ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৬৫তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৬৫

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

মাঠের একদিকটায় মুখ ভোতা করে প্রীতি ঠাই দাঁড়িয়ে।তবে বেশ কিছুক্ষণ থেকে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে হাত-পাগুলো অসার হয়ে আসছে যেন।এমন দাঁড়িয়ে থেকে হাতের দুটো ব্যাগ নিয়ে কি পড়নের ভারী জামদানী শাড়ি সামলানো সম্ভব?তাই তো হাপিয়ে উঠেছে মেয়েটা।

কিন্তু মাথায় যেন আরেক চিন্তা।প্রীতি তো ভেবেছিল কল্পনা তার ফোন নিজের হাতেই রেখেছে।তাই অযথা দাঁড়িয়ে না থেকে হুলরুমে এসে বসে পড়েছিল।কিন্তু বেশ সময় পর যখন কল্পনার ফোনে কল করে নিজের হাতের ব্যাগে সেটা বাজতে শুনলো তখনই যেন চোখ কপালে উঠে তার।কল্পনা যে ফোন নামক জিনিসটা হাতে ধরে রাখতে একটুও পছন্দ করে না,সেটা মনে হতেই মাথায় হাত চাপড়ালো প্রীতি।উপায়ান্তর বেড়িয়ে পড়ে কল্পনার খোঁজে।কিন্তু কল্পনা যে এতক্ষণে রেস্টরুম থেকে বেড়িয়ে প্রীতিকে খুঁজতে হাটা ধরেছে সেটা তো আর প্রীতি জানে না।যার দরুন কল্পনা নজরে না পড়ায় বেশ চিন্তিত সে।অবশ্য কল্পনা তো ছোট বাচ্চা নয় যে হারিয়ে যাবে।কিন্তু তারপরও যেন মন টিকছে না প্রীতির।

ব্যস্তভাবে হাটতে নিয়েই ফোনে কথা বলছিল অন্ত।হঠাৎ সাহিত্য মাঠ থেকে গায়েব হয়ে যাওয়ার কারণে রবির সাথে যেন অন্তই বাকি কাজগুলো সামলাচ্ছে।তবে অন্ত খুব করে চাইছে যেন সাহিত্যের দেখা মিলুক।কাজগুলো সামলাতে গিয়ে যে অনেক মানুষের সাথে কথা বলতে হচ্ছে তাকে।সেটা যেন ভারীই অস্বস্তিকর।তবে এবার ব্যস্ত পদযুগল থমকে গেল নিজের প্রেয়সীকে দেখে।ফোন কানে চেপে ধরেই যেন প্রীতিকে দূর থেকে দেখতে লাগলো অন্ত।খয়েরী জামদানী শাড়িতে এই রাতের আলোতে কি সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে।সেপাশে ক্ষণিক সময় স্তব্ধ নয়নে দেখে থেকে হালকা হেসে উঠল অন্ত। মনে পড়ে গেল গতকাল সকালের কথা।

ভোর-ভোর সময়টাতে যখন অন্ত মাথা ঠান্ডা করতেই একটু বেড়িয়েছিল তখন সেই ভোরের কুয়াশার মধ্যে এক শ্যামবতীরও দেখা মিলে তার।দুজনের কথা-বার্তা কখন যে প্রেমালাপে বদলে যায় কেউই যেন বুঝে উঠতে পারেনি।আর তাই তো এখন কোনো সংকোচ ছাড়াই অন্ত তার প্রেয়সীর দিকে দেখে আছে।

কানের কাছে ফোনের শব্দে ভ্রম কাটলো অন্তর।কল কেটে হাটা দিল প্রীতির উদ্দেশ্যে।অন্তকে দেখে প্রীতি না হেসে যেন হালকা ঠোঁট উলটিয়ে বসলো।সেটা দেখে মেকি হেসে শুধালো অন্ত,

"কি হয়েছে?এমন ঠোঁট উলটিয়ে আছো কেন?"

ঠোঁট উলটিয়ে রেখেই বলল প্রীতি,

"কল্পনাকে খুঁজে পাচ্ছি না"

এবার মুখ থেকে হাসি সড়ে গিয়ে অন্তর কপালে ভাজ পড়ল,

"মানে?ওর ফোনে কল দাও"

প্রীতি নিজের হাতে থাকা কল্পনার সাদা ব্যাগখানা দেখালো,

"ওর ব্যাগ আর ফোন আমার কাছে।তাই তো অতো টেনশন করছি"

এবার অন্তও বেশ চিন্তায় পড়ে গেল।মাথার বুদ্ধি খাটিয়ে ফোনে হাত চালালো সে,

"দেখি ভাইয়াকে কল দেই।ভাইয়ার চেনা কারো চোখে তো অবশ্যই পড়বে"

এতক্ষণ থেকে নিজে কাজ থেকে বাচার জন্য সাহিত্যকে কল না লাগালেও এবার আর পিচপা হলো না অন্ত।ফোন দুবার রিং হতেই পেছন থেকে ভেসে এলো সাহিত্যের ফোনের রিংটোন।সেটাতে প্রীতি আর অন্ত দুজনেই সেদিকে ঘুরলো।পিছনে ঘুরে যেন কপালে ভাজ পড়ল দুজনেরই।

অয়ন পাঞ্জাবির পকেট থেকে সাহিত্যের ফোন বের করে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে।নজর তার অন্তর উপর।অন্ত তার দিকে দেখতেই এগিয়ে এলো সে,

"কি ব্যাপার?সাহিত্যকে কেন কল দিচ্ছিস?"

অন্ত আগে নিজের প্রশ্ন ছুড়লো,

"ভাইয়ার ফোন তোমার কাছে কি করে?"

"অফিসের কিছু ইমেইল চেক করছিলাম"

প্রীতি যেন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।রাগে ফেটে পড়ল সে,

"সমস্যা কি এই দুইজনের?দুটোই এমন ফোন জমা দিয়ে কেন ঘুরছে?মানুষকে টেনশন দিতে মনে হয় খুব ভালো লাগে?"

অন্ত প্রীতিকে শান্ত করতে লেগে পড়লেও অয়ন ভ্রু কুচকে শুধালো,

"দুজন?আর কে ফোন জমা রেখেছে?"

ফুসে উঠে প্রীতি,

"আমার বাদর বান্ধুবী কল্পনা!ওকেই তো খুঁজে না পেয়ে সাহিত্য ভাইয়াকে কল দেওয়া হচ্ছিল"

এবার যেন স্বাভাবিক হলো অয়ন,

"আরে টেনশন নিও না।ও সাহিত্যের সাথেই আছে"

অয়নের কথা শুনে স্বস্তির এক শ্বাস ফেলল প্রীতি,

"যাক বাবা,হারিয়ে তো যায়নি"

অয়ন হালকা হেসে হাত নাড়ালো,

"কল্পনা তোফায়েল আঙ্কেলের চোখে পড়তে-পড়তে বেঁচে গিয়েছে।তাই ওকে মনে হয় কোনো সেফ জায়গায় নিয়ে গিয়েছে সাহিত্য।ওকে নিয়ে চিন্তা করিও না"

অয়নের কথায় সামনের দুজনই ভড়কালো।তোফায়েল শেখের কথা শুনে অন্ত মাথায় হাত ঠেকিয়ে যেন বেশ চিন্তায় পড়ে গেল।আর এদিকে তো প্রীতি কল্পনার অসচেতনতার জন্য মুখ ফুলিয়ে বিড়বিড় করেই যাচ্ছে।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

অবশেষে অনেক কষ্টে একটা ফাকা রুম পেয়েছে সাহিত্য।বিল্ডিংয়ের দোতলায় একটু ভেতরের পাশে একটা রুমের দরজা হা করে খোলা।কিন্তু ভেতরে কোনো মানুষজন নেই।সেই সুযোগেই রুমে ঢুকে পড়ল সে।পা দিয়ে পেছনে রুমের দরজা লাগিয়ে কল্পনাকে দাড় করিয়ে দিল।রুম পরখ করতে নিয়ে কল্পনার দিকে চোখ আটকালো তার।কল্পনা এখনো শালের নিচে ঠায় দাঁড়িয়ে।সেটা দেখে নিঃশব্দে হাসলো সাহিত্য।নিজ ইচ্ছায় যেন এক কাজ করে বসলো।

প্রেয়সীর মাথার শালটা নব বধুর ঘোমটা তোলার মতো করেই উঁচু করল।সেটাতে যেন চোখাচোখি হলো তার প্রেয়সীর ভরাট কাজল কালো চোখগুলোর সাথে।সাহিত্য তো প্রতিবারই নিজের প্রেয়সীর দিকে এভাবে দীর্ঘ সময় দেখে থাকতে চায়।কিন্তু এবার যেন সাহিত্যের প্রেয়সীর মাঝেও সেই আকাঙ্ক্ষা দেখা দিল।চুপটি করে দাঁড়িয়ে সাহিত্যের নজরের সাথে নজর মেলাতে ব্যস্ত কল্পনা।সাহিত্যের মৃদু ঠোঁট বাকানো হাসি যেন বিমোহিত হয়ে দেখছে সে।তবে নিজের হুশ ফিরতেই যেন শালে নিজের হাত রেখে মাথা থেকে সড়িয়ে নিল সেটি।সেটাতে সাহিত্যও কিছুটা সজাগ হলো।নড়েচড়ে দাড়ালো সে।কল্পনার থেকে নজর সড়িয়ে রুমের দিকে নজর ঘুরাতে লাগলো,

"এই রুমে সমস্যা হবে তোর?"

কল্পনা মাথা ঘুরিয়ে রুম পরখ করে মৃদু স্বরে বলল,

"না"

তবে আবারো সাহিত্যের নজর তার প্রেয়সীর দিকে আটকালো।এবার আর মৃদু ঠোঁট বাকালো না সে।হালকা শব্দ করেই হাসলো।সেটাতে ভ্রু কুচকালো কল্পনা,

"কি হয়েছে?"

সাহিত্য কিছু না বলে কল্পনার দুই বাহু ধরে পেছনে ঘুরালো তাকে।বেডসাইড আয়নাটায় দেখা মিলল কল্পনার উষ্কখুষ্ক চুল।ভড়কে উঠে ব্যতিব্যস্ত হয়ে আয়নার দিকে পা বাড়ালো সে।ঠোঁটে মৃদু হাসি এবং নজর কল্পনার দিকে রেখেই পকেটে হাত রাখলো সাহিত্য।কল্পনাকে নিজের ফোন দেওয়ার উদ্দেশ্যেই সে কাজ করা।কিন্তু পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে সে ভ্রু কুচকালো বেশ।মাথা নিচু করে এবার পায়জামার পকেটেও ফোন খুঁজতে লাগলো।তবে পর মুহুর্তেই অয়নের কথা স্মরণে আসতেই মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে বসলো।কল্পনার দিকে আবার নজর রাখলো সে,

"আমার ফোন অয়নের কাছে আছে।তুই এখানে থাক আমি ফোন নিয়ে আসছি"

কল্পনা নিজের চুল ঠিক করতে নিয়েই আয়নায় সাহিত্যের দিকে দেখে 'আচ্ছা' বলে উঠল।পর মুহুর্তেই সাহিত্য পা বাড়ালো দরজার দিকে।বাইরের এতো কাজ রেখে প্রেয়সীর সাথে বেশি সময় থাকা হয়ে গিয়েছে তার।আর মনে হয় থাকা সম্ভব হবে না।তবে হুমায়ূন সাহেব সাহিত্যকে একটু বিশ্রাম নিতে বলেছিলেন।এখন তো শুধু ভিকি আর এশার টুকটাক আংটি খোজার খেলাসহ মিষ্টি মুখ করা বাকি।মেয়ে শশুর বাড়িতে গেলে গাড়ি থেকে নামার পর যেসব হৈ-হুল্লোড় করা হয় সব তো এখানেই হবে।তারপর তো আর কোনোকিছু বাকি নেই।হুমায়ূন সাহেবের সেকথায় অয়ন আর সাহিত্য হুমায়ূন সাহেবের চোখের আড়ালে লুকিয়ে বেশ হেসেছিল।কারণ তারপরেই তো ভিকির বন্ধুদের কাজ শুরু।এতো সহজে নতুন বউয়ের কাছে ভিকিকে কিছুতেই যেতে দিবে না তারা।

সেসব কথা চিন্তা করতে নিয়ে হালকা ঠোঁট বাকালো সাহিত্য।কিন্তু দরজার হ্যান্ড লক ঘুরাতে গিয়ে যেন মিলিয়ে গেল সেই হাসি।দরজার হ্যান্ড লক ধরে বেশ ঝাকাঝাকি করল সে।কিন্তু বদ্ধ রুমের দরজার হ্যান্ড লকটা যেন এক ইঞ্চিও নড়ল না।তারপরও বেশ কসরত করল সাহিত্য সেই লক খুলার উদ্দেশ্যে।লক তো খুললোই না বরং সাহিত্য আরো হাপিয়ে উঠল।মেজাজটা তার চটে যাচ্ছে একদম।টনক নড়তেই চোখ-মুখ খিচে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল সে,

"সিট!লক নষ্ট,এজন্যই রুমে কেউ ছিল না"

বুঝে উঠার পরেও সাহিত্য যেন হাতের কাজ চালিয়ে গেল।রুম থেকে একবার বের হতে পারুক সে,রিসোর্টের স্টাফদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়বে।এমন রিস্কি এক রুম এরকম করে খোলা রেখেছে কেন?কোনো সাইনবোর্ডও দরজায় ঝুলিয়ে রাখেনি।এমন কেয়ারলেস থাকা কি ভালো কথা?

সাহিত্যের এমন লক নড়ানোর শব্দ এবার পৌঁছালো কল্পনার কানে।আয়নায় সাহিত্যকে দেখে এবার সাহিত্যের দিকে ঘুরে দাড়ালো,

"কি হয়েছে?"

সাহিত্য লকে হাত চালাতে নিয়েই বলল,

"দরজার লক নষ্ট।খুলছে না"

সেকথায় কল্পনা হন্তদন্ত পায়ে এসে সাহিত্যের পাশে দাড়ালো,

"লক নষ্ট মানে?"

কল্পনার দিকে মাথা ঘুরালো সাহিত্য,

"লক নষ্ট মানে লক নষ্ট"

ব্যতিব্যস্ত দেখালো কল্পনাকে,

"এখন কি করব?সাথে তো কোনো ফোনও নেই"

লকের সাথে যুদ্ধ করা শেষ করে এবার সাহিত্য দরজায় বারি দিতে লাগলো।গলা উঁচিয়ে ডাকতে লাগলো সাহায্যের জন্য।কিন্তু সাহিত্যের এতো উঁচু কন্ঠেও যেন কেউ প্রতিক্রিয়া করছে না।তবে হাল ছাড়লো না সাহিত্য।অনবরত ডেকেই গেল।রুমে ঢুকার সময় তো বাইরে মানুষজন চোখে পড়েছিল তার।তো কেউ সারা দিচ্ছে না কেন?আর সাহিত্যের এমন উঁচু পুরুষালী গলা তো বেশ অনেক দূরই যাওয়ার কথা।

সাহিত্য ভাবতে নিয়েই চিল্লানো থামিয়ে দিল।সেটা দেখে এবার কল্পনা এগিয়ে গিয়ে দরজায় ভারী হাত ফেলতে লাগলো।হাতের চুড়ির সাথে বেজে উঠছে তার চিকন গলাটা।

কিন্তু সাহিত্য স্তব্ধ হয়ে আছে অন্য কারণে।দরজা থেকে সড়ে গিয়ে দেয়ালের কাছে দাড়ালো সে।অতঃপর দেয়ালে কান লাগিয়ে আঙুলের টোকা বসালো।চোখ-মুখ আপনা-আপনিই খিচে এলো আসল বিষয় বুঝতে পেরে।অযথা কল্পনা যেন তার শক্তি নষ্ট না করে তাই তো তাকে থামিয়ে দিয়ে দরজার দিকে মুখ করে দাড়ালো সাহিত্য।কল্পনা ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করতেই মৃদু স্বরে বলল সে,

"এটা সাউন্ড প্রুফ রুম।বাইরের কেউ আমাদের ডাক শুনতে পারবে না"

সাহিত্যের কথা শুনে ভড়কে উঠেই ভ্রু কুচকালো কল্পনা,

"কিহ! সাউন্ড প্রুফ কেন......"

থেমে গেল কল্পনা।একটা রিসোর্টের রুম সাউন্ড প্রুফ কেন হয় কেমন হাবার মতো সাহিত্য ভাইকে প্রশ্ন করতে গিয়েছিল!সাথে সাথে কথা ঘুরিয়ে নিল সে,

"এখন কি করবো?"

সাহিত্য কিছু না বলে দরজার কাছাকাছি দাড়িয়ে দরজার দিকে দেখে আছে।কল্পনা সাহিত্যের উত্তরের অপেক্ষা করলো কয়েক মুহুর্ত।উল্টো ঘুরে থাকা সাহিত্যের থেকে যখন কোনো উত্তর এলো না তখন আবার ডাকলো সে,

"সাহিত্য ভাই"

আবারো কোনো উত্তর নেই।হঠাৎ সাহিত্যের এমন চুপ হয়ে যাওয়া দেখে কল্পনা ভ্রু কুচকালো বেশ।বিড়বিড় করে আওড়ালো,

"কি যে প্ল্যান বানাচ্ছে লোকটা,আল্লাই জানে"

কল্পনা দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট না করে রুমের আশেপাশে ঘুরে চোখ বুলাতে লাগলো।এই আশায় যে কোনো জানালা খুলা আছে কিনা।কিন্তু এদিকে যে সাহিত্যের অবস্থা নাজেহাল।এতক্ষণ পর একটু নড়ে উঠে চোখ জোড়া সিলিং এর পাশে হালকা তুলে মনের মধ্যেই বলতে লাগলো সাহিত্য,

"হে মাবুদ!না হয় ভুল করে একটু বলেছিলাম চরিত্রে দাগ লাগার কথা।তাই বলে এতো বড় শাস্তি দিবে?ভুল হয়ে গিয়েছে।বিয়ের আগ পর্যন্ত আর জীবনেও ডার্টি মাইন্ডে দেখবো না।তবুও এরকম শাস্তি দিও না,প্লিজ!!সবকিছু ঠিক করা আছে।বেড আছে,এসি আছে,রুমও সাউন্ড প্রুফ!শুধু কাবিননামায় সাইন করে ৩ কবুলটা বলা বাকি!!সুযোগ দিবে বিয়ের পরেই দিতে।অযথা এই ধৈর্যহীন ব্যক্তিটার ধৈর্য পরীক্ষা করছো কি জন্য??"

সৃষ্টিকর্তাকে নিজের মনের দুঃখ প্রকাশ করে এবার দরজায় মাথা ঠেকিয়ে মেঝের দিকে নজর দিল সাহিত্য।সাথে ঠোঁট উলটিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলো।

কল্পনা রুমের বন্ধ জানালায় হাত চালাতে নিয়ে নজর দিল সাহিত্যের দিকে।কপালে ভাজ ফেলে আবারো বিড়বিড় করে উঠল সে,

"না জানি কি এমন প্ল্যান বানাচ্ছে এতক্ষণ ধরে?"

কিন্তু কল্পনা যেন বুঝলোই না,যে বন্ধ রুমে প্রেয়সীর সাথে আটকা পড়ে বিপাকে পড়ে গিয়েছে সাহিত্য।সুযোগ নেওয়ার জন্য অনুভূতিরা কিলবিল করছে।অথচ নিজের সুপুরুষের ট্যাগ থাকার কারণে যেন আগাতে পারছে না সেদিকে।

নিজের অতি কষ্টে এবার শোকে চলে গিয়েছে সাহিত্য।কান্না থামিয়ে মুখ অন্ধকার করে এসে ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ল।কল্পনা এতক্ষণ ভালোই চেষ্টা করল জানালার লক খুলার।কিন্তু সেগুলোও যেন তালা বন্ধ হয়ে আছে।সাহিত্যকে বেশ কিছুক্ষণ পর নড়তে দেখে দৌড়ে এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে শুধালো মেয়েটা,

"কি প্লান বানালেন?"

সাহিত্য মাথা তুলে নজর দিল কল্পনার দিকে।নরম হাতে হালকা একটা জানালার লক ঘুরাতেই লাল হয়ে উঠেছে মেয়েটা।গলদেশে লেপ্টানো চুলগুলোর জন্যই হয়তো,কি মায়াবতী লাগছে তাকে।সাহিত্যের প্রেয়সীকে আজই এতো সুন্দর লাগতে হতো?সামনে বসা পুরুষের মাথায় যে কিসব ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে এই মুহুর্তে,সেটা যে বড়ই অসভ্যের কাতারে পড়ে।কিন্তু সেটার সাথে নিজের ধৈর্যের পরীক্ষা দিতেও ব্যস্ত সেই পুরুষ।

কল্পনা তার উত্তরের আশায় এবার ভ্রু নাচালো।সেটাতে অন্ধকার মুখোশ্রি নিয়েই বলে উঠল সাহিত্য,

"এটা সাউন্ড প্রুফ রুম।আমাদের করার কিছুই নেই"

"করার কিছু নেই মানে?অবশ্যই আছে।খুঁজতে হবে"

সাহিত্যের কথার পর মুহুর্তে কল্পনা প্রতিক্রিয়া করে আবার রুমে পায়চারি করে এদিক-ওদিক দেখতে লাগলো।এখন কোনো ইঁদুরের খাল পেলেও মনে হয় মেয়েটা খুশি হবে।

কিন্তু এদিকে সাহিত্য যেন দোটানায় পড়ে রয়েছে।ছেলেটা না ইঁদুরের খাল পেলে খুশি হবে আর না এই বদ্ধ রুমে প্রেয়সীর সাথে দূরত্ব বজায় রেখে শান্তি পাচ্ছে।সাহিত্যের মনটা যেন আবার ভেঙে এলো।ঘাড় পেছনে হেলিয়ে অস্ফুটস্বরে আওড়ালো সে,

"করার মতো আসলেই অনেক কিছু আছে জানপাখি।কিন্তু এখন কিছুই করতে পারব না"

সাহিত্য নিজের পোড়া কপালকেই দোষ দিতে ব্যস্ত ছিল এতক্ষণ। কিন্তু হঠাৎই কল্পনা চেচিয়ে উঠল,

"সাহিত্য ভাই!সাহিত্য ভাই!!রাস্তা পেয়েছি!"

কল্পনার সে কথায় সাহিত্যকে একদমই ব্যতিব্যস্ত দেখালো না।বাইরে বের হওয়ার রাস্তা পেলেও কি আর না পেলেও কি?ছেলেটার তো কোনোটাতেই সুবিধা হবে না।কিন্তু তারপরও কল্পনার ডাকে উঠে গিয়ে তার পাশে দাড়ালো।অমনি কল্পনা হাত উঁচু করে রুমের এক কোণে উপরে দেখিয়ে দিল,

"ওই যে দেখেন!ওখানে একটা থাই গ্লাস আছে।ওটা খুলতে পারলেই আমাদের ডাক শুনতে পারবে সবাই"

সাহিত্য ভাবলেশহীনভাবে মাথা তুলে সেদিকটায় দেখলো।দেয়ালের শেষ মাথায় ছোট চারকোণাচি এক থাই গ্লাস বসানো সিলিংয়ের কাছে।সাহিত্য কল্পনার দিকে ঘুরে কপালে ভাজ ফেলে শুধালো,

"নাহয় আমি ছ'ফিটের কাছাকাছি।তাই বলে তুই আমাকে জিরাফ ভেবে বসে আছিস?অতোদূর হাত যাবে আমার?!"

সাহিত্যের শেষের দিকের উঁচু গলায় তার দিকে পিটপিট করে দেখতে লাগলো কল্পনা,

"কেন?যাবে না?"

কল্পনার এমন মিনমিনিয়ে বলা কথায় মাথায় হাত ঠেকালো সাহিত্য।সেটা দেখে আবার বলে উঠল কল্পনা,

"আচ্ছা না যাক।কোনো চেয়ার-টুল দিয়ে উঠতে পারবেন তো"

প্রেয়সী সামনে লাফালাফি করার পরেও তাকে চেপে ধরতে পারছে না সেটা নিয়ে ক্ষণিক আগে থেকেই চটে আছে সাহিত্য।তার উপর কল্পনার একেকটা কথায় যেন আরো রাগটা বাড়ছে।

সাহিত্য মাথা ঝুকিয়ে কল্পনার উদ্দেশ্যে দাঁত চিবিয়ে বলল,

"রুমে চেয়ার-টুল কি তোর বাপ রেখে গিয়েছে?"

কল্পনা মাথা ঘুরালো আশেপাশে।আসলেই রুমে কোনো চেয়ার-টুল নেই।দেয়ালের বড় আয়নাটাসহ বিছানা আছে শুধু।দাঁত বের করে কল্পনা সাহিত্যের দিকে ঘুরলো।কন্ঠে হাসির প্রভাব ফেলে বলে উঠল,

"না।বাবা রেখে যায়নি চেয়ার-টুল"

প্রেয়সীর হাসিতে যেন সবসময়ই কাবু হতে বাধ্য হয় ছেলেটা।তাই তো কল্পনার এমন কথা শুনে সাহিত্যেরও বেশ হাসি পেল।নজর ঘুরিয়ে ঠোঁট টিপে হাসলো সে।

কল্পনা আবারো হাসতে নিয়ে হাত দাপিয়ে বলল,

"এখন না হেসে কি করা যায় ভাববেন একটু?"

সাহিত্য তো মনের মধ্যে সেটাই ভাবছে।কারণ এই বদ্ধ রুমে প্রেয়সীর সাথে আটকা পড়ার সুযোগ নিতে বলছে সাহিত্যের মনের অনুভূতিরা সাহিত্যকে।তারউপর প্রেয়সীর এমন ক্ষণে-ক্ষণে কাচের চুড়িতে আবৃত মেহেদী রাঙা হাত দিয়ে সামনের ছোট চুলগুলো ঠিক করায় সাহিত্য যেন আরো কাবু হয়ে পড়ছে।কাজি সাহেবকে চলে যেতে দেওয়া ভুল হয়ে গেল নাকি?কারণ আজ যে সাহিত্যের হাতে অঘটন কিছু ঘটার অনেক জোরদার সম্ভাবনা রয়েছে।ছেলেটা নিজের মনের অনুভূতিদের যেন আর দাবিয়ে রাখতেই পারছে না।আকড়ে ধরতে ইচ্ছা করছে প্রেয়সীকে।প্রেয়সী শত বাধা দিলেও হয়তো আজ নিজেকে থামাতে পারবে না সাহিত্য।যার দরুন যতটুকু সম্ভব হচ্ছে প্রেয়সীর দিকে না দেখারই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা।কিন্তু নিজের বুকের অস্বাভাবিক কম্পন থামাতে যেন অক্ষম সে।তবে এতোকিছুর মাঝেও প্রেয়সীকে নিজের হাতে কোরবানি হওয়া থেকে বাঁচাতেই মাথায় এক বুদ্ধি আনল সাহিত্য।

নিজের এলোমেলো শ্বাস লুকিয়ে কল্পনার দিকে নজর দিল,

"চেয়ার-টুল লাগবে না।তুই আমার কাধের উপর উঠ"

কল্পনা ভড়কে উঠেই এক ধাপ পিছিয়ে গেল,

"পাগল নাকি আপনি?আমি আবার কেমন করে আপনারা কাধে উঠব?পারব না আমি!"

কথাটা বলেই মাছি তাড়াবার মতো হাত নাড়িয়ে অন্যদিকে ঘুরল কল্পনা।তবে সাহিত্যের আবারো কথা বলায় সাহিত্যের দিকে ঘুরতে বাধ্য হলো,

"ছোটতে তো খুব বাদরের মতো উঠতি"

যেমন ভড়কালো তেমন লজ্জাও পেল কল্পনা।এক নজর সাহিত্যের দিকে দেখে এলোমেলো নজর ফেলে বলল,

"তখন তো ছোট ছিলাম।এখন তো বড় হয়েছি"

নিজের ললনার এমন লজ্জা রাঙা চেহারা দেখে নিজেকে আর দূরে রাখতে পারলো না সাহিত্য।রাণী গোলাপি প্রসাধনীতে রাঙানো প্রেয়সীর অধর জোড়া যেন দুর্বল করছে সাহিত্যকে।শ্বাস যেন ঘন হতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে।ধীর পায়ে কল্পনার দিকে এগুতে লাগলো।ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি নিয়েই ভারী কন্ঠে বলল,

"এখন বড় হয়েছিস?"

সাহিত্যের ভারী পুরুষালী কন্ঠ শুনে লজ্জায় কল্পনা যেন মাথাটা আরো নিচু করে নিল।সাথে মিনমিনিয়ে বলল,

"হ্যাঁ"

সাহিত্য এখনো তার প্রেয়সীর দিকে এগুতে ব্যস্ত।পায়ের সাদা হিলগুলো সুক্ষ্ম পিছিয়ে নিয়েও যেন কল্পনা সাহিত্যের থেকে বেশি দূরত্ব তৈরি করতে পারলো না।দূরত্ব যেন আরো সুক্ষ্ম হয়ে এলো তাদের মাঝে।এর ভেতরেই সাহিত্য আবারো ভারী কন্ঠে বলল,

"কত বড়?"

নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখলেও এবার একটু জোর গলায় বলল কল্পনা,

"অনেক বড়"

এবার সাহিত্য কথায় বিরতি দিয়ে শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার দিকেই মনযোগ দিল।দুজনের মাঝে দূরত্ব এতোটা কমে এসেছে যে সাহিত্য তার প্রেয়সীর শরীরের মিষ্টি সুবাসটা খুব ভালো করেই উপভোগ করতে পারছে।তার মন তো চাইছে খানিক দূরে থাকা দেয়ালের সাথে প্রেয়সীকে চেপে ধরুক।নিজের শখের নারীর ঘ্রাণটা আরো গভীরভাবে নিতেই মুখ গুজে দিক প্রেয়সীর ফর্সা গলদেশটায়।কিন্তু সেটা যেন করতে পারছে না শুধুমাত্র প্রেয়সীর কথা ভেবে।সাহিত্যের গভীর ছোঁয়ায় যদি মেয়েটা কেঁদে ফেলে?তবে ভারী নেশায় বুদ হয়ে থাকা পুরুষটি যেন এবার নিজের মনের সুক্ষ্ম প্রশ্নখানা বলেই বসলো,

"আমাকে সামলানোর মতো বড় হয়েছিস?"

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন