#পর্ব_৬৭
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সাধারণত বিয়ের পরের দিন পরিবেশ বেশ ঠান্ডা থাকে।তবে সারাহ রিসোর্টের বর্তমান অবস্থা একদমই তেমনটা নেই।ডেকোরেশনের লোকজনদের ভারী ব্যস্ত দেখাচ্ছে।কেউবা গতকালের বিয়ের সাজ গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত,তো কেউবা আগামীকালের রিসিপশনের অনুষ্ঠানের জন্য রিসোর্টখানা সাজাতে ব্যস্ত।তবে আজ ভিকিসহ বাকি সবার মধ্যে তেমন ব্যস্ততা দেখা দিচ্ছে না।অনুষ্ঠান কেন্দ্রীক ব্যক্তিরা যেন আত্মীদের সাথে গল্পে মেতে রয়েছে।এতক্ষণ থেকে আত্মীদের সাথে গল্পের আসর বসালেও এবার যেন বেশ কিছু নামীদামী কোম্পানির সি.ই.ও.-দের সাথে বসেছে O.S.S. কোম্পানির চার তারকা।
কোম্পানির কথা পাশে ফেলে আজ যেন ব্যক্তি জীবনের কথায় মত্ত্ব তারা।তবে উপস্থিত প্রত্যেকের গাম্ভীর্যপূর্ণ কথার ধরন দেখে যেন সেই স্বাভাবিক কথপোকথনও অতি প্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে আশেপাশের মানুষদের নজরে।
ভিকির বিয়েতে কানাডার পরিচিত প্রায় সব কোম্পানির সি.ই.ও.-কেই আমন্ত্রণ করা হয়েছে।তবে সেই ব্যস্ত জীবনের ব্যক্তিরা শুধু বিয়ের দিনটাতেই উপস্থিত থাকতে পেরেছে।আর আজ এই বিকেলের হালকা ঠান্ডায় প্রত্যেকে তাদের প্রাইভেট জেটে উঠে আবার পারি জমাবে কানাডায়।
সাহিত্যের পাশের সোফাতেই বসে থাকা এক মধ্যবয়স্ক কানাডিয়ান লোক শুধালেন,
"আই হার্ড দ্যাট দ্য সি.ই.ও. অফ F.S. ইজ ইওর আঙ্কেল,ইজ দ্যাট রাইট মিস্টার অহি?"
ভদ্র লোকের কথায় O.S.S. কোম্পানির চার বিজনেসম্যানই থমকালো।স্বাভাবিক কথা চলতে নিয়েই যেন অস্বাভাবিক কিছু বলে বসেন তিনি।সেই কথাটা অবশ্য অতি স্বাভাবিক হলেও O.S.S. কোম্পানির ওনারদের কাছে স্বাভাবিক ছিল না।
বাকি তিনজন আড় চোখে সাহিত্যকে দেখলেও সাহিত্য ক্ষণিক সময় চুপ থেকে মৃদু হেসে বলে উঠল,
"ইয়েস"
সাহিত্যের উত্তরে যেন ভড়কালো বাকি সব সি.ই.ও-রা।একজন তো বলেও বসলো,
"রেলি মিস্টার অহি!হোয়াই ডিডেন্ট ইউ টেল আস?এন্ড হোয়ার ইজ হি রাইট নাও?ইজেন্ট হি অ্যাটেন্ডিং ভিকি'স ওয়েডিং?"
সামনের মানুষদের এতো আগ্রহ দেখে ইতোমধ্যে হয়তো একটু ফুসতে শুরু করেছে সাহিত্য।নিজের আশেপাশে সেই কাঙ্খিত ব্যক্তিকে দেখার এতো আগ্রহ নিয়ে উপস্থিত থাকা সবাই যেন হঠাৎই চোখের বি'ষ হয়ে উঠল তার।
সাহিত্যের মন-মস্তিষ্কের অবস্থা যেন বুঝল অয়ন,রবি আর ভিকি।সেটা বুঝতে পেরেই রবি বাকিদের উদ্দেশ্যে হাসি মুখে বলে উঠল,
"হি ইজ নট ইন বিডি রাইট নাও"
প্রকাশ্যে না হলেও মনের মধ্যে যেন খানিকটা হতাশাই হলো সবাই রবির সেই কথায়।তবে সেই হতাশা স্পষ্ট নজরে পড়ল সাহিত্যের।রগ ফুলে উঠা শক্ত ঘাড়খানা ডানে-বামে নড়িয়ে ফুটিয়ে নিল সে।শক্ত নজর স্থির হয়ে আছে কোনো এক কোণায়।
নিজের রাগটা হয়তো আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সাহিত্য।তাই তো পড়ণের গাঢ় সবুজ রঙা শার্ট ঠিক করে উঠে দাড়ালো সে।অতঃপর যতটা স্বাভাবিকভাবে সম্ভব কুশল বিনিময় করে বেড়িয়ে এলো সেই কথপোকথনের গন্ডি থেকে।
ফাহাদ শেখের নামটা শুনে সাহিত্যের মাঝে যতটা না রাগ উদয় হয়েছিল,সেই ব্যক্তির ছোট কন্যাকে দেখে যেন ততটাই শান্তি অনুভব করছে সাহিত্য এই মুহুর্তে।হয়তো বা তার থেকেও বেশি।
প্রেয়সীকে দেখা মাত্রই মুখে হাসি ঝুলিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগুলো সাহিত্য।অতঃপর চেয়ার টেনে নিজের প্রশান্তির পাশেই বসে পড়ল।
কল্পনা ক্ষণিক আগেই রেডি হয়ে এসে নাস্তা খেতে বসেছে।সাহিত্যই তাকে ম্যাসেজ করে বলল যে কিছুক্ষণের মধ্যেই বের হবে তারা।তাই তো কল্পনা আর দেরি করেনি।রেডি হওয়ার পর প্রীতিকে জানিয়ে ডাইনিংয়ে চলে আসে।
ভিকির বিয়ের অনুষ্ঠান আজ শেষ না হলেও ফাহাদ শেখের জানা মতে কল্পনা আর প্রীতির স্টাডি টুর আজই শেষ।ফাহাদ শেখ তো এটাও জানেন যে কল্পনারা সকালেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছে।সন্ধ্যায় নাহয় রাতে পৌঁছোবে।তাই সিদ্ধান্ত হয়েছে গাজিপুর থেকে বিকেলের দিকে রওনা দিবে কল্পনারা।ধীরে-সুস্থে গাড়ি চালালে হয়তো সন্ধ্যা পেড়িয়ে রাত হতে পারে ঢাকার গলিতে ঢুকতে।
হঠাৎ পাশে সাহিত্যকে আবিষ্কার করে হালকা একটু চমকে উঠল কল্পনা।সাহিত্যের দিকে নজর দিয়ে পিটপিট করে দেখলো সুক্ষ্ম মুহুর্তের জন্য।অতঃপর আবার হাতের স্যান্ডউইচে মনোযোগ দিল।
প্রেয়সীর এমন নজর ঘুরিয়ে নেওয়ায় ভ্রু জোড়া নেতিয়ে গেল সাহিত্যের।এক হাতের কণুই টেবিলে ঠেকিয়ে হাতের তালুতে গালের ভার দিল।অতঃপর মিন্ট গ্রিন রঙা থ্রিপিসে আবৃত কল্পনাকে দেখতে লাগলো।ঠোঁটের সুক্ষ্ম হাসি বজায় রেখেই ভারী কন্ঠে শুধালো সে,
"এখনো রাগ করে আছিস?"
খাবার চাবানো বন্ধ করল কল্পনা।আড় চোখে সাহিত্যকে দেখে আবার খাবার চাবানোতে মন দিল।সাথে ধীমি আওয়াজে বলে উঠল,
"না"
পর মুহুর্তেই প্রতিক্রিয়া করল সাহিত্য,
"তোর 'না'-য়ে তো আমি বড়সড় হা পাচ্ছি"
কিছু বলল না কল্পনা।শুধু খাবার চিবিয়েই যাচ্ছে।সাহিত্য অপেক্ষা করল উত্তরের।তবে অপর পক্ষ কিছু না বলায় ভ্রু কুচকালো।আরেক হাত দিয়ে কল্পনার সামনে থাকা প্লেটের বাকি অর্ধেক স্যান্ডউইচটা নিয়ে মুখে পুড়ল সাহিত্য।সেটা মুখে ঢুকানোর আগে বলেও উঠল,
"দেখি কি আছে এই স্যান্ডউইচে,যে আমার কথা না শুনে এতো মনযোগ দিয়ে খাচ্ছিস?"
হঠাৎ সাহিত্যের এমন স্যান্ডউইচ হাতে তুলে নেওয়ায় হালকা ভড়কালো কল্পনা।সাহিত্যের দিকে নজর দেওয়ার পর মুহুর্তেই সাহিত্য মুখের খাবার শেষ করে বলে উঠল,
"তেমন কিছুই তো নেই"
কল্পনা সাহিত্যের প্রশ্নের আবারো উত্তর করল,
"বললাম তো রাগ করিনি।ঘুম থেকে দেরি করে উঠেছি দেখে মুড ভালো নেই"
সাহিত্য কল্পনার দিকে নজর রেখেই স্যান্ডউইচ খেতে নিয়ে বলল,
"তো রাতে এতোগুলো ম্যাসেজ দিয়েছি একটাও সিন করিসনি কেন?"
সাহিত্যের এবারের কথায় এলোমেলো নজর ফেলতে লাগলো কল্পনা।কি বলবে সে এখন?যে কাল রাতে হৃদয়ে উদয় হওয়া অনুভূতিদের ধামাচাপা দিতেই সাহিত্যের থেকে ক্ষণিক সময়ের জন্য দূরত্ব তৈরি করছিল সে?এ কথা হয়তো কল্পনার দ্বারায় বলা কখনোই সম্ভব না।তাই তো আবারো ধীমি আওয়াজে সাহিত্যকে উত্তর করল,
"ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম"
সাহিত্যের প্রেয়সীর মনের কথা সাহিত্য বুঝবে না তো আর কে বুঝবে?কিন্তু বুঝার পরেও যেন চুপ থাকলো ছেলেটা।তবে করে বসল আরেক প্রশ্ন,
"ব্যথা কমেছে?রাতে যে ঔষধ পাঠিয়েছিলাম খেয়েছিস?"
কপালে ভাজ ফেলে কল্পনা সাহিত্যের দিকে নজর দিল,
"ঔষধ খাওয়ার মতোও ব্যথা লাগেনি।তারপরও...খেয়েছি"
সাহিত্য হয়তো হালকা মজা নিতেই ঠোঁট বাকিয়ে বলে উঠল,
"না কমলে বল এখনো।কাধে নিয়ে আরো একটা আছাড় মারলে এবার কমে যাবে"
কল্পনার কুচকানো মুখসুদ্দো সুক্ষ্ম হাসি দেখে এবার শব্দ করেই হাসলো সাহিত্য।হাসার কারণেই হয়তো বাহুতে কল্পনার হাতের এক মৃদু চাপড়ও খেল।
হাতের কাজ সাড়িয়ে উঠে দাড়ালো কল্পনা,
"হয়েছে,এতো হাসতে হবে না।চলেন বের হই"
পড়ণের সাদা শাল ঠিক করে কল্পনা সামনে এগুতেই হাতে একটা পানির বোতল নিয়ে উঠে দাড়ালো সাহিত্য।তবে কল্পনাসহ বিল্ডিংয়ের বাইরে যাওয়ার আগেই দেখা মিলল ভিকি আর এশার।
এশা তো কল্পনাকে দেখা মাত্রই এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে তাকে,
"এতো তাড়াতাড়ি চলে না গেলে হয় না?তোমাকে যে আমি অনেক মিস করব"
এশার জড়িয়ে ধরায় ভালোই চিপায় পড়েছে কল্পনা।তারপরও যেন হাসি ফুটছে তার মুখে।এশার মৃদু দোলে তাল মিলিয়ে বলল সে,
"আমার তো থাকারই ইচ্ছা ছিল।কিন্তু বাবাকে যে বলেছি আজই বাসা ফিরব।আর যদি পরে বড় মা-দের সাথে ফিরি তাহলে বাবা সন্দেহ করবে"
কল্পনার দুই বাহু ধরে দূরত্ব তৈরি করল এশা।সাথে কল্পনার পাশে দেখে ভারী এক শ্বাস ফেলল।এর মাঝেই দেখা মিলল শেখ ভিলার সদস্যদের।
লতিফা শেখ ও রঞ্জক শেখ কল্পনার কাছে দাঁড়িয়ে থাকলেও আমেনা শেখ ছেলেকে সাবধানে থাকার জন্য নীতি বাক্য শুনাচ্ছেন।আজ একদম সকাল-সকাল তোফায়েল শেখ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন।গত রাতে আমেনা শেখকে বলেছিলেন যে সাহিত্য হয়তো কোনো মেয়েকে পছন্দ করে।অনুষ্ঠানে এক মেয়ের সাথে তাকে দেখেছেন তিনি।আমেনা শেখ যেন ছেলের কাছ থেকে এ ব্যাপারে জেনে নেন।ছেলের বয়স তো কম হয়নি।ভিকির বিয়ে যেহেতু হয়ে গেল তাই সাহিত্যের ব্যাপারটাও নিপটানো যাক।
আমেনা শেখ তোফায়েল শেখের কথা শুনে ভালোই ভড়কেছিলেন।সকালে স্বামী রিসোর্ট ছাড়ার পরপরই সাহিত্যের কাছে তেড়ে যান তিনি।তোফায়েল শেখ কার সাথে সাহিত্যকে দেখেছিল সেটা জানতে চাওয়া মাত্রই সাহিত্য হাসিতে ফেটে পড়ে।অতঃপর গত রাতে তোফায়েল শেখের সামনে কল্পনাকে নিয়ে কি হয়ে গিয়েছে সব খুলে বলে সে।তখন থেকেই তো ভয়ে আছেন আমেনা শেখ।রঞ্জক শেখের কাছেও ফাহাদ শেখের কল দেওয়ার কথা জেনেছেন।এই শেখ আহমেদের চোখগুলো যেন একদমই সাধারণ না।কিছু না কিছু অবশ্যই মাথায় চলে তাদের।কল্পনা যে ধরা পড়েনি সেটার জন্য লাখো শুকরিয়া আদায় করেন আমেনা শেখ।
মায়ের নীতি বাক্যে সাহিত্যের তেমন কোনো দৃঢ় মনোযোগ নেই।ক্ষণিক আগেই রাজ সাহিত্যকে তার কালো ব্লেজারটা ধরিয়ে দিয়ে কেটে পড়ে।সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলে নির্ঘাত রাজকেও নীতি বাক্য শুনাতে শুরু করবেন আমেনা শেখ।সে কারণেই হয়তো।
কালো ব্লেজারখানার কাধের অংশ সাহিত্যের কাধে অবস্থান করলেও হাত জোড়াকে দখল করতে পারেনি সেটি।হাত জোড়া তো শুধু শার্টে আবৃত হয়ে কালো ফর্মাল প্যান্টের পকেটে স্থান পেয়েছে।তবে সাহিত্যের মাথাখানা নিচু হয়ে মায়ের কথায় মৃদু দুলতে ব্যস্ত।কল্পনার নিরাপত্তার কথা বলতে নিয়ে যেন তোফায়েল শেখের বলে দেওয়া সাহিত্যের বিয়ের কথাটা ধামাচাপা পড়ে গেল।তবে সাহিত্য সেই কথা স্মরণে রেখে মাথা দুলানোর সাথে মৃদু হেসেও যাচ্ছে।
তোফায়েল শেখ ভুল বুঝেননি।ছেলেকে তিনি তার বউমার সাথেই দেখেছেন।কিন্তু সেই বউমার কথা বললে তো এ জীবনে সাহিত্যকে সন্ন্যাসী থাকতে বলবেন তিনি।
কল্পনার সাথে শেখ পরিবারের সবাই টুকটাক কথা বলার পড়েই গাড়িতে উঠল তারা।গাড়িতে উঠার আগ মুহুর্তে প্রীতির সাথে কথা হয় কল্পনার।অন্ত নাকি এক কাজে আটকা পড়েছে,তাই একটু পরে বের হবে তারা।সে ব্যাপারে বেশি চিন্তা করল না কল্পনা।প্রীতি যেন ভালোই সময় কাটাতে ব্যস্ত এখানে।
তাই আর দেরি না করে বিকেলের রোদটা কড়া থাকা অবস্থাতেই সবাইকে বিদায় দিয়ে সারাহ রিসোর্ট থেকে বেড়িয়ে পড়ল রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিন গাড়িখানা।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সময়টা জানুয়ারির শুরুর দিকে হলেও শীতটা যেন খুবই হালকা বেশ কয়দিন থেকেই।গাজিপুরে যদিও একটু ঠান্ডার আভাস বুঝা যাচ্ছিল।কিন্তু ঢাকার একটু ভেতরের দিকে সেটাও আর বুঝা যাচ্ছে না।ব্যস্ত শহরে অতি মানুষের বসবাসের কারণেই হয়তো এমনটা।তবে গাজিপুর থেকে ফেরার পথে ফাঁকা মেইন রোডটার আশেপাশে তেমন কিছু নেই দেখেই মনে হয় ভারী বাতাস আছড়ে পড়ছে সাহিত্যের রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনটাতে।আর সেটা সম্পুর্ণ উপেক্ষা করে যাচ্ছে সেই গাড়ির ভেতরে উপস্থিত নর-নারী।
সাহিত্য দক্ষ হাতে গাড়ির স্টেয়ারিং ঘুরাতে নিয়েই বেশ কিছুক্ষণ থেকে কল্পনাকে আড় চোখে পরখ করে যাচ্ছে।কিন্তু কল্পনার যেন সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই।মেয়েটা কেমন ক্লান্ত চাহনি নিয়ে জানালার বাইরে দেখতে ব্যস্ত।গাড়ির ভেতরের আবহাওয়া স্বাভাবিকই বলা চলে।কিন্তু নিজের হৃদয়ের শিরশিরানি অনুভূতিদের অনুভব করতে পেরেই যেন কুকড়িয়ে আছে সে।পায়ের ঘীয়ে জুত্তি জোড়া খুলে সিটের উপর পা চড়িয়ে দিয়ে নিজের সাথে লেপ্টে নিয়েছে একদম।মাথাটা ঠেকিয়ে রেখেছে জানালার কাচে।
কাল রাত থেকে বেজায় জিনিস নিয়ে ভাবছে কল্পনা।আর সেই বেজায় জিনিসের মধ্যে নিজের মনের অনুভূতিরা পড়ে।নিজের উপর যেন প্রচন্ড রাগ উঠছে তার।সাহিত্য ভাইয়ের ব্যাপারে এতো গভীরভাবে কেন ভাবছে সে?এই কয়টা মাসে নিজেকে বুঝ দিয়েও কি লাভ হয়নি?এইচএসসি দেওয়ার পরের সময়টা নাহয় অবুঝ ছিল সে।কিন্তু এখন?.....এখন তো আর বাচ্চামো করার বয়সে নেই সে।তবে এক দিক দিয়ে কল্পনা সম্পুর্ণ দোষ নিজেকেও দিতে অনিচ্ছুক।গত কয়েক মাসে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও,এই কয়দিনে সাহিত্যের আচরণে যেন আর পারছে না।কল্পনা নাহয় বাচ্চামো করছে।কিন্তু সাহিত্য ভাইও কি একটু বুঝবে না?সে তো বুঝদারের ঘরে পা দিয়েছে।কিন্তু সে কথা মনে হয় একপ্রকার ভুলেই বসেছে সাহিত্য।শেখ ভিলার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে যেন কোনো ভুরুক্ষেপই নেই তার।কিন্তু কল্পনার পক্ষে তো আর সেটা করা সম্ভব না।মেয়েটা যেন নিজেকে বাধ্য করে রেখেছে সেই কাজে।
নিজের মনের অনুভূতিদের উপর আরো একবার চাদর মুড়ি দিতেই ভেতর থেকে ভারী শ্বাস বেড়িয়ে এলো কল্পনার।সেটা দেখেই যেন সাহিত্য ডাক দিল তাকে।নিজের ভাবনায় বুদ থাকার দরুন সে কথা হয়তো কল্পনার কানে পৌঁছালো না।তবে ক্ষণিক সময় পর আবারো শুধালো সাহিত্য,
"ক্ষুধা লেগেছে?খাবি কিছু?"
উত্তরে শুধু মৃদু মাথা দোলালো কল্পনা।সে খাবে না।বাধন ছাড়া চুলের আড়ালে থাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন চেহারাটা দেখতে পেল না সাহিত্য।কিন্তু সাহিত্যের যে খুব করে দেখতে ইচ্ছে করছে তার প্রেয়সীর আদলখানা।কল্পনা অনেকক্ষণ থেকে চুপচাপ হয়ে থাকায় যেন এবার তারও আর ভালো লাগছে না।মেয়েটা কি সাহিত্যকে দূরে ঠেলে দেওয়ার জন্য এমন করছে?হয়তো বা।কিন্তু সাহিত্য যে কিছুতেই সেটা হতে দেবে না।প্রেয়সীকে নিজের সাথে বেধে রাখবে একদম।
কল্পনার মুখ খুলতে ও মন ভালো করতেই যেন সাহিত্য ঠোঁট বাকিয়ে বলে উঠল,
"চাচুকে তো বলেছিস তুই বান্দরবানে গিয়েছিস।এখন চাচু যদি গাছপালার ছবি দেখতে চায় তখন কি করবি?"
আবারো কল্পনা কোনো উত্তর করল না।আড় চোখে সেদিকে দেখে আবার সামনে নজর দিল সাহিত্য।ঠোঁটে হাসি বজায় রেখেই বলল,
"চল,গাছপালার সাথে ছবি তুলে আসি"
সাহিত্যের এবারের কথায় কল্পনা ভ্রু কুচকালো।জানালার বাইরে নজর থাকায় চোখে এলো ঢাকার ভেতরে ঢুকার প্রশস্ত রাস্তাটা।যেটা থেকে ধীরে-ধীরে দূরে চলে আসছে তারা।শরীরের ক্লান্ত ছাড়িয়ে বেশ ব্যতিব্যস্ত হয়ে সাহিত্যের দিকে ঘুরলো কল্পনা।অতঃপর ব্যতিব্যস্ত কন্ঠেই বলে উঠল,
"ধানমন্ডির রাস্তা ওদিকে,তো আমরা এদিকে কেন যাচ্ছি?!"
কল্পনার দিকে না দেখেই মেকি হেসে বলল সাহিত্য,
"কারণ গাছপালার সাথে ছবি তুলে তোর বাপকে দেখাবো"
কল্পনা চোখ-মুখে হালকা বিরক্ত ভাব এনে বলল,
"বাবাকে গাছপালার ছবি দেখাতে হবে না।আপনি গাড়ি ঘুরান তো!বাসা চলেন সরাসরি"
আগেরই কন্ঠ সাহিত্যের,
"না বাবা।আমি রিস্ক নিব না।নাহলে তোর বাবা আমাকে সন্দেহ করবে।এমনিতেই ক্ষণে-ক্ষণে তোর থেকে দূরে থাকতে বলে ইন্ডিরেক্টলি"
সাহিত্যের দুষ্টুমি মাখা কন্ঠের প্রতিক্রিয়ায় কল্পনা খুত-খুত করে উঠল,
"আমি যাব না গাছপালা দেখতে।বাসা চলেন তো,আমার ভালো লাগছে না"
কল্পনার দিকে ঘুরে হাওয়াতেই চুমু দিল সাহিত্য।অতঃপর পর মুহুর্তেই বলল,
"কাঁদে না বাচ্চা।কিছুক্ষণ পরেই মন ভালো হয়ে যাবে"
সাহিত্যের হঠাৎ এমন চুমু দেওয়ার ভান করায় থমকালো কল্পনা।চোখ জোড়া বড় করে পর মুহুর্তেই লাল হয়ে উঠল তার মুখোশ্রি।সাহিত্যকে আর কিছু বলতেই পারলো না।আবারো ব্যতিব্যস্ত হয়ে জানালার দিকে ঘুরলো।নিজের লজ্জায় রাঙা মুখখানাই যেন সাহিত্যের থেকে লুকাতে চাইছে।কিন্তু এদিকে যে সাহিত্য সেটা ভালো করেই বুঝলো।কল্পনার খোলা চুলে ঢাকা পিঠের দিকে দেখে নিঃশব্দে হাসলো সে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিন গাড়িটা শহরের ইট-পাথর থেকে অনেক দূরে এসে এক জঙ্গলে থামলো।আশেপাশের হরেক রঙা সবুজের মাঝে রয়েল গ্রিন রঙা গাড়িটা দাঁড়িয়ে থাকায় মনে হচ্ছে সেই গাড়ি যেন এই ঘন জঙ্গলেরই অধিবাসী।আশেপাশে পশু-পাখির কিচিরমিচির কিছুটা থাকলেও তেমন ভারী না।শেষ বিকেলের সময় সেজন্যই হয়তো।সূর্য ডুবার মুহুর্তেই তো পশু-পাখিরা নীড়ে ঢুকতে পছন্দ করে।তবে সাহিত্য যেই জায়গার উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে সেখানটায় এখনো সূর্যের হালকা রোশনাই দেখা দিচ্ছে।এই শীতে সাহিত্য সেটা অবশ্য আশা করেনি।কিন্তু সেই দৃশ্য চোখে পড়তেই ঠোঁটে হাসি ফুটল তার।
সাহিত্যের তখনকার কান্ডে কল্পনা যেন একটু বেশিই লজ্জা পেয়েছে।যার প্রমাণ তার বর্তমান অবস্থা।পড়নের সাদা শালটা দিয়ে মাথা-মুখও ঢেকে ধরে রয়েছে।
সাহিত্য আবারো নিঃশব্দে হেসে ডাকলো তাকে,
"অমন করে বসে না থেকে বের হবি কি?"
শালের ভেতর থেকে সোজাসাপটা উত্তর করল কল্পনা,
"আমি বের হবো না।বাসায় চলেন"
বেশ বিরক্ত হয়ে ঠোঁট উল্টালো সাহিত্য।অতঃপর কল্পনার শালের একটা কোণা ধরে টানতে লাগলো,
"আরে বাইরে একটু দেখতো!সূর্য ডুবে গেলে ভালো দেখাবে না"
সাহিত্যের শাল টানাটানিতে হালকা নড়ে উঠলো কল্পনা।একপ্রকার বাধ্য হয়েই শাল থেকে মাথা বের করে দিয়ে নজর দিল গাড়ির সামনের গ্লাসে।থমকালো সে।কিছু মুহুর্ত সেদিকে নিষ্পলক দেখে থেকে ঘন-ঘন অক্ষি পল্লব ফেলতে লাগলো,
"কোথায় আমরা?"
কল্পনা সামনে নজর রেখেই ধীমি কন্ঠে শুধালো।সেটাতে সাহিত্যের ছোট উত্তর,
"জঙ্গলে"
কল্পনা ভ্রু কুচকে নজর দিল সাহিত্যের দিকে।সাহিত্য সামনের লুকিং গ্লাসে দেখতে নিয়েই নিজের চুলে আঙুল চালাচ্ছে।কল্পনা এখনো দ্বিধায় আছে,
"আপনি এই জায়গার ব্যাপারে জানলেন কেমন করে?"
"খোঁজ নেওয়ার জন্য আমার মানুষের অভাব নেই জানপাখি"
কল্পনাকে নিজের দিকে দেখে থাকতে দেখে পাশে ঘুরলো সাহিত্য,
"এখন আমার দিকে অমন হাবার মতো না তাকিয়ে থেকে গাড়ি থেকে নামবি কি?
সময় নিয়ে মুখে হাসি ফুটালো কল্পনা।ক্ষণিক আগের এতো চিন্তা যেন মাথা থেকে বাষ্প হয়ে উড়ে গেল।হঠাৎই ব্যস্ত পায়ে জুত্তি জোড়া পড়ে দরজা খুলে বেড়িয়ে গেল সে।সাদা শালখানা পড়ে থাকলো কালো সিটখানায়।
গাছপালা দিয়ে ঘীরে থাকা ছোট্ট একখানা দীঘির দিকে এগিয়ে গেল কল্পনা।পাড়ের কিছু দূর অংশ জুড়ে বালু থাকায় সেখানেই আটকে গেল।তবে চোখ জোড়া যেন প্রকৃতির দর্শন পেতে একদমই ভুলছে না।চকচক করতে থাকা চোখ জোড়া আশেপাশে ঘুরিয়ে বুজে নিল সেগুলোকে।অতঃপর লম্বা এক শ্বাস টেনে বক্ষে প্রবেশ করালো।শীতের সময় হওয়ার কারণেই যেন প্রকৃতির ঠান্ডা আবহাওয়া কল্পনার প্রশ্বাসে অনুভব হলো।আর সেই ঠান্ডা আবহাওয়াকে আরো বেশি রোমাঞ্চকর করে তুলল হালকা বইতে থাকা হাওয়া।উঁচু-নিচু গাছের পাতারা যেন আপনমনেই দুলতে শুরু করল।আর তার সাথে কল্পনার পড়নের ওড়নাটাও।সিল্কের ওড়নাটা কল্পনার গলা থেকে পেট অব্দি ঢেকে রাখার দরুন দমকা হাওয়ায় শেষের অংশরা উড়তে থাকলেও বাকিটা যেন লেপ্টে গেল শরীরের সাথে।
উড়তে থাকা চুলগুলোর কিছু অংশ এক কানের পিছনে গুজে পেছনে ঘুরল কল্পনা।যাকে দেখার উদ্দেশ্যে ঘুরেছিল তাকেই দেখতে পেল।সাহিত্য এতক্ষণ থেকে গাড়ির সামনে হেলান দিয়ে থাকলেও এবার হেটে কল্পনার দিকে এগুতে শুরু করেছে।হালকা বাতাস উপভোগ করতেই যেন ব্লেজারখানা আর শরীরে চড়ায়নি।
কল্পনা সাহিত্যের দিকে দেখে মুচকি হেসে আবার সামনে ঘুরলো।অতঃপর ব্যস্ত আচরণে পায়ের জুত্তি জোড়া খুলে হালকা জোরে পা বাড়াতে লাগলো বালুগুলোর মধ্যে।নরম বালু যেন খালি পায়েই উপভোগ করতে চাইছিল সে।বাতাসের বিপরীতে দীঘির পাড় ঘেঁষে পায়ের গতি কমানো বৈকি বাড়ালো মেয়েটা।প্রকৃতি যেন বরাবরই টানে তাকে।আর সেকথা তো সাহিত্য ভালো করেই জানে।তাই তো ঠোঁটের রেখায় হাসি নিয়ে কল্পনার এলোমেলো করে ফেলে রাখা জুত্তি জোড়া বাম হাতটায় তুলে নিল।সাথে ধীর পায়ে হাটতে লাগলো খানিক দূরের প্রেয়সীকে অনুসরণ করে।
বেশ কয়েকদিন থেকেই নিজের মস্তিষ্কে কিছু স্মৃতি জমাচ্ছে সাহিত্য।হয়তো নিজের ফাঁকা ক্যানভাসে সেগুলোকে স্থান দেওয়ার জন্যই।তবে আজকের স্মৃতিটা যেন শুধু মস্তিষ্কে রাখতে ইচ্ছা করলো না।মুঠো ফোনটাতেও যে সেটি স্থান করে নিতে উস্কানি দিচ্ছে সাহিত্যকে।
সামনের হাটতে থাকা প্রেয়সীর উড়তে থাকা কালো চুল ও মিন্ট গ্রিন রঙা ওড়না যেন প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে সাহিত্যের হৃদয়ে।ভালোবাসার অদ্ভুত দিক মনে হয় এটাই।ভালোবাসার মানুষের মুখে হাসি দেখলেই যেন শীতল হয়ে উঠে নিজ হৃদয়টাও।যেমনটা বর্তমানে সাহিত্যের হচ্ছে।সেদিকে নজর রেখেই পকেট থেকে মুঠো ফোনটা বের করে প্রেয়সীর দিকে তাক করে ধরল সাহিত্য।একটা...দুটা...তিনটা...এবার আর শুধু পেছনের ছবি উঠল না কল্পনার।কানের পিছনে চুল আটকে ধরে পেছন ফিরতেই আদলখানারও ছবি উঠল।সূর্যের হালকা কিরণে যেন অপরূপা লাগছে সামনের যুবতীকে।সেই প্রেয়সীর দিকে নজর রেখেই হাতের ফোন পকেটে রাখলো সাহিত্য।নিজের একমাত্র প্রেয়সীর হাসি দেখে যেন কোমল হলো তার চাহনি।সাহিত্যকে যে বড় কাছে টানছে সে।তবে সাহিত্য নিজের পায়ের গতি ধীর রেখেই সামনে এগুতে নিল।হৃদয় ছটফট করলেও এতো অধৈর্য হয়ে সে কখনোই প্রেয়সীর দিকে এগুবে না।ধৈর্য ধরলে হয়তো তার প্রেয়সী নিজেই সাহিত্যের দিকে এগিয়ে আসবে কোনো এক সময়।
সাহিত্যের ছবি তুলা হঠাৎ চোখে পড়ায় হাসি মুখখানায় মুচকি হেসে উঠল কল্পনা।তবে আবারো সামনে ঘুরে প্রকৃতি অনুভব করতে লাগলো।এই সময়গুলো যে খুব ভালো লাগে কল্পনার।যখন মস্তিষ্কের সব চিন্তা ফেলে রেখে সামনে পা বাড়াতে পারে সে।আর পেছনে ঘুরে সেই ভারী চিন্তার দিকে দেখতে চাইলে দেখা মেলে তার সাহিত্য ভাইয়ের।যে কল্পনাকে খুশি করার উদ্দেশ্যেই ক্ষণিক সময়ের জন্য সেই চিন্তাগুলোকে নিজের পেছনে আড়াল করে রাখে।
কল্পনা চোখ বুজে মনের মধ্যে এক কথা যেন আজ বলেই বসলো,
'ভালোবাসাটা যেন আমার জীবনে সাহিত্য ভাইয়ের রূপেই আসুক'
মনের মধ্যে কথাটা আওড়ানোর পর মুহুর্তেই দমকা হাওয়ার সাথে এক গানের সুর কানে ভেসে এতো তার।যেটা হয়তো সাহিত্যও শুনতে পাইছে।জঙ্গলের অপরপাশটায় যে শীতের বনভোজন খেতে এসেছে কিছু মানুষজন।সেখানেই হয়তো সাউন্ড বক্সে গান লাগিয়েছে কেউ।
সূর্যটা যেন এখনো ডুবেনি।তবে শীতের মাঝে শরীরে উষ্ণতা ছড়ানোর উদ্দেশ্যেই যেন গানের মিষ্টি সুরের পরে সাউন্ড বক্সে বেজে উঠল এক জনপ্রিয় গানের গলা,
❝
ভালোবাসবো, বাসবো রে, বন্ধু,
তোমায় যতনে।
আমার মনের ঘরে চান্দের আলো,
চুইয়া চুইয়া পড়ে.....
❞
#চলবে