ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৫৫তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৫৫

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

সারাহ রিসোর্ট গাজিপুরের খুবই নাম করা এক রিসোর্ট।আর সেখানেই তো ভিকির বিয়ের সবকিছু আয়োজন করা হয়েছে।আগামী সাতদিনের জন্য এই রিসোর্টখানাতে শুধুমাত্রই ভিকির পরিচিত ব্যক্তিদের দেখা মিলবে।অবশ্য বেশিরভাগই কানাডিয়ান।এতো বছর থেকে কানাডায় থেকে যে বন্ধু-বান্ধবদের ঝোলাটা বেশ বড়ই করেছে সাহিত্য ও ভিকি।তার উপর নামি-দামি বেশ কিছু কোম্পানির মালিককেও দাওয়াত করা হয়েছে।যতই হোক,O.S.S. কোম্পানির সি.ও.ও.-এর বিয়ে বলে কথা।সেটাও আবার O.S.S. কোম্পানির সি.ই.ও.-এর খালাতো বোনের সঙ্গে।আগামী সাত দিন যেন ভারী জমজমাট থাকবে সারাহ রিসোর্টখানা।

গাজিপুরের ঠান্ডাটা ঢাকার থেকে অনেকটাই বেশি।যেখানে হয়তো বা এই ১২টার দিকে ঢাকায় একটু রোদের মুখ দেখা দিয়েছে সেখানে যে গাজিপুরে এখনো হালকা কুয়াশার ছড়াছড়ি আবহাওয়ায়।কিন্তু এই ভারী শীতের দিকে না দেখেই সাহিত্যের রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনটা রিসোর্টের মেইন গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে হর্ন বাজাতে লাগলো।ঠান্ডায় ঝিমুতে থাকা দারোয়ান হাত-পা নড়িয়ে গেইট খুলতে বাধ্য হলো সেকারণে।

ভেতরে ঢুকে বেশ কিছুটা রাস্তা গাড়িতেই যেতে হয়।তবে সেই দূরত্ব শেষ করে গাড়িটা যখনই থামলো অমনি কল্পনা গাড়ি থেকে বেড়িয়ে শরীরের আড়মোড়া ভাঙতে লাগলো।প্রায় দেড় ঘন্টার মতো কমোড় বাকিয়ে বসে ছিল কল্পনা।মাঝখানে তো একটা ঘুমও দিয়েছে।সেটাতে অবশ্য ক্ষণিকের জন্য সাহিত্যের সুবিধাই হয়েছিল তার পাখিটাকে মন ভরে দেখার জন্য।কিন্তু আপাতত কল্পনার শরীরের অবস্থা তেমন একটা ভালো না।শরীর যেন ভেঙে আসতে চাইছে তার।

ওদিকে সাহিত্য গাড়ি থেকে কল্পনার লাগেজ নামাতে ব্যস্ত,আর এদিকে হঠাৎই কল্পনার উপর আক্রমণ চলল।এক মেয়ে এসে হঠাৎই কল্পনাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল,

"এই তুমি কল্পনা না?আল্লাহ,কি কিউট তুমি!পুরাই পুতুল একটা!দেখি-দেখি আমার দিকে ঘুরো তো একটু"

কল্পনাকে কোনো প্রতিক্রিয়া করার সময়ই দিল না।তার আগেই নিজ থেকে কল্পনাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে কল্পনার দিকে বিস্ময় ভরা চোখে দেখতে লাগলো মেয়েটা।

সামনের শ্যাম সুন্দর মেয়েকে একদমই চিনল না কল্পনা।কিন্তু সেই মেয়েকে দেখে যেন মনে হচ্ছে সে কল্পনাকে খুব ভালো করেই চিনে।কল্পনার মতোই হাটু অব্দি চুলগুলোতে সুন্দর একখানা ফ্রান্স বেনি করা।পড়নে ওয়েস্টার্ন কাপর পড়া থাকলেও বেশ মার্জিত সেই কাপড়।কল্পনা সেই মেয়েকে না চিনলেও এটা ভালো করেই বুঝলো যে মেয়েটা খাটি বাঙালী বটে।শ্যামলা চেহারায় আমেনা শেখের ফর্সা চেহারার কিছু মিল পাওয়ায় বেশ ভ্রু কুচকালো কল্পনা,

"আপনি...."

"আমি এশা।ভিকির ফিয়ান্সে।সাথে তোমার সাহিত্য ভাইয়ের খালাতো বোন"

কথাটা বলেই হালকা হাসতে লাগলো এশা।সাহিত্য কল্পনার লাগেজ হাতে নিয়ে এসে কল্পনার পাশে দাড়ালো।অমনি এশা ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে হাতে হাত ঘষতে লাগলো।সাথে আড় চোখে কিছু দুষ্টুমি বুঝিয়ে যাচ্ছে।এশার এমন কান্ড দেখে ভ্রু কুচকালো সাহিত্য।কিছু বলতে যাবে তার আগেই ভিকি এসে হাজির।কল্পনাকে দেখেই ছেলেটা হালকা কাধ দুলাতে লাগলো,

"এখন না মনে হচ্ছে রিসোর্টে মানুষ আছে।এখন অন্তত একটু হৈ-হুল্লোড় হবে"

কল্পনার কাছে দাড়িয়ে চোখ উল্টালো ভিকি।সাথে কল্পনার উদ্দেশ্যে বলেও উঠল,

"শেখ ভিলায় এই মরাটুপাগুলোর সাথে তুমি থাকো কেমন করে?কাল আসার পর থেকে সবগুলো কেমন ঝিম ধরে আছে"

ফিক করে হেসে উঠল কল্পনা,

"সমস্যা নেই।আমি জাগিয়ে দেব সবাইকে"

ভিকি হাতে এক তালি মেরে শুধালো,

"এই হলো না এক কথা!এখন না একটু বিয়ে বাড়ির ফিল পাবো"

সে কথায় কল্পনা আবার মৃদু হাসতেই এশা আবার এসে কল্পনাকে দেখতে লাগলো।বেশ আগ্রহ নিয়েই সে কল্পনাকে দেখছে।এবার ভিকির দিকে ঘুরে বলে উঠল সে,

"তুমি তো বলেছিলে কল্পনা শুধু কিউটের ডিব্বা।কিন্তু আমি তো অন্যকিছুই দেখছি।এমন একটা হট চিকসকে শুধু কিউট কেমন করে বলো তুমি?"

হঠাৎ এশার এমন কথায় উপস্থিত বাকি তিনজনই যেন ভড়কে উঠল।ভিকি কিছু বলতে যাবে তার আগেই এশা কল্পনাকে আবার জড়িয়ে ধরে শুধালো,

"কিছু মনে করো না,কেমন?তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে তো তাই বলছিলাম আরকি....সেই মানাবে!"

শেষের কথাটা এশা কিসের উদ্দেশ্যে বুঝিয়েছে সেটা ভিকি আর সাহিত্য ভালো করেই বুঝলো।কিন্তু সাহিত্য যেন চকিত হলো অনেকটা।এশার তো এ ব্যাপারে কিছু জানার কথা না।তাহলে সে জানলো কেমন করে?

এশা তার কথা শেষ করে সাহিত্যের কাছ থেকে কল্পনার লাগেজটা নিয়ে কল্পনার হাত ধরে হাটা দিল।সাথে সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বলেও উঠল কিছু,

"এদিকে যেন আর নজর না পড়ে।কল্পনার পুরো দায়িত্ব এখন আমার উপর।রাতে পার্টির আগে আর দেখা হচ্ছে না"

হুট করে এশার কল্পনাকে নিয়ে যাওয়া দেখে বেশ ভড়কালো সাহিত্য।সাথে এশার কথায় তেড়ে যেতে লাগলো সেদিকে।কিন্তু ভিকির হেচকা টানে আর পাড়ল না।ভিকি সাহিত্যকে টানতে নিয়েই বলল,

"এ ভাই থাম।তোর নাইটমেয়ার কোথাও পালাচ্ছে না।রাতে পার্টিতে তো দেখা হচ্ছেই"

এশার টানে কল্পনাও বেশ হকচকিয়ে গিয়েছে।পড়নের ফ্লাফি স্কার্ফটার কারণে তো হালকা মাথা ঘুরিয়েও পিছনের পরিস্থিতি ঠাহর করতে পারল না বটেই,তারউপর এশা তাকে পুরোপুরি ঘুরতেও দিল না।সামনে ঘুরিয়ে কাধে হাত রেখে হাসি মুখে বলল এশা,

"আহা কল্পনা তুমি টেনশন নিও না।তোমার কাছে সামিয়া যেমন আমিও তেমন।কানাডায় ১১বছর ভাইয়াকে সামিয়া যেই জ্বালাতন করতে পারেনি সেটা আমি করেছি।আই এম হিজ সিস্টার ফর্ম আনাদার মাদার"

এশার টানে কল্পনাও আর পেছনে ঘুরলো না।ঘুরলে হয়তো বুঝতে পারতো যে সে দূরে যাওয়ায় তার সাহিত্য ভাই কেমন আকুপাকু করছে।সেটা চোখে না পড়ায় এশার কথায় হেসে উঠল সে,

"ঠিক আছে আপু।আর আপনার সাথে কথা বলে মনেই হচ্ছে না যে প্রথমবার কথা বলছি।বড় মার চেহারার সাথে আপনার চেহারা অনেক মিল থাকার কারণে আরো মনে হচ্ছে আপনি আমাদের ফ্যামিলিরই কেউ"

"বড় মা?ওহ, ইউ আর টকিং আবাউট খালামনি?হ্যাঁ-হ্যাঁ, সবাই অবশ্য বলে যে আমি নাকি খালামনির মতো দেখতে।আর তুমি আমাকে আপনি করে কেন ডাকছো?এখানেই বলছো ফ্যামিলি মেম্বার আবার এখানেই আপনি করে ডাকছো?তুমি করে ডাকো।কারণ এই কয়দিনে আমি আর তোমাকে ছাড়ছি না।আমার সাথেই উঠা-বসা হবে তোমার"

এশার কথায় মুচকি হেসে 'ঠিকাছে' বলল কল্পনা।সাথে বিল্ডিংয়ের ভিতরে ঢুকে যাওয়ায় সাহিত্যের চোখে সম্পুর্ণ আড়াল হয়ে গেল।

সাহিত্য ভিকির টানেও দমলো না।কল্পনাদের যাওয়ার পানে দেখেই বলে উঠল,

"এখন সকাল,আর কই সেই রাত!আমি কল্পনাকে এখানে নিয়ে এসেছি কি হুটহাট মুখ দেখার জন্য নাকি?সারাদিন বসে দেখার জন্য এনেছি"

ভিকি এখনো সাহিত্যের হাত ছাড়েনি,

"আচ্ছা দেখিস ভাই।এশা ওকে সবার সাথে পরিচয় করাতে নিয়ে গেল হয়তো"

এবার সাহিত্য চোয়াল শক্ত করে ভিকির দিকে কটমটিয়ে ঘুরলো,

"এশা কল্পনা আর আমার ব্যাপারে কেমন করে জানে?"

ভিকি বিষম খেতে নিয়েই আটকে গেল,

"ওই...আমিই বলেছি"

"কেন!"

সাহিত্যের হুংকারে কেপে উঠল ভিকি।তারপরেও বলে উঠল,

"আরে ভাই বাধ্য হয়ে বলেছি!এশা এবার প্লান করে এসেছিল যে আমাদের বিয়ে হওয়ার আগে তোর ঘাড়ে একটা ঝুলিয়ে দেবে।তোর নাছোড়বান্দা বোন যখন কিছুতেই আমার কথা শুনছিল না তখন বাধ্য হয়ে আজ সকালে বলে দিয়েছি"

সাহিত্য ভিকির পড়নের কালো জ্যাকেটের কলার টেনে ধরল,

"আম্মু আর খালা যদি জানে তোর খবর আছে কিন্তু"

সাহিত্যের এমন কলার ধরায় তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না ভিকি,

"এশাকে আমি বুঝিয়েছি সবকিছু।কেউ কিছুই জানবে না।এখন চল তাড়াতাড়ি,ক্ষুধা লেগেছে আমার।তোর জন্যই ওয়েট করছিলাম"

সাহিত্যের হাতের বাধন কিছুটা ঢিলা হয়ে এলো।বাচ্চাদের মতো কাদো-কাদো চেহারা বানিয়ে ভিকির সিনায় মাথা ঠেকালো সে,

"আমি নাস্তা খাবো নাআআ।আমাকে আমার জানপাখি ফেরত দেএএএ।পুরো রাস্তা ড্রাইভিং করার কারণে ভালো করে দেখতেও পারিনিইই।হাতে শুধু পাঁচটা দিনই আছে।কি জন্য তোরা বউ-জামাই আমার জানপাখিকে নিয়ে উঠে-পড়ে লেগেছিস"

ভিকি মৃদু হাসতে নিয়েই সাহিত্যের মাথায় হাত বুলাতে লাগলো,

"কাঁদিস না বাচ্চা কাঁদিস না।দেখি আমি এশার সাথে কথা বলি,পার্টির আগে দেখা করে কিনা"

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

শীতের এই পরিবেশে যদিও বা বাইরের আবহাওয়া অনেক বেশিই ঠান্ডা।কিন্তু সারাহ রিসোর্টের ইনার কর্টেজের হল রুমখানায় মানুষের ভীড়ে ভালোই উষ্ণ হয়ে আছে।সাথে সেই উষ্ণ আবহাওয়াকে আরো বেশি মুখোরিত করে তুলেছে সাউন্ড বক্সে জোরদার আওয়াজে চলা 'তারিফফা' গানের স্লো এন্ড রিভার্ব ভার্সন।গানের কথাগুলো সবার কানে পৌঁছালেও হল রুমের আলোখানা সব কোণায় পৌঁছাতে পারছে না।হয়তো কোনো সময় পৌঁছাচ্ছে,আবার কোনো সময় না।বলতে গেলে কিছুটা নাইট ক্লাবের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।তবে সেটা যেন ভদ্র সমাজের বটে।

আজকের এই নাইট পার্টিটা মূলত ভিকির তরফ থেকে।কণে-বর দুজনেই উপস্থিত।তবে পার্টির নাম দেওয়া হয়েছে ব্যাচেলর পার্টি।কানাডা থেকে আগত বেশিরভাগ অতিথিই যুবক-যুবতীদের কাতারে পড়ে।তাই তাদের মনোরঞ্জনের জন্য আর বিয়ের যতসব ঝামেলা শুরু হওয়ার আগে একটু শান্তি নেওয়ার জন্যই তো ভিকির এ কাজ করা।

সিনিয়র সিটিজেনদের পার্টিতে আসার আমন্ত্রণ দেওয়া আছে।তবে তেমন কারো দর্শন পাওয়া যাচ্ছে না।হয়তো বাচ্চাদের এসব আনন্দ করা তারা একটু-আধটু হলেও বুঝছে।তবে পার্টির একটা জিনিস একদম নির্ধারিত।আর সেটা হলো ড্রেস কোড।ছেলেদের টাই সুদ্দো ফরমাল শার্ট-প্যান্ট আর মেয়েদের পার্টি গাউন।সবাই যদি এই ড্রেস কোড মেনে আসতে পারে তাহলে স্বাগতম।

হল রুমটার এককোণে ছোট করে এক ড্রিংকিং এরিয়া বানানো।সেখানেই তো দাঁড়িয়ে আছে এই পার্টির অর্গানাইজার,সাথে তার ঘনিষ্ট বন্ধুগুলো।ভিকি তার হাতে থাকা মোজোর গ্লাসে বেশ ভাব নিয়ে চুমুক বসাচ্ছে আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রবির সাথে ভবিষ্যতের কথা চালিয়ে যাচ্ছে।নজর তাদের দুজনেরই নিজেদের বউদের উপর।খানিক দূরে তারা দুজনও একই সাথে দাঁড়িয়ে।বউদের সাথে মিলিয়ে পড়নের শার্ট পড়েছে তারা।যেমন,ভিকি মাটিয়া-লালচে একখানা শার্ট আর রবি তার আদরের অর্ধাঙ্গিনী ইরার সাথে মিলিয়ে মিন্টি গ্রিন রঙা শার্ট পড়েছে।

কিন্তু তাদের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা তিন ব্যক্তি অন্য কিছুতেই মগ্ন।অয়ন পেস্ট গ্রিন রঙা শার্ট পড়ে ওয়াইনের গ্লাসে তার চুমুক বসাতে নিয়ে নজর ঘুরিয়ে যাচ্ছে সুন্দর-সুন্দর রমণীদের উপর।বেশ কয়েক মাস থেকেই বেচারা সিংগেল আছে।এবার একটাকে পটানোর খুবই জোরদার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে।অয়নের পাশেই অন্ত দাঁড়িয়ে অয়নের এসব আজগুবি কান্ড দেখছে।যাকে অয়ন কিছু সময় পরপরই রিলেশনে যাওয়ার টিপস দিয়ে যাচ্ছে।অয়নের এতোসব টিপস মাথায় না ঢুকার কারণেই হয়তো ভ্রু কুচকিয়ে রেখেছে অন্ত।এতক্ষণে তো ধুসর রঙা শার্টের হাতায় মুড়ানো হাত দুটি কালো প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছে সে।

তবে এদের সবাইকে উপেক্ষা করে যে বেশি নজরে পড়ছে সে হলো আমাদের আদরের সাহিত্য ভাই।বেচারা তো সিটে বসে টেবিলটায় মাথা একদম এলিয়ে রেখেছে।উপস্থিত এই পাঁচ যুবকের যেন শুধু একদিকটাতেই মিল রয়েছে।আর সেটি হলো পড়নের কালো টাই আর কালো প্যান্ট।তবে সাহিত্যের সেই সিংনেচার গাঢ় নেভি ব্লু রঙের শার্টের উপরে পড়া কালো টাইখানা সেই কতক্ষণ থেকে হালকা দুলে যাচ্ছে।কিন্তু সেদিকে কারো যেন খেয়ালই নেই।তবে এবার সেই ডিপ্রেশনে পড়া সাহিত্যের দিকে নজর গেল তার ছোট্ট ভাইটার।

অন্ত এবার অয়নকে সম্পুর্ণ উপেক্ষা করে সাহিত্যের দিকে ঘুরলো।সাহিত্যের এমন মনমরা ভাব বেশ কিছুক্ষণ থেকেই চোখে পড়ছে তার।কিন্তু কারণটা এখনো জানা হয়ে উঠেনি।আগ বাড়িয়ে কিছু বলতেও পারছে না।যদি ছ্যাত করে উঠে?তারপরেও ভাইয়ের এমন কষ্টের দিকটা দেখেই যেন বলে উঠল সে,

"ভাইয়া।কি নিয়ে এতো টেনশন করছো?টেনশনটা একটু কমা যায় না?.....বিয়ার দিতে বলব কি?তোমার নাকি বিয়ার খেলে মাথা ঠান্ডা হয়"

সেই দেশে ফেরার পর সাহিত্যের ভোর ৩টার দিকের কথা স্মরণে আসতেই শেষের সেই কথা বলে উঠে অন্ত।তবে সাহিত্য কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও অয়ন পাশ থেকে বলে উঠল,

"সাহিত্য ওগুলো হারাম করেছে তুই জানিস না?ও তো এখন আমার সাথে সিগারেটও জ্বালায় না"

ভালো করেই ভ্রু কুচকালো অন্ত,

"সেটা আবার কবে থেকে হলো?"

মন খুলে হাসলো অয়ন।হাসি থামিয়ে বলে উঠল,

"কল্পনা ওরে চড় মেরেছিল ওগুলো খাওয়ার জন্য"

"কি!!"

অন্ত ভড়কে উঠেই কথাটা বলে সাহিত্যের দিকে ঘুরলো।চোখ-মুখ টেবিলে ঢেকে রাখা সাহিত্যকে জিজ্ঞেস করল সে,

"ভাইয়া সত্যি??এটা কবে হলো?"

সাহিত্য তো এমনিতেও কোনো প্রতিক্রিয়া করল না।তবে অন্ত সাহিত্যকে কিছু বলার সময় না দিয়েই ভারী শ্বাস ফেলে নিজ থেকেই বলে উঠল,

"অবশ্য কল্পনার কাছ থেকে সেটা আশা করা কোনো ভুল কাজ না।সে তো এমনিতেই ওগুলো পছন্দ করে না।আর তারউপর ভাইয়ার খাওয়ার কথা শুনে তেমন প্রতিক্রিয়া আশানুরূপ"

কথাটা বলেই ফিক করে হেসে উঠল অন্ত।কল্পনার হাতে সাহিত্যের চড় খাওয়ার দৃশ্য ভাবনায় ফুটিয়ে তুলতে গিয়েই যেন সেই হাসি।তবে সেই হাসি আর দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠল না।পকেটের ফোন বাজতেই অন্ত স্থান ত্যাগ করল।আর এদিকে ভিকি অবশেষে এগিয়ে এলো সাহিত্যের দিকে।সাহিত্যের কাধে জোরে-জোরে হাত চাপড়িয়ে শুধালো সে,

"আরে হয়েছে,এতো দেবদাস হয়ে থাকতে হবে না।কল্পনা মনে হয় রেডি হচ্ছে।বাচ্চাটাকে একটু সুন্দর করে সাজতেও দিবি না?"

এতক্ষণে সাহিত্যের মুখোশ্রির দেখা মিলল।কিন্তু সেটা যেন ভারী গম্ভীর হয়ে আছে।ভিকির দিকে মাথা ঘুরিয়ে কটমটিয়ে উঠলো সে,

"তুই একদম কথা বলবি না।সকালে বললি তুই এশার সাথে কথা বলবি।এই তোর কথা বলা?সারাটাদিন গেল আমি আমার জানপাখিটাকে একবারও দেখতে পারিনি।এর থেকে তো ভালো ছিল তোর বিয়েতে না এসে আমি কল্পনাকে নিয়ে শেখ ভিলাতেই থাকতাম"

"এতোই যখন কল্পনাকে দেখতে ইচ্ছা করছে তো হোয়াটস অ্যাপে ওর একটা ছবি চাইলেই তো পারিস"

সবাই অয়নকে বেশ কয়েকবার পরামর্শ দিয়েছে সাহিত্যের আশেপাশে যেন তেমন মুখ না খুলে।কিন্তু অয়ন যেন প্রতিবারই নিজের মুখ খুলার শাস্তি ভুলে বসে।

হঠাৎ অয়নের এমন কথায় সাহিত্য আর ভিকি ক্ষণিক সময় দেখে থাকলো তার দিকে।অতঃপর সাহিত্য ভিকিকে ডিঙ্গিয়ে অয়নের গলায় ঝুলানো টাইটা টেনে ধরল।মুখে কৃতিম হাসি ফুটিয়ে দাঁত চিবিয়ে বলল সাহিত্য,

"ওয়াও দোস্ত,কি ভালো আইডিয়াটা দিলি।আমার তো সেটা মাথাতেই ছিল না"

এবার চেচিয়ে উঠলো সে,

"আব্বে বিনা নেটওয়ার্কের সিম কার্ড!!কল্পনা আর আমি তো প্রেম করছি তাই না?যে আমি চাইতেই ও কিছু না বলেই আমাকে ছবি পাঠাবে!!কমন সেন্স বলে কি তোর মাথায় কিছু আছে রে মোজোর বোতল!!"

অয়নের টাই ধরে সাহিত্য এতো টানাটানি করছিল দেখে এবার ভিকি তাদের মাঝে ঢুকে পড়ল।সাহিত্যের হাত থেকে টাইটা ছাড়িয়ে নিয়ে বেচারা অয়নকে জীবন দান করে ভিকি সাহিত্যের দিকে ঘুরলো,

"এতো হাইপার হোস না।পার্টি তো কেবলই শুরু হলো।কল্পনা আসছে মনে হয় কিছুক্ষণ পরেই।তখন সারারাত বসে দেখিস ওরে।এখন মাথাটা একটু ঠান্ডা কর।একটু পানি খেয়ে নে"

সাহিত্য আবার টেবিলে মাথা এলিয়ে দিল।কল্পনার সাথে যে একদমই কথা হয়নি তেমনটা নয়।সকাল থেকে তো সেই ম্যাসেজেই টুকটাক কথা চলছে।কল্পনা নাকি সারাদিন শেখ পরিবারের সদস্যদের সাথেই ছিল।প্রীতি যে কল্পনা আসার কিছুক্ষণ পরেই এসেছে সেটাও জানিয়েছে সাহিত্যকে।কিন্তু সাহিত্যের মন যেন কিছুতেই ভরেনি সেই হালকা ম্যাসেজ আদান-প্রদানে।কল্পনার কন্ঠটা শুনার জন্য যেন গলা শুকিয়ে আসছে ছেলেটার।ভিকির উদ্দেশ্যে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল সাহিত্য,

"আমি খাবো না কিছু।আমাকে আমার জানপাখি দে।সেই সকাল থেকে শুধু অক্সিজেনই ভেতরে ঢুকেছে।কল্পনার স্মেলের দরকার আমার"

ভিকি সাহিত্যের এমন আজগুবি কথায় তার দিকে ভাবলেসহীন দেখতে লাগলো।আর তার পাশে অয়ন গলার টাই ঠিক করে ঝুলে পড়ল ভিকির কাধে,

"সাহিত্য কিন্তু পুরোটাই গিয়েছে।দুপুর থেকে দেখছি কেমন হাসফাস করে ঘুরছে ও।কল্পনা কি কালা জাদুটাই না করেছে ওর উপর"

ভিকি ঠোঁট বাকিয়ে ধীমি আওয়াজে বলল,

"কল্পনা কালা জাদু করেনি।অহি নিজেই কালা জাদু করে নিজেকে ফাসিয়েছে"

এতক্ষণে রবি এসে সাহিত্যের পাশে দাড়ালো।চোখের নজর দূর দিগন্তে রেখে বলল সে,

"ওই দেবদাস,দেখ তোর পারবতি এসেছে"

রবির কথাটা শুধু শেষ হওয়ার বাকি অমনি সাহিত্য হুড়মুড়িয়ে মাথা তুলে সেদিকে নজর দিল।ব্যতিব্যস্ত আচরণ পর মুহুর্তেই যেন শান্ত হয়ে গেল তার।

হল রুমের আলোরা এখনো স্থির নেই।এদিক-ওদিক ঘুরছে তারা।কিন্তু সেই কাপতে থাকা আলোতে সাহিত্য তার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেয়সীকে খুব ভালো করেই দেখতে পারছে।

কেনই বা সব সময়ের জন্য সাহিত্যের প্রেয়সীকে সবার থেকে আলাদা দেখাবে?মেয়েটা যেন আলাদাভাবেই সবার চোখে ফুটে উঠতে বাধ্য।আর বর্তমানে পড়নের অরগানজা ফেইরি গাউনটার জন্য যেন ঠিক পুতুলের মতোই লাগছে।

হাটুর নিচ অব্দি ফুলকো হয়ে থাকা সাদা গাউনটার পুরোটাই আসমানী রঙা ফ্লোরাল প্রিন্ট দিয়ে ভরাট।মাথার ঘন কালো কেশগুলো যেন কল্পনা ইচ্ছা করেই বাধন হারা করে রেখেছে সাহিত্যকে অকেজ করার জন্য।সে কথা অবশ্য সাহিত্যের একান্তই নিজের মনে তৈরি হওয়া ভাবনা।সাদা গাউনটার নিচে ফর্সা পাগুলো কি যথেষ্ট ছিল না?তার নিচে সিন্ড্রেলা টাইপ সাদা ম্যাট ফিনিস সু-ও পড়তে হবে কল্পনাকে?আর এতো সাজসজ্জাকে যেন আরো কয়েকগুণ ফুটিয়ে তুলেছে সেই হার্ট সেইপ অধর জোড়ায় লেপ্টানো লালচে খয়েরী রঙা লিপস্টিকটা।এতো দূর থেকেও যে সাহিত্য সেই অধর জোড়ার সুক্ষ্ম কম্পন দেখতে সক্ষম।

কল্পনা এদিক-ওদিক নজর ঘুরালেও সাহিত্য তার প্রেয়সীর দিকে নজর স্থির রেখেই সিটখানা থেকে উঠে দাড়ালো।হৃদয়টা যে তার হালকা শীতল হতে শুরু করেছে এতক্ষণে।ঠোঁটে হাসি ফুটল তার।সেটার সাথে বাকিদের উদ্দেশ্যে বলে উঠল সে,

"দেবদাস পারবতিকে কেন নিজের করে পায়নি জানিস?কারণ পারবতির জায়গায় না কল্পনা ছিল,আর না দেবদাসের জায়গায় ছিল এই সাহিত্য"

কথাটা শেষ করেই সাহিত্য তার প্রেয়সীর দিকে হাটা দিল।পেছনে ফেলে রাখা তার তিন বন্ধু যেন সাহিত্যের এতো গভীর এক কথার অর্থ খুব ভালো করেই বুঝলো।যার উত্তর তাদের ঠোঁটের সুক্ষ্ম এক হাসির ঝলক।

নিজের শার্টের হাতা গুটাতে নিয়েই সামনে এগুচ্ছিল সাহিত্য।এর মাঝেই সাউন্ড বক্সের গান পরিবর্তন হয়ে গেল।সেই গানের মিউজিকে মেকি হেসে গলার টাইয়ের নটটা অনেকটাই ঢিল করে দিল সে।হয়তো গানের কথাগুলোর সাথে তার মনের কথা অনেকটাই মিলতে সক্ষম হবে সেজন্যই।শুরুর দিকের মিউজিক শেষ হতেই সাহিত্য এসে কল্পনার হাতটা হেচকা টান দিল।সাহিত্যের দিকে নজর পড়ার সাথে-সাথে কানে গানের কথাগুলো বেজে উঠলো কল্পনার।

❝ গড়িয়ে,তু কিন্নি গড়িয়ে,

তু জামিন পে চান্দ কি জোড়িয়ে।

বুড়িয়ে,বাড়ি বুড়িয়ে,

দুনিয়া কি নিয়াত ছোড়িয়ে।

নাযার না লাগ যায়ে জানু,

থট এ ঘাবড়ায়ে সানু

নাযার না লাগ যায়ে জানু,

থট এ ঘাবড়ায়ে সানুউউ ❞

সাহিত্যের সেই মাটিয়া-সবুজাভাব চাহনিতে যেন গানের কথাগুলো খুব ভালো করেই প্রতিফলিত হচ্ছে।তবে সাহিত্যের এমন হঠাৎ হেচকা টানে এবং তার নেশালো চাহনির সামনে নিজেকে সামলাতেই হয়তো সাহিত্যের প্রশস্ত বুকে বাম হাতের তালু ঠেকিয়ে দিল কল্পনা।

এতক্ষণ থেকে কল্পনা আশেপাশে প্রীতিকে খুজে যাচ্ছিল।কল্পনার রেডি হতে একটু দেরি হচ্ছিল দেখেই তো প্রীতিকে সে বাকিদের সাথে চলে আসতে বলে।কিন্তু হল রুমে ঢুকে চোখের সামনে পরিচিত কাউকে না দেখতে পেয়েই ঠাই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আশেপাশে নজর ঘুরাচ্ছিল সে।কিন্তু হঠাৎ সাহিত্যের এমন আগমনের একদমই আশা করেনি।

সাহিত্যের হেচকা টানে নিজেকে সামলিয়ে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল কল্পনা,

"সাহিত্য ভাই,আপনি?"

সাহিত্য তো তার প্রেয়সীর ডান হাত আকড়ে ধরে আরেক হাত নিজের পেছনে বেধে রেখেছে।প্রেয়সীকে এখনই যেন অত গভীরভাবে ছুতে চাইছে না সে।কল্পনার আদুরে আদলখানার দিকে কোমল নজর রেখেই শুধালো,

"কই ছিলি এতক্ষণ?আমার ডান্স পার্টনারের যে অভাব পড়ে গিয়েছিল"

কল্পনা সাহিত্যের কথা শুনে আশেপাশে নজর ঘুরাতে নিয়েই বলল,

"অনেকেই তো একাই দাঁড়িয়ে আছে।তো ডান্স পার্টনারের অভাব কেন পড়বে?..."

কল্পনার কথা শেষ হওয়ার একদম পর মুহুর্তেই ঠোঁট বাকিয়ে কল্পনার হাতটা উপরে উঠিয়ে একটা ঘুরানি দিল সাহিত্য।তাতে কল্পনার ফ্লোরাল গাউনটা নড়ে উঠার সাথে তার লম্বা কেশগুলোও সাহিত্যের শরীরে ছুয়ে গেল।হঠাৎ এমন একটা ঘুরানিতে আবারো হকচকিয়ে গেল কল্পনা।কিন্তু কানে এলো সাহিত্যের কোমল কন্ঠ,

"প্রিন্স চার্মিং-এর সামনে অনেক প্রিন্সেসই ছিল।কিন্তু সিন্ড্রেলা আসার পরেই সে প্রথম ডান্সটা করে"

কল্পনা পূর্ণ ঘূর্ণনের পর আবারো সাহিত্যের দিকে থমকে দাড়ালো।সাহিত্যের কথাটা বেশ অবাক করে দিয়েছে তাকে।কিন্তু সাহিত্য যেন কল্পনাকে স্বাভাবিক করতেই মুখের হাসি বড় করে বলে উঠল,

"ছোটতে সিন্ড্রেলা দেখার সময় একটা কথা বলেছিলাম মনে নেই?কোনো বল ডান্সে কেউ থাকুক আর না থাকুক।তোর ফার্স্ট ডান্স তোর সাহিত্য ভাই-ই হবে"

এবার কল্পনাও হেসে উঠল।সাহিত্য তো সেই তখনই গানের তালে নড়তে শুরু করেছে।এবার যেন কল্পনাও তাল মিলালো।মিষ্টি-মিষ্টি শান্ত গানটায় যেন দুই নর-নারী ক্ষণিক মুহুর্তের মাঝেই ডুবে গেল এক সুন্দর কাপল ডান্সে।

#চলবে

আপনারা কি নোটিস করছেন,গল্পের প্রচ্ছদ হিসেবে নিচের যেই ছবিটা দেই সেটা একটা ওয়েল পেইন্টিং?সেটার যথেষ্ট কারণ আছে।আপনাদের সাহিত্য ভাই একজন আর্টিস্ট কিন্তু😌তাই তো প্রচ্ছদটা এমন🫣

আর আজকে সাহিত্য ভাই কল্পনাকে যে ঘুরানিটা দিয়েছে ছবিটা সেইরকম-ই🥹❣️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন