#পর্ব_৬৩
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
রাত প্রায় এগারোটা বাজতে চলল।তবে কাল বিয়ের আয়োজন সামলাতে যেন এখনো সবাই ব্যস্ত।রিসোর্টের মেইন বিল্ডিংয়ের দিকটা মানুষের কোলাহলে ভর্তি থাকলেও খানিক দূরে কর্টেজের এপাশটা যেন শান্ত হয়ে আছে।কিছুক্ষণ আগে যে-ও বা মেহেদী দেওয়ার হৈ-হুল্লোড় উঠেছিল সেটাও আর নেই।সবাই মেহেদী দেওয়ার পর্ব চুকিয়ে হাটা ধরেছে নিজ নিদ্রা স্থলে।
তবে যাওয়ার আগে প্রায় সবার ফোনেই এক নির্দিষ্ট ছবি যেন ধারণ করে নিয়েছে তারা।আর সেটি হলো সাহিত্যের হাত দিয়ে তৈরি কল্পনার পায়ের সেই মেহেদীর কারুকাজ।বেশি হাবিজাবি একদমই না সেই কারুকাজ।ফর্সা পা দুটোতে যেন সাধারণের মাঝেই অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে মেহেদীদের।বুঝাই যাচ্ছে সাহিত্য তার প্রেয়সীর পায়ে নিজের আর্টিস্ট হওয়ার প্রতিভার মাধুরি খাটিয়েছে।আর সেটা যেন হৃদয়ের গহীন থেকে ভালোবেসে।কল্পনার পা জোড়া দেখে গুটিকয়েক প্রকাশ্যে বললেও প্রতেকেই যেন মনের মধ্যে বলে উঠেছে, 'ইস!আমার পায়েও যদি কেউ অমন সুন্দর করে মেহেদী দিয়ে দিত'
পাশের রুমে থাকা প্রীতি যখন জানতে পারে যে সাহিত্য কল্পনার পায়ে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছিল তখন যেন ভারী আপসোস করে সে,যে কেন সে এই রুমে ছিল না।কিন্তু থাকতোই বা কেমন করে?সেই রুমে যে বসার কোনো জায়গাই ফাকা ছিল না।যখন কল্পনার খোজে এই রুমে আসে তখন বারান্দায় ঘুমন্ত অবস্থায় পায় তাকে।আর এখন মেহেদীর অনুষ্ঠান হওয়া কর্টেজে বর্তমানে শুধু কল্পনা আর প্রীতি উপস্থিত।কারণটা অবশ্যই কল্পনার পায়ের মেহেদী।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার একদম শেষ মুহুর্তেই যে সাহিত্য তার হাতের কাজ শেষ করে পালিয়েছে।তাই তো এখনো কাঁচা রয়েছে পায়ের সেই মেহেদীখানা।কল্পনার কর্টেজ এখান থেকে পায়ে হেটে দু মিনিট।কিন্তু কল্পনা যেন ইচ্ছা করেই যায়নি।কাঁচা মেহেদী পায়ে নিয়ে হাটলে ডিজাইন নষ্ট হয়ে যাবে সেই ভয়েই যেন।এতো সুন্দর মেহেদী কারই বা নষ্ট করতে মন চাইবে?
তবে ক্ষণিক আগে হালকা শুকোতে শুরু করলে কল্পনা রুম থেকে বেড়িয়ে সামনের বারান্দায় এসে এক সোফায় বসে।আর পা দুটো তুলে রাখে এক ছোট টুলের উপর।আজ শীত একটু কম হওয়ায় রুমের সামনে ছাদ যুক্ত বারান্দায় বসে আকাশের তারা দেখতে যেন ভারী মজা পাইছিল কল্পনা।তবে বেশিক্ষণ আর নিজের চোখের পাতা খোলা রাখতে পারেনি সে।রাত গভীর হওয়ায় নিদ্রা ভার করেছে চোখ দুটোতে।
কর্টেজে কেউ না থাকলেও প্রীতি তার ঘুমন্ত বান্ধুবীর কাছে উপস্থিত ছিল।তবে ক্ষণিক আগেই তো অন্তর আগমনে আর থাকতে পারলো না।অন্তর সাথে একটু কথা বলার লোভেই যেন কল্পনার চোখের আড়ালে তার সাথে হাটা ধরে প্রীতি।কিন্তু সাহিত্যের জন্য যেন এক সুবিধা করে দিয়ে গেল।কল্পনার ফোন থেকে সাহিত্যকে কল করে শুধালো,
"ভাইয়া আমি প্রীতি বলছি।কল্পনা এখানেই ঘুমিয়ে গিয়েছে তো,আপনি কি একটু ওকে ওর রুমে দিয়ে আসবেন?"
এমন সময় অন্ত পেছন থেকে বলে উঠে,
"প্রীতি হয়েছে?চলো তাড়াতাড়ি"
প্রীতি অন্তর দিকে ঘুরে চোখ রাঙালো বেশ।প্রীতির কানে ফোন দেখে জিহ্বায় কামোড় বসালো অন্ত।প্রীতি যে এখনো সাহিত্যের সাথে কথা বলছে সেটা অন্তর নজরে আসেনি।
তবে সাহিত্য অন্তর গলা শুনে সবটা বুঝলো।তার শান্ত ভাইটা যে কাল থেকেই কেউ একজনের সাথে লুকিয়ে কথা চালাচ্ছে সেটা সাহিত্যের নজর এড়ায়নি।সাহিত্য নিঃশব্দে হেসে প্রীতির উদ্দেশ্যে বলল,
"ঠিকাছে,সমস্যা নেই।আমি কল্পনাকে নিয়ে যাব.......আর....অন্তকে বলিও কাল সকাল ৮টায় যেন হলে থাকে।অনেক কাজ আছে তো।ও থাকলে একটু সুবিধা হতো"
সাহিত্যের শেষের কথায় চোখ-মুখ খিচে নিল প্রীতি।অতঃপর হালকা মাথা দুলিয়ে মিনমিনিয়ে বলল,
"ঠিকাছে ভাইয়া"
কল্পনার কোলের উপর তার ফোনটা রেখে অন্তর দিকে তেড়ে এলো প্রীতি।প্রীতির উদ্দেশ্য ভালো করেই জানা আছে অন্তর।ছেলেটা কাচুমাচু হয়ে গেল।সেই চেহারায় যেন প্রীতি গললো না,
"একটু চুপ থাকতে বলেছিলাম।সেটাও পারেননি"
হালকা আওয়াজ এলো অন্তর থেকে,
"আমি কি জানতাম যে তুমি তখনো ভাইয়ার সাথে কথা বলছো?"
প্রীতি মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে হালকা হাত-পা নড়ালো।অতঃপর সামনে এগুতে নিল সে।কিন্তু অন্তর উদ্দেশ্য যেন অন্য কিছুই।ছেলেটা সব কাজ ফেলে এদিকে এসে পড়ে আছে একটা কারণেই।আর সেটা সম্পন্ন করতেই পেছন থেকে প্রীতির হাত টেনে ধরল,
"দেখি তোমার মেহেদী কেমন হয়েছে?"
প্রীতি এখনো ঠান্ডা হয়নি।সরু চোখে পেছনে ঘুরে বলে উঠল সে,
"আজ সকাল থেকে কিন্তু ভালোই হাত ধরছেন আপনি।এমন মেয়েদের হাত ধরা কি কোনো শান্ত-ভদ্র ছেলের কাজ?"
ছাড়লো না অন্ত প্রীতির হাতখানা।ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম হাসি নিয়ে প্রীতির হাতটা আরো শক্ত করে ধরল।অতঃপর প্রীতির দিকে এগুতে নিয়ে বলল,
"কোনো সাধারণ মেয়ের হাত ধরেছি নাকি?তাবাসসুম প্রীতির হাত ধরেছি।যেই মেয়ের কারণেই এই ছেলে আর শান্ত-ভদ্র নেই"
এবার প্রীতিও ঠোঁট বাকালো,
"আচ্ছা?"
অন্ত হালকা ভড়কে উঠেই পেছনে কল্পনার দিকে নজর দিল।অতঃপর প্রীতির হাত ধরেই সামনে এগুতে নিয়ে বলল সে,
"এখন আচ্ছা-বাচ্ছা ছাড়ো।কল্পনা দেখে ফেললে বারোটা বেজে যাবে"
হাসলো প্রীতি,
"দেখুক না একটু আমার বান্ধুবীটা,যে তার ভদ্র ভাইটা কেমন করে তার বেস্টফ্রেন্ডের হাত ধরে টানছে"
অন্ত কিছু না বলে পেছনের শ্যামবতীকে দেখে হালকা হাসলো শুধু।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
প্রীতি সাহিত্যকে কল করেছিল ১১:৪৫ এ।আর এখন সময় ১১:৫৯।হাতে চাপানো এনালগ ঘড়িতে সময়টা দেখে পায়ের গতি আরো বাড়িয়ে নিল সাহিত্য।তবে কর্টেজের সামনে গিয়ে ঘুমে বিভোর তার জানপাখিকে দেখে হাসতে নিয়েই আবার পায়ের গতি কমিয়ে নিল।
সাহিত্যের মতে তার জানপাখিটাকে স্লিপিং বিউটি নাম দেওয়া উচিৎ ছিল।এতো বিভোরে ঘুমাতে পারে মেয়েটা!
সাহিত্য তার পায়ের গতি একদম থামিয়ে দিল কল্পনার সামনে দাড়ানোর পর।দুই হাত পেছনে বেধে মন ভরে দেখতে লাগলো তার জানপাখিটাকে।হাতে-পায়ে ভারী মেহেদী থাকার দরুন বউ-বউ তো লাগছে বটে।হালকা শব্দ করে হেসে চিন্তা করে বসলো সাহিত্য।কাল কাজি সাহেবকে দুটো বিয়ের কথা বলবে নাকি সে?
হাত থেকে পায়ের দিকে নজর ফেলেই সাহিত্য কল্পনার সামনে হাটু গেড়ে বসল।নিজের হাত দিয়ে রাঙানো প্রেয়সীর পা জোড়া দেখতে লাগলো।তবে বেশি নজর কাড়ছে ডান পায়ের তিলটা।সাহিত্য সেই তিলখানা একদম মেহেদী দিয়ে ঢেকে দেয়নি।বরং সেই তিলের আশেপাশের মেহেদী এমন করে দিয়ে দিয়েছে যে কালো তিলখানা যেন ফুটে উঠেছে আরো।
ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়েই শুকনো মেহেদীর উপর হাতের বৃদ্ধা আঙুল চালালো সাহিত্য।ছুঁয়ে দিল সেই তিলখানা।তাতে সেই তিলের আশেপাশের শুকনো মেহেদী যেন ঝড়ঝড়িয়ে পড়ে গেল।সেটাতে কিছু যায় আসে না সাহিত্যের।প্রেয়সীর মেহেদী রাঙা পদযুগল দেখে যেন ভারী লোভ লাগছে তার।নেশায় ডুবে থাকা আধো বন্ধ চোখ জোড়া যেন কিছুতেই সেই স্থান থেকে সড়তে চাইছে না।আরো কাছে টানছে সাহিত্যকে।সাহিত্য বাধা দিল না সেই টানকে।এগিয়ে গেল।মেহেদী লাগানোর আগে মনের মধ্যে যে ইচ্ছা জেগেছিল সেটা যেন আর দাবিয়ে রাখতে পাড়ল না।কল্পনার ডান পা-টা টুল থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে উঁচু করে ধরল।অতঃপর শুষ্ক অধর জোড়া আলতো করে ছুঁয়ে দিল কল্পনার পায়ের তিলটায়।শুধু প্রেয়সীর অবচেতন অবস্থাতেই যেন সাহিত্য তার মন গহীনের কথা বলতে সক্ষম হয়।এখনো সেটাই হলো।প্রেয়সীর পায়ে অধর ছুঁয়ে রাখা অবস্থাতেই হাস্কি কন্ঠে এক ধ্বনি বেড়িয়ে এলো সাহিত্যের কন্ঠনালি থেকে,
"তোর আসক্তে যে এই সাহিত্য আর কত ধ্বংস হবে এই দুনিয়াও সঠিক জানে না"
প্রতিবারের ন্যায় এবারো সাহিত্যের প্রেয়সী সাহিত্যের হৃদয়ের অতল গভীরে থাকা অনুভূতিদের চাপা আর্তনাদ শুনলো না।
সাহিত্য হয়তো গত রাতের মতো আজও বেসামাল হয়ে উঠতে এগিয়েছিল।তবে আজ নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলো সে।উঠে দাঁড়িয়ে প্রেয়সীর থেকে দূরত্ব তৈরি করে নিজের ভারী শ্বাস সংযত করল।অতঃপর হালকা হুংকারই দিয়ে উঠল বটে,
"কল্পনা!!!"
এমন হুংকার কল্পনা আশা করেনি।সে তো এতক্ষণ স্বপ্নের মধ্যেও আকাশের তারা গুনছিল।সাহিত্যের হুংকারে ঘুমন্ত মেয়েটা সটান উঠে বসলো।চোখ বড়-বড় করে দেখতে লাগলো সাহিত্যের দিকে।সাথে ভয়ার্থ কন্ঠে বলেও উঠল,
"কি হয়েছে?"
সাহিত্য বেশ কষ্ট পেল তার প্রেয়সীর এমন অবস্থা দেখে।কিন্তু সাহিত্যের প্রেয়সী তার কাছ থেকে গভীর ছোঁয়া পেয়ে কেঁদে ফেলার থেকে আপাতত যেন এটাই ঢেড় ভালো।
কল্পনার প্রশ্নের পর মুহুর্তেই প্রতিক্রিয়া করল সাহিত্য,
"এখানে এমন ঘুমাচ্ছিস কেন?"
বুকে হাত রেখে কলিজার ধুকপুকানি সংযত করে নিজের পা পরখ করতে নিয়েই কপালে ভাজ ফেলে বলল কল্পনা,
"পায়ে যে মেহেদী দিয়ে দিয়েছেন,সেটা শুকোতে হবে না?মেহেদীর ডিজাইন খারাপ হয়ে গেলে তো তখন আমাকেই ঝাড়ি দিবেন"
শেষের কথাটা সাহিত্যের দিকে দেখেই শুধালো সে।এই কম সময়ের মধ্যে সাহিত্য তার চাহনি কঠিন করে ফেলেছে।সেটা কেন,তার উত্তর সাহিত্যের পরবর্তী কথার মধ্যেই পেল কল্পনা।
"বিকেল থেকে আমার সামনে আসিসনি কেন?"
কল্পনার যেন এটারই ভয় ছিল।কিন্তু সাহিত্যকে সেটা বুঝতে দিল না।নজর আবার পায়ের দিকে ঘুরিয়ে হাত দিয়ে শুকনো মেহেদী ডলতে লাগলো সে।শান্ত স্বরে শুধালো,
"এটা আবার কেমন কথা?সামনে যাইনি মানে?বিয়ে বাড়িতে আবার অমন করে দেখা হয় নাকি?আপনিও ব্যস্ত ছিলেন আমিও একটু ব্যস্ত ছিলাম।তাই তো দেখা হয়নি"
সাহিত্য এবার কল্পনার সজাগ অবস্থায় তার সামনে হাটু গেড়ে বসতে সংকোচ বোধ করল না।তবে সাহিত্যের এমন হঠাৎ মেঝেতে হাটু গেড়ে বসায় কল্পনা বেশ ভড়কালো।কিছু বলতে যাবে তার আগেই কোমল স্বরে বলতে লাগলো সাহিত্য,
"কানাডায় যাওয়ার পর আমি কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে অব্দি দেখিনি।পড়াশুনা আর কোম্পানি নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম এই ১১বছর।আর সেখানে হঠাৎ করে আমার জানপাখিটাই যদি বলে আমি বদলে গিয়েছি তাহলে কেমন লাগবে আমার বল?"
কল্পনা যেন কাবু হয়ে গেল সাহিত্যের এতো কোমল কন্ঠে।বুকের মাঝটা হঠাৎই ধকধক করতে শুরু করেছে সামনের এই মাটিয়া-সবুজাভাব চোখ জোড়ায় নজর রাখতে গিয়ে।ভারী শ্বাস তো সাহিত্যের সাথে এবার সে-ও ফেলতে শুরু করল।তবে নিজের মনের অবস্থা সামনের পুরুষকে একদমই বুঝতে দিল না এই নব যুবতী।মাথা নামিয়ে নিল।নিজের মনের অনুভূতি উপেক্ষা করে ভাবতে লাগলো বিকেলের কথা।মেয়েটা যেন বেশ অনুতপ্ত বোধ করছে সে বিষয়ে।মিনমিনিয়ে বলল সে,
"সরি।আমি অমন কিছু বলতে চাইনি।কিন্তু তখন সিচুয়েশনটাই এমন হয়ে গিয়েছিল যে আমিও বুঝতে পারিনি"
"তোকে যেন আমি আর অয়নের সাথে কথা বলতে না দেখি।তাহলে কিন্তু ওর সব হাড্ডি ভেঙে হসপিটালে পাঠাবো এবার"
সাহিত্যের দাঁত চিবিয়ে বলা কথায় তড়িৎ বেগে মাথা তুলল কল্পনা।ব্যতিব্যস্ত শুনালো তার কন্ঠ,
"আরে না না!অয়ন ভাইয়াকে কেন দোষ দিচ্ছেন?বেচারা তো শুধু একটু মজা করেছিল।ভাইয়া আমাকে তেমন কিছুই বলেনি।পরে লিসা আপুর সাথে কথা বলে একটু মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গিয়েছিল।আপনার রাগ মুলত আমার কারণেই উঠেছে।কি বলবেন আমাকে বলেন"
শেষের দিকে নিজের ব্যাপারের বাক্যগুলো যেন মিনমিনিয়ে বলল কল্পনা।হয়তো সাহিত্যের ঝাড়ি খাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে নিল সে।কিন্তু সাহিত্য যেন হালকা হেসে অবাক করল কল্পনাকে।হাসতে নিয়েই বলল সাহিত্য,
"তোর কেন মনে হলো তোকে আমি কিছু বলব?"
মাথা নিচু করে আবার মিনমিনিয়ে উঠল কল্পনা,
"না....মানে..."
"আমার জানপাখিকে আমি কখনো বকা দিয়েছি?"
মাথা নিচু রেখেই ডানে-বামে জোরে মাথা ঝাকালো কল্পনা।সেটাতে আবার হালকা হাসলো সাহিত্য।কল্পনার ঝুকে রাখা মুখের সামনে নিজের মুখখানা নিয়ে গেল সে।অতঃপর প্রেয়সীর তুলতুলে কপোল যুক্ত আদলে কোমল নজর রেখে বলতে লাগলো,
"তুই শুধু আমার আদর আর ভালোবাসাটাই পাবি।আমার বকা দেওয়াটা মনে হয় একটু কম জুটবে তোর ভাগ্যে"
কল্পনার হৃদয়টা যেন শীতল হয়ে উঠল কিছু মুহুর্তের জন্য।প্রথমবারের মতো সাহিত্যের বলা কথা গভীরভাবেই নিল সে।যদিও বা তার জানা আছে সেটা করা একদম ঠিক হচ্ছে না।কিন্তু কেন জানি এই মুহুর্তে নিজের হৃদয়ের অনুভূতিদের আর উপেক্ষা করতে মন চাইলো না কল্পনার।মুচকি হেসে উঠল মেয়েটা।সেই হাসির নেশা যেন সইতে পারলো না সাহিত্য।গতকালের অঘটন যেন আবার না হয় তাই তো সটান দাঁড়িয়ে পড়ল।
"অনেক রাত হয়েছে,গিয়ে ঘুমিয়ে পড়"
কথা শেষে যাওয়ার জন্যই সাহিত্য পা বাড়িয়েছিল।সেটাতে কল্পনা ভড়কালো বেশ।সাহিত্যের পেছন থেকেই বলে উঠল,
"মেহেদী দিয়ে দেওয়ার জন্য থ্যাংক ইউ।আমার অনেক পছন্দ হয়েছে"
থামলো সাহিত্য।পেছনে ঘুরে আবেদনময়ী প্রেয়সীর নেশায় আর ডুবতে চাইলো না।তাই তো মাথা না ঘুরিয়েই মৃদু হেসে বলল,
"ওয়েলকাম জানপাখি"
হালকা বার্তা বলেই সাহিত্য তার জানপাখির থেকে দূরে চলে গেল।আশেপাশের হালকা কুয়াশায় সাহিত্যের দিকেই নজর স্থির রাখলো কল্পনা।মেয়েটার মুখে এখনো মৃদু হাসি ঝুলছে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
বিয়ের অনুষ্ঠানে সবাই যেমনটা প্রয়োজনীয় কাজের ব্যস্ততায় নিমজ্জিত থাকে ঠিক তেমনটাই কেউ-কেউ অপ্রয়োজনীয় কাজেও ব্যস্ত থাকে।অবশ্য বিয়ে বাড়িতে সেটা অতটাও অপ্রয়োজনীয় নয় বটে।আর সেই মহান ছোটখাটো প্রয়োজনীয় কাজটি বর্তমানে সামিয়া এবং তার কিছু নতুন বান্ধুবীদের দ্বারায় সম্পন্ন হচ্ছে।
ভিকির জুতা চুরির বিষয়ে সামিয়া একটু বেশিই দৃঢ় মনোভাব নিয়ে রেখেছে।আর সেই দৃঢ় মনোভাব নিয়ে কিছুক্ষণ আগেই তো ভিকির জুতো জোড়া গায়েব করল সে।
কাজি সাহেব কিছুক্ষণ আগেই বর-কণের বিয়ে সম্পন্ন করেছেন।তবে এশার কবুল বলার পরপরই সামিয়া রুমের বাইরে দৌড় লাগায়।তার তো বসে থাকলে চলবে না।যেই জুতো জোড়া চুরি করেছে সেগুলোতো আবার নজরে-নজরে রাখতে হবে।নাহলে এই ভিদ কখন যে সেগুলো নিয়ে নেয় কে জানে?
জুতা চুরি করার পর আপাতত মেইন বিল্ডিংয়ের রিসিপশনের এক কোণায় রেখেছিল সেগুলো।সামিয়া ভেবেছিল বিয়ে পড়ানো হয়ে গেলেই সেগুলো কর্টেজে নিয়ে যাবে।কিন্তু রিসিপশনে এসে যেন মাথায় হাত ঠেকালো সে।জুতা নেই!
জুতার খোঁজে এপাশ-ওপাশ নজরই ফেলছিল সামিয়া।এমন সময় পেছন থেকে ভিদের পুরুষালী কন্ঠ কানে বাজলো,
"এই যে জুতা চোর ম্যাডাম,এগুলো খুজছেন কি?"
সামিয়া চকিত হয়ে পেছনে ঘুরতেই ভিদ ও তার বন্ধুদের দেখতে পেল।চেয়ারে বসে থাকা ফর্সা ত্বকের ভিদের শরীরে একখানা কালো পাঞ্জাবি চড়ানো।আর সাদা পায়জামা পরিহিত হাটুর উপরে ঠেকিয়ে রাখা দুই হাতের মধ্যে এক হাতে নিজের ভাইয়ের শালির দ্বারা চুরি করা জুতা জোড়া ঝুলছে।সামিয়া তাকে সরু চোখে দেখতেই উঠে দাড়ালো সে।তবে এগিয়ে এলো না।সেখানে দাঁড়িয়েই শুধালো,
"কিই?জুতা চুরি করার শখ মিটেছে?"
ভিদের পেছনের ছেলেরা হালকা হাসলেও সামিয়ার পেছনের মেয়েরা সামিয়ার কানে ফুসফাস করতে শুরু করেছে।তবে ক্ষণিক বাদে সামিয়া তাদের থামিয়ে দিয়ে পড়নের আসমানী লেহেঙ্গা উঁচিয়ে ভিদের দিকে এগিয়ে এলো।
ভিদ তো তার ভ্রু কুচকিয়েছে যখন থেকে পেছনের মেয়েরা সামিয়ার কানে ফুসফাস করছিল।সামিয়া একদম তার সামনে এসে দাড়ানোর পরেও যেন সেই কুচকানো ভ্রু সমান হলো না।কারণ সামিয়ার চেহারায় না রাগ দেখা যাচ্ছে আর না হাসির চিহ্ন।তবে এবার ভিদের ভ্রু জোড়া সমান হতে যেন বাধ্য হলো।
সামিয়া দুই হাত পেছনে বেধে হালকা দুলতে নিয়েই আদুরে কন্ঠে বলল,
"ভিইইদ,দাও না জুতাগুলো"
ভিদ হালকা ঠোঁট বাকিয়ে ভ্রু উঁচু করল,
"ও,তো আমাকে ব্লাকমেল করার বুদ্ধি করছো?চালিয়ে যাও।এই ভিদ চৌধুরী এতো সহজে গলবে না"
সামিয়া ঠোঁটের হাসি সুক্ষ্ম বড় করে আরো একটু ভিদের দিকে এগিয়ে এলো।সামিয়ার গোল-গোল চোখ জোড়া দেখে যেন এবার বেশ ভড়কালো ভিদ।এদিক-ওদিক নজর দিল।সেটারই সুযোগ নিল সামিয়া।নিজের ডান হাতের তালু ঠেকিয়ে দিল ভিদের শক্ত সিনার বাম দিকটায়।হঠাৎ এমন আক্রমণে ভিদ এলোমেলো নজর ফেলতে নিয়েই অস্ফুটস্বরে কাপা গলায় 'আহ' বলে উঠল।সেটাতে পিছনের এক ছেলে ভিদের কাধ চেপে ধরল,
"ভিদ গলিস না।তোরে ফাদে ফেলছে"
পেছনের সেই ছেলের এমন কথা বলার কারণ আছে।কাল রাতেই ভিদ তার বন্ধুদের সামনে সামিয়াকে কিউট বলেছে।আর এই মুহুর্তে সেটার ফল ভালো ঠেকবে না।
পেছনের বন্ধুর কথায় ভিদ শক্ত থাকলো।চোখ-মুখ খিচে নিয়ে ক্ষণিক সময় পর আবার সামিয়ার দিকে নজর দিল।কিন্তু সেদিকে দেখা যেন একটু কষ্টই ঠেকছে ভিদের।সামিয়ার মাসুম চাহনি যেন ভিদের হাত-পা কাপতে বাধ্য করছে।
সামিয়া তার পরিকল্পনা আরো একটু উন্নত করল।ভিদের আরো একটু কাছে এসে সিনায় ঠেকানো হাতের তর্যনী আঙ্গুল দিয়ে সেই জায়গাটাতেই গোল-গোল ঘুরাতে লাগলো।আঙুলের দিকে নজর রেখেই মাসুম কন্ঠে বলে উঠল সামিয়া নামক ফাজিলটা,
"ভিদ শুনো না।আমি না কক্ষনো জুতা চুরি করিনি,জানো?এটা আমার ফার্স্ট টাইম।তোমারও তো ফার্স্ট টাইম,তাই না?"
সামিয়া শেষের কথাটা বলতে নিয়েই লাজুক হেসে মাথা উঁচিয়ে ভিদের দিকে দেখলো।ভিদ সামিয়ার শেষের কথার যেন দুটো অর্থ বুঝে বসলো।তবে বর্তমানে সেই কথার আসল উত্তর হিসেবে কাপাভাবে উপর-নিচ মাথা ঝাকালো।আর এদিকে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেরা যেন মাথায় হাত ঠেকিয়ে দিয়েছে।কেউ একজন তো অস্ফুটস্বরে বলেও উঠল,
"গিয়েছে এই ব্যাটা"
সামিয়া তার কথা চালিয়ে গেল,
"ভিইইদ,দাও না জুতা জোড়া।জুতার বদলে তুমি আমার থেকে যেটা চাইবে সেটাই দিব,আই প্রমিস!প্লিজ ভিদ,তুমি আমার একটা কথা রাখবে না?আমাদের আবার এই বিয়েতে শেষ দেখা নাকি?এখন থেকে তো প্রায় সময় দেখা হবে।বেয়াইন মানুষের সাথে কেউ এমন করে,বলো?"
ভিদ আসলেই সামিয়ার কথায় পুরো ফুস হয়ে গিয়েছে।ছেলেটার উপর হঠাৎ এমন আক্রমণে পাথর বনে গিয়েছে সে।শুধু অনুভবে আসছে নিজের সিনার উপরে সামিয়ার ঘুরানো আঙুলখানা।আঙুলের এক-একটা ঘুরানিতে যেন শরীরের শিরা-উপশিরারা থরথরিয়ে কেপে উঠছে ছেলেটার।জীবনে প্রথম এমন কিছুর অনুভূতি যেন জমিয়ে দিয়েছে তাকে।
সামিয়া এবার তার আরেক হাত দিয়ে ভিদের জুতা ধরে রাখা হাতের উপর রাখলো,
"তুমি আমাকে জুতা জোড়া দিয়ে দিলে তুমি যেটা চাইবে আমি কিন্তু সেটাই দিব তোমাকে,সত্যি!"
সামিয়ার মুখে আবারো একই কথা শুনে ভারী এক ঢোক গিলল ভিদ।বাধ্য ছেলের ন্যায় জুতাসুদ্দো হাতখানা উঁচিয়ে ধরল।সেটা দেখে ঘাড় কাত করে হেসে উঠল সামিয়া।ভিদের হাত থেকে জুতা জোড়া নিতে নিয়েই আবার মাসুম কন্ঠে বলল,
"থ্যাংক ইউ ভিদ"
কথা শেষে বড় এক হাসি দিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে বাকি মেয়েদের সাথে হাটা দিল সামিয়া।আর এদিকে ছেলেগুলো যেন চেপে ধরল ভিদকে,
"শালা কি করলি তুই!!"
ভিদ এখনো সামিয়ার দিকে দেখে আছে।কমোড় ছুই-ছুই সিল্কি চুলের মেয়েটার এক হাতে জুতা জোড়া থাকার পরেও দুই হাত দিয়ে লেহাঙ্গা সামলে সামনে এগুচ্ছে।সেদিক থেকে নজর না সড়িয়েই ভিদ কাপা কন্ঠে শুধালো,
"শুনলি না?বলল যে যেটা চাইবো সেটাই দিবে"
অমনি ভিদের কথার প্রতিক্রিয়া হিসেবে এক ছেলে তার মাথায় এক বারি বসালো,
"আব্বে গাধা!ও তোকে কিছুই দিবে না।সে শুধু জুতা নেওয়ার জন্যই সে কথা বলেছে"
ছেলেটার কথা শেষ হতেই সামিয়া পেছনে ঘুরে ভিদের উদ্দেশ্যে হাসি মুখে এক চোখ টিপে সামনে ঘুরলো।সেটাতে ভিদের যেন আরো বেহাত দশা হলো।শরীরের পুরো ভার পেছনের বন্ধুদের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিল সে,
"ভাই ধর আমাকে"
#চলবে
আগামী দুই পর্বে ভিকি আর এশার বিয়ে চলবে।অথচ কাহিনী চলবে অন্য দুই ব্যক্তির🙈