ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৫৭তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৫৭

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

শীতের এই দুপুরটায় নাচ-গানের আসরের কারণেই যেন মাঠের মাঝের উষ্ণভাবটা অনেক বেশি।এতক্ষণ থেকে তো নাচেরই ধুম পড়েছিল মাঠটায়।ছেলে-মেয়েরা যেন মন খুলে নাচতেই ব্যস্ত।তবে অবশেষে নাচের পর্ব চুকিয়ে হলুদ মাখার দিকে এবার বেশি মন দিল সবাই।সবাই ভিকি আর এশার গালে হলুদ লাগালেও ভিকির তিন ঘনিষ্ঠ বন্ধু যেন এখনো তার ধারের কাছে যেতে পারেনি।এতো ব্যস্ততা যেন এই ছেলে তিনটার মাঝেই দেখা দিচ্ছে।কিন্তু কল্পনা যেন সেই ব্যস্ত তিনজনের একজনকে খুব ভালো করেই পরখ করে যাচ্ছে।

সাহিত্য এক জায়গায় স্থির নেই।তবে কল্পনার চোখ আড়াল যেন হতেই পারছে না সে।কল্পনা এক কোণে চেয়ারে বসে মুখ ফুলিয়ে সাহিত্যকে নিজের নজর বন্দি করে রেখেছে।কিছুক্ষণ আগের বিছা খোলার কথাটাতেই যেন এখনো মুখ ফুলিয়ে রয়েছে সে।সাহিত্য তো অমন করে বিছাটা না-ও ছিড়তে পারতো।সেই বিছাটা যে বড়ই পছন্দ হয়েছিল কল্পনার।ওটাকে অমন টেনে ছিড়ার কি মানে হয়।আর কল্পনাকে অমন লজ্জাজনক এক পরিস্থিতিতে ফেললই বা কেন?

তবে সাহিত্যের উপর কল্পনার অতোটাও রাগ উঠছে না।যা হয়েছে-হয়েছে।এখন হলুদের মজা নিক।কিন্তু সেই সময়ের কথা মনে পড়লেই লজ্জার কারণেই হয়তো,জেদ মিশ্রিত রাগটা বেড়িয়ে আসছে মেয়েটার।

প্রীতি কল্পনার পাশেই বসে আছে।কল্পনা তাকে বিছার ব্যাপারে কিছুই জানায়নি।তাই তো প্রীতি জিজ্ঞেস করতে-করতে এখন হাল ছেড়ে দিয়ে বসে রয়েছে।এমন সময় কোথা থেকে যেন অনু হুড়মুড়িয়ে কল্পনার কাছে এলো।কল্পনাকে উদ্দেশ্য করে ব্যতিব্যস্ত হয়েই শুধালো সে,

"আপু আপু আপু!!তোমার কমোড়ের বিছাটা খুলো।আম্মু তোমাকে সেটা এখনই খুলতে বলল"

কল্পনা সাহিত্যের দিকে কঠিন নজর রেখেই বলে উঠল,

"খুলেছি"

কল্পনার বলার পরেও যেন অনুর বিশ্বাস হলো না।তাই তো কল্পনার হাত সড়িয়ে দেখতে লাগলো সে।কিন্তু কল্পনার যেন সেদিকে ভ্রুক্ষেপই নেই।অনু একদম নিশ্চিত হয়েই এক শ্বাস ফেলল।সেটা দেখে ভ্রু কুচকে শুধালো প্রীতি,

"এমন কি হয়েছে সেই বিছায়,যে এতো চিন্তায় আছো?"

অনু প্রীতির পাশের চেয়ারে বসতে নিয়েই বলল,

"আম্মু আমাকে ডেকে বলল কল্পনা আপুকে যেন বিছাটা খুলতে বলি।জিজ্ঞেস করলে বলল যে আপুর কমোড়টা নাকি চোখে পড়ার মতো লাগছিল।আম্মু ব্যস্ত থাকার কারণে আপুর কাছে এসে সেটা বলতে পারেনি।আম্মুর টেনশন হচ্ছিল যে এতোগুলো ছেলে আছে আশেপাশে।তারউপর বেশিরভাগই বিদেশি।বলা যায়না কে কখন নজর দিয়ে বসে।বিয়ে বাড়িতে সেটা কারো নজরেও পড়বে না।আর সাহিত্য ভাইয়াও তো অনেক ব্যস্ত যে সেদিকটায় খেয়াল রাখবে"

কথাটা বলেই অনু ফিক করে হেসে উঠল,

"আসল কথা কি জানো?কল্পনা আপুর কমোড়টা অনেক সেক্সি লাগছিল"

অনু আর প্রীতি দুজনেই কল্পনার দিকে দুষ্টু নজর দিতে লাগলো। কিন্তু কল্পনার কড়া নজর এখনো অদূরে।মিনমিন করে কটমটিয়ে উঠলো সে,

"চাচীমার চোখে সেক্সি লাগছিল।আর কারো একজনের চোখে বিদঘুটে লাগছিল।তাই তো বেয়াদব লোকটা টেনে আমার বিছাটা ছিড়েছে"

এবার প্রীতি কল্পনার একটু গা ঘেঁষেই বসলো,

"তখন থেকে কটমট না করে বলবি কি একটু,যে হয়েছেটা কি?সাহিত্য ভাইয়াকে তখন থেকে গিলে খাচ্ছিস কেন?"

প্রীতির দিকে ঘুরে এবার কাঁদো গলায় বলতে লাগলো কল্পনা,

"কারণ ওই বেয়াদব লোকটা আমার এতো সুন্দর বিছাটা ছিড়ে ফেলেছে!"

সে কথায় প্রীতি আর অনু বেশ ভড়কালো।তবে প্রীতি শান্ত থেকেই বলে উঠল,

"কেন ছিড়েছে?"

একই কন্ঠ কল্পনার,

"উনি খুলতে বলেছিল খুলিনি দেখে তাই"

"তো ভাইয়া তো ঠিকই করেছে।তুই জেদখোরের মতো জেদ ধরে থাকবি আর ভাইয়া কি সারাক্ষণ তোকে কাভার করে ঘুরবে নাকি?"

"তারপরও,আমার কতো পছন্দ হয়েছিল বিছাটা।শাড়ির সাথে কি সুন্দর সেট করে পড়েছিলাম।আর উনি সেটা কেন করল?"

প্রীতি প্রতিবারের ন্যায় খুব সহজেই বিষয়টা বুঝলো।সাহিত্যের বিছা খোলার কারণটাও বুঝেছে।কিন্তু এই জেদিকে কে বুঝাবে?তবে কল্পনাকে বুঝানোর জন্যই যেন প্রীতি এবার বলে উঠল,

"কোনো অচেনা ছেলে যদি এসে তোর কমোড়ে হাত দেয় তাহলে কি তোর ভালো লাগবে?"

নাক কুচকালো কল্পনা,

"কিসব বাজে কথা বলছিস?চড় খাবে সেই ছেলে আমার হাতে"

প্রীতি কাধ উঁচু করে বলল,

"কোনো ছেলে যেন তোর হাতে চড় না খায় সেজন্যই সাহিত্য ভাইয়া তোকে বিছা খুলতে বলেছিল"

কল্পনা হয়তো অর্ধেক কথা বুঝলো।কিন্তু তারপরেও তার যুক্তি চালিয়ে গেল,

"কিন্তু শাড়ির কারণে তো বিছাটা অতো দেখা যেত না"

প্রীতি আবারো শান্ত স্বরে শুধালো,

"ছেলেদের নজর কতটা তীক্ষ্ণ সেটাও সাহিত্য ভাইয়ার জানা আছে"

কল্পনা যেন এবার নিজের বিছা হারানোর অভিমান পাশে রেখে চিন্তা করতে লাগলো।সময় নিয়ে পিটপিট করে সে প্রীতির দিকে দেখতে লাগলো,

"তার মানে সাহিত্য ভাই যেটা করেছে সেটা ঠিক?"

নির্দ্বিধায় বলল প্রীতি,

"শতভাগ"

কল্পনা আবার সাহিত্যের দিকে নজর ঘুরালো।এতক্ষণে সাহিত্য,রবি আর অয়ন ভিকির কাছে যেতে পেরেছে।হাসি-ঠাট্টা করে কথা বলছে তারা।সেটা দেখে যেন কল্পনার মুখেও হাসি ফুটল।

"আমি সাহিত্য ভাইকে থ্যাংক ইউ আর সরি বলে আসি"

কথাটা বলেই সাহিত্যের দিকে হাটা দিল সে।

সাহিত্য তার দিকে কল্পনাকে আগাতে দেখে মেকি হেসে উঠল।এতক্ষণ থেকে কি শুধু কল্পনাই সাহিত্যকে পরখ করে যাচ্ছিল নাকি?সাহিত্য শত ব্যস্ত থাকার পরেও তার প্রেয়সীকে নজরে রেখেছিল।হয়তো সেই দৃশ্য কল্পনার চোখের আড়াল হয়েছে।কিন্তু সাহিত্য তো ঠিকই বুঝতে পেরেছিল যে তার জানপাখিটা গাল ফুলিয়ে তাকেই দেখে আছে।দেখুক-দেখুক,সাহিত্যের প্রেয়সীটা সাহিত্যকে দেখছে দেখুক না একটু।এমন করে আবার দেখেই বা কখন?তাই তো সাহিত্য প্রেয়সীর চোখের আড়াল হয়নি।আশেপাশেই ঘুর-ঘুর করছিল ছেলেটা।

কল্পনা স্টেজের কাছে আসতেই এশা গলা উঁচিয়ে ডাকতে লাগলো তাকে,

"এই সুন্দরী!এতক্ষণ কই ছিলা তুমি?কি একটু হাত ছাড়া করেছি তাই বলে পালিয়েছো?আমার গালে হলুদ কে লাগাবে?"

মুখে হাসি নিয়ে স্টেজে উঠল কল্পনা,

"এতক্ষণ অনেক ভীড় ছিল তো তাই এখন এলাম"

কল্পনা এশার থেকে ভিকির দিকে নজর দিতেই ভড়কে উঠল।ভিকির অবস্থা দেখার মতো নেই।বেচারাকে হলুদের স্তুপ করে রেখেছে ছেলেগুলো।ভ্রু কুচকিয়ে সেপাশ থেকে নজর ঘুরিয়ে আবার এশার দিকে দেখল কল্পনা।কল্পনার মনভাব বুঝতে পেরেই হেসে উঠল এশা।সাথে সাহিত্যের দিকে দেখে বলেও উঠল,

"ভাইয়া তুমি এখনো আমাকে হলুদ লাগিয়ে দাও নি।এবার অন্তত একটু দাও"

এশার সে কথায় কল্পনার চোখের আড়ালে হাসলো সবাই।সাহিত্য এশাকে হলুদ লাগিয়ে দেয়নি সেটা পুরো দমেই মিথ্যা কথা।এমনকি সাহিত্য স্টেজে উঠে ভিকির আগে এশাকেই হলুদ লাগিয়েছে।কিন্তু এশা হয়তো কল্পনা ও সাহিত্য দুজনের কাছে একসাথে হলুদ লাগিয়ে চাইছে।তাই তো সাহিত্য ও কল্পনাকে উদ্দেশ্য করে আবার বলে উঠল সে,

"তোমরা আসো তো তাড়াতাড়ি।তোমাদের হাতে হলুদ মেখে আমি এগুলো ক্লিন করতে যাব।নাহলে ছবি ভালো আসবে না"

সময় নষ্ট করল না সাহিত্য।বাকা ঠোঁটে মুচকি হাসি নিয়ে এশার দিকে এগিয়ে গেল।কল্পনাও যেন আমতা-আমতা করতে নিয়ে এগিয়ে গেল সেদিকে।অতঃপর এশার দুই পাশে রাখা হলুদের বাটি থেকে হলুদ নিয়ে দুজনেই এশার গালে হলুদ লাগালো।ভিকির ব্যতিব্যস্ত ইশারায় সে দৃশ্য যেন এক ক্যামেরাম্যান ধারণ করল তার মুঠো ক্যামেরাটায়।

কল্পনা এশাকে হলুদ মাখাতে নিয়েই আড় চোখে পরখ করল সাহিত্যকে।অতঃপর ফাজিলের মতো এক কান্ড করে বসল সে।হলুদ মাখা হাতখানা হঠাৎই ছুঁয়ে দিল সাহিত্যের গালে।কিছু মুহুর্ত স্তব্ধ থেকে যেন হেসে উঠল মেয়েটা।সেই কাজে যেন বাকিরাও আর বিরতি রাখলো না।

তবে সাহিত্য কি কল্পনার থেকে কম কিছু নাকি?সে তো আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে।হাসতে থাকা কল্পনার দিকে চোখ রেখেই হলুদের বাটিতে হাত ঢুকিয়ে দিল সে।সেপাশে নজর পড়তেই হাসি বন্ধ হয়ে চোখ জোড়া কটোর ফাটিয়ে বেড়িয়ে আসতে চাইলো কল্পনার।সাহিত্যের বাকা হাসি যুক্ত মুখোশ্রিতে নজর দিল।অতঃপর জিহ্বা যেন কাপতে লাগলো মেয়েটার।'সাহিত্য ভাই একদম কাছে আসবেন না!' বলেই ভো দৌড় লাগালো সে।তবে সাহিত্য সে কথায় থামলো না।কল্পনার পেছনে সে-ও দৌড় লাগালো।স্টেজে থাকা বাকি সবাই সেই দৃশ্যে ক্ষণিক সময়ের জন্য চুপ থাকলেও পর মুহুর্তেই হো হো করে হাসতে লাগলো।

সবাই এতক্ষণে হলুদ লাগিয়ে প্রায় সংখ্যক মানুষ রুমের উদ্দেশ্যে চলে গিয়েছে।তাই তো মাঠটাতে তেমন মানুষ নেই।বিকেল সময়ে আশপাশটা একটু শান্তই বলা যায়।কিন্তু হঠাৎ সাহিত্যের কল্পনাকে দাবড়ানি দেওয়ার বিষয়টা যেন হৈড়ৈ ফেলে দিল।

"সাহিত্য ভাই কি জন্য আমার পিছে লেগেছেন!একটু হলুদই তো শুধু লাগিয়েছি!!সেটাতে এমন ধাওয়া করার কি আছে!আপনি এখন আমার গালে হলুদ লাগালে আমি আর ভালো ছবি তুলতে পারবো নাআআ!!থামেন!!!"

কল্পনার এতো-এতো কথায় যেন সাহিত্যের কিছুই হলো না।সে তো মন-প্রাণ ছেড়ে দিয়ে দৌড়ানো কল্পনার পিছে ছুটতে ব্যস্ত।ঠোঁটে তো তখন থেকেই এক চিলতে হাসি ঝুলছে।

এবার কল্পনা এসে আমেনা শেখকে আকড়ে ধরল,

"বড় মা!!বড় মা!বাঁচাও!"

কল্পনার হুড়মুড়িতে ভালোই নড়ে উঠলেন আমেনা শেখ।সাহিত্যকে তার দিকে এমন ব্যস্ত পায়ে আগাতে দেখে বেশ ভড়কালেন তিনি।পেছনে তাকে আকড়ে ধরে রাখা কল্পনার উদ্দেশ্যে শুধালেন,

"কি আবার অকাজ করেছিস যে সাহিত্য তোর পিছে পড়েছে?"

কল্পনা তার বড় মাকে জাপ্টে ধরে মাথা ঝাকিয়ে বলল,

"বিশ্বাস করো,আমি কিচ্ছু করিনি!শুধু একটু হলুদ গালে লাগিয়ে দিয়েছি"

এতক্ষণে সাহিত্য আমেনা শেখের সামনে এসে দাড়িয়েছে।মায়ের জামা-কাপড়ে হলুদ লাগানোর কোনো ইচ্ছা নেই সাহিত্যের।যার দরুন কপালে ভাজ ফেলে শান্ত স্বরেই বলে উঠল,

"আম্মু সড়ো সামনে থেকে"

কল্পনা যেন আরো ভালো করে আকড়ে ধরল আমেনা শেখকে।সাহিত্যের দিকে নজর রেখেই শুধালেন আমেনা শেখ,

"আরে নাহয় মাখিয়েছে একটু হলুদ।তাই বলে বচ্চাটাকে এমন দাবড়ানি দিচ্ছিস কেন?"

সাহিত্য নিজের কথায় অটল রইল।নাক-মুখ কুচকে শুধালো সে,

"সড়ো তো বলছি!ওর আর আমার মাঝে ঢুকিও না তো"

কল্পনা বুঝলো যে আমেনা শেখ আর তাকে বাঁচাতে পারবেন না।তাই তো আবার ছুটে পালালো মেয়েটা।ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে কল্পনার দিকে নজর রেখে ক্ষণিক সময় সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকলো সাহিত্য।অতঃপর আমেনা শেখ কিছু বলতে যাবেন তার আগেই আবার কল্পনার দিকে দৌড় লাগালো।আমেনা শেখ কিছু বলতে গিয়েই থেমে গেলেন।সাহিত্য-কল্পনার এমন কান্ড দেখে হাসতে লাগলেন তিনি।

মাঠের এক দিকে বেশ সুন্দর করে একখানা খোলামেলা তাবু টাঙানো।দুই পাশে বন্ধ রেখে সামনে পেছন উন্মুক্ত।এক দিকের একপাশে লাল,হলুদ,কমলা লম্বাটে কাপড় ঝুলিয়ে রাখা।তবে সেই কাপড়গুলোরও একপাশের কিছু অংশ এক প্লাস্টিকের বড় খাচার দেয়ালের সাথে সুন্দর করে বেনুনি গেথে রেখেছে।এস্থেটিক ছবি তুলার জন্যই মনে হয় বানিয়েছে জায়গাটা।তবে বর্তমানে সেই ফাকা জায়গাটা কল্পনার আশ্রয় স্থল হয়ে দাড়ালো।

কল্পনা নিজের জান বাচিঁয়ে লাল,কমলা,হলুদ মিশ্রিত কাপড়ের পেছনে এসে লুকিয়েছে।নিজের শ্বাস সংযত করে কাপড়গুলোর ফাক দিয়ে মাথা বের করে দিল সে।সুক্ষ্ম চোখে সাহিত্যকে খুজতে লাগলো।কিন্তু সাহিত্যের কোনো ছিটে ফোটা না দেখতে পেয়েই কাঁদো গলায় শুধালো সে,

"এই লোকটা কি একটুর জন্যেও আমাকে শান্তিতে থাকতে দিবে না?হলুদই তো লাগয়েছি,মরিচের গুড়া তো আর লাগাইনি!না জানি হাতে ধরা পেলে কি করবে আমার।শাড়ি পড়ে এমন দৌড়ানো যায়?!"

কথাটা শেষ করেই কল্পনা পেছনে ঘুরলো।অপ্রত্যাশিতভাবে পেছনে সাহিত্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে 'হায় আল্লাহ!!' বলে হাতে-পায়ে কেপে উঠল মেয়েটা।সাহিত্য হাতে হলুদ আর মুখে হাসি নিয়ে কল্পনার দিকেই দেখে আছে।কল্পনা এর মাঝেই পালাতে চাইলো।কিন্তু সাহিত্যের হাতের টানে আর পাড়ল না।আছড়ে পড়ল প্লাস্টিকের খাচার দেয়ালের উপর।সাথে চোখ জোড়াও খিচে বন্ধ করে নিল,

"সাহিত্য ভাই না,প্লিজ!"

কল্পনার আর্তনাদ শুনলো না সাহিত্য।প্রেয়সীর সাজ নষ্ট করতেই যেন এগিয়ে গেল।তবে হলুদ মাখা হাতটা কল্পনার গালে না লাগিয়ে নিজের চাপ দাড়ি যুক্ত গালে ছুইয়ে দিল।অতঃপর ঝুকে এসে মোটা স্তরের হলুদে আবৃত শক্ত গালটা নির্দ্বিধায় ঘষে দিল প্রেয়সীর নরম গালে।

সাহিত্যের এমন অপ্রত্যাশিত ব্যবহারে চোখ জোড়া খুলে ভালোই বড় আকার ধারণ করল কল্পনার।সাথে সাহিত্যের চাপ দাড়ির খরখরে ছোয়ায় কেপে উঠল ছোট নারী কায়া।খামচে ধরল পেছনের হরেক রঙা কাপড় যুক্ত গ্রিলখানা।

সাহিত্য সময় নিয়েই লেপ্টে দিল হলুদের সেই ভারী স্তর প্রেয়সীর তুলতুলে বাম গালটায়।অতঃপর ভারী শ্বাস চলতি রেখেই কল্পনার ঝুমকো ঝোলা কানের লতির কাছে অধর জোড়া নিয়ে গেল।নব যুবতীর কানের পেছনে নিচের দিয়ে থাকা গোলাপের সুগন্ধেই যেন কন্ঠে হাস্কিভাব ভেসে উঠল সাহিত্যের।সেই স্বরেই হিসহিসিয়ে বলে উঠল,

"শোধবোধ"

সাহিত্যের ঠোঁটের ছোয়া যেন স্পষ্ট অনুভব হলো কল্পনা কানের নরম লতিটায়।শিরশিরিয়ে উঠল তার পুরো শরীরখানা।তবে কল্পনার কোনো প্রতিক্রিয়া করার আগেই সাহিত্য অধর জোড়া আগের জায়গায় রেখেই সেই হাস্কি স্বরে হেসে উঠল।অতঃপর হাসতে নিয়েই কল্পনার চোখের সামনে নিজের আদলখানা নিয়ে এলো সাহিত্য,

"কল্পনা.....অঘটন কিছু ঘটলে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদিস না,প্লিজ"

নজর কাপার সাথে এবার ধক করে উঠল কল্পনার হৃদপিণ্ডটা।আবারো সেই কথা!সাহিত্য ভাই কল্পনাকে কেনই বা এই কথাটা বারবার বলছে!!কি বুঝাচ্ছে সাহিত্য ভাই এই কথাটা দিয়ে?কি এমন অঘটন ঘটাবে সাহিত্য ভাই?এবার তো একদমই মনে হচ্ছে না যে কোনো কিছু দিয়ে ফাসিতে ঝুলাবে।নিজের চিন্তায় সেই অঘটনের রহস্য না খুঁজে পেয়েই যেন তীর-তীর করে কাপতে লাগলো নব যুবতীর ঠোঁট জোড়া।

কিন্তু এদিকে যেন সাহিত্যের ঠোঁট জোড়ায় এক চিলতি হাসি ঝুলছে।কথা শেষে এবারো আর এক মুহুর্ত দাড়ালো না সে।স্থান ত্যাগ করল পর মুহুর্তেই।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

সাহিত্য আর কল্পনার হলুদ মাখার দৃশ্য যেন সবাইকে তরতাজা করে দিয়েছে।তাই তো সবাই এখন একে-অপরের গায়ে হোলি লাগার মতোই হলুদ মাখিয়ে বেড়াতে ব্যস্ত।স্টেজসহ স্টেজের আশপাশ যেন বেশ কয়েকজন ভালোই গ্যাঞ্জাম করে রেখেছে।ভিকি যদিও বা আগে থেকেই হলুদে ভরাট,তারপরেও সে ছাড় পায়নি।এমনকি বিয়ের বউও উঠে সবার সাথে হলুদ খেলায় মত্ত।

এদিকে ভিদ যেন অবশেষে এক সুযোগ পেয়েছে সামিয়াকে জুতা চুরি করা শখের মজা বুঝানোর।হলুদ হাতে নিয়ে ছুটছে সে সামিয়ার পেছনে।কিন্তু সামিয়া যেন এদিকে নিজেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যেই অন্তর পিছনে এসে দাড়ালো।আর সেটাতে ভিদের হাতের হলুদের শিকার হলো অন্তর মুখ-মাথা।সে দৃশ্যে ভিদ আর সামিয়া যেন পেট চেপে ধরে হাসলো বেশ।কিন্তু ভিদের নিজের আসল উদ্দেশ্যের কথা মনে পড়তেই আবার সামিয়ার পিছে ছুটলো।

অন্ত যেন আহাম্মক বনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।ঘীয়ে পাঞ্জাবিটার উপরের দিক হলুদে ভরা।দাড়ি-মুখে হলুদ লাগায় বেশ ইতখিত লাগছে তার।পকেটে টিস্যুও নেই যে মুখটা একটু মুছবে।আশেপাশে নজর ঘুরাচ্ছিল এমন সময় প্রীতি তার দিকে এক তোয়ালে বাড়িয়ে দেয়।সেটা দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল অন্ত,

"ওহ,থ্যাংক ইউ সো মাচ"

বলেই তোয়ালেটা নিয়ে মুখে ডলতে লাগলো সে।কিন্তু ক্ষণিক বাদেই একদম হুট করেই থেমে গেল।তোয়ালের মধ্যে হলুদ রঙা আবির মাখানো।যেটা এখন অন্তর মাথা-মুখে।সবার আনন্দ দেখে হয়তো কেউ বেশ কিছু রঙের আবিরও নিয়ে এসেছে।সেগুলো নিয়েই বেশ ব্যস্ত এখন সবাই।আর প্রীতি যেন সেটারই সুযোগ নিয়েছে।

অন্তর এমন হলদেটে মাথা-মুখ দেখে হো হো করে হাসতে লাগলো প্রীতি।সেদিকে ভারী নজর ফেলল অন্ত।প্রীতি হাসতে নিয়ে অনেকটাই ঝুকে পড়েছে।যার ফলে কমলা রঙের লেহাঙাটা অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছে মাটিতে।তবে হাসতে নিয়ে সোজা হয়ে দাড়াতেই অন্ত তার উপর আক্রমণ চালালো।তোয়ালেটা দিয়ে পেছন দিক থেকে পেচিয়ে ধরল তাকে।উদ্দেশ্য,প্রীতিকেও আবিরে চুবাবে সে।

প্রীতি যেন হাসতে নিয়েই ভড়কে উঠল,

"আরে!!আমার ড্রেস নষ্ট হচ্ছে তো!!ছাড়েন!"

একই তালে বলল অন্ত,

"আমাকে মাখানোর সময় সেটা মাথায় ছিল না?"

"আচ্ছা বাবা,সরি সরি!!লাগছে আমাকে!ছাড়েন!!"

ছাড়লো না অন্ত।প্রীতির কাধের কাছে মুখ নিয়ে বলে উঠল সে,

"এতো সহজে তো ছাড়বো না ম্যাডাম।আপনাকে তো হাতের নাগালে পাওয়াই যায় না"

প্রীতি হাসতে নিয়েই অন্তর দিকে মাথা ঘুরালো,

"এতো সহজে পাবেনও না..."

প্রীতির কথা শেষ হতেই হঠাৎই যেন দুজনে থমকে গেল।প্রীতি আর অন্তর মাঝের দূরত্বটা যে এতো কম হয়ে এসেছে সেটা যেন এখনই মাথায় ঢুকলো তাদের।তারউপর প্রীতি তার কথাটা বলতে নিয়েই অন্তর দিকে ঘুরায় এখন বেশ কাছাকাছি তাদের চাহনি জোড়া।হঠাৎই যেন সুক্ষ্ম কাপতে লাগলো প্রীতির পাতলা অধর।সাথে ক্ষণিক মুহুর্তের জন্য চলল দুই চোখ জোড়ার কোমল চাহনির মিলন।ভারী শ্বাস ফেলতে থাকা দুজনের মাঝে হঠাৎই অন্ত প্রীতিকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সড়ে দাড়ালো।এলোমেলো নজর ফেলতে থাকা ছেলেটার থেকে সুক্ষ্ম আওয়াজ শুনা গেল,

"স-স-সরি"

আর কিছু বলল না অন্ত।উল্টো দিকে ঘুরে হাটা দিল সে।এদিকে প্রীতি যেন বেশ হতবম্ব হয়ে আছে।কয়েক মুহুর্তে কি হয়ে গেল সব যেন তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।বুকের মাঝটা যেন হঠাৎই ধকধক করতে শুরু করেছে তার।নিজের অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার দিকে মনযোগ দেওয়ার আগেই কল্পনার দিকে নজর গেল।তাই তো আর কিছু না ভেবে ভ্রু কুচকে দেখতে লাগলো সেদিকে।কল্পনা থম মেরে এক কোণে বসে আছে।মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে সেদিকেই প্রীতি পা বাড়ালো।

কল্পনার পাশে বসতে নিয়েই বলল প্রীতি,

"তোর হয়েছেটা কি বলতো?তখন থেকে এমন কোণায়-কোণায় বসে আছিস কেন?কিছুক্ষণ আগে তো সাহিত্য ভাইয়ার দাবড়ানি খেয়ে একদম গায়েব হয়ে গিয়েছিলি।আবার এমন মুখ ফুলিয়ে আছিস কেন?.....আর একি!গালে এতোগুলো হলুদ কে মাখিয়েছে?গোলাপ ফুলটাতেও তো ভরেছে"

প্রীতির শেষের কথায় কল্পনা ঠোঁট-মুখ উল্টিয়ে বিনা চোখের জলে কাঁদতে শুরু করল।হঠাৎ কল্পনার এমন শব্দ করে কাঁদা দেখে বেশ ভড়কালো প্রীতি।ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল সে,

"এই কল্পনা,কি হয়েছে!এমন কাঁদছিস কেন?"

কল্পনা কাঁদতে নিয়েই কৃতিম নাক টেনে বলল,

"সমস্যা কি ওই লোকটার!!এমন উদ্ভট আচরণ কেন করে?দুপুর থেকে কি সব শুরু করেছে!এমন আকার ইঙ্গিত দিয়ে কি বুঝাচ্ছে উনি!!"

ভ্রু কুচকালো প্রীতি,

"কে?সাহিত্য ভাইয়া?"

প্রীতির দিকে দেখে চেচিয়ে উঠলো কল্পনা,

"আর আবার কে!!"

"কেন,আবার কি করেছে?"

কল্পনা দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ডানে-বামে মৃদু মাথা দোলাতে লাগলো,

"জিজ্ঞেস করিস না,প্লিজ জিজ্ঞেস করিস না!!সাহিত্য ভাই নিশ্চয়ই আবার ড্রিংক করেছে।নাহলে ভিকি ভাইয়ার বিয়ের টেনশন মাথায় একটু বেশিই ঢুকেছে!"

"আরে বাবা হয়েছেটা কি,বলবি তো!"

প্রীতির কথায় কল্পনা মাথা নিচু করে কোলে রাখা শাড়ির আঁচল কচলাতে লাগলো।কল্পনার আশেপাশে এখনো সাহিত্যের শরীরের ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউমটা ভেসে আসছে।ক্ষণিক আগের কথা আবার স্মরণে আসতেই গাল দুটো লাল হয়ে উঠল তার।এসব কিছুর ভেতরে প্রীতির উত্তরে মাথা ঝাকিয়ে শুধালো সে,

"পারবো না আমি বলতে!তুই তোর সাহিত্য ভাইয়াকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর!"

"কেন,সাহিত্য ভাইয়া তোকে কিস করেছে নাকি?"

প্রীতির কথায় যান্ত্রিকভাবেই তার দিকে মাথা ঘুরালো কল্পনা।প্রীতির ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ঝুলছে।কল্পনাকে তার দিকে এমন বিস্ময় ভরা চোখে দেখতে দেখে এলোমেলো নজর ফেলে বলল প্রীতি,

"না মানে,বলছিলাম কি,আমার বেস্টিকে আজকে অনেক সুন্দর লাগছে তো।তাই ভাবলাম সাহিত্য ভাইয়া কন্ট্রোল না করতে পেরে সেটাই করে দিয়েছে হয়তো"

উঠে দাঁড়িয়ে চেচিয়ে উঠলো কল্পনা,

"তুই তো সাহিত্য ভাইয়ের থেকেও বেশি জঘন্য মাইন্ডের!সাহিত্য ভাই তো শুধু তার গাল দিয়ে আমার গালে হলুদ লাগিয়েছে,আর তুই তো!!.....ছিঃ!!!আমি আর বাইরেই থাকবো না!কর্টেজে গেলাম আমি!"

কথা শেষেই কল্পনা হনহনিয়ে তার কর্টেজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।আর এদিকে প্রীতি দুই হাত দিয়ে নিজের অধর জোড়া চেপে ধরেছে।কল্পনার কথায় যেন বেশ শিহরিত সে।সাহিত্য কল্পনার গালের সাথে গাল লাগিয়ে হলুদ মাখিয়েছে!আর কি বুঝার বাকি আছে?প্রীতির তো এখন কল্পনাকে জুতা পেটা করে কানের কাছে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে, 'কল্পনা!!!মেনে নে যে সাহিত্য ভাই তোকে পছন্দ করে!!আর নিজের কাছ থেকে লুকাস না সে কথা!!'

কিন্তু প্রীতির এই জেদখোর বেস্টফ্রেন্ডটা যেন কিছুতেই সে কথা মানতে রাজি না।কিসব বলছে যে সাহিত্য নাকি ড্রিংকস করে সেসব করেছে।আরে অমন একটা সুন্দর চাচাতো বোন থাকতে মানুষকে আবার ড্রিংকস করে নেশা ধরাতে হয় নাকি!!

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন