#পর্ব_৫৯
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সাহিত্য কল্পনাকে নিয়ে একদমই তেড়ে আসেনি।খুবই ধীরে-সুস্থে পা বাড়িয়েছে সে।তার প্রেয়সী গভীর ঘুমের মাঝে ঠান্ডার চটেই যেন সাহিত্যের বুকের বাম দিকটায় মুখ গুজে রেখেছে।যেখানে সাহিত্যের হৃদপিণ্ড অবস্থিত।সেই জায়গাটা যে বর্তমানে সাধারণের তুলনায় একটু বেশিই জোরে ধকধক করছে সাহিত্যের।হৃদয়ে যার বসবাস সে বাইরে থেকেই সেই জায়গা ছুঁয়ে দিচ্ছে হয়তো সেকারণেই।ঘুমন্ত প্রেয়সীর আদলখানার দিকে দেখে ধীমি আওয়াজে গানের এক লাইন গেয়ে উঠলো সাহিত্য,
"এই পথ যদি না শেষ হয়,তবে কেমন হতো তুমি বলোতো?"
উত্তর করল না সাহিত্যের প্রেয়সী।সে তো গভীর ঘুমে তলিয়ে।ঘুমের মধ্যে হয়তো মজার কিছু খাইছে।তাই তো অধর জোড়া ও জিহ্বাটা হালকা নড়িয়ে যাচ্ছে সে।সেপাশে নজর রেখেই আবার মুচকি হাসলো সাহিত্য।তার জানা আছে তার প্রেয়সীর উত্তর কি হবে।সাহিত্যের প্রেয়সী নির্দ্বিধায় সাহিত্যের সাথে না শেষ হওয়া পথে চলতে রাজি।শুধু সাহিত্যকে তার প্রেয়সীর মনের কথা মুখে আনতে হবে।তবে সেটা এখন নয়।এখন আপাতত রাতের ভারী কুয়াশা থেকে বাঁচার উপায় খুজতে লাগলো সাহিত্য।কারণ প্রেয়সীকে দেখতে গিয়ে যে কুয়াশায় মাথা-মুখ সব ভিজিয়ে ফেলেছে।যার দরুন এবার বাধ্য হয়েই কোলে থাকা প্রেয়সীকে নিয়ে জোর পায়ে কর্টেজের দিকে এগুলো সে।
রুমের লক খুলে ভেতরে ঢুকলো সাহিত্য।অতঃপর কল্পনাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজের মাথার কুয়াশা ঝাড়তে লাগলো।আবার কল্পনার দিকে নজর পড়ায় হঠাৎই হাত থেমে গেল তার।কুয়াশার ঠান্ডা পানিতে নাকের ডগা আর গাল দুটো লাল হয়ে আছে নব যুবতীর।মুচকি হেসে এক টিস্যু হাতে নিয়ে মেঝেতে হাটু গেড়ে বসল সাহিত্য।আলতো করে মুছতে লাগলো কল্পনার মুখে পরা সুক্ষ্ম পানি কণাদের।কিন্তু আবারো হাত থেমে গেল।তবে এবার আর মুচকি হাসলো না সাহিত্য।নেশালো দৃষ্টি নিয়ে কল্পনার লাল অধরের দিকে দেখতে লাগলো।ক্ষণে-ক্ষণে সুক্ষ্ম কেপে উঠছে সেগুলো।যা বড়ই আদুরেভাবে সাহিত্যকে কাছে ডাকছে।
হাতের টিস্যুখানা আনমনেই পড়ে গেল হাত থেকে।সাথে সেই হাত এগিয়ে গেল সুক্ষ্ম কাপতে থাকা অধরের দিকে।সেগুলোকে সাহিত্য একটু ছুঁয়ে দিলে কি অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে?সেগুলোকে যে একটু আলতো করেই ছুঁয়ে দিতে চায় সাহিত্য।হয়তো নিজের অধর জোড়া দ্বারা।হয়তো আলতোভাবে না.....একটু গভীরভাবেই।একটু নিজের অধিকার খাটিয়ে।কিন্তু বাধা যে সব দিকে।তবে এখন যেন কোনো বাধা নেই।আশেপাশে তো কেউ দেখছে না।বদ্ধ রুমটায় শুধু সাহিত্য আর তার প্রেয়সী।সাহিত্যের কল্পনা তো সাহিত্যেরই,তাই না?তাকে এখন একটুখানি গভীরভাবে ছুঁয়ে দিলে হয়তো তেমন কিছুই হবে না।
সাহিত্য নিজের মনের এতো হাবিজাবি কথা ভাবতে নিয়েই হাতের বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে কল্পনার নিম্নাষ্ঠখানা ছুঁয়ে দিল।তুলতুলে নরম অধরের ছোঁয়ায় যেন হৃদপিণ্ডের কম্পন আরো বেড়ে যাওয়ার সাথে অবাধ্য নিষিদ্ধ অনুভূতিরা উস্কানি দিতে লাগলো সাহিত্যকে।ভারী এক ঢোক গিলে চিন্তা করে বসলো সাহিত্য।একবার ছুঁয়ে দিলে হয়তো তেমন কিছুই হবে না।সাহিত্য তার প্রেয়সীকে ক্ষণিক সময়ের জন্য একটু কাছে পাবে শুধু।যা চোখের আড়ালে থেকে যাবে সবার।এবং সাহিত্যের প্রেয়সীরও।
অনুভূতিরা আজ সাহিত্যকে বুঝ দিতে লাগলো।সাহিত্য যেন আজ ভারীভাবেই কাবু হয়েছে তার এই অবাধ্য অনুভূতিদের কাছে।সাহিত্য হাতখানা কল্পনার অধর থেকে সড়িয়ে পাশে বিছানায় ভর দিল।অতঃপর ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়েই নেশাগ্রস্থের মতো ধীরগতিতে এগিয়ে যেতে লাগলো সেই আবেদনময়ী অধর জোড়ার দিকে।
"সাহিত্য ভাই.."
ঘুমের ঘোরে অস্ফুটস্বরেই শুধালো কল্পনা।থমকে গেল সাহিত্য।যেন হুশ ফিরল তার।কাপতে থাকা চাহনি নিয়ে দেখতে লাগলো কল্পনার দিকে।কি করতে এগুচ্ছিলো সাহিত্য এখনে?কোনো অধিকার ছাড়াই কল্পনাকে ছুঁতে যাচ্ছিল সে?মাথা নিচু করে ভারী কয়েক শ্বাস ফেলল।অতঃপর জোর পায়ে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।কিন্তু এদিকে যে কল্পনা এখনো ঘুমের ঘোরে সাহিত্যের নাম যপে যাচ্ছে।হয়তো কোনো স্বপ্ন দেখছে সে তার সাহিত্য ভাইকে নিয়ে।যেই স্বপ্নের আসল কাহিনী কল্পনা ছাড়া যেন আর কেউ জানে না।আর হয়তো ঘুম ভাঙার পর সেই স্বপ্ন ভুলেও বসবে মেয়েটা।
সাহিত্য কর্টেজের বাইরে এসে যেন ভারী হাসফাস করতে লাগলো।এতো ঠান্ডার মাঝেও যেন হৃদয়ে শান্তি পাইছে না।খুব কষ্ট হচ্ছে তার।কষ্টের ঔষধের ঠিকানা সাহিত্যের জানা থাকলেও যেন সেই ঔষধের কাছে যেতে পারছে না সে।আপাতত সাহিত্যের জন্য নিষিদ্ধ সেই ঔষধ সেবন করা।কিন্তু সাহিত্য আর কতদিন বাঁচবে তার এই কষ্টকে নিয়ে?সেই ঔষধ কি তাড়াতাড়ি নিজের কাছে আনতে পারে না সাহিত্য?তার যে বড্ড প্রয়োজন সেটার।
নিজের মনকে আর বুঝ না দিতে পেরে দেয়ালে অবিরাম ঘুষি বসাতে লাগলো সাহিত্য।নিজের উপর ক্ষোভ নিয়েই যেন বলতে লাগলো,
"ড্যামিট!ড্যামিট!ড্যামিট!!পাগল হয়ে গিয়েছিস কেন এতো?একটু ধৈর্যও ধরে রাখতে পারছিস না?১১টা বছর তো খুব দূরে ছিলি।তখন মনে হয়নি?এখন কি জন্য অধৈর্য হয়ে পড়েছিস?"
নিজের চাপা কন্ঠ যেন নিজের কাছেই সীমাবদ্ধ থাকলো সাহিত্যের।কিন্তু এই সীমা রেখায় যে প্রতি ক্ষণেই টান পড়ছে।ছিড়তে যেন আর বেশি সময় বাকি নেই।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
শীতের সকালে এখন ১১টা বাজলেও আকাশে তেমন কুয়াশা নেই।আজ একটু হালকা রোদ উঠেছে বলা চলে।এই মিষ্টি রোদের মাঝেই তো রিসোর্টের মাঠখানা মানুষে ভরপুর হয়ে আছে।কিন্তু কারো মধ্যে যেন কোনো তাড়া নেই।আর থাকবেই বা কেন?আজ দিনের বেলাটায় যে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়নি।আজ রাতে শুধু এশার মেহেদী ফাংশন হবে।তাই অডিটোরিয়ামসহ মাঠের দিকে সবাই আগামীকালকের বিয়ের জিনিসপত্র গোছাতে ব্যস্ত।তবে মিষ্টি রোদখানা উপভোগ করতেই যেন বেশিরভাগ মানুষ মাঠেই ঘোরাফেরা করছে।মাঠের কিছু-কিছু জায়গায় বসার জন্য সুন্দর করে রং-বেরঙের কাপড় দিয়ে তাবু টাঙানো।আর সেগুলোরই একটার মধ্যে বসে রয়েছে সাহিত্য আর ভিকি।
আকাশের দিকে মুখ করে বসে রয়েছে সাহিত্য।তার নড়াচড়ার যেন কোনো লক্ষণই দেখছে না ভিকি।ইদানীং ভিকির চোখে সাহিত্যের এমন ব্যবহার ধরা পড়ছে যখন কল্পনা বেশিক্ষণ তার চোখের সামনে থাকে না।তবে কাল রাতেই তো দেখা হয়েছে।এমনকি কল্পনাকে কোলে করেও নিয়ে গিয়েছে সাহিত্য।তো এতো তাড়াতাড়ি ডিপ্রেশনে পড়া ভিকির চোখে বাচ্চামো।
বেস্টফ্রেন্ডটাকে এবার একটু টোকা দিয়ে বসলো ভিকি,
"তুই আবার দেবদাস মুডে চলে গিয়েছিস?কল্পনা তো মাঠেই ঘুর-ঘুর করছে।এখন তো দেখতেও সমস্যা হচ্ছে না।তো এমন করে কেন বসে আছিস?"
ভিকির কথায় সাথে-সাথেই কোনো প্রতিক্রিয়া করল না সাহিত্য।সময় নিয়ে ভারী শ্বাস ফেলল।আকাশের দিকে মুখ রেখেই বলল সে,
"ইয়াসটারডে আই ট্রাইড টু কিস কল্পনা"
ভিকি হয়তো প্রথমে তেমন বুঝে উঠল না সাহিত্যের কথা।তবে ক্ষণিক পরে বুঝে উঠতেই হুড়মুড়িয়ে সাহিত্যের দিকে ঘুরে বসলো।কোটর ফাটা অক্ষি দিয়ে সাহিত্যকে কয়েক মুহুর্ত দেখে আবার সামনে ঘুরলো সে।মাঠের দিকে নজর দিয়ে খুজতে লাগলো কল্পনাকে।অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা কল্পনা প্রীতির ওড়না ধরে তার পেছন-পেছন ঘুরছে।প্রীতির সাথে হয়তো কিছু নিয়ে ঘ্যান-ঘ্যান করছে মেয়েটা।
ভিকি সেদিক থেকে নজর ঘুরিয়ে আবার দেবদাস রূপী সাহিত্যের দিকে দেখলো।কন্ঠে ভয় ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলল সে,
"কিন্তু কল্পনাকে দেখে তো স্বাভাবিক মনে হচ্ছে"
সাহিত্য তার ভঙ্গিমা না বদলেই বলে উঠল,
"ও ঘুমের মধ্যে ছিল"
ভিকি এবার বেশ জোরেই হুড়মুড়িয়ে নড়ে উঠলো।সাহিত্যের পাঞ্জাবির কলার শক্ত হাতে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলতে লাগলো সে,
"তোকে এজন্যই কি কাল রাতে কল্পনাকে কোলে নিতে দিয়েছিলাম?শা'লা,মেয়েটা তোর কাছে একটুও সেফ না!"
সাহিত্য তার পাঞ্জাবির কলার থেকে ভিকির হাত এক ঝটকায় সাড়িয়ে নিতে নিয়েই বলে উঠল,
"আরে করিনি তো কিস!বললাম যে করতে গিয়েছিলাম,থেমে গিয়েছি"
ভিকি ভারী শ্বাস ফেলে মাথা সামনের দিকে ঝুকিয়ে দিল,
"এমন কিছু করিস না যেন আমার বিয়ের আগে তোদের বিয়ে দিতে হয়"
সাহিত্য হঠাৎই ভিকির জ্যাকেটের কলার ধরে কাঁদো গলায় বলতে লাগলো,
"ভাই আমার দ্বারায় আর হচ্ছে না।আমি আর পারবো না।কিছু কর!কল্পনা আর আমার কোট ম্যারেজ করে দে!"
ভিকিও আবার সাহিত্যের পাঞ্জাবির কলার ধরে টানতে লাগলো,
"পাগলের মতো কথা কেন বলছিস?কল্পনা তোর মনের কথা এখনো অব্দি জানে না,তোর চাচা জীবনেও তোর সাথে কল্পনার বিয়ে দেবে না,আবার কল্পনা ফাহাদ আঙ্কেলের বিরুদ্ধে গিয়ে তোকে বিয়ে করবে কিনা সেটারও গ্যারান্টি নেই!তো তুই কোট ম্যারেজটা করবি কেমন করে!!"
সাহিত্য ভিকির কথায় তার জ্যাকেটের কলার ছেড়ে দিয়ে ভিকির ঝাকুনিতে কাবু হয়ে গেল।পেছনে মাথা হেলিয়ে গোঙাতে নিয়েই কাঁদো গলায় শুধালো সে,
"আমি জানি না-আ-আ।আমাকে শুধু আমার জানপাখি দে-এ-এ।এই ফাহাদ চাচার কি করি?দাদার ব্যাটা জীবন পানি-পানি করে রেখেছে।নিজে তো বউ পালিয়ে নিয়ে এসে বিয়ে করেছে,তো নিজের কন্যার ক্ষেত্রে এতো বৈষম্য কেনওওও"
ভিকি হাসতে নিয়েই সাহিত্য পাঞ্জাবির কলার ছেড়ে দিল,
"নিজে দোষ করলে বাপের নাম হয় এটা তোর চাচা নিজে বাপ হওয়ার পরে বুঝেছে"
কিছু বলল না সাহিত্য।শুধু খুত-খুত করে অশ্রুহীন কাঁদতে লাগলো।
এসময়টায় ভিকি আর সাহিত্যের কাছে কারো আসা বড্ড বোকামি হবে।সাহিত্য দেবদাস হয়ে থাকার কারণে কোনো উত্তর করবে না।আর ভিকি হয়তো কিছু কড়া কথাই শুনিয়ে দেবে।তবে সামনে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে রয়েছে সে হয়তো আগে থেকেই এমন পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত।তাই তো ভিকির সামনে দাঁড়িয়ে গলা খাকাড়ি দিল লিসা।
হঠাৎ কারো উপস্থিতি বুঝতে পেরে মাথা তুলল ভিকি।ফুল হাতা কালো লং টপস আর কালো ডেনিম প্যান্ট পরা লিসাকে দেখে ভ্রু জোড়া তার আপনা-আপনি উপরে উঠে গেল।লিসা একটু ভয়ে থাকলেও ভিকি একটুও রাগ হলো না লিসার উপর।শান্ত স্বরেই হাত দিয়ে ইশারা করে নিজের পাশে বসতে বলল তাকে।লিসা হালকা ভয় মনের মধ্যে রেখেই তার বসের পাশে বসল।মেয়েটা আনমনেই বসছিল,কিন্তু তার বসার পর মুহুর্তেই ভিকি পাশে থাকা এক পানির বোতল দিয়ে লিসার মাথায় দিল এক বারি।ভিকির এমন হঠাৎ আক্রমণে 'আউ' বলে মাথায় হাত বুলাতে লাগলো লিসা।মাসুম নজর ফেলল ভিকির উপর।এবার ভিকির চেহারায় কঠিনাত্ব দেখা দিচ্ছে।দুই হাত হাটুতে ঠেকিয়ে লিসার দিকে নজর রেখে শক্ত কণ্ঠেই বলে উঠল ভিকি,
"তোকে আমি বিডিতে আসতে বলেছিলাম তিন দিন আগে।এখন কেন এসেছিস?"
লিসা এখনো মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে।মিনমিনিয়ে বলল,
"আমি তো বলেছিলাম আপনাকে,যে অফিসের সবকিছু ঠিকঠাক করে তারপরেই আসবো আমি"
ভিকি লিসার দিকে নজর রেখেই হাতের বোতল প্রথমে সাহিত্যের দিকে তারপর নিজের দিকে তাক করে বলল,
"কোম্পানির সি.ই.ও. তার না হওয়া বিয়ে নিয়ে টেনশনে আছে।কোম্পানির সি.ও.ও. তার হওয়া বিয়ে নিয়ে টেনশনে আছে।আর সেখানে কোম্পানির প্রতি তোর এতো দরদ কেন উতলাচ্ছে?"
লিসা যেন একজন দায়িত্ববান স্টাফ হিসেবে মেরুদণ্ড সোজা করে বলল,
"কোম্পানির সি.ই.ও. তার না হওয়া বিয়ে নিয়ে টেনশনে আছে।কোম্পানির সি.ও.ও. তার হওয়া বিয়ে নিয়ে টেনশনে আছে।তাই তো আমিই আপাতত কোম্পানির দায়িত্ব নিয়ে আছি"
ভিকি সোজা হয়ে বসে আবার লিসার মাথায় বোতলের আঘাত করল।লিসা ক্যাত করে উঠার পরপরই শুধালো
সে,
"এতো অফিসের কাজ করে কোন বড়লোক হবি রে!কেন?অহির সাথে কথা বলে যে সব সেটেল করে নিলি।তারপরও আর কি কাজ সেখানে?"
লিসা এবার বেশ বিরক্ত হলো ভিকির কর্মকাণ্ডে,
"উফ্ স্যার!বুঝেন না কেন?অফিসের সবকিছু নিট এন্ড ক্লিন না থাকলে আমার মাথা ঠিক থাকে না"
সাহিত্যও এবার নিজের চিন্তা থেকে বেড়িয়ে লিসার কথায় মন দিল।লিসার কথা শেষ হওয়ার পরপরই সাহিত্যের দিকে ঘুরলো ভিকি,
"তোর ভাগ্য শুধু কল্পনার দিকটাতেই খারাপ।জীবনে দুটো অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাগ্যে জুটেছে দুটোই অফিসের কাজ ছাড়া কিছু বুঝে না।এই মেয়ে নাহয় আজকে এসেছে,রাজ নিশ্চয়ই কাল রাতে বিয়ের আগ মুহুর্তে আসবে।এসে মনে হয় এটাও বলবে যে একটা ডিল ফাইনাল করে এলাম"
সাহিত্য ভিকির কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া করল না।চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে ভিকির হাতের পানির বোতলটা টেনে নিল।অতঃপর গলা ভিজাতে লাগলো সেই পানি দিয়ে।
এদিকে লিসা ভিকির বাহুতে আঙুল দিয়ে ঘুতা দিয়ে যাচ্ছে,
"স্যার,অহি স্যারের কি হয়েছে?"
"আবার স্যার ডাকিস!!"
হঠাৎ সাহিত্য আর ভিকির এমন একসাথে চেচিয়ে উঠা একদম আশা করেনি মেয়েটা।হাতে-পায়ে চমকে উঠে চোখ-মুখ কুচকিয়ে শব্দ করে কৃতিম কান্না শুরু করল।সেই ভঙ্গিমা বজায় রেখেই কাঁদো গলায় শুধালো সে,
"মনে ছিল না তো"
ভিকি তীক্ষ্ণ নজর দিল লিসার উপর,
"কানাডায় ফেরত যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকেও স্যার ডাকবি না।এখানে তুই তোর ভাইয়ের বিয়েতে এসেছিস।এটা যেন দ্বিতীয়বার বলতে না হয়"
মাথা নিচু করে ফোত করে শ্বাস ছাড়ল লিসা।বাবা-মার একমাত্র সন্তান হওয়া এই মেয়েটার ভাগ্যে যেন একপ্রকার জোর জবরদস্তি দুটো বড় ভাই জুটেছে।সেটাতে অবশ্য লিসা কখনো নালিশ করেনি।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
কল্পনা প্রায় অনেকক্ষণ থেকেই প্রীতির চুড়িদারের ওড়না ধরে তার পিছন-পিছন ঘুরছে।উদ্দেশ্য তার একটাই।কাল রাতে সে তার রুমে কেমন করে গিয়েছে?সে ঘুমিয়ে পড়েছিলই বা কখন?
প্রীতি কল্পনাকে বারংবার বলে চলেছে,
"এই টপিকে তোর সাথে কোনো কথা হবে না।কথা শুরু হলেই আমি তোকে একটা বুঝাবো আর তুই আরেকটা বুঝবি।তার থেকে ভালো আমি চুপ করে থাকি"
এসব কান্ড অনেক সময় থেকেই চলছে।এবার আর কল্পনা শান্ত থাকলো না।ফুসে উঠে প্রীতির সামনে এসে প্রীতিরই ওড়না দিয়ে প্রীতির গলা পেচিয়ে ধরল,
"তুই মুখ খুলবি,নাকি মরবি আজকে"
কাশতে লাগলো প্রীতি।হাত দাপাদাপি করতেই কল্পনা তাকে ছেড়ে দিল।প্রীতি যেন পারছে না কল্পনাকে চিবিয়ে খেতে।তারপরও ভারী নজর কল্পনার দিকে রেখে বলে উঠল সে,
"সাহিত্য ভাইয়া তোকে কোলে করে নিয়ে গিয়েছে"
দুই ধাপ পিছিয়ে গেল কল্পনা।ডান হাতটা চলে গেল তার বুকের উপর,
"মাথা খারাপ তোর?ঘুমিয়েছিলাম আমি আর স্বপ্ন দেখেছিস তুই?"
প্রীতি মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করল,
"এই যে।বললাম যে, আমি যেটা বলব তুই শুনবি না"
"তুই যে কাল থেকে অমন কথাই বলে বেড়াচ্ছিস"
"আর তোর সাহিত্য ভাই যে অমন কাজই করে!"
থতমত খেল কল্পনা।বুকে রাখা হাত উঠিয়ে হাওয়ায় নেড়ে বলল,
"অমন কিছুই করে না সাহিত্য ভাই।ওই...কাল ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম,তাই ঘুম না ভাঙার জন্য মনে হয় কোলে করে রুমে নিয়ে গিয়েছে"
আশপাশে পরিবেশ স্তব্ধ রইল কিছুক্ষণ।অতঃপর কল্পনা দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেও আঙুলের ফাক দিয়ে চোখ জোড়া উন্মুক্ত রাখল।চাপা চিৎকার দিল সে,
"সাহিত্য ভাই আমাকে কোলে নিয়েছিল!!??"
কল্পনার এমন আজগুবি কান্ড দেখে প্রীতি মাথায় হাত চাপড়ে বসলো।তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মেয়েটা মনে হয় আসলেই পাগল।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
আজ রাতে যেহেতু শুধু মেয়েদেরই মেহেদী অনুষ্ঠান তাই ছেলেরা যেন নিজ থেকেই দিনটাকে নিজেদের করে নিয়েছে।মাঠের মাঝের দিকটায় বড়সড় এক খোলামেলা তাবুর মধ্যে সাউন্ড বক্স লাগিয়ে হৈ-হুল্লোড় করতে ব্যস্ত তারা।আগে সেখানে বাকি ছেলেদের সাথে শুধু অয়ন আর রবি থাকলেও এখন ভিকি আর সাহিত্যও যোগ দিয়েছে।অন্ত অনেকক্ষণ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল সেই জায়গা থেকে। তবে আর পাড়ল না।ভিকি আর অয়ন একপ্রকার তাকে ঘাড়ে তুলেই নিয়ে এসেছে।
দূর থেকে বাচ্চাদের এমন পাগলামো দেখে মৃদু হাসছিলেন রঞ্জক শেখ।সাহিত্য দেশে ফেরার পর যেন তার চুপচাপ ছেলেটাও একটু স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।এই বয়সে এমন হৈ-হুল্লোড় করবে না তো কখন করবে?
সেই তাবুর দিকেই নজর রেখে ছিলেন রঞ্জক শেখ।হঠাৎই শুভ্রা রঙা পাঞ্জাবির পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো তার।পকেট থেকে ফোন বের করে ফাহাদ শেখের নাম্বার দেখে বেশ ভালোভাবেই তার ভ্রু কুচকালো।তবে তেমন কিছু চিন্তা না করে রিসিভ করে ভাইকে সালাম দিলেন তিনি।ফাহাদ শেখ সালাম নেওয়ার পরপরই রঞ্জক শেখ বলে উঠলেন,
"কি ব্যাপার ভাইজান,কোনো দরকার ছিল?"
ফাহাদ শেখের সোজাসাপটা কথা,
"কেন,আমি কি এমনি কল দিতে পারি না?"
রঞ্জক শেখের ভ্রু জোড়া আরো বেশি কুচকালো।ফাহাদ শেখ কোনো কারণ ছাড়া কল দেওয়ার মানুষ না এটা রঞ্জক শেখ তার ছোট ভাই হিসেবে ভালো করেই জানেন।তারপরও মুখে হাসি ফুটিয়ে শুধালেন,
"আরে না না।সেটা কেন হতে যাবে?ভাই হন আপনি আমার, যখন ইচ্ছা কল করবেন।ওই,জরুরি কিছু নাকি সেটাই জিজ্ঞেস করছিলাম"
"না তেমন জরুরী না।আম্মা জিজ্ঞেস করছিল তোদের ব্যাপারে।তাই কল করলাম"
মহুয়া বেগম কখনোই ফাহাদ শেখকে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন না।আর কাল রাতেই লতিফা শেখের সাথে কথা হয়েছে মহুয়া বেগমের।রঞ্জক শেখ মনের মধ্যে ভাইয়ের কল দেওয়ার কারণ খুঁজছিলেন,এর মাঝেই আবার বলে উঠলেন ফাহাদ শেখ,
"তো কেমন আছে সবাই?"
"এই তো,আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই"
"অন্ত যে পরের দিন গেল,যেতে কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি?"
"না কোনো সমস্যা হয়নি"
"অনু ঠিক আছে?"
"হ্যাঁ-হ্যাঁ,ও তো ভালোই মজা করছে"
"আর কল্পনা?"
এবার রঞ্জক শেখ ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে নিম্নাষ্ঠ কামড়ে ধরলেন।ভাইয়ের হঠাৎ কল দেওয়ার কারণ তিনি এবার বুঝতে পেরেছেন।ফাহাদ শেখের চোখ ফাকি দেওয়া অতটাও সহজ না।কিন্তু কল্পনা সেটা করতে সক্ষম হলেও ফাহাদ শেখের মনের চোখকে কখনোই ফাকি দিতে পারবে না।
কল্পনা আসলেই বান্দরবান গিয়েছে নাকি ভিকির বিয়েতে এসেছে,সেটা নিশ্চিত হতেই ফাহাদ শেখ এমন এক চাল চেলেছেন রঞ্জক শেখের কাছে।হয়তো ভেবেছিলেন যে কল্পনা যদি সত্যিই ভিকির বিয়েতে থাকে তাহলে রঞ্জক শেখ আনমনেই সে কথা বলে দিবেন।কিন্তু আজ আল্লাহ মাবুদ কল্পনাকে বাঁচিয়ে নিয়েছেন।কারণ রঞ্জক শেখ ফাহাদ শেখের চাল ভালো করেই বুঝতে পেরেছেন।
ফাহাদ শেখের কথা শেষ হওয়ার ক্ষণিক সময়ের মধ্যেই বলে উঠলেন রঞ্জক শেখ,
"কল্পনা এখানে কি করবে?ও না বান্দরবানে?ভুলে গিয়েছেন?অবশ্য কল্পনার সাথে ফোনে তেমন কথা হয়নি তো ভাইজান,তাই বলতে পারছি না।কিন্তু অনুর কাছে শুনলাম সে নাকি বান্দরবানে ভালোই মজা করছে।তার সাথে নাকি কথা হয়েছিল কল্পনার"
রঞ্জক শেখের এতো তাড়াতাড়ি উত্তর দেওয়া ফাহাদ শেখ আশা করেননি।তাই তো বুঝে উঠতে পারছেন না যে আসল ঘটনা কি।তবে রঞ্জক শেখের কথায় মুখে হালকা হাসি নিয়েই বললেন,
"হ্যাঁ-হ্যাঁ,আমি ভুলে গিয়েছিলাম ও তোমাদের সাথে নেই।সে যাই হোক,একটা মিটিংয়ের জন্য ডাক পড়েছে তো,রাখছি এখন"
রঞ্জক শেখ সালাম দিয়ে ফোন কেটে দিলেন।লোকটা ভারী শ্বাসকষ্টে ভুগছেন বর্তমানে।তার এই চতুর ভাইকে বুঝ দেওয়া এতো সহজ না।যেহেতু তিনি রঞ্জক শেখকে কল দিয়েছেন তার মানে অন্য কাউকেও কল দিতে পারেন।রঞ্জক শেখ প্রথমে পা বাড়ালেন নিজের স্ত্রীর উদ্দেশ্যে।তবে কল্পনাকে মনে হয় বিষয়টা আগে জানানো উচিৎ হবে সেটা ভেবেই উলটো দিকে ঘুরে কল্পনার খোঁজে পা বাড়ালেন।
#চলবে