#পর্ব_৪৯
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
🚫এটি একটি কাল্পনিক গল্প।বাস্তব জীবনে ভিভাসফট কোম্পানির সাথে এই গল্পের নায়ক অহিয়াম শেখ সাহিত্যের কোনো সম্পর্ক নেই।আশা করছি সেই দিকটা গোলমিল করবেন না।এই গল্প শুধুমাত্র লেখিকা রশনি করিমের কল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ🚫
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সপ্তাহের দুটো দিন বাদে বাকি পাঁচটা দিনই যে ভারী ব্যস্ততায় কাটে সবার।সেটা বাচ্চা হোক আর মধ্যবয়স্ক।কেউই যেন রেহাই পায় না এই পাঁচটা দিনের থেকে।বাধ্যতা মূলক প্রতিষ্ঠানে বা কাজে উপস্থিত থাকতেই হবে।যার দরুন পিস ঢালা কালো রাস্তাগুলোও যেন সকালটায় রঙিন হয়ে উঠে অনেক মানুষের পরিহিত ইউনিফর্মে।কেউবা জোর পায়ে হেঁটে,তো কেউ বা ধীরে সুস্থে।কিন্তু খানিক দেরি হলেই তো দৌড় শুরু করতে হয়।
তেমনই এক ব্যস্ত সকালে রাতুলকে দেখা গেল প্রশস্ত রাস্তাটায়।তার পায়ের গতি কখনো হালকা জোরে, তো কখনো বা দৌড়েও মানুষের ভিড় পার করছে।হাঁটার ফাঁকে হাতের ঘড়ির দিকেও নজর বুলিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা।সাপ্তাহিক দুই দিন ছুটির পর যেন আজ রবিবারটা উঠতে একটু দেরিই হয়েছে তার।তবে গত রাতে বন্ধুদের সাথে মিলে হৈহুল্লোড় ও ম'দ্দ পান যেন সেই দেরি হওয়ার মূল কারণ।
লিফটে উঠে হাফ ছেড়ে যেন বাঁচল রাতুল।পূণরায় হাতের ঘড়িতে নজর দিল।অতটাও দেরি হয়নি।কিন্তু দেরি হলেও ততটা চিন্তা করার প্রয়োজন ছিল না তার।কিছু মাস কম প্রায় এক বছর হতে চলল তার এই কোম্পানিতে জয়েন করার।এই কয়মাসে সবার নজরে ভালোই পড়েছে ছেলেটা।আর পড়বেই বা না কেন?নিজেকে যে এক দুর্দান্ত স্টাফ হিসেবে গড়ে তুলেছে সে।ছেলেটা যে সেই কলেজের সময় থেকেই ভালো স্টুডেন্টের নাম কামিয়ে আসছে।আর তুখার স্টুডেন্ট না হলে কি ভার্সিটির সি.জি.পি.এ এতো ভালো হয়?আর ভিভাসফটের মতো কোম্পানিই বা কি তাকে হায়ার করতো?ছেলেটার ট্যালেন্টের জন্যই যেন ভালো এক কোম্পানিতে চাকরি পাওয়ার সাথে পজিশনটাও অনেক ভালো পেয়েছে।
লিফট রাতুলের প্রত্যাশিত ফ্লোরে থামতেই বেড়িয়ে এলো সে।রিসিপশনের মেয়েটাকে দেখা মাত্রই এক চোখ টিপে মুখে মুচকি হাসি নিয়েই 'হাই' বলল রাতুল।রাতুলের সেই কর্ম দেখে প্রতিদিনের মতোই রিসিপশনের মেয়েটি হালকা হেসে উঠে হাত নাড়ালো।নিজের কাঙ্খিত স্থানে পৌঁছানোর পূর্ব পর্যন্ত অনেক সহকর্মীদের সাথেই দেখা হলো রাতুলের।তবে মেয়েদের সংখ্যাটা যেন একটু বেশিই বলা যায়।অফিসে এক ভালো মানের স্টাফ হওয়ার পাশাপাশি মেয়েদের কাছেও যে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে।সেটা সৎ কি অসৎ , কে-ই বা জানে?কিন্তু প্রায় মেয়েই যেন বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান রাতুলের কাছে নিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
নিজের চেয়ারটাতে বসেই আড়মোড়া ভাঙতে লাগলো রাতুল।ভারী শ্বাস ফেলে কেবলই সামনের কম্পিউটারটা চালু করতে যাবে,এমন সময় হাতের ডান পাশে রাখা ল্যান্ড ফোনে এক কল ঢুকলো।কোনো দ্বিধা ছাড়াই সেটা তুলে কানে চেপে ধরল সে।অতঃপর ডাক পড়ল ম্যানেজারের রুমে যাওয়ার জন্য।শার্টের হাতা ঝাড়তে নিয়েই ম্যানেজারের রুমের দিকে এগোলো।নক করে রুমে মাথা ঢুকিয়ে দিল সে,
"আসবো স্যার?"
অফিসের ম্যানেজার যেন ভারী এক চিন্তায় মগ্ন ছিলেন।রাতুলের ডাকে ভড়কে উঠে সেদিকে ঘুরলেন তিনি।অতঃপর মুখে সুক্ষ্ম হাসি নিয়েই রাতুলকে ভেতরে ঢুকতে বললেন।রাতুল চেয়ারে বসার পর মুহুর্তেই কিছু বললেন না অফিসের ম্যানেজার।তিনি যেন সময় নিচ্ছেন বেশ।যার দরুন রাতুলই মুখে হালকা হাসি নিয়ে বলে উঠল,
"স্যার,কোনো সমস্যা হয়েছে?"
ভারী শ্বাস ফেলে রাতুলের দিকে তার ডিসমিসাল লেটারটা এগিয়ে দিলেন অফিসের ম্যানেজার,
"এটা তোমার.......ডিসমিসাল লেটার"
টেবিলের খামের দিকে চোখ পড়তেই আত্মা শুকিয়ে এলো রাতুলের।বিস্ময়ে ভরা সেই চোখ জোড়া নিয়েই সামনের ব্যক্তিকে দেখলো সে।ম্যানেজারের মুখের সুক্ষ্ম হাসি তো নেই,বরং ভারী অন্ধকার বিরাজ করছে সেই চেহারায়।এতো বড় ধাক্কা পেয়েও নিজেকে হালকা সংযত করে ভাঙা গলায় শুধালো রাতুল,
"কেন স্যার?"
সরল উত্তর ম্যানেজারের,
"আমার জানা নেই।কোম্পানির নতুন সি.ই.ও. গত সপ্তাহেই জয়েন করেছেন।সেখান থেকেই অর্ডার এসেছে"
রাতুল নজর ঘুরিয়ে নিম্নাষ্ঠ ভিজিয়ে নিল।অতঃপর আবার সামনে দেখে বলে উঠলো,
"আর কতজনকে ডিসমিসাল লেটার দিয়েছে?"
ভারী গলায় শুধালেন ম্যানেজার,
"আর কাউকে না।শুধু তোমাকেই"
এবার যেন শ্বাসটা নিতেও ভারী কষ্ট হচ্ছে রাতুলের।তবুও হালকা জোর গলায় বলে উঠল,
"ফাজলামো পেয়েছেন?হঠাৎ আমাকে ফায়ার করার মানেটা কি?তাও আবার ডিসমিসাল লেটার দিয়ে!"
ম্যানেজার পর মুহুর্তেই কিছু বললেন না।রাতুল একটু চুপ হতেই শুধালেন তিনি,
"একটু শান্ত হও রাতুল।আমিও সেটাই ভাবছি যে তোমাকে কেন ফায়ার করল?ডিসমিসাল লেটারটা হাতে পেয়ে আমিও বেশ অবাক হয়েছিলাম।তাই তো সরাসরি সি.ই.ও. স্যারের কাছে গিয়েছিলাম।তিনি তেমন কিছুই বললেন না।শুধু বললেন যাকে ডিসমিসাল লেটার দেওয়া হয়েছে তার কোনো সমস্যা থাকলে যেন স্যারের সাথে দেখা করে"
আবার চেচিয়ে উঠলো রাতুল,
"তেমন কিছু বলেনি মানে?আর আমি এমন কি খারাপ কাজ করেছি যে নতুন সি.ই.ও. জয়েন হয়েই আমাকে ডিসমিসাল লেটার দিচ্ছেন?"
ম্যানেজার যেন বুঝলেন রাতুলের বর্তমান অবস্থা,
"মাথাটা একটু ঠান্ডা করো রাতুল।আমার মনে হয় স্যারের সাথে তোমার সরাসরি এ ব্যাপারে কথা বলা উচিৎ "
দেরি করল না রাতুল।টেবিল থেকে খামটা শক্ত হাতেই তুলে নিয়ে সি.ই.ও. এর কেবিনের দিকে এগুতে লাগলো।সকালের পরিপাটি করে পরা টাইটা এখন অসহ্য লাগছে তার।ইতোমধ্যেই ঘামতে শুরু করেছে সে।উপযুক্ত কোনো কারণই যেন খুঁজে পাচ্ছে না সে।কোন কারণে তাকে চাকরি থেকে বের করা হচ্ছে,তাও আবার ডিসমিসাল লেটার দিয়ে?
ডিসমিসাল লেটার যে কতটা ক্ষতিকর হয়ে উঠবে রাতুলের জন্য তা ভাবার বাইরে।এই লেটারখানা অন্য কোনো কোম্পানি দেখলেই যে আর রাতুলকে নিতেই চাইবে না।আগের কোম্পানিতে যদি আচরণগত দিক থেকে বাজেভাবে কোনো স্টাফ কোনো খারাপ কিছু করতে গিয়ে ফেসে যায় ,একমাত্র তখনই এই ডিসমিসাল লেটারটা দেওয়া হয়।যেন পরবর্তীতে অন্য কোম্পানির ইন্টারভিউ-এ গিয়ে সেটা তাদের চোখ না এড়িয়ে যায়।এক কথায় ডিসমিসাল লেটার একবার কেউ পেলে তার পুরো ক্যারিয়ার ধ্বংস।
কেবিনের দরজায় নক করে ক্ষণিক সময় দাঁড়িয়ে থাকলো রাতুল।কিন্তু কোনো সাড়া শব্দ নেই।তাই আবার নক করল।আবারো বেশ সময় নিল।তবে ভেতরে ঢুকার অনুমতি পেল।জোর পায়ে রুমে ঢুকেই সি.ই.ও. এর চেয়ারের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলতে লাগলো রাতুল,
"সরি স্যার,আপনাকে অসময় যদি আমি ডিস্টার্ব করে থাকি।কিন্তু হঠাৎ শুধু আমাকেই কেন ডিসমিসাল লেটার দেওয়া হলো?আমি তো কোনো উপযুক্ত কারণ দেখছি না।আই থিংক উই শুড ডিস্কাস অন দিস ম্যাটার"
সি.ই.ও. পদের বড় লেদার চেয়ারটা টেবিলের পেছনের দেয়ালের দিকে ঘুরানো আছে।তাই তো রাতুলের নজরে নতুন সি.ই.ও. -এর চেহারার এখনো দর্শন মিলল না।কিন্তু রাতুল তার কথা শেষ করেই হালকা হাসফাস করতে শুরু করেছে।হয়তো চেয়ারে বসা ব্যক্তির প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা সুঁই ফুড়ছে রাতুলের বুকে।
রাতুলের কথার পর মুহুর্তেই সামনে থেকে কোনো উত্তর এলো না।আর না দেখা গেল কোনো নড়াচড়া।কিন্তু সময় নিয়েই চেয়ারখানা ঘুরিয়ে বসলো নতুন সি.ই.ও.।হয়তো সেই ব্যক্তি রাতুলের মুখের ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে চাওয়ায় বেশ ইচ্ছুক।কারণ তার ঠোঁটের কোণে যে সুক্ষ্ম এক হাসি ঝুলছে।
চেয়ারখানা ঘুরার পরপরই চিনতে পারলো না রাতুল।কিন্তু চেয়ারে বসে ঠোঁট বাকিয়ে রাখা ব্যক্তির দিকে ক্ষণিক সময় দেখে থাকতেই রাতুলের চোখ জোড়া বড় হয়ে আসার সাথে নজরও কাপতে লাগলো।বসুন্ধরা শপিংমলে রবির হাতে যেই দাবড়ানিটা খেয়েছিল তাতে সেই চেহারা যেন সহজে ভুলার নয়।রবিকে সি.ই.ও. এর চেয়ারে দেখে যেন বিস্ময়ের শেষ চূড়ায় গিয়ে পৌঁছালো রাতুল।অবাকের চোটে নাকি ভয়ের চোটে, কে জানে?দুই ধাপ পিছাতে বাধ্য হলো সে।
রাতুলের এমন আচরণ দেখে যেন বেশ মজাই পেল রবি।হাসতে থাকা ঠোঁটের নিচে তর্জনী আঙ্গুল ঘষে শুধালো সে,
"কি হলো মিস্টার রাতুল?আপনি যেন কি বলছিলেন?"
রাতুল বিষয়টা যেন এবার একটু হলেও আন্দাজ করতে পারলো,যে শুধু তাকেই কেন ডিসমিসাল লেটার দেওয়া হয়েছে।কিন্তু তারপরেও কোনো মতে নিজেকে সংযত করে বলে উঠল,
"আমি আমার ডিসমিসাল লেটারের কথা বলছি,স্যার।অফিসে আমার এমন কোনো রেকর্ড নেই,যার কারণে আমাকে এই ডিসমিসাল লেটারটা দেওয়া হয়েছে"
"ডিসমিসাল লেটার অফিসের কোনো কারণে যে দেওয়া হয়েছে,সেটা কে বলল?"
কন্ঠটা রবির ছিল না।রবি তো সেই তখন থেকে রাতুলের দিকে দেখে সুক্ষ্ম হেসেই যাচ্ছে।সেই ভারী গাম্ভীর্য পুরুষালী কন্ঠ যে রাতুলের পেছন থেকে এসেছে।
লম্বাটে কেবিনটার এক দিকে দরজা।যার কাছেই সি.ই.ও.-এর টেবিলটা বসানো।ওপরপাশটা যেন সুন্দর আসবাবপত্র দিয়ে সাজিয়ে রাখা।রাতুল যান্ত্রিকভাবে ঘুরতে নিয়েই সেখানকার এক সোফায় নজর দিল।
কেউ একজন খুব আয়েশেই সেই লম্বা সোফাটায় শুয়ে আছে।রাতুলের নজরে আসছে সু জুতার তলদেশ।পদতলে জড়ানো ডারবি সু জুতার উপরে ব্লাক ফরমাল প্যান্ট পরিহিত।সেই প্যান্টে আবৃত এক পা সটান হয়ে থাকলেও আরেক পা ভাজ হয়ে দাঁড়িয়ে হাটুখানা সোফার হেলান দেওয়ার জায়গায় ঠেকিয়ে দেওয়া।পড়নের মেরুন রঙের শার্টের মতোই একখানা ম্যাগাজিন দিয়ে পুরো মুখোমন্ডল ঢেকে রাখা সেই ব্যক্তির।শার্টের হাতা ফোল্ড করা black rado jubile ঘড়ি চাপানো বাম হাতখানা পেটের উপর থাকলেও আরেক হাত মাথার কাছের সোফার হাতলটায় এলিয়ে দেওয়া রয়েছে।যে কেউ দেখেই বলবে যে সেই ব্যক্তি ম্যাগাজিন দিয়ে মুখোমন্ডল ঢেকে বেশ কিছুক্ষণ থেকেই আরামের সহিত ঘুমে বিভোর ছিল।সেই ভারী গাম্ভীর্য কন্ঠ না শুনা গেলে হয়তো এখনো দেখে মনে হতো যে সেই ব্যক্তি ঘুমেই বিভোর আছে।
রাতুল নিশ্চিত হতেই সোফার দিকে দেখে ভ্রু কুচকালো,
"সরি?কি বললেন আপনি?"
ডান হাতখানা নড়িয়ে মুখের উপরের ম্যাগাজিনটা সময় নিয়েই সড়ালো সাহিত্য।যেই ম্যাগাজিনখানার এক আর্টিকেল বেশ কিছুক্ষণ থেকেই পড়ছিল সে।F.S. গ্রুপ এন্ড ইন্ডাস্ট্রির আর্টিকেলটার পাশে ফাহাদ শেখের পায়ের উপর পা তুলে বসা একটা সুন্দর ছবি।নিজের চাচা কম হবু শশুরের কোম্পানির আর্টিকেল পড়ে হয়তো মজাই পাইছিল সাহিত্য।সেই ম্যাগাজিন সড়তেই দেখা মিলল সাহিত্যের চেহারার সেই কুটিল হাসির।ম্যাগাজিনখানা টি-টেবিলের উপর রেখে আবার ডান হাতখানা আগের স্থানে ঠাই পেল।সেই হাতখানা মাথার কাছে রাখতে নিয়েই আবার একই কথা বলল সাহিত্য,
"ডিসমিসাল লেটার অফিসের কোনো কারণে যে দেওয়া হয়েছে,সেটা কে বলল?"
রাতুল সেদিন শপিংমলে সাহিত্যকে সেভাবে দেখেনি।কিন্তু আন্দাজ করল যে সামনের এই ব্যক্তি সেই ব্যক্তিই হবে।এরকম একটা অহেতুক কারণে যে নিজের চাকরি হারাচ্ছে সেটা ভেবেই যেন এবার মাথায় রাগ উঠছে রাতুলের।ভারী কন্ঠে বলল সে,
"আফিস থেকে বের করার জন্য তো অফিসেরই কোনো কারণ হওয়ার কথা।এখানে পার্সোনাল কারণ কেমন করে আসছে?"
এবার আর শুয়ে থাকলো না সাহিত্য।এক ঝটকায় উঠে বসলো।কুটিল হাসিটা যে এখনো বিদ্যমান সেই সুন্দর চেহারাখানায়,
"পার্সোনাল বিষয় সামলাতে হবে দেখেই তো কোম্পানিটা পার্সোনাল করে নিয়েছি"
ভ্রু কুচকালো রাতুল,
"মানে?কে হন আপনি?কোম্পানির সি.ই.ও. তো এখানে বসে আছে।কোন অধিকারে নিজের পার্সোনাল ইস্যু এখানে দেখাচ্ছেন?"
রাতুলের পেছন থেকে রবি হাত ওয়েভ করে রাতুলের দৃষ্টি আকর্ষণ করল,
"হ্যালো,মিস্টার রাতুল।এদিকে দেখেন।আমি শুধু এই কোম্পানির সি.ই.ও।আর আপনার ওইপাশে যে ব্যক্তি বসে আছে সে এই কোম্পানির ওনার।সেই ব্যক্তিই আমাকে এই কোম্পানির সি.ই.ও. বানিয়েছে।তো একটু সাবধানে কথা বলিয়েন"
রাতুল যেন প্রতি মুহুর্তেই সুক্ষ্ম হার্ট স্ট্রো'কের শি'কার হচ্ছে কয়েক মুহুর্ত থেকেই।সে আবার সাহিত্যের দিকে নজর দিল।সাহিত্য এতক্ষণে ঠিক হয়ে বসে পায়ের উপর পা চড়িয়ে দিয়েছে।কিন্তু রাতুলের নজরে পড়ছে শুধু সাহিত্যের চেহারার এক সাইডখানাই।
কে এই ব্যক্তি?কল্পনার সাথে তার সম্পর্কটাই বা কি,যে এতো সুক্ষ্ম এক বিষয় সামলাতে এতো বড় কোম্পানি কিনে নিয়েছে?ভিভাসফট কোম্পানি কিনে নেওয়া কোনো চাট্টিখানি কথা নাকি?এই ব্যক্তির পাওয়ার কি এতোই বেশি,যে দোকানে ফল কেনার মতোই এক নামি-দামি কোম্পানিকে কিনে নিয়েছে?
রাতুলের ভাবনায় তৈরি হওয়া এতো প্রশ্ন যেন তার চেহারায় স্পষ্ট।কিন্তু সাহিত্য রাতুলের দিকে না দেখে মাথা সোজা রেখেই তার মনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বলে উঠল,
"আমার ব্যাপারে বেশি চিন্তা করো না......তোমার মাথা কুলাতে পারবে না"
শেষের কথাটা রাতুলের দিকে মাথা ঘুরিয়েই বলে উঠল সাহিত্য।তার ভারী গলার সাথে যেন এবার অগ্নিকান্ডে জ্বলতে থাকা অক্ষি জোড়াও সঙ্গ দিল।যার দরুন রাতুলের ভাবনার ইতি ঘটতে বাধ্য করে দিল সেই অক্ষি জোড়া।
ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়েই মাথা নিচু করে নিল রাতুল।হাতের ডিসমিসাল লেটারখানা চেপে আছে তার শক্ত মুঠোয়।ক্ষণিক সময় নিয়ে ভাঙা গলায় বলল সে,
"আমি এটা মানবো না।আমি আমার ট্যালেন্ট দিয়ে এই কোম্পানিতে জয়েন করেছি।হাউ ডেয়ার ইউ ফায়ার মি লাইক দিস!"
শেষের কথাটা জোর গলায় বলল রাতুল।মাথা তুলে সাহিত্যের দিকেও তাকালো।কিন্তু সাহিত্যের যেন কোনো হেলদোলই নেই।এক পা তো আগে থেকেই আরেক পায়ের উপর চড়িয়ে রেখেছিল।এবার হাত দুটোও সোফার উপরের দিকে এলিয়ে দিল।অতঃপর রাতুলের দিকে দেখে শান্ত স্বরে শুধালো,
"নষ্ট চরিত্রের ট্যালেন্টে খুব তাড়াতাড়ি ছাতা পড়ে"
সাহিত্যের এহেন কথায় রবি ফিক করেই হেসে উঠল।কিন্তু পর মুহুর্তেই ভড়কে উঠে গলা খাকাড়ি দিল সে।
সাহিত্যের দিকে দেখে কটমটিয়ে উঠলো রাতুল,
"ছাতা পড়ে কি পড়ে না সেটা আমি দেখে নিব।বাট ইউ হ্যাভ নো রাইটস টু ফায়ার মি!"
"এ্যান্ড ইউ হ্যাভ নো রাইটস টু টাচ মাই ওমেন!!!"
রাতুলের কন্ঠের তিন গুণ স্বরে গর্জে উঠল সাহিত্য।সাহিত্যের সেই গর্জনে রাতুল আবারো একটু পিছাতে বাধ্য হলো।সুক্ষ্ম এক বিরতির পর সাহিত্য আবার গর্জে উঠল,
"ব্লা'ডি বা'স্টার্ড!!কল্পনার কাছে যাওয়ার সাহস কেমন করে হয় তোর!!কে লাগিস তুই কল্পনার?"
শরীরের লোমগুলো যেন শিরশিরিয়ে উঠল রাতুলের।তারপরেও বলে উঠল সে,
"আমার কথা বাদ দে!তুই কি লাগিস ওর?"
রাতুলের তুই-তুকারি শুনে মেকি হাসলো সাহিত্য,
"মুখ সামলে ছেলে।ওয়াচ ইয়র টোন।হাসবেন্ড হই আমি কল্পনার।আমার বউয়ের গায়ে হাত দিয়েছিস তুই।যেই হাত দিয়ে এখন নিজের ডিসমিসাল লেটারটা ধরে আছিস"
বউ না হওয়া সত্ত্বেও প্রেয়সীকে নিজের বউ সম্মোধন করা সাহিত্যের দিকে কটমটিয়ে দেখতে লাগলো রাতুল।তার হাতের মুঠটা আরো শক্ত করে ধরল সে।রাগ মাথায় চড়চড়িয়ে উঠার পরেও যেন কিছু বলতে পারছে না।কল্পনার বিয়ে কবে হলো সেটা যেন কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না তার।আর বিয়ে করলেও কি এক দানবকে বিয়ে করেছে!যে কিনা কল্পনার উপর হালকা আঁচড় পড়ায় সব পুড়িয়ে রাখ করে ছাড়ছে।যেই রাখের মধ্যে যে রাতুল নিজেই উপস্থিত।নিজের সুক্ষ্ম বুদ্ধি খাটিয়ে এবার নিজেকে বাঁচার হালকা চেষ্টা চালালো রাতুল।গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
"আচ্ছা মানলাম আমাকে এই কোম্পানি থেকে ফায়ার করবেন।কিন্তু আমার ডিসমিসাল লেটারটা চেঞ্জ করে নিন।তাহলে আমি আর কোনো দিন কল্পনার সামনেও যাবো না"
সাহিত্য আবারো মেকি হাসলো।কিন্তু পর মুহুর্তেই গম্ভীর মুখোশ্রি নিয়ে শুধালো সে,
"বেগ ফর ইট"
তড়িৎ বেগে মাথা তুলল রাতুল।সাহিত্য এখনে কি বলল সেটা যেন আশ্চর্য লাগলো তার কাছে।ভিক্ষা?সাহিত্য কি রাতুলকে তার কাছে ভিক্ষা চাইতে বলছে?ভ্রু কুচকে ধীমি কন্ঠে বলে উঠল রাতুল,
"কিহ্?"
সাহিত্য আবার একই কন্ঠে শুধালো,
"আই সেইড,বেগ ফর ইট"
রাতুল আবারো সাহিত্যের মুখে সেই কথা শুনে বেশ ভড়কালো।সময় নিয়ে এলোমেলো নজর ফেলতে লাগলো সে।
আর এদিকে চোখের আড়ালে রবি সাহিত্যের সেই কথা শুনে ফোন বের করে ভিডিও অন করে দিয়েছে।অয়ন আর রাজকে এই জিনিস থেকে কিছুতেই বঞ্চিত করা যাবে না।সাথে আবার ভিকিকেও তো পাঠাতে হবে।ভিকিও একটু দেখুক যে তার বেস্টফ্রেন্ডটা প্রেমে কি পরিমাণে পা'গল হওয়ার সাথে হিং'স্রও হয়ে উঠেছে।
আর যেন কোনো উপায় বাকি নেই রাতুলের কাছে।নিজের চোয়াল শক্ত করে সময় নিয়েই সুক্ষ্ম আওয়াজে বলে উঠল,
"স্যার...........প্লিজ"
সোফায় মাথা এলিয়ে দিল সাহিত্য।অতঃপর রবিকে উদ্দেশ্য করে উঁচু গলায় বলে উঠল,
"রবি রে।শুনা যায়?"
পরপরই রবি বলে উঠল,
"আমি তো একদমই শুনতে পারিনি।একটু কাছে গিয়ে বললে ভালো হতো না?"
রাতুল ভালো করেই বুঝলো রবি কি বুঝাচ্ছে।আবারো সময় নিয়ে সাহিত্যের সামনে গিয়ে দাড়ালো সে।মেঝের দিকে নজর রেখেই বলে উঠল,
"স্যার...প্লিজ"
সাহিত্য মাথা তুলে রাতুলের দিকে দেখলো।অতঃপর খুবই শান্ত স্বরেই বলল,
"অত উপর থেকে শব্দ আমার কানে পৌঁছাচ্ছে না।হাঁটুটা একটু ভাজ করা যায় না?"
রাতুলের র'ক্ত যেন মাথায় উঠল সাহিত্যের কথা শুনে।কিন্তু তারপরেও মাথা তুলল না।সাহিত্য যে একদম রাতুলের দুর্বল জায়গাটায় হাত দিয়েছে।নিজের ক্যারিয়ার বাঁচাতেই যেন রাতুল বাধ্য ছেলের মতোই হাঁটু ভেঙে সাহিত্যের সামনে বসে পড়ল।ভাঙা গলা নিয়ে আবারো বলতে লাগলো,
"প্লিজ স্যার।আমার পুরো ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যাবে।ডিসমিসাল লেটারটা চেঞ্জ করে নিন"
সাহিত্য কিছু বলল না।মেকি হাসলো শুধু।কিন্তু এবার হালকা শব্দ হলো সেই হাসির।যেই হাসিখানার শব্দ কল্পনার কানে বড়ই সু-মধুর লাগে।
ধীরে ধীরে নিজের হাসি সুক্ষ্ম করল সাহিত্য।অতঃপর রাতুলকে সম্মানহানির শেষ চূড়ায় নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই হয়তো নিজের তুলে রাখা বাম পা-টা রাতুলের মুখো-মন্ডলের অনেক নিকট ঘেঁষেই নামালো।পরপরই দুই হাতের কনুই দুই হাঁটুতে ঠেকিয়ে রাতুলের দিকে অনেকটাই ঝুকে এলো।ভারী কন্ঠে কটমট করে উঠল সে,
"আমি এখানে কোনো ডিল করতে আসিনি।আমি আমার ডিসিশন শুনাতে এসেছি।তুই কল্পনার উপর শুধু একবারই নজর দিতে পেরেছিলি।দ্বিতীয়বারের কথা তুই চিন্তাও করতে পারবি না।কাকে পায়ের নিচে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছিলি সেটা ভালো করে দেখা উচিৎ ছিল তোর।বাট ইয়র ব্লা'ডি ফা'কিং ব্যাড লাক।আমার হাতে পড়াই তোর ভাগ্যে ছিল"
প্রকৃতিকে নানাভাবে ধ্বংস করার পরেও যেন কিছু সময় এই প্রকৃতি মায়া দেখিয়ে মানুষজাতিকে ক্ষমা করে দিতে সক্ষম হয়।তাই তো ধরণীতে মানুষ এখনো শ্বাস নিতে পারছে।কিন্তু কেউ যদি একবার সাহিত্যের কোনো কিছু ধ্বংস করার চিন্তাও করে তাহলে সেই ব্যক্তি হয়তো ক্ষমার ছিটেফোঁটাও দেখতে পারে না।এতোটাই নির্দয় এই অহিয়াম শেখ সাহিত্য।তবে তার প্রেয়সীর ব্যাপার এলে যে সেই নির্দয়তা ভয়ানকভাবেই বেড়ে যায়।
কেবিন থেকে বেড়িয়ে ডিসমিসাল লেটারটার উপরেই নিজের সব রাগ ঝাড়লো রাতুল।অতঃপর মাথার চুলগুলো যেন টানতে লাগলো।সব শেষ।তার জীবন পুরোপুরি শেষ হয়ে গেল এক মুহুর্তেই।আর সেটা তার একটা মাত্র ভুলের কারণে।কল্পনা তার জীবনে যে এমন এক তুফানের সৃষ্টি করবে সেটা যেন ভাবনারও বাইরে ছিল রাতুলের কাছে।শুধু এক মেয়েকে অসৎভাবে কাছে পাওয়ার ইচ্ছাটাই যেন সব ধ্বংস করে দিল।
গলার টাইটা টানটে নিয়েই ভারী পা ফেলে লিফটের দিকে এগোলো রাতুল।আর এদিকে হল রুমটার টিভিতে এক মেয়ে সাংবাদিকের কন্ঠের উচ্চ আওয়াজ অফিসে উপস্থিত সবার কানেই বাজতে লাগলো,
"আজকের তাজা খবর।দেশের নামি-দামি কোম্পানি,ভিভাসফট গত সপ্তাহেই তার নতুন মালিকের হাতে গিয়েছে।ভিভাসফট কোম্পানির নতুন ওনার,O.S.S. কোম্পানির সি.ই.ও. মিস্টার অহিয়াম শেখ সাহিত্য।এবং ভিভাসফট কোম্পানির নতুন সি.ই.ও. মিস্টার রবি আহম্মেদ।গত সপ্তাহেই ভিভাসফট কোম্পানির প্রাক্তন ওনার অফিসিয়ালি পুরো কোম্পানির দায়ভার মিস্টার অহিয়াম শেখ সাহিত্যকে হস্তান্তর করেন"
#চলবে