ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৩৯তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৩৯

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

বর্ষা ঋতু তো প্রায় শেষের দিকেই।কিন্তু তবুও যেন ধরণী আকাশ থেকে পানি কণা গড়াতে ব্যস্ত।কিন্তু তেমন ভারী বর্ষণ আজ হচ্ছে না।খুবই হালকা ছিটা পানি ঝড়ছে।মাথার উপরে ছাতা ধরার কেউ তেমন প্রয়োজন বোধ করে না।তবে এই পানিতে ক্ষণিক সময় দাঁড়িয়ে থাকলে শরীর হালকা ভিজতে বাধ্য।আর বর্তমানে ভার্সিটির প্রাঙ্গনে প্রায় সবারই শরীর তেমনটা ভিজে আছে।কিন্তু সেই হালকা ভেজা শরীরের তোয়াক্কা যেন কেউই করছে না।তাদের সবার নজর তো সেই কতক্ষণ থেকেই এক যায়গায় স্থির হয়ে আছে।হয়তো বা এক ব্যক্তিতে।হয়তো বা....দুই ব্যক্তিও হতে পারে।কারণ কেউই তো ঠাহর করতে পারছে না যে তাদের কার দিকে দেখা উচিৎ।কল্পনার দিকে? নাকি তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নওশাদের দিকে।যে কল্পনার দিকে অক্ষি জোড়া রাখার সাথে সাথেই ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসিও ঝুলিয়ে রেখেছে।

কল্পনা আশেপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল।অনেক মানুষ জমা হয়েছে আশেপাশে।দূর থেকে আরো কিছু মানুষকে এদিকেই আসতে দেখা যাচ্ছে।এখানকার ঘটনা বুঝতেই তারা এগুচ্ছে হয়তো।

কল্পনা আবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নওশাদের দিকে দেখলো।কল্পনার থেকে খানিক দূরে খুব স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়িয়ে আছে সে।যেন তেমন কিছুই হয়নি।সে কিছুই করেনি।নওশাদের সামনের চুলগুলো দিয়ে তো এতক্ষণে পানি চুয়ে-চুয়ে পড়তে শুরু করেছে।আকাশের সেই হালকা বৃষ্টিতে যে ছেলেটা অনেক্ক্ষণ থেকেই দাঁড়িয়ে আছে।গায়ের রঙ ফর্সা হলেও ভার্সিটির যতসব রাজনৈতিক কাজ সামলাতেই যেন হালকা বাদামী বর্ণের হয়ে উঠেছে শরীরখানা।

আশেপাশের অনেক মেয়েই নওশাদের এমন আধো ভেজা অবস্থা দেখে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচছে না।ছেলেটাকে যে বড়ই সুদর্শন লাগছে এই মুহুর্তে।কিন্তু নওশাদের যেন সেই মেয়েদের দিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।তার নজর যে স্থির হয়ে আছে একটা লক্ষ্যেই।যখন থেকে পা জোড়া থমকে সেই স্থানে দাঁড়িয়েছে ঠিক তখন থেকেই একজনের উপরেই নজরকে বন্দি করে রেখেছে সে।কিন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি যেন এখনো তার কথার জবাব দিচ্ছে না।তাই তো ভারী পুরুষালী কন্ঠটা দিয়ে আবার বলে উঠল নওশাদ,

"কল্পনা!কি ভাবছো এতো?তোমাকে আমার গার্লফ্রেন্ড হতে বলেছি।বেশি কিছু তো আবদার করিনি।সিনিয়রের এতোটুকু আবদারটাই রাখতে পারবে না?"

ভিড়ের মাঝ থেকে এক মেয়ের কন্ঠ ভেসে এলো,

"নওশাদ ভাইয়া!!আমি আপনার সেই আবদার রাখতে পারি!!"

নওশাদ হাসলো হালকা।কল্পনার দিকে নজর রেখেই উঁচু গলায় বলে উঠল,

"যার কাছে আবদার করেছি শুধু সে মানলেই চলবে আমার"

নওশাদের সেই কথায় ভিড়ের ছেলেরা যেন হৈ-হুল্লোড় করে উঠল।

কল্পনার মাথার উপরে কালো ছাতাটা থাকার দরুন পড়নের ঘীয়ে রঙা কুর্তিটা ভেজার সুযোগ পায়নি।কিন্তু কুর্তির পায়াজামার আগাটা ঠিক নওশাদের আধো ভেজা কালো শার্টটার মতোই ভিজে আছে।এবার কল্পনার সেই ভেজা পায়াজামায় আবৃত পা জোড়া এগুতে দেখা গেল।দূরত্ব ঘুচিয়ে নওশাদের একটু কাছে এসে দাড়ালো সে।মুখোশ্রি গম্ভীর তার।শান্ত স্বরে বলল কল্পনা,

"কি মনে করেছেন?এতো মানুষের সামনে বললেই আমি হ্যাঁ করে দিব?তাহলে ভুল মেয়েকে প্রপোজ করতে এসেছেন আপনি।গত দু সপ্তাহ থেকে সহ্য করছি দেখে এটা মনে করিয়েন না যে আপনার প্রতি আমার কোনো ইন্টারেস্ট আছে।সিনিয়র হন দেখে সম্মান দিয়ে যাচ্ছিলাম।কিন্তু আর আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠছে না।কিন্তু তারপরেও আরো একবার এবং শেষবারের মতো বলছি।আমি আপনাকে পছন্দ করি না আর কখনো সেটা হয়েও উঠবে না।তাই প্লিজ,আর আমার পেছনে ঘুরিয়েন না"

ক্ষণিক সময় কল্পনার দিকে অপলক দেখে থেকে মাথা নিচু করে মেকি হাসল নওশাদ।অতঃপর আবার কল্পনাকে দেখতে লাগলো,

"এতো কিছু না বুঝিয়ে শুধু 'হ্যাঁ' টা বললে কি এমন ক্ষতি হয়ে যেত?দু সপ্তাহ থেকে তো একটা জিনিসই তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।কিন্তু তুমি যেন বুঝছোই না.....বুঝার চেষ্টাটাও করছো না আমার মনের কথা"

কল্পনা কোনো উত্তর করল না।সেই গম্ভীর মুখোশ্রিই এখনো বজায় রেখেছে।সেই চেহারায় নজর রেখেই নওশাদ ভারী এক শ্বাস ফেলল।অতঃপর আবার বলতে লাগলো।কিন্তু এবার যেন বেশ কোমলভাবেই শুধালো সে,

"বিশ্বাস করো কল্পনা,তোমাকে প্রথম যখন দেখেছিলাম তখন আসলেই শুধু তোমার এই সৌন্দর্য দেখে মনে ধরেছিলে।কিন্তু এই কয়দিনে তোমার প্রতিটা জিনিসই যেন ভালো লাগতে শুরু করেছে।তোমার ব্যাপারে চিন্তা না করে আমি থাকতে পারছি না,বিলিভ মি!আমি প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছি।আমার দিক থেকেও একটু চিন্তা করে দেখো না,প্লিজ।আমার মধ্যে এমন কি নেই যে তুমি আমাকে পুরোপুরি ইগনোর করে যাচ্ছো?আই হ্যাভ এভ্রিথিং!আই ক্যান গিভ ইউ এনিথিং!"

পরপরই কিছু বলল না কল্পনা।কিন্তু সময় নিয়ে সুক্ষ্ম এক কথা বলে উঠল।সেটা যেন নওশাদকেও থমকে দিল।

"ইউ ক্যান হ্যাভ এভ্রিথিং,বাট নট মি"

কথাটা বলেই কল্পনা নওশাদকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেল।ক্ষণিক সময় নিয়েই যেন নওশাদ কল্পনার সেই কথার ভাবনা থেকে বেড়িয়ে এলো।আবার হাসি ফুটলো ছেলেটার মুখে।পেছনে ঘুরে যেতে থাকা কল্পনার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলে উঠল,

"এই নওশাদকে তুমি পাগল বানিয়ে রেখেছো কল্পনা!একবার তো সাড়া দাও এই পাগলের ডাকে!!"

আকাশের বৃষ্টি তো এতক্ষণে পুরোপুরি থেমে গিয়েছে।কিন্তু সেদিকে দেখার যেন কারোরই সময় নেই।নওশাদের এহেন আবেগী বার্তায় কল্পনা তার পায়ের গতি না কমালেও আশেপাশে জড়ো হওয়া ভিড় যেন হৈ-হুল্লোড়ে ফেটে পড়ল।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

আই প্যাডের স্ক্রিনটায় বেশ সযত্নে একটা ছবি আর্ট করা।আর সেটা যে ক্ষণিক আগেই কেউ একেঁছে।কিন্তু দেখে যেন কারো বলার সাধ্য নেই যে এটা এই মুহুর্তেই আঁকা হলো।কি নিখুঁত সেই অংকন।যেন ছবিতে থাকা মেয়েটি এখনই বেড়িয়ে আসবে।যদি সেটা সম্ভব হতো তাহলে কেউ একজনের অনেকটা সুবিধা হতো বলা যায়।কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব নয়।

এক হাত গালে ঠেকিয়ে আরেক হাতের আ্যাপেল পেনটা দিয়ে কল্পনার সামনের কার্টেইন ব্যাঙ কাটের চুলগুলো আরো সুক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত সাহিত্য। কিন্তু কেন জানি সাহিত্যের চেহারা আর শরীর কোনোটাই দেখে মনে হচ্ছে না যে বিন্দুমাত্র শক্তি আছে তাতে।কেমন নেতিয়ে পড়ে প্রেয়সীর সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্ম বিবরণ ফুটিয়ে তুলছে সে।

হঠাৎই কেবিনে অয়ন ঢুকে পড়ল।কোনো কথা ছাড়াই সাহিত্যের চেয়ারের পাশে থাকা র‍্যাক থেকে ফাইল খুঁজতে লাগলো।কাংক্ষিত ফাইলটি পেয়েই সোজা হয়ে দাড়িয়ে সেটি উলোটপালোট করতে লাগলো।কিন্তু সাহিত্যের আই প্যাডে চোখ পড়তেই বেশ ভড়কালো সে।ফাইলটা এক ফিক মেরে সোফায় ফেলে দিয়ে সাহিত্যের শরীরের সাথে ঘেঁষে একটু ঝুকে এলো,

"সর্বনাশ সাহিত্য!তুই আর্টে ভালো সেটা জানা ছিল।কিন্তু এতো ভালো সেটা কে-ই বা জানতো!এটা তো হুবাহু কল্পনার ছবি মনে হচ্ছে।কোনো খুঁত নেই ছবিটাতে"

অয়নকে তোয়াক্কা করল না সাহিত্য।সে তো নিজের দুঃখ থেকেই বেড়িয়ে আসতে পারছে না।এবার আই প্যাডটা মুখের সামনে তুলে ধরে ভাঙা গলায় বলে উঠল,

"আহারে আহারে,কবে পাবো তাহারে?"

সাহিত্যের সেই কথা শুধু অয়নের কানেই না,বর্তমানে কেবিনে ঢুকতে থাকা রবির কানেও পৌঁছালো।সাহিত্যের সেই কথা শুনে তো অয়ন হাসতে শুরু করেছে।আর রবি দরজার কাছে দাড়িয়েই ভ্রু কুচকালো।অতঃপর ভারী শ্বাস ফেলে ভেতরে ঢুকলো সে।সাহিত্যের সামনের চেয়ারটাতে বসতে নিয়েই বলে উঠল,

"এতোই যখন তর সইছে না তো কল্পনাকে বলে দিলে কি হয়?অন্তত একটু প্রেমটা তো করতে পারবি"

সাহিত্যের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অয়ন এখনো হেসেই যাচ্ছে।যেটা সাহিত্যের কানে বেশ তীর্যকভাবেই লাগছে।তাই তো উঠে দাঁড়িয়ে হাতের আই প্যাডটা দিয়ে অয়নের পিঠে ধুমাধুম দুটো বসিয়ে দিল।তাতে ভালোই আর্তনাদ করে উঠল অয়ন।অয়নকে কিলিয়ে আবার চেয়ারে বসলো সাহিত্য।রবির প্রশ্নের উত্তরটা এখন ঠান্ডা মাথায় দিতে পারবে সে,

"এখন যতটুকু কাছে যেতে দেয়,বলে দিলে ততটাও আর যেতে দেবে না"

রবি ভ্রু কুচকালো।আর এদিকে অয়ন পিঠ বাকিয়ে এসে রবির পাশের চেয়ারে বসল,

"কেন?তোর পিচ্চি প্রেমিকা তোরে ভালোবাসে না?"

আজ যেন সাহিত্যের কেবিনে ঢুকাই ভুল হয়েছিল অয়নের।সেটার সাক্ষী দিয়ে দিল সাহিত্যের দিক থেকে অয়নের দিকে ঢিল মারা পেপার ওয়েটটা।ক্যাত করে উঠল অয়ন।হাতের জবাব দিয়ে এখন মুখের জবাব দিল সাহিত্য,

"আমার জানপাখি আমাকে ঠিকই ভালোবাসে।কিন্তু সমস্যা হলো তার বাপকে নিয়ে।চাচাটা আমার এতো বড় ভূমিকা পালন করছে যে বলার বাইরে"

অয়ন পেপার ওয়েটটা টেবিলে শব্দ করে রেখে আতঙ্কের সুরে বলল,

"কেন!!তোর চাচা আবার কল্পনার বিয়ে ঠিক করেছে নাকি?"

চেচিয়ে উঠলো সাহিত্য,

"তোর মুখে ঠাডা পড়ুক শালা!!ভালো কিছু কি আদোও তোর মুখ থেকে কখনো বের হয়েছিল?"

অয়ন আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল।কিন্তু রবি তার কাধে হাত রেখে থামিয়ে দিল।নজর তার সাহিত্যের দিকে,

"বাসায় আবার কিছু হয়েছে?"

সাহিত্য ভারী শ্বাস ফেলল,

"যেমন তেমনই আছে।আর এই কল্পনা তো সেটা ঠিক করতেই উঠে পড়ে লেগেছে।যার কারণে আমার থেকে কেন জানি একটু ভদ্রতা বজায় রেখে চলে এখন।মাঝে-মাঝে এমন করে দেখবে,এমন করে কথা বলবে যে মনে হয় আমার জানটা আমাকে ভালোবেসে ফাটিয়ে দিচ্ছে।কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই যেন আমাকে ভুল প্রমাণ করে দেয়।বুঝায় যেন সে কিছুই বুঝে না"

"তার মানে কি কল্পনা তোকে পছন্দ করে কিন্তু পছন্দ করতে চাচ্ছে না?"

অয়নের আরেকবার মুখ খুলায় সাহিত্য নিজের মুখ বিকৃত করে রবির দিকে দেখলো,

"আব্বে এটাকে মুখ খুলতে নিষেধ কর তো।সহ্য হচ্ছে না আমার"

সাহিত্যের সে কথায় অয়ন আবার চুপসে গেল।কিন্তু সাহিত্যের যেন টনক নড়ল,

"তুই যেটা বলেছিস সেটা অবশ্য ভুল বলিসনি"

মিনমিনিয়ে শুধালো অয়ন,

"গরীরের কথা বাসি হলেও ফলে"

সাহিত্য আবার বলতে লাগলো,

"ব্যাপারটা মনে হয় তেমনই কিছু।কল্পনা আব্বু আর মেঝো চাচুকে মিলানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।তার মানে সে চেষ্টা করছে যেন এমন কিছু না হোক যেন তারা আবার বাড়ি ছেড়ে চলে যাক.."

কথা বলতে বলতে দুই হাত দিয়ে নিজের মাথার চুলগুলো টানতে নিয়েই পেছনে নিয়ে গেল সাহিত্য।সাথে হালকা গোঙানি দিয়ে উঠল।অতঃপর ভারী কন্ঠে শুধালো,

"কেন জানপাখি?কেন নিজেকে এমন করে কষ্ট দিচ্ছিস?তোর সাথে যে আমিও পস্তাচ্ছি"

রবি বলল,

"তুই এতো সিওর কেমন করে?সেটা নাও তো হতে পারে"

রবির পাশে দেখে মেকি হাসল সাহিত্য,

"কল্পনাকে আমি বাচ্চাকাল থেকে চিনি।ওর মন মেজাজে কি চলছে আমার থেকে ভালো কেউ বলতে পারবে না।ওটা তো আমারই কলিজার টুকরা।আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট সিওর না।কিন্তু পুরোপুরি ভুলও না।কোনো কারণ থাকলে একমাত্র এটা কারণই থাকতে পারে।আমি আর কোনো কারণ দেখছি না"

চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিল রবি,

"তাহলে এটার সমাধান কি?কল্পনা নিজে যদি রাজি না থাকে তাহলে তুই ওকে বিয়ে করবি কেমন করে?আর কল্পনা রাজি না থাকলে তো ফাহাদ আংকেল আরো বাধা হয়ে দাঁড়াবে"

আবার নিজের চুল টানতে লাগলো সাহিত্য।রাগটাকে যেন দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করছে,

"জানা নেই আমার।কি করব,কেমন করে করব কিছুই জানা নেই আমার।কল্পনা মেঝো চাচুকে যেমন সম্মান করে তার থেকেও বেশি ভয় করে।কল্পনা তো আগে থেকেই ভয়ে আছে।আর মেঝো চাচু তাকে একবার না করলে কারো সাধ্য নেই তাকে দিয়ে হ্যাঁ বলানোর।মেয়েটা মেঝো চাচুর সামনে নিজের মনের কথা একদম চিন্তা করে না।পাগলটা তো পারলে তার বাবার কথায় ম'রতেও দৌড়াবে!"

সাহিত্যের কথায় বাকি দুজনের ভারী শ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকলো না।তারাও বেশ চিন্তায় আছে এ ব্যাপার নিয়ে।না জানি কি হবে ভবিষ্যতে?সাহিত্য কল্পনাকে না পেলে যে তুলকালাম শুরু করবে সেটা সাহিত্যের বন্ধুদের ভালো করেই জানা আছে।

হঠাৎই দরজায় নক করার শব্দ হলো।রবি অনুমতি দিতেই রাজ মাথা ঢুকিয়ে দিল,

"স্যার....ওই যে....আসলে...ম্যাম এসেছে"

রাজের মুখে 'ম্যাম এসেছে' শুনে কেবিনের তিনজনই চমকে উঠল।রাজ একটা মেয়েকেই 'ম্যাম' সম্মোধন করে ডাকে।কিন্তু সেই মেয়ে হঠাৎ এখানে কেন?তিন বন্ধুর চিন্তার মাঝেই রাজের পেছন থেকে কল্পনা বলে উঠল,

"আহা ভাইয়া,আমি আপনার থেকে অনেক ছোট।আমাকে ম্যাম বলে ডাকিয়েন না তো"

কল্পনার গলা শুনে ধড়ফড়িয়ে উঠল রবি,অয়ন আর সাহিত্য।কিনা কি করবে কারোরই যেন মাথায় ঢুকছে না।সাহিত্য চটজলদি আই প্যাডটা থেকে কল্পনার ছবিটা সড়িয়ে ফেলল।আর ওদিকে রবি আর অয়ন সটান দাঁড়িয়ে পড়েছে।এর মাঝেই কল্পনা রাজকে ঠেলে ভেতরে ঢুকলো।সেই সাথে কেবিনের তিন যুবকেরও ধড়ফড়ানি পর মুহুর্তেই থেমে গেল।মিনমিনিয়ে শুধালো কল্পনা,

"আমি কি ভুল সময়ে এসেছি?"

কল্পনার কথায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে উঠল রবি আর অয়ন,

"আরে না না!তেমন কিছু না"

সাহিত্য সটান দাঁড়িয়ে।মুখোশ্রি গম্ভীর তার,

"হ্যাঁ, ভুল সময় এসেছিস তুই।এই অসময়ে কে আসতে বলেছে তোকে?আর কার সাথে এসেছিস?"

সাহিত্যের এমন কথায় রবি আর অয়ন বেশ ভড়কালো।মেয়েটাকে এমন করে বলার কি আছে?আজ প্রথমবার এসেছে সে সাহিত্যের অফিসে।কি একটু মাথায় বসিয়ে রাখবে, তা না করে কেমন করে কথা বলছে!

কিন্তু এদিকে যে সাহিত্যের মনে অন্যকিছুই চলছে।তার জানপাখির উপর এখন বড্ড রাগ করে আছে সে।কল্পনা কেন তাকে এমন দূরে ঠেলে দিচ্ছে?কল্পনার নিজের মন বলে কি কিছু নেই?সব সময় তার বাবার কথায় চলতে হবে?একবার নিজের মনের কথা শুনলে এমন কি হয়ে যাবে?সেটাতে একটা জিনিসই হতে পারে।আর সেটা হলো সাহিত্য তার জানপাখিকে নিজের করে পাবে।কিন্তু কল্পনার তো সেদিকে খেয়ালই নেই।না নিজের দিকে দেখে,আর না সাহিত্যের দিকে দেখছে।

সাহিত্যের কথায় কল্পনা একটু চুপসে গেল।সে বুঝলো কোনো কারণে হয়তো সাহিত্যের মেজাজ ভালোই গরম আছে।তাই তো বাচ্চাদের মতো সাহিত্যের রাগ মাখা কথা গায়ে মাখালো না সে।মুখে হাসি নিয়ে বলে উঠল,

"অসময় কেন?লাঞ্চ টাইমেই তো এসেছি।আর আমি যদি না আসতাম তাহলে পরে আপনিই আপসোস করতেন"

কল্পনার হাসি দেখে এবার বাধ্য হয়েই সাহিত্য হালকা হেসে দিল।তার জানপাখিটা যে প্রতিবারের মতোই সাহিত্যের রাগ কমাতে লেগে পড়েছে।হালকা হাসতে নিয়েই বলল সে,

"ও আচ্ছা?কি এমন আপসোস করতাম শুনি একটু"

রবি আর অয়ন একবার কল্পনার দিকে তো একবার সাহিত্যের দিকে দেখছে।সাহিত্যের রাগ গায়েব?রবি আর অয়ন যেন আজ বুঝতে পারলো যে সাহিত্য কেন কল্পনার কাছে ঠান্ডা থাকে।সাহিত্য ইচ্ছা করে ঠান্ডা থাকে না।কল্পনা তাকে ঠান্ডা রাখতে পারে।মেয়েটা যেন ভালো করেই বুঝে যে সাহিত্যের কাছে কখন কি বললে সাহিত্য ঠান্ডা হয়ে যাবে।

সাহিত্যের কথায় আরেক দফা হেসে উঠল কল্পনা।হাতের বড়সড় টিফিন বক্সটা দেখিয়ে বলল,

"লাঞ্চ নিয়ে এসেছি বাসা থেকে।মা-চাচিমারা আজ অনেক কিছু রান্না করেছে।অন্ত ভাইয়া বাবা-চাচুদের দিতে গিয়েছে।তো আমি ভাবলাম আপনাকে আমিই দিয়ে যাই"

সাহিত্য হালকা শ্বাস ফেলল।তার মা-চাচিরা আর কাজ পায় না।সাহিত্যকে সেদিনই বলছিল দুপুরে যেন ভালো খাবার খায়।সাহিত্য কথাটা হেলাফেলায় নিয়েছিল।আর আজ দেখো কি কান্ড করে বসেছে।

অয়ন কল্পনার হাতের টিফিন বক্সটা দেখা মাত্রই চোখ বড় বড় করে বলে উঠল,

"আয়-হায়,বাড়ির খাবার!"

রবি বলল,

"এমন করে বলছিস যেন তুই বাড়িতেই থাকিস না"

চোখের জল মুছার ভান করল অয়ন,

"আরে শেখ বাড়ির খাবারের কথা বলছি রে।আগে সেখান থেকে প্রায় প্রায় দাওয়াত পেতাম।কিন্তু এখন তো কেউ নিয়েই যায় না"

অয়ন শেষের কথাটা বলতে নিয়েই সাহিত্যের দিকে দেখলো।আর কল্পনা এদিকে ফিক করে হেসে উঠে বলল,

"আপনাদের জন্যও পাঠিয়েছে ভাইয়া"

কল্পনার কথা শুনেই অয়ন তার জ্বলজ্বল করতে থাকা চোখ জোড়া নিয়ে টিফিন বক্স হাতে নেওয়ার জন্য এগিয়ে গেল।কিন্তু সাহিত্য উড়ে এসে তাকে পেছন থেকে টেনে ধরল।কানের কাছে মুখ নিয়ে হিসহিসিয়ে বলল সে অয়নকে,

"একদম কল্পনার ধারের কাছেও যাবি না,কালমুখা"

অয়ন কিছুক্ষণ আগে যে সাহিত্যকে এতো-এতো কথা বলছিল সেটারই রাগ এখন ঝাড়ছে সাহিত্য।কল্পনা সেটার কিছু না বুঝতে পেরেই পিটপিট করে দেখতে লাগলো।রবি এগিয়ে এলো কল্পনার দিকে,

"আরে কল্পনা, তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন?বসো-বসো"

কল্পনা টেবিলের উপরে টিফিন বক্সটা রাখতে নিয়েই বলে উঠল,

"না ভাইয়া,আমি বসবো না।বাসায় যেতে হবে তাড়াতাড়ি"

সাহিত্য তার ভ্রু জোড়া নেতিয়ে নিল,

"কেন?"

সাহিত্যের মাসুম নজর কল্পনার নজরে এলো না।কারণ তার চেহারায় তো আরেক টেনশন।শুধু সাহিত্যকে বুঝানোর জন্যই সাহিত্যের দিকে দেখে বলে উঠল সে,

"কারণ বাবা কিছুক্ষণ পরেই বাসায় ফিরবে"

আবার ফুসে উঠল সাহিত্য।এই চাচাটার কিছু করা উচিৎ সাহিত্যের।আশেপাশে না থেকেও যেন ঝামেলা পাকিয়ে যাচ্ছে।

সাহিত্যের হাতের বাধন ছাড়া পেয়ে অয়ন আবার কল্পনার দিকে এগিয়ে গেল।হ্যান্ডশেকের জন্য হাত সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

"আমি অয়ন আর ওটা রবি।তোমাকে কত পিচ্চিতে দেখেছিলাম।এখন কত বড় হয়ে গিয়েছো"

অয়ন হাসি মুখে চোখ বন্ধ করায় হয়তো সাহিত্যের আগমন খেয়াল করল না।সাহিত্য অয়নের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটার সাথে নিজের হাত মিলিয়ে নিয়ে মোচড়াতে শুরু করল।কিড়মিড়িয়ে বলে উঠল সে,

"তো ওর বয়স কি তোর মনমানসিকতার মতো সবসময় ছোটই থাকবে?"

চোখ বন্ধ করে রাখা অয়ন এবার চোখ কোটর থেকে ফাটিয়ে বের করে সাহিত্যের দিকে দেখতে লাগলো।সাহিত্য এখনো অয়নের হাতটা ভালোভাবেই কচলে যাচ্ছে।হাতের ব্যথায় অয়নের বেহাল দশা।কিন্তু একটা মেয়ে মানুষের সামনে তো আর গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করতে পারছে না।নাহলে তখন সাহিত্য আবার বলে উঠবে 'শালা কচুর লতির মধ্যে ম্যানলি কোনো ম্যানার্স নেই'। তাই তো দাঁতে দাঁত চিবিয়ে সহ্য করে যাচ্ছে।অয়ন তো শুধু তার ভাবিটার সাথে একটু পরিচয়ই হতে চাচ্ছিল।কিন্তু এই সাহিত্যের যেন সেটাই সহ্য হচ্ছে না।

অয়ন তো অপেক্ষায় আছে যে সাহিত্য কখন হাতটা ছাড়বে।কিন্তু সাহিত্যের সেই ইচ্ছার কোনো লক্ষ্মণই দেখা দিচ্ছে না।তাই তো অয়ন এবার সাহিত্যের হাতের বাধোনের মাঝে থাকা তার হাতটা উপর-নিচ ঝাকিয়ে বলতে লাগল,

"দেখি ছাড় তো, কি খাবার পাঠিয়েছে আন্টি দেখি একটু"

"আমার খাবারে নজর দিবি না"

আবার ধীমি আওয়াজে কটমটিয়ে উঠল সাহিত্য।অয়ন ঠিকই বুঝছে সাহিত্য টিফিনের খাবারের কথা বলছে না।সে তো তার জানপাখির কথা বলছে।ভয়ে অয়ন এবার জোর করেই সাহিত্যের হাত থেকে নিজের হাতটা টেনে ছাড়িয়ে নিল।ফাহাদ শেখের রাগ যে সাহিত্য সম্পুর্ণ অয়নের উপর ঝাড়ছে সেটাও বেশ ভালো করে বুঝলো সে।সাহিত্যের এমন রাগে অয়নকেই বারবার বলির পাঠা হতে হবে কেন?!

নিজের হাতটা দ্রুত পেছনে নিয়ে মুখে নকল হাসি ফুটালো অয়ন,

"তোর খাবারে আমি কেন নজর দেব?আমি তো আমার ভাগের কথা বলছি"

অয়নের মুখ বরাবর এগিয়ে এলো সাহিত্য,

"আমার খাবারে কিসের ভাগ খুজছিস তুই?নিজেরটা নিজে খুঁজে নে"

চোখ বন্ধ করে মিনমিনিয়ে শুধালো অয়ন,

"ভাই আমি টিফিন বক্সের খাবারের কথা বলছি।প্লিজ ছেড়ে দে আমায়"

অয়নের এমন বেহাল দশা দেখে বেশ মায়া হলো কল্পনার।তাই তো সাহিত্যের একটা হাত ধরে টানতে লাগলো সে।শান্ত স্বরে শুধালো,

"আ-আরে সাহিত্য ভাই,আপনার খাবারে কেউ ভাগ বসাবে না তো।সবার জন্যই খাবার পাঠিয়েছে"

প্রেয়সীর হাতের ছোঁয়ায় রাগটাতে যেন ধপ করেই এক গোলা বরফ পড়ল সাহিত্যের।মাথা ঘুরিয়ে কল্পনার ধরে রাখা হাতের দিকে দেখলো।আজ প্রায় দুই মাসের মতো হয়ে গেল সাহিত্য তার প্রেয়সীর হাতের কোনো ছোঁয়া পায়নি।যার দরুন আজ হঠাৎ প্রেয়সীর ছোঁয়ায় মোমের মতো গলে গেল সাহিত্য।কল্পনার হাতটা আরো গভীরভাবে জড়িয়ে ধরল সে।সেই হাত নিজের হাতে রেখেই কল্পনাকে নিয়ে সোফার দিকে আগালো।কল্পনাকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে নিজে কল্পনার সামনে টি-টেবিলটায় বসলো।রাজকে ইশারা করে টিফিন বক্সটা নিয়ে আসতে বলল।কল্পনার দিকে ঘুরে কোমল কন্ঠে বলল,

"কি কি খাবার পাঠিয়েছে?"

কল্পনার নজর তার হাতের উপরে ছিল।যেটা সাহিত্য শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে।সাহিত্যের কথায় ভড়কে উঠে সাহিত্যের দিকে নজর দিল সে।আমতা-আমতা করে বলতে লাগলো,

"খ-খুলে দেখিয়ে দিচ্ছি"

বাধা দিল সাহিত্য,

"রাজ খুলছে।তুই শুধু দেখে বলে দে কোনটা কি"

প্রেয়সীর হাত যেন নিজের হাত থেকে না ছুটে যায় তার জন্যই তো সে কাজ করা সাহিত্যের।আজ যত বেশি সময় পর্যন্ত সম্ভব ততক্ষণ প্রেয়সীর হাত ধরে থাকবে সাহিত্য।না জানি আর কত সময় পর এমন নিজ ইচ্ছায় তাকে ছুবে তার প্রেয়সী।

অয়ন তো লুকিয়ে নিজের হাত ডোলতে ব্যস্ত।কিন্তু রবি স্টাডি টেবিলটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দুই হাত বুকে ভাজ করে আছে।নজর তার কল্পনা ও সাহিত্যের হাতের বন্ধনে।স্বইচ্ছায় হাত ধরে রাখা আর জোর দিয়ে হাত ধরে রাখা দুটোই ভালো করে বুঝে রবি।তার ঘরেও তো একটা বউ আছে।কল্পনা যেন কোনো সংকোচই বোধ করছে না সাহিত্যের হাত ধরায়।বরং খাবারের নামগুলো বলতে নিয়ে সেগুলো বানানোর সময় রান্নাঘরে কি-কি মজার ঘটনা হয়েছে সেগুলো বলছে আর সাহিত্যের হাতটা ক্ষণে-ক্ষণে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে ধরছে।যেন সাহিত্যের সেই হাতটার মাঝে কল্পনার হাতটা বেশ অধিকার নিয়েই ঠাই হয়ে আছে।যেন সেই হাতেই হাত রাখা কল্পনার জন্য সবচেয়ে নিরাপত্তার অনুভূতি।

এবার সাহিত্যের দিকে নজর দিল রবি।এক হাত তো প্রেয়সীর নামে কোরবান করে দিয়েছে সে।আর আরেক হাতের কনুই উরুতে ঠেকিয়ে কল্পনার দিকে মাথাটা ঝুকিয়ে দিয়ে হাতের তালায় মাথাটার ভাড় দিয়ে আছে।কি আবেগ ভরা চোখে বকবক করতে থাকা নিজের প্রেয়সীকে দেখছে সে।যেন সেটার থেকে মধুর কথা এ দুনিয়ায় আর কিছু হতেই পারে না।আবার মাঝে মাঝে কল্পনার কিছু কথায় প্রশ্নও করছে আবার কিছু কথার উত্তরও দিচ্ছে।

রাজ সব টিফিন বাটির ঢাকনা খুলে দিয়ে এসে রবির পাশে দাড়ালো।তার বস ও ম্যামের দিকে নজর রেখেই রবির উদ্দেশ্যে বলে উঠল,

"আপনি জিজ্ঞেস করেন না,যে আমি কল্পনাকে ম্যাম কেন ডাকি?তার কারণ এটা।স্যার অফিসে থাকা অবস্থায় যখনই কল্পনার সাথে ফোনে কথা বলে তার মুখে এক আলাদাই হাসি থাকে"

ধীমি আওয়াজে বলল রবি,

"হ্যাঁ,সেটা এখন আমিও বুঝছি"

বেশ কিছুক্ষণ কল্পনার খাবারের বর্ণনা চলল।অয়ন আর রাজ তাদের একা থাকতে দিতে চাইলে রবি থামিয়ে দেয়।সেই কাজ করলে প্রথমত কল্পনার মনে সন্দেহ ঢুকবে।যেটা হতে দেওয়া যাবে না।আর দ্বিতীয়ত,সাহিত্যকে এখন কল্পনার কাছে একা ছাড়া যাবে না।সাহিত্যের নিজের অনুভূতিদের উপর কখনোই নিয়ন্ত্রণ ছিল না।তার শরীরের শিরা-উপশিরারা যদি টের পায় যে সাহিত্য আর কল্পনা একা আছে তাহলে সাহিত্যের অজান্তেই সে ভুল কিছু করতে পারে।যেটা এখন কোনোভাবেই হতে দেওয়া যাবে না।যার দরুন তিনজন রুমে থাকলেও তাদের থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখেই থাকলো।মাঝে মাঝে রবি বাড়ির গিন্নিদের ব্যাপারে কিছু টুকটাক জিজ্ঞেস করে যাচ্ছিল।যেন সাহিত্যের স্মরণে থাকে রুমে আরো মানুষও আছে।

সবকিছু বলে এবার কল্পনা একটা নির্দিষ্ট টিফিন বাটির দিকে নজর দিল,

"আর এটা চিংড়ির মালাইকারি।চাচিমা কিন্তু এটা অনেক শখ করে বানিয়েছে আপনার জন্য।এটা আপনি খাইয়েন,ঠিক আছে?...খাবেন কিন্তু।খেয়ে জানাইয়েন কেমন হয়েছে"

সাহিত্যসহ কেবিনে উপস্থিত সবাই বুঝলো যে সেই কাঙ্খিত চিংড়ির মালাইকারি চাচিমা নয়,সয়ং কল্পনা নিজে রান্না করেছে।তাই তো এতো কোমলপ্রাণে সাহিত্যের কাছে আবদার করছিল যেন সাহিত্যই সেটা খায়।তার খাওয়ার আগে যেন শেষ না হয়ে যায়।

নিজের জানপাখির এমন কথা শুনে নিম্নাষ্ঠ কামড়ে লুকিয়ে হাসলো সাহিত্য।অতঃপর কল্পনার উত্তরে উপর-নিচ মাথা ঝাকালো।কথা শেষেই কল্পনা উঠে দাড়ালো,

"আমার এখন যাওয়া উচিৎ।বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে"

সাহিত্য যেন হঠাৎই মনমরা হয়ে গেল,

"আমার অফিসটা একটু ঘুরেও দেখবি না?"

"আজকে থাক সাহিত্য ভাই।নাহলে বাসায় দেরি করে গেলে বাবা প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করে বসবে"

কল্পনা সামনে আগাতে গিয়েও থেমে গেল।সাহিত্য যে এখনো কল্পনার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে।সেদিকে কল্পনা নজর দিতেই সাহিত্য অনিচ্ছায় কল্পনার হাতটা একটু ঢিল দিল।কল্পনা সামনে এগোতেই সাহিত্য উঠে দাড়ালো।ভারী কন্ঠেই বলল,

"তুই একাই যাবি?আমি দিয়ে আসি?"

না করল কল্পনা,

"লাগবে না।আমি চলে যাবো।একটু প্রীতির সাথে দেখা করব তো।তার সাথেই চলে যাবো"

সাহিত্য আর কথা বাড়ালো না।কল্পনাকে বিদায় দিয়ে নিজের লেদার চেয়ারটাতে ধপ করে বসে পড়ল।ডান হাতখানা মুখের সামনে ধরে দেখে যাচ্ছে সে।ক্ষণিক আগেই কল্পনা তার এই হাতের তালুর সাথে নিজের হাতের তালু মিশিয়ে রেখেছিল।

অয়ন এগিয়ে এলো সাহিত্যের দিকে,

"এই! তুই কল্পনার সামনে আমার সাথে অমন কেন করছিলি?কল্পনা কি মনে করবে?যে আমার ক্যারেক্টরে সমস্যা আছে?"

সাহিত্য নিজের হাত থেকে নজর সড়ালো না,

"যেখানে আমি আমার জানপাখির কাছে প্রায় গত দু মাস থেকে যেতে পারিনি,সেখানে ওর এতো কাছে অন্য কেউ কেমন করে সহ্য হবে আমার?"

এবার অয়নের দিকে দেখল সে,

"আর তোর ক্যারেক্টর আসলেই ঢিলা।বছরে ১৩টা গার্লফ্রেন্ড চেঞ্জ করিস।আমার কল্পনার থেকে দূরে থাকবি।নাহলে তোর সম্পদ হারাবি,বলে দিচ্ছি"

শেষের কথাটা কিড়মিড়িয়েই বলল সাহিত্য।সেটাতে লম্বা এক ঢোক গিলল অয়ন।কল্পনাকে তো সে ভাবি হিসেবেই দেখে।কিন্তু এই রগচটাকে এখন সেটা বুঝিয়ে লাভ নেই।খাবারের কড়া ঘ্রাণে টি-টেবিলের দিকে চোখ ঘুরালো অয়ন।সাহিত্যের হুমকি সাইডে রেখে দুই হাতের তালু ঘষতে নিয়েই বলল,

"এই রাজ,তাড়াতাড়ি সবার জন্য প্লেট নিয়ে আয়।আজ আমাদের চারজনের দাওয়াত খাওয়া হবে এখানে"

রবি সাহিত্যের দিকে নজর দিল।সাহিত্য এদিকে শরীরের ভাড় টেবিলে ছেড়ে দিয়েছে।নেশালো নজর তার এখনো ডান হাতটায়।রবি নিঃশব্দে মেকি হেসে শুধালো,

" কিরে? তোর বউ লাঞ্চ দিয়ে গেল, খাবিনা?"

সাহিত্য ছোট করে বলে উঠল,

"না"

ভ্রু কুচকালো রবি,

"কেন?"

"খাবার খেলে এখন এই হাত ধুতে হবে।আর এই হাত আমি ধুতে পারবো না"

সাহিত্যের উত্তরে রবি আবার ঠোঁট টিপে হাসলো।আর ওদিকে অয়ন সাহিত্যকে শুনানো জন্য উঁচু গলায় বলে উঠল,

"রাজ,চিংড়ির মালাইকারিটা এদিকে দে তো।ওটা বেশি টেস্টি লাগছে"

ধড়ফড়িয়ে উঠে দাড়ালো সাহিত্য।অয়নের দিকে এক আঙ্গুল তাক করে দাঁতে দাঁত চিবিয়ে আবার কটমটিয়ে উঠলো,

"চিংড়ির মালাইকারিতে হাত দিলে তুই আর বাইরের আলো দেখতে পারবি না।চিংড়ি গলা থেকে নামার আগেই তোর গলায় পাড়া মারব!"

অয়ন প্রতিবারের ন্যায় এবারো চুপসে গেল,

"ভাই আমি তো শুধু মজা করছিলাম....এই রাজ!চিংড়ির বাটিটা আমার থেকে দূরে রাখ তো ভাই!নিজের জীবনের মায়া আছে আমার"

অয়নের কাঁদো গলায় রবি আর রাজ হেসে উঠল।সাহিত্য একটু শান্ত হয়ে আবার চেয়ারে বসে পড়ল।এবার হাত দুটো আড়পার করে সেগুলোর মাঝে মাথাটা রেখে হেড-ডাউন করল সে।সাথে ডান হাতের তালুতে নাক ডলতে লাগলো।সেখানটায় মনে হয় কল্পনার শরীরের মিষ্টি সুবাসটা এখনো লেগে আছে।তাই তো চোখ জোড়া আবার ভারী নেশায় আধো বন্ধ হয়ে এলো সাহিত্যের।

সাহিত্যের এমন পাগলামি দেখে শুধালো রবি,

"ভাই.....কল্পনার প্রতি তোর এই অবসেশনের একটা সীমা থাকা দরকার"

সাহিত্য তো এখনো তার প্রেয়সীর নেশায় বুদ হয়ে আছে।আদলখানা আরো গভীরভাবে মিশিয়ে দিল হাতটার সাথে।নেশালো কন্ঠেই ধীমি আওয়াজে রবির উদ্দেশ্যে শুধালো,

"দরকার নেই কোনো সীমার"

#চলবে

দুইটা পর্ব লাগালাগি দিয়েছি তার মানে এটা না যে পরের পর্বগুলোও প্রতিদিন আসবে।শুক্র-শনি ছিল দেখে দিয়েছি।মারাত্মক পরিমাণের রাইটিং ব্লকে পড়ার পরেও দুটো পর্ব লিখে দিয়েছি।তারউপর মন-মেজাজ খুবই খারাপ আছে।গল্প লিখতে বসলেই আপনারা গল্পে গালি ছাড়া কিছু পাবেন না🐸।কিন্তু চেষ্টা করব দুইদিনের বেশি যেন দেরি না হয়।একজন পাঠক হিসেবে আপনাদের গল্প পড়ার কুড়কুড়ানি একটু হলেও বুঝি আমি।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন