#পর্ব_৪৩
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
প্রতিদিনের মতোই বসুন্ধরা শপিংমল আজও মানুষের আনাগোনায় ব্যস্ত।কেউবা সোরুমে ঢুকে নিজের পছন্দের কাপড় নাড়াচাড়া করতে ব্যস্ত,তো কেউবা পছন্দের কাপড় হাতে নিয়ে কাউন্টারে বিল পরিষদ করতে ব্যস্ত।কিন্তু এদের মাঝে কেউ একজন যে নিজের পছন্দের জিনিস না খুঁজে তার পছন্দের মানুষের জন্য জিনিস খুঁজতে ব্যস্ত এই মুহুর্তে।
কল্পনা প্রায় অনেকক্ষণ থেকেই miniso-তে ঘুর-ঘুর করছে।কিন্তু চোখে যেন কোনো জিনিসই ধরছে না তার।এমন কিছুই তার চোখে ধরছে না যেটা সে তার সেই পছন্দের মানুষকে উপহার দিতে পারবে।
সামনের জিনিসগুলোতে নিজের হাত বুলিয়ে এবার কল্পনা মাথা বাড়িয়ে বাকিদের দেখলো।তার কিছু ক্লাসমেট ক্ষাণিকটা দূরেই দাঁড়িয়ে আছে।তারাও হয়তো টুকটাক জিনিস দেখছে।কল্পনা অবশ্য আজ এখানে থাকতো না।কিন্তু তার কিছু ক্লাসমেট তাকে অফার করে এখানে আসতে।একটু ঘুরাও হয়ে যাবে,সাথে টুকটাক প্রয়োজনীয় জিনিসও কেনা যাবে।কল্পনা অবশ্য না করে দিত।কিন্তু হঠাৎ সাহিত্যের বার্থডে গিফটের কথা মনে হতেই আর পিচপা হয়নি।সামনের অক্টোবর মাসের ১তারিখ সাহিত্য ভাইয়ের জন্মদিন আসছে।আর এদিকে কল্পনা সাহিত্যকে প্রমিস করা আগের জন্মদিনেরই জন্য কিছু দেয়নি এখনো।কিন্তু কি-ই বা করবে কল্পনা?বেশ কয়েকদিন থেকেই তো তার আশেপাশের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। ভার্সিটির সাথে শেখ ভিলাও যে কল্পনার বারোটা বাজিয়ে রেখেছে।
শেখ ভিলার পরিবেশ উপেক্ষা করতে যে একটু ভার্সিটিতে গিয়ে থাকবে,তাতেও যেন রেহাই নেই।কল্পনার ভার্সিটির সিনিয়র নওশাদ যেন হাত ধুয়ে পড়েছে কল্পনার পেছনে।ছেলেটা কল্পনাকে মনে করাচ্ছে সে যেন পাগল প্রায় কল্পনার জন্য।কিন্তু কল্পনার তো তার সম্পর্কে এতো দিনে ভালো করেই ধারনা চলে এসেছে।ছেলেটা যে পুরোই বখাটে একটা ছেলে।কত মেয়ের সাথে যে গা ঘেঁষে চলেছে তার হিসাব নেই।সুন্দর মেয়ে দেখলেই নাকি নিজের গার্লফ্রেন্ড বানাতে দৌড়ায়।আর সেটার মেয়াদ রুমডেট পর্যন্তই।তো কল্পনা জেনে-শুনে কেন সেই ছেলের সাথে রিলেশনে যাবে?আর ওদিকে তো রাতুল আছেই।এখনো কল্পনাকে ফোনে নক দিয়েই যায়।তবে বেশ কয়দিন থেকেই সরাসরি দেখা দেয়নি।না দেখা দিলেই ভালো।কল্পনার তো এখন একটু ভয় করতেও শুরু করেছে।নিজেকে বারংবার সাহস দিয়ে যায় কল্পনা।কিন্তু তার পরেও কেন জানি মনের এক কোণে একটু ভয় জমা হয়ে থাকে।ছেলেটা যদি কোনো ক্ষতি করে ফেলে?সাহিত্য ভাইকে তো কল্পনা বলে দিয়েছে যে সে নিজেই সবকিছু অনেকটা সামলে নিয়েছে।কিন্তু আদৌ কি সে সামলাতে পারছে?
এসব কথা চিন্তা করতেই যেন ভারী এক শ্বাস বেড়িয়ে এলো কল্পনার ভেতর থেকে।কোথাও যেন একটু শান্তি নেই।সবদিকেই যেন চোখ-কান খোলা রাখতে হয়।এমন কোনো জায়গাই নেই যেখানে কল্পনা একটু সচেতনতা ছেড়ে দিয়ে শান্তির শ্বাসটা নিতে পারবে।
আনমনে কত কি-ই না চিন্তা করছিল কল্পনা।এর মাঝেই কল্পনার এক ক্লাসমেট ডেকে উঠে,
"কল্পনা!হলো তোর?অন্য সোরুমে ঢুকতে চাচ্ছি"
তাদের দিকে এগিয়ে গেল কল্পনা,
"হ্যাঁ হয়েছে,চল"
সবাই জোর পায়ে হাটলেও কল্পনা যেন একটু পেছনেই পড়ে আছে।মনটা তেমন ভালো নেই কল্পনার।ইদানীং কিসব যেন চিন্তা করতে নিয়ে হঠাৎই এমন প্রায়শই মনটা খারাপ করে ফেলে মেয়েটা।প্রীতিও তার সাথে নেই।নাহলে তো প্রীতিই কল্পনার মুখে অন্তত একটু হাসি ফুটাতে পারতো।প্রায় পনেরো দিনের মতো হচ্ছে প্রীতির সাথে কল্পনার দেখা-সাক্ষাৎ নেই।প্রীতি তার বাবা-মার সাথে নানুবাড়ি গিয়েছে।সে জানিয়েছে তার আসতে আরো বেশ কিছুদিন দেরি হতে পারে।অবশ্য ফোনে যোগাযোগ হয়।কিন্তু সেই কঠোর মেয়েটা থাকলে হয়তো নওশাদের ব্যাপারে কল্পনার একটু সুবিধা হতো।কল্পনা নওশাদের সাথে উঁচু গলায় কথা বলতে সংকোচ বোধ করলেও প্রীতি অন্তত চুপ করে বসে থাকতো না।কিন্তু এদিকে যে কল্পনা প্রীতিকে নওশাদের ব্যাপারে কিছু জানায়ইনি।এমনকি সেদিন যে বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে সবার সামনে নওশাদ কল্পনাকে তার গার্লফ্রেন্ড হতে বলছিল সে কথাটাও প্রীতিকে জানায়নি।কল্পনা এসব অযৌক্তিক কথা প্রীতিকে জানিয়ে তার ছুটির সময়টা অযথা নষ্ট করতে চায়না।
কল্পনা যেন তার আশেপাশের সবার খেয়ালই রাখে।রাখে না শুধু নিজের খেয়ালটা।সেটাতে যে বড্ড অমনযোগী সে।
মাথা তুলতেই একটা সোরুমে চোখ আটকে গেল কল্পনার।কি সুন্দর করে সাজানো সোরুমটা!দেখেই যেকারো ভেতরে উঁকি-ঝুকি দিতে মন চাইবে।কিন্তু কল্পনাকে সেই সোরুমের সবচেয়ে বেশি যেই জিনিসটা আকর্ষণ করল সেটা হলো,সেই সোরুমটা পুরোটাই আর্টের সামগ্রী দিয়ে ভরা।বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় ক্যানভাস,রঙ তুলি,হরেক রকম রঙ,আরো কত কি!সোরুমটা মনে হয় নতুন খুলেছে।কারণ আগে তো কখনো কল্পনার চোখে পড়েনি।
কল্পনা তার ক্লাসমেটদের গলা উঁচিয়ে বলল,
"তোরা এগিয়ে যা।আমি একটু এখানে ঢুকবো।তোদের কাজ হলে কল দিস আমাকে"
কথাটা বলেই কল্পনা সোরুমটাতে ঢুকে পড়ল।ঘুরে-ঘুরে দেখতে লাগলো বিভিন্ন রং-বেরঙের জিনিসগুলো।হাতে তুলে দেখতে লাগলো বড় থেকে ছোট পেইন্ট ব্রাশগুলো।সাহিত্য ভাইকে এই সোরুমের ব্যাপারে জানাতে হবে।তার প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই আছে এখানে।সে কথা ভাবতে নিয়েই ফিক করে হেসে উঠল কল্পনা।তার সাহিত্য ভাই যে পাগল তার ওই সব জিনিসপত্র নিয়ে,দেখা যাবে এই সোরুমের ব্যাপারে আগে থেকেই জানা আছে তার।এতোদিনে কেনাকাটাও করে নিয়ে গিয়েছে হয়তো।সবকিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে এবার একটু আসল কাজে মনযোগ দিল কল্পনা।সাহিত্য ভাইয়ের জন্য কোনো গিফট নিতে হলে এখান থেকেই নিতে হবে তাকে।তাই তো খুটে-খুটে সব দেখতে লাগলো।
কিন্তু ক্ষণিক সময় পর যেন হাপিয়ে উঠল মেয়েটা।যেটাই পছন্দ হচ্ছে সেটাই তো সে সাহিত্যের রুমে দেখেছে।ব্রান্ডেড যে কোনো পেইন্ট নিবে সেটাও পারছে না।কল্পনার যে এই সব সামগ্রীর ব্যাপারে কোনো ধারনাই নেই।বাধ্য হয়েই কল্পনা এবার সোরুমে উপস্থিত সেলসম্যানদের মধ্যে এক মেয়েকে ডাক দিল।একজন আর্টিস্টের পছন্দ হবে এমন কিছু কি নিতে পারে সেটা জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটা হাসি মুখে জিজ্ঞেস করল,
"আপু আপনি কি আপনার বয়ফ্রেন্ডের জন্য গিফট খুঁজছেন?"
কল্পনার সেই ব্যক্তির জন্য উপহার কেনার আগ্রহটা যেন ভালো করে চোখে পড়েছে মেয়েটার।কারণ কল্পনার কথা শুনেই বুঝা যাচ্ছিল যে সেই গিফটটা কতটা পারফেক্ট হতে হবে।সেই ব্যক্তি যেন কল্পনার হাতে সেই উপহার পেয়ে নিরাস না হয়।তাই তো সেলসম্যান মেয়েটা নিশ্চিত হতেই সেই প্রশ্ন করেছে।তাহলে হয়তো কল্পনাকে উপহার খুঁজে দিতে বেশ সুবিধাই হতো তার।
সেই প্রশ্নে বেশ ভড়কালো কল্পনা।মাথা নিচু করে দুই হাতের তর্যনীর মাথা একে-অপরের সাথে টোকাতে নিয়েই মিনমিনিয়ে শুধালো,
"আসলে......তেমন কিছু না.....আমার সিনিয়র এক ভাইয়ার জন্য আরকি"
নিঃশব্দে মুচকি হেসে শুধালো সেই মেয়েটি,
"আপনি চাইলে তাকে একটা ছোট দেখে আর্ট বুক গিফট করতে পারেন,যেটা তিনি তার সাথেই রাখতে পারে প্রায় সময়।আমার জানা মতে আর্টিস্টরা চোখের সামনে যেটাই দেখে সেটাকেই নিজের আর্টে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে।সেই আর্ট বুকে প্রায় সময় আর্ট করতে নিয়ে হতে পারে সেই ভাইয়া আপনাকেও স্মরণ করে থাকবে"
কথা শেষেই মেয়েটা কল্পনাকে একটা সেকশন দেখিয়ে দিল।সেটার প্রতিটা সেল্ফ বিভিন্ন ধরনের নোট বুকে ভরা।কল্পনা মেয়েটাকে থ্যাংক ইউ বলতেই মেয়েটা অন্যদিকে চলে গেল।কল্পনা নজর বুলাতে লাগলো হরেক রকমের আর্ট বুকগুলোতে।মেয়েটা অবশ্য খারাপ বুদ্ধি দেয়নি।কল্পনা সাহিত্যকে সব সময় ক্যানভাসেই আর্ট করতে দেখেছে।কখনো কোনো আর্ট করার খাতা কল্পনার চোখে পড়েনি।
বিভিন্ন রঙের উপর বিভিন্ন ডিজাইন করা অনেকগুলোই আর্ট বুক আছে।কিন্তু কল্পনা খুবই সাধারণ একটা কালো মলাটের আর্ট বুক হাতে তুলে নিল।সাহিত্য বরাবরই সাদামাটা জিনিস পছন্দ করে।তেমন হাবিজাবি পছন্দ নয় ছেলেটার।একমাত্র মনে হয় এই দিক দিয়েই সাহিত্য আর কল্পনার কিছু মিল রয়েছে।দুজনই কোনো কিছু কিনলেই সাদামাটা কিনে থাকে।দুজনের রুমের সাজসজ্জা দেখলেই বুঝা যায় সেটা।খাতাটা উল্টে-পাল্টে দেখে তার সাথে একটা ম্যাচিং মেকানিকাল পেন নিয়ে কাউন্টারের দিকে এগুলো কল্পনা।
কল্পনা বিল পে করার সময় ব্যাগ ঘেটে পার্সই বের করছিল।কিন্তু হঠাৎই এক ছেলের গলা শুনা গেল,
"এই বিলটা আমি পে করব"
কন্ঠটা চিনতে পেরে তড়িৎ গতিতে মাথা তুলল কল্পনা।মাথা উঠাতে নিয়েই অক্ষি জোড়া যেটুকু বড় হয়ে এসেছিল,সামনের ব্যক্তিকে দেখার পর সেগুলো আরো বড় আকার ধারণ করল।রাতুল তার কার্ডটা কাউন্টারের লোকটির দিকে এগিয়ে দিয়েছে।সেদিকে চোখ পড়তেই কল্পনা শান্ত স্বরেই বলে উঠল,
"সরি।ওটা আমার জিনিস,আমি পে করছি"
কাউন্টারের লোকটা রাতুলের কার্ড নিতে গিয়ে থেমে গেলে রাতুল কল্পনার দিকে দেখলো,
"কেন কি হয়েছে সোনা?আমি পে করা আর তুমি পে করার মধ্যে তফাৎ কোথায়?"
কল্পনা কাউন্টারে টাকা এগিয়ে দিতে নিয়েই রাতুলের দিকে না দেখেই বলল,
"অপরিচিত কোনো মেয়েকে এমন ডাকে সম্মোধন করবেন না প্লিজ"
ভড়কালো রাতুল,
"অপরিচিত?মানুষের সামনে এমন উইয়ার্ড বিহেভ কেন করছো?"
কাউন্টারের লোকটা বেশ আগ্রহ নিয়ে কল্পনা আর রাতুলের কথা শুনছিল।তাই তো কল্পনা আর কোনো কথা না বলে হাতের শপিং ব্যাগটা নিজের টোট ব্যাগে ঢুকাতে নিয়েই জোর পায়ে হাঁটা দিল।
রাতুল কল্পনার এমন হঠাৎ চলে যাওয়ায় প্রস্তুত ছিল না।তাই তো কল্পনার সাথে এখন আর তাল মিলিয়ে হাটতে পাড়ছে না সে।তবুও পেছন থেকে যেন কল্পনার নাম ধরে ডেকে যাচ্ছে।কল্পনা এদিকে জোর পায়ে হেটেও যেন বারবার পা অচল হয়ে আসছে তার।শপিংমলের এপাশটায় তেমন কোনো মানুষ নেই।তারউপর প্রায় মানুষই জোহরের নামাজ পড়তে বেড়িয়েছে।আশপাশ ফাঁকা দেখে যেন আরো বেশি ঘাবড়ে গেল মেয়েটা।এদিক-ওদিক ফেলা নজর যেন বরাবরই কাপতে শুরু করেছে তার।হঠাৎই যেন পেছন থেকে রাতুলের হাসির হালকা শব্দ কানে এলো কল্পনার।হাসির সাথে ধীমি গলায় কিছু বলেও উঠল,
"আজ একা পেয়েছি।ছাড়ার তো কোনো ইচ্ছাই নেই আমার"
পেছনে ঘুরলো না কল্পনা।এস্ক্যালিভেটরে উঠতে যাবে এমন সময় রাতুল পেছন থেকে তার এক হাত ধরে হেচকা টান দিল।কল্পনা টাল সামলাতে পাড়ল না।হুড়মুড়িয়ে পড়ে যেতে লাগলো।কিন্তু রাতুলের শক্ত হাতের বাধনে আর পড়ল না।কল্পনার ঝুঁকে থাকা মাথার কাছে মুখ নিয়ে হিসহিসিয়ে উঠল রাতুল,
"অনেক পালিয়েছিস।এবার দেখি কে বাচাঁয় তোকে?পায়ের নিচে দাবিয়ে রাখবো একদম"
চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করে জোর দিয়েই এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল কল্পনা।পরপরই প্রায় দৌড়েই সামনে আগাতে লাগলো।অমনি লিফটের দরজা খুলতেই এক শক্তপোক্ত বুকে ধাক্কা খেল সে।আতকে উঠে সামনে দেখতেই থমকে গেল।
কল্পনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাহিত্যের পাশ থেকে দ্রুত গতিতে রবি বের হয়েই রাতুলের দিকে আগাতে লাগলো।কিন্তু সাহিত্য ব্যতিব্যস্ত হয়েই কল্পনার গালে-বাহুতে হাত দিতে নিয়েই শুধালো,
"কি হয়েছে কল্পনা?তুই এমন দৌড়াচ্ছিস কেন?কে পেছনে পড়েছে তোর?"
সাহিত্যের ছোঁয়ায় হালকা হেলে-দুলে উঠলেও কল্পনা যেন এখনো মুর্তির ন্যায় নিশ্চুপ হয়েই আছে।সাহিত্য যদি এখনে না আসতো তাহলে তার সাথে আজ কি হয়ে যেত সেটা ভেবেই যেন মেয়েটার এমন অবস্থা।
কল্পনার কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে রাগটা চড়াও হলো সাহিত্যের।রাতুল যেখানে ছিল সেদিকে নজর দিল সে।রবি যখন রাতুলের দিকে এগিয়েছিল তখনই রাতুল পরিস্থিতি বুঝতে পেরে এস্ক্যালিভেটরে উঠে জোর পায়ে নেমে যায়।কিন্তু রবি তার পরেও তার পেছনে দৌড় লাগায়।সেদিকে শক্ত নজর রেখে সামনে আগাতে গেলে কল্পনা সাহিত্যের বুকের নেভি ব্লু শার্টটা শক্ত হাতে খামচে ধরল।সেটাতে ভড়কে উঠে কল্পনার দিকে নজর দিল সাহিত্য।কল্পনা মাথা নিচু করে আছে।মৃদু আওয়াজ শোনা গেল কল্পনার থেকে,
"আমার সাথে থাকেন.......প্লিজ"
কল্পনার কন্ঠের সাথে সাহিত্যের শার্ট ধরে রাখা হাত দুটোও প্রচন্ড রকমের কাপছে।সেটা বুঝতে পেরেই কল্পনাকে নিজের বুকে শক্ত করে আকড়ে ধরল সাহিত্য।সাহিত্যের গলাটাও যেন শুকিয়ে এসেছে।কল্পনাকে দুই হাত দিয়ে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাপা কন্ঠেই বলে উঠল,
"আছি আমি......তোর কাছে আছি আমি.....কখনো ছেড়ে যাবো না তোকে"
সাহিত্যের শক্ত বাধোনে যেন একটু নিয়ন্ত্রণে এলো কল্পনার হাতুড়ি পেটা হৃদপিণ্ডটা।হাতের মুঠে থাকা শার্টের বাধোনটা আরো শক্ত করে সেথায় মুখ গুজে দিয়ে মৃদু কান্নার তোপে কেপে-কেপে উঠতে লাগলো সে।
অফিসের লাঞ্চ ব্রেকে রবির সাথে একটু কাজেই শপিংমলে এসেছিল সাহিত্য।নিচে এতো মানুষের ভিড়ের মাঝে চোখ জোড়া পাঁচতলায় যেতেই তার বুকটা ধক করে উঠে।কল্পনা জোর পায়ে হেটে যেতে নিয়ে বারবার পেছনে দেখছিল।কল্পনার চোখের লক্ষ অনুসরণ করে সেদিকে নজর দিতেই পা জোড়া আর থামিয়ে রাখতে পারেনি সাহিত্য।এক প্রকার দৌড়েই ভিড় ঠেলে লিফটে উঠে।
প্রেয়সীর মাথায় এক গাঢ় চুম্বন দিল সাহিত্য।অতঃপর চোখ জোড়া বন্ধ করে এক স্বস্তির শ্বাস ফেলল।কল্পনাকে একদমই তাড়া দিল না।শান্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দিল।কল্পনা যখন নিজ থেকেই সাহিত্যের বুকের উপর থেকে নিজের মাথা উঠালো তখন প্রেয়সীর আদলখানা দুই হাত দিয়ে আলতো করে ধরে মাথা ঝুকিয়ে শুধালো সে,
"কি হয়েছে জানপাখি?কে ছিল ওটা?তোর পেছনে কেন পড়েছিল?"
এখনো হালকা হেচকি তুলছে কল্পনা।সেই অবস্থায়ই বলে উঠল,
"ওটা রাতুল ছিল।একটা সোরুম থেকেই আমার পেছনে পড়েছে।প্রথমে ভয়ে ছিলাম না আমি।কিন্তু যখন কেমন উল্টা-পাল্টা কথা বলা শুরু করেছে তখন থেকেই একটু ভয় করছিল"
মাথা ঝাকিয়ে শুধালো সাহিত্য,
"কি বলেছে জান?বলতো আমাকে"
"আজ একা পেয়েছে তাই ছাড়বে না....আমি পালাচ্ছি কেন....কে বাচাঁবে আজকে দেখে নিবে....পায়ের নিচে দাবিয়ে রাখবে আমাকে"
কল্পনা ভাঙা গলায় তার কথাগুলো খুবই এলোমেলোভাবে বলল।কিন্তু সাহিত্য সবটা ভালো করেই বুঝেছে।চোয়ালটা আবার শক্ত হয়ে এলো তার।সাহিত্যের কয়েকদিন থেকে অনেক বড় এক কোম্পানির সাথে ডিল চলছে।সেটার জন্য বেশ ব্যস্ত ছিল সে।এখনো আছে।খুবই বড় আকারের ডিলই বলা চলে।একটু হিমসিমই খেতে হচ্ছে তাকে।তারপরেও যেন চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে।কিন্তু যার জন্য সেই ডিলের ব্যবস্থা করছে সে যেন আবার আজ ভুল করে বসলো।সাহিত্য মনে হয় একটু বেশিই সময় নিচ্ছিল।কিন্তু আর না।সময় প্রায় এসেই গিয়েছে।আর কয়টা দিন মাত্র।
এদিকে রবি হাপাতে নিয়েই এস্ক্যালিভেটর দিয়ে উঠে সাহিত্যদের দিকে এগিয়ে এলো।সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বলে উঠল সে,
"একদম ধরেই ফেলেছিলাম।ভিড় বেশি হওয়ায় পালিয়েছে রাস্কেলটা"
রবির উপস্থিতি বুঝতে পেরে কল্পনা সাহিত্যকে ছেড়ে দিয়ে দাড়ালো। মাথাটা এখনো নিচু করা।সাহিত্য রবির দিক থেকে ঘুরে কল্পনাকে দেখল,
"তুই এখানে একাই কি করছিলি?"
মিনমিনিয়ে শুধালো কল্পনা,
"ফ্রেন্ডসদের সাথে এসেছিলাম।আমি এদিকে একটা সোরুমে ঢুকায় তাদের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছি"
"তোর ওই ফ্রেন্ডটা কই ছিল?"
কল্পনা বুঝল,যে সাহিত্য প্রীতির কথা বলছে।আবার মিনমিনিয়ে বলল কল্পনা,
"প্রীতি ওর নানুবাড়ি গিয়েছে।আজ আমার সাথে আসেনি"
চোখ বন্ধ করে হালকা শ্বাস ফেলল সাহিত্য।রাগটা আর ধরে রাখতে পাড়ল না।গর্জে উঠল সে,
"এমন একাই ঘুরার দরকার কি ছিল?ফ্রেন্ডসদের সাথে এসেছিস তো তাদের সাথে থাকা যেত না?আমি যদি আজ এখানে না থকতাম!কি হতো তখন,মাথায় আছে সেটা তোর স্টুপিড!সেই ছেলে তো আজ কিছু করার পুরো মতিগতি নিয়ে এসেছিল!আর একটু দেরি হলে কি হতো তোর,ধারনায় আছে সেটা?আমার কি হতো সেটা ধারনায় আছে?"
সাহিত্যের হঠাৎ এমন গলা শুনে ভড়কে উঠল রবি।শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলো তাকে।কিন্তু সাহিত্য যেন রাগে ফুসেই যাচ্ছে।রাগটা যেন কোনো এক কারণে নিজের উপরেই উঠছে সাহিত্যের।কিন্তু সেটার ফল যেন কল্পনাকে ভোগ করতে হচ্ছে।এবার আর ধরে রাখতে পাড়ল না কল্পনা।ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো।কল্পনার কান্নায় রবি তো ভড়কালোই সাথে সাহিত্যও ভড়কে উঠে একদম চুপ মেরে গেল।সাহিত্যের দিকে ঘুরে দাঁত চিবিয়ে অস্ফুটস্বরে আওড়ালো রবি,
"বললাম চুপ কর।বাচ্চাটাকে কাদিঁয়েই ছাড়লি।এমন সময় কেউ এসব কথা বলে?"
কল্পনার কান্নায় যেন এক মুহুর্ত স্তব্ধ রইল সাহিত্য।কিন্তু পর মুহুর্তেই একদম ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল।হাত দুটো প্যান্টের সাইডে ঘষে কল্পনার দিকে হাত বাড়ালো।অমনি কল্পনা ঘুরে অন্য দিকে ঘুরল।তাতে আরো ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল সাহিত্য,
"এই জানপাখি শুন না।সরি জান,আমি তোকে অমন কিছু বলতে চাইনি।আমার রাগ উঠলে আমি কেমন হয়ে যাই তুই তো জানিসই।প্লিইইইজ,পাখি আমার কাদিঁস না,প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ"
সাহিত্য আবার কল্পনার সামনে আসতেই আবার কল্পনা ঘুরে দাড়ালো।কাদঁতে নিয়েই বলল মেয়েটা,
"আমি কি জানতাম ওই বেয়াদবটা আমার পিছু করে এখানেও চলে আসবে?আমি কি এখন শান্তি মতো শপিংমলেও ঘুরতে পারবো না?আমি কি ছোট বাচ্চা?আগেও তো একাই এসেছিলাম,তখন তো কিছু হয়নি।সবকিছু শুধু আমার সাথেই কেন হয়?সব সময় এতো সচেতনে কেন থাকতে হবে আমাকে?কার কি খারাপ করেছি আমি?"
এবার সাহিত্য এক কান্ড করে বসলো।যেটাতে কল্পনা আর রবি দুজনই চমকে উঠল।কল্পনার সামনে ঝুঁকে বসে পায়ের উপর ভর দিয়ে নিজের দুই কান চিমটে ধরল সাহিত্য।অতঃপর আবার ব্যতিব্যস্ত হয়ে কাদোঁ গলায় বলতে লাগলো,
"সরি পাখি,কাদিঁস না আর।আর বোকবো না তো।এই যে দেখ,কান ধরেছি।প্লিজ একটু থাম"
সাহিত্যের কান্ড দেখে কপালে হাত চাপড়ে বসল রবি।নামি-দামি এক কোম্পানির মাল্টি-বিলিনিয়ার সি.ই.ও. হয়ে নাকি তার থেকে নয় বছরের ছোট একটা মেয়ের সামনে বসে এমন কান ধরছে।এমন পাগলামো করা যে একমাত্র এই ছেলেটার দ্বারাই সম্ভব!
কল্পনা কান্না থামিয়ে হতবম্ব হয়ে সাহিত্যকে দেখতে লাগলো।কল্পনা যেন ভাবতেই পারেনি সাহিত্য এমন একটা কাজ করে বসবে।ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে উঠল সে,
"আরে আরে, কি করছেন?কান ধরছেন কেন?উঠুন তাড়াতাড়ি,পাবলিক প্লেস এটা"
উঠলো না সাহিত্য,
"আগে বল,তুই আমার কথায় মন খারাপ করেছিস?"
তাড়াহুড়ো করে বলে উঠল কল্পনা,
"না না না!করিনি মন খারাপ।আপনি আগে উঠুন তো!"
উঠে দাড়ালো সাহিত্য।কোমল স্বরে বলল,
"সরি জানপাখি।ওই বেয়াদবের উপর উঠা রাগটা তোর উপর ঝাড়ছিলাম"
সাহিত্যের কোমল চোখ জোড়ায় যেন কল্পনা আবার কাবু হয়ে গেল।মাথাটা আবার নিচু করে ফেলল মেয়েটা।
আর সময় নষ্ট করল না সাহিত্য।রবির দিকে দেখে বলে উঠল,
"তুই অফিসে যা।আমি কল্পনাকে বাসায় রেখে আসছি"
কল্পনা মিনমিনিয়ে শুধালো,
"লাগবে না।আমি আমার ফ্রেন্ডসদের সাথে চলে যাবো"
কল্পনার সে কথায় অন্ধকার হয়ে এলো সাহিত্যের চোখ জোড়া,
"তোর বা'লের ফ্রেন্ড ওগুলো।তোর ওই ঝগড়ি ফ্রেন্ডটা ছাড়া যেন আর কারো সাথে তোকে বাইরে না দেখি।এখন চুপচাপ আমার সাথে চল"
সাহিত্য কথা শেষ করেই কল্পনার হাত ধরে হেচকা টান দিল।আর রবি যেন সাহিত্যের কথায় আরেক দফা হেসে উঠল।কল্পনা টাল সামলে ভেজা চোখে সাহিত্যের ধরে রাখা হাতটার দিকে দেখল।যেটা ধীরে-ধীরে কল্পনার হাতের কব্জি থেকে সামনে এগিয়ে হাতের তালুটা আকঁড়ে ধরছে।বাধা দিল না কল্পনা।শুধু অনুভব করে গেল সাহিত্যের হাতের উষ্ণ ছোয়া।
সাহিত্য কল্পনাকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে রবির দিকে এগিয়ে এলো,
"কোম্পানির কাজটা কত দূর?"
রবি ভালো করেই বুঝলো সাহিত্য কোন কোম্পানির কথা বলছে।তাই তো মৃদু হেসে উত্তর দিল,
"আগামী মাসের মধ্যেই সব ফাইনাল হয়ে যাবে"
"গুড"
হাতের ফোনের দিকে নজর রেখেই ছোট করে বলে উঠল সাহিত্য।
"সাহিত্য?"
"হুম"
"তুই কি আজকে গোসল করবি না?"
হঠাৎ রবির এহেন কথায় ভ্রু জোড়া ভালোভাবেই কুচকে সাহিত্য মাথা তুলে রবির দিকে দেখলো।রবিও ভ্রু জোড়া কুচকে আছে।সাহিত্য রবির প্রশ্ন না বুঝতে পেরেই বলল,
"এই কথা কই থেকে উঠলো?"
"সেদিন কল্পনা তোর হাত ধরেছিল দেখে তুই হাত ধুসনি।আজ তো কল্পনা তোকে পুরোটাই জড়িয়ে ধরেছিল.....তো....তুই কি.... আজকে....গো.."
"ও জাস্ট শাট আপ রবি!"
রবি তার কথাটা আর শেষ করতে পারল না।তার আগেই সাহিত্য তেতে উঠল।
মুখে মৃদু হাসি ফুটালো রবি।অতঃপর ঘাড় চুলকাতে নিয়ে আকাশ পানে চোখ রাখল,
"না মানে...আমি শুধু একটু সিওর হয়ে নিচ্ছিলাম আরকি"
সাহিত্য আবার তেতে উঠল,
"ভেবেছিলাম তোকে উবার বুক করে দেব।এখন নিজেই উবার বুক করে অফিসে যা!"
এবার সাহিত্যের দিকে দেখে রবি তার জমিয়ে রাখা হাসিটা বের করল।কিছু গা'লি রবির উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে বলতে নিয়েই গাড়িতে উঠল সাহিত্য।
#চলবে