#পর্ব_৪৮
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
কল্পনা আজ হঠাৎই এক কাজ করে বসলো।বেয়াদবের মতো নক না করেই লক ঘুরিয়ে সাহিত্যের রুমের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে দিল সে।আর তার পর মুহুর্তেই সেই কাজের জন্য বেশ পস্তালোও বটে।সাহিত্যকে দেখা মাত্রই হুড়মুড়িয়ে পড়ে যেতে ধরে নিজেকে সামলে নিয়ে বের হয়ে যেতে লাগলো।কিন্তু সাহিত্যের কন্ঠে পা জোড়া বাধ্য হয়েই থামিয়ে দিল,
"অমন লুকিয়ে না দেখে,সামনে এসেই দেখ"
পেছনে ঘুরলো না কল্পনা।চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করে মাথা নামিয়ে নিল।সাহিত্য সে কথা কেন বলেছে সেটা তো ভালোভাবেই বুঝছে সে।কল্পনা দরজা খুলে যা দেখেছিল তা যেন বড়ই ভয়ংকর ছিল।ঘরের উষ্ণতার কারণেই হবে হয়তো,সাহিত্য যে শুধু একখানা ধুসর রঙের ট্রাউজার পড়ে ক্যানভাসে পেইন্ট ব্রাশ ঘুরিয়ে যাচ্ছিল।কল্পনার নজরে পড়ছিল সাহিত্যের ভি সেইপের সুন্দর চওড়া পিঠখানা।সেই দৃশ্য কল্পনার চোখ জোড়া হঠাৎ সইতে না পেরেই যেন কল্পনা হুড়মুড়িয়ে পড়ে যেতে ধরেছিল।
সাহিত্যের কথায় মাথা নিচু রেখেই মিনমিনিয়ে বলল মেয়েটা,
"আমি আপনাকে দেখছিলাম না তো"
ক্যানভাসে হাত চালাতে নিয়েই মেকি হেসে বলে উঠল সাহিত্য,
"ওহ,এখানে আমাকে দেখার কথাও চলছিল?"
আবার চোখ-মুখ খিচে নিল কল্পনা।অতঃপর আবার মিনমিনিয়ে শুধালো,
"সামিয়া ডেয়ার দিয়েছে,আপনার একটা পেইন্ট ব্রাশ চুরি করে নিয়ে যাওয়ার জন্য।সেটাই নিতে এসেছিলাম"
"বাড়িতে চুরি করতে এসে বাড়ির মালিককে কে খবর দেয়?"
"দিতাম না খবর।কিন্তু আপনি উল্টা-পাল্টা কিছু ভাববেন তাই বলে দিলাম"
"কি উল্টা-পাল্টা ভাবতাম?"
সাহিত্য ভালো করেই বুঝেছে যে কল্পনা সাহিত্যকে দেখার কথা বলছে।কিন্তু প্রেয়সীকে একটু জ্বালাতন করতেই কথাটা বলে উঠল সে।কিন্তু কল্পনা আর সাহিত্যের প্রশ্নের উত্তর দিল না।হনহনিয়ে সাহিত্যের সামনে এসে দাড়ালো সে,
"আমাকে একটা ব্রাশ দিন।কিছুক্ষণ পরেই দিয়ে যাচ্ছি"
হাতের ব্রাশখানা পানিতে ডুবিয়ে দিল সাহিত্য।সেই দিকে নজর রেখে পানির পটে ব্রাশখানা ঘুরাতে নিয়েই বলল সে,
"ব্রাশ দেওয়ার বদলে আমি কি পাবো?"
ভড়কালো কল্পনা,
"আমি কি একেবারের জন্য নিচ্ছি নাকি?বললাম তো কিছুক্ষণ পরেই দিয়ে যাচ্ছি"
এবার সাহিত্য ভ্রু জোড়া কুচকে কল্পনার দিকে অনেকটাই ঝুঁকে এলো,
"তুই ভালো করেই জানিস কল্পনা।আমি আমার ব্রাশ অন্য কারো হাতে দেই না।ইটস নট হাইজেনিক"
চোখ-মুখ উল্টিয়ে সাহিত্যের মুখ ভেংচালো কল্পনা,
" 'ইটস নট হাইজেনিক'।তো এখন আপনার পেইন্ট ব্রাশ হাতে নেওয়ার জন্য কি পি.পি.ই. পড়ে আসতে হবে আমাকে?"
কল্পনার সে কথায় হালকা হাসলো সাহিত্য।সেটা তো শুধু অজুহাত হিসেবে বলেছে সে।আসল বিষয় তো হলো সাহিত্য তার প্রেয়সীর থেকে কিছু চাইছে।আবার ক্যানভাসে হাত চালাতে লাগলো সে,
"বললাম তো।আমাকে কিছু দিলে তার বদলে ব্রাশ পাবি"
এবার বিরক্ত হয়েই বলল কল্পনা,
"কি লাগবে আপনার?"
"চিঠি"
পর মুহুর্তেই সাহিত্য কল্পনার দিকে ঘুরে বলে উঠল।সেটাতে কল্পনা বেশ ভড়কালো।সাহিত্য সুক্ষ্ম নজরে দেখতে লাগলো এদিক-ওদিক নজর ফেলা কল্পনাকে,
"শেষ চিঠিটা কবে দিয়েছিস আদৌ কি মনে আছে তোর?এবার একটু বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে না?"
কল্পনা মাসুম নজরে সাহিত্যকে দেখতে লাগলো,
"যেই ড্রয়ারে চিঠি রাখি সেটার চাবি হারিয়ে ফেলেছিলাম।সেটাতে আমি কি করব?গত কালই পেলাম সেটা"
কল্পনার সে কথা শুনে ভারী শ্বাস ফেলল সাহিত্য।অতঃপর আবার ক্যানভাসে মন দিল,
"চিঠি নিয়ে আয়,তারপর ব্রাশ দিচ্ছি"
খূটি গাড়িয়ে দাড়ালো কল্পনা।জোর গলায় বলল,
"না!আগে ব্রাশ দিন।আমি ব্রাশ ফেরত দেওয়ার সময় চিঠি দেব"
প্রেয়সী চোখের সামনে থেকে তাড়াতাড়ি পালানোর বুদ্ধি রটিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু সাহিত্য তো সে সুযোগ দেবে না।পারলে রুমে আটকিয়ে রাখবে তাকে।তারপরেও এতো তাড়াতাড়ি চোখের আড়াল হতে দেবে না।যার দরুন এবার শান্ত স্বরে শুধালো সাহিত্য,
"ঠিকাছে।কিন্তু একটু অপেক্ষা করতে হবে।আর্টের বেইজ কালারটা হয়ে গেলেই দিয়ে দিব"
কল্পনা ভ্রু কুচকালো।সেই কুচকানো ভ্রু নিয়েই সাহিত্যের দিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে টেবিলের উপর রাখা শ-খানেক ব্রাশের দিকে নজর দিল।আবার সাহিত্যের দিকে দেখে বলে উঠল সে,
"আপনার হাতের ব্রাশটা কে চেয়েছে?যেকোনো একটা দিলেই হবে"
কল্পনার দিকে ঘুরে ঠোঁট বাকালো সাহিত্য,
"তোকে দেওয়ার মতো এটাই একমাত্র ব্রাশ আছে।কারণ এটা হারালেও তেমন কিছু যায় আসে না আমার"
কল্পনা নাকের পাটা ফুলিয়ে ফুসে উঠল,
"হারালে মানে?আমি কি আপনার ব্রাশ হারিয়ে ফেলবো?"
"তোর কাছে কিছু যাবে আর তুই সেটা হারাবি না সে কথা কল্পনারও বাইরে"
ছোটবেলার কথা স্মরণে এলো কল্পনার।সাহিত্যকে তেল মাখিয়ে খেলা করার জন্য অনেক পেইন্ট ব্রাশ নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেয়নি।কল্পনা তার সাহিত্য ভাইয়ের পেইন্ট ব্রাশ বন্ধুদের দেখাতে গিয়ে সবকটা যে হারিয়ে রেখে আসতো।
নিজের অতীতে করা কু-কর্ম ফু মেরে উড়িয়ে দিয়ে আবার সাহিত্যের দিকে নজর দিল কল্পনা,
"তখন তো ছোট ছিলাম।এখন আবার কিছু হারাই নাকি?"
এক চোখ বন্ধ করে পেইন্ট ব্রাশটা দিয়ে দূর থেকেই ক্যানভাসে করতে থাকা আর্টের মাপ ঠিক করতে নিয়েই বলে উঠল সাহিত্য,
"ড্রয়ারের চাবি যেন কে হারিয়েছিল?"
