#পর্ব_৬৮
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
প্রকৃতি অনেক আগেই অন্ধকারাচ্ছন্নে ঢেকে পড়েছে।কিন্তু কল্পনার মুখোশ্রিতে অন্ধকারাচ্ছন্ন নেমে এলো এই তো ক্ষণিক আগেই।কল্পনা সরু চোখে পাশের ব্যক্তির দিকে কটমটিয়ে দেখে থাকলেও,পাশের ব্যক্তি এলোমেলো নজর ঘুরাতে ব্যস্ত।সাথে দুই হাতের আঙুলগুলো স্টেয়ারিংটায় টুকিয়ে যাচ্ছে।
অবশেষে সাহিত্য কল্পনার এমন কড়া নজর সইতে না পেরে বলেই বসলো,
"এয়ার জানপাখি,দেখিস না তো অমন করে।এমন চোখ দিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছিস কেন?"
তেতে উঠল কল্পনা,
"অকাজ করার মতো কাজ করলে রাগ হবো না তো কি করব!"
সাহিত্য আবারো চুপসে গিয়ে মাথা পাশের জানালার দিকে ঘুরালো।কিন্তু কল্পনা দমলো না।রাগের সুরেই বলে উঠল সে,
"আপনি রাস্তা তেমন ভালো চিনেন না তো এদিকে এসেছিলেনই কেন?এ কথা আমাকে আগে বললেই তো দিনের আলোতে ফিরতে পারতাম"
মাথা না ঘুরিয়েই মিনমিনিয়ে উঠল সাহিত্য,
"তুই অনেক মজা করছিলি দেখে কিছু বলিনি"
সাহিত্যের কথায় লাল হয়ে উঠল কল্পনার কপোল জোড়া।এই লোকটা এতো জেন্টালম্যান ভাইব দেয় কেন?কল্পনা মজা করছিল দেখে কি বাধা দিয়ে প্রয়োজনীয় কথাটা বলা যেত না?সেটা না করে কল্পনাকে দিব্বি পানিতে পা ভিজাতে দিয়েছে।আর কল্পনা পা মুছে যখন গাড়িতে উঠে বসেছে তখন ব'ম ফাটায় সাহিত্য।মাথা চুলকাতে নিয়েই বলে উঠে,
"কল্পনা....একটা সমস্যা হয়ে গিয়েছে।আমি তো এদিকের রাস্তা তেমন চিনি না।রবির কাছে একটু খোঁজ পেয়েই এখানে এসেছিলাম।কিন্তু.....এখন রাতের বেলা যে রাস্তা চিনছি না"
সাহিত্যের সেই কথার পর কল্পনা কয়েক মুহুর্ত হা হয়ে দেখে ছিল।তবে নিজেকে ভড়কাতে না দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠেই বলে উঠে,
"আপনার গাড়িতে হেডলাইট নেই?হেডলাইট অন করে গাড়ি স্টার্ট দিন।একটু হলেও তো রাস্তা চিনতে পারবেন"
সাহিত্যের সোজাঝাপ্টা কথা,
"জঙ্গলের ভেতরের কথা।অমন করতে গিয়ে যদি আরো রাস্তা হারিয়ে ফেলি?তার থেকে ভালো সকাল পর্যন্ত এখানে অপেক্ষা করি"
সাহিত্যের এবারের কথায় কল্পনা নিজেকে আর ভড়কানো থেকে থামাতে পারেনি।আর তারপর থেকেই তো ভবিষ্যতে কল্পনার উপর ফাহাদ শেখের গজব পড়ার ব্যাপারে সাহিত্যের কান ভরেই যাচ্ছে মেয়েটা।
এবার সাহিত্যের থেকে সরু চোখ সড়িয়ে নিজের ফোন হাতে নিল কল্পনা।নেটওয়ার্ক না থাকা ফোনটা আরো একবার বারি দিল নিজের হাতে।কোনো কাজ না করায় খুত-খুত করে উঠল।আর কল্পনার সেই খুত-খুত আওয়াজ শুনে ঘাড় ঘুরে রাখা সাহিত্য নিঃশব্দে ঠোঁট বাকালো।শয়তানিভাব যেন ফুটে উঠছে সেই হাসিতে।
সাহিত্য এই জঙ্গল থেকে বের হওয়ার রাস্তা ভালো করেই চিনে।এমনকি গাড়ির হেডলাইট না জ্বালিয়েও সে দিব্বি মেইন রোডে উঠতে পারবে।কিন্তু সে সেই কাজ করবে না।মনের মধ্যে যেন একদম জিদ ধরেই বসেছে।তার কারণ একটাই।প্রেয়সীকে আরো কিছু সময়ের জন্য একটু শান্তি মতো দেখবে সে।গত পাঁচ দিনে যেন একদমই মন ভরেনি।আর শেখ ভিলায় গেলে তো এই ফাহাদ চাচার জন্য সাহিত্য তার জানপাখির দিকে চোখই ঘুরাতে পারবে না।তাই আজ রাতটা অন্তত একটু শান্তিতে পার করুক সাহিত্য।ওদিকে সবাই টেনশনে ভুগছে তাতে সাহিত্যের কি?সাহিত্যের জানপাখি তার সাথে আছে সেটাই যথেষ্ট।
"অমন জানালার দিকে দেখে না থেকে আপনার ফোনটা বের করবেন কি!"
কল্পনার কথায় স্বাভাবিকভাবেই সাহিত্য তার দিকে ঘুরলো।মাসুম নজরে দেখতে লাগলো সে।কল্পনার রাগটা থেকে যেন হঠাৎই হাওয়া বেড়িয়ে গেল সাহিত্যের এমন চাহনি দেখে।এলোমেলো নজর ফেলে বলে উঠল মেয়েটা,
"আ-আপনার ফোনেও কি নে-নেটওয়ার্ক নেই?"
কিছু না বলে ঠোঁট উলটিয়ে ডানে-বামে মাথা নাড়ালো সাহিত্য।সেটাতে মুখে 'চ' বর্গীয়ে আওয়াজ করে মাথায় হাত চেপে বসলো কল্পনা।
এখন সময় আটটা পনেরো।এতক্ষণে হয়তো সবাই টেনশনে পড়ে সাহিত্য আর কল্পনাকে কল দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।কিন্তু তাদের ফোনে তো নেটওয়ার্কই নেই।
কল্পনা দাপিয়ে উঠে আরো একবার নিজের কথা চালালো,
"সাহিত্য ভাই গাড়িটা স্টার্ট তো করেন!দেখেন একটু এখান থেকে বের হওয়া যায় কিনা"
সাহিত্য স্টেয়ারিংয়ে কণোই ঠেকিয়ে রাখা হাতের তালুতে মাথার ভার দিয়ে তার প্রেয়সীর দিকে নজর দিয়ে রেখেছিল।এমন টেনশনে থাকলেও তার প্রেয়সীকে কত সুন্দর লাগে দেখতে।তবে কল্পনার কথায় হালকা বিরক্তির শ্বাস ফেলে গাড়ি স্টার্ট দিল।সাহিত্যের এখন উদ্দেশ্য গাড়িটা কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরাবে।নাহলে যদি কল্পনা সন্দেহ করে বসে?
খুবই হেলাফেলায় স্টেয়ারিংটা এক হাত দিয়ে ঘুরিয়ে গাড়ির চাকা চালালো সাহিত্য।কল্পনা তো তার ফোনে ব্যস্ত।যদি ক্ষণিক সময়ের জন্যও কোনো আশা থাকে নেটওয়ার্ক আসার।তবে সেটা যে আসবে না তা ভালো করেই জানা আছে তার।
কল্পনার ঝাড়ুনি,বকুনি ও খুত-খুতে কান্নায় ঘন্টা দেড়েক পার হতে চলল।কিন্তু সাহিত্য আর সঠিক রাস্তা খুঁজে পেল না।পাশে বসে থাকা প্রেয়সী যেটাই বলুক,আপাতত সব কথাই মধু রূপে ভেসে আসছে সাহিত্যের কানে।গত পাঁচ দিনেও তো মনে হয় কল্পনা এতো কথা বলেনি তার সাথে।আর সেই পিপাসা মনে হয় সাহিত্য আজ একদিনেই মিটিয়ে নিচ্ছে।
গাড়ির তেল আর নষ্ট করল না সাহিত্য।গাড়ি থামিয়ে স্টেয়ারিং থেকে হাত উঠিয়ে নিল।কল্পনা তো সিটে শরীর এলিয়ে দিয়ে মুখে শাল ঢাকা দিয়ে রয়েছে।সাহিত্যের গাড়ি থামার শব্দ শুনে কল্পনা শালের নিচ থেকে চোখ বের করল,
"এখন কি করব?"
কল্পনার প্রাণহীন কন্ঠের বিপরীতে সাহিত্য হামি তুলে শরীরের আড়মোড়া ভাঙতে লাগলো,
"আমার তো ঘুম পেয়েছে"
কপালে ভাজ ফেলে কল্পনা শালের নিচ থেকে বেড়িয়ে এলো,
"আপনার কি একটুও টেনশন হচ্ছে না?ওদিকে সবাই মনে হয় চিন্তায় পড়ে আছে,আর আপনি ঘুম নিয়ে পড়ে আছেন?"
"হ্যাঁ তো আমি কি করব?"
কল্পনা এতক্ষণ পর আবারো তেতে উঠল,
"আপনার জন্যই তো এতো কিছু হচ্ছে!একটু তো টেনশন করেন।এতো রাতে এই জঙ্গলে এমন থাকা যায়?যদি কোনো বন্য পশু গাড়ির উপর ঝাপিয়ে পড়ে?"
সাহিত্য শার্টের হাতা গুটাতে নিয়েই বলল,
"তোর সাহিত্য ভাইয়ের গাড়ি কি খেলনা গাড়ি নাকি?হাতি এসে লাফিয়ে বসলেও এই গাড়ির কিছু হবে না"
সাহিত্যের মুখে তার নিজের গাড়ির এতো সুনাম শুনে কয়েক মুহুর্ত কল্পনা ভাবলেসহীন দেখে থাকলো তার দিকে।অতঃপর পা জোড়া সিটের উপর তুলে গুটিয়ে নিয়ে জানালার দিক হয়ে বসল,
"এসব ফালতু কথা বলার দরকার নেই।তার থেকে ভালো ঘুমান আপনি"
সাহিত্য ঘুমের কথা বললেও আসল ঘুম পেয়েছে কল্পনার।গত রাতে তো ঘুমই হয়নি,আবার দীঘির পাড়েও তো অনেকক্ষণ হাটাহাটি করেছে।
শাল মুড়ি দিয়ে কেবলই চোখ বন্ধ করতে যাবে কল্পনা।এমন সময় সাহিত্যের ধীমি আওয়াজ ভেসে এলো।
"ধুর,গাড়িতে ব্যাক সিটও নেই।ব্যাক সিট থাকলে একটু সুবিধা হতো"
কল্পনার আধো বন্ধ চোখ যেন হঠাৎই কোটর ফাটিয়ে বেড়িয়ে আসতে লাগলো।ব্যাক সিট?হঠাৎ সাহিত্য ভাই ব্যাক সিটের কথা কেন বলছে?ব্যাক সিট থাকলে কি সুবিধা হতো তার?আর এমন সময়ই কেন সেই সুবিধা হতো?
নিজের মনের এতো ভাবনা দাবিয়ে রেখে কল্পনা যান্ত্রিকভাবে মাথা ঘুরালো,
"ক-কি বললেন?"
কল্পনার কন্ঠের ভাঙা স্বরে সাহিত্য কল্পনার মনের কথা ভালো করেই বুঝেছে।ধীরে-সুস্থে ঠোঁট বাকালো সে।ভারী কন্ঠে বলল,
"বললাম ব্যাক সিট থাকলে একটু সুবিধা হতো"
"ক-ক-কিসের সুবিধা?"
"আমাদের সুবিধা"
"মানে?"
"মানে বুঝছিস না?"
সাহিত্যের এবারের কথায় কল্পনা হাতে-পায়ে কেপে উঠল,
"কিসব অসভ্য কথা বলছেন আপনি!মাথা ঠিক আছে আপনার?"
সাহিত্যও এবার গলা বড় করে বলে উঠল,
"নষ্টা মাইন্ডেড মেয়ে,আমি ঘুমানোর কথা বলছি!ফ্রন্ট সিটে এমন করে ঘুমাতে পারবি?ব্যাক সিট থাকলে তোর সুবিধা হতো!"
কল্পনা যেন পুরো থতমত খেয়ে গেল।কি বলবে যেন কিছুই বুঝছে না।তবে কল্পনার প্রতিক্রিয়া করার আগেই সাহিত্য আবার বলল,
"মাথায় ঢুকেছে?নাকি এখনো ওসব উল্টা-পাল্টা জিনিস ঘুরছে মাথায়?"
কল্পনা পুনরায় লজ্জা পেয়ে বসলো।হুড়মুড়িয়ে আবারো জানালার দিকে ঘুরে ঘাপটি মেরে বসল সে।কাপা কন্ঠে সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বলেও উঠল,
"আ-আমার মাইন্ড একদম ঠিক আছে।আপনি কথাটা বলেছেনই অমন করে তো আমি কি করব!"
নিঃশব্দে আবারো হাসলো সাহিত্য।তবে তার পরবর্তী কথায় হাসির প্রভাব ভালো করেই বুঝা গেল,
"আচ্ছা বাদ দে,মজা করছিলাম।তোর কি আসলেই সমস্যা হচ্ছে?"
মাথা ঝাকালো কল্পনা,
"না না!"
কথার মাঝে লম্বা এক বিরতি পড়ল।সাহিত্য ফোনের মধ্যে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলতে নিয়ে কল্পনার দিকে নজর দিয়েছিল কয়েকবার।কল্পনার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।ঘুমিয়েছে হয়তো।সেটা মাথায় রেখেই সাহিত্য ফোন রেখে কল্পনার দিকে ঘুরে বসলো।কিছুক্ষণ আগে যে বেশ নড়ছিল,সে কারণেই হয়তো কল্পনার লম্বা চুলগুলোর কিছু গিয়ার লিভারটার উপর ছড়িয়ে আছে।
সাহিত্য বিনা বাধায় হাত বাড়িয়ে নাড়তে লাগলো সেগুলো।প্রেয়সীর কেশ আলতো হাতে ছুঁয়ে দিয়ে যেন হৃদয়ে বেশ শান্তি অনুভব করছে সে।
"সাহিত্য ভাই?"
জানালার দিকে মুখ আড়াল করে রাখা কল্পনার হঠাৎ কথা বলায় হালকা ভড়কালো সাহিত্য।তবে হাত প্রেয়সীর চুলে ব্যস্ত রেখেই মাথাখানা সিটে হেলিয়ে দিল।সুক্ষ্ম আওয়াজে উত্তর করল সে,
"হুম"
বেশ সময় নিয়ে বলল কল্পনা,
"আপনার মনে হয় বিয়ে করে নেওয়া উচিৎ"
কল্পনার মুখে হঠাৎ এমন সাহিত্যের বিয়ের কথা শুনে কপালে ভাজ পড়ল সাহিত্যের।হালকা ঠোঁট বাকিয়ে শুধালো,
"কেন?"
কল্পনা আবারো সময় নিয়ে বলল,
"আজ দুপুরে বড় মা-র কাছে শুনলাম।বড় মা আমাকে বলল যে......বড় বাবা নাকি আপনার বিয়ের কথা বলেছে"
হয়তো সাহিত্য কল্পনার আরো কিছু কথার অপেক্ষা করছিল।কিন্তু কল্পনার আর কিছু না বলায় ভারী শ্বাস ফেলে মুখ খুলল সে,
"আব্বু তো অনেক কিছুই বলে।ওগুলোতে কান দিস না"
"আমি শুধু বড় বাবার দিক থেকে বলছি না।আমার মনে হয়.....আপনার আসলেই বিয়ে করে নেওয়া উচিৎ।জীবনে তো সাকসেসফুল হয়েছেন।তো ভালো একটা মেয়ে দেখে এখন বিয়ে করা উচিৎ না?"
সাহিত্য বুঝে উঠল না যে কল্পনা ঠিক কি বুঝাচ্ছে।কল্পনা কি নিজের ও সাহিত্যের বিয়ের কথা বলছে?হতে পারে মেয়েটা এটা বুঝাচ্ছে যে,ফাহাদ শেখের কাছে কল্পনার হাত চাইতে।
কিন্তু কল্পনার পরবর্তী কথায় যেন সাহিত্যের ভ্রু জোড়া একদম নেতিয়ে গেল।
"বাড়িতে নতুন কোনো সদস্য এলে সবারই ভালো লাগবে।আমারো একটু আপনার বিয়ে খাওয়া হয়ে যাবে"
শেষের কথা বলে কল্পনা হাসার চেষ্টা করলেও যেন সম্ভব হলো না সেটা।বুকে যেন পাথর চেপে আছে তার।কি ভারী-ভারী কথাই না বলছে সে আজকে!আর সেটাও আবার নিজের মনের বিরুদ্ধে।সাহিত্য ভাইকে নিজের থেকে দূরে সড়ানোর এর থেকে ভালো বুদ্ধি আর কি হতে পারে।কল্পনাকে তো ফাহাদ শেখ এখনে বিয়ে দিবেন না।তাই সাহিত্যেরই বিয়ে করে নেওয়া উচিৎ।অন্তত কল্পনার থেকে দূরে সড়ে যাওয়ার জন্য হলেও।
কল্পনার কথার কোনো উত্তর দিল না সাহিত্য।অতঃপর কিছু মুহুর্ত পর এক কথা বলল,
"কল্পনা.....কোনো কারণে যদি চাচু আর আমার মাঝে কোনো একজনকে বেছে নিতে হয় তুই কার দিকে যাবি?"
সাহিত্যের কথায় কল্পনা চোখ-মুখ খিচে বন্ধ করে নিল।সাহিত্যের কথার মানে ভালো করেই বুঝেছে সে।বুক ফেটে যেন কান্না বেড়িয়ে আসছে তার।কিন্তু সেই কান্নাকে শক্ত করে বেধে উত্তর করল কল্পনা।সময় নিয়ে নিজেকে সংযত করে চোখ খুলল,
"সেটা নির্ভর করবে বিষয়টা কতটা যৌক্তিক।অযৌক্তিক কোনো বিষয় হলে আমি বাবার দিকেই যাবো"
প্রেয়সীর সোজাসাপটা এমন উত্তরে রাগে-দুঃখেই যেন চোয়ালটা শক্ত হয়ে এলো সাহিত্যের।তবে ছলছল চোখ প্রেয়সীর দিকে রেখেই কথা বলল সাহিত্য।তবে ভাঙনভাব স্পষ্ট সেই সুপুরুষের কন্ঠে,
"আমার কথা তোর কাছে অযৌক্তিক লাগে?"
এবার কল্পনা পর মুহুর্তেই বলে উঠল,
"অবশ্যই না!......কিন্তু....কিছু বিষয় আছে যেগুলো উপযুক্ত যুক্তি ধারণ করার পরেও অর্থহীন হয়ে উঠে।পরিস্থিতি সেই যুক্তিকে অর্থহীন বানিয়ে দেয়"
অবাক হলো সাহিত্য।পরপর হাসলোও একটু।তার জানপাখিটা আসলেই বড় হয়েছে।কি ভারী কথাটাই না বলল।সাহিত্যকে একদম চুপ করে দিয়েছে।
প্রেয়সীর চুল থেকে হাত সড়িয়ে নিল সে।সোজা হয়ে বসে দুই হাত দিয়ে মুখোমন্ডল ডলতে লাগলো।কল্পনা তার উত্তর দিয়ে দিয়েছে।সে কখনোই ফাহাদ শেখের বিরুদ্ধে গিয়ে সাহিত্যের কাছে আসবে না।সেটা ভাবতে নিয়ে নিঃশব্দে মেকি হেসে উঠল সাহিত্য।ফাহাদ শেখ আহমেদ মেয়ে বড় করেছেন একটা!নিজের জান বের হয়ে যাবে,তবুও পিতৃআজ্ঞা ছাড়বে না।
সাহিত্য কি আজ আবার হেরে গেল?এগারো বছর আগের কষ্ট যেন আবারো বুকে হানা দিচ্ছে সাহিত্যের।আর সেটার একমাত্র কারণ সেকালেও দুই শেখ আহমেদ ছিল,আর একালেও সেই,দুই,শেখ,আহমেদ-ই।
কল্পনা নিজের শেষ কথা বলে একদমই চুপ হয়ে গিয়েছে।কিন্তু সেই নিশ্চুপ অন্ধকারের আড়ালে যে মেয়েটা অঝোর চোখের পানি ফেলছে সেটা আর সাহিত্যের চোখে পড়ল না।কল্পনা নিজেও বুঝছে যে সাহিত্যকে সে আজ নিজের শেষ কথা শুনিয়ে দিয়েছে।কিন্তু এটা কি কল্পনার মনের আসল কথা?একদম না।নিজের হৃদয়ের আসল স্বচ্ছ কথা মেয়েটা তো কোনো দিন শুনেইনি।আর আজও সেটাই করল।সাহিত্যকে বহু দূরে ঠেলে দিল সে।যেই সাহিত্য ভাইয়ের জন্য হৃদয়ের কোনো এক অংশ মোচড় দিয়ে ওঠে বারংবার।তবে সেই অনুভূতি আজ মুখে না বলে চোখের নোনাজল দিয়ে বের করছে সাহিত্যের কল্পনা।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
পশু-পাখিরা যেমন সন্ধ্যা হতেই নিজেদের নীড়ে ঢুকতে পছন্দ করে তেমনই ভরবেলায় নীড় ছাড়ারও অভ্যাস আছে তাদের।তবে সাহিত্য তো সূর্য উঠার আগেই ঢাকার অন্দরমহলের উদ্দেশ্যে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছিল।অবশ্য এখনো ঢাকার তেমন ভিতরে ঢুকেনি।তাই তো ফাঁকা পিচ ঢালা রোডে সূর্যের মিষ্টি কিরণটা এসে রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনে আছড়ে পড়ছে।কুয়াশাটা তেমন ভারী নেই।যার দরুন হয়তো হালকা হাওয়া খেতেই সাহিত্য পাশের জানালার কাচ নামিয়ে রেখেছে।সকালের সেই বাতাস যেন শক্তভাবেই ছুঁয়ে দিচ্ছে সাহিত্যকে।কিন্তু সেই বাতাসের তোয়াক্কা না করে এনালগ ঘড়ি চাপানো বাম হাত দিয়ে দক্ষ হাতে স্টেয়ারিং ঘুরাতে ব্যস্ত সে।
প্রতিবারের ন্যায় আরো একবার কল্পনার দিকে চোখ বুলিয়ে নিল সাহিত্য।মেয়েটা গভীর ঘুমে তলিয়ে।তার পাশের জানালাটা পুরোটাই বন্ধ।কিন্তু সাহিত্যের দিক থেকে আসা বাতাসে তার সামনের কার্টেইন ব্যাঙ কাটের ছোট চুলগুলো সেই অনেকক্ষণ থেকেই মৃদু দুলছে।হালকা বাতাসে হয়তো কল্পনা প্রশান্তিই পাইছে।কারণ এখনো অব্দি মেয়েটা গভীর ঘুমে একবারও নড়ে উঠেনি।মাথা ও সাহিত্যের ব্লেজারের মাঝে দুই হাত রেখে দিব্বি ঘুমাছে।
সিটে মাথা রাখা কল্পনার দিকে আরো একবার নজর দিয়ে সামনে ঘুরলো সাহিত্য।আগে যতবারই কল্পনাকে এ অবস্থায় দেখেছে একটু হলেও ঠোঁট বাকিয়েছিল ছেলেটা।কিন্তু আজ সকাল থেকে সেটা আর হয়ে উঠছে না সাহিত্যের পক্ষে।
কাল রাতে চোখের পানি মুছেই ঘুমিয়ে গিয়েছিল কল্পনা।সাহিত্য প্রথম দিকে না বুঝলেও ক্ষণিক পরে ঠিকই বুঝেছিল যে কল্পনার চোখে পানিকণা জমেছিল।ঘুমন্ত প্রেয়সীর হালকা ভেজা চোখ দেখার পর থেকেই তো এমন হয়ে আছে সে।মুখটা কেমন অন্ধকার হয়ে আছে তার।ভারী মাথা ব্যথা নিয়েই যেন গাড়ি চালাচ্ছে এই মুহুর্তে।
কল্পনার ঘুমটা হালকা বাতাসে না ভাঙলেও,এখন হালকা রোদটা চোখে পড়ায় আর সইতে পারলো না সে।চোখের পাতা নড়িয়ে পিটপিট করে চোখ খুলল।সামনের আলো ঢাকতেই যেন বাম হাত দিয়ে আড়াল করল চোখগুলোকে।
কল্পনার নড়াচড়ায় পাশ ফিরল সাহিত্য।এতক্ষণ থেকে মুখোশ্রি গম্ভীর বানিয়ে রাখালেও কল্পনার চোখের সামনে যেন হাসি ফুটালো মুখে,
"হলো ঘুম?"
কল্পনার তো একদমই ঘুম হয়নি।এই সকাল-সকাল তার ঘুম পুরোন হওয়া অসম্ভব ব্যাপার।কিন্তু গাড়িতে আছে সেটা মাথায় রেখেই ছোট করে 'হু' বলল সে।এবং পর মুহুর্তেই সটান করে রাখা হাত-পায়ের আড়মোড়া ভাঙতে লাগলো।আড়মোড়া ভেঙে আবারো সাহিত্যের ব্লেজারে কেবলই মাথা গুজে দিয়েছিল সে।লম্বা শ্বাসটায় সাহিত্যের ব্লেজারের ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউমের ঘ্রাণ ঢুকতেই সেই সময় আবারো মনে পড়ল তার,যে সে গাড়িতে আছে।সেটা আবারো মনে পড়ার কারণটা হলো,গাড়িতে এমন সটান হয়ে শুয়ে সে আড়মোড়া ভাঙছে কেমন করে?টনক নড়তেই সাহিত্যের দিকে দৃষ্টি ঘুরালো কল্পনা।সেটাতেই যেন এতো ভারী ঘুমের রেশ গায়েব হয়ে গেল একদম।
সাহিত্যের কোলে কল্পনার দু'খানা পা-ই দেখা যাচ্ছে।বাম হাত দিয়ে স্টেয়ারিং ধরে থাকলেও সাহিত্যের ডান হাতখানা কল্পনার মেহেদী রাঙা পায়ের উপর আলতো করেই বসে রাখা।কল্পনার ঘুমের রেশ ভালো করে কাটতেই যেন সেই হাতের স্পর্শও এখন ভালো করে অনুভব হচ্ছে তার।কল্পনার পা-গুলো ঠান্ডা হয়ে থাকলেও সাহিত্যের হাতটা উষ্ণ অনুভব দিচ্ছে।কল্পনার পা জোড়া ঠান্ডা হয়ে আছে দেখেই মনে হয় সেই শুরু থেকেই ডান হাতটা আর স্টেয়ারিংয়ে নিয়ে আসেনি সাহিত্য।
এই হালকা শীতেও যেন কল্পনা হঠাৎই পুরো জমে গেল।পা দুটো যেন হঠাৎই অবস হয়ে এলো তার।ঘুমটা কেবলই ভাঙার কারণে কন্ঠের স্বর ভারী হয়েই আছে।সাথে এমন পরিস্থিতিতে যেন কথাই বের হতে চাইছে না।
কল্পনা শোয়া থেকে চট করেই উঠে বসলো।পা দুটো একটু টান দিতেই সাহিত্যের হাতখানা যেন আরো শক্ত করে চেপে ধরল তাদের।সেটাতে বেশ ভড়কালো কল্পনা।ভড়কানো নজর সাহিত্যের দিকে দিয়েও কোনো লাভ হলো না।কারণ সাহিত্য তো খুবই স্বাভাবিক ভংগিতে গাড়ি চালাচ্ছে।যেন কল্পনার পা তার কোলে থাকা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।তবে তার মুখোশ্রিতে কোনো অনুভূতি ফুটছে না।ড্রাইভ করতে নিয়ে যে কি ভাবছে ছেলেটা,কে জানে?
নজর লুকিয়ে কল্পনা এবার পা জোড়া কচলাকচলি করতে লাগলো।সেটাতে সাহিত্যের হাতের বাধন দৃঢ় হওয়া বৈকি আলত হলো না।নজর লুকানো অবস্থাতেই মিনমিনিয়ে উঠল কল্পনা,
"সাহিত্য ভাই.....আমার.....পাগুলো..."
কল্পনার কথা যেন সাহিত্যের কানেই ঢুকলো না।যেমন ছিল তেমনই গাড়ি চালাচ্ছে সে।কল্পনা অপেক্ষা করল কিছু মুহুর্ত।কিন্তু সাহিত্য না তার পা ছাড়ছে,আর না কোনো কথা বলছে।
কল্পনা আরেকদফা কিছু বলার জন্যই মুখ খুলেছিল।কিন্তু সাহিত্য নজর দিল কল্পনার মেহেদী রাঙা পায়ে।ভারী কন্ঠে মৃদু স্বরে বলল সে,
"তোর পাগুলো খালি-খালি লাগছে"
#চলবে
কল্পনার ১৬নাম্বার চিঠিটার কথা মনে আছে?আগামী পর্বে থাকছে সেটা🫠