#পর্ব_৫১
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
রাত এখন বাজে ১২:৩০।সাধারণত মধ্য রাত বলা হয়ে থাকে এই সময়টাকে।তবে শীতের সময় যেন আরো বেশি গভীর মনে হয় এই সময়টা।কিন্তু সেই বিষয়টা সম্পুর্ণ উপেক্ষা করে কল্পনা আর অনু নুডুলস আর চা হাতে নিয়ে ছাদের দিকে এগুচ্ছে।
ট্রে ভর্তি নুডুলসের বাটি হাতে নিয়ে কোনো রকম রান্নাঘরের লাইট নিভিয়ে চুপিচুপি কল্পনার পিছু হাটা দিল অনু।নিচতলার কেউ যেন তাদের উপস্থিতি টের না পায় তাই তো সে কাজ করা।লিভিং রুমের হালকা ড্রিম লাইটের আলোটাই শুধু রাতের বেলা জ্বালানো থাকে।সেই নিভু আলোতে কল্পনা হাতে চায়ের ট্রে নিয়ে দক্ষ পায়ে সামনে এগুচ্ছে।তবে অনুর মধ্যে অত দক্ষতা দেখা যাচ্ছে না।সে তো আধারের মাঝে কল্পনাকেই অনুসরণ করতে ব্যস্ত।
দোতলায় উঠে এবার ফোনের ফ্লাশ লাইট জ্বালিয়ে ছাদে পা রাখলো কল্পনা।শীতের ঠান্ডা হাওয়াকে উপেক্ষা করা যেন কোনোভাবেই সম্ভব হলো না।যার দরুন কাপতে নিয়েই ছাদের একপাশের ছাউনি দিয়ে ঘিড়ে রাখার মতো বসার জায়গায় গিয়ে থামলো।এখানটায় বাইরের ঠান্ডাটা তেমন নেই বললেই চলে।শীতে ছাদে বসার সুবিধার্থেই যে এই জায়গাখানা বানানো।
কল্পনা আর অনুকে আসতে দেখেই উঠে দাড়ালো অন্ত,
"চার বাটি নুডুলস বানাতে তোদের এতক্ষণ লাগে?"
সাহিত্য মেঝেতে এক হাটু গেড়ে বসে ম্যাচ দিয়ে ফায়ারবক্সে আগুন ধরানোর চেষ্টায় নিয়জিত ছিল।অন্তর কথায় মাথা তুলল সে।সিমেন্টের তৈরি বসার জায়গায় হাতের ট্রে রাখতে নিয়েই বলে উঠল কল্পনা,
"নাহয় নুডুলসের প্যাকেটের গায়ে লিখা আছে ২মিনিটে হয়ে যাবে,তাই বলে কি আসলেই ২মিনিটে হবে?খারাপ হলে তো তখন আমার হাতের রান্নার খুঁত ধরতে তুমি"
ঠান্ডায় শরীর কেপে উঠল অন্তর,
"আমি তোকে আগেই বলেছি কি করবি তাড়াতাড়ি কর।গ্রুপের মধ্যে ওমন লেট নাইট পার্টির কথা বলার সময়ই সব ঠিক করে রাখবি না?"
কল্পনা গায়ে মোড়ানো শালটা আরো একটু জড়িয়ে নিল,
"আমি কি জানতাম যে চা ছাড়াও নুডুলসও খাবে তোমরা?আমি শুধু চা খাওয়ার ইনভিটেশন পাঠিয়েছিলাম গ্রুপে"
ভাই-বোনের এমন কান্ড দেখেও যেন শরীরে জোর পেল না অনু।বেশ বড় একটা হামি তুলল।তার তো এখন মনে হচ্ছে এই চার বাদর মিলে যে একটা হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ খুলেছে সেটার নোটিফিকেশন মিউট করে রাখার দরকার ছিল।অন্তত শান্তি মতো একটা ঘুম তো দিতে পারতো।
কল্পনা আর অন্তর মাঝ দিয়েই অনু পার হয়ে সাহিত্যের দিকে এগুলো।এদিকে সাহিত্য শত চেষ্টা করেও যেন বৃথা হলো আগুন জ্বালাতে।অন্ত অবশ্য বলেছিলই,যে ঠান্ডায় কাঠগুলো সব ড্যাম হয়ে গিয়েছে।হুট করে এমন না জ্বলাই স্বাভাবিক।কোনো উপায় না পেয়ে চাঁদের হালকা আলোতেই বসে পড়ল সবাই।এই ঠান্ডায় আবার নিচে গিয়ে চা গরম করে আনতে কল্পনা একদমই রাজি নয়।যার দরুন ব্যতিব্যস্ত হয়েই সবাই নুডুলস শেষ করে চায়ে মন দিল।
গরম চায়ের কাপের একটা বিশেষ গুণ আছে।আর সেটা হলো গভীর ভাবনায় মনোনিবেশ করা।একেক চুমুকে যেন মাথার শিরা-উপশিরারা ভালোই সচল হয়।এই মুহুর্তে মানুষের মুখ না চললেও মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে।নিজের জীবনের নানা বিষয় নিয়ে চিন্তা করার ইচ্ছা জাগে।যেমন এই মুহুর্তে সাহিত্যের মস্তিষ্ক ঘাটলেই দেখা যাবে এক ভিন্ন কথার চিন্তা।যা বর্তমানে তার গম্ভীর মুখোশ্রি থেকে একদমই ভিন্ন।
সাহিত্যের তেমন কোনো ইচ্ছা ছিল না এই ঠান্ডায় বাকি তিন পাগলের সাথে এখানে বসার।সে তো ভারী ব্যস্ত ছিল তার অফিসের কাজে।কিন্তু কল্পনাকে এক নজর দেখতে চাওয়ার লোভ সামলাতে না পেরেই রুম থেকে বেড়িয়ে পড়ে।কিন্তু এই আধারে বসে তার চাঁদের মতো প্রেয়সীর মুখ যেন খাক দেখতে পারছে সাহিত্য!তার উপর ডাকাতগুলোর মতো শরীরে শাল পেচিয়ে আছে কল্পনা।আর সাহিত্যের থেকে দূরত্ব তো চৌদ্দো হাতের কম হবে না।
সাহিত্য অবশ্য একটা জিনিস খেয়াল করেছে।কল্পনা তার সাথে একা থাকলে যে বাচ্চামো আচরণগুলো করে,তাদের মাঝে আরো কেউ থাকলে বেশ ম্যাচিউর হয়ে যায় মেয়েটা।এতো ভদ্র সেজে কি বুঝাতে চায় কল্পনা?যে সে সাহিত্যকে একটুও জ্বালাতন করে না?খুবই মাসুম বাচ্চা সে?সেটা ভাবলে যে বেশ হাসি পায় সাহিত্যের।বাচ্চাকাল থেকেই তো সাহিত্যের মাথা চিবিয়ে খাচ্ছে এই মেয়েটা।আর ইদানীং মাথার সাথে কলিজাটাও ছিড়ে খাচ্ছে।এতো নির্দয় কেমন করে হয় মানুষ?সাহিত্যকে একটু তো রেহাই দিক।সাহিত্যের কলিজাটা যেমন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে তেমন একটু ঠান্ডাও করে দিক।আর বেশি কিছু তো চাইছে না সাহিত্য।
অপরদিকে অন্ত তার পরীক্ষার চিন্তায় ব্যস্ত।ছাদে আসার আগে যেগুলো পড়ে এসেছিল সেগুলোই যেন মনের মধ্যে রিভিশন দিচ্ছে সে।পরীক্ষায় যে কিছুতেই খারাপ করা যাবে না।ভালো চাকরি পেতে হলে মাস্টার্সের রেজাল্টাটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কল্পনা স্বভাবতই ভাবছে তার বাবা আর বড় বাবাকে নিয়ে।লোক দুটো যেন জ্বালিয়ে মারছে কল্পনাকে।কোনো প্লান করলে অর্ধেক খেটে যেন বিফলে যায়।দুই শেখ আহমেদের যদি রাগটা না থাকতো তাহলে হয়তো কল্পনার জন্য একটু সুবিধা হতো।কিন্তু কল্পনার যেন পর মুহুর্তেই মনে পড়ল,যে কল্পনাকে এতো কিছু করতে হচ্ছেই তো সেই রাগের ভরাট কৌটোগুলোর কারণে।
এদের মাঝে অতি পিচ্চিজনের মাথায়ও এক চিন্তা ঘুরছে।তবে সেটা সে মনে দাবিয়ে না রেখে মুখে প্রকাশ করল।কল্পনার দিকে ঘুরে স্বাভাবিকভাবেই বলল অনু,
"আপু?"
নিজের চিন্তায় মগ্ন থেকে আনমনেই উত্তর দিল কল্পনা,
"হুম"
"একটা প্রশ্ন করি?"
"কর"
"তুমি অন্ত ভাইয়াকে তুমি করে ডাকো,কিন্তু সাহিত্য ভাইয়াকে আপনি করে কেন ডাকো?"
অনুর এমন কথায় সবার চায়ের চিন্তায় বিরতি পড়ল।কল্পনা তো পুরো হতবম্ব হয়ে গিয়েছে অনুর কথায়।তারপরেও আমতা-আমতা করতে লাগলো সে,
"কে-কেন,তুইও তো ডাকিস"
অনু মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করল,
"আহা,আমার কথাটা একটু আলাদা।আমি তো ল্যাদাকাল থেকেই অন্ত ভাইয়ার চুল টেনে বড় হয়েছি।যেখানে সাহিত্য ভাইয়ার ত্রিসীমানায় থাকতাম না আমি।কিন্তু তুমি তো আমার পুরো উল্টোটা"
কল্পনা কি বলবে এমনিতেও খুঁজে পাচ্ছে না।তার উপর অন্ত দুষ্টু হাসি মুখে নিয়ে বলে উঠল,
"আরে বুঝিস না?আমি কল্পনার আপন,আর ভাইয়া পর তো,তাই"
কল্পনার চা-টা আর গরম-গরম খাওয়া হলো না।হাতের মগ সাইডে রেখে বলে উঠলো সে,
"কি যে বলো না ভাইয়া।সেটা কেন হবে?এখানে আপন-পরের বিষয় কই থেকে আসছে?তুমি যেমন সাহিত্য ভাইও তেমন।আর এতো বছর একটু দূরে ছিল দেখে তুমি করে ডাকতে কেমন যেন অসম্মান করা বুঝায়"
কল্পনা বর্তমানে ভারী লজ্জায় পড়ে গেল।কি আজব এক বিষয়ে কথা চলছে।এই অনুটা অযৌক্তিক কথা যে কেন তুলে?মাঝখানে শুধু-শুধু কল্পনাকে লজ্জায় ফেলে দিল।
অন্ধকারের মাঝেও কল্পনা সাহিত্যকে আড় চোখে দেখল।সাহিত্য কেন জানি কোনো কথাই বলছে না।তার অবয়বটা ঠিক মূর্তির মতোই লাগছে।নিজের ভাবনায় তৈরি হওয়া সাহিত্যের মুখোশ্রি নিশ্চিত করতেই ফোনের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালাতেই "মা গো!" বলে বেশ ভড়কালো মেয়েটা।কল্পনা নাহয় ধারনা করেছিল যে সাহিত্য রেগে আছে দেখে অমন চুপ হয়ে আছে।কিন্তু এমন রাগের মাথায় ফুসতে নিয়ে যে কল্পনার দিকে অগ্নি দৃষ্টি বর্ষণ করে যাচ্ছে সেটাতেই যেন মেয়েটা হাতে-পায়ে লাফিয়ে উঠল।
অনু যেন অবশেষে বুঝতে পারলো কি পাপটাই না সে করে বসেছে।তবে অন্ত মিটিমিটি হেসে সাহিত্যের দিকে ঝুকে এলো,
"আরে বাদ দাও তো ভাইয়া।ও তোমাকে পর করে দিয়েছে তো কি হয়েছে,আমি তো আছি তোমার কাছে"
সাহিত্য কিছু বলল না।হাতের মগ সাইডে রেখে উঠে দাড়ালো।অতঃপর কল্পনার দিকে সুক্ষ্ম চোখ রেখেই স্থান ত্যাগ করল সে।সাহিত্য চলে যাওয়ার কিছু মুহুর্ত পর্যন্ত যেন স্তব্ধ রইল পরিবেশ।তারপরই কল্পনার গলা শোনা গেল,
"তোমরা দুজন পাগল হয়েছো নাকি!!অযথা ওসব বলার দরকার কি ছিল!সাহিত্য ভাই এমনিতেই কদিন থেকে আমার না কথাতেই ভড়কে উঠছে।আরো পেট্রোল ঢেলে দিলা??!!"
কথা শেষ করেই সাহিত্যের পেছনে ভো দৌড় লাগালো কল্পনা।সেদিক থেকে ঘুরে অন্তর দিকে নজর দিল অনু।ভ্রু কুচকে
শুধালো,
"আমি নাহয় একটু কিউরিসিটি নিয়ে বললাম কথাটা,তাই বলে তুমি এমন প্যাচ কেন লাগালে?"
মেকি হেসে চায়ে চুমুক বসালো অন্ত,
"মজা লাগে।তুই তো এই দুটোর আসল চেহারা দেখিসইনি।ছোট থাকতে এই দুটো যে কি পরিমাণে বিনোদন দিত!এটা ওদের জন্য নরমাল জিনিস"
কথার মাঝে হঠাৎই ভারী শ্বাস ফেলল অন্ত।অতঃপর শান্ত স্বরে শুধালো,
"এমন থাকলেই ভালো রে"
অনু যেন বুঝলো অন্তর কথার মানে।প্রথমদিকে সাহিত্যের সেই ভয়ানক চেহারা তো অনুর নজরেও পড়েছিল।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
কল্পনা সিড়ি ভেঙে নিচে নামতেই দেখলো সাহিত্য তার রুমের দরজার লকে হাত দিয়েছে।অমনি মেয়েটা পায়ের গতি আরো বাড়িয়ে সাহিত্যের কাছে গিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে উঠল,
"আপনি হঠাৎ চলে এলেন কেন?"
সাহিত্য ঘুরল না,
"থাকতে ইচ্ছে করছিল না,তাই"
সাহিত্যের গম্ভীর কন্ঠে যেন বেশ ভয় হলো কল্পনার।তারপরেও মিনমিনিয়ে বলল,
"রাগ করেছেন কি?"
এবার কল্পনার দিকে ভারী নজর ফেলল সাহিত্য,
"যার কাছে আমি পর তার উপর রাগ করে কেন থাকবো?"
চোখ-মুখ খিচে নিল কল্পনা।অতঃপর আবার সাহিত্যের দিকে নজর দিল,
"অমন করে কেন বলছেন?আমি আপনাকে সম্মান করি দেখেই তো 'আপনি' করে ডাকি।সেই ডাকটা ভালো লাগে আমার"
নিজের লজ্জা-শরম দাবিয়ে রেখেই কথাটা বলে মাথা নিচু করল কল্পনা।শেষের কথাটা মিনমিনিয়েই শুধালো।কিন্তু সাহিত্য গললো না কল্পনার কথায়।তার মাথায় তো আরেক কথা ঘুরছে।এবার কল্পনার দিকে পুরো ঘুরে দাড়ালো সে।হয়তো দাঁত চিবিয়েই বলল,
"তুই তো মাহিরকেও আপনি করে ডাকছিলি।তাহলে মাহির আর আমি কি তোর কাছে এক?"
সাহিত্য যে এখনো মাহিরকে বড্ড হিংসে করে সেটা কল্পনা না বুঝলেও সাহিত্যের চোখেমুখে স্পষ্ট।হঠাৎ মামাতো ভাই মাহিরের কথা শুনে ভড়কে উঠল কল্পনা,
"এখানে মাহির ভাইয়া কই থেকে আসছে!!তার সাথে তো দূরের সম্পর্ক।তো তাকে 'আপনি' করে ডাকবো নাতো কি করব?"
"ওই তো,ঘুরে ফিরে এক কথা।আমাকেও তো 'আপনি' করে ডাকিস।তার মানে আমিও দূরের কেউ"
কল্পনা যেন এবার মাথায় হাত চেপে বসলো।সাহিত্য যে বরাবরই এবার ছেলে মানুষি করছে।সাহিত্য অপেক্ষা না করে লক ঘুরিয়ে হালকা দরজা খুলল।অমনি কল্পনা সাহিত্যের এক হাত টেনে ধরল।চোখ খিচে বন্ধ করে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল সে,
"শুধু আপনাকেই যে আমি ভাইয়ার বদলে ভাই ডাকি সেটা খেয়াল করেছেন?সেটা তো দেখবেন না"
কল্পনার এবারের কথায় থমকালো সাহিত্য।আসলেই তো।কল্পনা সাহিত্যকে 'সাহিত্য ভাই' বলে ডাকে।কারণটা অবশ্য কখনো জানা হয়ে উঠেনি।সাহিত্য কল্পনার দিকে আবার নজর দিল,
"কেন ডাকিস?"
সাহিত্যের হাতটা ধরে রাখা কল্পনার হাত জোড়া ঢিলা হয়ে এলো।অধর জোড়া সুক্ষ্ম কাপতে লাগলো তার,
"ওই.....আসলে.....ইচ্ছা করে তাই ডাকি!!"
প্রথমের শব্দ দুটো মিনমিনিয়ে বললেও শেষের কথাটা কল্পনা গলা উঁচিয়েই বলল।
এতক্ষণ থেকে রাগের মাথায় প্রেয়সীর যেই সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করছিল সাহিত্য,এখন আর উপেক্ষা করার ইচ্ছা করছে না।কল্পনা নিশ্চয়ই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতে নিয়েই গ্রুপে চায়ের কথা বলে।কারণ কাধের একপাশ দিয়ে যে লম্বা বেনিখানা নেতিয়ে পড়ে আছে সেটা যে হালকা উষ্কখুষ্ক।শাল শরীরে পেচিয়ে নেওয়ায় ওড়না নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।কিন্তু সাহিত্যকে এতো কিছু বুঝাতে নিয়ে যে সেই প্রথম থেকেই শালের একপাশটা নেতিয়ে পড়ে গিয়েছে তাতে যেন বিন্দুমাত্র ভুরুক্ষেপ নেই কল্পনার।সাহিত্যের জায়গায় অন্য কোনো ছেলে থাকলে হয়তো কল্পনাকে এই মুহুর্তে লালসার নজরে দেখতো।তবে সাহিত্যের চোখের লক্ষ্য তো অন্যকিছুতেই আবদ্ধ।যেমন এই যে,কল্পনার নাকের ডগাটা ঠান্ডায় কেমন লাল হয়ে আছে।আর এতক্ষণ থেকে সাহিত্যকে বিভিন্নভাবে বুঝাতে গিয়ে যেন গাল দুটোও লাল হতে পিচপা বোধ করল না।
প্রেয়সীর এমন নূরানী চেহারা নিয়ে সাহিত্যের অনেক ভয় করে।সে নাহয় তার প্রেয়সীর বাহ্যিক দিকের তোয়াক্কা করে না।তার প্রেয়সী যেমন হতো তেমনই সাহিত্যের।কিন্তু অন্যের চোখে যে সহজেই পড়ে যায় তার প্রেয়সীটা।দুনিয়ার সবাই যে কল্পনার সাহিত্য ভাইয়ের মতো নয়।তবে কল্পনাকে কখনোই বেধে রাখবে না সাহিত্য।বাইরের দুনিয়া সামলানোর জন্য সাহিত্য তার প্রেয়সীর প্রথম ভরসা হবে।
সাহিত্য কল্পনার দিকে বেশ কিছুক্ষণ দেখে আছে বলে এবার কল্পনা নজর নিচু করে ফেলল।সাথে মিনমিনিয়ে আবারো শুধালো সে,
"আপনি কেন নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করেন?আমার কাছে অন্যরা আর আপনি কি এক?আকাশ-পাতাল তফাৎ আছে আপনার আর বাকিদের মধ্যে....এখন আবার জিজ্ঞেস করিয়েন না কেন.....কারণ আপনার জায়গা কেউ নিতে পারবে না"
কল্পনা তার পুরো কথাটাই মিনমিনিয়ে শুধালো। কিন্তু শেষের বাক্যখানা বেশ অস্ফুটই শুনালো তার মুখে।হয়তো মেয়েটা লজ্জা বোধ করছে,তাই।তবে সাহিত্যের অযৌক্তিক রাগ ভাঙাতে যেন লজ্জা ঠেলে সেটা বলতেই হলো।কিন্তু সাহিত্যের কানে যে কল্পনার পুরো কথাটা স্পষ্টই শোনা গেল।প্রেয়সীর এসব সুক্ষ্ম আওয়াজের বার্তাতেই যেন সাহিত্য তার কাঙ্ক্ষিত উত্তর খুঁজে পায়।
প্রতিবারের ন্যায় সাহিত্য আবারো একটু ঝুকে এলো কল্পনার
দিকে,
"আমি ভেবেছিলাম তোর হাতে বানানো ফালুদাটাই শুধু সুন্দর।কিন্তু এখন তো দেখছি মন ভালো করার মতো রান্না শিখেছিস তুই.......নুডুলস আর চা-টা মজা ছিল।আবার একদিন দাওয়াত দিস।তবে এবার রুমে দাওয়াত দিস।নাহলে চারজনেরই জ্বর ধরবে"
সাহিত্য কথা শেষে সোজা হয়ে দাড়াতেই কল্পনা আড় চোখে দেখল তাকে।সাহিত্যের মুখে হাসি দেখে সে-ও হালকা হেসে উঠল।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
ঢাকার শীত সাধারণত তেমন ভারী হয়না।বাকি এলাকার থেকে ঢাকার শীতটা দেরিতে আসে এবং তাড়াতাড়িই চলে যায়।তবে এ বছরটায় চিন্তার বাইরেও বেশি শীত বিরাজ করছে ঢাকার আবহাওয়ায়।অনেকটা শৈত্য প্রবাহ চলছে বললেও ভুল হবে না।
সেই ঠান্ডা থেকে নিজেকে রক্ষা করতেই মনে হয় সাহিত্য ইদানিং ব্লেজারের নিচে টার্টল নেক সোয়েটার পড়তে শুরু করেছে।শার্টের বদলে শরীরে চাপানো টার্টল নেক সোয়েটারে যেন ম্যানলিভাবখানা আরো বেশি করে ফুটে উঠে এই যুবকের।তবে কালো রঙা টার্টল নেক সোয়েটারটা একটু বেশিই মানায় ফর্সা ত্বকটার উপর।হয়তো সেজন্য প্রায় সময় কালো রঙা টার্টল নেক সোয়েটারগুলোতেই হাত পড়ে তার।
যেই ঠান্ডা হাওয়া থেকে রেহাই পেতেই এতো সোয়েটারের খেলা চলে শরীরের উপর,সেই ঠান্ডা হাওয়াকেই চিরে রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনটা শেখ ভিলার বাগানে ঘেরা রাস্তাটায় উঠে এলো।সময়টা বিকেলের দিক।তাই তো দুপুরের থেকে ঠান্ডাটা কম না হয়ে বরং বেড়েই চলেছে।
গাড়ি গ্যারেজে ঢুকতেই সাহিত্যের ফোনে এক নোটিফিকেশন ঢুকলো।গাড়িতে বসে থাকা অবস্থায় ফোনে নজর দিলেও গাড়ি থেকে বের হতে নিয়েই ইনবক্সে ঢুকলো সাহিত্য।ভিকির থেকে ম্যাসেজ এসেছে,
"শা'লা কই তুই?"
নজর ফোনের দিকে রেখেই ভিলার দিকে এগুলো সাহিত্য।সাথে ভিকির ম্যাসেজের উত্তরও দিল,
"বাসায়।কেন?"
পর মুহুর্তেই ভিকির ম্যাসেজ এলো,
"তো আমি কি মানুষের বাসায় বসে চা খাচ্ছি,যে তোর এখনো দেখা পাই না?"
বাড়ির বড় কাঠের ফটক পার করতে নিয়েই ভিকির সেই ম্যাসেজের দেখা মিলল সাহিত্যের।ভ্রু জোড়া কুচকানোর সাথে পায়ের গতিও সুক্ষ্ম হলো তার।সাহিত্য আর কিছু চিন্তা করতে পারবে তার আগেই ড্রইং রুম থেকে তোফায়েল শেখের গলা শুনা গেল,
"আরে ওই যে,সাহিত্য এসে গিয়েছে"
মাথা তুলল সাহিত্য।ড্রইং রুমের পরিবেশ খুবই জমজমাট দেখলো সে।তিন শেখ আহমেদের সঙ্গে তাদের স্ত্রীরাও উপস্থিত সেখানে।আশ্চর্যের বিষয় হলো সবার মুখেই মৃদু হাসি ঝুলছে।সাহিত্য হালকা ভড়কে উঠতেই যাবে,এমন সময় চোখ পড়ল সোফায় বসে থাকা আরো দুই ব্যক্তির দিকে।
হুমায়ূন সাহেব তার ভাগিনাকে দেখে ঠোঁটের হাসি সুক্ষ্ম বড় করলেও ভিকি সাহিত্যের দিকে দেখে সমানে ভ্রু নাচিয়ে যাচ্ছে।সাহিত্যের হাতের ফোনটাতে আবার একখানা ম্যাসেজ ঢুকলো।এবার আর ইনবক্সে ঢুকলো না সাহিত্য।ফোনের উপর থেকেই ভিকির ম্যাসেজটা দেখে নিল,
"দেখ রে!তোর বাপ আর শশুরকে একসাথে বসিয়েছি।আবার সেই তখন থেকে দাঁত বের করে হেসেও যাচ্ছে"
ফোন থেকে নজর সড়াতে নিয়েই সাহিত্য ড্রইং রুমের দিকে এগুলো।হুমায়ূন সাহেব তো এতো মাস পর ভাগিনাকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে বুকে টেনে নিলেন।তবে ভিকি উঠলো না।সাহিত্য তার পাশে এসে বসতেই হাত মেলালো শুধু।সাহিত্য অবশ্য বেশ অবাক হলো ভিকির আচরণে।এতো ভদ্র তো ভিকির হওয়ার কথা না।হয়তো এতো মানুষ দেখেই ভদ্রতা কায়েম করছে।
শেখ পরিবারের সব সদস্যদের একসাথে দেখে প্রথমে ভড়কালেও এখন স্বাভাবিক আছে সাহিত্য।কারণ ড্রইং রুমে সবাই উপস্থিত হয়েছে শেখ পরিবারের ভদ্রতার খাতিরে।বাইরের লোকের সামনে একে-অপরের সাথে মুখ ফুলিয়ে থাকার মতো অশিক্ষিত শেখ পরিবারের কোনো সদস্যই নয়।তবে যে একদম গলায়-গলায় পিরিত বনিয়ে রেখেছে তেমনটাও না।যেমন বর্তমানে শেখ পরিবারের সদস্যদের সোফায় বসার ধরন দেখলে বাইরের কোনো মানুষ না বুঝলেও সাহিত্য ভালো করেই বুঝলো।
ড্রইং রুমে উপস্থিত কিছুটা ইউ আকৃতির হাফ স্কয়ার শুভ্রা রঙা বড় সোফার একপাশে তোফায়েল শেখ ও হুমায়ূন সাহেব বসেছেন।তাদের মুখোমুখি হয়ে বসেছেন ফাহাদ শেখ ও রঞ্জক শেখ।আর তিন গিন্নিরা তো তাদের সোয়ামিদের গা ঘেঁষেই বসেছেন।মাঝখানটায় এতক্ষণ ভিকি একাই বসে ছিল।তাই তো বোর হয়েই সাহিত্যকে ম্যাসেজ করতে শুরু করে সে।
সোফায় বসা পুরুষেরা যেন আবার তাদের কথা চালু করলেন।হুমায়ূন সাহেব হাসতে নিয়েই শুধালেন,
"আমরা তো প্রথমে চিন্তা করেছিলাম যে কানাডাতেই বিয়ের সবকিছু ঠিক করব।যেহেতু এশার নানা-দাদা বাড়িতেও কেউ নেই।সাথে আমার প্রায় সব আত্মীয়রাও দেশের বাইরে।আবার ভিক্রমের ফ্যামলিরও কানাডায় যাতায়াত চলে।বেয়াইনরা তো রাজিই ছিলেন,কিন্তু ভিক্রম আর এশাই বলল দেশে সবকিছু ঠিক করতে।এখন যাদের বিয়ে তাদের মর্জির বিরুদ্ধে গিয়ে তো আর আমরা কিছু করতে পারব না,তাই না?"
শেষের কথাটা বলেই হেসে উঠলেন হুমায়ূন সাহেব।পরপরই ভিকি হুমায়ূন সাহেবের উদ্দেশ্যে শুধালো,
"কে বলেছে দেশে কোনো আত্মীয় নেই,আব্বা?আমার বেস্টফ্রেন্ডের এতো বড় একটা ফ্যামিলি থাকতেও আপনি বলছিলেন দেশে কেউ নেই?আর তারউপর কানাডার সবাইকে একটু আমাদের দেশের চেহারা দেখাতে হবে না?"
রঞ্জক শেখ বলে উঠলেন,
"তুমি ঠিক বলেছো ভিক্রম।বিয়ের মতো এতো বড় এক অনুষ্ঠান কি বিদেশে করা যায়?"
আমেনা শেখের কন্ঠও শুনা গেল,
"তো বিয়ের ডেট কবে ঠিক হলো হুমায়ূন ভাই?একমাত্র ভাগিনির বিয়ে আমার।একটু কেনাকাটা করব না?"
"এই তো আপা,এই মাসের শেষ সপ্তাহেই।সবার সিডিউল দেখতে গিয়ে একদম বছরের শেষেই পড়ে গেল।তারপরও সবকিছু তাড়াতাড়ি শেষ করার চেষ্টা করব।ভিক্রমও ওখানে অফিসের সবকিছু রেখে এসেছে।সাথে আমারো ব্যস্ততা।সব মিলিয়ে তাড়াতাড়িই করব"
ভিকি আমেনা শেখের দিকে দেখে সাহিত্যের দিকে আঙ্গুল তাক করল,
"অফিসের বস একদম ছুটি দেয় না আন্টি।খুবই স্ট্রিক্ট আমার কোম্পানির সি.ই.ও.-টা"
ভিকির কথায় সবাই হেসে উঠলেও সাহিত্য চোখ উল্টালো,
"হেড অফিসে বলে লাভ নেই।যতটুকু ছুটি পেয়েছিস সেটাও ক্যান্সেল করে বিয়ের দিনই শুধু আসতে দেব"
ভিকি সাহিত্যের কথা সম্পুর্ণ উপেক্ষা করে এক কাজ করে বসল।ফাহাদ শেখের উদ্দেশ্যে শুধালো সে,
"আঙ্কেল আপনার কোম্পানির নাম F.S. গ্রুপ এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি না?"
ফাহাদ শেখ মৃদু হেসে শুধালেন,
"হ্যাঁ"
"সিঙ্গাপুরে যে F.S. কোম্পানির প্রডাক্ট লঞ্চিং-এর কথা চলছে সেটা কি আপনারই?"
ফাহাদ শেখ আবার হ্যাঁ বলায় ভিকি ও সাহিত্য বেশ ভড়কালো।ভিকি সাহিত্যের পায়ে নিজের পা দিয়ে একখানা টোকা দিয়ে বসলো।বড় টি-টেবিলটা সামনে থাকায় সে দৃশ্য যেন কারো চোখে পড়ল না।ভিকির টোকাটুকির মানে ভালো করেই বুঝলো সাহিত্য।সাহিত্যের আগে থেকেই ফাহাদ শেখের কোম্পানির ব্যাপারে খোঁজ নেওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না।তবে একই ইন্ডাস্ট্রিতে থাকায় উপরে-উপরে একটু হলেও তথ্য কানে আসতো সাহিত্যের।কিন্তু সিঙ্গাপুরের বিষয়টা যেন সম্পুর্ণ ভড়কে দিল তাকে।এই ফাহাদ শেখ তো সাহিত্যের চিন্তার থেকেও বেশি চালু।ভিকির বিয়ের ছুটিটা মনে হয় আসলেই কমাতে হবে।কিছুতেই পেছনে পড়ে থাকা যাবে না!
ভিকির এক কথায় যেন সাহিত্যের মন-মস্তিষ্কে তৈরি হওয়া বুদ্ধি যে তারই বিয়ের ছুটি কমিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে সেটা বেচারা ভিকির অজানাই থেকে গেল।সে তো হাসি মুখে আবার ফাহাদ শেখের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
"ইট'স ভেরি শকিং টু হেয়ার দ্যাট আঙ্কেল।এতো বড় কোম্পানি আমাদের এতো কাছে থাকার পরেও আমরা পার্টনার হিসেবে নেই?আই থিংক উই শুড বি পার্টনার এজ সুন এজ পসিবেল.......তাই না?"
ভিকি শেষের কথাটুকু বলতে নিয়েই সাহিত্যের দিকে দেখল।সাহিত্য আগে থেকেই আড় চোখে দেখে ছিল ভিকির দিকে।ভিকি একদমই ভড়কালো না সেই নজরে।কারণ সে জেনেশুনে আগুনে হাত দিয়েছে।ভবিষ্যৎ জামাই-শশুরের একটু মিলানোর চেষ্টা আরকি।ভিকি সাহিত্যের ভারী নজর ফু মেরে মাথা ঝাকিয়ে শুধালো,
"আঙ্কেলের সাথে তুই এখনো এ ব্যাপারে কোনো কথা বলিসনি কেন?"
সাহিত্যের এখন খুব করে ইচ্ছা করছে ভিকির নাকে দুটো ঘষি বসিয়ে দিক।কিন্তু সেটা তো আর করতে পারছে না।কারণ শেখ ভিলার সবাই সহ হুমায়ূন সাহেবও জানেন যে ভিকি শেখ পরিবারের এসব ঝগড়াঝাটির ব্যাপারে তেমন কিছুই জানে না।কিন্তু সাহিত্য যে ভিকিকে সব বলেছে আর বর্তমানে ভিকি তার বন্ধুর সেই জিনিসের সৎ ব্যবহার করছে সেটাও উপস্থিত কেউ জানে না।তবে সাহিত্যের মতে বন্ধুকে তার হবু শশুরের সাথে মিল বন্ধন করাচ্ছে করাক,কিন্তু এক দিনে এসেই এমন ষাড়ের সামনে লাল কাপড় কেন ঝুলাতে পাগল হয়ে গিয়েছে সে।
কোনো উপায় না পেয়ে সাহিত্য এবার ফাহাদ শেখের দিকে নজর ফেলল।সাহিত্যের মতো ফাহাদ শেখও ভারী মুখোশ্রি নিয়ে সাহিত্যের দিকে দেখে ছিলেন।নজর লুকানো কোনোকালেই অভ্যাস ছিল না ফাহাদ শেখের।
সময় নিয়ে বলে উঠল সাহিত্য,
"ব্যস্ততার কারণে সেদিকে খেয়ালই করিনি।তো কি বলো মেঝো চাচু?করা যায় পার্টনারশিপ?"
#চলবে