ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৫৮তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৫৮

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

দিনের বেলাটায় এতো দৌড়া-দৌড়ির পর বেশ ক্লান্ত ছিল কল্পনা।তার উদ্দেশ্য ছিল কম্বল মুড়িয়ে একখানা ঘুম দেবে।কিন্তু এশা আবার সেটা হতে দিল কই?কল্পনার ফোনের ঘন্টি বাজিয়ে তাড়া দিল তাকে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য।এই শীতের রাত সাড়ে ন'টার সময় কোথায় যেন বসে নাকি আড্ডা দেবে তারা।কল্পনা প্রথমে একটু কচলাকচলি করেছিল।কিন্তু এশার কথা কল্পনাকে আসতে হবে মানে হবেই।সাথে আবার প্রীতিকেও নিয়ে যেতে বলেছে।যার দরুন কালো কুর্তিটার উপর একটা কালো শাল জড়িয়ে প্রীতিকে নিয়ে হাটা দিল গন্তব্য স্থলে।

গন্তব্য স্থলের কাছে পৌছাতেই সবার হাসি-ঠাট্টার আওয়াজ শুনতে পেল তারা।এক ছোটো-খাটো গাজেবোর মধ্যে বসে রয়েছে সবাই।গাজেবোটার ভেতরে কোনো বসার জায়গা নেই।সবাই নিচেই গোল হয়ে বসেছে।তবে শীত বেশি হলেও মানুষের উষ্ণতায় মেঝের ঠান্ডাটা তেমন উঠছে না বললেই চলে।

গাজেবোর ভেতরে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে মেয়ে শুধু দুজন থাকলেও বাকি সব ছেলে।তবে কল্পনার কোনো সংকোচ বোধ হলো না।সবারই চেহারা চেনা কল্পনার।রবি এবং তার বউ ইরা,অয়ন,ভিকি,এশা।এদের সাথে এতোদিনে ভালোই জমেছে কল্পনার।প্রীতিও গত তিন দিন থেকে টুকটাক কথা চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে প্রীতি এই মুহুর্তে সংকোচ বোধ না করলেও কেন জানি হাসফাস করছে অনেকটা।তার কারণ গাজেবোর এক কোণে বসে থাকা অন্ত।ছেলেটা একটা ওভার সাইজের কার্টিগেন সোয়াটার পড়ে এতক্ষণ হাসি মুখে কথা চালালেও প্রীতিকে দেখে যেন হঠাৎই চুপ মেরে গেল।সাথে পর মুহুর্তেই নজরটাও ঘুরালো।আজ দুপুরের বিষয়টাতে যেন দুজন এখনো লজ্জায় পড়ে আছে।সেই তখন থেকে যেন দেখা হওয়ার পরেও দুজনের কেউই মুখ ফুটে কথা বলছে না।

কিন্তু কল্পনার তো আর এ বিষয়ে কোনো ধারণা নেই।সে প্রীতির হাত ধরে এসে অন্তর পাশেই বসলো।তবে দুজনকে দুপাশে দিয়ে মাঝে বসলো কল্পনা।এতো মানুষের মাঝে যেন অন্তর পাশে বসাই ঠিক মনে করল সে।সেটাতে অবশ্য অন্ত আর প্রীতির নজর লুকাতে সুবিধাই হলো বটে।

কল্পনার হালকা নাক টানা দেখে ইরা কপালে ভাজ ফেলে শুধালো,

"তোমাকে না কালকেই বললাম একটু গরম পানি খাবা।দেখো কেমন নাক টানছো"

রবি একজন জানা-মানা বিজনেসম্যান হলেও তার বউ একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।তাই তো কাল রাতে কল্পনার হঠাৎ নাক টানা দেখে কোনো প্রকার ঔষধের আগে তাকে গরম পানি খাওয়ার উপদেশ দেয়।তবে কল্পনা মাথা নাড়িয়ে বলে উঠল,

"খেয়েছিলাম তো।কিন্তু কালকেই বললাম না?শীতের সময় রাতে করে আমার এমন একটু নক বন্ধ হয়ই।আমার জন্য স্বাভাবিক"

ওপাশে ভিকির পাশ থেকে এশা বলে উঠল,

"আমার বিয়েতে মজা করতে এসে আবার অসুস্থ হয়ে পড়িও না।তখন আবার ভাইয়া আমার উপর চিল্লাবে"

হেসে উঠল কল্পনা,

"কিচ্ছু বলবে না সাহিত্য ভাই।আমার এটার ব্যাপারে জানে উনি"

এই শীতের রাতে নাক টানা যেন কল্পনার জন্য নিত্য দিনের বিষয়।তবে আজ সারাদিনের ক্লান্তিতে যেন শরীরের ভার আর সইতে পারছে না মেয়েটা।মাথা যেন বেশ ভারী হয়ে আসছে তার।তাই তো আর কোনো উপায় না পেয়ে কথা শেষে পাশে বসে থাকা অন্তর হাতে মাথা এলিয়ে দিল।লম্বাচওড়া ছেলের হাতে মাথাটা ভালো ঠেস পাবে সে আশায়ই সেই কাজ করা।

তবে হঠাৎই এক বিষয়ে কল্পনার ভ্রু জোড়া ভালোই কুচকালো।অন্তর হাতে মাথা এলিয়ে রেখেই আশেপাশে নজর ঘুরালো সে।নজর তার সাহিত্যকে খুজছে।সাহিত্যের সব সাঙ্গোপাঙ্গো তো এখানেই আছে তাহলে সাহিত্য কোথায়?তবে কল্পনার কপালে ভাজ পড়েছে অন্য এক কারণে।তার আশপাশটা যেন হঠাৎই সেই চিরপরিচিত ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউমে ভরে গেল।সে কারণেই তো সাহিত্যকে খুজতে লাগলো সে।

নজর ঘুরিয়ে সাহিত্যকে না পেয়ে বেশ অবাক হলো কল্পনা।কই না কই রয়েছে সেই ব্যক্তি,আর কল্পনা তার সেই সুগন্ধি ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউমের ঘ্রাণ এখান থেকেই পাইছে।আজ কি শরীরে পুরো বোতল ঢেলেছে নাকি,যে এতো দূর থেকে এতো ভালো করে সেই ঘ্রাণ শুকতে পারছে কল্পনা?তবে আর বেশি চিন্তা করতে গেল না।অন্তর হাতে মাথাটা আরো ভালো করে এলিয়ে দিয়ে সবার গল্পে মন দিল।

"এই নাও তোমার পানির বোতল।আর ইলেক্ট্রিক গিটার ছাড়া আর কোনো গিটার নেই নাকি?"

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্তর কথায় সেদিকে দেখে চোখ জোড়া কোটর ফাটিয়ে বেড়িয়ে আসতে লাগলো কল্পনার।কল্পনা না অন্তর হাতে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে!তাহলে অন্ত সামনে কি করে!অন্ত সামনে থাকলে কল্পনাই বা কার হাতে মাথা দিয়ে রেখেছে?

যান্ত্রিকভাবে পাশের ব্যক্তির দিকে মাথা ঘুরালো কল্পনা।নজরে এলো সেই ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউমের অধিকারীর।এক হাতে তো প্রেয়সীকে সম্পুর্ণ অধিকার খাটাতে দিচ্ছে সাহিত্য।আর অপর হাতে থাকা লাল রঙা বইটার প্রচ্ছদ ভালো করেই নজরে পড়ছে সাহিত্যের প্রেয়সীর চোখে।সেই লাল রঙা প্রচ্ছদের মাঝ বরাবর লম্বায় এক নীল রঙের টান।তাতে সোনালী অক্ষরে লম্বায় লিখা

"power"।

কল্পনা শুষ্ক ঢোক গিলল সেই প্রচ্ছদ দেখে।এই বই কল্পনা কখনো পড়েনি।তবে একটু হলেও ধারণা আছে তার এই বই সম্পর্কে।এমন টাইকুন বিজনেসম্যান হওয়ার পরেও এই বই পড়ার মানেটা কি?আর আবার কি অর্জন করতে চায় এই টাইকুন বিজনেসম্যান?

এবার কল্পনা নজর দিল বই হাতে ধরে থাকা ব্যক্তির দিকে।সেদিকে নজর যেতেই ঠোঁট জোড়ার মাঝে সুক্ষ্ম দূরত্ব তৈরি হলো মেয়েটার।সাহিত্য চোখে একখানা চিকন ফ্রেমের চশমা লাগিয়ে খুব মনযোগ দিয়ে বইয়ে নজর বুলাতে ব্যস্ত।আগে কি কম সুদর্শন ছিল যে এখন চশমাও পড়তে শুরু করেছে?এমন চশমা চোখে ঝুলিয়ে যেন আশেপাশের মেয়েদের কাবু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সাহিত্য।তবে সেই আশেপাশের মেয়েদের মধ্যে আপাতত শুধু কল্পনাই পড়ছে।বাকি তিন মেয়ে তো নিজেদের মনের অনুভূতি নিয়েই ব্যস্ত।

কিন্তু সাহিত্য তো আর কল্পনা বা অন্য কোনো মেয়েদের কাবু করার উদ্দেশ্যে চোখে চশমা ঝুলিয়ে রাখেনি।ছেলেটা হয়তো জানেও না যে তাকে বর্তমানে এই কালো চিকন ফ্রেমটায় কি মারাত্মক লাগছে!সে তো চশমা পরে বই পড়ছে যেন আবার মাথা ব্যথা না উঠে।ল্যাপটপের স্ক্রিনের সামনে বেশি সময় ধরে কাজ করার ফলে বেশ কয়েকদিন থেকেই মাথা ব্যথায় ভুগছে সে।যার দরুন ডাক্তার তাকে বাধ্য করিয়েছে চশমা পরতে।তবে সেটা শুধুমাত্র প্রয়োজনের সময়ই।তাছাড়া সাহিত্যের কোনো ইচ্ছা নেই চশমা ঝুলানো।কিন্তু সে যদি জানতো যে তার প্রেয়সী বর্তমানে এতেই কুপোকাত হচ্ছে তাহলে তখন হয়তো অন্য বিষয় হতো।

কল্পনা সাহিত্যের দিকে আর হাবার মতো দেখে থাকলো না।হুড়মুড়িয়ে মাথা তুলতে নিয়েছিল মেয়েটা।কিন্তু সাহিত্যের হাতের কারণে সেটা যেন আর হয়ে উঠল না।কল্পনা মাথা তুলতে নিলেই সাহিত্য হাত দিয়ে আবার কল্পনার মাথা তার হাতে ঠেকিয়ে দেয়।কিন্তু নজর আরেক হাতের বইখানা থেকে একদমই সড়েনি তার।

সাহিত্যের হঠাৎ এমন প্রতিক্রিয়ায় কাবু হয়ে গেল কল্পনা।নড়ার আর যেন শক্তি পাইছে না।তাই তো ক্ষণিক মুহুর্ত পর সাহিত্য যখন তার মাথা থেকে হাত সড়ালো কল্পনা আর মাথা উঠার সাহস পেল না।সাহিত্য তো ঠিকই বুঝছে,যে কল্পনার মাথা ধরেছে দেখেই অমন এলিয়ে দিয়েছিল।কাকে ভেবে এলিয়ে দিয়েছিল সেটাও জানে সাহিত্য।কিন্তু প্রেয়সীকে একটু আরামে থাকতে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই যেন তখনও কিছু বলেনি আর এখনো কিছু না বলে মাথাটা নিজের হাতে ঠেকিয়েই রাখলো।

কিন্তু কল্পনা এদিকে আরাম পাওয়ার থেকে যেন বেশি সংকোচ বোধ করছে।মাথার ভেতরে আবারো বিকেলের সেই ঘটনা ভাসছে যেন।সাহিত্যের অমন গালে গাল লাগিয়ে হলুদ দেওয়াতে বেশ লজ্জায় পড়েছে মেয়েটা।রুম থেকে বের হলেই সাহিত্যের সাথে দেখা হবে সেটা ভেবে তো সেই বিকেল থেকে আর রুমের বাইরেই আসেনি।কিন্তু এখন যেন আরো বেশি লজ্জায় পড়তে লাগলো সে।পায়ের আঙুল মোচড়ামুচড়ি করতে লাগলো।যার কৃতকর্মের জন্য পাশে বসা মেয়েটা এমন লজ্জায় মাথা নামিয়ে রেখেছে তারই যেন কোনো সংকোচ নেই।যেন কিছুই হয়নি,এমন ভাব নিয়ে বাম হাতের বইখানা পড়ে যাচ্ছে সেই পুরুষ।

আগের জায়গা ফাঁকা না পেয়ে অন্ত এবার কল্পনা আর প্রীতির মুখোমুখি হয়ে বসলো।শুধুমাত্র ভিকির পাশে সে জায়গাটাই তো ফাঁকা আছে।তাই উপায়ন্তর না পেয়ে সেখানেই বসেছে।বসতে নিয়ে ভিকির উদ্দেশ্যে আবার বলে উঠল অন্ত,

"হঠাৎ গিটার আনতে বললে যে?"

ভিকি বোতলের পানি দিয়ে গলা ভিজিয়ে সেটা অন্তর দিকে এগিয়ে দিল,

"আগে এটা খা তারপর বলছি"

অন্ত ভ্রু কুচকালেও ভিকির জোরাজোরিতে একটু পানি খেল।তারপরেই তো শুধালো ভিকি,

"অনেকদিন হয়ে যাচ্ছে তোর হাতে গিটার বাজিয়ে তোর গলায় গান শুনা হয় না"

পানি অন্তর গলা দিয়ে অনেকক্ষণ আগেই নেমেছে।কিন্তু ভিকির কথায় বেশ বিষম খেয়ে বসল ছেলেটা।বিষম কাটিয়ে যেন গলা খাকাড়ি দিল,

"কিহ্!.......না ভাইয়া।আমি গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।অনেকদিনের প্রাক্টিস নেই।আমার দ্বারায় ওসব হবে না"

অন্তর কথা শেষ হতেই কল্পনা বলে উঠল,

"ভাইয়া তুমি গান গাও?আমি তো মনে করেছি গিটারটা শুধু-শুধু কিনে ফেলে রেখেছো"

অয়ন এতক্ষণে হুডির ভেতর থেকে মাথা বের করল,

"আরে কল্পনা তুমি তো জানোই না?তোমার অন্ত ভাইয়া কত ভালো সিংগার জানো?!একবার তো আমাদের কলেজের এক ফাংশনের দিনে হুট করে সিংগারের গলা খারাপ হয়ে যায়।তখন স্কুল পড়ুয়া অন্তই বাঁচিয়েছিল আমাদের।সেদিন ও না থাকলে কতটা ক্ষতি যে হতো আমাদের"

রবি হাসতে নিয়েই বলল,

"তবে ব্যাটাকে মানাতে অনেক কাঠ পুড়াতে হয়েছে।কিছুতেই সে স্টেজে যাবে না।পরে আদর-সোহাগ দিয়ে যখন মানছিলই না তখন সাহিত্যের ঝাড়ি কাজে লেগেছিল"

রবির কথা শেষেই সবাই এক জোগে হেসে উঠল।তবে মৃদু হাসতে নিয়ে ঘাড় চুলকাতে লাগলো অন্ত।এর মাঝেই ভিকি অন্তর দিকে ঝুকে ফিসফিস করে বলল,

"তোর ভাবির কাছে কিন্তু তোর নামে অনেক শুনাম করেছি।সে তো আরো বলছিল সবার সামনে স্টেজে গান গাইতে।অনেক কষ্টে এখান অব্দি নামিয়েছি।প্লিজ ভাই।নাহলে কিন্তু সাহিত্যের বই পড়ার মনযোগ ভাঙিয়ে আবার ঝাড়ি দেওয়াবো"

শেষের কথাটা বেশ হুমকির স্বরূপ করেই শুধালো ভিকি।কি আর করার?বড় ভাইয়ের এতটুকু আবদার তো এখন রাখতেই হয়।না রাখলে যে মান-ইজ্জত সব যাবে।তাই আবারো অন্ত ঘাড় চুলকাতে নিয়ে মাথা নিচু করল,

"ঠিক আছে।কিন্তু অনেক বছর ধরে প্রাক্টিস নেই তো,তাই তেমন ভালো না-ও হতে পারে"

অয়ন হাতে এক তালি মেরে শুধালো,

"আরে আমাদের অন্ত গান গাইছে!সুন্দর হবে না মানে!"

সবাই মৃদু হাসতে লাগলেও এবার অন্ত গিটার হাতে তুলল।সেই সাহিত্য দেশ ছাড়ার সময় এই গিটার হাত থেকে রেখেছিল।আর যেন ঘুরেই দেখা হয়নি সেদিকে।সাহিত্যের জোরাজোরিতে যতটুকু গিটার বাজিয়ে থাকতো সাহিত্যের চলে যাওয়ার পর যেন সেটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে।তারউপর শেখ ভিলার এমন পরিবেশে কার-ই বা মন খুলে গিটার বাজাতে ইচ্ছা করবে?তাই তো পছন্দের গিটারটা এখনো আলমারির এক কোণে পড়ে রয়েছে।তবে আজ যেন আবারো সেই বন্ধু রূপী বড় ভাইগুলোর আবদারেই গিটার হাতে নিল ছেলেটা।

আসল গানের শুরুর দিকের মিউজিকের মতো ততটা হয়তো পাকা নয়।কিন্তু অন্তর চেষ্টায় ফুটিয়ে তোলা সেই গিটারের সুরে এবার সাহিত্যও বই থেকে খানিকটা মনযোগ সড়িয়ে ঠোঁট বাকালো।বইয়ের দিকে নজর থাকার পরেও যেন কানে আসা অন্তর তৈরি সুর উপভোগ করতে লাগলো সে।তার ছোট্ট ভাইটা যে আবার আগের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।যে সময় বন্ধু তিনটা আর এই ছোট্ট ভাইটার সাথে হাসি-ঠাট্টার দিন কাটাতো।তবে সাহিত্য অনেক প্রশান্তি অনুভব করলেও ক্ষণিক বাদে গিটারের সুরের পরে অন্তর কন্ঠ যেন অবাক করে দিল সবাইকে।ভিকি আর অয়ন যে এতক্ষণ থেকে কি কারণে অন্তর গুনোগান গাইছিল সেটা যেন বুঝলো সবাই।তবে সেদিকের তোয়াক্কা না করেই যেন চোখ বুজে নিজের কন্ঠ পরিবেশন করতে ব্যস্ত অন্ত।

❝তুমি আর তো কারো নও,শুধু আমার।

যত দূরে সরে যাও,রবে আমার।

স্তব্ধ সময়টাকে ধরে রেখে।

স্মৃতির পাতায় শুধু তুমি আমার।

কেন আজ এতো একা আমি?

আলো হয়ে দূরে তুমি।

আলো-আলো আমি কখনো খুঁজে পাব না।

চাঁদের আলো তুমি কখনো আমার হবে না।

আলো-আলো আমি কখনো খুঁজে পাব নাআআ

চাঁদের আলো তুমি কখনো আমার হবে না... ❞

সেই গাম্ভীর্যপূর্ণ সুরেলা কন্ঠে বাইরের শীতটা হয়তো কমলো না।তবে উষ্ণ হলো কয়েকটি হৃদয়।কল্পনা অন্তর গান শুনতে নিয়ে যেন ক্ষণিক আগের লজ্জা ভুলে বসলো।ঠান্ডার চটেই হয়তো,সাহিত্যের অনেকটা গা ঘেঁষে বসেছে সে।ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি ঝুলিয়ে রাখার সাথে অন্তর দিকেও নজর দিয়ে রেখেছে।তবে সেই কাজ যেন শুধু কল্পনাই করে যাচ্ছে তেমনটাও না।কল্পনা হালকা সংকোচ বোধ করে সাহিত্যের কাছে বসলেও ইরা আর এশা যেন আগলে ধরে রেখেছে তাদের জীবন সঙ্গিদের।কিন্তু অয়নের বিষয়টা একদম ভিন্ন।সে নিজের শরীরের সম্পুর্ণ ভার অন্তর উপর ছেড়ে দিয়েছে।সেটাতে অবশ্য অন্ত একদম বিরক্ত বোধ করছে না।

সময় যেন খুব তাড়াতাড়িই অতিবাহিত হলো।গান শেষ করে গিটারের দিক থেকে মাথা তুলে আনমনেই সামনে চোখ গেল অন্তর।তবে যেটা দেখলো সেটা যেন আশা করেনি ছেলেটা।

প্রীতি 'দ' আকৃতিতে বসে থুতনি ঠেকিয়ে রেখেছে হাটুর উপর।আর শাল আবৃত হাত জোড়া তো পায়ের আঙুল ছুইছে।কিন্তু সবকিছুর সাথে বেশি আকর্ষণীয় লাগছে অন্তর দিকে এক দৃষ্টিতে দেখে থাকা চোখ জোড়া।অন্ত মাথা তুলার পর ক্ষণিক সময়ের জন্য চোখাচোখি হলো দুই জোড়া চোখের।হয়তো কোনো বার্তা প্রেরণের সুযোগ খুঁজছে সেই দুই অক্ষি জোড়া।তবে সেটা হওয়ার আগেই ধীর-স্থিরভাবে নিজের মাথা ঘুরিয়ে নিল প্রীতি।অন্তর কাছে সেই মায়াবী আদলখানা ঢাকা পড়ে গেল এক রাশ কালো কেশ দিয়ে।কিন্তু অন্ত যেন নজর ঘুরাতে অনিচ্ছুক।এখনো সেদিকে দেখে আছে সে।হয়তো বাকিদের মতো তার হৃদয়টাও একটু উষ্ণ অনুভব করে শুরু করেছে ইতোমধ্যে।কিন্তু সে দৃশ্য যেন কারো নজরেই পড়ল না।

অন্তর গান শেষ হওয়ার সেই সুক্ষ্ম নিরবতায় যেন সবাই নিজেদের মনের অনুভূতিদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলোই বলা যায়।তবে অয়ন এবার অন্তর পিঠ থেকে উঠে চাপড় বসিয়ে দিল অন্তর কাধে,

"আররে ভাই!তুই তো তাহসান ভাইরেও ফেল করে দিলি!তোর কন্ঠ তো আগের থেকেও বেশি সুন্দর হয়েছে"

অয়নের কথায় ও হাতের আঘাতে ভড়কে উঠেই অয়নের দিকে নজর দিল অন্ত।সামনের রমণীর কথা মাথা থেকে বের হতেই অয়নের কথায় হালকা হেসে উঠল সে।

অয়ন তার কথা শেষ করে হাসতে নিয়েই সামনে চোখ ঘুরালো।তবে এবার হাসি থামিয়ে ধীমি আওয়াজে সাহিত্যকে ডাকতে লাগলো,

"সাহিত্য।এ সাহিত্য"

সাহিত্য বই থেকে মাথা তুলে নজর দিল অয়নের দিকে।তার পরপরই অয়ন কল্পনার নাম মুখে নিয়ে ফা'সিতে ঝুলানোর মতো ঘাড় কাত করে জিহ্বার মাথা বের করল।

অয়নের এমন উদ্ভট আচরণ দেখে ভ্রু কুচকালো সাহিত্য।পর মুহুর্তেই দাঁত চিবিয়ে সে-ও ধীমি আওয়াজে বলল,

"ফা'সিতে ঝুলে ম'রার শখ হয়েছে তোর?কল্পনার সাথে লেগেছিস কেন?"

অয়ন চোখ-মুখ কুচকালেও ভিকি নিঃশব্দে হেসে বলে উঠল,

"আরে ও ওটা বুঝায়নি।কল্পনা ঘুমিয়ে গিয়েছে সেটা বুঝাচ্ছে এই ছাগল"

ভিকির কথায় হকচকিয়ে গেল সাহিত্য।সাথে প্রীতিসহ বাকি সবাইও নজর দিল কল্পনার দিকে।সাহিত্যের কণোই এর ভাজের কাছে এক হাতের আঙুলগুলো আলতোভাবে জড়িয়ে রেখেই ঘুমিয়ে গিয়েছে মেয়েটা।এতোটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল যে অন্তর মিষ্টি গানের সুরে নিজেকে আর জাগিয়ে রাখতে পারেনি।

কল্পনার দিকে দেখে আদুরে কন্ঠে শুধালো এশা,

"ইস রে,গুচুপুটা।ঘুমালেও কি কিউট লাগে"

এশার সাথেই তাল মিলিয়ে অয়ন বলে উঠল,

" আল্লাহ দেখ,সাহিত্যের হাতের সাথে লাগায় ওর গালটাও কেমন ফুলে আছে"

নিজের প্রেয়সীকে অয়নের কু-নজর থেকে বাচানোর উদ্দেশ্যেই কল্পনার আদলখানা নিজের হাতে থাকা খোলা বইটা দিয়ে ঢেকে অয়নের চোখের আড়াল করল সাহিত্য।সাথে গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,

"তোকে না বলেছি,কল্পনার উপর নজর দিবি না।নাহলে জাহান্নামের টিকিট কেটে দেব"

অয়ন মাথার হুডিটা দিয়ে মুখোমন্ডল পুরোটাই ঢেকে ধরল,

"ধুর বাল,এই ছেলেটার জন্য শান্তি মতো একটু কথাও বলা যায় না"

কথাটা বলেই উঠে দাড়ালো সে,

"আমি ঘুমাতে গেলাম।আর বেশিক্ষণ এই জাহান্নামের টিকিট প্রদানকারীর চোখের দিকে দেখে থাকলে ঘুমে দুঃস্বপ্ন দেখবো আমি"

কথা শেষেই হনহনিয়ে জায়গা ত্যাগ করল অয়ন।সবাই হালকা হাসলেও সাহিত্য ক্ষণিক সময় সরু চোখ রাখলো অয়নের দিকে।তবে কিছু সময় পর সে-ও হেসে উঠল।অয়নের কথা তো ঠিকই বুঝেছিল সাহিত্য। কিন্তু নিজের প্রেয়সীর দিকে অন্য কারো নজর যেন একদমই সহ্য হয় না এই ছেলেটার।চোখের চশমা আর হাতের বই মেঝেতে রেখে কল্পনাকে পাজা কোলে তুলল সাহিত্য।সাথে অন্তর উদ্দেশ্যে বলেও উঠল,

"অন্ত,বই আর চশমাটা রুমে নিয়ে যাস।আমি কল্পনাকে রেখে রুমে যাচ্ছি"

সাহিত্যের যাওয়ার দিকে দেখে মুখে হাসি ফুটল প্রীতির ঠোঁটে।কল্পনাটা যে কবে বুঝবে তার সাহিত্য ভাইয়ের এতো আদর?বান্ধুবীর চিন্তা থেকে বেড়িয়ে শাল ঠিক করে উঠতেই যাচ্ছিল প্রীতি।কিন্তু ইরা এসে আবার বসিয়ে দিল তাকে,

"তুমি কই যাচ্ছো?তুমি আমার সাথে একটু বসো তো।তোমার সাথে কথা বলতে বেশ ভালো লাগে আমার।তুমি অনেক প্রয়োজনীয় কথা-বার্তা বলো"

কথা শেষেই ফিক করে হেসে উঠল ইরা।প্রীতিও হেসে সেখানেই ঠাই বসে থাকলো।অতঃপর কথা চলল বেশ কিছুক্ষণ।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

সারাদিনের ক্লান্তি তো বাকি সবারও ধরেছে।তাই গল্পের আসর আর বেশি দীর্ঘ হলো না।সবাই নিজ-নিজ কর্টেজের উদ্দেশ্যে রওনা হলেও প্রীতি আর অন্ত যেন থম মেরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

প্রীতির কর্টেজটা কল্পনার কর্টেজের কাছে হলেও এই আড্ডা দেওয়া জায়গা থেকে বেশ দূরে।আর ঘড়ির কাটা এখন ১১টার ঘরে।কুয়াশা ভরা রাতে একা সেপাশে যাওয়া একটু বিপদজনক মনে করল ভিকি।প্রীতি নিজে যেতে পারবে বলার পরেও যেন ভিকি অন্তকে দায়িত্ব দিয়ে গেল প্রীতিকে রেখে আসার।

আজ বিকেলটা থেকেই যেন মুখোমুখি হতে পারছে না এই দুই ব্যক্তি।আর বারবার যেন তাদের একই পথেই চলতে হচ্ছে।কোনো উপায় না দেখে আমতা-আমতা করতে নিয়েই দুজনে সামনে পা বাড়ালো।তবে পাশাপাশি হাটলেও যেন নিরবতা চারিপাশে।অন্ত এমন নিরবতায় অভ্যস্ত থাকলেও প্রীতির কাছে যেন ভালো ঠেকলো না এমন পরিবেশ।তাই তো অন্তর হাতে থাকা সাহিত্যের বইটার দিকে দেখে বলে উঠল সে,

"সাহিত্য ভাইয়া এমন বইও পড়েন?"

এমন হঠাৎ প্রীতির কথা বলায় বেশ ভড়কালো অন্ত।তবে নিজেকে পর মুহুর্তেই সংযত করে বলল,

"ভাইয়া তো এমন বই-ই পড়ে।ভাইয়াকে আমি এমন আরো কিছু বই পড়তে দেখেছি।এমনি-এমনি এতো ইন্টেলিজেন্ট না আমার ভাই"

অন্তর কথার বিরোধিতা করল না প্রীতি।সাহিত্যের চাল-চলন দেখলে সেটা অবশ্য ভালো করেই বুঝা যায়।কিন্তু সেই ছেলেকে চেনার আগ্রহ তো প্রীতির মাঝে একদম নেই।প্রীতির চেনার আগ্রহ আছে বর্তমানে তার পাশে হাটতে থাকা ছেলেটাকে।যেই ছেলেটা নিজের ব্যাপারে যেন তেমন কিছুই বলে না কাউকে।গত তিন দিন যাবত অন্তকে প্রথমবার এতো কাছ থেকে পরখ করছে প্রীতি।অন্য মেয়েদের দেখলে যেন সাথে-সাথেই মাথা নিচু করে ফেলে।কোনো মেয়ে তাকে ডাকলে শুনার পরও অনেক দেরিতে সেই মেয়ের কথার উত্তর দেয়।নিজের কাছে তেমন কাউকে ভিড়তে দেয় না ছেলেটা।নিজের গন্ডিতেই যেন সে শান্তিতে আছে।

তবে প্রীতির সাথে তো কখনো তেমন কিছু হয়নি।প্রীতি কথা বলার আগে যেন অন্তই আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসে।এতো মানুষের ভীড়ে প্রীতির কাছে এসে প্রায়-প্রায় বলেছে 'কোনো সমস্যা হচ্ছে?'।প্রীতিকে কেন এতো আলাদা করে দেখে?তার চাচাতো বোনের বেস্টফ্রেন্ড হয় সেজন্য?নাকি অন্যকিছু?হয়তো এই লাজুক ছেলে সে বিষয়টাও মুখ ফুটে বলবে না।তাই ঠোঁটে এবার সুক্ষ্ম হাসি নিয়ে অদূরে নজর রেখেই বলে উঠল প্রীতি,

"তো...আপনার আলোকে খুঁজে পেয়েছেন কি?"

"এই তো পেয়েছি মনে হয়"

একদম পর মুহুর্তেই অন্তর এমন কথায় যেন ভড়কে উঠল প্রীতি।সাথে-সাথেই নজর দিল অন্তর দিকে,

"মানে?"

লাজুক ছেলেটা যে এতক্ষণ ধরে লুকিয়ে তার পাশের শ্যামবতীকে দেখে যাচ্ছিল সেটা আর সেই শ্যামবতীর নজরে এলো না।তার আগেই অন্ত মাথা ঘুরিয়ে ল্যাম্পপোস্টের দিকে দেখে বলে উঠল,

"এই তো ল্যাম্পপোস্টের আলোর কাছে এসেছি।এতো দূরে-দূরে কে ল্যাম্পপোস্ট বসায়?"

সামনে মাথা ঘুরিয়ে প্রীতি নিঃশব্দে হাসলো।সেটা যেন অন্তর চোখের আড়াল একদমই হলো না।হাসলো ছেলেটা।হয়তো তার এই শান্ত জীবনে কোনো ঝড়ের আগমনের আভাস বুঝতে পারলো সে।যেই ঝড় অনুভূতিদের মাঝে উথাল-পাথাল ঢেউ তৈরি করলেও হৃদয়ে প্রশান্তি দিয়ে যাবে।

#চলবে

আপনারা কি জানেন,একমাত্র এই গানটার জন্যই মাহাদি শেখ অন্তর আগমন ঘটেছে এই গল্পে?🥹

এই গানটা শুনলেই শুধু অন্তর কথা মনে পড়ে আমার😩

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন