ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৫৪তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৫৪

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

হাতের লাগেজখানা সিড়ি থেকে নামিয়ে কেবলই সামনে এগুতে নিয়েছিল কল্পনা।অমনি সামনে নজর যেতেই পা জোড়া থমকে গেল তার।ফাহাদ শেখ দুই হাত পেছনে বেধে কল্পনার সামনে দাঁড়িয়ে।কল্পনা বাবাকে দেখে বেশ ভড়কে উঠল।কিছু বলতে যাবে তার আগেই ফাহাদ শেখ গম্ভীর গলায় শুধালেন,

"বাস কয়টায় তোমাদের?"

ফাহাদ শেখের চোখের আড়ালে নিজেকে সংযত করে স্বাভাবিকভাবে কল্পনা বলে উঠল,

"১১টায়"

"ভার্সিটি থেকে উঠবে?"

"হ্যাঁ"

"হুম...তোমার মার সাথে কথা হয়েছে?"

"হ্যাঁ,মা আমার রুমেই ছিল এতক্ষণ"

ফাহাদ শেখ এবার একটু বেশ সময় নিয়েই বলে উঠলেন,

"সাবধানে যে-ও।যেকোনো ধরনের সমস্যা হলে কল মি ডিরেক্টলি।ভার্সিটির সমস্যা হোক বা পার্সোনাল।মনে থাকে যেন"

কল্পনা ফাহাদ শেখের দিকে পিটপিট করে দেখতে নিয়েই মাথা দুলালো।ফাহাদ শেখ হয়তো আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন।কিন্তু কোরিডোরে অন্তকে দেখে ভ্রু কুচকালেন তিনি,

"অন্ত!তুমি বাসায় আছো?গতকাল না সবার সাথে তোমারও যাওয়ার কথা ছিল"

ফাহাদ শেখের কন্ঠে অন্ত তো থমকালোই সাথে কল্পনাও ঘাড় বাকিয়ে অন্তর দিকে নজর দিল।

ফাহাদ শেখ,হেনা শেখ, কল্পনা ও মহুয়া বেগম বাদে গতকাল সবারই ভিকির বিয়ের অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা ছিল।পুরো এক সপ্তাহের জন্য।সবাই শুধু বিয়ের দিনই যেতে চেয়েছিল।কিন্তু সাহিত্য ও আমেনা শেখ একপ্রকার জোর করেই নিয়ে গিয়েছে।সেই হিসেবে অন্তর আজ এখানে থাকার প্রশ্নই উঠে না।

ফাহাদ শেখের উত্তরে বেশ সময় নিয়ে বলে উঠল অন্ত,

"একটু কাজ ছিল তো, মেঝো বাবা।তাই আজকে যাবো"

গম্ভীর কন্ঠ শুনা গেল ফাহাদ শেখের,

"ও আচ্ছা"

কল্পনা ও ফাহাদ শেখের চোখের আড়ালে মুখ ফুলিয়ে অন্ত হাঁটা দিল নিজ রুমের দিকে।খাক কোনো কাজ ছিল অন্তর!বেশ ভালোই-ভালোই ব্যাগ গুছিয়ে বের হতে নিয়েছিল সে।

সেই সময় এই কল্পনাটা এসে হাজির হয় তার রুমে।কল্পনার এক কথা,

"তুমি কাল যাবে।তাও আবার তোমার বাইক নিয়ে"

অনেকটাই ভড়কালো অন্ত,

"কাল কেন?আর বাইকই বা কেন?"

সরল উত্তর কল্পনার,

"কারণ তোমাকে কাল প্রীতিকে সাথে করে নিয়ে যেতে হবে"

অন্ত কল্পনার কাছে শুনেছিল যে ফাহাদ শেখের সাথে কল্পনার কন্ডিশন হয়েছে প্রীতির ফোনে কল দিলে যেন তাকে পায়।আর শেখ ভিলার বাকি সদস্যরা প্রীতিকে নিয়ে যেতে সম্মতিও জানায়।কিন্তু প্রীতি যে অন্তর সাথে যাবে এটা কখন নির্ধারণ হলো!!

অন্ত আমতা-আমতা করতে নিয়েই বলে উঠে,

"শু-শুন কল্পনা।আমি পারব না প্রীতিকে নিয়ে যেতে।তুই একটা মেয়েকে আমার বাইকের পেছনে বসাতে চাচ্ছিস!!?"

কল্পনার ভাবলেশহীন কথা,

"হ্যাঁ তো কি হয়েছে?আমি কি বসিনি তোমার বাইকে?"

"কল্পনা তুই বসা আর প্রীতি বসা কি এক?"

অন্তর এতো চিন্তিত কন্ঠেও যেন কিছু হলো না কল্পনার।রুম থেকে বের হতে নিয়ে শুধালো সে,

"তোমার হোয়াটস অ্যাপে প্রীতির বাসার লোকেশন দিয়ে দিচ্ছি।কাল আমি বের হওয়ার আধা ঘণ্টা পর তুমি প্রীতিকে নিয়ে রওনা দিবে"

"এই কল্পনা!কি জন্য আমাকে এই ডেঞ্জারাস সিচুয়েশনে ফেলছিস!আরে শুন তো!"

কল্পনা শুনেনি।নাচতে নিয়েই বেড়িয়ে গিয়েছে রুম থেকে।আর তাই তো এখন অন্তকে এই সকালে রেডি হতে হচ্ছে।কল্পনা এখন বের হচ্ছে মানে অন্তকে সাড়ে ১০টায় বের হতে হবে।বেচারা শার্টের বোতাম লাগাতে নিয়েই আরেক টেনশনে মগ্ন।প্রীতি যদি এবারও তার সাথে খ্যাক করে উঠে?ওই মেয়ের তো কোনো ঠিকঠিকানা নেই।তারউপর শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল অন্ত কিসব উল্টা-পাল্টা কথা বলে চলে এসেছিল।সেটার জন্য হলেও তো নির্ঘাত ঝাড়ি খাবে একটা।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

কল্পনা সাধারণত শেখ ভিলা থেকে একটু দূরে এসেই রিকশায় উঠে ভার্সিটি যাওয়ার জন্য।আজও একই কাজ করল।কিন্তু আজ আর রিকশায় উঠল না সে।কিছু দূর এসেই তার সাহিত্য ভাইয়ের সেই রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিন গাড়িখানা দেখে পায়ের গতি বাড়িয়ে নিল।সকালের এতো ভারী কুয়াশার মাঝেও যেন চিকচিক করছে সেই গাড়িখানা।আরো একটু সামনে এগুতেই গাড়ির সামনে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাহিত্যও নজরে এলো কল্পনার।

সবার সাথে সাহিত্যও কাল গিয়েছিল।কিন্তু তার জানপাখিটাকে একটু প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট দিতেই তো এতো সকালে ঠান্ডায় এখানে দাঁড়িয়ে আছে।পড়ণে সেই টার্টল নেক সোয়েটার।আর সেই কচুপাতা রঙা সোয়েটারের উপর কালো একখানা ব্লেজার।যে কেউ দেখে নির্দিধায় বলে দেবে যে পেছনের রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনটা সামনের এই ক্লাসিক আবরণে আবৃত সুদর্শন পুরুষেরই হবে।হয়তো কিছু চিন্তা করছিল সাহিত্য,তাই তো নিচু করে রাখা মাথাটা আকাশ পানে করে হালকা শ্বাস ছাড়লো সে।ঠান্ডার কারণেই হয়তো,স্পষ্ট সাদা ধোঁয়া আকারে দর্শনে এলো সেই শ্বাসগুচ্ছো।

কল্পনা লাগেজ হাতে টানতে নিয়েই সাহিত্যের সামনে গিয়ে দাড়ালো।যাকে নিজের করে নেওয়ার জন্যই এতো টেনশনে ভুগছে,সামনে তার উপস্থিতি বুঝতে পেরেই মুখে হাসি নিয়ে কল্পনার দিকে দেখলো সাহিত্য।দেখা মিলল তার ছোট্ট চড়ুই পাখিটার।কি বড় হাসিটাই না ঝুলিয়ে রেখেছে ঠোঁট জোড়ায়।কিন্তু সেটা যেন পুরোপুরি দর্শনে আসছে না।

বেল বটম জিন্স প্যান্টের সাথে শুভ্রা রঙা একটা লং টপস পরেছে কল্পনা।তার উপরে সাহিত্যের শরীরে চাপানো টার্টল নেক সোয়েটারের থেকে একদম ভিন্ন,কফি রঙা একটা ওভার সাইজড্ কার্টিগেন।সেই কার্টিগেন পরিহিত হাত দুটো লাগেজের হ্যান্ডেল ধরে থাকলেও আঙ্গুলের মাথাগুলো ছাড়া আর কিছুই নজরে আসছে না।আর ঠোঁটের সেই বড় হাসিটা তো লুকিয়ে আছে গলায় প্যাচানো ফ্লাফি সাদা স্কার্ফটা দিয়ে।সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই পুতুলের ন্যায় নব যুবতী সাহিত্যকে যেন আরো একটু আকর্ষণ করে বসলো তার লাল আপেলের মতো গাল দুটো ও লাল টুকটুকে নাকটা দিয়ে।ঠান্ডায় ভালোই লাল হয়ে আছে সেগুলো।

সাহিত্য স্বাভাবিকভাবেই শুধালো,

"চাচু কিছু বলেছে?"

মুখে উত্তর না করে শুধু ডানে-বামে মাথা দুলিয়ে গেল কল্পনা।সেটাতে স্কার্ফের নিচে বাধন ছাড়া চুলগুলো একটু ঘষা লেগে আরো একটু এলোমেলো হয়ে গেল।কল্পনার দিকে নজর রেখেই ঘাড় একদিকে কাত করল সাহিত্য।ক্ষণিক বাদে মুচকি হেসেও উঠলো।তার জানপাখিটাকে যে সেই বহু বছর আগের মতোই লাগছে দেখতে।আদুরে,বাচ্চাসুলভ।সেই ছোট থাকলে হয়তো এতক্ষণে সাহিত্যের কোলে চড়ে বসতো।সাথে নিজের ঠান্ডা হাত দুটো সাহিত্যের গালে লাগিয়ে দিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠতো।কিন্তু সেই বাচ্চাসুলভ মেয়েটা যে এখন অনেকটাই বড় হয়ে গিয়েছে।সেই নব যুবতী এখন সাহিত্যের হৃদয়কে ঘায়েল করার ক্ষমতা রাখে।আদরের দিকটা ছাড়াও যে এখন ভালোবাসার দিকটাও সাহিত্যের দিতে ইচ্ছে করে তার জানপাখিটাকে।

কিন্তু সাহিত্যের মাঝেমধ্যে চিন্তা হয়।কল্পনা কি সাহিত্যের সেই ভালোবাসা বুঝার মতো বয়সে গিয়েছে?নাকি এখনো অবুঝই আছে মেয়েটা।সাহিত্যকে কি সে ভুল বুঝবে এ ব্যাপারটায়?

সাহিত্যের এতো গভীর চিন্তার ব্যাপারে যেন কল্পনা সম্পুর্ণ অজ্ঞাত।সে তো সাহিত্যের হাসি মাখা চেহারায় পিটপিট করে দেখতে লাগলো,

"অমন হাসছেন কেন?"

মাথা দুলালো সাহিত্য,

"কিছু না।তুই গাড়িতে বস,আমি লাগেজ ঢুকিয়ে উঠছি"

গাড়িতে উঠেই যেন কল্পনার একটু গরম লাগতে শুরু করেছে।যার দরুন পড়নের স্কার্ফটাই খুলছিল সে।এমন সময় ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল তার।অন্তর নাম্বার দেখে রিসিভ করে কানে চেপে ধরল,

"হ্যাঁ ভাইয়া,বলো কি হয়েছে?"

পরপরই কোনো কথা বলল না অন্ত।কিন্তু সময় নিয়ে বলে উঠল,

"তোর বান্ধুবীকে বের হতে বল"

কল্পনা ফোনটা মুখের সামনে নিয়ে আবার কানে ধরল,

"তুমি এখনই গিয়েছো?তোমাকে না বললাম অন্তত আধা ঘণ্টা পরে যেতে"

"উফ্,এখন মাথাটা খাস না তো।তোর বান্ধুবীর ঝামেলায় আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঝামেলা মুক্ত হতে চাই আমি।অত দায়িত্ব আমি নিতে পারবো না"

মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করল কল্পনা,

"আচ্ছা ঠিক আছে।দেখি ওকে টেক্সট করছি আমি"

কল কেটে দিয়ে মাথা চুলকালো কল্পনা।অন্তকে সে ভালোই ঝামেলায় ফাসিয়ে দিয়েছে।না দিয়েই বা কি করত?সাহিত্যের গাড়িতে ড্রাইভিং সিটসহ মাত্র দুটো সিট।তারপরেও কল্পনা প্রীতিকে সাহিত্যের সাথে যেতে বলেছিল।কিন্তু প্রীতির চিৎকারেই সেটা আর সম্ভব হয়ে উঠে না।প্রীতি তো কল্পনাকে সোজা বলেছে যে,

"তোর ওই হাত-পা কাটাকাটি সাহিত্য ভাইয়ের কাছে আমি থাকবো না"

এর সাথেও কল্পনা রাগ হয়ে তার একটা চিঠিতে সাহিত্যকে 'তোফায়েল শেখের পোলা' হিসেবে সম্মোধন করেছিল প্রীতির উসকানিতে, সেটাও নাকি সাহিত্য জানে।তাই তো প্রীতি পারলে এখন সাহিত্যের ত্রিসীমানার বাইরে থাকে।

সাহিত্যের পর্ব চুকিয়ে কল্পনা অন্তর কথা বলে।প্রীতির সেটাতেও সমস্যা।অন্তকে দেখলেই নাকি প্রীতির রাগ উঠে।কেন রাগ উঠে সেটা নাকি সে নিজেও জানে না।এমন অযৌক্তিক ব্যাপারের কারণেই কল্পনা এক প্রকার জোর করেই প্রীতিকে রাজি করায় অন্তর সাথে যেতে।কিন্তু এখন তো দেখছে যে অন্তরও সমস্যা।

গাড়ির ছাদের পাশে দেখেই কল্পনা বিড়বিড় করে আওড়ালো,

"আল্লাহ মাবুদ,এরা যেন বাইকের মধ্যেই ঝগড়া শুরু না করে"

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

অন্ত প্রায় পাঁচ মিনিট যাবত রোডের উপর দাঁড়িয়ে আছে।ফোনের মধ্যে বাসার ঠিকানাটা আবার দেখে নিল সে।সেপাশ থেকে সামনে চোখ ঘুরাতেই আতকে উঠল ছেলেটা।

রাস্তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রীতি কটমট করে অন্তর দিকে দেখে আছে।অন্ত তার দিকে নজর ফেলার পরও কোনো পরিবর্তন এলো না তার মুখোশ্রিতে।প্রীতির কল্পনার উপরের রাগটা এখনো নামেনি।প্রীতিকে একপ্রকার ডাকাতি মেরে ভিকির বিয়েতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।ফাহাদ শেখকে বলা সবকিছু খুলে বললে প্রীতির কাছে ভালোই রাম ধমক খেয়েছে কল্পনা।অমন মিথ্যা বলেছে তো বলেছে,আবার প্রীতিকেও সেখানে ফাসিয়ে দিয়েছে?আর সেই রাগের হালকা তেজ তো অন্তর কাছেও পৌঁছাচ্ছে বর্তমানে।

প্রীতি দুই হাত বুকে ভাজ করে তো সেই তখন থেকেই দাঁড়িয়ে আছে।এবার গজগজ করে অন্তর দিকে এগিয়ে এলো।অন্ত ভ্রু কুচকে কেবলই বলতে যাবে যে প্রীতির ব্যাগ কোথায়,তখনই প্রীতি গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,

"বাসায় চলেন"

কুচকানো ভ্রু জোড়ার উপরে এবার কপালেও ভাজ পড়ল অন্তর,

"কি?কেন?"

"অত কথা বলতে পারবো না আমি।আসতে বলেছি আসেন"

কথা শেষেই প্রীতি আবার আগের দাঁড়িয়ে থাকা জায়গার দিকে যেতে লাগলো।কিন্তু এদিকে যেন অন্তর মাথায় কিছুই ঢুকছে না।হঠাৎ প্রীতি তাকে বাসায় কেন যেতে বলছে?বাসায় গিয়ে আবার ধোলাই দেবে নাকি?গলা ভিজিয়ে আবারো প্রীতিকে ডেকে উঠল অন্ত।তাতে এক ঝটকায় প্রীতি মাথা ঘুরালো,

"কি!"

"কি আবার!আমাকে বাসায় কেন যেতে বলছো?এখন আবার কি করলাম আমি?"

অন্তর কথা শুনে বেশ বিরক্ত হলো প্রীতি,

"শুধু আপনি কিছু করেননি।আপনার বোন কল্পনাও করেছে।আপনাদের দুটোর চেহারা দেখলেই রাগ উঠে আমার!এখন সময় নষ্ট না করে চলেন তাড়াতাড়ি।বাবা আপনার সাথে দেখা করবে"

এবার অন্তর অন্তর-আত্মা শুকিয়ে গেল,

"কিহ্!!তোমার বাবা কেন আমার সাথে দেখা করবে??এই প্রীতি!এটা কিন্তু এবার একটু বেশি-বেশি হয়ে যাচ্ছে!আমি কিছু বলছি না দেখে তুমি তো দেখছি একদম উঠে-পড়ে লেগেছো।আরে নাহয় সেদিন দিয়েছি একটু গোলাপ ফুলগুলো কিনে,তাই বলে তোমার বাবাকে বলে দিতে হবে?তুমি যে এতো চিল্লাচ্ছিলে আমি কি কিছু বলেছি?আমার শান্ত-ভদ্র হওয়ার কিন্তু সৎ ব্যবহার করছো তুমি!"

এই ঠান্ডা সকালটায় অনেকেই হাটতে বের হয়েছে।সবাই এতক্ষণ শান্তি মতোই হাত-পা নড়াচ্ছিল।কিন্তু হঠাৎই অন্তর উঁচু গলা শুনে সবার নজর যায় সেই ছেলেটার উপর,যে চিৎকার করে-করে বলছে যে সে কতটা ভদ্র আর সেই ভদ্র ছেলে প্রীতিকে গোলাপ ফুলও দিয়েছে।

প্রীতি ভড়কে উঠে আশেপাশে নজর দিল।প্রায় বিল্ডিংয়ের মহিলারা কেমন চোখ লাগিয়ে দেখছে।যাদের কাজই তিলকে তাল বানানো।অন্তর দিকে ঘুরে এবার প্রীতি চেচিয়ে উঠলো,

"চুপ করবেন আপনি একটু!কিসব শুরু করেছেন মাঝ রাস্তায়!"

ফর্সা ছেলেটার কান দুটো একদম লাল হয়ে উঠেছে চিল্লাতে নিয়ে।তারপরও মনের ভয় ধরে রেখে আবার বলে উঠল,

"আমি আবার কি শুরু করলাম?তুমিই তো তোমার বাবার কাছে নিয়ে যাচ্ছো আমাকে!"

অন্ত এমনভাবে কথাটা বলে উঠল যেন প্রীতি তার বয়ফ্রেন্ডকে তার বাবার কাছে প্রীতির হাত চাওয়ার জন্য যেতে বলছে।কোনো উপায় না পেয়ে এবার প্রীতি মাথায় হাত ঠেকিয়ে বসলো।অতঃপর ক্ষণিক বাদে হাতখানা আবার শালে মুড়িয়ে জোর পায়ে অন্তর কাছে এসে দাড়ালো।দাঁত চিবিয়ে কটমটিয়ে উঠলো সে,

"আমার বাপের একমাত্র মেয়ে অচেনা একটা ছেলের সাথে প্রায় ১ ঘন্টার মতো জার্নি করবে।তো সে একটু সেই ছেলের মুখটা দেখবে না?আমার বাবা কোনো দারোগা নয় যে এতো ভয়ে আছেন আপনি"

এবার অন্ত একদম চুপসে গেল।জিহ্বা কাপছে ছেলেটার।কোন জিনিসকে কি বানিয়ে দিয়েছে।সেটা ভাবতে নিয়েই এই ঠান্ডার মাঝেই ঘামতে লাগলো সে।এর মাঝেই প্রীতি আবার দাঁত চিবিয়ে বলে উঠল,

"এখন চুপচাপ বাসায় চলেন।আশেপাশের মানুষ অন্যকিছু ভাবছে"

কথাটা বলেই প্রীতি ঘুরে হাটা ধরল।আর এদিকে অন্ত ভড়কে উঠে আশেপাশে নজর ফেলল।এতোগুলা চোখ দেখে মাথাটা ভালোই নিচু করে নিল সে।অন্য কোনো সময় তো এমন হয়না।এই প্রীতির সাথে থাকলেই অন্তর জীবনে যত ঝড় উঠে।মাথাখানা নিচু রেখেই বড় ব্যাকপ্যাকটা কাধে চড়িয়ে প্রীতির পেছনে হাটা দিল সে।

বিল্ডিংয়ের দোতলায় উঠে ডান দিকের ফ্লাট বাসায় সোজা ঢুকে গেল প্রীতি।কিন্তু অন্ত এখনো ঠায় ফ্লাটের বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে।ভেতরে যেতে বেশ সংকোচ বোধ করছে ছেলেটা।না জানি প্রীতির বাবা কেমন হবে?অন্ত তো একদমই মানুষের সাথে কথা বলতে পারে না।প্রীতির বাবা যদি প্রীতির মতোই হয় তাহলে তো আজ জীবন পানি-পানি হয়ে যাবে তার।অন্ত কল্পনাকে মনের মধ্যে যে কতখানি ঝাড়ি দিল তার হিসেব এদিকে কল্পনার চিপসের প্যাকেটখানা।খুলতে নিয়েই সব চিপস পুরো গাড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল।ঠোঁট উল্টিয়ে মিনমিনিয়ে শুধালো কল্পনা,

"আমার চিপস"

কল্পনার চিপসের এমন হালত দেখে ফিক করে হেসে উঠল সাহিত্য,

"অন্ত ওদিকে নিশ্চয়ই তোকে অভিশাপ দিচ্ছে"

সাহিত্যের কথাটাই তো ঠিক।কিন্তু অন্তর কল্পনাকে অভিশাপ দেওয়া থামলো যখন প্রীতি এসে ফ্লাটের দরজায় দাড়ালো।দরজায় ঝুলতে নিয়েই বলল সে,

"আপনাকে কি এখন বাসায় ঢুকার জন্য ইনভিটেশন কার্ড দিতে হবে?"

অন্ত কিছু বলতে যাচ্ছিল।কিন্তু তার আগেই প্রীতির পেছন থেকে এক মহিলার গলা শুনা গেল,

"এই মেয়ে!বাসায় আসা মেহমানকে কেউ এমন করে বলে?"

প্রীতিকে ঠেলে এক মধ্য বয়সী মহিলা বেড়িয়ে এলেন,

"আরে বাবা তুমি কিছু মনে করো না।ওর মুখ অমনই তিতা"

মুখের বাক্য শেষ হতেই যেন থমকে গেলেন তিতলি বেগম।ক্ষণিকের জন্য অমনই থাকলেন।অতঃপর অস্ফুটস্বরে 'মাশাল্লাহ' বলে উঠলেন ভদ্র মহিলা।কিন্তু পর মুহুর্তেই ব্যতিব্যস্ত ব্যবহার দেখা দিল তার মাঝে,

"আরে-আরে বাবা তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন?ভেতরে এসো।এই প্রীতি তুই সড় তো।যা গিয়ে দেখ রান্নাঘরে তোর মা-র কিছু লাগবে নাকি"

প্রীতিকে একপ্রকার ঠেলেই তিতলি বেগম অন্তকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন,

"বাবা তোমার নাম কি?"

কথা মুখ থেকে বের করতে নিয়ে গলা ভেঙে আসতে লাগলো অন্তর।তাই তো হালকা কেশে এবার ভালো করে বলে উঠল,

"মাহাদি শেখ অন্ত"

ভ্রু কুচকালেন তিতলি বেগম,

"মাহাদি শেখ?তুমি কি এহনাফ শেখের নাতি নাকি?"

মাথা দুলিয়ে বলল অন্ত,

"জ্বী আন্টি।আমি ওনার ছোট ছেলে রঞ্জক শেখ আহমেদের ছেলে"

তিতলি বেগম অন্তকে নিয়ে ড্রইং রুমেই দিকেই এগুচ্ছিলেন।সামনে ঘুরে মুখে হাসি নিয়েই শুধালেন তিনি,

"আরে দুলাভাই শুনলেন?মুহিত সাহেব যে এহনাফ শেখের কথা বলেন না?অন্ত নাকি তারই নাতি"

হালকা ভড়কে উঠে সামনে নজর দিল অন্ত।বুঝতে আর বাকি রইল না যে সামনের সোফায় প্রীতির বাবা বসে আছেন।সেদিকে নজর পড়ার পরপরই সালাম দিল অন্ত।কিন্তু সামনে বসে থাকা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ যেন গাম্ভীর্যপূর্ণ মুখোশ্রি নিয়ে অন্তকে আগা-গোড়া পরখ করতে ব্যস্ত।ক্ষণিক মুহুর্তের ব্যবধানে অন্তর সালামের উত্তর দিয়ে মুখে বড় হাসি নিয়ে ওয়াহিদ সাহেব উঠে এলেন সোফা থেকে।সাথে হ্যান্ডশেকের জন্য হাতটাও বাড়িয়ে দিলেন।অন্ত হাসি মুখে হাত মেলাতেই শুধালেন তিনি,

"নাইস টু মিট ইউ ইয়াং ম্যান।ঘুরেফিরে দেখছি পরিচিতদের ভেতরেই সবাই"

এর মাঝেই প্রীতি চা-নাস্তার ট্রে নিয়ে হাজির হলো।তাকে দেখেই ওয়াহিদ সাহেব বলে উঠলেন,

"তোমার বান্ধুবী যে এহনাফ শেখের ফ্যামিলি মেম্বার সেটা আগে বলোনি কেন?"

ঠোঁট উলটিয়ে বিড়বিড় করল প্রীতি,

"চৌদ্দো বার বলেছি।তোমার মনে থাকলে তো"

ওয়াহিদ সাহেব অন্তকে নিয়ে সোফায় বসলেন।চা-নাস্তা এগিয়ে দিয়ে কথা বলতে লাগলেন তিনি।কিন্তু চা-নাস্তা নেওয়ার ইচ্ছা যেন অন্তর মাঝে একদমই দেখা দিচ্ছে না।তারপরেও ওয়াহিদ সাহেব একটু জোরাজোরি করলে চায়ের কাপটা হাতে তুলল অন্ত।একটু আগে যেই সংকোচ বোধটা ছিল এখন সেটা অনেকটাই কমে এসেছে অন্তর।কারণটা হয়তো ওয়াহিদ সাহেবের মিসুক ব্যবহারে।প্রীতির মতো একদম কটমট করছেন না তিনি।হাসতে নিয়েই ভালো কথপোকথন চালাতে ব্যস্ত।

প্রীতি তো সেই ট্রে দিয়েই ওয়াহিদ সাহেবের সোফার হ্যান্ডেলে বসেছে।আর অদিকে এতক্ষণে তামান্না বেগম এলেন।তিতলি বেগম বোনকে আসতে দেখেই কাছে গিয়ে কানের মধ্যে কিছু ফিসফিসালেন।সেটা অবশ্য সবার চোখ আড়াল হয়ে গেল।

টুকটাক চাকরি আর পড়াশোনা নিয়েই কথা চলছিল।হঠাৎই তামান্না বেগম বোন তিতলির টোকায় এক কথা বলে বসলেন,

"তো তোমার পড়াশোনার পর বিয়েশাদির কথা কি ভেবেছো?"

তামান্না বেগমের সেই কথায় বাকি সবাই নিশ্চুপে ভড়কালেও প্রীতি হঠাৎই বিষম খেল।মায়ের থেকে নজর ঘুরিয়ে আদরের খালামণির দিকে চোখ দিয়েই অগ্নি বর্ষণ করল সে।অতঃপর উঠে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল পানি খাওয়ার উদ্দেশ্যে।

এদিকে তামান্না বেগমও নিজের কথায় বেশ হতবাক।ছোট বোনের টোকাটুকিতে হঠাৎ কি এক কথা বলে ফেললেন।

প্রীতির অমন হঠাৎ বিষম খাওয়ায় অন্ত সেদিকেই চোখ দিয়েছিল।নজর ঘুরিয়ে হালকা হেসেই তামান্না বেগমের উদ্দেশ্যে শুধালো সে,

"আসলে আন্টি,মাস্টার্সের রেজাল্টটা দিলে আগে সরকারি চাকরিতে ঢুকার প্লান আছে।বিয়েশাদির চিন্তাটা এখন আর করছি না।নিজেকে আগে স্টাবলিশ করব তারপর"

ওয়াহিদ সাহেবের হয়তো কথাটা পছন্দ হলো।অন্তর কাধে হালকা চাপড় মেরে শুধালেন তিনি,

"ঠিকই বলেছো।ছেলেদের আবার বিয়েশাদি করার নির্দিষ্ট বয়স আছে নাকি।নিজের পায়ে আগে দাঁড়ানো উচিৎ তারপর না সংসারের দায়িত্ব নেবে"

প্রীতি আর দেরি করল না।নিজের ব্যাগ নিয়ে হাজির হয়ে তাড়া দিতে লাগলো সে,

"হয়েছে তোমাদের গল্প?দেরি হচ্ছে মনে হয়"

অন্ত হয়তো প্রীতির সেই কথারই অপেক্ষায় ছিল।প্রীতির কথা শেষ হতেই উঠে দাড়ালো সে।ওয়াহিদ সাহেবের দিকে ঘুরে বলে উঠল,

"হ্যাঁ আংকেল,আমাদের মনে হয় আর দেরি করা উচিৎ হবে না।এমনিতেই অনেক লেট হয়ে গিয়েছে"

ওয়াহিদ সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে আবার অন্তর সাথে হাত মেলালেন।সাথে বড় আপসোসের সুরে বললেন তিনি,

"আহা,তোমার সাথে কথা বলে ভালোই মজা পাচ্ছিলাম।তোমার মতো লিসেনার খুব কমই দেখা যায়।ইউ আর আ ভেরি পেশেন্ট ম্যান"

সে কথায় অন্ত শুধু হালকা হাসলো।তবে প্রীতির তাড়ায় আর বেশি কথা বাড়াতে পারলেন না ওয়াহিদ সাহেব।বাসা থেকে বের হতে নিয়ে আদরের খালাকে বেশ চোখ রাঙালো প্রীতি।

#চলবে

রিচেক দেইনি।কোনো ভুল যদি চোখে ধরা পড়ে তাহলে কমেন্ট বক্সে বলিয়েন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন