#পর্ব_৬২
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সাহিত্যের হাত থেকে অয়ন একদমই ছাড়া পায়নি।আজ সাহিত্য তাকে কিলিয়েই ছেড়েছে।অমন জিম করা এক ছেলের হাতের ঘুষি খেয়ে অয়ন যেন আর আস্তো নেই।বাম চোখের নিচটা কেমন লাল হয়ে আছে বেচারার।
অয়ন তো শুধু একটু মজা করেই কল্পনাকে সেকথা বলেছিল।কিন্তু এদিকে যে এই কল্পনা গিয়ে লিসার সাথে কথা বলেছে এবং এতোকিছু হয়ে যাবে সেটা যেন অয়নের ধারণার বাইরে ছিল।
বাম গালে তো আর হাত ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না,তাই ডান গালে হাত ঠেকিয়ে মাঠের এক সাইডে তাবুর মধ্যে বসে রয়েছে অয়ন।অবশেষে সাহিত্যের হাতে ধোলাইটা খেয়েই ছাড়লো।সেটা ভাবতে নিয়েই নিজের মুখখানা একদম প্যাচার মতোই করে রেখেছিল সে।এর মাঝেই তার সামনে আগমন ঘটে সেই ব্যক্তির যেই ব্যক্তিকে নিয়ে এতোকিছু হয়ে গিয়েছে।
অয়ন মুখ ভোতা করে নজর অদুরে রেখেছিল।লিসা এসে একটা আইস ব্যাগ ধরল তার সামনে।অয়ন মাথা তুলে দেখার পরেও কিছু বলল না লিসা।শুধু হালকা ঠোঁট বাকালো।আবার নজর ঘুরিয়ে নিয়ে অভিমানি সুরে বলে উঠল অয়ন,
"লাগবে না"
লিসা সময় নষ্ট করল না।এবার মুখ খুলল সে,
"আরে আমি হাসছি না তো।নিন,এটা লাগিয়ে নিন।নাহলে অহি যে বাঞ্চটা মেরেছে,এতো সহজে ব্যথা সড়বে না"
অয়ন আবারো লিসার পাশে ঘুরলো,
"এই আইস ব্যাগ নিয়ে গিয়ে তোমার অহি স্যারকেই দাও।ওর মাথাটা একটু ঠান্ডা করুক"
লিসা অয়নের পাশে বসতে নিয়েই শুধালো,
"তো আপনি অমন কথা কেন বলতে গিয়েছেন?"
লিসার দিকে ঘরলো অয়ন।মাথা ঝাকিয়ে ঝাজিয়ে উঠল,
"আমি কি জানতাম যে এতোটুকু কথা এতোদূর যাবে?.....আউ!"
শেষের 'আউ'-টা অয়ন তার গালের ব্যথার কারণেই বলে উঠল।সেটা অবশ্য লিসা ভালোভাবেই বুঝলো।যার দরুন এবার আর অয়নকে জিজ্ঞেস করল না সে।নিজ থেকেই অয়নের গালে আইস ব্যাগটা চেপে ধরল।তাতে আবারো 'আউ' করে উঠল অয়ন।তবে লিসা নিজের কথা বলে উঠল,
"আপনি অমন মজা করবেন সেটা আমাকে তো অন্তত জানাতেন।আমার মতো সিংগেল একটা মেয়েকে এমন মিংগেল বানিয়ে দিতে পারলেন?"
ভ্রু কুচকালো অয়ন,
"তোমার না বয়ফ্রেন্ড আছে?"
লিসা স্বাভাবিকভাবেই বলে উঠল,
"সেটা কবেকার কথা।প্রায় এক বছর হতে চলল ব্রেকাপ হওয়ার"
অয়ন যেন আকাশ থেকে পড়ল সে কথা শুনে।লিসার দিক থেকে সটান নজর ঘুরিয়ে আবার অন্যদিকে দেখতে লাগলো।সেটাতে লিসার হাত থেকে আইস ব্যাগটা পড়ে যেতে নিলে সামলে নিল মেয়েটা।
এদিকে অয়ন মাথা ঘুরিয়ে নিয়ে অন্য চিন্তায় ব্যস্ত।সে তো জানে লিসার বয়ফ্রেন্ড আছে।তাই তো ছেলেটার চোখ বারবার এই মেয়েটার উপর পড়ার পরেও ভারী শ্বাসের সাথে মুচকি হাসি দিয়ে অন্যদিকে ঘুরে।কিন্তু আজ যেন আর ভারী শ্বাস ফেলল না।আর না মুচকি হাসলো।
সাহিত্য দেশে ফেরার পর অয়নকে দু'বার কানাডায় যেতে হয়েছিল অফিসের কাজের সুবাদে।তখনই তো লিসা চোখে পড়ে তার।সেটা ছাড়াও অনলাইনে অনেক মিটিং করেছে তারা।মেয়েটার বাচ্চামোতে যেন কেমন একটা মায়া বসে গিয়েছে অয়নের।কিন্তু সাহিত্য যখন বলেছিল যে লিসার বয়ফ্রেন্ড আছে তখন আর সামনে আগাতে যায়নি।সদ্য ব্রেকাপ হওয়া ছেলেটা যেন আবার ভেঙে পড়ে।
অয়নের হাসফাস লিসার চোখে স্পষ্ট।লিসা আবার কম চালাক নাকি?কানাডিয়ান এই মেয়ের এসব ব্যাপারে ভালো করেই জানা আছে।জীবনের গত হওয়া সময়ে তিনটা রিলেশন করা থেকে কিছু তো জ্ঞান অর্জন করেছে সে।অয়নের সাথে অনলাইন মিটিং-এ লিসা একটু বিভ্রান্তে থাকলেও আজ সারাটাদিন অয়নকে দেখেছে।লিসার সাথে যেন কথাই বলতে আসে না।লিসা কাছে গেলেই ফোন দেখার ভান করে অন্যদিকে চলে যায়।
লিসা এবার নিঃশব্দে মুচকি হাসলো।অয়নের চাপ দাড়ি যুক্ত গালে তো এখনো সে আইস ব্যাগটা চেপে ধরে রয়েছে।কিছু বলার জন্য মুখই খুলেছিল সে।কিন্তু সেখানে আগমন ঘটলো আরো এক ব্যক্তির।এক মেয়ে এসে ঠোঁটে হালকা হাসি নিয়েই বলল,
"কি ব্যাপার মিস্টার অয়ন তালুকদার?যেই বন্ধুর কথায় আমাকে ছেড়েছিলেন সেই বন্ধুর হাতে মার খেয়ে কেমন লাগছে?"
সামনের মেয়ে কথা বলতে শুরু করার সময়ই অয়ন আর লিসা তার দিকে দেখে।দুজনেই ভ্রু কুচকালো সেই মেয়ের কথায়।অতঃপর অয়ন উঠে দাড়ালো।প্রথমে একটু বিভ্রান্ত হলেও এখন দাঁত চিবিয়ে বলল সে,
"রাইবা?তুমি এখানে কি করো?"
হাসলো রাইবা,
"তোমার ফ্রেন্ডের হবু বউ এশা তোমার এক্স এর দূর সম্পর্কের বোন হচ্ছে।তাই আমি এখানে"
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে এবার লিসাও উঠে দাড়ালো।তবে কিছু না বলে শুনতে লাগলো সবকিছু।
অয়ন রাইবার দিকে দেখে ফুসেই যাচ্ছে।সেটা দেখে রাইবা আবার হেসে বলে উঠল,
"মানে,তুমি আমাকে ছেড়েছিলেই কেন অয়ন?এখন এমন সিংগেল থাকার জন্য?"
অয়ন কটমটিয়ে উঠল,
"না।আমার হালাল কামাইয়ের টাকা তোমার মতো বস্তা পচা মেয়ের পিছনে যেন ওয়েস্ট না হয় সেজন্য...হাউ রিডিকুলাস ইউ ওয়্যার!তুমি এমন টাকা খাওয়ার জন্য আমাকে ইউজ করছিলে?যখন দিতে মানা করে দিয়েছি তখন 'আর ভালোবাসি না তোমাকে', তাই না?"
রাইবার মুখ থেকে যেন হাসি সড়ছেই না,
"এমন লেম অযুহাত দিও না।আমাকে সামলানোর মতো তোমার সাধ্য নেই তাই তুমি আর কিছু দিচ্ছিলে না।তোমার মতো ছেলেদের আমি কেন?কোনো মেয়েই পছন্দ করবে না"
এবার আর লিসা চুপ থাকতে পারলো না।অয়নের সামনে দাঁড়িয়ে রাইবার মুখোমুখি হলো,
"ও হ্যালো,কুইন অফ ছাপরি।মুখ সামলে...অবশ্য কথাটা ভুল বলোনি।তোমার মতো মেয়েদের অয়নের সাথে থাকা উচিৎ-ও না।অয়নের মতো বিজনেসম্যান তোমার মতো থার্ডক্লাস মেয়েকে কেন টাকা দিতে যাবে?নিজের দিকে একবার দেখেছো?কেউ যদি জানতে পারে তুমি অয়নের এক্স তাহলে অয়ন লজ্জায় পড়ে যাবে।তুমি এতোটা ডিসগাস্টিং দেখতে আর সাথে তোমার ন্যাচারও"
লিসা যেন সফল হলো সামনের তরুনীর মুখ থেকে হাসি সড়াতে।লিসার দিকে আঙুল তাক করে ঝাজিয়ে উঠল রাইবা,
"এই মেয়ে!মুখ সামলে।জানো আমি কে?...."
"জানি তো।ফ্লাইং গাধা"
রাইবার কথার মাঝেই লিসা এমন কিছু বলে উঠাতে অয়ন পিছনে লুকিয়ে হাসলেও সামনের রাইবা ভালোই ভড়কালো।কিন্তু নিজের কথা চালিয়ে গেল সে,
"এই মেয়ে,কে তুমি?অয়নকে এতো ডিফেন্স করছো কেন?"
লিসা নির্দ্বিধায় বলে উঠল,
"আমি অয়নের গার্লফ্রেন্ড!এন্ড ইউ নো হোয়াট?তোমার মতো বেকার পিদ্দি মেয়ে অয়নের যোগ্য না।নিজেকে আগে স্টাবলিশ করে তখন নিজের টাকা খেও।আমার অয়নের পিছনে কেন পড়েছো?"
লিসার কথায় যেন অয়নের ভ্রু জোড়া হালকা উঁচুতে উঠতে বাধ্যই হলো।বিড়বিড় করে আওড়ালো সে,
"আমার অয়ন?"
তবে লিসার সামনের মেয়ে ভড়কে উঠেই নজর দিল অয়নের দিকে,
"অয়ন!এই মেয়ে কি বলে?"
অয়ন কাধ উঁচু করার সাথে দুই হাতও উঁচু করল।অতঃপর ঠোঁট উল্টিয়ে হেসে স্বাভাবিকভাবেই রাইবার উদ্দেশে বলে উঠল,
"শি সেইড হোয়াট শি সেইড"
লিসা এখনো দমেনি।আবার বলল সে,
"কি অয়ন,হ্যাঁ?অয়ন ভাইয়া ডাকো।এমনকি ভালো হবে অয়নকে দুলাভাই ডাকো।তোমার এই লিসা আপুর বয়ফ্রেন্ড লাগে সে।আর ফারদার যদি অয়নের সাথে কথা বলতে এসেছো তাহলে খবর করে ছেড়ে দিব একদম"
নিজের এক্স বয়ফ্রেন্ডকে হঠাৎ দুলাভাইয়ের কাতারে পড়তে দেখে ভড়কে উঠল রাইবা।ফুসে উঠতে গিয়েও লিসার চোখ দেখে থেমে গেল।অতঃপর হনহনিয়ে অন্যদিকে হাটা দিল।সেদিকেই নজর রেখে ফুসছিল লিসা।এর মাঝেই পেছন থেকে অয়নের গলা শুনা গেল,
"এখন যে ভিকির রিসিপশন পর্যন্ত আমাদের অ্যাক্টিং করতে হবে।সেটার কি করবা?"
অয়নের কথায় ভড়কালেও পর মুহুর্তে মুখে হালকা হাসি নিয়ে পেছনে ঘুরলো লিসা,
"অ্যাক্টিং কেন?রিয়েলে করলে কি কোনো সমস্যা আছে?"
চোখে চোখ রেখে লিসার এমন কথা বলায় বেশ অবাক হলো অয়ন।এই মেয়েটা যে তাকে পছন্দ করে বর্তমানে কি সেটাই বুঝাচ্ছে?অয়ন মেকি হেসে মাথা নিচু করল।তবে আবার সামনের সুন্দর রমণীর দিকে দেখে বলে উঠল,
"আমার তো কেনো সমস্যা নেই ম্যাডাম।আপনার সমস্যা হবে নাকি সেটাই জিজ্ঞেস করছিলাম"
লিসা কিছু না বলে শুধু ঠোঁট বাকিয়ে হেসে গেল।ক্ষণিক বাদে হাতের আইস ব্যাগটা অয়নের দিকে ছুড়ে মেরে বলে উঠল সে,
"কিছুক্ষণ পরে এশার মেহেদী অনুষ্ঠান শুরু হবে,আমি সেখানেই গেলাম।আর এটা গালে লাগিয়ে বসে থাকেন।নাহলে আমার পাশে ছবিতে সুন্দর দেখাবে না"
কথা শেষেই লিসা উল্টো ঘুরে চলে গেল।অয়ন মুখে হাসি নিয়ে সেদিকে দেখে থাকলো কিছুক্ষণ।অতঃপর হাতের আইস ব্যাগ গালে না লাগিয়ে সেটা হাতে রেখেই নাচতে শুরু করল সে।তার এক্স একটা কাল নাগিনী হলেও আজ ফেরেশতার রূপে এসেছিল।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
রিসোর্টের এক কর্টেজের বড়সড় দুটো রুম আজ মেয়েদের দখলে।কারণ মেহেদী লাগানোর মানুষজন শুধু যুবতী মেয়েরাই।যার দরুন দুটো রুমই যথেষ্ট ছিল।ফাঁকা রুম দুটোর মেঝেতে মাদুর পেতে কিছু পিলো আর ছোট-ছোট কোল বালিশ রাখা হয়েছে।ঘরের কোণাগুলো সুন্দর ঘীয়ে রঙা ফেইরি লাইটের সাথে আর্টিফিশিয়াল গাছের পাতা দিয়ে সাজানো।ঘরের কোণা আর্টিফিশিয়াল জিনিস দিয়ে সাজানো থাকলেও পুরো ঘরে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে যবতীরা।তাদের কথা-বার্তাসহ হাসির গুঞ্জন শুনা গেলেও বেশ ক্ষীণ সেই আওয়াজ।কারণ সবাই যে নিজের হাতে মেহেদী লাগিয়ে নিতে ব্যস্ত।অনেকের এতক্ষণে মেহেদী লাগানো শেষও হয়েছে বটে।তবে তারা সেখানে বসে থেকেই গল্প করার সাথে টুকটাক নাস্তাও খেতে ব্যস্ত।
কিন্তু এশা একদমই সে কাজ করছে না।হাতের ভারী মেহেদী নিয়েই সে দুই রুম পায়চারি করে যাচ্ছে।এতক্ষণ ধরে পায়ের মেহেদী না শুকানোর জন্যই উঠতে পারছিল না।তবে সেটা শুকোনোর পরপরই উঠে হাটাহাটি শুরু করেছে মেয়েটা।অবশ্য এমন ব্যস্ত আচরণের কারণও আছে।ভিকির সাথে দুপুর থেকে দেখা হয়নি।ভিডিও কলে কথা হয়েছে শুধু।সেই কথা বলার সময়ই এশা বুঝতে পেরেছিল যে ভিকি কতটা ব্যস্ত।বিয়ের দিনের সব ঠিকঠাক করার ভুত যেন এবার ভিকির মাথাতেও চড়েছে।বিয়ের দিন যেন কোনো গোড়মিল না হয় সেসব ঠিক করতেই সারাদিন বাকিদের সাথে সে-ও ব্যস্ত।কিন্তু এশার মনটা কেন জানি খুত-খুত করছে ভিকিকে একবার সরাসরি দেখবে বলে।তাই তো ক্ষণিক আগেই এশা সাহিত্যকে কল করে ভিকিকে টেনে এখানে আনতে বলল।সাহিত্য অবশ্য বলেছে যে ছেলেরা সবাই অনেক ব্যস্ত আছে।কিন্তু এশা যেন জিদ ধরে বসেছে।ছোট বোনের এক আবদার রাখতেই যেন সাহিত্য হাজির হলো ভিকিকে নিয়ে।
রুমের দরজায় ভিকিকে দেখে মুখে হাসি নিয়ে লাফিয়ে উঠে সেদিকে এগুলো এশা।গিয়ে আগে জাপ্টে ধরল ভিকিকে।ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত ছিল ভিকি।হঠাৎ এশার এমন জড়িয়ে ধরায় ভড়কালো বেশ।আশেপাশের মেয়েরা তো কৃতিম মৃদু কাশি দিতে ব্যস্ত।সেদিকে তোয়াক্কা নেই এশার।ভিকিকে ছেড়ে দিয়ে মেহেদী রাঙা হাত সামনে নিয়ে ভিকিকে দেখালো সে,
"দেখো!আমি আজকে ফাস্ট টাইম এমন হেভি ডিজাইনের মেহেদী দিয়েছি।কেমন লাগছে?"
এশার দিকে নজর দিয়ে কান থেকে ফোন সাড়ালো ভিকি।মুখে মৃদু হাসি নিয়ে ক্ষণিক সময় দেখে থাকলো এশার দিকে।অতঃপর দুই হাত দিয়ে এশার মুখো-মন্ডল ধরে কপালে অধর ছুয়ে দিল।সে অবস্থায় থেকেই শান্ত স্বরে শুধালো,
"আমার বউ লাগছে"
সে কথায় এশা হালকা লজ্জা পেলেও রুমের বাকি মেয়েরা টোন করে উঠল।সেটাতে হাসলো ভিকি।
সাহিত্য দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দেখে ছিল ভিকি আর এশার দিকে।ভিকির কান্ডে ঠোঁট বাকিয়ে হালকা হেসে রুমের ভেতর চোখ ঘুরাতে লাগলো।হয়তো নিজের প্রেয়সীর কথা খুব মনে পড়ছে তাই।অয়নকে কেলানোর পর কল্পনার সাথে সাহিত্যের আর দেখা হয়নি।ছেলেটা তার প্রেয়সীকে অনেক খুঁজেছে।কিন্তু কল্পনা যেন চোখের সামনেই পড়ছে না।সেজন্যই হয়তো বিকেল থেকে মেজাজটা চিটচিটে হয়ে আছে সাহিত্যের।কেউ অল্প কিছু বললেই যেন চেচিয়ে উঠছে সে।ভিকির মতো তো তারও একটু ইচ্ছা করে নিজের প্রেয়সীকে মনে কথা বলতে।অধর জোড়া সেই তুলতুলে গালগুলোতে এমনভাবে ছুয়ে দিতে মন চাইছে যেন ভারী লজ্জা ভার করে বসে সাহিত্যের প্রেয়সীর চোখ দুটোতে।কবে যে সাহিত্য একটু নিজ অধিকার খাটাতে পারবে তার প্রেয়সীর উপর?
মনের মধ্যে এতো কিছু ভাবতে নিয়েই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির উপর চোখ আটকালো সাহিত্যের।কল্পনা এক কোণে উলটো দিক হয়ে বসে কি যেন করছে।উলটো দিকে ঘুরে থাকা প্রেয়সীকে সবার চোখের আড়ালে দেখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে সাহিত্য।খোলা চুলে পিঠখানা একদম ঢেকে আছে কল্পনার।কিন্তু সাহিত্য যেন ঠিকই চিনেছে তার জানপাখিকে।সাহিত্য যে ঘ্রাণ শুকেও বলে দিতে পারবে যে কোনটা তার প্রেয়সী।তবে বর্তমানে আলগোছে শত চেষ্টার পরেও প্রেয়সীকে না দেখতে পেয়ে রাগটা যেন আবার মাথায় উঠল সাহিত্যের।হয়তো রুম থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার চিন্তাই করছিল সে।কিন্তু এমন সময় এশা বলে উঠল,
"আমার কাছে একটা এতো ভালো আর্টিস্ট থাকতে নাকি আমি মেহেদী আর্টিস্টকে হায়ার করেছি।এটা কি ভালো কথা?"
সাহিত্য বুঝলো যে এশা তাকেই সে কথা বলেছে।বুকে দুই হাত গুজে রাখা অবস্থাতেই বলল সাহিত্য,
"ওসব মেহেদী দেওয়া আমার কাজ না"
মুখের হাসি দাবিয়ে রেখে ঠোঁট মোচড়ালো এশা,
"তুমি যে ভালো আর্ট পারো না সেটা বললেই তো হয়"
ভিকি ভড়কে উঠে এশার দিকে দেখলো।এশা ভিকির নজর উপেক্ষা করে জড়িয়ে ধরল তার হাত।অতঃপর আবার সাহিত্যের উদ্দেশ্যে শুধালো,
"স্বীকার করে নাও,যে তুমি এখন আর ভালো আর্ট পারো না"
সাহিত্যের রাগটা যেন বেড়েই যাচ্ছে।কিন্তু নিজেকে সংযত করল সে।দাঁত চিবিয়ে শান্ত স্বরে বলে উঠল,
"বল,কাকে মেহেদী দিতে হবে?"
হয়তো রুমে উপস্থিত বাকি মেয়েরা কান কাড়া করে রেখেছিল সাহিত্যের এই কথা শুনার উদ্দেশ্যেই।কেবলই সবাই হুড়মুড়িয়ে নিজের নাম বলতে যাবে এমন সময় এশা মুখের হাসি বড় করে বলে উঠল,
"কল্পনাকে!"
থমকালো সবাই।সাহিত্যও বেশ ভড়কেছে।ভিকি এবার বুঝলো যে এশা কিসের পরিকল্পনা রটিয়ে যাচ্ছে।সে মিটিমিটি হাসলো শুধু।
কিন্তু এদিকে যার নাম এশা এতো জোরে বলে উঠল সেই ব্যক্তি আতকে উঠে দরজার দিকে ঘুরলো।দরজার কাছের তিন ব্যক্তি নজরে আসার পরেও সাহিত্যের দিকে চোখ আটকে গেল তার।অমনি আবারো আতকে উঠল মেয়েটা।সাহিত্যের মুখোশ্রি যে বড়ই ভয়ংকর ঠেকছে কল্পনার কাছে।সাহিত্য যে রাগের মাথায় আছে সেটা বুঝলো সে।তবে ঠোঁটের বাম কোণ বাকিয়ে যে সুক্ষ্ম হাসি নিয়ে কল্পনার দিকে দেখে আছে সেটা মাত্রাতিরিক্ত ভয়ংকর!
বিকেলে অয়নকে সাহিত্য যখন ধুমাধুম বসিয়ে দিচ্ছিল তখন কল্পনা দূর থেকে সবই দেখে।কল্পনার একটা ভুল বুঝা যে সাহিত্যের এতোটা রাগ উঠিয়ে দেবে সে বুঝতে পারেনি।তখন সাহিত্যকে অমন রাগের মাথায় দেখে তার সামনে যেতেও ভয় লাগছিল।রাগের মাথায় যদি কল্পনাকেও দু-একটা বসিয়ে দেয়?এমনিতে তো গতকাল হলুদের অনুষ্ঠানে কিসব করছিল সাহিত্য।সেগুলোর সম্মুখীন আর হতে চায় না কল্পনা।মনটা যে কেমন ধড়ফড় করে উঠে মেয়েটার।সেই অনুভূতি থেকে দূরে ভাগতেই তো সাহিত্যের থেকে পালিয়ে বেড়াতে ব্যস্ত।কিন্তু এই মুহুর্তে এশার মুখ থেকে বের হওয়া একটা শব্দে যেন সেই পালিয়ে বেড়ানো বেহেশতে গেল।
কল্পনা নজর ঘুরিয়ে এশার দিকে দেখলো।কাপতে লাগলো মেয়েটার কন্ঠে,
"এশা আপু,আমাকে কি জন্য কোরবানি করছো?....আর আমার হাতে মেহেদী দেওয়া হয়ে গিয়েছে তো!এই দেখো,এখনে শুকনো মেহেদীগুলো তুলে ফেললাম"
শেষের কথাটা বলতে নিয়েই মেহেদী ভর্তি দুই হাত সামনে ধরল কল্পনা।শুকনো মেহেদীর কিছু অংশ এখনো লেগে আছে হাত দুটোয়।কিন্তু মেহেদীর কালচে গাঢ় রঙের পাশে যেন সেগুলো বুঝা যাচ্ছে না।অর্গানিক মেহেদীটা কালচে হয়ে কেমন গাঢ় খয়েরী রঙ ধারণ করে আছে।অথচ বাকিদের মতো কল্পনাও শুধু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মেহেদী হাতে রেখেছিল।
এশা কল্পনার হাতের মেহেদীর দিকে নজর রেখেই ভিকির উদ্দেশ্যে ধীমি আওয়াজে বলল,
"দেখো!কল্পনার হাতের মেহেদী কত গাঢ় হয়েছে।ভাইয়ার ভালোবাসা একদম ফুটে উঠেছে মেয়েটার হাতে।আমার মেহেদী এমন গাঢ় না হলে কিন্তু তোমার খবর আছে"
শেষের কথাটা বলতে নিয়েই ভিকির দিকে সরু চোখে দেখলো এশা।ভিকি তার দিকে নজর দিয়ে ঘাড় চুলকাতে নিয়েই মৃদু হেসে বিড়বিড় করে উঠল,
"তোমার ভাই কল্পনার জন্য যেমন পাগলামি করে সেটা আমার কেন?কারো সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর সাধ্য নেই"
শুকনো মেহেদীসুদ্দো হাত দিয়ে অধর ঢেকে হাসলো এশা।অতঃপর আবার কল্পনার দিকে ঘুরে স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালো,
"হাতে মেহেদী দেওয়া হয়েছে তো কি হয়েছে?পায়ে দিয়ে দিক।তুমি পায়ে তো এখনো মেহেদী দাওনি"
কল্পনা 'দ' আকৃতি হয়ে বসে ছিল।এশার কথায় মেরুন রঙের থ্রিপিসের সালোয়ারে আবৃত পাগুলোকে আরো নিজের কাছে লেপ্টে নিল সে,
"আ-আরে না না!আমি পায়ে মেহেদী দিব না তো।শুধু হাতেই ঠিক আছে"
কল্পনা আরেক দফা আতকে উঠল যখন সাহিত্যকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখলো।সাথে পড়নের হালকা কফি রঙা ওল্ড মানি প্যান্টের উপর কালো ফুল স্লিভ'স পোলো শার্টের হাতা গুটাতেও ব্যস্ত সাহিত্য।ঠোঁটের সেই বাকা হাসি নিয়েই সাহিত্য কল্পনার দিকে এগিয়ে আসছে।
এলোমেলো নজর ফেলল কল্পনা।একবার চিন্তা করল উঠে দাঁড়াবে।কিন্তু পাগুলো যেন হঠাৎই অকেজ হয়ে গিয়েছে।কল্পনার এসব হাবিজাবি চিন্তার মাঝেই সাহিত্য এসে কল্পনার সামনে পা ভাজ করে বসলো।সেটা দেখে ভড়কে উঠে সাহিত্যের দিকে নজর দিল কল্পনা।সাহিত্যের মুখের হাসিটা এখন আর নেই।গম্ভীর মুখোশ্রি ধারণ করেছে সেই চেহারা।
সবাই যেন দম বন্ধকর এক রোমাঞ্চক দৃশ্য দেখতে ব্যস্ত।যেই কানাডিয়ান মেয়েরা এতো বছর ধরে সাহিত্যের উপর নজর দিয়ে রেখেছিল তারা যেন হতাশায় চোখ-মুখ উল্টিয়ে রেখেছে।কিন্তু আশেপাশের পরিবেশের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে কল্পনার দিকে নজর রেখেই তার ডান পায়ের গোড়ালির কাছে হাত রাখলো সাহিত্য।পুরুষালী হাতের টানে যেন হালকা এগিয়ে গেল কল্পনার পা-টা।সাথে সাহিত্যের খরখরে হাতের ছোঁয়ায় অন্তর-আত্মা কেপে উঠল কল্পনার।শরীরটা যেন তার ঝিমঝিমিয়ে উঠল।
সাহিত্যের ভারী নজর থেকে তো সেই কতক্ষণেই চোখ সড়িয়ে নিয়েছে কল্পনা।অন্তর-আত্মা কেপে উঠার ফলে ভারী শ্বাস ফেলতে শুরু করেছে সে ইতোমধ্যে।সাহিত্যের হাতের বাধন থেকে যেন ছুটে পালাতে চাইছে।সেই ইচ্ছাতেই ডান পা-খানা মোচড়া-মোচড়ি শুরু করল সে।সাহিত্য সেই নড়তে থাকা পা আরো একটু শক্ত করে ধরলে কল্পনা যেন আরো একটু হাসফাস করতে লাগলো।কিন্তু তারপরও যেন মিনমিনিয়ে বলে উঠল,
"সাহিত্য ভাই....সবাই দেখছে"
মৃদু আওয়াজ ভেসে এলো সাহিত্যের থেকে,
"দেখুক"
সাহিত্যের সেই কন্ঠে আবারো কেপে উঠল রমণী।কিছুতেই যেন সাহিত্যের হাতের বাধন থেকে ছাড়া পাইছে না।কিন্তু সাহিত্যের সেই হাতের বাধনের ফলে হৃদয়ে যেন এক অদ্ভুত অনুভূতির সূচনা ঘটছে কল্পনার।সেই অনুভূতিরা যেন প্রশ্রয় না পায় তাই তো নিজেকে ছাড়ানোর আরেক দফা চেষ্টা চালালো সে,
"পায়ে মেহেদী দেওয়ার দরকার নেই তো"
প্রেয়সীর ধবধবে ফর্সা পায়ের আঙুলের উপরের দিকের কালো তিলটা দেখেই যেন ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি ফুটল সাহিত্যের।সেদিকে নজর রেখেই বাম হাতের বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে সেই তিল আলতো করে ছুঁয়ে দিল সে।অতঃপর মাথা না উঠিয়েই মুখের হাসি লুকিয়ে কল্পনার উদ্দেশ্যে দাঁত চিবিয়ে শুধালো,
"শাট আপ...অর আই উইল কিল ইউ"
আবারো আতকে উঠল কল্পনা।তবে এবার বুঝলো যে আর কিছু বলা যাবে না।নাহলে সাহিত্য ভাই আবার বলে উঠবে 'কল্পনা....অঘটন কিছু ঘটলে ভ্যা-ভ্যা করে কাঁদিস না,প্লিজ'।তাই তো কিছু না বলে এবার চুপ থাকলো সে।
সাহিত্য এদিকে তার প্রেয়সীর ডান পা-খানা কোলের মধ্যে তুলে নিয়েছে।মাথা ঝুকিয়ে দক্ষ হাতে সূচনা করল প্রেয়সীর পায়ের কারুকাজ।আর সেই সূচনা স্থল ছিল পায়ের চতুর্থ আঙুলের হাফ ইঞ্চি উপরে থাকা সেই কালো তিলটা।সাহিত্য তো এর আগে কখনোই তার ললনার এই তিলটা লক্ষ করেনি।কিন্তু আজ প্রথমবার চোখে পড়ায় যেন প্রথমবারেই একদম কাবু হয়ে গিয়েছে ছেলেটা।খুব করে সেথায় অধর জোড়া ছুঁয়ে দিতে মন চাইছে।কিন্তু আশেপাশের ভীড়ের নজর উপেক্ষা করে সেটা করা যে সম্ভব নয়।যার দরুন ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি ঝুলিয়ে প্রেয়সীর পায়ে মেহেদী লাগাতেই ব্যস্ত রাখলো নিজেকে।
কল্পনা এই যে মাথা হেট করেছে,উঠার যেন নাম-ই নেই।তারপরও আড় চোখে আশেপাশে নজর ফেলল মেয়েটা।অনেকেই ফোন বের করে ভিডিও করতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে।তাদের চোখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে যে,সাহিত্য যে কোনো মেয়েকে ছুঁতে রাজি হয়েছে সেটা বড় আশ্চর্যের বিষয়!
সাহিত্যের হাতের উষ্ণতা ভালো করে অনুভব করতে পারছে কল্পনা।সাহিত্য নিজের সুবিধা অনুযায়ী লম্বা আঙুলগুলো বিচরণ করে যাচ্ছে পা-টাতে।কিন্তু সেই পুরুষালী হাতের উষ্ণ ছোঁয়ায় যেন আরো অকেজ হয়ে আসছে সাহিত্যের প্রেয়সী।কল্পনার পক্ষে আর সম্ভব হলো না।লজ্জায় মেয়েটা লাল হয়ে উঠার অবস্থায়।কাঙ্খিত ব্যক্তির কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত সময় কাঙ্খিত জিনিস পাইছে সে।হয়তো সে কারণেই ভারী লজ্জা ভার করে বসেছে তার উপর।
আশেপাশে থাকা মানুষের চোখ থেকে নিজের লজ্জা ঢাকতেই যেন এবার এক কান্ড করে বসলো কল্পনা।পড়নের মেরুন রঙা অর্গাঞ্জা ওড়না দিয়ে নিজের মাথা-মুখ ঠিক মোমির মতোই পেচিয়ে নিল।সেটা দেখে সাহিত্যসহ রুমের বাকি সবাই নিঃশব্দে হাসল।তবে সাহিত্য আরো একবার তার প্রেয়সীর দিকে নজর ফেলে আবারো নিমজ্জিত হলো প্রেয়সীর পায়ে মেহেদী ছোঁয়াতে।
#চলবে