#পর্ব_৫৩
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
কল্পনা যে খুবই আজব একটা মেয়ে সেটা শেখ ভিলার সবাই জানে।এমনকি শেখ ভিলার কাজের বুয়া লিমা খালাও।কিন্তু সাহিত্য যেন সেই দিকটায় একটু বেশি করেই অব্যাহত।তাই তো যখন কল্পনার কোনো উল্টো-পাল্টা আচরণ করায় বাড়ির সবাই মাথায় হাতের চাপড় দেয় তখন সাহিত্য তার প্রেয়সীর আচরণে মুচকি-মুচকি হাসে।যেমন এই মুহুর্তের কথাটাই বলা যাক।সাহিত্য তার শান্তিপূর্ণ রুমে বসে লিসার সাথে অনলাইন মিটিংয়ে ছিল।ভিকি দেশে ফেরায় লিসাকে কিছু টুকটাক কাজ সামলাতে সাহায্য করছিল সে।কারণ ভিকির বিয়ের কিছুদিন আগে যে লিসাও দেশের মাটিতে পা রাখবে।অফিসের সবকিছু যেন ঠিকঠাক করে রেখে আসতে পারে তাই তো সাহিত্যকে কল লাগানো।
কিন্তু শান্তিপূর্ণ রুমটা যেন হঠাৎই বদলে গেল।দরজায় তীব্র আঘাতের শব্দে সেপাশে না দেখেই সাহিত্য কল্পনাকে ভেতরে আসতে বলে।প্রেয়সীর আগমনে যেন সবসময়ই অবগত থাকে ছেলেটা।কিন্তু রুমে ঢুকার অনুমতি দিয়ে যেন নিজেরই মিটিংয়ের বারোটা বাজালো সাহিত্য।
কল্পনা রুমে ঢুকে কোনো পাশে না দেখেই একদম দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে,
"সাহিত্য ভাই!সাহিত্য ভাই!সাহিত্য ভাই!আমি কি করব এখন?কিছু তো আইডিয়া দেন!সাহিত্য ভাই আপনি কি শুনছে......!"
দাপাদাপির সাথে এবার কথাটাও থেমে গেল কল্পনার।সাহিত্য যে ল্যাপটপে কাজ করছিল সেটা যেন নজরেই পড়েনি তার।কিন্তু তার দাপাদাপিতে সাহিত্য এতক্ষণে মিটিং ক্লোজ করে ল্যাপটপ বন্ধ করায় ব্যস্ত।কল্পনা নিজের ভুল বুঝতে পেরে জিহ্বার মাথায় কামোড় বসিয়ে দিল।সাথে মিনমিনিয়ে ছোট করে বলেও উঠল সে,
"সরি"
সাহিত্য 'ইটস ওকে' বলে চেয়ারখানা ঘুরিয়ে কল্পনার দিক হয়ে বসলো।ঠোঁট বাকিয়ে হাসি তো ফুটেছে সেই মিটিং ক্লোজ করার সময়ই।দুই হাত বুকে ভাজ করে স্বাভাবিকভাবেই বলল,
"কি হয়েছে?এমন তিরিং-বিরিং করছিস কেন?"
সাহিত্যের কথাটা শেষ হওয়ার পর মুহুর্তেই কল্পনার মাঝে আবার সেই ব্যতিব্যস্ততা দেখা গেল,
"কি হয়েছে?কিছুই তো হচ্ছে না।আমি ভিকি ভাইয়ার বিয়েতে যাওয়ার জন্য ব্যাগ গোছাচ্ছিলাম।হঠাৎ মনে পড়ল বাবা তো আমাকে যেতেই দিবে নাআআ"
শেষের কথাটা খুবই মরমরা হয়ে বলল সে।বলতে নিয়েই বিছানায় বসে পড়ল।আর এদিকে মাথা নিচু করে মিটিমিটি হাসতে থাকা সাহিত্যের কানে কল্পনার খুত-খুত করে তোলা কান্নার আওয়াজ ভালো করেই ঢুকছে।সাহিত্য চেয়ার থেকে উঠল না।সেই চাকাওয়ালা চেয়ার টেনে কল্পনার সামনে এসে বসলো,
"এখন কি আমাকে মেঝো চাচুকে কয়েকদিনের জন্য কিডন্যাপ করে গায়েব করে দিতে বলছিস,যেন তুই ভিকির বিয়েতে যেতে পারিস?"
কল্পনা তার খুতখুতে কান্না থামিয়ে সাহিত্যের দিকে দেখে ভালোই চোখমুখ কুচকালো,
"বাবাকে নিয়ে সবসময় এমন উল্টাপাল্টা চিন্তা করেন কেন?"
কল্পনার দিকে নজর রেখেই বাকা ঠোঁটের হাসি আরো বড় করল সাহিত্য।মনে মধ্যে সেই হাসির কারণটাও বলে উঠল,
'আমি তোর বাবাকে নিয়ে না,তোকে নিয়ে সবসময় উল্টাপাল্টা চিন্তা করি।তুই জানতে পারলে হয়তো আমাকে কিলিয়ে ছাড়তি'
সাহিত্যের এমন ঠোঁট বাকানো দেখে মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করল কল্পনা।অতঃপর শুধালো,
"আ হা!এমন না হেসে কিছু বলবেন কি?বাবাকে কেমন করে রাজি করাবো?বাবা ভিকি ভাইয়ার বিয়ের কথা শুনলে আর কথাই বাড়াতে দিবে না আমাকে"
সাহিত্য কল্পনার মুখের সামনে নিজের ডান হাতের তর্যনী আঙ্গুলখানা গোলগোল ঘুরাতে লাগলো,
"ভার্সিটির টুর নামে একটা জিনিস থাকে।তোর কি জানা আছে সেটা?আমি কানাডায় থাকায় সেটাকে কাজে লাগাতে পারিনি।কিন্তু কলেজের টুরকে কাজে লাগিয়েছিলাম"
কল্পনা তো সাহিত্যের ঘুরানো সেই আঙ্গুলে পূর্ণ মনযোগ দিয়ে ছিল।ভেবেছিল সাহিত্য আঙ্গুলের মাধ্যমে কল্পনাকে কোনো ট্রিকস শিখিয়ে দিচ্ছে ফাহাদ শেখকে পটানোর জন্য।কিন্তু সাহিত্যের মুখে এমন কথা শুনে আবারো মুখ বিকৃত করল সে,
"আমি আপনার কাছে আইডিয়া চাচ্ছি যে বাবাকে কেমন করে পটাবো,আর আপনি কিনা ভার্সিটির টুর-কলেজের টুর নিয়ে পড়ে আছেন।আমি যাই না ওসব টুরে।ভার্সিটির ওসব টুরে গিয়ে কিসব হয় আমার ভালো করেই জানা আছে"
মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করল সাহিত্য।অতঃপর শুধালো,
"ভালো কথা যাস না।কিন্তু এখন যেতে হবে ভিকির বিয়ের জন্য"
সাহিত্যের কথা বুঝতে অক্ষম হলো কল্পনা।তাই তো চোখ উল্টিয়ে ভারী শ্বাস ফেলে বলল সে,
"আমার উচিৎ ছিল বাবার মাথা খারাপ করা,কিন্তু এদিকে তো আপনি আমারই মাথা খারাপ করছেন।কথাটা সোজাসাপটাভাবে বললে কি এমন হয়ে যাবে!"
সাহিত্য এবার কল্পনার কপালে আঙ্গুলের টোকা বসালো,
"ভন্দু একটা।আমার কথার মানে হলো চাচুকে তুই বলবি যে তুই ভার্সিটির টুরে যাচ্ছিস,কিন্তু আসলে তুই আমাদের সাথে ভিকির বিয়েতে যাবি"
সাহিত্য অকারণেই কল্পনাকে 'ভন্দু' ডাকেনি।কিন্তু এই ভন্দুর মাথায় এবার যেন কথা ঢুকলো।মনে হয় বেশ বুঝলো কল্পনা।তাই তো কপালের টোকা দেওয়া জায়গায় হাত বুলাতে নিয়েই ঠোঁট জোড়া গোল করে বিস্ময়ে বলে উঠল,
"ওওওওওও, আচ্ছাআআ।এবার বুঝেছি।কিন্তু বাবা যদি আমাকে টুরে যাওয়ার পারমিশন না দেয়?"
সাহিত্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো,
"সেটা আমি জানি না।তুই আমাকে আইডিয়া দিতে বললি আমি দিলাম।এখন বাকিটা কেমন করে ম্যানেজ করবি সেটা তোর ব্যাপার"
কথাটা বলেই সাহিত্য রুম থেকে বেড়িয়ে গেল।রান্নাঘরে গিয়ে হয়তো কোনো গিন্নির কাছে তার সুগার ফ্রি ব্লাক কফির আবদার করবে।কল্পনাকে নিয়ে আর চিন্তার কোনো কারণ নেই।সাহিত্য ভালো করেই জানে তার চঞ্চল চড়ুই পাখি ঠিকই ফাহাদ শেখকে মানিয়ে নেবে।সাহিত্যের ভাবনাই যেন ঠিক।কল্পনা ক্ষণিকের মাঝেই মাথায় খিচুড়ি পাকিয়ে দৌড় লাগালো ফাহাদ শেখের রুমের দিকে।
সিড়িতে ধীরে-সুস্থে নামতে থাকা সাহিত্যের পাশ কেটে ঝড়ের বেগে নেমে গেল কল্পনা।সেটাতে হালকা ভড়কালো সাহিত্য।কিন্তু পর মুহুর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে যেতে থাকা কল্পনার দিকে নজর রেখেই ধীমি কন্ঠে শুধালো,
"এই যে।প্রেসার কুকারের শিটি দিয়েছে।এখন শুধু মাংস ভালো করে কষলেই হলো"
সামিয়া সাহিত্যের পাশ দিয়েই উপরে উঠছিল।হঠাৎ সাহিত্যের প্রেসার কুকারের এতো পাকা বর্ণনা শুনে কপালে ভাজ ফেলে বলল সে,
"তুমি কেমন করে জানো যে মাংস কষানোর আগে শিটি দিতে হয়?"
দুই হাত উঠিয়ে ঘাড়ের কাছে তো কিছুক্ষণ আগেই চেপে ধরেছে সাহিত্য।সেই অবস্থায়ই সামিয়ার দিকে ঘুরে শুধালো সে,
"কারণ এই ১১ বছর তোর ভাইও মনে হয় মাঝে মাঝে রান্না করে খেত।আমার পিতা-শ্রী তো আর আমার সাথে আমার বউকে পাঠিয়ে দেননি যে সে রান্না করে খাওয়াবে.....বউয়ের এতো সুন্দর রান্না জানা পরেও এতদিন না খেয়ে ছিলাম আমি"
শেষের কথাটা সামিয়ার কানে অস্ফুট শুনালো।তাই তো সাহিত্যকে উদ্দেশ্য করে 'অ্যা' বলে উঠল সে।সাহিত্য পর মুহুর্তেই মাথা থেকে হাত নামিয়ে শুধালো,
"কি অ্যা?বললাম যে একটু রান্না-বান্না শিখ।নাহয় শশুরবাড়ির লোকেরা বলবে মা-ভাই এতো ভালো রান্না জানে আর তুই শুধু বসে-বসে খেয়েছিস মাত্র"
সাহিত্যের এতো দূর দর্শনের চিন্তা কানে নিল না সামিয়া।ভাইকে জিহ্বার মাথা দেখিয়ে জোর পায়ে উপরে চলে গেল।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সিড়িসহ ড্রইং রুমের পুরো রাস্তাটা হুড়মুড়িয়ে এলেও ফাহাদ শেখের রুম থেকে খাণিকটা দূরে এসে পায়ের গতি স্বাভাবিক করল কল্পনা।রুমের খোলা দরজা দিয়ে ফাহাদ শেখকে ভালো করেই পরখ করা যাচ্ছে।বিছানার বসে হেলান দিয়ে হাতের খবরের কাগজ পড়ছেন তিনি।সারাদিন অফিসে ব্যস্ত থাকায় মাগরিবের পর সন্ধ্যার এই সময়টায় একটু শান্তভাবে বসতে পারেন।তবে সেটাকেও কাজে লাগিয়ে খবরের কাগজে চোখ বুলাতে ব্যস্ত থাকেন।
লম্বা এক শ্বাস ভেতরে নিয়ে আবার বের করল কল্পনা।ফাহাদ শেখের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই কাঠের দরজায় টোকা দিয়ে বলে উঠল,
"বাবা ভেতরে আসতে পারি?"
কান খাড়া করে কল্পনার ডাক ফাহাদ শেখ শুনলেন বটে।কিন্তু পড়তে থাকা আর্টিকেলটা শেষ করে তারপরেই খবরের কাগজ মুখের সামনে থেকে নামালেন।চিকন ফ্রেমের চশমার উপর দিয়ে কল্পনাকে পরখ করে আবার খবরের কাগজে মন দিলেন।অতঃপর ভারী পুরুষালী কন্ঠে ছোট করে বললেন তিনি,
"হুম"
কল্পনা যেন সেই ছোট উত্তরেরই অপেক্ষায় ছিল।দৌড়ে এসে ফাহাদ শেখের সামনে দাড়ালো সে।কোনো কিছু না বলেই মুখে মৃদু হাসি নিয়ে হালকা দুলতে লাগলো।
আড় চোখে মেয়েকে পরখ করে শুধালেন ফাহাদ শেখ,
"কোনো দরকার ছিল,মা?"
কল্পনা পর মুহুর্তেই উত্তর করল,
"সমস্যা নেই।তুমি আগে আর্টিকেল পড়া শেষ করো"
ফাহাদ শেখ খবরের কাগজ ভাজ করে পাশে রাখলেন,
"তুমি এমন মাথার কাছে দাড়িয়ে দুলতে থাকলে আর্টিকেলে মন বসবে না।বলো, কি হয়েছে?হঠাৎ আমার কথা স্মরণে এলো কেমন করে?"
কল্পনা বাবার পায়ের কাছে বসে আলতো হাতে পা টিপতে লাগলো।নজর তার ফাহাদ শেখের দিকেই আবদ্ধ,
"আমি তোমার কাছে কি তেমন কোনো জিনিস চাই বাবা?"
ফাহাদ শেখ মেয়ের পা টিপা দেখেই বুঝতে পেরেছেন ব্যাপারটা।কল্পনা নিশ্চয়ই কোনো আবদার করতে এসেছে।মায়ের মতো মেয়েটাও ঠিক একইভাবে আবদার করে ফাহাদ শেখের কাছে।চোখের চশমা খুলে পাশের টেবিলে রাখতে নিয়েই নিঃশব্দে হালকা হাসলেন তিনি,
"একদম না তো।আমার মেয়ের যখন যেটা প্রয়োজন হয়েছে বলার আগেই এনে দিয়েছি আমি।তুমি মুখ থেকে তেমন কোনো আবদারই করো না"
বাবার পায়ের মালিশ আরো জোরালো করল কল্পনা।আদুরে কন্ঠে বলল,
"আজকে একটা করি?"
ফাহাদ শেখ তো প্রস্তুতই ছিলেন এই প্রশ্নের জন্য।তিনি হ্যাঁ সূচকে মাথা দোলাতেই কল্পনার মুখে হাসি ফুটল।পর মুহুর্তেই নিজের খুশি সংযত করে সময় নিয়ে বলল সে,
"ভার্সিটি থেকে একটা ৫ দিনের স্টাডি টুর আছে।আমি তো আগের কোনো টুরেই যাইনি।এটাতে একটু যাই?"
ফাহাদ শেখ ভ্রু উঁচিয়ে শুধালেন,
"৫ দিনের টুর?"
কল্পনা মুখের সামনে মাছি তাড়ানোর মতো হাত নাড়িয়ে বলল,
"৫দিন আবার ঘুরবো নাকি?প্রথম ৩দিন তো আমাদের ডাটা কালেক্টিং-এর কাজ করতেই শেষ হয়ে যাবে"
"কবে সেই টুর?"
"এই তো,কয়েকদিন পরেই"
"কয়জন যাবে তোমরা?ছেলে-মেয়ে কতজন?"
"২৫-২৬ জন হবে।সব মেয়ে,কোনো ছেলে নেই।সাথে দুজন ম্যাম থাকবে"
কল্পনা ভালো করেই জানে ফাহাদ শেখ ছেলের কথা শুনলে একটু পিচপা হতেন।তারপর টেনশন করতেন কোনো গার্জিয়ান সাথে না থাকায়।তাই তো কল্পনা বুদ্ধি খাটিয়ে সব কথা একসাথে বলে দিল।সাথে তো এটাও বলল যে ভার্সিটির পড়াশোনার কাজে যাচ্ছে।সেটা শুনে হয়তো সম্মতির পাল্লাটা একটু বেশি ভারী হতে পারে।হলোও সেটা।ফাহাদ শেখ খানিক চিন্তা করে বললেন,
"যেহেতু ভার্সিটির কাজ তাহলে যাওয়া তো দরকার.......কোথায় যাবে তোমরা?"
কল্পনা সে কথাও চিন্তা করে এসেছে।ফট করে বলে উঠল সে,
"বান্দরবান।আমাদের কাজের জন্য ঐ জায়গাটা একদম পারফেক্ট"
ফাহাদ শেখ যেন তারপরও ভারী চিন্তায় মগ্ন।বাবা হিসেবে মেয়েকে একাই এতো দূরে যেতে দেওয়ায় মনটা খানিক সায় দিচ্ছে না তার।কি যেন চিন্তা করে বলে উঠলেন তিনি,
"তোমার বান্ধুবী প্রীতি যাবে না?"
কল্পনা দ্বিধা ছাড়াই বলে উঠল,
"হ্যাঁ হ্যাঁ! আমি তো এই ৫দিন ওর সাথেই থাকবো"
কল্পনার সে কথা এতো জোর দিয়ে বলাল কারণ আছে।কল্পনার জন্মদিনে ফাহাদ শেখ প্রীতির সাথে বসে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেছেন।তার বাচ্চাসুলভ মেয়েটা কেমন বন্ধু বানিয়েছে সেটাই হয়তো পরখ করছিলেন তিনি।দীর্ঘ সময় আলাপের পর প্রীতিকে বেশ পছন্দ হয়েছে ফাহাদ শেখের।কল্পনা হালকা অবুঝ আর ভরপুর চঞ্চলতাপূর্ণ হলেও প্রীতিকে বেশ ম্যাচিউর মনে হয়েছে তার।তাই কল্পনার এবারের কথায় ফাহাদ শেখ মুখে হালকা হাসি ফুটালেন,
"আচ্ছা ঠিক আছে।যেও তুমি টুরে"
কল্পনা পারছে না শুধু নাচতে!অবশেষে সফল হলো সে।কিন্তু ফাহাদ শেখের পরের কথায় নাচার ইচ্ছা ফুস করেই বেড়িয়ে গেল।
"কিন্তু প্রীতির ফোন নাম্বারটা আমাকে দাও"
চুপসানো মুখ নিয়েই শুধালো কল্পনা,
"কেন?"
"কারণ এই ৫দিন হঠাৎ-হঠাৎ তোমাকে কল করা ছাড়াও আমি প্রীতিকেও কল করব।তাকে কল করে যেন তোমার কন্ঠও শুনতে পারি আমি"
কল্পনা এখন কি করবে বুঝতে না পেরেই ভাবলেসহীনভাবে বসে থাকলো।এখন ফাহাদ শেখকে যদি সে বলে যে প্রীতির ফোন নষ্ট হয়ে গিয়েছে তাহলেও তো ফাহাদ শেখ সন্দেহ করা শুরু করবেন।তাই কোনো উপায় না পেয়ে প্রীতির নাম্বারটা ফাহাদ শেখের ফোনে সেভ করল কল্পনা।নাম্বার সেভ করতে নিয়েই চিন্তা করে বসলো যে প্রীতিকেও এখন ভিকির বিয়েতে নিয়ে যেতে হবে।অবশ্য এ বিষয়ে তেমন খারাপ লাগলো না কল্পনার।প্রীতি গেলে ভালোই হবে তার জন্য।প্রাণপ্রিয় বান্ধুবীটার সাথে নাহয় আরো কিছু সুন্দর মুহুর্ত স্মৃতি হিসেবে থেকে যাবে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সাহিত্য আড়মোড়া ভাঙতে নিয়েই রান্নাঘরের দরজায় এসে দাড়ালো,
"একটু কফি পাওয়া যাবে কি?"
বাড়ির তিন গিন্নি রাতের খাবার তৈরি করতে ব্যস্ত।তারপরেও আমেনা শেখ ঝটপট কফি বানিয়ে ছেলের হাতে ধরিয়ে দিলেন।কফি দিতে নিয়েই শুধালেন তিনি,
"কিছুক্ষণ আগে কল্পনাকে লাফাতে-লাফাতে ফাহাদের রুমে যেতে দেখলাম।কিছু হয়েছে নাকি?"
সাহিত্য কফির মগে প্রথম চুমুকটা দিতে নিয়েই বলল,
"ভিকির বিয়েতে যাওয়ার জন্য মেঝো চাচুর কাছে পারমিশন নিতে গিয়েছে"
রান্নাঘরে গিন্নিদের ব্যস্ত হাতের কারণে হাড়ি-পাতিলের ভালোই শব্দ হচ্ছিল।কিন্তু সাহিত্যের এমন কথায় হঠাৎই চুপ মেরে গেল পুরো পরিবেশ।নিশুতি পরিবেশে প্রেসার কুকারের শিটির তীব্র শব্দ কানে বাজলো শুধু।
হেনা শেখ হন্তদন্ত পায়ে সাহিত্যের দিকে এগিয়ে এলেন।ব্যতিব্যস্ত শুনালো তার কন্ঠ,
"মাথা-টাথা গিয়েছে নাকি ওই মেয়েটার?এতো তাড়াতাড়ি মরার শখ হয়েছে?"
গরম কফি ফুকাতে নিয়েই বলল সাহিত্য,
"আরে টেনশন নিও না।কিছু হবে না।তোমার মেয়ে যে কনফিডেন্স নিয়ে গেল,আমার তো মনে হচ্ছে চাচু রাজি হয়ে যাবে"
আমেনা শেখ দাঁত চিবিয়ে বলে উঠলেন,
"কল্পনার সাথে তোরও মাথা গিয়েছে মনে হয়।তুই জানিস তো ওকে থামাসনি কেন?ফাহাদ কল্পনাকে ভিকির বিয়েতে যাওয়ার পারমিশন দেওয়া তো দূরে থাক,কল্পনার মুখে সেই কথা শুনলেই চেচিয়ে উঠবে"
লতিফা শেখ ওদিকে আবার তরকারি নাড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।মাথা না ঘুরিয়েই কল্পনাকে উদ্দেশ্য করে শুধালেন তিনি,
"এই মেয়েটা কি জন্য এমন উঠে-পড়ে লেগেছে রাতের খাবারটা হারাম করার জন্য"
তিন গিন্নির ভারী নিঃশ্বাসে সাহিত্যের কিছুই হলো না।তার নজর হাতের কফির দিকে,
"কিছুই হবে না ছোট চাচি।শুধু কথায়-কথায় আমার জানপাখিটার দোষ কেন দাও?"
আমেনা শেখ আবার কথা শুনালেন ছেলেকে,
"তোর জানপাখি করেই অমন কাজ।চড়ুই পাখির মতো ফুতুর-ফুতুর করে বেড়াবে আর কিসব অকাজ করে বেড়ায়।আর তুইও একদম মাথায় বসিয়ে রাখিস ওটাকে"
হেনা শেখ এতক্ষণে ভেজা হাতের পানি শাড়ির আঁচলে মুছতে লাগলেন,
"তোর চাচু কল্পনাকে কিছু বললে যখন ও ভ্যা-ভ্যা করতে নিয়ে তোর কাছে যাবে তখন আবার চাচা-ভাতিজা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগাস না"
পেছন থেকে লতিফা শেখ ফিক করে হেসে বলে উঠলেন,
"তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ তো ১১বছর আগেই হয়ে গিয়েছে ভাবি।এটা আজকে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে"
কথা বলতে নিয়েই পেছনে ঘুরলেন লতিফা শেখ।দুই জা-এর চিন্তার ছাপে ভরা মুখ দেখে জিহ্বায় কামোড় বসালেন তিনি।হাসিটা ভুল সময় হেসেছেন ভালো করেই বুঝ হলো তার।
দুই গিন্নি যখন সাহিত্যকে অক্ষি জোড়া দিয়েই চিবিয়ে খাচ্ছিলেন তখনই সাহিত্যের চোখ জোড়া ড্রইং রুমে গেল।সামনের দুই গিন্নিকে উদ্দেশ্য করে শুধালো সে,
"ওই যে তোমাদের চড়ুই পাখি ডায়নোসরের গুহা থেকে বেড়িয়ে এসেছে"
ওদিকে দুই গিন্নি নজর দিলেন কল্পনার দিকে।আর এদিকে কল্পনার চোখ সাহিত্যের উপর পড়ায় সাহিত্য ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করল ফাহাদ শেখ কি বললেন।
সাহিত্যের ইশারা বুঝতে পেরেই কমোড় দুলিয়ে নিঃশব্দে নাচতে লাগলো কল্পনা।সেটা দেখে দুই গিন্নির কপালে ভালোই ভাজ পড়ল।হেনা শেখ শুধালেন,
"পাগলটা অমন নাচছে কেন?"
লতিফা শেখ কেবলই চুলা বন্ধ করেছিলেন।হেনা শেখের কথায় দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাড়ালেন তিনি।ভাতিজীর কান্ড দেখে তারও কপালে ভাজ পড়ল।সাহিত্য স্বাভাবিকভাবেই কফিতে চুমুক বসিয়ে হেনা শেখের উত্তরে বলল,
"সিম্পল।চাচু মেনে গিয়েছে সেজন্য"
গিন্নিদের কোটর ফাটিয়ে বেড়িয়ে আসা চোখগুলো আবার সাহিত্যের দিকে ঘুরলো।এবার আমেনা শেখ ছেলের উপর ভালোই চটে গেলেন।গম্ভীর মুখোশ্রি নিয়ে বাক্য ছুড়লেন তিনি,
"সাহিত্যওওওও"
কল্পনা এতক্ষণে নাচতে নিয়েই সিড়ির দিকে এগিয়ে গিয়েছে।সেপাশে নজর রেখেই মায়ের লম্বা টানের ডাকে সে-ও লম্বা উত্তর দিল,
"হুমমমমম"
"কি হয়েছে ভালো করে বলবি?আমাদের মগজের খিচুড়ি বানাচ্ছিস কেন?"
মায়ের দিকে ঘুরে এবার ফিক করে হেসে উঠল সাহিত্য।অতঃপর সব ঘটনা গোড়া থেকে খুলে বলল সে।কথা শেষেই আমেনা শেখের হাতে এক চাপড় খেল সাহিত্য।আমেনা শেখ ছেলেকে কিলিয়ে হাতের ফাকা কফির মগটা নিয়ে রান্নাঘরের ভেতরে ঢুকলেন।যেতে নিয়ে কথা শুনাতে ভুললেন না অবশ্য,
"আমরা যেন ভুলতে বসেছিলাম যে ওই বাদরের গুরু তুই"
আমেনা শেখের সাথে তাল মিলিয়ে হেনা শেখ ও লতিফা শেখও সাহিত্যকে কিছু কথা শুনিয়ে আবার রান্নায় মন দিলেন।সাহিত্য যেন বেশ মজা পাইছিল এতক্ষণ থেকে।হাসতে নিয়েই সে নিজের রুমের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
এদিকে কল্পনা তো রুমে ঢুকেই ইউটিউবে গান ছেড়ে দিয়ে নাচতে শুরু করেছে।মেয়েটার খুশির যেন কোনো শেষ নেই।খুশির ঠেলায় রুমের দরজাটাও ভালো করে লাগায়নি সে।যার দরুন সিড়িতে উঠতে থাকা সাহিত্যের কানে স্পষ্ট শুনা গেল সেই গানের কথা,
❝ জান, ও বেবি!
সোনা-ময়না পাখি
কবে তুমি হবে আমার
আসবে বুকে,হায়!! ❞
সাহিত্যের মুখে এবার বড়সড় এক হাসি দেখা গেল।ছেলেটার ভাবতেই ভালো লাগছে যে প্রেয়সীকে টানা ৫দিন কোনো বাধা ছাড়াই দেখতে পারবে সে।মনের সুখে কল্পনার সাথে এবার সাহিত্যও হালকা নাচতে শুরু করল।সিড়ি দিয়ে উঠতে নিয়ে গানের কন্ঠের সাথে নিজের কন্ঠ মিলালো সাহিত্য,
"আমার যত ভাই-বেরাদার ডাকবে তোমায় ভাবী।তোমার শাড়ির আঁচলে তে থাকবে ঘরের চাবি...."
থেমে গেল সাহিত্য।মাথা ঝাকিয়ে নিজেকে সংশোধন করে নিল,
"না না।ঘরের চাবি না।অফিসের চাবি......তোমার শাড়ির আঁচলে তে থাকবে O.S.S.-এর চাবি"
শেষের কথাটা আবার গানের সুরেই বলল সাহিত্য।বাকি গান গাইতে যাবে এমন সময় হঠাৎই গান বন্ধ করে কল্পনা হুটিপুটি পায়ে বেড়িয়ে এলো রুম থেকে।হঠাৎ কল্পনার আগমনে বেশ ভড়কালো সাহিত্য।নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে সে।এদিকে কল্পনার সে বিষয়ে কোনো খেয়াল নেই।হয়তো সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বেড়িয়েছিল সে।কারণ সাহিত্যকে দেখা মাত্রই থেমে গিয়ে কাদো গলায় অস্ফুটস্বরে বলল সে,
"সাহিত্য ভাই"
চোখ উল্টালো সাহিত্য,
"আবার কি হয়েছে?"
"বড় বাবা?"
"বড় বাবা কি?"
"বিয়ে বাড়িতে তো বড় বাবাও থাকবে।বাবাকে নাহয় একবারে সামলে নিয়েছি।বড় বাবার কি করব?"
সাহিত্য যে এতক্ষণ নাচছিল সেটা কল্পনাকে বুঝতে না দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে পাশ কেটে চলে যেতে নিয়েই বলে উঠল,
"আব্বুর অফিসে কাজ থাকায় বিয়ের দিন গিয়ে বিয়ের দিনই চলে আসবে।গত পরশু কথা হয়েছে আমার সাথে"
"সত্যি?!তাহলে তো আর কোনো টেনশন নেই!আমি ব্যাগ গোছানো শুরু করি"
সাহিত্য কল্পনার দিকে ঘুরার আগেই কল্পনা হাসি মুখে গড়গড় করে কথাগুলো বলে রুমে ঢুকে গেল।কিছুক্ষণ আগের গান আবার বাজতে শুরু করল রুমের ভেতর।ভেতরে কল্পনা যেমন ক্ষণিক আগের নাচে ফিরে গিয়েছে সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম কিছু ঘটল না।
অন্ত নিজের রুম থেকে বেড়িয়ে কল্পনার রুম থেকে গান শুনে আর সাহিত্যকে এমন নাচতে দেখে বেশ অবাক হলো।কারণটা তেমন বুঝলো না সে।কিন্তু সাহিত্যের এমন নাচা দেখে সে-ও এগিয়ে গেল।কাধ দুলাতে নিয়েই সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বলল সে,
"হঠাৎ এমন নাচানাচি চলছে কেন?ব্যাপার কি?"
অন্তকে দেখা মাত্রই সটান দাঁড়িয়ে পড়ল সাহিত্য।কিন্তু অন্ত এখনো নাচার মুডেই আছে।ছোট ভাইয়ের কাছে নাচতে গিয়ে ধরা খেয়ে সাহিত্য এলোমেলো নজর ফেলতে লাগল।আমতা-আমতা করে বলে উঠল সে,
"ওই ভিকির বিয়ের নাচের প্রাকটিস করছি আরকি"
এবার সাহিত্য তার মুখোশ্রি থেকে চোরাভাব সড়িয়ে কটমটিয়ে উঠলো,
"তোর না কালকে পরীক্ষা!আর তুই এখানে নাচছিস?যাহ্,পড়তে বস"
কথা শেষেই হনহনিয়ে রুমে ঢুকে গেল সাহিত্য।আর এদিকে অন্ত যেন বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে রইল।আগামীকাল তার মাস্টার্সের শেষ পরীক্ষা।তাই তো ভিকির বিয়েতে সেও যাবে।গানের জন্য পড়ার অসুবিধা হচ্ছিল দেখেই তো বেড়িয়েছিল সে।তাই নিজের রুমে ফেরত যেতে নিয়েই কল্পনার উদ্দেশ্যে গলা উঁচিয়ে বলল,
"এই কল্পনা!গান বন্ধ কর!তোর মনে রঙ লেগেছে দেখে কি সবার মনে রঙ লাগবে?মানুষের পরীক্ষাও তো থাকতে পারে!"
পর মুহুর্তেই গান বন্ধ হয়ে গেল।সাথে কল্পনার ২-৩ বার উচ্চস্বরে বলা 'সরি' বন্ধ দরজার বাইরে ধীমি আওয়াজে শোনা গেল।
#চলবে
ভিকির বিয়েতে সবার আমন্ত্রণ থাকলো😌আর হ্যাঁ!ভিকির বিয়ে কিন্তু ডিসেম্বরে।তাই শীতের কাপড়-চোপড় আনতে ভুলিয়েন না আবার😉