#পর্ব_৬৪
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
বর-কণের মুখ থেকে কবুল বের করতে দিনের ঘন্টা বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যায় এসে পৌঁছেছিল।তবে সেই কাজ শেষ করে সবার মাথার ভাড় যেন অনেকটাই নেমেছে এখন।যার দরুন সবাই হলরুমসহ বাইরের মাঠে ঘুরেফিরে হাটতে ব্যস্ত এই মুহুর্তে।তবে ভিকি আর এশা সেই ঘুরাঘুরির মধ্যে নেই।তাদের দুজনকে হলরুমের স্টেজের সোফায় বসিয়ে রাখা হয়েছে।টুকটাক মানুষজন আসছে আর তাদের সাথে ছবি তুলছে।অবশ্য চাইলেই তারা সেখান থেকে উঠতে পারতো।কিন্তু এশা তার ভারী লেহাঙার জন্য সেখানে বসে থাকতে বাধ্য।আর নতুন বিয়ে করা বউকে রেখে ভিকিও যেন আর উঠতে চাইছে না।
রিসোর্টের মাঠখানায় মৃদু গানের আওয়াজে যেন রাতের পরিবেশটা বেশ ভালোই ফুটে উঠেছে।আর সেই পরিবেশকে আরো মুখরিত করে রেখেছে বিয়ে বাড়ির অতিথিরা।কোনো অতিথিরই যেহেতু বাড়ি ফেরার তাড়া নেই সেহেতু রাতে দেরি করেই অনুষ্ঠিত শেষ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।সেই সুবাদে সবাই যেন গা ঝাড়া ভাব নিয়ে গল্প করতে ব্যস্ত।কারো হাতে কোমল পানিও,তো কারো হাত ফাঁকা।তবে এদিকে কেউ একজন তার পড়নের হালকা গোলাপি শাড়িখানা দুই হাত দিয়ে সামলাতে ব্যস্ত।
কল্পনা তার হাতের কাছের আঁচলের অংশটা আবার পরখ করে ঠিক করে নিল।লতিফা শেখ নিজ হাতে শাড়িখানা সুন্দর করে পড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন যে একদম খুলবে না।আর এখন পর্যন্ত খুলেওনি বটে।শাহ সিমেন্টের ন্যায় কল্পনার শরীরে জড়িয়ে আছে।কিন্তু কল্পনার যেন মনের ভয়টা বেশি।এই প্রথমবার সে মসলিন শাড়ি পড়েছে।হালকা গোলাপি শাড়িটা একটু পাতলা হলেও নব যুবতীর গায়ে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে সেটি।পুরো শাড়িতে সাদা-গোলাপি মিশ্রণে ছোট-ছোট পাতার ডিজাইন ইমব্রডারি করা থাকলেও আঁচলসহ পুরো শাড়ির জমিন সেই সাদা-গোলাপির মিশ্রণে তৈরি ইমব্রডারি করা বড়-বড় ফুল দিয়ে ভরাট।আর সেটার সাথে মিলিয়েই যেন কানে সিলভার রঙা ভারী ঝুমকা ও হাতে সিলভার আর গোলাপি কাশ্মীরি চুড়ি পড়েছে কল্পনা।প্রতিবারের ন্যায় আজও ঘন কালো কেশগুলো বাধন হারা।এমন বাধন হারা চুলেই যেন সুন্দর লাগে মেয়েটাকে।প্রতিবার বাধতে গিয়েও যেন আশেপাশের মানুষের পরামর্শ শুনেই আর বাধে না।তবে আজ চুলের মধ্যে আলাদা কোনো ফুল লাগানোর প্রয়োজন বোধ করেনি।চুলগুলো যেন আজ একাই তাদের উজ্জ্বলতা ছড়াতে ব্যস্ত।
গাঢ় রাণী গোলাপি লিপস্টিকে আবৃত অধর জোড়া একে-অপরের সাথে হালকা ঘষতে নিয়েই আশেপাশে নজর ফেলল কল্পনা।সবসময়ের মতো এবারও সে প্রীতিকেই খুঁজছে।কিছুক্ষণ আগেই তারা দুজন একসাথে ছিল।কিন্তু কল্পনার জোড়াজুড়িতেই আলাদা হয়েছে।কল্পনার শাড়ি ঠিক থাকার পরেও মনের শান্তির জন্য প্রীতির হাতে নিজের ব্যাগ-ফোন সব ধরিয়ে দিয়ে রেস্টরুমে দৌড় লাগায়।এসে আর এখন প্রীতিকে খুঁজে পাইছে না সে।কিছু মুহুর্ত হাটাহাটি করেও যেন লাভ হলো না।এতো মানুষের ভীড়ে যেন সম্ভবই হচ্ছে না প্রীতিকে খুঁজে পাওয়া।
কল্পনা যেমন প্রতিবার প্রীতিকে খুঁজতে ব্যস্ত থাকে তেমন সাহিত্যও প্রতিবার সেই মুহুর্তে তার প্রেয়সীকে দেখতে ব্যস্ত থাকে।যেমন এই মুহুর্তই তার প্রমাণ।মাঠের একদিকে অয়ন সাহিত্যের ফোন হাতে নিয়ে অফিসের কিছু মেইল চেক করলেও সাহিত্য ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি নিয়ে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা তার প্রেয়সীর দিকে মনযোগ দিয়ে রেখেছে।সাহিত্যের নজরে আসছে কল্পনার হাটু অব্দি সিল্কি কালো কেশগুলো।একগুচ্ছো চুলের সবগুলিই পিঠ বেয়ে নিচে নেমেছে।কল্পনা এপাশ-ওপাশ মৃদু মাথা ঘুরানোর ফলে হালকা ঝলমল করে উঠছে সেগুলো।
প্রেয়সীর শাড়ির দিকে দেখে মাথা নিচু করে এবার নিজের পাঞ্জাবি পরখ করল সাহিত্য।সিলভার সুতার হালকা কাজ যুক্ত ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিটা দেখে হাসল মেকি।অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার দিকে সাহিত্য নেভি ব্লু রঙের একখানা পাঞ্জাবি পড়েছিল।কিন্তু তার সাদা-গোলাপি প্রেয়সীকে দেখে চট জলদি সেটা বদলে সাদা পায়জামার উপরেই সাদা পাঞ্জাবিখানা পড়ে আসে।প্রেয়সীর সাথে মেলাতেই তো সে কাজ করা।ভিকি আর এশার সাথে যখন তারা ছবি তুলতে গিয়েছিল তখন তো এশা বলেও বসে,
'আরে!তোমাদের দুজনকে তো একদম নতুন বিয়ে করা কাপলের মতো লাগছে'
এশার সে কথায় সাহিত্য লুকিয়ে হালকা হেসে নিয়েছিল।সে যে কল্পনার সাথে পড়নের কাপড় মেলাতে সক্ষম হয়েছে সেই খুশিতেই যেন সেই হাসি।তবে কল্পনা ভারী লজ্জা পেয়েছিল সেই কথায়।সে সাহিত্য ভাইয়ের বউ,এ কথাটা যেন অবিশ্বাস্য।তবে এই দু'দিনে যেন এসব চিন্তা করতে নিলে কল্পনার মনটা কেমন প্রশান্তিতে ভরে উঠছে।মেয়েটা যেন একটু হলেও বুঝছে,যে তার সাহিত্য ভাইয়ের হৃদয়ে তার জন্য হয়তো একটু হলেও জায়গা তৈরি হয়েছে।সেটা তো কল্পনার হৃদয়েও তৈরি হয়েছে।আর সেটা কি এখনকার কথা?সাহিত্য যেমন রাগ-জেদের জন্য নিজের অনুভূতিদের দাবিয়ে রেখেছিল কল্পনাও ঠিক তেমন নিজের অনুভূতি এখন অব্দি দাবিয়ে রেখেছে।আর সেটা একমাত্র তার বাবা আর বড় বাবার কারণে।
সাহিত্য মাথা নিচু করে তো সেই তখন থেকেই নিজের পাঞ্জাবি দেখে হাসছিল।এবার যেন চিন্তা করে বসলো।কল্পনাকে কি এখন নিজের মনের কথাটা বলা যাবে?সাহিত্য যদি বলেও দেয়,কল্পনা কি বুঝবে সেটা?সেটা কল্পনা ভালো নজরে দেখবে নাকি খারাপ নজরে?মেয়েটা কি এখনো অবুঝ আছে?হয়তো হাতে-পায়ে বড় হয়েছে।কিন্তু মনের দিকটায়?নিজের মনটাকে কি কল্পনা বুঝতে শিখেছে এখন?যেমন সাহিত্য তার প্রেয়সীর মনের কথা খুব ভালো করেই জানে।সাহিত্য এটাও জানে যে কল্পনা তাকে সম্মানটা যেমন করে তেমন ভালোও বাসে।কিন্তু সেটা কল্পনা এখনো বুঝছে না কেন?নিজের অনুভূতিদের কেন দাবিয়ে রাখছে মেয়েটা?
মাথা নিচু রেখেই ধীর গতিতে ভারী শ্বাস ফেলল সাহিত্য।সাথে এক বড় সিদ্ধান্তও নিয়ে নিল।ভিকির বিয়ের এসব ঝামেলা শেষ হয়ে ঢাকা ফেরার পরপরই সাহিত্য কল্পনাকে সব বলে দিবে।কল্পনা নিজের মনের অনুভূতি দাবিয়ে রাখতে পারলেও সাহিত্যের পক্ষে আর সেটা সম্ভব হচ্ছে না।অমন লুকিয়ে-লুকিয়ে প্রেয়সীকে আর দেখতে চায় না সাহিত্য।প্রেয়সীকে 'ভালোবাসি' শব্দটা বলতে যেন একদম মরিয়া হয়ে উঠেছে সে।
কল্পনা হয়তো প্রথমে বাধা দিবে সাহিত্যকে।আর সেটা যে ফাহাদ শেখ এবং তোফায়েল শেখের কারণেই সেটাও জানা আছে সাহিত্যের।তবে সাহিত্য হাল ছাড়বে না।তার প্রেয়সী আর কত দিন তাকে দূরে ঠেলে দিবে?নিজের ঘৃণাকে পরিত্যাগ করে সাহিত্য যেমন হৃদয়ের অনুভূতিদের দিকে ঝুকে পড়েছে;সাহিত্যের প্রেয়সীও নিজের হৃদয়ের কথা উপেক্ষা করতে পারবে না বেশিদিন।হয়তো একটু সময় নিবে সাহিত্যের প্রেয়সী।আর সেটাতে সাহিত্য তাকে একদমই তাড়া দেবে না।যদি অপেক্ষার ফল তার প্রেয়সীর ভালোবাসা হয় তাহলে প্রেয়সীর প্রেমে পাগল হওয়া এই অধৈর্য পুরুষ জন্মজন্মান্তর পর্যন্ত ধৈর্য ধরে রাখতে রাজি।
কিন্তু প্রেয়সীকে জানানোর ক্ষেত্রে আর ধৈর্য কুলোচ্ছে না সাহিত্যের।নিজের জানপাখিটাকে প্রতিদিন রুটিন করে নিজের মনের কথা বলতে চায় সে।
সাহিত্য ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে ভারী ব্যস্ত।এর মাঝেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অয়ন সাহিত্যের কাধে হাত দিয়ে জোরে এক ঝাকুনি দিল।সাথে ব্যতিব্যস্ত শুনালো তার কন্ঠ,
"আবে ওই!!এতক্ষণ থেকে কল্পনাকে দেখছিস,তো তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তোর বাপকে দেখিসনি??"
অয়নের কথায় ভড়কে উঠে তড়িৎ গতিতে মাথা তুলল সাহিত্য।কল্পনার দিকে আবার নজর দিতেই চোখ কোটর ফাটিয়ে বেড়িয়ে আসতে লাগলো।কল্পনা আর তোফায়েল শেখ একদম কাছাকাছি।তবে তোফায়েল শেখের পেছন পাশটা কল্পনার দিকে হয়ে থাকার দরুন দুজনের কেউই এখনো একে-অপরকে দেখেনি।কিন্তু সে কাজ হতে আবার বেশি দেরি কোথায়?কয়েক মুহুর্তের মাঝেই সেটা ঘটা সম্ভব।শেখ ভিলায় তৈরি হওয়া সুনামির যেন পূর্বাভাস দেখছে সাহিত্য আর অয়ন।
হঠাৎই সাহিত্য আর অয়ন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল।এতদূর থেকে কল্পনাকে ডাক দিতেও পারছে না।সেটাতে আরো কল্পনাকে দেখা সুবিধা হয়ে যাবে তোফায়েল শেখের।এই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কি করা যায় সেটা ভাবতে নিয়েই অয়নের দিকে চোখ পড়ল সাহিত্যের।
আজ রাতের শীতটা ভারী হলেও অত্যাধিক মানুষের শরীরের গরমে যেন কারো শরীরেই সোয়াটার বা শাল চাপানো নেই।সবাই গ্রীষ্মকালের মতোই অনুষ্ঠান উপভোগ করছে।তবে সাহিত্যের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অয়ন শুভ্রা রঙা পাঞ্জাবির উপর কালো একখানা শাল জড়িয়ে রেখেছে।গতকাল সাহিত্যের হাতে ধোলাই খাওয়ার পর রাতে জ্বর এসেছিল বেচারার।তাই তো তার নাকি বেশ শীত করছে।
সাহিত্য অয়নের শালের দিকে ক্ষণিক সময় দেখে থেকে অয়নের মুখের দিকে নজর দিল,
"কল্পনাকে বাঁচানোর জন্য তোর শাল নিচ্ছি দেখে এটা মনে করিস না যে কল্পনার সাথে কথা বলার পারমিশন পেয়ে গিয়েছিস।আবারো কল্পনার কাছে গিয়ে উল্টা-পাল্টা কিছু বললে এবার মেইন পয়েন্ট ফাটিয়ে দিব"
হঠাৎ সাহিত্যের এমন কথায় অয়ন ভালোই ভ্রু কুচকালো,
"কিহ?এসব কেন বলছি..."
অয়ন তার কথাটা আর শেষ করতে পারলো না।তার আগেই সাহিত্য এক টানে তার শরীরের শাল ছিনিয়ে নিয়ে দৌড় লাগালো।অমন এক টানে বেশ কিছুটা ঘুরানি খেল অয়ন।পর মুহুর্তেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত চেপে ধরল।সাথে ভ্রু কুচকে নজর দিল সাহিত্যের দিকে।
কল্পনা অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে নিজের শাড়ির কুচিতে হাত দিয়েছে।প্রীতিকে খোঁজা আর সম্ভব না তার পক্ষে।কই গিয়েছে যাক।কল্পনা নাহয় একটু একাই ঘুরুক।শাড়ির কুচি নাড়তে নিয়েই সামনে থেকে অতি পরিচিত এক কন্ঠ শুনলো কল্পনা।মাথা নিচু রেখেই যেন থমকে গেল মেয়েটা।শুষ্ক ঢোক গিলে মাথা তুলতেই কলিজাটা ধক করে উঠল তার।
সামনের পুরুষের চওড়া পিঠখানা শুধু নজরে আসলেও তাকে চিনতে এক মুহুর্তও দেরি হলো না কল্পনার।সে যেন ভুলেই বসেছিল যে আজ বিয়ের অনুষ্ঠানে তোফায়েল শেখেরও থাকার কথা ছিল।আর সেটা ভুলে বসার কারণেই তো সতর্ক ছিল না সে।আর এখন এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে পড়ল।
তোফায়েল শেখ ফোনে কথা বলছিলেন।কথা শেষে কল কেটে নজর তার হাতের ফোনের দিকে রেখেই পেছনে ঘুরতে নিলেন তিনি।আর সেটা দেখে কল্পনার হৃদপিণ্ড ধকধক করে উঠায় এই মুহুর্তে সে কি করবে সেটা যেন মাথাতেই আসছে না।কেমন এলোমেলো নড়ছে মেয়েটা।মনের মধ্যে ভয় যেকে বসায় পা জোড়াও থমকে আছে।
কল্পনা চোখ-মুখ খিচে নিয়ে যখন একদমই ভেবে নিয়েছিল যে আজ আর রেহাই নেই,ঠিক তখনই সাহিত্য পেছন থেকে এসে হাতের শাল দিয়ে কল্পনাকে পুরোটা ঢেকে ধরে।আর সেই মুহুর্তেই তোফায়েল শেখও কল্পনার দিকে ঘুরেন।
ঘটনাটা এতো দ্রুত ঘটেছে যে উপস্থিত তিন ব্যক্তিই যেন থমকে থাকলো কিছুক্ষণ।শালের নিচে থাকা কল্পনা যেন বুঝে উঠল না যে কি হলো।সাহিত্য যে কল্পনাকে বলবে যে তার মাথায় শাল দেওয়া ব্যক্তি সাহিত্য,সেটারও যেন সুযোগ নেই।তাই তো বুদ্ধি খাটিয়ে এক কাজ করল সাহিত্য।
তোফায়েল শেখ ছেলেকে হঠাৎ এমন সামনে দেখতে পেয়ে ভড়কে উঠেই নজর স্থির রেখে আছেন।আর সেটার সুযোগ নিয়েই সাহিত্য মুখে বড় হাসি নিয়ে উঁচু গলায় বলে উঠল,
"আরে আব্বু,তুমি এখানে?"
কল্পনা যেন সাহিত্যের কন্ঠ চিনতে পারে সেজন্যই এতো উঁচু স্বরে কথাটা বলল সাহিত্য।সেই পরিকল্পনা বিফলে গেল না।কল্পনা এতক্ষণ বিভ্রান্তে থাকলেও এবার বুঝলো যে সাহিত্য তোফায়েল শেখের কাছ থেকে কল্পনাকে বাঁচানো উদ্দেশ্যেই দৌড়ে এসেছে।সেটা ভেবে শালের নিচে স্বস্থির শ্বাস ফেলল কল্পনা।
কিন্তু এদিকে সামনের দৃশ্য দেখে তোফায়েল শেখ ভ্রু কুচকে দাঁড়িয়ে আছেন।তোফায়েল শেখের জানা মতে তার এই ছেলেটা যেখানে মেয়েদের থেকে শত হাত দূরে-দূরে থাকে সেখানে সাহিত্য এক মেয়ের সাথে দাঁড়িয়ে।আবার তাকে এমন শাল দিয়ে ঢেকে ধরে রয়েছে কেন?মনের প্রশ্ন মুখে আনলেন তোফায়েল শেখ,
"সাহিত্য?কি করছো তুমি?"
হাসি মুখে সাদামাটা উত্তর সাহিত্যের,
"কিছু না তো।এমনি দাঁড়িয়ে আছি"
ছেলের কথায় হালকা মুখ বিকৃত করলেন তোফায়েল শেখ,
"সেটা তো আমিও দেখছি।কিন্তু এই ভদ্র মহিলা কে?"
নিজের কচি প্রেয়সীকে তোফায়েল শেখের মুখে মহিলা সম্বোধন করা শুনে হাসি পেল সাহিত্যের।কিন্তু তা গিলে মাথার মধ্যে তোফায়েল শেখের প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে লাগলো,
"আ...এটা...এশার মেকাপ আর্টিস্ট!"
প্রথমে একটু আমতা করে বললেও শেষের কথাটা দৃঢ়ভাবেই বলে উঠল সাহিত্য।কিন্তু সেটাতে তোফায়েল শেখের কুচকানো ভ্রু সরল হলো না,
"তো ওনাকে এমন ঢেকে ধরে আছো কেন?"
পিতার শক্ত নজর এড়িয়ে লুকিয়ে শুষ্ক ঢোক গিলল সাহিত্য।সাথে সামনে চলতে থাকা কুইজ প্রতিযোগিতার আরো একটি মারাত্মক প্রশ্নের আরো একটি সুন্দর উত্তর তৈরি করল সে,
"আসলে...উনি একজন মেকাপ আর্টিস্ট না?তাই মেকাপ ছাড়া উনি বাইরে বের হন না।কিন্তু আজকে ভুলে রুম থেকে মেকাপ ছাড়া বের হয়েছে।তাই ওনার চেহারা যেন কেউ না দেখে তাই শাল ঢাকা দিয়ে আছে"
মুখের হাসি বজায় রেখে সাহিত্য কথা শেষে ঘনঘন চোখের পল্লব ফেলতে নিয়েই তোফায়েল শেখের দিকে দেখে আছে।ছেলের এমন আজগবি কান্ডে ভ্রু জোড়া আরো বেশি কুচকালেন তোফায়েল শেখ।অতঃপর নিজের পরবর্তী প্রশ্ন ছুড়লেন,
"তো তুমি ওনার সাথে কি করো?"
পিতা-পুত্রের যেন হাড্ডাহাড্ডি কুইজ লড়াই চলছে।আর সেই কুইজ প্রতিযোগিতার বিষয় তাদের মাঝে নব বধুর ন্যায় ঘোমটা দিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে।এখন যদি কল্পনা এক ইঞ্চিও নড়েছে তাহলে আকাশ-পাতাল এক হয়ে যাবে।
সাহিত্য দক্ষতার সাথে মুখের চোরাভাব লুকিয়ে শুধালো,
"শাল মাথায় দিয়ে উনি আবার দেখতে পারবে কেমন করে?তাই আমি ওনাকে রুমে যেতে হেল্প করছি"
তোফায়েল শেখ দুই হাত বুকে ভাজ করলেন।তার ছেলে এতো সহজে কোনো মেয়ের পিছনে ঘুরার কথা না।নিশ্চয়ই কোনো ব্যাপার আছে।সে কথা ভাবতে নিয়েই বললেন তিনি,
"তুমিই কেন?"
এবার সাহিত্যের মেজার গরম হতে শুরু করেছে।এতো প্রশ্ন কেন করছে এই লোকটা!যদি সাহিত্য প্রেম করতে গিয়েও ধরা খেত,তারপরেও এভাবে কেউ জিম্মি করে??
প্রেয়সীর কথা চিনতা করে রাগটা একটু সংযত করল সাহিত্য।মুখে কৃত্রিম হাসি নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
"বিয়ে বাড়ির ব্যাপার বুঝো না আব্বু?সবাই ব্যস্ত।কার ঘাড়ে কোন দায়িত্ব পরে ঠিক আছে?আমাকে সামনে পেয়েছে তাই এনার দায়িত্ব আমাকে দিয়ে দিয়েছে"
সাহিত্য যেন এখনো সফল হয়নি তোফায়েল শেখের ভ্রু জোড়া সরল করতে।এবার আর কোনো প্রশ্ন করলেন না তোফায়েল শেখ।চোখে এক রাশ সন্দেহ নিয়ে ছেলের দিকে দেখে থাকলেন।এমন সময় কুইজ প্রতিযোগিতায় আগমন ঘটে কাঁচা খেলোয়ার অয়নের।সে দূর থেকেই সব কিছু দেখছিল।তবে যখন দেখলো যে পরিস্থিতি সাহিত্যের হাতের বাইরে যাওয়ার রাস্তায় তখনই দ্রুত পারে এগিয়ে আসে।
অয়ন একপ্রকার জোর পায়ে এসেই তোফায়েল শেখকে সালাম দিয়ে মিথ্যা তাড়া দিতে লাগলো,
"আঙ্কেল আপনি এখানে?খালু আপনাকে সেই কতক্ষণ থেকে খুঁজছে।তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে হচ্ছে আর আপনি তাকে একা ছেড়ে দিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন?খালু এসব একাই সামলাতে পারে?"
অয়ন এতক্ষণ থেকে ভান ধরে ছিল যেন সাহিত্যকে সে দেখেইনি।একজন দক্ষ অভিনেতার চূড়ায় উঠে সাহিত্যের দিকে হঠাৎ নজর পড়ায় কৃত্রিম ভড়কে উঠল সে,
"আরে সাহিত্য!তুই এখানে কি করিস?আর একি?তুই এশার মেকাপ আর্টিস্টকে এখনো রুমে নিয়ে যাসনি?ভিকি এখনে কল করে বলল এশা নাকি তাকে খুঁজছে।তোকে একটা কাজ দিয়েছে আর তুই সেটাও ঠিক মতো করতে পারছিস না?"
সাহিত্য যেন বুঝলো অয়নের পরিকল্পনা।অয়নের সাথে তাল মিলালো সে।মাথা ঝাকিয়ে বলল,
"আরে হ্যাঁ হ্যাঁ!কাজই তো করছি।একসাথে আর কতগুলো সামলাই?ইনি শাল মাথায় দিয়ে হাটতে না পারলে আমার দোষ?"
অয়ন আবার তোফায়েল শেখের দিকে ঘুরলো,
"একি আঙ্কেল!আপনি এখনো দাঁড়িয়ে?চলেন তাড়াতাড়ি!খালু আপনাকে খুঁজছে"
অয়ন তোফায়েল শেখকে হুমায়ূন সাহেবের অছিলায় একপ্রকার টেনেই হলরুমের দিকে নিয়ে গেল।অয়ন আর তোফায়েল শেখ সাহিত্যের চোখের আড়াল হতেই যেন স্বস্থির এক শ্বাস ফেলল সাহিত্য।আর দেরি করল না।কল্পনা কোনো প্রতিক্রিয়া করার আগেই সাহিত্য চট জলদি কল্পনাকে শালে আবৃত অবস্থাতেই পাজা কোলে তুলল।হঠাৎ সাহিত্যের এমন কান্ডে হতবম্ব হয়ে গেল কল্পনা।হালকা দাপাদাপি করে শুধালো মেয়েটা,
"আরে সাহিত্য ভাই কি করছেন?আমি হাটতে পারবো তো।নামিয়ে দিন আমাকে"
সাহিত্য আশেপাশে নজর বুলিয়ে হাটা দিল মেইন বিল্ডিংয়ের উদ্দেশ্যে।হাটতে নিয়েই শান্ত স্বরে বলল সে,
"মাথায় শাল ঢাকা দিয়ে কেমন করে হাটতে পারবি?যতক্ষণ না কোনো সেফ প্লেসে তোকে নিয়ে যাচ্ছি ততক্ষণ পর্যন্ত এমনই থাক"
আর কিছু বলল না কল্পনা।এমনিতেই তো বেশ কিছুক্ষণ থেকে সাহিত্যের ছোঁয়ায় মেয়েটা কাপছিল।আর এখন সাহিত্যের কোলে তুলে নেওয়ায় যেন জমে গিয়েছে পুরা।তবে ক্ষণিক আগের এক কথা মাথায় যেন টোকা মারছে কল্পনার।তাই তো চোরের মতো শাল থেকে মাথা বের করে সাহিত্যের দিকে দেখলো সে।সরু চোখ সাহিত্যের দিকে রেখেই বলে উঠল,
"আর হ্যাঁ,আমি অতোটাও মেকাপ করি না যে মেকাপ ছাড়া বেরই হতে পারব না।এমনকি বলতে গেলে আমি মেকাপই করি না"
কল্পনা বুঝেছে যে সাহিত্য পরিস্থিতি সামলাতেই সেই কথাটা বলেছিল।কিন্তু কল্পনার চিন্তা হচ্ছে যে যদি সাহিত্য ভাই মনে করে যে কল্পনা আসলেই অনেক মেকাপ করে?তাহলে তো সেটা সম্পুর্ণ ভুল ধারণা হয়ে যাবে।নিজের চেহারার যত্ন নিতে মেকাপ থেকে দূরে থেকে শুধু স্কিন কেয়ারেই আসক্ত কল্পনা।কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার পালা এলে সানস্ক্রিমের সাথে ঠোঁটে একটু লিপস্টিক দিয়ে নেয়।আর মাঝে-মাঝে সাহিত্যের পছন্দের সেই তুলতুলে গাল দুটোতে হালকা লাল প্রসাধনীর ছোঁয়া পড়ে।যেমন আজই কল্পনা ভারী সাজের নামে সানস্ক্রিমের উপর গাল দুটোতে ব্লাশ নামক প্রসাধনী দিয়েছে।
হঠাৎ বিড়াল ছানার মতো মাথা বের করে কল্পনার এমন কথা বলায় হালকা চমকে উঠে ঠোঁট বাকালো সাহিত্য।পায়ের গতি কমাতে নিয়েই কল্পনার দিকে হালকা ঝুকে এলো।প্রেয়সীর উদ্দেশ্যে কোমল কন্ঠে বলল ছেলেটা,
"আমি জানি তো আমার জানপাখি ন্যাচারাল বিউটি"
হঠাৎ সাহিত্যের এমন কোমল কন্ঠ যেন সইতে পাড়লো না সাহিত্যের প্রেয়সী।নজর এখনো সাহিত্যের মাটিয়া-সবুজাভাব চোখের দিকে স্থির থাকলেও লজ্জা যেন বেশ ভার করে বসলো।যার দরুন হালকা ব্লাশে লাল হয়ে থাকা গাল দুটো আরো একটু বেশি লাল হয়ে উঠল।
প্রেয়সীর আদলখানা এই মুহুর্তে বেশ আদুরে লাগছে সাহিত্যের কাছে।কপোল জোড়ার রঙ যে পরিবর্তন হয়েছে সেটাও লক্ষ্য করেছে সাহিত্য।সাহিত্যের মনতো চাইছে প্রেয়সীর নরম তুলতুলে গালদুটাতে দুটা কামড় বসিয়ে পুরো মুখো-মন্ডল অসংখ্য টুকরো চুমুতে ভরিয়ে দিক।আশেপাশের এতো মানুষের ভীড়কে যেন একদমই তোয়াক্কা করে না সে।তবে এই মুহুর্তে সেই কাজটা যেন একদমই মানানসই দেখাবে না।না জানি কবে যে বিয়েটা করবে সাহিত্য?বাসর রাতে সারা রাত বসে শুধু এই নরম গাল দুটোতেই চুমু খাবে।
দুই জোড়া চোখের মিলনের ইতি টানিয়ে সাহিত্য নেশালো কন্ঠে বলে উঠল,
"এখন শালটা নিচে নামা।তোর দিকে দেখে থাকলে আমি হাটতে পারব না"
স্তব্ধ থাকা কল্পনা ভড়কে উঠল সাহিত্যের সেই কথায়।সাথে শালটাও নামিয়ে নিল তাড়াতাড়ি।
ক্ষণিক মুহুর্ত পার হতে চলল।কিন্তু সাহিত্য যেন এখনো কল্পনাকে কোলে নিয়ে ব্যস্ত পায়ে হাটছে।শালের নিচে কল্পনা সাহিত্যের এমন আচরণের কিছু না বুঝেই ধীমি আওয়াজে জিজ্ঞেস করল,
"কি হয়েছে?এতো ঘুরছেন কেন?"
শান্ত কন্ঠ সাহিত্যের ,
"কোনো ফাঁকা রুম পাচ্ছি না"
"যেকোনো একটা তে গেলেই তো হয়"
"আব্বুর কাছ থেকে একবার বেঁচে গিয়েছিস দেখে যে আর সামনে পরবি না তার কোনো গ্যারান্টি আছে?তোকে নিয়ে আমি আর কোনো রিস্ক নিব না।আর অনুষ্ঠান শেষের দিকে।তাই তোকে বাকি সময় একটা রুমেই থাকতে হবে"
"তো আমি কর্টেজে চলে যাই?"
"না।ওপাশটা পুরা ফাঁকা আছে এখন"
সাহিত্যের কথার মানে বুঝল কল্পনা।তার সাহিত্য ভাই এতো মানুষের ভীড়ে যেন চোখের আড়াল করতে চাইছে না কল্পনাকে।অনুষ্ঠান শুরুর দিকেই কল্পনা লক্ষ্য করেছে।অনেক ছেলেই তার দিকে দেখছিল।নিজের নিরাপত্তার চিন্তা করেই সাহিত্যের সাথে আর দ্বিমত করল না সে।
কিছু স্মরণে আসতেই যেন আবার বলে উঠল কল্পনা,
"আমার ফোন-ব্যাগ সব প্রীতির কাছে।এতো বড় জায়গায় তখন ওকে খুঁজতে গিয়েই বড় বাবার সামনে পড়েছিলাম।এখানে একাই থাকব আমি,ফোন যে কাছে নেই"
আশেপাশে ফাঁকা রুম পাওয়ার উদ্দেশ্যেই চোখ ঘুরাচ্ছিল সাহিত্য। কল্পনার কথাই ছোট করে বলে উঠল,
"সমস্যা নেই।আমার ফোন দিয়ে যাব"
সাহিত্যের কথা শুনে কল্পনা বেশ অবাক হয়।সাহিত্য ভাই তার পার্সোনাল ফোন কল্পনার হাতে তুলে দিয়ে চলে যাবে?মানে সাহিত্য ভাইয়ের ফোনের পাসওয়ার্ডও কল্পনাকে বলতে হবে।মানে সাহিত্য ভাইয়ের ফোনের দ্বায়িত্ব পুরাই কল্পনার হাতে।আর সাহিত্য ভাইয়ের কথা শুনে তো মনে হলো কল্পনার কাছে তার ফোন থাকা কোনো ব্যাপারই না।
সাহিত্যের ছোট এক কথায় এতকিছু ভাবতে নিয়েই যেন লাজুকভাবে ঠোঁট বাকালো কল্পনা।হাতের চুড়ি নাড়তে নিয়েই ভেবে বসলো।এমন করে তো মানুষ শুধু তার বউকেই ফোন দেয়।কল্পনার সাহিত্য ভাই কি আসলেই তাকে সেই নজরে দেখে?
শালের নিচে লজ্জা ভার করা প্রেয়সীর চেহারা সাহিত্যের আর দেখা হয়ে উঠল না।কিন্তু সামনে থেকে তার দিকে আসতে থাকা এক কানাডিয়ান মেয়েকে ভালো করেই দেখলো সে।সেই মেয়ের দিকে চোখ পড়তেই যেন মুখটা ঝাত করে অন্ধকার হয়ে গেল সাহিত্যের।
ভার্সিটি জীবনে সাহিত্যের ব্যাচমেট ছিল এই মেয়ে।ভার্সিটির সময়টাসহ পরবর্তী বেশ কিছু বছর সাহিত্যের পেছনে ঘুরেছে।উদ্দেশ্য তার একটাই।সাহিত্যকে রুমে নিয়ে যাওয়া।যার দরুন এতো বছর থেকে বহু ছেলের পাত্তা পেলেও সাহিত্যের পাত্তা কখনোই পায়নি সেই মেয়ে।
সাহিত্যকে দেখা মাত্রই সেই মেয়ে যেন দৌড়ে এলো সাহিত্যের দিকে।এগুতে নিয়ে ভ্রু কুচকালো বেশ,
"হেই অহি!হু ইজ দিজ?আর ওকে এমন ঢেকে কোলে করে কেন নিয়ে বেড়াচ্ছো?"
প্রথমের ছোট বাক্যখানা হাত নাড়িয়ে হাসি মুখে বললেও পরের দুই বাক্যে কন্ঠে বেশ সন্দেহ মাখা ছিল মেয়েটার।কথা শেষে ভ্রু কুচকে সেই মেয়ে কল্পনার দিকেই দেখে আছে।জানার হয়তো খুব আগ্রহ জাগছে যে কে আছে এই পর্দার আড়ালে!
এতো হাটার পরেও কোনো ফাঁকা রুম না পেয়ে আগে থেকেই বেশ চটে আছে সাহিত্য।আর সামনের এই মেয়েকে দেখে চটে যাওয়ার মাত্রা যেন বেড়ে উঠল তার।ভারী পুরুষালী কন্ঠে কাটকাট গলায় বলল,
"শি ইজ মাই গার্লফ্রেন্ড।ওর রূপের আগুনে তোমরা ঝলসে যাবে তো,তাই ঢেকে নিয়েছি।আর হাটতে গেলে ওর সুন্দর পা ক্ষয় হয়ে যাবে তাই কোলে নিয়েছি"
সাহিত্যের হঠাৎ এমন কথায় সামনের মেয়ে কল্পনার দিক থেকে ঘুরে সাহিত্যের দিকে ভড়কানো নজর ফেলল।এদিকে কল্পনাও যেন বেশ ভড়কেছে।তবে সে বুঝে নিল যে সামনের মেয়েকে এড়িয়ে যেতেই হয়তো সেই কথাটা বলে বসে সাহিত্য।সাহিত্যের এমন কাটকাট গলা শুনে তো সেটাই মনে হচ্ছে।
সামনের মেয়ে থমকে থাকলো কিছুক্ষণ।অতঃপর হালকা হেসে বলল,
"তোমার যে গার্লফ্রেন্ড আছে সেটা শুনে অবাক হলাম।আর তোমার ব্যাপারে আমরা মেয়েগুলা যেরকম এক্সপেক্ট করেছিলাম দেখছি তুমি তো অমনই.....বউ পাগল।আমাদের লাক মনে হয় ভালো না"
মেয়েটা ঠোঁটের হাসি বজায় রেখেই আবার কল্পনার দিকে ঘুরলো।মেকি হেসে শুধালো সে,
"লাকি গার্ল,হা?"
আর কোনো কথা বাড়ানোর ইচ্ছা দেখা দিল না সেই মেয়ের মাঝে।সাহিত্যের তীরের ফলার মতো কথা একবারেই চুপসে দিয়েছে তাকে।মেয়েটা সাহিত্যকে পাশ কেটে যেতে নিয়ে হাসতে নিয়েই বলে উঠল,
"তোমার যে গার্লফ্রেন্ড আছে আর তুমি তাকে ভিকির বিয়েতে এভাবে কোলে করে নিয়ে ঘুরছো,ইট'স গনা বি ভাইরাল,ইউ নো?"
সে কথার কোনো প্রতিক্রিয়া করল না সাহিত্য।এমনকি সেই মেয়ের যাওয়ার পানে ঘুরেও দেখলো না।সামনে আবার পা বাড়াতে নিয়েই ধীমি আওয়াজে শুধু বলে উঠল,
"পাথেটিক অয়েমেন"
কল্পনা সাহিত্যের সে কথা শুনেই হয়তো বলে বসলো,
"কে ছিল ওটা?"
সাহিত্যের সোজাসাপটা উত্তর,
"আমার পেছনে ঘুরতো"
"ওওও"
অস্ফুটস্বরে সেটা বলে ক্ষণিক সময় নিরব থাকলো কল্পনা।কিন্তু মনের মধ্যে খচখচ করতে থাকা কথার উত্তর জানতে আবারো শান্ত স্বরে বলে উঠল,
"যাওয়ার আগে ওটা কেন বলে গেল?"
কল্পনার এমন কথায় একটুও ভড়কালো না সাহিত্য।রুমের খোঁজে নজর আশেপাশে ঘুরাতে নিয়েই শান্ত স্বরে বলল,
"কারণ তারা আমাকে কখনো কোনো মেয়ের সাথে দেখেনি"
সাহিত্যের কথায় কল্পনার মস্তিষ্ক যেন সচল হলো।কাল রাতের কথা স্মরণে এলো তার।আবার যেন হালকা হাসি ফুটল তার মুখে।তার সাহিত্য ভাইটা আসলেই আলাদা।এতোগুলো সুযোগ থাকার পরেও সাহিত্য কখনো ঘুরেও কোনো মেয়ের দিকে দেখেনি।তার কারণটা কি কল্পনা হতে পারে?নয়তো একটা ছেলে তার জীবনের আঠাশটা বছর কোনো মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে থাকতে পারে কেমন করে?নিজের ভাবনায় মুচকি হেসে পর মুহুর্তেই সেই হাসি সড়িয়ে নিল।নিজের অনুভূতিদের আবার বাধা দিয়ে দিল কল্পনা।সাহিত্যের উদ্দেশ্যে শান্ত স্বরেই বলল,
"আমাকে নামিয়ে দিন।আমার কারণে আপনার রেপুটেশনে দাগ লাগছে"
সাহিত্য ঠোঁট বাকিয়ে নজর দিল কল্পনার দিকে।মনের মধ্যে এক কথা আওড়ালো সে,
'রেপুটেশন চুলায় যাক।তোর কারণে আমি আমার চরিত্রে দাগ লাগাতে চাচ্ছি।সেটা যে কবে হবে?'
মনের কথা মনের মধ্যে বলে নিজের হাসি লুকিয়ে শান্ত স্বরে বলল সাহিত্য,
"আমার রেপুটেশনের টেনশন তোকে করতে হবে না।আমি কাকে কোলে নিব সেটা সম্পুর্ণ আমার ব্যাপার"
কল্পনার নিরবতা দেখে সাহিত্য ভ্রু কুচকালো।ঠোঁটে আবার হাসি ঝুলিয়ে শুধালো সে,
"তোকে যে আমার গার্লফ্রেন্ডের পরিচয় দিলাম,তো কিছু বলছিস না যে?"
কল্পনা স্বাভাবিকভাবেই বলে উঠল,
"এমন সিচুয়েশনে মেয়েটাকে এড়াতে আপনি ওটা বলতেই পারেন।ইট'স নরমাল"
বেশ অবাক হলো সাহিত্য।এই মেয়েটা এতো ম্যাচিউর কবে থেকে হলো?আসলেই কি সাহিত্যের জানপাখিটা বড় হয়ে গিয়েছে?
ঠোঁট বাকিয়ে এবার একটু শব্দ করে হেসে উঠল সাহিত্য।কন্ঠে হাসির প্রভাব ফেলে বলল,
"স্মার্ট গার্ল"
সাহিত্যের কথা শুনে মুচকি হাসি দিল কল্পনা।অতঃপর মেয়েটার কথা ভাবতে লাগলো।ক্ষণিক আগের সেই মেয়ের বলা এক কথা যেন অনবরত মাথায় ঘুরছে কল্পনার।মেয়েটার বলা মতো যদি কল্পনা আসলেই সেই লাকি গার্ল হতো।
আজ যেন সব কিছু উপেক্ষা করে নিজের মনের কথা বলেই বসলো কল্পনা।মনে মনে দোয়া করতে লাগল সে,
'হে আল্লাহ,বড় বাবা আর বাবার মিল করে দাও।আমার ভাগ্যটা একটাবার খুলে দাও।আমাকে সাহিত্য ভাইয়ের বউ বানিয়ে দাও'
সাহিত্য যদি এখন কল্পনার দোয়া শুনতো তাহলে কোনো দ্বিধা ছাড়াই জোরে জোরে ৩ বার আমিন পড়ত।কিন্তু আপসোস!সেই আমিন আর পড়া হয়ে উঠল না সাহিত্যের।
#চলবে
আজ পর্ব কিন্তু বড় করে দিয়েছি😑