#পর্ব_৭০
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
বছর ঘুরে সময় আবারো মার্চ মাসে এসে পড়েছে।শীত তো বিদায় নিয়েছে সেই কবেই।তার পাশাপাশি আবহাওয়া এখন গ্রীষ্মের দিকে এগুতে শুরু করেছে।যার দরুন গরমের আভাসটা একটু হলেও অনুভব করা সম্ভব আশপাশের পরিবেশে।আর সেই গরমের হালকা ঘাম শাড়ির আঁচলে মুছতে নিয়েই লতিফা শেখ সিড়ির দিকে এগুলেন।
রাত এখন বাজে ১২:৪০।এতক্ষণে রান্নাঘরের কাজ সাড়িয়ে রুমে ঢুকেন বাড়ির গিন্নিরা।কিন্তু আজকের রুটিন যেন ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়।হেনা শেখ ও ফাহাদ শেখ গিয়েছেন শিকদার বাড়িতে।কল্পনার নানা কায়েস শিকদার হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন।ফাহাদ শেখ ও হেনা শেখের সাথে দেখা করতে চেয়েছেন।কল্পনারও যাওয়ার কথা ছিল।কিন্তু ভার্সিটির পরীক্ষার জন্য হয়ে উঠেনি।
আজ বিকেলে কল্পনা ভার্সিটি থেকে এসে বলেছিল সে দেরি করে রাতের খাবার খাবে।হেনা শেখ নেই দেখে কল্পনাকে কান ধরে নিয়ে এসে খাওয়াতে বসাতে পারেননি লতিফা শেখ।কল্পনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে সে কারণে আমেনা শেখকেও নিজের ঘরে যেতে বলেন তিনি।কল্পনার জন্য যেহেতু খাবার দেরি করেই ফ্রিজে ঢুকাতে হবে,তাহলে লতিফা শেখই সেই কাজ করে নিবেন।কিন্তু লতিফা শেখ যেন সেই ১১টা থেকেই আটকা পড়ে আছেন কল্পনার কারণে।রাত বেশি ভারী হচ্ছে দেখেই তো এবার তিনি কল্পনার রুমের দিকে হাঁটা দেন।
লক ঘুরিয়ে রুমে ঢুকতে নিয়েই কল্পনার নাম ধরে ডাকলেন লতিফা শেখ।কল্পনার উত্তর না পেলেও বিছানায় কল্পনার দেখা মিলল।খয়েরী সালোয়ার-কামিজ পরিহিত মেয়েটা বিছানায় কেমন গুটিয়ে শুয়ে আছে।সিলিং ফ্যানটা চালু করেছিল ভেজা চুলগুলো শুকানোর জন্য।বাধন হারা চুলগুলো ক্ষণিক আগে শুকালেও এখন যে শরীরখানায় ঠান্ডা লাগছে তার।
বিভোরে ঘুমোতে থাকা কল্পনার দিকে এগিয়ে গেলেন লতিফা শেখ।হালকা আওয়াজে ডাকতে লাগলেন,
"কল্পনা...এই কল্পনা।খাবি না?খেয়ে ঘুমা...উঠ তো,খেয়ে নে"
কোনো সাড়াশব্দ নেই।এমনকি হালকা নড়েও উঠল না কল্পনা।লতিফা শেখ আরো একটু এগিয়ে কল্পনার গায়ে হাত দিলেন।ডাকতে যাবেন এমন সময় ভ্রু কুচকে গেল তার।কল্পনার বাহুর যেই জায়গায় তিনি হাত রেখেছেন সেই জায়গা অসম্ভব রকম গরম।পরপরই লতিফা শেখ তার হাতখানা কল্পনার কপাল ও গলায় ছুঁয়ে দেন।অমনি যেন আঁতকে উঠলেন তিনি।কল্পনার শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।জ্বরের তাপমাত্রা আঁচ করতে পেরে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন লতিফা শেখ।ঝুকে এসে কল্পনাকে হালকা ঝাকাতে নিয়েই ডাকতে লাগলেন।কিন্তু কল্পনা সুক্ষ্ম 'হু-হা' করা ছাড়া আর কিছুই করল না।
লতিফা শেখ উঠে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত দিলেন।কল্পনার সচরাচর জ্বর হয় না।কিন্তু একবার কাবু হয়ে গেলে খুবই বেহাল দশা হয়ে যায়।যেমন এই মুহুর্তে লতিফা শেখ কল্পনার শরীর ছুঁয়ে দক্ষ গিন্নির মতো বলে দিতে পারবেন যে কল্পনার জ্বর ১০৩° এর নিচে নেই।ভাতিজির এমন অবস্থা দেখে যেন ভয় করতে লাগলো তার।এখন এই মাঝ রাতে কি করবেন তিনি?হেনা শেখও তো বাসায় নেই।
কল্পনার দিকে দেখে চোখ-মুখ খিচলেন তিনি।বিড়বিড় করতে লাগলেন,
"কতবার করে বলেছি এই মেয়েটাকে যে দেরি করে গোসল করিস না।এখন হলো তো অঘটন!খাওয়া-দাওয়াও ঠিক মতো করে না সেটা।এখন কি করব আমি?"
কিন্তু লতিফা শেখ তো আর জানেন না,যে কল্পনা নিজের মনের দুঃখ সহ্য করতে না পেরেই এমন অনিয়মে চলে গিয়েছিল।আর সেই অনিয়মের পরিণতি জ্বর হয়ে উঠেছে।
শেষের কথা বলে হাতে শাড়ির আঁচল কচলাতে শুরু করলেন লতিফা শেখ।অমনি মাথায় বুদ্ধি আসতেই সাহিত্যের রুমের উদ্দেশ্যে দৌড় লাগালেন।
সাহিত্য আজ অফিস থেকে ফিরেছিল ১০টার দিকে।তাই তো রাতের খাবারটাও আজ বাইরে খেতে হয়েছে।অফিসের কাজ করে দেরি করে বাসায় ফিরলেও এখনো যেন ল্যাপটপ সামনে নিয়ে বসে আছে সে।কিন্তু হঠাৎই রুমের দরজায় ভারী কড়াঘাতে ভড়কালো হালকা।লতিফা শেখের কন্ঠ শুনে কুচকানো ভ্রু সোজা করে দরজার দিকে এগুলো।দরজা খুলতেই লতিফা শেখ বলে উঠলেন,
"ঘুমিয়েছিলি নাকি?"
"না।কেন?কি হয়েছে?"
এবার একটু চিন্তায় দেখা গেল লতিফা শেখকে,
"কল্পনার অনেক জ্বর এসেছে।ঘুমের মধ্যে এমন নেতিয়ে পড়েছে যে ডাকছি উঠছেও না।কি করব এখন?"
লতিফা শেখের কথার শুরুর দিকেই সাহিত্য চোখ জোড়া বড় করে 'কিহ!' বলে উঠে।আর এখন দৌড় লাগালো পাশের রুমে।
রুমে ঢুকে কোনো বাধা ছাড়াই কল্পনার গলদেশ-কপাল ছুঁয়ে দিল সাহিত্য।সেটাতে যেন ধক করে উঠল বুকের মাঝটা।হঠাৎ এতোটা জ্বর কেমন করে এলো সেটা ভাবতে নিয়েই কল্পনাকে নরম স্বরে ডাকতে লাগলো সে,
"কল্পনা..এই কল্পনা"
আবারো কল্পনার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।সাহিত্য তার সামনের ছোট চুলগুলো কানের পিছনে গুজে দিতে নিয়ে আবারো ডেকে উঠল,
"এই জানপাখি....বেশি খারাপ লাগছে?কথা বল একটু"
এবার কল্পনা ঘুমের মাঝেই হালকা খুত-খুত করে উঠল।কুকড়ানো শরীরটা আরো গুটিয়ে নিল।সাহিত্য মাথায় হাত বুলাতেই অস্ফুটস্বরে আওড়ালো সে,
"ঠান্ডা লাগছে.."
কল্পনার বলার পরপরই লতিফা শেখ ফ্যান বন্ধ করে এসে সাহিত্যের পাশে দাড়ালেন।তবে সাহিত্য আর মেঝেতে বসে থাকলো না।ঘুমে বিভোর কল্পনাকে উঠিয়ে কোলে তুলে নিল সে।বিছানায় বসেই কল্পনার মাথাটা নিজের বুকে হেলিয়ে দিল।কল্পনার শরীরের তাপে যেন এবার সাহিত্যেরও শরীর জ্বলতে শুরু করেছে।তবে সেটা সহ্য করে আবারো কোমল কন্ঠে শুধালো,
"ঠান্ডা লাগছে?এই তো আমি আছি।ঔষধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।একটু দাড়া..."
কথা বলতে নিয়েই সাহিত্য পড়নের ধুসর ট্রাউজারের পকেট থেকে ফোন বের করল।অতঃপর কল লাগালো মুহিত সাহেবকে।
লতিফা শেখ শুধালেন,
"এতো রাতে কাকে কল দিচ্ছিস?"
"মুহিত আঙ্কেলকে"
"রাত এখন ১টা বাজছে।ইমার্জেন্সি ছাড়া কল দেওয়া ঠিক হবে?"
"ইমার্জেন্সি দেখেই তো কল দিচ্ছি!"
সাহিত্যের শক্ত গলা আর লাল চোখ দেখে বেশ চমকালেন লতিফা শেখ।পর মুহুর্তে লক্ষ করলেন সাহিত্যের ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস।কল্পনার জ্বরের অবস্থা দেখে লতিফা শেখ এতক্ষণ যে হাসফাস করছিলেন সেটা যেন এখন সাহিত্যের হাসফাসের কাছে বেশ ফিকে লাগছে।সাহিত্যের রাগের কন্ঠ থেকে নিজেকে বের করে সামনে নজর দিলেন লতিফা শেখ।কপালে হালকা ভাজ পড়লেও ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি ফুটল তার।
সাহিত্য এক হাত দিয়ে ফোন কানে চেপে ধরে থাকলেও আরেক হাত দিয়ে কোলে বসে থাকা কল্পনাকে একদম আগলে ধরে রয়েছে।কল্পনার প্রতি সাহিত্যের এতো আদরের দিকটাতে যেন লতিফা শেখেরও একটু সন্দেহ হয়।ছেলেটা হয়তো বা কল্পনাকে পছন্দই করে।কিন্তু সেকথা কতটা সত্য সেটা ঠিক জানা নেই লতিফা শেখের।আর সত্য হলেও বা করার কিছু আছে?দুই মেরু কি আবার এক হওয়া সম্ভব এই শেখ ভিলায়?
সাহিত্যের হ্যালো বলে উঠায় লতিফা শেখ তার ভ্রম থেকে বেড়িয়ে এলেন।
"হ্যালো আঙ্কেল?"
সাহিত্যের ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে মুহিত সাহেবও হালকা ভড়কালেন,
"কি হয়েছে সাহিত্য?সব ঠিক আছে?এতো রাতে ক..."
"কল্পনার অনেক জ্বর এসেছে।আপনি কি এখন বাসায় আসতে পারবেন?"
মুহিত সাহেবের কথা শেষ না হতেই সাহিত্য নিজের কথা বলে উঠল।তবে মুহিত সাহেব হালকা স্বাভাবিক থেকেই শুধালেন,
"কল্পনার জ্বর এসেছে?ওকে চেকাপ না করে তো ঔষধও দিতে পারছি না.....আচ্ছা সাহিত্য,তুমি কি ওকে হসপিটালে নিয়ে আসতে পারবে?আমার নাইট ডিউটি চলছে তো।আমি হসপিটালেই আছি"
সাহিত্য পর মুহুর্তেই বলে উঠল,
"হ্যাঁ হ্যাঁ!সমস্যা নেই।আমি এখনই বের হচ্ছি"
কল কেটে সাহিত্য কল্পনাকে পাজা কলে নিয়েই উঠে দাড়ালো।সেটা দেখে লতিফা শেখ জিজ্ঞেস করলেন তাকে,
"কি বললেন মুহিত ভাই?"
"উনি হসপিটালে আছে,ওখানেই যেতে বলল"
"আমি অন্তকে ডেকে দেব?"
"না ওকে ডাকতে হবে না।আমি ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে যাচ্ছি।তুমি টেনশন করো না।কল্পনার ঔষধপত্র সব নিয়েই বাসায় ফিরব আমি।তুমি ঘুমিয়ে পড়ো...আর কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।অযথা সবাই টেনশন করবে"
দ্রুত কথা শেষ করেই দরজার দিকে পা বাড়ালো সাহিত্য।তবে দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে লতিফা শেখের দিকে দেখলো,
"ছোট চাচি,কল্পনার ওড়নাটা দাও"
সাহিত্যের ক্ষণিক আগের এতো দ্রুত কথায় থম মেরে ছিলেন লতিফা শেখ।হঠাৎ সাহিত্যের আবারো কথায় ভড়কালেন,
"হা?ওহ,দিচ্ছি দিচ্ছি!"
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
টুলে বসে দুই হাতের কণোই হাটুতে ঠেকিয়ে রেখেছে সাহিত্য।তবে ডান পা-টা ব্যস্তভাবেই মৃদু নড়ছে।অস্থির নজর তার সামনের বেডে শুয়ে থাকা কল্পনার দিকে।আশপাশের বাতাস স্বাভাবিক থাকা সত্বেও কপাল গড়িয়ে মোটা ঘামের কণা ছুটছে সাহিত্যের।কল্পনার এমন অবচেতন অবস্থা যেন আর সহ্য হচ্ছে না।
মুহিত সাহেব কল্পনার জ্বর মেপে আবারো একবার সাহিত্যের দিকে দেখলেন।নজর পুনরায় থার্মোমিটারে রাখতে নিয়েই শান্ত স্বরে বললেন তিনি,
"সাহিত্য...কাম ডাউন।কল্পনার শুধু জ্বর এসেছে।তেমন সিরিয়াস কিছু না"
টুলে বসার পর থেকেই সাহিত্য এমন চুপ মেরে আছে।মুহিত সাহেবের এবারের কথাতেও কোনো প্রতিক্রিয়া করল না সে।নজর এখনো অবচেতন কল্পনার ক্লান্ত চেহারাখানায়।প্রেয়সীর এমন অবস্থা যে সাহিত্যের কোনোকালেই সহ্য হয় না।তারউপর ভিকির বিয়ে থেকে ফেরার পর কল্পনা যেন সাহিত্যের নাগালেই আসছে না।সাহিত্যের সাথে অতি ভদ্রতার সাথে কথা বলে যাচ্ছে।আগের মতো না কোনো জ্বালাতন করে,আর না সাহিত্যের কাছে কোনো আবদার।সাহিত্যের মনের কথা বুঝতে পেরে যেন নিজেকে সাহিত্যের থেকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে চাইছে মেয়েটা।সাহিত্য তো এটারই ভয় করছিল।কল্পনা এমন কিছুই করবে সেটা ভালো করেই জানা ছিল তার।হঠাৎই যেন সবকিছু কেমন খাপছাড়া হয়ে উঠেছে গত এক মাসে।না সাহিত্য নিজের মনের কথা ভালো করে বলতে পারলো,আর না কল্পনাকে সেটার কারণ বুঝাতে পারলো।
"তোমার এখন প্রেসার মাপা হলে অনেক হাই দেখাবে,সেটা আমি এমনিতেই বুঝছি"
মুহিত সাহেবের এবারের কথায় নিজের ভাবনা থেকে বেড়িয়ে ভড়কে উঠেই তার দিকে নজর দিল সাহিত্য।কল্পনার হাতে ইঞ্জেকশন পুশ করতে নিয়ে মুহিত সাহেব আবারো শুধালেন,
"বললাম তো সিরিয়াস কিছু না।এতো টেনশন নিচ্ছো কেন?"
"সিরিয়াস কিছু না হলে এখনো সেন্স ফিরছে না কেন?"
সাহিত্যের শান্ত ভারী কন্ঠে ঠোঁট বাকালেন মুহিত সাহেব,
"কারণ এই ফাজিল ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া করে না।শরীর বেশি দুর্বল হয়ে গিয়েছে সেজন্য জ্বরে একদম কাবু হয়ে গিয়েছে সে"
সাহিত্য কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করল।মাথাটা ঝিম-ঝিম করছে তার।এতটুকু টেনশনই যেন নিতে পারছে না।তবে টেনশনটা যে শুধু এই মুহুর্তের বিষয়ে সেটাও না।আরো কত চিন্তায় ভুগছে ছেলেটা।আর সেগুলোর মধ্যে মুখ্য বিষয়টা হয়তো প্রেয়সীকে হারানোর ভয়।
মুহিত সাহেব এগিয়ে এলেন সাহিত্যের দিকে,
"আমি একটা এন্টিবায়োটিক দিয়ে দিয়েছি।কিন্তু ঔষধ না খেলে জ্বর কমবে না।ওকে কিছু খাইয়ে দিয়ে ঔষধ খাওয়াতে হবে"
মুহিত সাহেব অপেক্ষা করলেন সাহিত্যের প্রতিক্রিয়ার।কিন্তু সাহিত্য এখনো মাথা নিচু করে রয়েছে।সেটা দেখেই আবার বলে উঠলেন তিনি,
"সাহিত্য,আর ইউ অল রাইট?খারাপ লাগছে নাকি?"
লম্বা শ্বাস ভেতরে নিয়ে উঠে বসলো সাহিত্য,
"নাহ,ঠিক আছি আমি"
সাহিত্যের শরীর হয়তো ঠিক আছে।কিন্তু মনের দিকটায় একদম ঠিক নেই সে।কিন্তু সেটা তো আর মুহিত সাহেব বুঝবেন না।আর তাকে বুঝিয়ে লাভও হবে না।যাকে বুঝানোর সে তো সাহিত্যের নাগালেই আসছে না।
টুল থেকে উঠতে নিয়েই সাহিত্য শুধালো,
"ওকে কি এখানে হসপিটালেই রাখবো,নাকি বাসায় নিয়ে যাবো?"
মুহিত সাহেব ক্লান্ত শ্বাস ফেলে মুখের মাস্ক সড়ালেন,
"বাসায় গেলেই ভালো হবে।কিন্তু মনে করে ওকে কিছুক্ষণের মধ্যেই কিছু খাইয়ে ঔষধটা দিও।ঘুমের ঔষধও দিয়েছি তো,ঘুমটা হলে ভালো হবে।কাল আমি শেখ ভিলায় গিয়ে একবার দেখে আসবো নাহয়"
সাহিত্য আর কথা বাড়ালো না।স্বাভাবিকভাবেই কল্পনাকে কোলে তুলে নিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটা দিল।
ইঞ্জেকশন হয়তো এতক্ষণে তার কাজ শুরু করে দিয়েছে।কারণ কল্পনা পিটপিট করে চোখ খুলে সাহিত্যকে দেখতে লাগলো।সাহিত্যের নজর সামনে।কল্পনাকে কোলে নিয়ে লিফট থেকেই বের হলো সে এই মুহুর্তে।আশেপাশের লাইটের সাদা আলোয় চোখ নিভু-নিভু করে সাহিত্যকে কিছু মুহুর্ত দেখে থাকলো কল্পনা।অতঃপর অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,
"আপনি আমাকে কই নিয়ে যাচ্ছেন?"
এতক্ষণ পর কল্পনার মুখে কথা শুনে যেন একটু স্বস্তি অনুভব করছে সাহিত্য।হালকা ঠোঁট বাকিয়ে বলল সে,
"ডাক্তারের কাছে এসেছিলাম।এখন বাসায় যাচ্ছি"
"কিহ!ডাক্তারের কাছে কেন?.....আমি কি প্রেগনেন্ট!!"
কল্পনা এখন সজাগ থাকলেও কোনো সেন্স নেই তার।বেশি জ্বর হলেই মেয়েটা মাতালগুলোর মতো করতে শুরু করে।সেই বাচ্চাকাল থেকেই এমন জ্বর উঠলে সাহিত্যের মাথাটা একদম চিবিয়ে খাবে।আর পরের দিন সুস্থ হওয়ার পর বলে,'আমি তো কিছু করিনি।অমন তো কিছু মনে নেই আমার'।গরম মাথায় কি কি বলে নিজেও যেন ভুলে বসে সে।
কল্পনার ক্লান্ত শরীরে বলা শেষের কথা শুনে সাহিত্য ভড়কালো বেশ।তবে হাসতে নিয়েই বলল,
"তুই প্রেগনেন্ট কেন হবি?আমি তো কিছু করিইনি।এমনি জ্বর এসেছে তোর"
কল্পনা আর কিছু বলল না।এক হাত দিয়ে সাহিত্যের পড়নের কালো গেঞ্জিটার বুকের কাছেটা মুষ্টি বদ্ধ করল।অতঃপর ভদ্র বাচ্চার ন্যায় চুপটি করে মাথাটা এলিয়ে দিল বুকে।জ্বরের ঘোরে কি যেন চিন্তা করে আবারো আস্তে করে বলে উঠল কল্পনা,
"সাহিত্য ভাই...আমাকে নামিয়ে দিন...আমি হাটতে পারবো"
সরল উত্তর সাহিত্যের,
"আচ্ছা ঠিক আছে"
কল্পনার শুধু প্রশ্নের উত্তরটাই দিল সাহিত্য।তাকে আর নামিয়ে দিল না।বুকে মুখ গুজে ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়েই সাহিত্যের সাথে লেপ্টে রয়েছে,আবার বলছে তাকে যেন নামিয়ে দেয়।জ্বরের মধ্যেও যেন সাহিত্যের থেকে দূরে থাকতে চাইছে সে।তবে বেশ সময় পার হওয়ার পর সাহিত্য তাকে নামিয়ে না দিলেও কল্পনা আর তেমন তর্ক করল না।শরীরে তো কোনো শক্তিই নেই তার।
গাড়ির দরজা খুলে কল্পনাকে সিটে বসিয়ে দিল সাহিত্য।আর সে এক হাঁটু গেড়ে বসলো খোলা দরজাটার কাছে।কাত হয়ে সিটে হেলান দিয়ে তার দিকে দেখতে থাকা প্রেয়সীর সামনে।কল্পনার এক হাত আলতো করে মুঠে পুড়ে কোমলভাবেই বলল সাহিত্য,
"কিছু খেয়ে ঔষধ খেতে হবে।স্পেসিফিক কিছু খেতে ইচ্ছে করছে?"
সামনে বসে থাকা সাহিত্যের দিকে কল্পনা ক্লান্ত চাহনি নিয়ে ড্যাবড্যাব করে দেখে আছে।যেন কোনো অবুঝ শিশু।কিন্তু সাহিত্যের কথায় সময় নিয়ে না সূচকে মৃদু মাথা দুলালো সে।আবারো সাহিত্য কোমল কন্ঠে শুধালো,
"না করলে হবে?কিছু খেতে হবে যে"
কোনো প্রতিক্রিয়া না করে কল্পনা তার ড্যাবডেবে চাহনি সাহিত্যের দিকেই রাখলো।সেটা দেখে মুচকি হেসে উঠে দাড়ালো সাহিত্য,
"তুই গাড়িতে থাক,আমি ঔষধ আর খাবার নিয়ে আসি"
আবারো কোনো প্রতিক্রিয়া করল না কল্পনা।গাড়ির দরজা লক করে মেডিসিন কর্ণারের দিকে হাঁটা দিল সাহিত্য।ফিরে এলো ক্ষণিকের মাঝেই।ঔষধের সাথে প্যাকেটের মধ্যে একটা পানির বোতল আর বাটার বান নিয়ে আবারো কল্পনার দিকের দরজা খুলে দাড়ালো সে,
"জানপাখি...এদিকে ঘুরতো।এটা খেয়ে নিয়ে ঔষধটা খা"
সাহিত্যের এতো আদুরে ডাকে কল্পনা হালকা নড়ে উঠলো।এই সুযোগে তাকে ভালো করে বসিয়ে হাতের বাটার বানের প্যাকেটটা খুলে ধরল সাহিত্য।মুখে তেতোভাব থাকার পরেও সাহিত্যের জোরে মুখে একটু খাবার দিল কল্পনা।তবে সামান্য একটুই খেতে পেরেছে।চোখের পাতা বন্ধ রেখে যতটুকু খাওয়া সম্ভব।পেটে একটু দানাপানি যেতেই সাহিত্য ঔষধ খাইয়ে দিল কল্পনাকে।মেয়েটা যেন সোজা হয়ে বসতে পর্যন্ত পারছে না।তারপরও পানি খাওয়া মুখটা ভালো করে মুছে দিয়ে সাহিত্য ছুটলো ড্রাইভিং সিটের দিকে।এখন বাসায় গিয়ে একটু ঘুমালেই হয়তো আরাম পাবে মেয়েটা।
ঔষধ আনতে গিয়েই সাহিত্য লতিফা শেখকে কল করেছিল।কল্পনার তেমন কিছু হয়নি সেটা জানার পরও তিনি চিন্তায় আছেন।বলেছেন কল্পনাকে যেন তাড়াতাড়ি বাসায় নিয়ে আসে।ঔষধের পাশাপাশি মাথায় জলপট্টি দিয়ে দিলে জ্বর তাড়াতাড়ি নামবে।লতিফা শেখ যে আজ নিজের ঘুম হারাম করে কল্পনার কাছে বসে থাকবেন সেটা সাহিত্যের ভালো করেই জানা আছে।
ড্রাইভিং করতে নিয়ে কল্পনার দিকে চোখ পড়তেই সাহিত্য ভড়কে উঠল।জ্বরের মধ্যে কাপতে শুরু করেছে মেয়েটা।শরীরের পাতলা ওড়না দিয়ে কতটুকুই আর ঠান্ডা আটকায়।কপালে হাত ছোঁয়াতেই সাহিত্য মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে বসল।ঔষধ তো আর সাথে-সাথেই কাজ করা শুরু করবে না।একটু সময় নিবে বটে।কিন্তু সাহিত্যের চোখে যে কল্পনার যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না।এবার মনে হয় সাহিত্যকে নড়তেই হবে।
রাস্তার একপাশে গাড়ি থামালো সাহিত্য।অতঃপর বের হয়ে গিয়ে কল্পনার দিকের দরজা খুলে দাড়ালো।হাত বাড়িয়ে দিল কল্পনাকে কোলে তুলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে।তবে কল্পনা তার হাত দুটো একদম গুটিয়ে নেওয়ায় বেশ অসুবিধা হচ্ছে সাহিত্যের।যার দরুন আবারো নরম আওয়াজে কল্পনার উদ্দেশ্যে বলল সে,
"আমার গলাটা জড়িয়ে ধরতো,জানপাখি"
সাহিত্যের এবারের কথায় ভারী হয়ে থাকা চোখের পাতা উঠিয়ে কল্পনা নজর ফেলল সেদিকে।আবছা দৃষ্টিতে দেখা মিলল তার সাহিত্য ভাইয়ের।জ্বরের ঘোরে থাকার পরেও সাহিত্যের কথাটা তার কানে স্পষ্ট ভেসে এলো।সাহিত্য তাকে কেন নিজেকে জড়িয়ে ধরতে বলছে কল্পনার তা জানা নেই।কিন্তু এতো দিনে নিজের মনের কোণের সুপ্ত এক আকাঙ্ক্ষা সাহিত্যের মুখ দিয়ে বের হতে শুনে কয়েক মুহুর্ত দেখে থাকলো সামনের মাটিয়া-সবুজাভাব চোখ জোড়ার দিকে।অতঃপর গা থেকে পড়ে যাওয়া ওড়নার তোয়াক্কা না করেই দুই হাত সাহিত্যের দিকে বাড়িয়ে ধরল।যেন শুধুমাত্র সাহিত্যকে জড়িয়ে ধরলেই কল্পনার সব দুঃখ বিলীন হয়ে যাবে।
প্রেয়সীর এমন হাত বাড়িয়ে দেওয়া দেখে কোমলভাবে হাসলো সাহিত্য।পর মুহুর্তেই ঝুকে এসে কল্পনাকে পাজা কোলে তুলল।সাহিত্যকে হাতের নাগালে পেতেই যেন তার গলাটা আষ্টেপৃষ্টে ধরল কল্পনা।সাথে মুখটাও গুজে দিল সাহিত্যের গলদেশে।
প্রেয়সীর তপ্ত গরম ভারী শ্বাস অনুভব করতে নিয়েই সাহিত্য ড্রাইভিং সিটের উদ্দেশ্যে এগুলো।জ্বরে আক্রান্ত ক্লান্ত প্রেয়সীকে কোলে নিয়েই বসে পড়ল সিটখানায়।কল্পনার পা জোড়া গিয়ার লিভারের কাছে ভালো করে রেখে তার কমোড় থেকে হাত সড়ালো সাহিত্য।কিন্তু কল্পনার যেন কোনো হেলদোল নেই।এই যে সাহিত্যের গলায় মুখ ডুবিয়ে দিয়েছে,আর উঠার নাম নেই যেন।সেই চির পরিচিত ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউমের ঘ্রাণে নিজেকে যেন অনেক সুরক্ষিত মনে করছে মেয়েটা।যেই সুরক্ষিত স্থানকেই গত কয়েকদিন থেকে নিজের থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছিল।
ঠোঁটের হাসি সুক্ষ্ম বড় করে কল্পনার গরম হয়ে থাকা গালে আলতো করে আঙুল ছোঁয়ালো সাহিত্য,
"পানি খাবি?"
কল্পনা অস্ফুটস্বরে আওড়ালো,
"খাবো না"
পাশের সিটে পড়ে থাকা ওড়নাটা হাতে তুলে কল্পনার উপর দিতে নিয়ে আবারো বলল সাহিত্য,
"আচ্ছা ঠিক আছে।চল,বাসায় যাই"
এবার কল্পনা মাথাটাও জোরে ঝাকালো,
"বাসায় যাবো না আমি"
সাহিত্য স্টেয়ারিংয়ে কেবলই হাত দিয়েছিল।কল্পনার কথায় থেমে গিয়ে ভ্রু কুচকালো সে,
"কেন?"
"বাসায় আমাকে কেউ ভালোবাসে না?"
নিঃশব্দে হাসলো সাহিত্য।শুরু হয়ে গিয়েছে এই মেয়েটার আবোলতাবোল বকা।এখন কথার স্টেশন কই থেকে কই নিয়ে যাবে কে জানে।তবে সাহিত্য কল্পনার সাথে কথার তাল মিলালো,
"আমিও না?"
এতক্ষণ পর কল্পনা সাহিত্যের গলা ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসলো।জ্বরে লাল হয়ে থাকা চোখ সরু করে দেখতে লাগলো সাহিত্যের দিকে।কাঁদো গলায় বলতে লাগলো,
"আপনি তো সবার উপরে!আমাকে একটুও ভালোবাসেন না আপনি।আপনার কারণেই তো এতো কিছু হচ্ছে!আপনাকে ভুলতে গিয়েই ওই রাতুলের সাথে প্রেম করতে গিয়েছিলাম আমি।কিন্তু সেটা তো হলোই না বরং আরো ঝামেলায় পড়ে গিয়েছিলাম......অমন সবসময় মাথায় ঘুর-ঘুর করতেন কেন,হু?আমার ফিলিংস বলে কি কিছু নেই?সব দোষ আপনার!আমাকে শুধু জ্বালাতন করতেন আপনি।এখনো জ্বালাতন করেন!এতো দূরে সড়তে চাই,কিন্তু পারিই না।সবসময় অমন জানপাখি-জানপাখি করে ডাকেন কেন?কেন বুঝেন না,এমন কিছু সম্ভব না?আমি আপনাকে ভালোবাসতে পারবো না।বাবা-বড় বাবা কখনোই মেনে নিবে না।একটু তো বুঝার চেষ্টা করেন..."
কল্পনা তার পুরো কথাটাই কাঁদো গলায় বললেও শেষের দিকে হালকা ফুপিয়ে উঠল মেয়েটা।সাথে সাহিত্যের বুকে কিল-ঘুষি মারতে নিয়েই মাথা ঠেকিয়ে দিল সেথায়।
সাহিত্য স্তব্ধ রইল কিছুক্ষণ।জ্বরের ঘোরেই নাহয়,কিন্তু কল্পনা আজ নিজের মনের কথাটা তো বলেছে।এতোটা সাহস হয়তো সাহিত্যেরও কুলিয়ে উঠতো না।কিন্তু আগামী সকালে কল্পনার স্মৃতি সব ধোয়াশা হয়ে যাবে সেই কথা মাথায় রেখেই সাহিত্যও আজ পিচপা হলো না।
নিজের বুকে ঠেকিয়ে রাখা প্রেয়সীর মাথায় হাত রেখে শান্ত স্বরে বলল,
"এতো কথার মাঝেও তো প্রমাণ দিতে পারলি না,যে আমি তোকে ভালোবাসি না"
কল্পনা ফোপাঁতে নিয়েই সাহিত্যের বুকের গেঞ্জিখানা খামচে ধরল,
"প্লিজ....একবার বলেন...যে আপনি আমাকে ভালোবাসেন না।...একবার বলেন,আপনি আমাকে শুধু আদর করেন।তার বেশিকিছু না...তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে"
সাহিত্যের থেকে সেই উত্তর শুনতে চাওয়ার একটাই উদ্দেশ্য কল্পনার।নিজের মনকে বুঝানো,যে সাহিত্য ভাই তাকে ভালোবাসে না,তাই সে-ও যেন দূরে চলে আসে।কিন্তু সাহিত্য পর মুহুর্তেই তার উল্টোটা বলে বসলো।কল্পনার মাথায় আলতো করে অধর ছুঁয়ে দিয়ে বলল সে,
"আমার জানপাখিকে আমি অসম্ভব রকম ভালোবাসি"
এক ঝটকায় কল্পনা মাথা উঠালো।অতঃপর দুই হাত দিয়ে চেপে ধরল সাহিত্যের অধর,
"প্লিজ চুপ করেন!বলিয়েন না এসব।যেটা সম্ভব না সেটার পেছনে কেন পড়ে আছেন আপনি!"
কল্পনার হাতের নিচে চাপা হাসলো সাহিত্য।নরম হাত দুটো নিজের শক্ত হাত দিয়ে আলতো করে সড়াতে নিয়েই বলল,
"তুই চাইলে সব সম্ভব"
কল্পনার আধো বন্ধ শক্ত নজর এখনো সাহিত্যের দিকে।ডান চোখের নিচে হঠাৎই দেখা দিল এক পানি কণা।সাহিত্যের হাতের বাধনে নিজের হাত মোচড়াতে নিয়েই বলল সে,
"চাই না আমি"
"চাস না তো কাঁদছিস কেন?"
নাক টানলো কল্পনা,
"কই কাঁদছি?কাঁদছি না তো?"
ভ্রু জোড়া নেতিয়ে নিল সাহিত্য।অতঃপর কল্পনার মাথা দুই হাতের মাঝে আবদ্ধ করে কপাল ঠেকালো তার কপালে।সেটাতে বাধা দিল না কল্পনা।বরংচ সাহিত্যের ছেড়ে দেওয়া হাত দুটো বসিয়ে দিল সাহিত্যের ধকধক করতে থাকা বুকের উপর।এবার সাহিত্যও ভারী শ্বাস ফেলতে লাগলো।ভাঙা গলায় বলল সে,
"জানপাখি.....একবার বল না...যে তুই আমাকে ভালোবাসিস"
অভিমানী সুর কল্পনার,
"বলব না"
"শুধু একবার"
"বললাম তো,বলব না"
"একবার...প্লিজ"
এবার সময় নিল কল্পনা।ভেঙে এলো তারও গলা,
"না বললে হয় না?"
"তোর মন যদি চায়,তাহলে বল"
সাহিত্যের কথা শেষ হওয়ার পর মুহুর্তেই কল্পনা আবারো সাহিত্যের বুকে মাথা ঠেকিয়ে দিল।এবার একদম কেঁদে উঠল মেয়েটা,
"বাবা মানবে না সাহিত্য ভাই"
কল্পনার এমন কেঁদে উঠায় কেপে উঠল সাহিত্যের ভারী শ্বাস।সাথে যেন হৃদয়েও রক্ত ক্ষরণ হতে শুরু করেছে।কিন্তু তারপরও ভারী ঢোক গিলে গলার জোর ধরে রেখে বলল সে,
"আমি মানিয়ে নিব"
কাঁদতে নিয়েই বলল কল্পনা,
"আপনি পারবেন না মানাতে"
"চেষ্টা তো করতে পারি"
"তারপরও হবে না"
"কেন বলছিস অমন করে?!"
মাথা তুলল কল্পনা,
"কারণ শুধু বাবা কেন,বড় বাবাও মানবে না!আর আমি ওদের কথার বিপরীতে যেতে পারবো না"
দুই হাতের মাঝে কল্পনার আদলখানা আবদ্ধ করল সাহিত্য।বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে চোখের পানিকণা মুছে দিতে নিয়েই শুধালো,
"তুই একবারও আমার পাশে দাড়াবি না,জানপাখি?"
সাহিত্য চোখের পানি মুছে দেওয়ার পরেও যেন কাজ হলো না।কল্পনার চোখ থেকে আবারো ভারী পানিকণা গড়িয়ে পড়তে লাগলো,
"এবার বাবা-বড় বাবা আলাদা হলে দাদি সহ্য করতে পারবে না"
রাগে ফুসতে নিয়ে ঝাজিয়ে উঠল সাহিত্য,
"তাই বলে নিজের দিকে একবারও দেখবি না??"
সাহিত্যের বড় গলায় কল্পনা নজর নিচু করল।অতঃপর ডানে-বামে মাথা ঝাকালো সে।সে বুঝালো,যে সে নিজের দিকে একবারও দেখবে না।ভারী শ্বাস ফেলল সাহিত্য।আবারো ভেঙে এলো সে।শক্ত চোয়াল নরম করে মাথা ঠেকিয়ে দিল কল্পনার মাথায়,
"এমন করিস না তো জানপাখি।মরে যাবো আমি"
জ্বরের ঔষধের সাথে যে ঘুমের ঔষধ ছিল,সেটা হয়তো কাজ করতে শুরু করেছে।চোখ জোড়া খুলে রাখতে পারছে না কল্পনা।তারপরও অস্ফুটস্বরে বলল,
"আপনি একবার বুঝার চেষ্টা করুন...ভুলে যান এসব..কয়দিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে"
সাহিত্য আরো শক্ত করে কল্পনার মাথার সাথে নিজের মাথা চেপে ধরল,
"পারবো না আমি ভুলতে তোকে!তোর ব্যাপারে কোনো কম্প্রোমাইজ করব না আমি।তোকে ছাড়া থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না।'তুই' একবার বুঝার চেষ্টা কর না,জানপাখি আমার,প্লিজ!"
সাহিত্যের কথার উত্তর করল না কল্পনা।হাত-পা একদম ছেড়ে দিল সে।কল্পনার হঠাৎ এমন নেতিয়ে পড়ায় ভড়কালো সাহিত্য।তবে পর মুহুর্তেই বুঝতে পারলো,যে ঘুমে এমন নেতিয়ে পড়েছে।কল্পনার উত্তর না পেয়ে সাহিত্য একদমই চুপসে গেল।অতঃপর নেতিয়ে পড়া প্রেয়সীকে হাতের মাঝে আগলে নিয়ে আলতো করে কপালে অধর ছুঁয়ে দিল।বুকের মাঝটা যেন ফেটে যাচ্ছে সাহিত্যের।কল্পনা যেন একবারও বুঝার চেষ্টা করছে না তার মনের অবস্থা।বারংবার উপেক্ষা করে যাচ্ছে।এমন অবস্থায় যেন প্রেয়সীকে নিজের করে নেওয়া প্রায় অসম্ভব ঠেকছে সাহিত্যের কাছে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সকালের রোদটা ভালোভাবেই কল্পনার চোখে পড়ছে।কিন্তু সেটা যেন আজ জ্বালা করছে না তাকে।তাকে এই মুহুর্তে জ্বালাতন তো করছে মাথায় চলতে থাকা বেশ কিছু চিন্তা।লতিফা শেখ ক্ষণিক আগেই ঘুমোতে গেলেন।কল্পনার জ্বর এখন অনেকটাই কমেছে।সে সজাগ হওয়ার পরেও লতিফা শেখ এখানে থাকতে চেয়েছিলেন।কিন্তু কল্পনাই তাকে একটু ঘুমিয়ে নিতে বলে।
কোন চিন্তায় ডুবে আছে সেটা হয়তো কল্পনাও সঠিক জানে না এই মুহুর্তে।তেমন কিছু যে মনেই করতে পারছে না সে।ঘুম থেকে উঠার পর থেকে শুধু নিজের শরীরে সাহিত্যের ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউমের ঘ্রাণ পাইছে।সাথে কাল রাতের আবছা কিছু স্মৃতি।এতোটাই আবছা যে,কল্পনার শুধু স্মরণে আসছে যে সে ফুপিয়ে কাঁদছিল।জ্বরের ঘোরে যে কল্পনা অনেক কিছুই ভুলে বসে সেটা তার ভালো করেই জানা আছে।তাই তো টেনশন করছে মেয়েটা।সাহিত্য ভাইকে আবার উল্টা-পাল্টা কিছু বলে বসেনি তো?গত এক মাস চুপ করে থেকে একদিনেই কি সব বলে দিয়েছে নাকি?
ক্লান্ত শরীরে এসব ভাবতে নিয়ে যেন মাথা ব্যথাটা আবারো বাড়লো তার।শোয়া থেকে উঠে বিছানায় হেলান দিয়ে পানির বোতলে মুখ লাগালো কল্পনা।দরজায় কারো নক করার শব্দে নিজের পড়নের কাপড় ঠিক করে ক্লান্ত স্বরেই বলে উঠল,
"দরজা খোলা আছে"
সাহিত্যকে রুমে ঢুকতে দেখে হালকা ভড়কালো সে।ধীমি কন্ঠে শুধালো,
"আপনি অফিসে যান নি?"
কল্পনার প্রশ্নের উত্তর করল না সাহিত্য।এসে কল্পনার পায়ের কাছে বসে বলে উঠল,
"এখন কেমন লাগছে?"
নজর নিচু করে মাথা দুলালো কল্পনা,
"হুম।ভালো"
"জ্বর এখনো আছে?"
কথাটা বলতে নিয়েই কল্পনার কপালে হাত ছোঁয়ালো সাহিত্য।তাপমাত্রা স্বাভাবিক দেখে হাত বাড়িয়ে টেবিলে রাখা ঔষধগুলো হাতে নিল।প্রেসক্রিপশনে চোখ বুলাতে নিয়েই বলল,
"জ্বর কমেছে দেখে ঔষধ খাওয়া বন্ধ করিস না।বিকেলে মুহিত আঙ্কেল এসে দেখে যাবে"
সাহিত্যের কথায় কল্পনার কোনো খেয়াল নেই।সে তো তার আগের চিন্তা নিয়েই পড়ে আছে।সাহিত্য ভাইকে কি একটু জিজ্ঞেস করবে সে,যে কাল উল্টা-পাল্টা কিছু বলেছে নাকি?যদি বলে থাকে তাহলে এখন কিছু ভুলভাল বুঝিয়ে দেওয়া যাবে।কিন্তু কল্পনা যেন জিজ্ঞেস করারই সাহস পাইছে না।তবে এখনো শরীরে হালকা জ্বর থাকায় কাল রাতের মতো সাহস না থাকলেও সুক্ষ্ম পরিমাণের সাহস তো আছে।আর সেই সাহস নিয়েই কল্পনা বলে উঠল,
"সাহিত্য ভাই"
সাহিত্যের নজর হাতের প্রেসক্রিপশনে,
"হুম"
"কাল রাতে....মানে..আমি কি কিছু....উল্টা-পাল্টা কথা বলেছিলাম?"
সাহিত্যের হাত থমকে গেলেও নজর উঠালো না।কল্পনার চোখের আড়ালে হালকা ঠোঁট বাকালো সে।এতো ভারী জ্বরের কারণে যে কল্পনা সব ভুলে বসবে সেটা তো আগে থেকে জানতো সাহিত্য।কল্পনার কথায় সময় নিয়ে মাথা তুলল সে।লম্বা শ্বাস ফেলে স্বাভাবিকভাবেই বলল,
"কি উল্টা-পাল্টা কিছু বলবি?কাল রাতে হাফ ডেড হয়ে গিয়েছিলি তুই।ছোট চাচি আর আমি কত টেনশনে ছিলাম জানিস!কোলে করে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছি,কোলে করে নিয়ে এসেছি।দু'দিন পর মেঝো চাচি এসে যদি শোনে তোর এমন অবস্থা হয়েছিল তাহলে হাড্ডি থেকে মাংস ছাড়াবে"
কল্পনা চুপসে গিয়ে নজর নিচু করল।সাথে পড়নের ওড়নার মাথা কচলাতে লাগলো।মিনমিনিয়ে শুধালো সে,
"আমি কি করব?অমন জ্বর হবে আমার কি জানা ছিল সেটা?"
শক্ত হলো সাহিত্যের কন্ঠ,
"তুই কি করবি মানে?এতো অনিয়ম করিস কেন?আমিও নোটিস করেছি,প্রায় দিন বিকেল বেলা করে গোসল করিস.."
সাহিত্যের কথার মাঝেই কল্পনা টুপ করে মিনমিনিয়ে উঠল,
"ভার্সিটি থাকে যে"
হালকা ঝাজিয়ে উঠল সাহিত্য,
"একদম কথা বলবি না।নাহলে প্রতিদিন এমন কাজ করব যে সকালে বাধ্য হয়ে গোসলের জন্য ওয়াশরুম দৌড়াবি"
সাহিত্যের কথায় কল্পনা যতটা ভড়কালো সাহিত্যও ততটা ভড়কেছে।মাথা তুলে কল্পনা হকচকিয়ে বলল,
"কি করবেন?"
পরিস্থিতি সামলে পর মুহুর্তেই বলল সাহিত্য,
"ঝাটা পেছনে নিয়ে দৌড়ানোর কথা বলছি"
নাক-মুখ কুচকালো কল্পনা,
"ভার্সিটি যাওয়ার আগে অমন গোসল করা যায়?"
"তাহলে এর পর থেকে নিজেই আমার গাড়ি চালিয়ে হসপিটালে চলে যাস"
কল্পনা আরো বেশি নাক-মুখ কুচকালো।সাহিত্য উঠে দাঁড়িয়ে চোখ রাঙালো কল্পনাকে,
"যদি শুনেছি আবার জ্বর ধরেছে তাহলে খবর আছে তোর"
কল্পনা খুত-খুত করে উঠল,
"আমি কি ইচ্ছা করে জ্বর ধরিয়েছি?"
সাহিত্য ট্রাউজারের পকেটে হাত গুজে দরজার দিকে এগুলো,
"ধরাতেও পারিস"
সাহিত্যের সে কথায় নাকের পাটা ফুলালো কল্পনা।বিড়বিড় করে সাহিত্যের পিছনে কিছু কড়া কথাও হয়তো বলল।তবে সাহিত্য হেলতেদুলতে নিয়েই রুম থেকে বেড়িয়ে পড়ল।সেদিকে নজর রেখেই বোতল থেকে গটগট করে পানি খেতে লাগলো কল্পনা।আপাতত ঔষধের পাশাপাশি পানি খেয়েই তাড়াতাড়ি সুস্থ হওয়ার পরিকল্পনা করছে সে।
যেই হালকা রোদ এসে কিছুক্ষণ আগে কল্পনার চোখে-মুখে পড়ছিল,সেটা এখন অনেকটাই কড়া হয়েছে।সূর্য যেন মেঘের আড়াল থেকে বের হয়ে এতক্ষণে কড়া রোদ ঝরাতে ব্যস্ত।যা সবারই নজরে পড়তে বাধ্য।তবে সাহিত্য আর কল্পনার এই মুহুর্তের খুনসুটি কথা-বার্তার পেছনে যেন আড়াল হয়েই থাকলো গত রাতে বহিঃপ্রকাশ পাওয়া দুই হৃদয়ের ভারী অনুভূতিরা।যা শুধু সাহিত্যের কাছেই স্মৃতি হয়ে থাকবে আজীবন।
#চলবে
আপনাদের কি মনে হয়, #একখণ্ড_আসক্তি গল্পের নামটা শুধু সাহিত্য ভাইয়ের আসক্তের কারণে দিয়েছি আমি?একদমই না।কল্পনাও এই নামের সমান ভাগিদার😌
কিন্তু প্রতিটা বাঙালী মেয়ের মতোই কল্পনা নিজের মনের কথা না শুনে নিজের পরিবারের চিন্তা করতেছে।সাহিত্য তাকে 'ভালোবাসি' কথাটা বলায় নিজের ইচ্ছা থাকার পরেও কল্পনা উত্তর দিতে পারল না😅