সাহিত্যের এমন আক্রমণে ভড়কে উঠল কল্পনা।অতঃপর হাল ছেড়ে দিয়ে হনহনিয়ে বেলকুনির দিকে যেতে নিয়েই বলল,
"কি বেইজ বানাবেন তাড়াতাড়ি বানিয়ে ব্রাশটা দেন আমাকে"
কল্পনার চোখের আড়ালেই হেসে উঠল সাহিত্য।অতঃপর ক্যানভাসে হাত চালাতে নিয়েই প্রেয়সীর দিকে আড় চোখ বজায় রাখলো।
কল্পনা এদিকে বেলকুনির দিকে আগালেও মাঝ পথেই পায়ের গতি কমিয়ে নিয়েছে।মাথা ঘুরাতে নিয়েই পুরো রুমখানা পরখ করতে লাগলো সে।সাহিত্য দেশে ফেরার পর থেকে এই ঘরখানা যেন আর আগের মতো করে ঘুরে দেখা হয়ে উঠে না কল্পনার।সাহিত্য যখন ছিল না তখন তো সময় পেলেই ছুটে এসে ঢুকতো এই ঘরটায়।নিঃসঙ্গ কত যে রাত কাটিয়েছে মেয়েটা এই রুমটাতে।সেই কথা যেন শেখ ভিলার কারোই জানা নেই।সাহিত্যকে দেওয়া প্রায় চিঠি তো এই রুমে বসেই লিখেছিল কল্পনা।যার কারণেই হয়তো চিঠিগুলো লিখার সময় সাহিত্যের কথা আরো একটু বেশি করেই মনে পড়ত তার।
মুখে সুক্ষ্ম হাসি নিয়ে অতীতের কথাই ভাবছিল কল্পনা।মাথা ঘুরাতে নিয়ে হঠাৎই চোখ আটকে গেল খুব কম সামগ্রি ধারণকারী লম্বা আয়না যুক্ত ড্রেসিং টেবিলটার উপর।কালচে খয়েরী ড্রেসিং টেবিলটার এক কোণায় একটা কাচের বোতল বসে রয়েছে।কোনো কিছু চোখে পড়ুক আর না পড়ুক,সেই আকর্ষণীয় বোতলখানা যেন চোখে পড়তে বাধ্য।ছোটখাটো বোতলটার ভেতরের তরলের রঙ তেমনটা বুঝা যাচ্ছে না।কারণটা যেন সেই কাচের বোতলের নিজেরই রঙের জন্য।কালো রঙ ধীরে-ধীরে গাঢ় সবুজ রঙে পরিণত হয়ে নিচের দিকে নেমেছে।গাম্ভীর্যপূর্ণে ভরপুর বোতলখানা দেখে পারফিউমের বোতলের মতোই লাগছে।
কল্পনা সামনে এগিয়ে হাতে তুলল বোতলখানা।কাচের বোতলটার মাথার লম্বাটে ষড়ভুজাকার ঢাকনাটা তীব্র গাঢ় মেটালিক ব্লুইশ রঙা।সেই ঢাকনার ঠিক সোজায় বোতলের গায়ে লম্বায় উপর থেকে একদম নিচ পর্যন্ত আবারো সেই গাঢ় মেটালিক ব্লুইশ রঙের তৈরি এক অংশ।তাতে নিচের দিকে চোখ দিতেই পারফিউমের ব্রান্ডের নামটা চোখে পড়ল কল্পনার।
" CARON "
সেই নামের দিকে চোখ রেখেই বোতলের ঢাকনাটা খুলল সে।হয়তো আনমনেই স্প্রে বাটোনটা নাসাগহ্বরের দিকে এগিয়ে দিল।লম্বা এক শ্বাস টেনে সেই সুগন্ধির ভারী ঘ্রাণ নিজের ভেতরে নিতে দেখা গেল তাকে।সাথে-সাথেই যেন অক্ষি জোড়া বুজে এলো।যেই ঘ্রাণটা আজ অব্দি খানিক দূরত্ব বজায় রেখেই শুকতে পেরেছে সেই ঘ্রাণ যেন আজ গভীরভাবেই নিজের মাঝে নিতে সক্ষম হয়েছে এই নব যুবতী।
সেই চিরপরিচিত ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার ঘ্রাণ।যেই ঘ্রাণ শুধুমাত্রই কল্পনার সাহিত্য ভাইয়ের পুরুষালী ঘ্রাণের সাথে মিশে থাকে।যেই ঘ্রাণটাই কল্পনা আশেপাশে অনুভব করে যখন সাহিত্য তার কাছে থাকে।যেই ঘ্রাণ নিজের মাঝে নিলেই কল্পনা যেন খানিকটা এলোমেলো হতে বাধ্য হয়।যেই ঘ্রাণে নব যুবতীর অধর জোড়া এক অজানা কারণেই সুক্ষ্মভাবে কাপতে শুরু করে।
কল্পনার মন তো চাইছে এভাবেই ঘ্রাণ নিতে থাকুক এই পারফিউমের।কিন্তু ঘরে যে সাহিত্যও উপস্থিত আছে সেটা মাথায় আসতেই মেয়েটা নিজেকে সংযত করল।হাতের বোতলটার দিকে নজর রেখেই সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বলে উঠল সে,
"আপনার পারফিউমটা অনেক ইউনিক"
সাহিত্য যে এদিকে প্রেয়সীর পাগলামো দেখে ক্যানভাসে হাত চালানো থামিয়ে দিয়েছে সেটা আর কল্পনার জানা হয়ে উঠল না।জানলে হয়তো ভারী লজ্জায় পড়ে যেত।সাহিত্য এবার কল্পনার দিকে ঘুরে দাড়ালো,
"কেন তোর পছন্দ হয়েছে?"
সাহিত্যের শান্ত স্বরে বলা সুক্ষ্ম কথায় তার দিকে নজর দিল কল্পনা।কি বলবে সে সাহিত্যকে?যে এই বোতলে আবদ্ধ ঘ্রাণ নয়,কল্পনা সাহিত্যের ঘ্রাণকে পছন্দ করে?হয়তো সে কথা বলতে পারবে না কল্পনা।কারণটা হয়তো লজ্জা।কিন্তু ছোট থেকেই যেই বুকে মাথা রেখে বড় হয়েছে সেই বুকের ঘ্রাণটাই তো সেকাল থেকেই কল্পনার অনেক আপন মনে হয়।মনে হয় সেই ঘ্রাণের ব্যক্তির কাছেই কল্পনা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ।
সাহিত্যের চোখ জোড়া থেকে নজর সড়াতেই সুদর্শন বক্ষপটেও নজর গেল কল্পনার।কিন্তু নিজের ইচ্ছাকে প্রশ্রয় না দিয়ে আবার হাতের মুঠে আবদ্ধ বোতলে নজর দিল।সেটা ড্রেসিং টেবিলে রাখতে নিয়েই বলে উঠল সে,
"মোটামুটি"
সে কথায় নিঃশব্দে মেকি হাসলো সাহিত্য।কল্পনার ক্ষণিক আগের আচরণ দেখে তো তার মুখের কথা বিশ্বাস হচ্ছে না সাহিত্যের।পানিতে ভেজানো হাতের ব্রাশটা কাপড় দিয়ে মুছতে নিয়েই বিড়বিড় করে উঠল সাহিত্য,
"তুই আমাকে জ্বালিয়ে মারছিস জানপাখি।আমার ধৈর্য ভাঙার রাস্তা খুলে দিচ্ছিস,অথচ নিজ থেকে কিছু বলছিস না"
কল্পনা সে কথা শুনলো না।তার কান অব্দি তো সাহিত্যের সে কথা পৌঁছায়ইনি।বিছানার কাছে রেলিং-এ আটকানো মানি প্লান্ট গাছটাতে হাত বুলাতে লাগলো কল্পনা।সে-ই তো এই গাছটা এখানে রেখেছিল।কিছুদিন আগেই জোর করে সাহিত্যের রুমে ঢুকে এটা রেখে গিয়েছে।সাহিত্য সেদিন একটু আনমনেই বলেছিল যে কল্পনা যেন তার রুম গোছানোর জিনিসও কিনে,তারপর থেকে তো সাহিত্যের আশেপাশে ঘুরে সাহিত্যের মাথা খারাপ করে দিয়েছে।এতো-এতো কিছু জিনিস দেখেই যেন মাথা ঘুরতে শুরু করে ছেলেটার।যার দরুন সেগুলো দেখার পর মুহুর্তেই একদম না করে দিয়েছিল।কিন্তু তার জেদখোর প্রেয়সীর জোরাজোরিতে শুধুমাত্র এই মানি প্লান্ট গাছটা রাখতে দেয়।
গাছটাকে ঘুরিয়ে দেখতে নিয়েই কল্পনা বলল,
"এটাতে পানি দেন?"
সে প্রশ্নে ছোট প্রতিক্রিয়া সাহিত্যের,
"বাসায় থাকি আমি?"
সাহিত্যের পানি খাওয়ার বোতলটার ঢাকনা খুলে গাছের গোড়ায় পানি ঢালতে লাগলো কল্পনা,
"সেজন্যই তো এই গাছ দিয়েছি।সবসময় দেওয়ার দরকার নেই।চোখে পড়লেই একটু পানি দিলেই চলবে"
"বাসায় থাকলে চোখ জোড়া তো এক জিনিস ছাড়া অন্য আর কিছু দেখতেই চায় না"
সাহিত্য যে তার প্রেয়সীর কথা বলছে সে কথা সাহিত্যের প্রেয়সী বুঝতে না পেরেই হয়তো বলে উঠল,
"সারাদিন অফিসে থেকেও বাসায় এসে ল্যাপটপে কাজ করতে হবে?বাসায় একটু কাজটা বন্ধ রাখা যায় না?"
অবুঝ প্রেয়সীর কথায় নিঃশব্দে হাসলো সাহিত্য।অতঃপর মাথা ঝাকিয়ে শুধালো,
"ঠিকাছে ম্যাডাম"
কল্পনা পানির বোতলটা রেখে সাহিত্যের দিকে ঘুরলো,
"হয়েছে আপনার?শুধু দুই মিনিটের জন্যই তো ব্রাশটা নিব।এখনই ফেরত দিয়ে যাচ্ছি"
কল্পনার দিকে এগোতে লাগল সাহিত্য।হাঁটার দরুন বলিষ্ঠ যুবকটার কাধের কাছের অংশরা হালকা নড়েচড়েই উঠল।সেদিকে চোখ দিয়ে পর মুহুর্তেই মাথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল কল্পনা।ইদানীং তার নজর এতো বেহায়া কেমন করে হয়ে উঠল সেটাই চিন্তা করতে লাগলো।
কল্পনার চিন্তার মাঝেই সাহিত্য তার একদম নিকটে এসে দাড়ালো।ঠোঁট যেন আপনাআপনিই বেকে এলো কল্পনার।ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউমটা এবার যেন সঠিক জায়গা থেকেই কল্পনার দিকে আসছে।
সাহিত্য হাতের পেইন্ট ব্রাশটা কল্পনার দিকে এগিয়ে দিল,
"ফেরত দেওয়ার সময় ব্রাশের সাথে যেন চিঠিও আসে"
কল্পনা আর কোনো কথা বাড়ালো না।সাহিত্যের হাত থেকে ব্রাশটা নিয়ে দরজার দিকে যেতে নিয়েই হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে বলে উঠল,
"দুই সেকেন্ডের মধ্যে আসছি"
কথাটা শেষ হতেই অদৃশ্য হয়ে গেল কল্পনা।কল্পনার নির্ধারিত সময়ের কথা শুনে সাহিত্য ভ্রু কুচকালেও কল্পনা সেই সময় অক্ষুণ্ণ রাখতেই দৌড় লাগালো।সিড়ি ভেঙে নিচে এসে হাতের মোটা ব্রাশটা দিয়ে সামিয়ার মাথায় দিল এক বারি।সামিয়া 'আউ' করে উঠার সাথেই কল্পনা তাকে ব্রাশটা দেখিয়ে বলল,
"এই দেখ,নিয়ে এসেছি।এখন তাড়াতাড়ি রেখে আসি নাহলে সাহিত্য ভাই জানলে খবর করে দিবে"
সোফায় শরীরের উষ্ণতাই লাগতে দিল না কল্পনা।যেভাবে এসেছিল সেভাবেই আবার সিড়ির দিকে এগুলো।সামিয়া মাথায় হাত বুলাতে নিয়েই পেছন থেকে বলে উঠল,
"এতোক্ষণ লাগলো কেন?ব্রাশটা ভালো করে দেখলামই না তো।আর চুরি করা জিনিস এতো তাড়াতাড়ি ফেরত দিতে হবে?"
ঘাড় ঘুরিয়ে সামিয়ার দিকে দেখে উপর-নিচ মাথা দোলালো কল্পনা।সাথে সামিয়ার শেষের প্রশ্নের উত্তরখানাও ছোট করে বলে উঠল,
"হুম"
সোফায় বসা সামিয়া আর অনুকে কল্পনা বললই না,যে গত কিছু মুহুর্ত কতটা প্রশান্তির কাটছিল কল্পনার।তাই তো দেরি করে ফিরেছে সে।
কল্পনা নিজের রুম থেকে চিঠিটা নিয়ে সাহিত্যের রুমে ঢুকলো।এবারো নক করেনি।দরজা খোলার পর মুহুর্তেই সেটা মনে পড়ল।তাই তো জিহ্বার মাথায় কামোড় বসিয়ে এবার সাহিত্যকে ডাকল,
"সাহিত্য ভাই"
'হুম' বলে কল্পনার দিকে দেখল সাহিত্য।সে তো এখনো ঠায় সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।কল্পনা তাকে নড়ার সুযোগটাই বা কই দিয়েছে।
কল্পনা শরীরের ভাড় একদম ছেড়ে দিয়েই চিঠি আর ব্রাশ থাকা হাতটা সাহিত্যের দিকে তাক করেই এগুতে লাগলো।কল্পনার এমন বাচ্চামো আচরণ দেখে ট্রাউজারের পকেটে হাত গুজে ঠোঁট বাকিয়ে হালকা হাসলো সাহিত্য।অতঃপর কন্ঠ স্বরে হাসির প্রভাব ফেলেই বলে উঠল,
"তুই শুধু হাতে-পায়েই বড় হয়েছিস।দুই সেকেন্ড মানে দুই সেকেন্ডই?"
ঠোঁট বাকিয়ে হালকা ভাব নিল কল্পনা।যেন সে নিজের কাজে অনেক গর্বিত।সাহিত্য কল্পনার হাত থেকে চিঠিটা প্রায় নিয়েই ফেলেছে।কিন্তু কল্পনার নজর সাহিত্যের টেবিলের দিকে যাওয়ায় সাহিত্য ব্রাশ আর চিঠিটা হাতে না নিতেই সেগুলো পুরোপুরি সাহিত্যের দায়িত্বে দিয়ে টেবিলের দিকে এগোলো সে।এদিকে সাহিত্য সেটার জন্য একদমই যেন প্রস্তুত ছিল না।কল্পনার হাতের জিনিসগুলো সাহিত্য ভালো করে না ধরার আগেই কল্পনা ছেড়ে দিয়ে দৌড় মেরেছে।যার দরুন ছেলেটা ভড়কে উঠেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে যেতে থাকা ব্রাশ ও চিঠিখানা ধরে ফেলল।বুকের হালকা ধুকপুক কমিয়ে ফুসতে নিয়েই কল্পনার দিকে দেখল সে।
কল্পনা টেবিলের নিকটে এসেই নিজের মাথার কাটাটা হাতে তুলে নিল।মেয়েটা যেন অবাকের শেষ চূড়ায়।কে বলবে যে এটা কল্পনার সেই সাদামাটা কাঠের মাথার কাটা?সেটাতে করা ভারী সুন্দর কারুকাজ দেখে তো কারো বলার সাধ্য নেই।কল্পনা নিশ্চিত হতেই সাহিত্যের দিকে ঘুরল।মেয়েটার চোখে এখনো বিস্ময়ের চিহ্ন,
"এটা আমার মাথার কাটাটা না?"
সাহিত্য একদমই ভড়কালো না।তবে কাটাটা সে নিজ হাতেই কল্পনাকে দিতে চেয়েছিল।কিন্তু তার প্রেয়সীর নিজ থেকে সেটা দেখায় তেমন খারাপ লাগলো না সাহিত্যের।বরং সে তো প্রেয়সীর বিস্ময়ে ভরা চোখ জোড়া দেখে ভারী আনন্দ পাইছে।ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে রেখে ছোট করে উত্তর দিল সাহিত্য,
"হুম"
কল্পনা আবার তার হাতের কাটাটায় নজর দিল।কাটাটার অর্ধেক অংশ জুড়েই ভারী কারুকাজ করা।কি সুন্দরই না লাগছে দেখতে!সেটা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখতে নিয়েই ধীমি কন্ঠে শুধালো কল্পনা,
"এটাতে পেইন্ট করার কি দরকার ছিল?"
কল্পনার কন্ঠ ধীমি থাকলেও সাহিত্য স্পষ্টভাবেই বলে উঠল,
"আমি থাকতে আমার জানপাখি এতো সাদামাটা জিনিস কেন ব্যবহার করবে?"
সাহিত্যের সেই কথায় চকিত হয়েই কল্পনা সাহিত্যের দিকে দেখলো।সামনের এই সুপুরুষ সেই কথাটা না বললেও পারতো।সে তো আর সারাজীবন কল্পনার সাথে থাকছে না।কিন্তু পরবর্তীতে যে কল্পনাকে এই জিনিস নিয়ে অনেক ভুক্তভোগী হতে হবে।এই আধুনিক যুগে সেটা হয়তো "হাই স্ট্যান্ডার্ডস" নামে পরিচিত।সাহিত্য কল্পনার স্ট্যান্ডার্ডস এতো উচ্চে নিয়ে গিয়ে বড়ই যে অসুবিধায় ফেলছে কল্পনাকে।সেটার প্রতিকার কোন ছেলের দ্বারাই বা সম্ভব?আদৌ কি সেই ছেলের সাধ্যের মধ্যে থাকবে সাহিত্যের দ্বারায় তৈরি করা কল্পনার সেই "হাই স্ট্যান্ডার্ডস"-এ পৌঁছানো?
কল্পনার এতো-এতো ভাবনার মাঝেই সাহিত্য ভ্রু কুচকে শুধালো,
"কেন?পছন্দ হয়নি?"
নিজের ভাবনা থেকে বেড়িয়ে এসে নড়েচড়ে দাড়ালো কল্পনা,
"না না!সে কথা কখন বললাম।আমি তো....শুধু বলছিলাম যে এতো কিছু করার কি দরকার ছিল?এতো হেভি ডিজাইন এতো ছোট জিনিসে করতে নিশ্চয়ই সময় লেগেছে..."
শেষের কথাটা বলতে নিয়েই আবার হাতের কাটায় নজর দিল কল্পনা।হাতে থাকা সাহিত্যের তৈরি সুন্দর আর্ট পিসটা দেখে আবার
হাসি ফুটল কল্পনার মুখে,
"তবে অনেক সুন্দর হয়েছে"
প্রেয়সীর অকৃতিম হাসি দেখে হৃদয় শিথিল হলো সাহিত্যের।বুঝলো যে সেটা কল্পনার ভালোই পছন্দ হয়েছে।কিন্তু ছেলেটা আবারো তার প্রেয়সীকে ভড়কানোর জন্য বলে উঠল,
"তোর পছন্দ না হলে দে,আমি রংগুলো উঠিয়ে দিচ্ছি"
সাহিত্যের ফেলা চাল বিফলে গেল না।তার উত্তর কল্পনার ব্যতিব্যস্ত ব্যবহার,
"কি বললেন?এতো সুন্দর ডিজাইনটা এখন উঠে ফেলবেন আপনি!পাগল নাকি!"
কথাটা বলেই কল্পনা ব্যস্ত হাতে তার খোলা চুলগুলো খোপা করতে লাগলো।খোপা করতে নিয়েই বলতে লাগলো,
"এটা আমার কত পছন্দের কাটা জানেন?আর এখন তো আরো পছন্দের হয়েছে।একদম এটাতে হাত লাগাতে আসবেন না।যেমন আছে তেমনই থাক"
কল্পনার মুখ থেকে ফোটা খৈ এর দিকে যেন ততটা ধ্যান নেই সাহিত্যের।সে তো অধর জোড়ার মাঝে সুক্ষ্ম দূরত্ব তৈরি করে প্রেয়সীর বাধতে থাকা এলোমেলো চুলগুলো দেখছে।কল্পনার হাতের বাধনে পেচানো চুলোগুলো যে তার গলদেশে ভারীভাবেই লেপ্টে যাচ্ছে মাঝেমধ্যে।কিন্তু সুক্ষ্ম সময়ের ব্যবধানে পড়নের হালকা কফি রঙা থ্রিপিসের উপর থেকে কল্পনা তাদের আবার হাতের মুঠোয় নেওয়ার চেষ্টায় নিমজ্জিত।
কল্পনা অবশেষে হাতের কাজ সম্পন্ন করে কাটাটা মাথায় গুজে দিল।অতঃপর হাবার মতো কল্পনার দিকে তাকিয়ে থাকা সাহিত্যের দিকে দেখার পর মুহুর্তেই বলে উঠল,
"দেখেন কি সুন্দর লাগছে।সুন্দর জিনিসটাকে অযথা নষ্ট করার দরকার নেই..."
সাহিত্যের এমন করে দেখে থাকায় বেশ ভড়কালো কল্পনা।মেয়েটা যেন ভারী লজ্জায় পড়ে গেল।নজর ঘুরিয়ে মিনমিনিয়ে শুধালো,
"অমন করে কি দেখছেন?"
কল্পনার কথায় সাহিত্য যেন নিজের করা অসভ্য কাজের ব্যাপারে অব্যাহত হলো।নিজেকে রাম ধমক দিয়ে খুজতে লাগলো কল্পনাকে এর উত্তর কি দেওয়া যায়।আজ মাথাটা যেন ভালো সময় চললো সাহিত্যের।তাই তো পর মুহুর্তেই বলে উঠল,
"দেখছিলাম যে তুই এখনে মাথায় ওটা কি বাধছিলি?এমন পাখির বাসাটা বাধলিই বা কেমন করে?"
সাহিত্যের মুখে নিজের মেসি বানকে পাখির বাসা শুনে চটে গেল কল্পনা।সুক্ষ্ম চোখে দেখতে লাগল সে সাহিত্যকে।সাহিত্যের অমন করে দেখায় কল্পনা কিনা কি ধারনা করে বসেছিল।কিন্তু এই লোক তো পুরুষ মানুষ পুরুষ মানুষই থাকবে।গম্ভীর কন্ঠে বলল কল্পনা,
"এটা পাখির বাসা না,মেসি বান বলে এটাকে!....দাড়ান। আবার বানিয়ে দেখাচ্ছি"
কল্পনা মাথার কাটা খুলতেই যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই সাহিত্য তাকে তাড়া দিল রুম থেকে বের হওয়ার জন্য,
"হয়েছে হয়েছে!ওই পাখির বাসা আর বানিয়ে দেখাতে হবে না।বের হ রুম থেকে।আমার আর্টের মাঝে ঢুকে সব গুলিয়ে দিলি তুই।কি যে আর্ট করছিলাম সেটাই ভুলে গিয়েছি।এখন বের হ-বের হ!!"
সাহিত্য কল্পনাকে একপ্রকার ঠেলেই রুম থেকে বের করে দরজা লাগিয়ে দিল।দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে ভারী শ্বাস ফেলছে ছেলেটা।তার প্রেয়সী যদি মাথার সেই পাখির বাসা খুলে আবার বাধতে শুরু করতো তাহলে নির্ঘাত আজই বিয়ে পড়াতে লাগতো সাহিত্য ও তার প্রেয়সীর।ছেলেটা যে বড়ই নিয়ন্ত্রণহীন নিজের অনুভূতিদের বিষয়ে।
এবার শব্দ করেই হেসে উঠল সাহিত্য।হাসতে নিয়েই হাতের চিঠির দিকে নজর গেল।ক্যানভাসের দিকে আগাতে নিয়েই হাতের ক্ষুদ্র চিঠিখানা খুলল সে।
📜.........................................................
আজ একটা মজার কথা বলি?এমনি হুট করে মাথায় এলো তাই বলছি।
মানুষ একতরফা প্রেম করে, আর আমি একতরফা চিঠি পাঠাচ্ছি।হাস্যকর না?
উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম।
................................................................📜
এবারের চিঠিটার শেষের দিকে কল্পনার নামটার আর দেখা মিলল না।থাকলে হয়তো প্রতিবারের মতোই এবারো সেখানটায় অধর জোড়া ছুইয়ে দিত সাহিত্য।কিন্তু সে কাজ করতে না পেরে অন্ধকার মুখোশ্রি নিয়েই বলে উঠল সে,
"আমিই তো একতরফা প্রেম করে যাচ্ছি তোর সাথে.......হয়তো তুইও করছিস,কিন্তু বলছিস না আমাকে"
#চলবে