ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৬৯তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৬৯

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

কল্পনা আরেকদফা কিছু বলার জন্যই মুখ খুলেছিল।কিন্তু সাহিত্য নজর দিল কল্পনার মেহেদী রাঙা পায়ে।ভারী কন্ঠে মৃদু স্বরে বলল সে,

"তোর পাগুলো খালি-খালি লাগছে"

কথাটা বলে আবারো সামনে নজর ফেলল সাহিত্য।নিজের কথা আর বলতে পারলো না কল্পনা।ভ্রু কুচকে সাহিত্যের থেকে নজর সড়িয়ে নিজের পায়ের দিকে দেখলো,

"কেন?মেহেদীটা তো সুন্দরই হয়েছে।আঙুল থেকে একদম গোড়ালি পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছেন।খালি কেন লাগবে?"

"আমি মেহেদীর কথা বলছি না"

সাহিত্যের ভারী কন্ঠে কল্পনা ক্ষণিক সময় দেখে থাকলো তার দিকে।হলুদের দিনেও সাহিত্য কল্পনার খালি পায়ের কথা বলেছিল।এই দুটো কথার উত্তর কি একই?

বেশি ভাবলো না কল্পনা।আসল কথা হলো,বেশি ভাবতে পারলো না।কারণ মেয়েলী নরম চিকন পা দুটোয় যে সাহিত্যের পুরুষালী শক্ত হাতের ছোঁয়া ক্ষণে-ক্ষণে কল্পনার শরীরে শিহরণ বয়ে দিচ্ছে।যার দরুন আবারো কল্পনা মিনমিনিয়ে উঠল,

"পা কেন কোলে নিয়েছেন?"

এবার সাহিত্য হাত সড়িয়ে স্টেয়ারিং ধরল।সেই সুযোগেই দ্রুত পা-গুলো নামিয়ে নিল কল্পনা।সাহিত্য নিজের হাত সড়ানোর পর মুহুর্তেই বলল,

"পা ভাজ হয়ে ছিল তোর।অসুবিধা হচ্ছে মনে করেই সোজা করে নিয়েছিলাম"

কল্পনা আর কিছু বলল না।হালকা মাথা নামিয়ে রেখেছে সে।সাহিত্যের হাতের ছোঁয়া যে এখনো পা দুটোতে অনুভব হচ্ছে তার।তবে সাহিত্য আবারো বলে উঠল,

"আম্মুর সাথে ফোনে কথা হয়েছে।জানিয়েছি আমরা সেফ আছি"

মনের হাসফাস ক্ষণিকের মাঝেই ভুলে সটান মাথা তুলল কল্পনা,

"আর প্রীতি?!"

কল্পনার দিকে ঘুরে ঠোঁট বাকালো সাহিত্য,

"প্রীতি এখনো রিসোর্টেই আছে।অনেক রাগ হয়েছে ও।তোকে অনেক ঝাড়ছিল সে"

গাড়ির সামনে রাখা বড় পার্স ব্যাগটা হাতে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ফোন বের করল কল্পনা।ফোনের স্ক্রিনে নোটিফিকেশন ভর্তি একদম।আর সেখানকার মধ্যে প্রীতির কলই বেশি ঢুকেছে।

কল্পনার ভালো করেই জানা আছে এখন প্রীতিকে কল দিলে প্রীতির গরম কথায় ফোনই গরম হয়ে উঠবে।কিন্তু উপায় না পেয়ে ভয়-ভয় করেই কল লাগালো।

দু'বার রিং হতেই রিসিভ হলো কলটা।অতঃপর বজ্রকন্ঠে ঝাজিয়ে উঠল প্রীতি,

"এই হারামি!!এই শাকচুন্নি!তোকে আমি আজকে মেরে ফেলব।শুধু বাসায় পৌঁছাতে দে আমায়।তোর বাসায় গিয়ে তোর মা'ডার করে আসবো আমি।তোর কারণে অকালেই চুল পেকে ঝরে পড়বে আমার।এতো টেনশন দিতে পারিস তুই!ফাহাদ আঙ্কেল তোর নাম্বার বন্ধ পেয়ে আমাকে কতবার কল করেছে জানিস!ঘুরতে যাবি তো তোকে নিষেধ করেছে কে?তোর সাহিত্য ভাইকে নিয়ে তুই মঙ্গল গ্রহে যা,আমার কোনো সমস্যা নেই।কিন্তু যাওয়ার আগে বলে তো যাবি!ফাহাদ আঙ্কেলকে কত কি বলে শান্ত করেছি আমি,জানিস তুই!!থ্যাংক গড যে আঙ্কেল বিশ্বাস করে নিয়েছে যে আমরা ট্রাফিকে আটকে গিয়েছি আর তুই আমার পাশে মরার মতো ঘুমাচ্ছিস।আমার তো খুব বলতে ইচ্ছা করছিল যে তুই তোর সাহিত্য ভাইয়ের সাথে হানিমুনে গিয়েছিস!!ফাহাদ আঙ্কেল আমাকে কতটা বিশ্বাস করে জানিস!আঙ্কেল যদি জানতে পারে যে গত কয়েকদিন থেকে আমি তাকে শুধু মিথ্যার উপর মিথ্যা বলে যাচ্ছি তাহলে জিন্দা কবর দিবে আমাকে!কিন্তু মাথায় রাখিস!সেটা হওয়ার আগে তোর নাড়ীভুঁড়ি বের করব আমি"

প্রীতির হয়তো আরো কিছু বলার ইচ্ছা আছে।কিন্তু দম নেওয়ার জন্যই হয়তো থেমেছে সে।কল্পনা তো সেই ফোন রিসিভ হওয়ার পর মুহুর্তেই চোখ খিচে বন্ধ করে রেখেছিল।প্রীতির কথার বিরতির সুযোগ নিল সে।ছোট করে বলে উঠল,

"সরি।বুঝতে পারিনি এমন কিছু হয়ে যাবে"

"তোর সরি আফ্রিকায় ফিক্কা মার!!হার্ট অ্যাটাক দেওয়ার পর আবার সরি বলতে এসেছে!"

"তো কি করব আমি?ফোনের নেটওয়ার্ক চলে যাবে সেটাও তো বুঝতে পারিনি।....আর আমার গাড়ির ড্রাইভারের জিপিএস যে এতো ভালো সেটা তো আগে জানা ছিল না!"

শেষের কথা বলতে নিয়েই আড় চোখে সাহিত্যের দিকে দেখলো কল্পনা।দেখা মিলল সাহিত্যের নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে সুক্ষ্ম হাসির।এবার ভালো করে সাহিত্যের দিকে ঘুরে তেতে উঠল সে,

"একদম হাসবেন না!আপনার জন্য আমাকে কত কথা শুনতে হচ্ছে।এখন বাবাকে কল দিয়ে আবার বাবার কথাও শুনতে হবে"

সাহিত্য তার হাসি না থামালেও প্রীতি এতক্ষণে ভারী শ্বাস ফেলল,

"আচ্ছা বাদ দে।তোরা ঠিক আছিস এটাই অনেক।আমেনা আন্টি আর লতিফা আন্টি তো অনেক টেনশন করছিল।পরে অন্ত..মানে অন্ত ভাইয়া যখন বলল যে সাহিত্য ভাইয়া তো আছেই তখন একটু শান্ত হয়েছে।আর কিছুক্ষণ আগে সাহিত্য ভাইয়ার সাথে কথা বলেই ঘুমাতে গেল"

"আর বাবা?...বাবা কি বলেছে?"

আবারো ভারী শ্বাস ফেলল প্রীতি,

"আঙ্কেলের সাথে কথা বলে আমি সব ঠিক করে নিয়েছি।তুই শুধু এখন আঙ্কেলকে কল দিয়ে বল যে ট্রাফিক ছেড়েছে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছাবো।আর বলিস যে ঘুম হচ্ছিল না দেখে ঘুমের ঔষধ খেয়ে একটু ঘুমিয়েছিলি তুই।ফোনে চার্জ ছিল না তাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।এখনে নাস্তা খেতে নেমে চার্জ করলি"

প্রীতির শিখিয়ে দেওয়া প্রতিটা কথায় মাথা দুলিয়ে গেল কল্পনা।আর সেটা দেখে আবারো মিটিমিটি হাসলো সাহিত্য।তবে সাহিত্যের সেই হাসি সম্পুর্ণ উপেক্ষা করে কল্পনা পরবর্তীতে কল লাগালো ফাহাদ শেখকে।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

শেখ ভিলা থেকে কিছু দূরে গাড়ি থামালো সাহিত্য।লাগেজ বের করে কল্পনার হাতে দিতেই কল্পনার যেন কিছু স্মরণে এলো।হাতের বড় পার্স ব্যাগটা যাওয়ার দিন লাগেজে নিলেও আজ সেটা হাতে রেখেছে সে।আর এখন সেই ব্যাগেই হাত ঢুকিয়ে কি যেন খুঁজছে মেয়েটা।সাহিত্য ভ্রু কুচকানোর পরপরই কল্পনা ব্যাগ থেকে হাত বের করে তার দিকে তাক করে ধরে,

"১৪ নাম্বার...আর...শেষ চিঠি"

কল্পনার মুখের হাসি দেখেও যেন সাহিত্য চুপ রইল।এতো তাড়াতাড়ি চিঠিগুলো শেষ হয়ে গেল?সেটা ভাবতেই ভারী শ্বাস বেড়িয়ে এলো সাহিত্যের ভেতর থেকে।তবে সেটা কল্পনাকে বুঝতে না দিয়ে হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিল সে,

"শেষ চিঠি কেন?১৫ নাম্বার চিঠিটা কই?"

"ওটা তো পড়েছেন আপনি।আবার পড়ে কি করবেন?তাই ওটা আর দিচ্ছি না"

এবার সাহিত্য তার অন্ধকার মুখোশ্রি কল্পনার নজরে নিয়ে এলো।শক্ত কন্ঠে শুধালো সে,

"কেন দিবি না?ওটাও লাগবে আমার।ইনফ্যাক্ট এখনই লাগবে"

সাহিত্যের কথায় বেশ ভ্যাবাচেকা খেল কল্পনা।অধর জোড়া সুক্ষ্ম কাপতে লাগলো তার।অতঃপর নজর নিচু করে আবারো ব্যাগে হাত ঢুকালো।সেদিন বাসা থেকে বের হওয়ার একদম আগ মুহুর্তে হেনা শেখের চোখের আড়ালে চিঠিগুলো ব্যাগে ঢুকিয়েছিল সে।নজর মায়ের দিকে রেখেই ড্রয়ারে হাত দিয়ে সব কাগজ তুলে ব্যাগে নেয়।তাই এই মুহুর্তে ব্যাগটাতে ১৫ নাম্বার চিঠিটাও থাকতে পারে।এবং হলোও সেটা।এক কোণে ফিনফিনে পাতলা খামটা পড়ে রয়েছে।

দ্বিতীয়বারের মতো সাহিত্যের দিকে খাম এগিয়ে ধরল সে,

"এই যে ১৫ নাম্বার চিঠি।আমার চিঠি দেওয়ার ডিউটি শেষ।আমার নামে আপনার কাছে আর কোনো চিঠি যাবে না"

মুখে হাসি ঝুলিয়ে কথা শুরু করলেও শেষের দিকে যেন প্রাণহীন হয়ে গেল সেই হাসি।সাহিত্য দেখে থাকলো তার প্রেয়সীর দিকে।আজ তো এমনিতেই মনটা খারাপ।তারউপর আজকের পর থেকে সাহিত্য আর কোনো চিঠিও পাবে না।এই দুঃখটারই যেন কমতি ছিল।তার প্রেয়সী কাছে আসার একমাত্র রাস্তাটাও আজ বন্ধ করে দিল।

কল্পনার হাত থেকে খাম নিতে নিয়ে মাথা নিচু করল সাহিত্য।অতঃপর মেকি হেসে উঠল।সাহিত্যের হাসির কারণ কল্পনা বুঝে উঠল না।আর আজ থেকে যেন সে বুঝতেও চাইবে না।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতেই যেন কল্পনা বলে উঠে,

"আপনি কি এখনই গাজিপুরে ফিরবেন?"

মাথা তুলল সাহিত্য,

"না।অফিসে গিয়ে একটু রেস্ট নিয়ে তারপর বের হবো"

কল্পনা কয়েক মুহুর্ত দেখে থাকলো সাহিত্যের দিকে।সময় নিয়ে বলে উঠল সে,

"সাবধানে যাইয়েন"

ছোট উত্তর সাহিত্যের,

"হুম"

আর দাড়ালো না কল্পনা।পেছনে ঘুরলো পা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে।সাহিত্যও আর দাঁড়িয়ে থাকলো না।গাড়িতে বসে সিটে মাথা এলিয়ে দিল।সুক্ষ্ম সময়ের জন্য নিজেকে সংযত করে কল্পনার ১৪ নাম্বার চিঠিখানা খুলল।

📜............................................................

আপনার অপেক্ষায় থাকলাম।

................................................................📜

তিন শব্দের বাক্যখানা পড়ে মেকি হাসলো সে।কিন্তু পর মুহুর্তেই মিলিয়ে গেল সেই হাসি,

"তোর কাছেই তো আমি আছি জানপাখি।তোর অপেক্ষা তো শেষ হয়েছে।কিন্তু তুই বুঝছিস না কেন?......তুই কি আমাকে তেমন ভালোবাসিস না যেমনটা আমি তোকে ভালোবাসি?আমাকে ছাড়া কি তুই এতো সহজেই থাকতে পারবি?....কিন্তু আমি যে পারবো না।আমার পক্ষে সম্ভব না।জীবন্ত লাশ হয়ে থাকবো আমি।তুই কি তোর সাহিত্য ভাইয়ের সেই অবস্থা সহ্য করতে পারবি?"

সাহিত্যের মন গহীনে থাকা এতো প্রশ্নের উত্তর সাহিত্য কখনই পায়নি।আর আজও হয়তো পেত না।কিন্তু অবশেষে হয়তো সাহিত্য তার সব প্রশ্নের উত্তর আজই পাবে।তার ভাগ্য যে অতটাও খারাপ না।

সিটের পাশে রাখা ১৫ নাম্বার চিঠিটার দিকে নজর পড়তেই সাহিত্যের ভ্রু জোড়া কুচকে গেল।মাথা ঝুকিয়ে চিঠির একপাশটা দেখতে লাগলো সে।আলতো করে হাতে নিল সেটা।চিঠির খামের হয়তো আঠা খুলে গিয়েছে।সেটা মনে করার পর মুহুর্তেই ভড়কে উঠল সাহিত্য।চিঠির খামের আঠা খুলেনি।দুটো খাম একসাথে লেগে আছে।

উপরের চিঠিটায় আবারো চোখ বুলালো সাহিত্য।১৫ নাম্বার চিঠি।তারিখের জায়গায় গত বছরের ১ অক্টোবর লিখা।এই চিঠি তো সাহিত্য কানাডায় থাকাকালীনই পড়েছে।তাহলে নিচের খামটা কোন চিঠির?

খুব সাবধানে দুটো খাম আলাদা করল সে।বুঝাই যাচ্ছে যে অনেকদিন একসাথে থাকার কারণেই পাতলা খাম দুটো একে-অপরের সাথে লেগে গিয়েছে।নিচের খামটার উপরের অংশটা অনেকটা ময়লা হয়ে গিয়েছে।কিন্তু সেগুলো উপেক্ষা করে তারিখের দিকে নজর দিল সাহিত্য।

কল্পনার দেওয়া গত ১৩টা চিঠির প্রতিটারই তারিখ খুব ভালো করেই স্মরণে আছে সাহিত্যের।প্রেয়সীর দেওয়া সুক্ষ্ম কাগজের যেন সবকিছুই মাথায় ধারণ করে রেখেছে সে।হাতে থাকা খামের উপরে যেই তারিখ দেওয়া সেই তারিখে কল্পনা সাহিত্যকে একটা চিঠি ইতোমধ্যেই পাঠিয়েছে।সাহিত্যের হিসেব অনুযায়ী ১১ নাম্বার চিঠি ছিল সেটা।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো বর্তমানে হাতে থাকা চিঠিটায় শুধু তারিখ লিখা।আর কোনো বিবরণ লিখা নেই।না সাহিত্যের কানাডার ঠিকানা,আর না কল্পনা যেখান থেকে পাঠিয়েছে সেই ঠিকানা।শুধু প্রেরকের জায়গায় "কল্পন" লিখে রাখা।বুঝাই যাচ্ছে,কল্পনা এই চিঠি সাহিত্যকে দিতে গিয়েও থেমে গিয়েছিল।

হঠাৎই সাহিত্যের হাত কাপতে শুরু করল।কি এমন লিখা আছে এই চিঠির মধ্যে,যে কল্পনা সাহিত্যকে না তখন এটা দিয়েছিল,আর না এখন দিতে ইচ্ছুক?সব চিঠিই দুবার করে লিখেছে কল্পনা,কিন্তু এই চিঠিতে এমন কি আছে,যে কল্পনা দুবার লিখার চেষ্টা করেনি?

একবার ভেবে বসলো সে,যে হতে পারে সেই ১১ নাম্বার চিঠিরই খসড়া।কিন্তু সাহিত্যের মন তো অন্য কিছুই চাইছে।যার দরুন আর দেরি করল না।ব্যস্ত হাতেই খামখানা খুলে ভেতরের কাগজটা হাতে নিল।অতঃপর ভাজ খুলে চোখ বুলালো সেথায়।

📜..............................................................

এই অষ্টাদশীর মনে প্রথমবার কোনো অনুভূতি জেগেছে।কেন জেগেছে,কখন জেগেছে জানা নেই আমার।কিন্তু এই অনুভূতি যে ভুল মানুষের জন্য জেগেছে তা আমি ভালোভাবেই বুঝছি।এতো বুঝার পরেও যেন নিজেকে ফিরিয়ে আনতে পারছি না সেই পথ থেকে।নিজের মনকে কিছুতেই বুঝাতে পারছি না যে,আমি যাকে চাই সে আমাকে ভালোবাসার নজরে নয়,বরং আদরের নজরে দেখে।আমার এই বেজায় অনুভূতির কারণে তার ওই আদরটুকু যে আমি হারাতে চাই না।কিন্তু....সেই আদর আর ভালোবাসা কি আমি একইসাথে পাওয়ার যোগ্য নই?হয়তো না।তাই তো এতো দূরে চলে গিয়েছেন আপনি আমার থেকে।কিন্তু তারপরও আপনার কল্পনা আপনার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে সাহিত্য ভাই।আপনাকে ছাড়া কিছু চিন্তাই করতে পারি না।আপনার সাথে কথা বলার জন্য যে কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে আমার।আপনাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে।আপনাকে নিয়ে আমার মনে কেমন অনুভব হয় সব খুলে বলতে ইচ্ছা করছে।সেটা না করতে পেরেই তো এই চিঠিটা লিখছি।জানি আপনি অনেক রাগ হবেন এই চিঠিটা পড়ে।হতে পারে আমাকে আর দেখতেও চাইবেন না।কিন্তু এই নতুন অনুভূতি একাই সামলাতে যে বড় হিমসিম খাচ্ছি আমি।মাঝে-মাঝে অনেক কষ্ট হয় আমার।এই অবাধ্য অনুভূতি সহ্য করা যে আর আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠছে না।

লেখনীতে,

আপনার কল্পনা

....................................................................📜

সাহিত্য যেন কিছু মুহুর্ত স্তব্ধ রইল চিঠিটা পড়ে।এই পাতলা কাগজে এতো ভারী কথা লিখা থাকবে সেটা হয়তো সাহিত্য কয়েক মুহুর্ত আগ পর্যন্তও জানতো না।দ্বিধা-দন্ধে ভুগতে থাকা সাহিত্যের চেয়ারায় এবার স্বস্তির আভাস দেখা দিল।ভ্রু জোড়া নেতিয়ে প্রেয়সীর চিঠির মৌখিক উত্তর দিল সাহিত্য,

"পাগল একটা।এই চিঠিটা তখনই আমাকে পাঠালে কি হতো?কানাডায় হয়তো পড়তাম না।কিন্তু পরে যখন চিঠিগুলো পড়া শুরু করেছি তখন তো পড়তে পারতাম।আমি কত টেনশনে ছিলাম জানিস!ভেবেছিলাম তুই আমাকে ভালোবাসিস না..."

কথা আর চালিয়ে রাখতে পারলো না সাহিত্য।চোখ থেকে অঝোরে জল গড়ার সাথে যে গলাটাও ভেঙে আসছে তার।একটামাত্র উপযুক্ত প্রেমপত্র লিখেছিল সাহিত্যের কল্পনা।আর সেটাও নাকি সাহিত্যকে পাঠায়নি।এতোটা পাষান কেমন করে হতে পারে এই মেয়েটা!সাহিত্যের উপর যেন একটুও মায়া-দয়া নেই।

ভেজা চোখেই আরো একবার চিঠিটা পড়ল সাহিত্য।হাসতে নিয়েই 'আপনার কল্পনা' লিখে রাখা জায়গাটায় অধর ছুঁয়ে দিল।এই একটামাত্র চিঠি,যেটার শেষের নামে কল্পনা তার আসল পরিচয় দিয়েছে সাহিত্যের কাছে।

এবার শব্দ করে হাসলো সাহিত্য।হাতের চিঠি দিয়ে নিজেকে বাতাস করতে নিয়েই বলল,

"এই চিঠি বাধাই করে রুমে সাজিয়ে রাখবো।আমাদের বাচ্চাকাচ্চাদের দেখাতে হবে তো,যে তাদের মা তাদের বাবাকে কতটা ভালোবাসে"

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

গাজিপুর থেকে ঢাকায় ফিরার আজ সপ্তাহ খানেক হচ্ছে।ডিসেম্বরের থেকে জানুয়ারি মাসে আবহাওয়াটা যেমন পরিবর্তন হয়েছে তেমন পরিবর্তন হয়েছে আরো অনেক কিছুর।যেমন কল্পনাকে বেশ কিছুদিন থেকে চুপচাপ লাগছে।ভার্সিটিতে এলেই প্রীতি সেটা খেয়াল করে।হয়তো সাহিত্যের সাথে কিছু হয়েছে।জানতে চাইলেও যেন কিছু বলে না।কিন্তু প্রীতি তো তার বান্ধুবীর মনের কথা ভালো করেই বুঝে।তবে কল্পনাকে বুঝানো এবার প্রীতির সাধ্যের বাইরে চলে গিয়েছে।প্রীতির বুঝানো যেন আর কোনো কাজেই আসে না।কল্পনার দিকটা যেমন পরিবর্তন হয়েছে তেমন পরিবর্তন হয়েছে প্রীতির ক্ষেত্রেও।তবে একটু ভিন্ন ধর্মী।

শক্ত মেয়েটা কোনো এক পুরুষের কারণে যেন হঠাৎই কোমল হতে শুরু করেছে।ফোনের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত কোনো ব্যক্তির ম্যাসেজ দেখলেই হালকা হাসি ফুটে তার ঠোঁটে।তবে দুদিন থেকে যেন প্রীতির ফোনে সেই কাঙ্ক্ষিত নাম্বার থেকে না কোনো কল আসছে,আর না কোনো ম্যাসেজ।রগচটা মেয়েটা তাই রাগ করে নিজেও আগ বাড়িয়ে আর ম্যাসেজ দেয়নি।কিন্তু ফোন হাতে থাকলেই যে মনটা আকুপাকু করে সেই নাম্বারে যোগাযোগ করতে।যেমন এই মুহুর্তে ফোনে সেই কাঙ্ক্ষিত নাম্বারের দিকে নজর রেখেই ভার্সিটির সদর গেট পার করল প্রীতি।

ম্যাসেজে টুংটাং করে কিছু লিখে থেমে থাকলো কিছুক্ষণ।অতঃপর না পাঠিয়ে ডিলেট করে দিল।দুদিন থেকে সে খোঁজ-খবর নেয়নি তো প্রীতি কেন আগ বাড়িয়ে যাবে?নিজের রাগে মত্ত থেকে মাথাটা কেবলই উঠিয়েছিল।তবে থমকালো পর মুহুর্তেই।যাকে নিয়ে এতো কল্পনা-জল্পনা সে তো খানিক দূরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।

রাস্তার বিপরীতে কালো মোটরসাইকেলে এক সুদর্শন যুবক হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে।পড়নে তার হালকা কফি রঙা শার্ট আর কালো ডেনিম প্যান্ট।মাথাটা নিচু করে নজর হাতের ফোনে থাকায় উষ্কখুষ্ক চুলগুলো ভালোই নজর কাড়ছে।এতোটুকু পর্যন্ত যেন স্বাভাবিক ছিল।কিন্তু কাধে ঝোলানো গিটারের মস্ত বড় কালো ব্যাগটা থাকায় যেন কোনো রকস্টারের থেকে কম লাগছে না সেই যুবককে!

প্রীতির ঠোঁটে হঠাৎই মৃদু হাসি খেলে গেল সেই দৃশ্য দেখে।অন্ত তার আরেক হাতটা যে পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছে;সেটাতে যদি একটা সিগারেট ঝুলানো থাকলো তাহলে নির্দিধায় এক বখাটে যুবকের পদবি পেত সে।যে কিনা কলেজ-ভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েদের বিরক্ত করতে ব্যস্ত থাকে।কিন্তু এই ছেলে মেয়েদেরকে বিরক্ত করা তো দূরের কথা,মেয়েদের দিকে যে চোখ তুলে অব্দি দেখে না সেটা হয়তো কারো জানা নেই।এতো সুদর্শন ছেলের মাঝে এতো ভদ্রতা যে বেশ দুর্লভ।

প্রীতি একবার চিন্তা করল অন্তর দিকে যাবে না।কিন্তু গত দুদিন থেকে যেন হাসফাস লাগছে তার।তাই তো উল্টো দিকে পা বাড়াতে গিয়েও যেন থেমে গেল।অন্তর দিকে স্বাভাবিকভাবে এগুতেই ভেবে বসল,যাবে,দেখবে,চলে আসবে।কারণ প্রীতির রাগ এখনো ভাঙ্গেনি।

অন্তর সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত বুকে ভাজ করল প্রীতি,

"কল্পনা তো আজ ভার্সিটিতে আসেনি।তো আপনি এখানে কি করেন?"

হঠাৎ সামনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে অন্ত মাথা তুলল।তেমন ভড়কেনি ছেলেটা।ঘীয়ে রঙা চুড়িদার পড়া প্রীতির দিকে নজর রেখে পকেটে ফোন রাখতে নিয়েই বলল,

"আমি কল্পনাকে নিতে আসিনি তো"

"আচ্ছা ঠিক আছে"

কথাটুকু বলেই প্রীতি হাঁটা ধরল অন্যদিকে।এক পা সামনে বাড়িয়েছে অমনি অন্ত ভড়কে উঠল,

"আরে আরে!কই যাচ্ছো?"

প্রীতি থেমে গিয়ে মাথা পেছনে ঘুরালো,

"অন্য কারো জন্য অপেক্ষা করছেন,করেন।আমি অযথা ডিস্টার্ব কেন করব?"

প্রীতির চেহারায় এখনো হালকা রাগ মিশে আছে।সেটা বুঝতে পেরেই অন্ত ঠোঁট বাকিয়ে এগিয়ে এলো,

"যার জন্য অপেক্ষা করছি সে-ই তো চলে যাচ্ছে।তো আমার এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কি লাভ?"

প্রীতি কিছু বলল না।অন্তর দিক থেকে মাথাটা তো ঘুরিয়েছিল সেই কথা শেষ হতেই।প্রীতির কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে এবার কোমল কন্ঠে শুধালো অন্ত,

"রাগ করেছো কি?"

এবার প্রীতি অন্তর দিকে ঘুরে দাড়ালো।হালকা তেতে উঠল মেয়েটা,

"রাগ?ওটা আবার কি?খায় না মাথায় দেয়?আমি আবার রাগ করতে পারি?রাগ করলেও কি?কেউ আবার আমার রাগ ভাঙাতে আসে?দু'দিন থেকে কোনো খবর নেই।আমার কথা কি কারো একটুও মনে পড়ে না?"

প্রীতির এতো কথা সব হজম করে নিল অন্ত।অতঃপর ঘাড় কাত করে হিসহিসিয়ে বলল,

"সরি"

অন্তর এমন করে সরি বলায় ভড়কালো প্রীতি।এলোমেলো নজর ফেলতে লাগলো।অন্তর সাথে ঝগড়া করে বিন্দুমাত্র শান্তি পায় না সে।প্রীতির এতো কথায় চুপচাপ সরি বলে দিবে।তর্ক করা যে ছেলেটার স্বভাবে নেই।

প্রীতির চিন্তার মাঝেই অন্ত আবার বলে উঠল,

"কয়েকদিন পর মাস্টার্সের রেজাল্ট দিবে।তারপর জবে এপ্লাই করার জন্য যে কাগজপত্রগুলো লাগবে সেগুলোই একটু গুছিয়ে নিচ্ছিলাম।এতো ব্যস্ত ছিলাম যে সময় কোন পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে বলতেই পারি না.....আর এমন হবে না!আই প্রমিস।এটাই লাস্ট।সত্যি!"

অন্তর শেষের দিকে আকুতি প্রীতি যেন আর উপেক্ষা করতে পারলো না।তবে নিজের রাগকেও হার মানতে দিল না সে।অন্য দিকে নজর ঘুরিয়ে শুধালো,

"একটা টেক্সটও করা যেত না?"

মুচকি হাসলো অন্ত।প্যান্টের পকেটে হাত গুজে প্রীতির আরো একটু গা ঘেঁষে দাড়ালো।মাদকাসক্তপূর্ণ কন্ঠে বলে উঠল সে,

"আপনি আমাকে এতো মিস করেছেন?"

অন্তর এমন ভারী কন্ঠে হকচকিয়ে প্রীতি সামনে ঘুরলো।তবে অন্তর এতো কাছে দাড়ানোর ফলে ভড়কে উঠে পেছনে পড়ে যেতে নিল মেয়েটা।কিন্তু ঠোঁটের হালকা হাসি অক্ষুণ্ণ রেখেই প্রীতির কমোড়ের ভাজে হাত ঠেকালো অন্ত।হেচকা টানে নিজেকে সামলাতেই যেন প্রীতির হাত জোড়া গিয়ে ঠেকলো অন্তর কাধে।দুজনের চোখাচোখি হওয়ার কিছু মুহুর্ত পার হতেই হয়তো অন্তর হুশ ফিরল।নিজের কান্ড-কারখানায় চমকে উঠে প্রীতিকে ছেড়ে দিয়ে নজর লুকিয়ে কাশতে শুরু করল।প্রীতিও বেশ লজ্জা পেয়েছে।তবে হালকা হাসি দেখা দিল ঠোঁট জোড়ায়।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতেই অন্ত বলে উঠল,

"বাসা যাবে না এখন?চলো আমি দিয়ে আসি"

ঠোঁটের বড় হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করেই বলে উঠল প্রীতি,

"শশুরবাড়ির রাস্তা এখন থেকেই মুখোস্ত করছেন?"

প্রীতির কথা শুনে অন্তও হালকা হাসলো।কাধের গিটারের ব্যাগ প্রীতির হাতে দিয়ে মোটরসাইকেলে উঠতে নিয়েই বলল সে,

"শশুরবাড়ির রাস্তা মুখোস্ত আছে আমার।এখন শুধু শশুর আব্বার মেয়ের মনে যাওয়ার রাস্তা মুখোস্ত করতে হবে।শুধু অভিমান করে বসে থাকে শশুর আব্বার মেয়েটা"

অন্তর কথায় প্রীতি ফোত করে শ্বাস ছাড়লো।অতঃপর গিটারের ব্যাগটা হাতে ধরে মোটরসাইকেলে উঠতে নিয়েই বলল সে,

"গিটার কেন নিয়ে এসেছেন?"

"ওই তো,শশুর আব্বার মেয়ের মন গলাতে হবে না?তাই এতো বছর ধরে পড়ে থাকা গিটারের তার ঠিক করতে নিয়ে এসেছিলাম।আমার শশুর আব্বার মেয়েটা আবার আমার গলার গান শুনতে অনেক পছন্দ করে"

আর কিছু বলল না প্রীতি।গিটারের আড়ালে লাজুক হেসে অন্তর কাধে হাত ঠেকিয়ে দিল।

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন