ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৪৭তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৪৭

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

এই ভারী শীতে শরীরের সাথে যেন অন্তর মস্তিষ্কও জমে গিয়েছে।কিন্তু এ কাজ এখন হলে তো চলবে না।কদিন পরেই যে মাস্টার্সের পরীক্ষা শুরু হবে।তবে মস্তিষ্ক জমার আরো একটা উপযুক্ত কারণ আছে।এই কঠিন শীতে যেমন পশু-পাখিরা নীড়ে ঢুকে গা ঢাকা দিয়ে আছে তেমনই অন্তও সেই শীতের প্রথম থেকে রুমের দরজা আটকিয়ে গা ঢাকা দিয়ে ছিল।বদ্ধ ঘরে যে মাথা ঝেড়ে পড়াশোনা করছিল ছেলেটা।মাথা যখন একদম পুরোপুরি অকেজো হওয়ার দিকে তখনই তো কালকুঠুরি থেকে বেড়িয়ে আসে।

ফাঁকা রাস্তা হওয়ার দরুন পড়নের কালো ট্রাউজারটা দিয়ে শিরশিরিয়ে হাওয়া ঢুকে ঠেকছে অন্তর পায়ে।সেই ঠান্ডা কমানোর জন্যই মনে হয় এবার কালো হুডির টুপিটা মাথায় চড়ানোর সাথে দু হাত হুডির পকেটে গুজে দিল।পায়ের গতি বাড়িয়ে হালকা জগিং করতে লাগলো সে।

অনেকটা পথ পার করে পড়নের কালো সু জুতা তখনই থমকে গেল যখন অদূরে এক পরিচিত মুখের দেখা মিলল।প্রথমে হয়তো চিনতে না পেরে ভ্রু কুচকিয়েছিল অন্ত।কিন্তু নিশ্চিত হতেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটল যেন।

বেলা ১১টা হওয়ায় শীতটা আর ক্ষণিক আগের মতো ভারী নেই।হালকা করে রোদের ঝলক দেখা যাচ্ছে।আর সেই রোদের ঝলকের একাংশ গিয়ে পড়ছে অদূরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রীতির উপর।মেয়েটা দুই হাত পেছনে বেধে ঝুকে দাঁড়িয়ে সামনে থাকা এক বাচ্চা ছেলের সাথে মুখে হাসি নিয়েই কথা বলছে।প্রীতির কোনো এক কথায় বাচ্চা ছেলেটি না সূচকে মাথা নাড়ালো।অমনি প্রীতি এক পায়ের উপর ভর দিয়ে বসে পড়ল বাচ্চাটির সামনে।পড়নের খয়েরি রঙের শালের নিচে শুভ্রা রঙা চুড়িদারটা যে ওদিকে রাস্তার ধুলোয় মিশে একাকার হচ্ছে সেদিকে যেন কোনো খেয়ালই নেই প্রীতির।সামনের বাচ্চা ছেলেটিকে মনযোগ দিয়ে কি যেন বুঝাতে ব্যস্ত সে।

রাস্তায় নেতিয়ে পড়া সেই চুড়িদারটার দিকে প্রীতির নজর না থাকলেও অন্তর নজর যেন স্থির সেই জায়গাটায়।মুখে সুক্ষ্ম হাসি বজায় রেখে আবার প্রীতির দিকে দেখল অন্ত।মাথার হুডিটা নামাতে নিয়েই ঘন ওয়েভি চুলগুলো ব্যাক ব্রাশ করে নিল।অতঃপর প্রীতির দিকে অক্ষি জোড়া রেখেই হালকা শ্বাস ছাড়লো।

মেয়েটাকে অন্ত যতটা রগচটা ভেবেছিল ততটাও না।খানিকটা মধুরতাও আছে।সেদিন অন্তর সাথে কেমন ঝগড়া করছিল।আর আজ সামনের বাচ্চা ছেলেটার সাথে কি সুন্দর হেসে-হেসে কথা বলছে।বাচ্চা ছেলেটার কাছে থাকা এতো-এতো গোলাপ ফুলগুলো নাড়িয়ে দেখছে আর মুখেও কিছু বলছে সে।মাথা নিচু করে এবার মেকি হাসলো অন্ত।প্রীতিকে নিয়ে অযথাই এক খারাপ ধারণা নিজের মস্তিষ্কে জমিয়ে রেখেছিল।সে ধারণা মাথা থেকে ঝাড়তে নিয়েই আবার সামনে নজর দিল সে।কিন্তু যেই দৃশ্যের দেখা মিলল তাতে ঝাড়তে থাকা ধারণা ঠান্ডার চোটেই যেন আবার অন্তর মাথায় ঠুকলো।

যেই প্রীতি এতক্ষণ থেকে মিষ্টি মুখে কথা বলছিল সেই প্রীতি বর্তমানে কালির রূপ ধারণ করেছে।বাচ্চা ছেলেটির সাথে কেমন কটমটিয়ে কথা বলছে।সেদিক দিয়ে ছেলেটিও কম কিছু না।প্রীতির সাথে এবার যেন সে-ও তাল মিলাল।প্রীতি এবার এক আঙুল তাক করে কটমটিয়েই কিছু বলছে।যার আবছা আওয়াজ এবার অন্তর কাছে পৌঁছাতে বাধ্য।আশেপাশে নজর দিল অন্ত।এতক্ষণে তো বেশ কিছু লোক প্রীতির দিকে দেখতে শুরু করেছে।আবার প্রীতির দিকে নজর দিতেই অন্ত চমকে উঠল।কোনো ভাবনা ছাড়াই দৌড়ে এগোতে লাগালো ছেলেটা।

এদিকে প্রীতি এক হাত তুলে ছেলেটাকে দেখিয়ে আবার কটমটিয়ে উঠলো,

"চড় খাবা একটা!এমনিতে তো ফুলের দাম এতো বেশি বলছো।আবার রাতে কথা বলার জন্য আমার নাম্বার চাও?বয়স দেখেছো তোমার?"

প্রীতি অবশ্য হাতটা তুলেছিল ছেলেটাকে শুধু একটু ভয় দেখবার জন্য।কিন্তু সেটা তো আর অন্ত জানতো না।তাই অন্ত হুড়মুড়িয়ে এসে প্রীতির হাতটা টেনে ধরল,

"আরে কি করছো!এটা রাগ ঝাড়ার কোনো জায়গা?"

অপ্রত্যাশিত এক ছোয়ায় ভড়কে উঠল প্রীতি।পাশে নজর দিয়ে অন্তকে দেখে আরো ভড়কে উঠল সে।কল্পনার জন্মদিনে বিকেলে একদম তিন শেখ আহমেদের সাথে দেখা করেই বাসা ফিরেছে প্রীতি।অন্তর কথা অনেকটাই ভুলে গিয়েছিল।কিন্তু শেখ ভিলার লোহার গেইটের কাছে এসে অন্তকে দেখে আবার দুপুরের কথা স্মরণে আসে।কিন্তু অন্ত আবারো প্রীতির রাগ উপেক্ষা করে ঘাড় চুলকাতে নিয়েই এগিয়ে এসেছিল,

"এখনো রাগ হয়ে আছো?"

কটমটিয়ে উঠলো প্রীতি,

"আমি কি আপনার গার্লফ্রেন্ড,যে এতো লুতুপুতু করে কথা বলছেন?"

প্রীতির কথায় অন্ত থতমত খেল,

"লুতুপুতু করে কথা কেন বলব?দুপুরের রাগ ঠান্ডা হয়েছে কিনা সেটাই তো শুধু জিজ্ঞেস করছিলাম"

অন্তর আরো একটু কাছে এগিয়ে এসে ফুসতে লাগলো প্রীতি,

"যেমন করেই বলেন না কেন,আমার উত্তর 'না'-ই থাকবে"

কিছুটা ম্যাও ম্যাও হয়ে গেল অন্ত,

"তখন মনে হয় একটু রুডলিই সরিটা বলেছি,তার জন্য সরি।আমি তোমার রাগ উঠাতে চাইনি,সরি।কিন্তু নিজের ব্যাপারে অমন শুনে কার মাথা ঠিক থাকবে বলো?কিন্তু তোমার দিকটাও বুঝছি।তার জন্য সরি"

প্রীতি শুধু পারছে না নিজের মাথার চুল টেনে ছিড়তে।আগের কন্ঠেই বলল সে,

"সরি বলার জন্য কে সরি বলে?!"

মাথা নিচু করে আবার ঘাড় চুলকাতে লাগলো অন্ত,

"না ভাবলাম তোমার রাগ উঠতে পারে তাই সরি বললাম।কিন্তু এখন তো দেখছি এই সরির জন্য আবার রাগ উঠছে.....সেটার জন্য সরি"

প্রীতির এবার নিজের চুলের সাথে অন্তরও চুল ছিড়তে মন চাইছে।এই ছেলেটা এমন কেন!!এবার প্রীতি বাধ্য হয়েই নিজেকে শান্ত করল।হালকা শ্বাস ছেড়ে শুধালো সে,

"দেখেন ভাইয়া,আমাদের মনে হয় আর কথা বলা উচিৎ হবে না।আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছি না।কারণ আপনার সাথে কথা বললেই আমার রাগ উঠছে!!"

প্রীতি তার শেষের কথাটা ক্ষোভ নিয়েই বলল মনে হয়।কিন্তু এদিকে প্রীতির কথা যেন অন্তর পছন্দ হলো না।তাই এই চুপচাপ ছেলেটা আবার মুখ খুলল,

"আসলে....তুমি কল্পনার অনেক ভালো বন্ধু হও।তাই তোমার সাথে এমন রাগারাগির সম্পর্ক রাখতে চাচ্ছি না।জিনিসটা ভালো লাগছে না আমার কাছে"

এই কথপোকথনে মনে হয় অন্ত প্রথমবারের মতো প্রীতির দিকে সরাসরি দেখলো।মুখে একখানা মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে শান্ত স্বরেই বলল,

"আগে যা কিছু হয়েছে সব ভুলে গিয়ে নতুনভাবে শুরু করা যায় কি?তোমার মুখে এমন রাগ দেখতে আর ভালো লাগছে না"

প্রীতি তো সেই চিঠি দেওয়ার দিন থেকেই সামনের এই সুদর্শন যুবকের হাসিতে কাবু হয়ে যাচ্ছে।সাহিত্যের মতো তেমন ফিট এ্যান্ড ফাইন বডি সেইপ নেই অন্তর।ছেলেটা অনেকটাই শুকনো সাহিত্যের থেকে।কিন্তু উচ্চতাটা যেমন সাহিত্যের মতো তেমন চেহারার গঠনটারও কিছুটা মিল আছে।আর সেই চেহারায় যখন এক স্নিগ্ধ হাসি ফুটে তখন গলার অ্যাডামস অ্যাপেলটাও যেন আরো বেশি আকর্ষণীয় লাগে দেখতে।

প্রতিবারের ন্যায় আবারো অন্তর সেই স্নিগ্ধ হাসিতে চুপসে গেল প্রীতি।ক্ষণিক সময় অন্তর দিকে অপলক দেখে থেকে মাথাটা পাশ ফিরিয়ে নিল।প্রীতি মাথা ঘুরিয়ে নিল দেখে আবার কোমল কন্ঠে শুধালো অন্ত,

"আসলেই কি রাগটা কমা যায় না?"

প্রীতি এবার চোখ জোড়াও খিচে বন্ধ করল।অতঃপর গম্ভীর কন্ঠে বলতে নিয়েই হ্যান্ডশেক করার জন্য এক হাত অন্তর দিকে বাড়িয়ে দিল,

"ঠিকাছে।একটু কমালাম রাগটা....আমার নাম তাবাসসুম প্রীতি"

অন্ত কিছু বলছে না দেখে প্রীতি সামনে ঘুরল।ঘুরতেই দেখলো অন্ত প্রীতির হাতের দিকে নজর রেখেই দুই হাত প্যান্টের সাইডে ঘষে যাচ্ছে।অন্তকে যেন অনেকটাই হাসফাস লাগছে দেখতে।আর লাগবেই বা না কেন?ছেলেটা এমন হঠাৎ এক মেয়ের হাত ধরতে যেন বেশ সংকোচ বোধ করছে।কিন্তু হ্যান্ডশেক না করলে যদি প্রীতি আবার মন খারাপ করে বসে,সে চিন্তায়ও বেশ ভুগছে ছেলেটা।

প্রীতি যেন অন্তকে সময় দিল।এবার তো প্রীতির বেশ হাসি পাইছে।কোনো এক দিক দিয়ে প্রীতি আবিষ্কার করল যে,তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছেলেটা যখনই এমন লাজুক হয়ে উঠে বেশ কিউট লাগে দেখতে।বুঝে-শুনেই অন্তকে আরো বিভ্রান্তে ফেলার উদ্দেশ্যেই প্রীতি জোর গলায় বলে উঠল,

"কি হলো?এখন পরিচয়টাও হওয়া যাবে না?"

প্রীতির কথায় ভড়কে উঠে তার দিকে নজর দিল অন্ত।এবার আর সময় নিল না।জীবনে প্রথমবার নিজ ইচ্ছায় কোনো মেয়েকে ছুঁয়ে দিল ছেলেটা।প্রীতির সাথে হাত মিলিয়ে জোরে জোরে হ্যান্ডশেক করে বলে উঠল,

"হ্যাঁ-হ্যাঁ, যাবে না কেন?আমি মাহাদি শেখ অন্ত"

নিজের সুক্ষ্ম পরিচয় দিয়ে পর মুহুর্তেই হাতটা ছাড়িয়ে নিল।মাথা নিচু করে আবার ঘাড় চুলকাতে লাগলো।সাথে আমতা-আমতা করে উঠল সে,

"আ-আচ্ছা,ঠিক আছে তাহলে।ভ-ভালো থাকিও"

প্রীতির উত্তরের অপেক্ষা না করেই শেখ ভিলার উদ্দেশ্যে হাটা দেয় অন্ত।পায়ের গতি না বাড়িয়ে যে আর কোনো উপায় ছিল না।লজ্জা যে প্রচন্ডরকমভাবে ভার করেছে ছেলেটার উপর।প্রীতি সেদিকে নজর রেখেই মুচকি হাসলো।সাথে অনুভবে ভেসে আসছে ক্ষণিক আগের সেই হাতের ছোয়া।কি আলতো ছিল সেই ছোয়া।সাথে খুবই সুক্ষ্ম সময়ের জন্যও।

আবারো সেই হাতের ছোয়া পাওয়া প্রীতি কখনো আশা করেনি।কিন্তু সেই ক্ষণিক মুহুর্ত থেকেই তো অন্ত তার হাতখানা ধরে রয়েছে।প্রীতির কোনো কথা বলা না দেখে অন্ত ভ্রু কুচকে আবার বলে উঠল,

"এটা কোনো রাগ ঝাড়ার জায়গা হলো?সবাই কেমন করে দেখছে।কি করেছে ছেলেটা,যে এমন কটমট করছো?"

এবার যেন হুশ ফিরল প্রীতির।দাঁত কিড়মিড়িয়ে এক ঝটকায় অন্তর থেকে হাতটা ঝাড়িয়ে নিল,

"একদম মাঝখানে ঢুকবেন না।আমার ম্যাটার আমাকে সলভ করতে দিন"

অন্তকে কড়া কথা শুনিয়ে প্রীতি আবার ছেলেটির দিকে ঘুরল।এক আঙ্গুল তাক করে কটমটিয়ে উঠল,

"ওই!এতো কিছুর পরেও যে তোকে ছেড়ে দিচ্ছি তোর ভাগ্য।এখন বেশি কথা না বলে চারটা ফুল একশো টাকায় দে!"

ফড়ফড় করে বলে উঠল ছেলেটা,

"এক ফুলের দামে আফনারে চাইট্টা দিমু ক্যা?আর আফনার যে বয়ফেন্ড আছে সেটা কইলেই তো হয়।যান গে,না নিলাম আফনার ফোন নাম্বার"

এইটুকু ছেলের মুখে এমন কথা শুনে প্রীতি আর অন্ত দুজনই ভড়কালো।অন্ত আমতাআমতা করতে শুরু করলেও প্রীতি আবার চেচিয়ে উঠলো,

"এই ছেলে,মুখ সামলে!কে আমার বয়ফ্রেন্ড,হ্যাঁ?না জেনে কথা বলো কেন?এই ব্লাক ব্যাটম্যানকে আমার বয়ফ্রেন্ড কিভাবে মনে হয় তোমার?"

অন্ত প্রীতির কথা শুনে থমকালো বেশ।অতঃপর নিজেকে একবার পরখ করল।সবকিছু কালো পরায় তাকে আসলেই কি ব্যাটম্যানের মতো লাগছে?অন্ত নিজেকে পরখ করে ভারী এক শ্বাস ফেলল।অতঃপর আবার প্রীতির দিকে দেখলো।প্রীতি তো অন্তকে সেই ব্লাক ব্যাটম্যান উপাধি দিয়ে আবার ছেলেটার সাথে ঝগড়া করতে লেগে পড়েছে।সে চারটা ফুল একশো টাকায় নিবে মানে নিবেই।অন্ত আর দাঁড়িয়ে থাকলো না।পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতে নিয়েই বাচ্চা ছেলেটার দিকে এগিয়ে গেল,

"চারটা ফুল কত?"

প্রীতিকে সম্পুর্ণ উপেক্ষা করে ছেলেটা অন্তর দিকে মনযোগ দিল,

"চাইশশো"

অন্ত পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করতেই ছেলেটা তাকে একশো টাকা ধরিয়ে দিল।তাদের এমন টাকা অদল-বদল করা দেখে প্রীতির মুখ যেন এক হাত খুলে গেল।অন্তর উদ্দেশ্যে চেচিয়ে উঠল সে,

"আরে!পাগল নাকি আপনি?বিশ টাকার ফুল একশো টাকা দিয়ে কেন নিচ্ছেন!!"

প্রীতির গলা সম্পুর্ণ উপেক্ষা করে বাচ্চা ছেলেটা চারটা বড়-বড় গোলাপ ফুল বের করে অন্তর দিকে এগিয়ে ধরল,

"আফনার গালফেন্ডকে আফনিই ফুল দেন।ওনার সাথে আমি আর ঝগড়া কত্তে পারমু না"

ছেলেটা অন্তর অনেকটা কাছে ফুলগুলো ধরায় সেগুলো হাতে না নিয়ে পারল না সে।ছেলেটা প্রীতির দিকে দেখে মুচকি হেসে রাস্তা মেপে হাটা দিল।আর এদিকে অন্ত হাতের তাজা ফুলগুলোর দিকে দেখে ঘাড় চুলকাতে লাগলো।এই ফুল এখন সে প্রীতিকে দিবে কেমন করে?সে কথা ভাবতে নিয়েই নজর এদিক-ওদিক ঘুরাতে নিয়েই প্রীতির দিকে দেখল সে।সাথে-সাথে অন্ত ভড়কে উঠে হালকা পিছিয়ে গেল।প্রীতির জ্বালামুখীর ন্যায় চোখ জোড়া যে অন্তর দিকেই দেখে আছে।অন্তকে কিছু বলতে না দিয়েই তেতে উঠল প্রীতি,

"আপনাকে কে ফুল কিনতে বলেছে!!"

নজর এলোমেলো ফেলতে লাগলো অন্ত,

"ওই...তুমি শুধু চারটা ফুলের জন্য ঝগড়া করছিলে...তাই সেটাই থামানোর চেষ্টা করছিলাম"

"তাই বলে কেউ বেকুবের মতো চারশো টাকা পানিতে ফেলে দেয়?"

অন্ত মুখে হাসি ফুটালো,

"আরে কোনো সমস্যা নেই।এ্যাজ আ গিফট ধরে নাও"

অন্তর হাসিতে থমকে গেল প্রীতি।আবার এই ছেলেটা সিরিয়াস এমন এক পরিস্থিতিতে মুখে হাসি ফুটাচ্ছে?সেই হাসিতে মন গললেও রাগটা যেন তরতর করে বেড়ে উঠল প্রীতির।সেই হাসি উপেক্ষা করার চেষ্টা করে হনহনিয়ে সামনে হাটা দিল,

"লাগবে না কোনো গিফট আমার"

প্রীতির এমন হঠাৎ পাশ কেটে যাওয়ায় বেশ ভড়কালো অন্ত।ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠে হাটা দিল প্রীতির পেছনে,

"আরে এটাতে এমন রাগের কি আছে?তুমি ফুল কিনতে চাচ্ছিলে দেখেই তো কিনে দিলাম।তুমি ধরে নাও যে এই ফুল বিশ টাকা করেই কেনা হয়েছে।এই প্রীতি!দাঁড়াও না!এতো জোরে কেউ হাটে?"

অন্তর কথায় প্রীতি পায়ের গতি একদমই কমালো না।তাই তো অন্ত তার পায়ের গতি আর একটু বাড়িয়ে প্রীতির সামনে গিয়ে উল্টো হাটতে লাগলো,

"আমার হাত থেকে কোনো কিছু নেওয়া বারন আছে নাকি?"

হঠাৎ অন্তর এমন উল্টো দিকে হাটা দেখে পর মুহুর্তেই থমকালো প্রীতি,

"এভাবে হাটছেন কেন!!"

পা থামিয়ে শান্ত স্বরে শুধালো অন্ত,

"তুমি না থামলে আর কি করব আমি?"

নজর নিচু করে নিল প্রীতি।অতঃপর সে-ও শান্ত স্বরে শুধালো,

"লাগবে না আমার ফুল।ওগুলো অনুকে দিয়ে দিয়েন"

হাসলো অন্ত,

"তোমার ফুল আমি অনুকে কেন দিব?আর আমার এমন হঠাৎ ফুল নিয়ে যাওয়া দেখলে অনু নির্ঘাত হার্ট স্ট্রোক করবে"

প্রীতির এলোমেলো নজর দেখে যেন এবার অন্তর মাথায় বুঝ ঠেকলো।ক্ষণিক সময়ের জন্য চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করে খুলে নিজেকে মনের মধ্যে ভালো করে শাসাতে লাগলো সে।এমন হুট করে একটা মেয়ে কোনো ছেলের হাত থেকে কেনই বা ফুল নেবে?প্রীতির অস্বস্তি বুঝতে পেরেই হাতের ফুলগুলো পেছনে লুকালো অন্ত।অতঃপর মুখে হাসি নিয়েই বলল,

"আচ্ছা ওসব বাদ দাও আপাতত।তুমি বলো,এতো সকালে এই ঠান্ডায় এমন বাইরে কি করছো?"

শাল পরিহিত এক হাত উঠিয়ে খোলা চুলের কিছু অংশ কানের পেছনে গুজে দিতে নিয়েই বলল প্রীতি,

"চা-পাতা কিনতে বেড়িয়েছিলাম"

"এতো চা পছন্দ তোমার, যে এই ঠান্ডায় বেড়িয়েছো?"

প্রীতি অন্তর দিকে দেখে কপালে ভাজ ফেলল,

"আমার জন্য না।আমার আম্মুর জন্য।তার একদিন চা মিস গেলে সারাদিন আর মাথা কাজ করে না।তাই তো বাধ্য হয়েই বের হয়েছি"

"হলো কেনকাটা?নাকি বাকি আছে এখনো?"

অন্ত কথাটা বলতে নিয়েই ধীরে সামনে এগুলো।প্রীতিও আর দাঁড়িয়ে না থেকে সামনে পা বাড়াতে নিয়েই বলল,

"না,হয়ে গিয়েছে।বাসায়ই ফিরছিলাম.....আপনি এতো সকালে বেড়িয়েছেন?জগিং করতে?"

"আরে নাহ্।আমি জগিং করার মানুষ না।ওই মাথায় বোঝ একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল তো তাই একটু বেড়িয়েছিলাম"

প্রীতির কুচকানো ভ্রু জোড়া দেখে মেকি হেসে আবার বলল অন্ত,

"সামনে আমার মাস্টার্সের এক্সাম আছে।তাই একটু পড়াশোনার চাপ বেশি হয়ে গিয়েছে।সেটাই বলছিলাম"

সুক্ষ্ম স্বরে 'ও আচ্ছা' বলেই মাথা নিচু করল প্রীতি।এবার অন্তও চুপ মেরে গেল।ক্ষণিক সময় নিরবতা ছাড়া যেন কিছুই শুনা গেল না।রাস্তার ফুটপাতে হাটতে থাকা এই নর-নারীকে দেখে কোনো কপোত-কপোতীর থেকে কম মনে হচ্ছে না।আর সেটা আরো ফুটিয়ে তুলেছে অন্তর পেছনে বেধে রাখা হাতের রক্ত বর্ণের ন্যায় চারখনা গোলাপ ফুল।

এবার থেমে দাড়ালো অন্ত।ছেলেটা যে এতক্ষণ এক মেয়ের সাথে থাকতে একটু ইতোস্ত বোধ করছে।কিন্তু এই প্রথম হয়তো নিজের মনে সেই সংকোচ একটু হালকা মনে হচ্ছে তার।কিন্তু প্রীতির হয়তো অস্বস্তি বোধ হচ্ছে ভেবেই থমকে দাড়ালো।প্রীতিও থেমে গিয়ে অন্তর দিকে নজর দিল।অন্ত পর মুহুর্তেই শুধালো,

"আ...আমার একটু তাড়াতাড়ি বাসা ফিরতে হতো তো...আর এই ফুলগুলো নাও।আমার তরফ থেকে ছোট একটা গিফট ভেবে নিও।আমি অন্যকিছু মিন করে দিচ্ছি না,বিলিভ মি!সেই ছেলের সাথে ঝগড়া থামাতেই এগুলো কিনেছি....আর কিছুই না"

অন্তর শেষের দিকে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলা কথায় এবার ফিক করে হেসে উঠল প্রীতি।এই প্রথম মনে হয় প্রীতি অন্তর কোনো কথায় হাসছে।রাগী মুখটায় এবার এক হাসির রেখা দেখে আনমনেই বলে উঠল অন্ত,

"তোমার হাসিটা তো অনেক সুন্দর"

প্রীতি হাসি থামিয়ে দিল,

"কি?"

প্রীতির কথায় চমকালো অন্ত,

"মানে,তুমি হাসতেও জানো?"

প্রীতি ভ্রু কুচকালো,

"হা?"

অন্ত নিজের কথায় নিজেই ভড়কে উঠল,

"না মানে.... এই ফুলগুলো নাও তো!গেলাম আমি"

প্রীতির হাতে কোনোমতে ফুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে সামনে জগিং করতে নিয়েই এগিয়ে গেল অন্ত।ভ্রু উঁচিয়ে সেদিকে দেখে থাকলো প্রীতি।ক্ষণিক বাদেই হেসে উঠল।ছেলেটা আসলেই একদম চালাক না।মনের কথা যেন মুখ দিয়ে দ্বিধা ছাড়াই বলে দেয়।অন্তর দিক থেকে হাতের ফুলে নজর দিল প্রীতি।সেগুলোর ঘ্রাণ নিতে নিয়েই ঠোঁটে হালকা হাসি নিয়ে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,

"না কিউট আছে....শুধু একটু বেশি ভদ্র"

#চলবে

একদম চিল্লাবেন না।বড় পর্ব দিয়েছি কিন্তু😑লিখতে মনে হয় আমার হাত ব্যথা করে না??🤧

#সারপ্রাইজ_পর্ব

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

আকাশের দিকে নজর রাখা যেন এই শীতের দিনে ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই না।কারণ আকাশটা যে ঘন কুয়াশায় ভরা।আকাশ পানে তাকিয়ে থাকলে সেই কুয়শার ঠান্ডা পানি ছিটা ছাড়া আর কিছুই অর্জন হবে না।কিন্তু তারপরেও যেন নওশাদ আকাশ পানে তাকিয়ে আছে।মোটরসাইকেলটার উপর সটান হয়ে শুয়ে আছে সে।অবশ্য একখানা পা নিচে ঝুলিয়ে রেখেছে।আর একখানা হাত কপালের উপর।গভীরভাবেই হয়তো কিছু চিন্তা করছে সে।নয়তো আকাশ পানে মুখ করে রেখে ঠান্ডা পানির ছিটা খাওয়ার শখ কার-ই বা থাকে?

যেই ভার্সিটির প্রাঙ্গনে এমন করে মোটরসাইকেলের উপর শুয়ে আছে সেই ভার্সিটিতে মান-সম্মানটা অক্ষুণ্ণ রাখা যেন ইদানীং ভালো ঠেকছে না নওশাদের।কেউ কিছু না বললেও যেন নিজের কাছেই অনুতপ্ত হয় ছেলেটা,যে পিদ্দি একটা মেয়েকেই পটাতে পারছে না সে।অথচ এই নওশাদের জন্য কত-কত সুন্দরী মেয়ে বেডরুম অব্দি গিয়েছে।আর সে কাজ করায় নওশাদ যেন এই চারটা বছরে নিজেকে বেশ বড় মনে করতে শুরু করেছিল।নিজেকে যেন উপরের এক স্থান দিয়েছিল সে।মেয়েরা যেমন পেছনে ঘুরে তেমন ছেলেরাও তাকে ভয় করার সাথে সম্মানটাও দিয়ে থাকে।কিন্তু ভার্সিটি জীবনের এই শেষ মুহুর্তে এসে যেন এক মেয়ের জন্য সব হারাতে বসেছে।

নিজেকে এবার প্রশ্ন করল নওশাদ,

'কি আছে এই মেয়ের মাঝে?'

মন ও মস্তিষ্কের এক কোণা থেকে উত্তর এলো সেই প্রশ্নের,

'সব আছে এই মেয়ের মাঝে।যা তুই এখন অব্দি কোনো মেয়ের মধ্যে পাসনি'

নিজের শারীরিক সুক্ষ্ম চাহিদা মেটাতেই তো এই সুন্দরীর পেছনে পড়েছিল নওশাদ।কিন্তু ধীরে ধীরে যেন সেই সুক্ষ্ম চাহিদা ছাড়াও আরো কিছু পাওয়ার ইচ্ছা জাগছে নওশাদের মাঝে।সুক্ষ্ম আওয়াজেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাগরকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল সে,

"কল্পনা বউ বানানোর মতো মেয়ে,তাই না?"

সাগরের কর্ণ গোচর হলো নওশাদের সেই কথা।কিন্তু তারপরেও ফোন থেকে নজর না সড়িয়েই হেলাফেলায় বলে উঠল,

"সেটা তুই এখন বুঝছিস?"

মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করল নওশাদ,

"কিন্তু আমি যে বিয়ে করার মুডে নেই রে।আই জাস্ট ওয়ান্ট হার ভেরি ক্লোজ ফর ওয়ান নাইট।কিন্তু সেটা যেন এই মেয়েটা বুঝছেই না যে,আমার মাঝে-মাঝে এমন নেশা উঠে।সেটা থামাতে না পারলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায় আমার"

সাগরের নজর এখনো ফোনের দিকে,

"তোর ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড তো আর কল্পনা বুঝবে না।সে তো একদম বিয়ের পরেই বাসর করার প্লান করে রেখেছে।তার আগে কোনো ছেলেকে সে ছুঁয়েও দেখবে না"

সাগরের শেষের কথাটায় গা শিরশিরিয়ে উঠল নওশাদের।ভাবতেই তার মজা লাগে যে, কোনো ছেলের ধরা-ছোঁয়া ছাড়া এক রূপবতী তার হাতের নাগালেই উড়ে বেড়াচ্ছে।

সাগরের হাতের টোকায় এবং কথায় অদূরে নজর দিল নওশাদ।

"ওই দেখ।তোর মালটা আসছে"

নওশাদ পর মুহুর্তেই উঠে বসল।কল্পনার হাসি মাখা চেহারায় নজর দিতে নিয়েই হাঁটা দিল সেপাশে।কল্পনার একদম সামনে দাড়ানোয় থমকে গিয়ে বেশ ভড়কালো কল্পনা।নওশাদকে দেখতেই মুখে বিরক্তির সাথে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে মাথা ঘুরিয়ে নিল।

কল্পনার দিকে একটু ঝুঁকে এসে ঠোঁটে হাসি ফুটালো

নওশাদ,

"সবাই অনেক অবাক হচ্ছে আমার ব্যবহারে।কেন,জানো?কারণ আমি আজ পর্যন্ত কোনো কিছুতে চোখ দেওয়ার দুই থেকে তিন দিনের মাথায়ই পেয়ে গিয়েছি।অথচ এবারের বেলায় এতোদিন হওয়ার পরেও আমি সেই জিনিসটা পাচ্ছি না।এতদিনে আমার জেদ আর রাগের শিকার হওয়ার কথা ছিল তোমার।কিন্তু আমি তারপরেও তোমাকে সময় দিয়েছি....যথেষ্ট সময় দিয়েছি।আর কয়েকদিন পরেই আমার আর ভার্সিটিতে তেমন আসা হবে না।তাই একটু চাইছিলাম শেষ মুহূর্তটা তোমার সাথেই একটু কাটাই।কিন্তু তুমি তো অতি ভদ্রে সতী হয়ে আছো।শেষবারের মতো বলছি,রাজি হয়ে যাও।সিনিয়রের কাছে থাকায় অনেক সুবিধা পাবে ভার্সিটিতে"

প্রীতি পুরো সময়টা কল্পনার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।নওশাদের কথায় তো গা জ্বলে উঠছে তার।নিজেকে আর থামিয়ে রাখতে পারলো না সে।গর্জে উঠতে যাবে সেসময় কল্পনাই কটমটিয়ে উঠলো।শক্ত নজর নওশাদের দিকে রেখে ভারী গম্ভীর কন্ঠে শুধালো কল্পনা,

"এটা ভার্সিটি।আপনার নষ্টামো করার কোনো নাইট ক্লাব না যে যেটা পছন্দ হবে ডাকতেই কাছে চলে আসবে।নিজের দাপট খাটিয়ে যে সবাইকে হাতের মুঠোয় রাখেন,ভবিষ্যতে যেই মেয়েটা আপনার ঘরের বউ হবে তার ব্যাপারে একটু ভেবে দেখেছেন?তার জন্য তো আমার এখন থেকেই মায়া হচ্ছে।বেচারির ভাগ্যে যে এমন একটা লম্পট ছেলে জুটবে কখনো হয়তো চিন্তাও করেনি সে।আপনাকে একটা এডভাইস দেব শুনবেন?কোনো মেয়েকে বিয়ে করে তার জীবনটা নষ্ট করিয়েন না।আপনার এসব জিনিস বেচারি সহ্য করতে পারবে না।আর,কয়েকদিন পরে চলে যাচ্ছে ভালো কথা।সম্মান নিয়েই চলে যান।কারণ আমি এর থেকেও মুখের ভাষা খারাপ করে কথা বলতে জানি।শেষ কিছু দিনে আমার সেই ভাষা না শুনে ফুরফুরে মন-মেজাজ নিয়েই ভার্সিটি লাইফের ইতি টানেন"

কথা শেষ হতেই নওশাদের পাশ কেটে চলে গেল কল্পনা।সাথে প্রীতিও নওশাদের দিকে দেখে নিঃশব্দে কিছু গালি দিয়ে কল্পনার সাথে এগিয়ে চলল।

নওশাদ এখনো ঠায় কল্পনার আগের দাঁড়িয়ে থাকা জায়গাটায় নজর দিয়ে আছে।সাগর এসে হাত রাখলো নওশাদের কাধে।সাগর কিছু বলার আগেই নওশাদ গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,

"ওইটার ফ্যামিলির ডিটেইলস বের কর"

চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করল সাগর।এটার ভয়ই তো করছিল সে।হালকা করে বলে উঠল,

"বাদ দে তো ভাই।একটা মেয়েই তো"

সাগরের দিকে নজর ঘুরালো নওশাদ।সেই অক্ষি জোড়া দেখে যেন বেশ ভড়কালো সাগর।লাল হয়ে উঠেছে সেগুলো।সাগরের দিকে আড় চোখ রেখেই আবার দাঁত চিবিয়ে বলে উঠল নওশাদ,

"যেটা বলেছি সেটা কর"

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

কপালের দুই পাশ হালকা ডলতে নিয়েই রুমের দরজা খুলল সাহিত্য।মুখে এক বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।হয়তো অফিসের কোনো কাজের চাপেই চেহারার সেই বিবরণ করে রেখেছে।কিন্তু এবার সব চিন্তা উপেক্ষা করে মাথার চুল ব্যাক ব্রাশ করতে নিয়েই নিচে নামলো।ড্রইং রুমের হাওয়া অথবা কফির স্বাদের একটু আভাস পেলে হয়তো মাথাটা একটু রেহাই পেতে পারে।

সোফায় বসেই মাথাটা পেছনে এলিয়ে দিল সাহিত্য।অতঃপর পাশের সোফায় বসে থাকা অনুকে নিজের ভারী কন্ঠ দিয়েই জিজ্ঞেস করল,

"রান্নাঘরে কেউ আছে?"

টিভির দিকে নজর রেখেই মাথা ঝাকিয়ে শুধালো অনু,

"না।কিছুক্ষণ আগেই রাতের খাবার রান্না করে সবাই রুমে ঢুকলো"

ঘড়িতে এখন ছ টা বাজছে।সাধারণত এই সময়টায় গিন্নিরা রাতের খাবার তৈরি করে একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্যই ঘরে ঢুকেন।

সাহিত্য মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করল।পর মুহুর্তেই চোখ বন্ধ করে চুলগুলো ব্যাক ব্রাশ করে হাতখানা সেথায়ই ঠেকিয়ে রাখলো।আর সেই দৃশ্য যেন কল্পনারই চোখে পড়তে হবে।পাশে বসে থাকা অনু না বুঝলেও সুক্ষ্ম দূরে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কল্পনা ঠিকই বুঝলো যে সাহিত্যের হয়তো এক মগ কফি এই মুহুর্তে অতি প্রয়োজন।যার দরুন আর ড্রইং রুমে পা না বাড়িয়ে রান্নাঘরে ঢুকল কল্পনা।

সাহিত্যের ট্রাউজারের পকেটে থাকা মুঠো ফোনটা ভাইব্রেট করতেই সেটা বের করে মুখের সামনে ধরল সাহিত্য।অতঃপর সব ক্লান্তি ঝাড়িয়ে রাজের কলটা রিসিভ করেই সিড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

"হুম রাজ,বলো"

"স্যার,গুড নিউজ।ভিভাসফটের সি.ই.ও. এর সাথে এখনই কথা হলো আমার।কাল উনি আমাদের অফিসে আসছেন।ওনার এবং রবি স্যার আর আপনার সাইনটা হয়ে গেলেই কাজ একদম শেষ"

রাজের কথা শুনতে নিয়েই ছাদে পা রেখেছিল সাহিত্য।আধার ঘেড়া ছাদে শীতের ঠান্ডাটা যেন সাহিত্যের মাথা ব্যথাটা হালকা কমিয়ে দিল।সেই ঠান্ডা হাওয়ার সাথে হয়তো রাজের বলা কথাটাও যুক্ত ছিল।ঠোঁটে এক হাসি ফুটল সাহিত্যের।আধারে ঠিক বুঝা যাচ্ছে না।কিন্তু হয়তো সেই হাসি কুটিল মিশ্রিত।ধীমি আওয়াজে শুধালো সাহিত্য,

"গুড"

"এরপর আর কি করব স্যার?"

"তুমি এবার রেস্ট নাও রাজ।বাকি কাজ আমি আর রবি সামলে নেব।সেটা আমাকে নিজ হাতেই সামলাতে হবে"

সাহিত্যের মনের ক্ষোভদের দমনের জন্য যে পৈশাচিক ইচ্ছাটা অবশেষে পূরণ হতে যাচ্ছে সেটা সাহিত্যের হাসি মাখা কন্ঠের স্বরেই বুঝলো রাজ।যার দরুন ছেলেটা আর কোনো ভারী কথা না বলেই সালাম দিয়ে কল কেটে দিল।

আর এদিকে সাহিত্যের হাসিটা যেন এখনো বজায় আছে।সেই হাসিতে যেন এক তৃপ্তির ঝলক ফুটছে।কিছুদিনের মধ্যেই কারো একজনের সাথে খুব ঘনিষ্ঠভাবেই সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে সাহিত্যের।

কোরিডোরে এসে ফোনের স্ক্রিন থেকে নজর সড়িয়ে সেটা পকেটে ঢুকাতেই সামনে অক্ষি জোড়া আটকে গেল সাহিত্যের।তার রুমের সামনে এক কেশবতী দাঁড়িয়ে।

কল্পনা কফি বানানো শেষ করে ড্রইং রুমে এসে সাহিত্যকে আর দেখতে পায় না।অনুকে জিজ্ঞেস করলে অনু বলে সাহিত্য নাকি উপরে গিয়েছে।সাহিত্য উপরে যাওয়া মানে তার রুমেই শুধু সে যেতে পারে।যার দরুন কল্পনা উপরে এসে রুমের দরজা নক করে।কিন্তু কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে বেশ ভ্রু কুচকায় সে।আরো বেশ কয়বার নক করেও যখন ওপাশ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পেল না তখন থেকেই তো দরজার সামনে এমন ঠাই দাঁড়িয়ে আছে।একবার চিন্তা করছে যে সাহিত্য ভাই ঘুমিয়েছে নাকি?আবার আরেকবার চিন্তা করছে যে সাহিত্য ভাই তো এতো তাড়াতাড়ি ঘুমান না।কফি খেলে সাহিত্যের মাথা ব্যথাটা ছেড়ে দিত।কিন্তু কল্পনা যে এখন বেশ দ্বিধায় ভুগছে যে কি করবে।সেটা ভাবতে নিয়েই মেয়েটা ইতোমধ্যে ডান হাতের তর্যনী আঙ্গুল কামড়াতে শুরু করে দিয়েছে।

সাহিত্য হঠাৎ এমনভাবে কল্পনাকে দেখে হালকা ভড়কে উঠে।কিন্তু উল্টো দিকে ঘুরে থাকা তার ললনার হালকা দুলতে থাকা চুলগুলো দেখে যেন মুচকি হেসে উঠল ছেলেটা।হাটু অব্দি এলোমেলো চুলগুলোর উপরের কিছু চুল একটা পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে আটকানো।সেটাও আবার কোনোরকম।সেই কোনোরকমে আটকে রাখা চুলগুলো দেখেই যেন বেশ লোভ লাগলো সাহিত্যের।

ট্রাউজারের পকেটে দুই হাত গুজে ধীর পায়ে নিঃশব্দে কল্পনার দিকে এগিয়ে গেল সাহিত্য।বাইসেপ্স যুক্ত পেটানো শক্ত এক হাত দিয়ে প্রেয়সীর কোমল চুলের আগায় হাত ছোঁয়ালো।সাথে আলতো করে নিজের মুখের কাছে আনতে লাগলো সেগুলোকে।সিল্কি চুলগুলো আঙ্গুলের মাঝে হালকা ঘষতে নিয়েই ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি ফুটলো তার।অতঃপর তীব্র নেশায় সুগন্ধি চুলগুলোকে দূরত্ব ঘুচিয়ে নিজের নাকের সাথে লাগিয়ে দিল।যখন লম্বা একখানা শ্বাস ভিতরে নিল তখন নেশায় আধো বন্ধ চোখ জোড়া এবার যেন পুরোপুরিই বুজে এলো তার।পর মুহূর্তেই যেন মিষ্টি এক ঘ্রাণ রন্ধ্রে-রন্ধ্রে ছড়িয়ে গেল সাহিত্যের।

সাহিত্যকে এখন মাতাল করার জন্য কোনো ওয়াইনের প্রয়োজন হয় না।তার ললনার ঘ্রাণই যথেষ্ট।নেশালো চোখ জোড়া আধো খুলে আবার কল্পনার দিকে দেখতে লাগলো সাহিত্য।মেয়েটা যে কি ভাবছে সাহিত্যের জানা নেই।ভাবনায় বিভোর থাকার দরুন পেছনে যে কেউ একজন তার চুলগুলোতে নিজের অধিকার খাটিয়ে যাচ্ছে সে কথা হয়তো কল্পনার জানা নেই।

সাহিত্যের তো খুব করে মন চাইছে চুলগুলো সড়িয়ে প্রেয়সীর ঘাড়ে ভালোবাসার রেখা একেঁ দিতে।তবে সেই রেখা যে কোনো ওয়েল পেইন্ট দিয়ে তৈরি হবে না।সেটা যে শুধু এবং শুধুই সাহিত্যের কার্যে সম্পন্ন হবে।কারণ এই মুহুর্তে যে প্রেয়সীর ঘ্রাণে মনের নিষিদ্ধ অনুভূতিরা শুধু চুলগুলো ছুঁয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না।

প্রতিবারের ন্যায় আবারো নিজের অনুভূতিদের দাবিয়ে রাখতে গিয়ে মেকি হাসলো সাহিত্য।হাত পিচলে কল্পনার চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে উল্টো পায়েই কল্পনার থেকে দূরত্ব বাড়ালো।মুখের হাসি সড়িয়ে ভারী করল চোখ-মুখ।অতঃপর ভারী কন্ঠেই বলে উঠল,

"এই!"

হঠাৎ পেছনে কারো উপস্থিতি টের পেয়েই কল্পনার শরীরে ক্ষণস্থায়ী ভুমিকম্পের দেখা দিল।কফির মগটা একটুর জন্য হাত থেকে পরেনি।কন্ঠের অধিকারীকে চিনতে পেরে এক শুকনো ঢোক গিলে পেছনে ঘুরলো সে।পেছনে ঘুরে হঠাৎ সাহিত্যের গম্ভীর মুখোশ্রি দেখে থেমে যাওয়া কাপাকাপি যেন আবার মৃদু শুরু হলো।সাহিত্য তার গম্ভীর মুখোশ্রি বজায় রেখেই শুধালো,

"এমন চোরের মতো আমার রুমের সামনে কি করিস?"

গলা খেকড়িয়ে কথা বের করল কল্পনা,

"ক-ক-কফি এনেছি"

সাহিত্য ট্রাউজারে পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে মাথাটা কল্পনার দিকে হেলিয়ে দিল।হয়তো কল্পনাকে ভড়কানোর জন্যই বলে উঠলো,

"আমি চেয়েছি কফি?"

নজর নিচু করে জিভ দিয়ে নিম্নাষ্ঠ ভিজালো কল্পনা।অতঃপর আবার সাহিত্যের দিকে দেখে বলে উঠল,

"সারাদিন অফিসে থাকেন।তাই ভাবলাম মাথা ব্যথা হালকা করার জন্য একটু কফি বানিয়ে দেই"

কল্পনার এহেন আদুরে কথায় সাহিত্যের হৃদয় গললেও মেজাজটা যেন বিগড়াতে লাগলো।কারণটা হয়তো একটাই,যে প্রেয়সীকে একটু ছুঁয়ে দিতে পারছে না সে এই মুহুর্তে।নিজের একমাত্র শান্তির স্থানে ক্ষণিক মুহুর্তের জন্যও ঠাই পাইছে না সাহিত্য।এখন যে সেটা নিষিদ্ধ।তার প্রাণপাখিটা যদি একটু আলত করেই সাহিত্যের কপালে অধর ছুঁয়ে দিত তাহলে মাথা যেন ব্যথার অর্থই ভুলে যেত।

কল্পনার কথায় মনের ভিতর এতো কিছু চললেও বাইরে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না সাহিত্য।সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসলো শুধু।যেটা কল্পনাকে বেশ বিভ্রান্তে ফেলল।আরো একটু হকচকিয়ে গেল মেয়েটা যখন সাহিত্য ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে লাগলো তার দিকে।উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়েই পিছাতে নিল কল্পনা।এক ধাপ-দু ধাপ করে পিছাতে নিয়ে বেশ খানিকটা পিছাতে বাধ্য করল সাহিত্য তাকে।কারণ সাহিত্য যে এই মুহুর্তে নিজের রুমের দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে।দরজার হ্যান্ড লকে হাত দিয়ে ভারী কন্ঠে শুধালো সাহিত্য,

"লাগবে না আমার কফি?"

কথাটা শেষ হতেই রুমে ঢুকে দরজা লাগালো সাহিত্য।কল্পনা যেন মুর্তির ন্যায় ঠাই দাঁড়িয়ে রয়েছে।ক্ষণিক আগে থেকে শুরু হওয়া বুকের ধুকপুকানিতে কফির গরমটা যেন হাতে সয়ে গিয়েছে তার।সাহিত্য হঠাৎ এমন চিটচিটে কথা কেন বলছিল সেটাই যেন বুঝে উঠতে পারছে না।কল্পনার অবুঝ মাথা হয়তো কুলিয়ে উঠতে পারলো না যে সাহিত্য তার প্রেয়সীর কাছে না যেতে পারায় অমন চটে আছে।

নিজের ভাবনায় থাকা অবস্থাতেই আনমনে হাতের কফির মগে ঠোঁট ছোঁয়ালো কল্পনা।অমনি কফির তেতোভাবে চোখ-মুখ কুচকে এলো তার।পর মুহুর্তেই ঠোঁট থেকে মগ সাড়িয়ে সাহিত্যের রুমের দিকে নজর ঘুরিয়ে বলে উঠল,

"এমন বেস্বাদ কফি কোনো আজরাইল-ই খেতে পারবে"

কল্পনা হয়তো ধারণা করেছিল সাহিত্যের কানে সে কথা যায়নি।কিন্তু সাহিত্য তাকে আশ্চর্য করে দিয়ে ভেতর থেকে গলা উঁচিয়ে বলে উঠল,

"আপাতত তোর জন্য আমি সেটাই!!"

সাহিত্যের সে কথায় কল্পনা ভড়কানোর সাথে তার চোখ জোড়াও রসগোল্লা হয়ে উঠল।সাহিত্যের মেজাজ গরম আছে ভেবে আর কিছু না বলেই সিড়ি দিয়ে দ্রুত পায়ে নেমে গেল মেয়েটা।

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন