#পর্ব_৭১
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
বৈশাখ মাসের আজ তৃতীয় দিনে আকাশের মেঘেরা যেন সূর্যের থেকে একটু দূরে-দূরেই থাকতে পছন্দ করে।নাহলে কি আবার শেষ দুপুরের দিকেও সূর্যের তাপটা এতো কড়া হওয়ার কথা ছিল?সেই তাপ হয়তো রাস্তায় হাটতে থাকা মানুষদের শরীর জ্বালা করতে পারে।কিন্তু বর্তমানে রাস্তার একপাশে ইঞ্জিন থামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মিনি মাইক্রো বাসের ভেতরের মানুষের শরীর জ্বালাতে সক্ষম নয়।তবে কেন জানি মাথার উপরে ছাদ থাকার পরেও মাইক্রো বাসের ভেতরের ছেলেগুলো দড়দড় করে ঘামছে।ঘামছে না শুধু সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে বসা নওশাদ।তার নজর তো আটকে আছে ফাঁকা রাস্তাটায়।যেই রাস্তায় খানিক দূরে দুই রমণী ধীর পায়ে হেটে তাদের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।
গাড়ির ব্যাক সিটে বসে থাকা সাগর সেই দুই মেয়ের দিকে নজর রেখে ভারী এক ঢোক গিলল।কপাল বেয়ে পড়তে থাকা ঘাম সম্পুর্ণ উপেক্ষা করে নওশাদের দিকে নজর ঘুরালো সে।অতঃপর কন্ঠের ভয় লুকানোর চেষ্টা চালিয়ে বলল,
"দোস্ত...আরো একবার ভেবে দেখ।কাজটা ঠিক হচ্ছে তো?"
পর মুহুর্তেই কিছু বলল না নওশাদ।কিন্তু চোখ জোড়া অদূরে মেয়ে দুটোর দিকে রেখেই দাঁত চিবিয়ে বলল,
"হ্যাঁ...একদম ঠিক হচ্ছে"
কড়া রোদের আভাসেই যেন পিচ ঢালা রোডগুলো থেকে ভ্যাপসা গরম উঠছে।কিন্তু সেই ভ্যাপসা গরম উপেক্ষা করে প্রীতি আর কল্পনা রাস্তায় হাটতে ব্যস্ত।ভার্সিটির ক্লাস শেষ করেই তো বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটা দিয়েছে তারা।তবে দু'জনের মধ্যে যেন কারো শরীরেই জোর নেই।এই গরমে শরীরে জোর থাকবেই বা কেমন করে?তারউপর দিনের বেলায় এই ৪টার দিকে যেন রাস্তাটা হঠাৎই বেশ ফাঁকা।অবশ্য এই গরমের জন্যই হয়তো সবাই বাসায় ঘাপটি মেরে রয়েছে।
আজ বেশ কয়েকদিন পর কল্পনার মনটা একটু ভালো দেখছে প্রীতি।পরীক্ষাগুলো শেষ হওয়ার পর যেমন প্রায়-প্রায় ভার্সিটি আসতো না সেই দিকটা এখন একটু ঠিক হয়েছে।মাঝখানে যেমন চুপচাপ থাকতো সেদিকটাও স্বাভাবিক হয়েছে।তবে সাহিত্যের ব্যাপারে কোনো কথা বলা একদমই বন্ধ করে দিয়েছে মেয়েটা।প্রীতি সাহিত্যের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করলে অন্য কথার ছলে সেদিকটা এড়িয়ে যায়।তাই তো প্রীতিও এখন কল্পনার কাছে সাহিত্যের ব্যাপারে কিছু বলে না।
তবে এই বিষয়টাতে প্রীতির বেশ খারাপ লাগে।এমনভাবে সবকিছু থেমে যাওয়া ঠিক হয়নি।কল্পনা ও সাহিত্যের দুজনেরই মনের অবস্থা কেমন সেটা প্রীতি একটু হলেও বুঝতে পারে।কিন্তু বুঝেও যেন কিছু করার নেই।বাধা তো কল্পনার দিক থেকেই।
তোফায়েল শেখ ও ফাহাদ শেখের কথা মাথায় আসতেই প্রীতি ফোস ফোস করতে লাগলো।কথার মাঝে প্রীতির এমন হঠাৎ ফুসে উঠা দেখে ভ্রু কুচকালো কল্পনা,
"তোর আবার কি হলো?কি নিয়ে রেগে উঠলি?"
হকচকিয়ে গেল প্রীতি।নিজের চেহারা স্বাভাবিক করতে নিয়েই বলল,
"আরে না না!তেমন কিছু না।একটু গরম লাগছে তো,তাই অমন করছিলাম"
কল্পনা সামনে ঘুরে আবারো নিজের কথা চালালে প্রীতি লুকিয়ে শ্বাস ফেলল।পর মুহুর্তে দুই শেখ আহমেদ বাদেও তৃতীয় শেখ আহমেদের ছেলের কথা মাথায় এলো তার।অন্তর ব্যাপারটা এখনো কল্পনাকে জানানো হয়নি।কিন্তু সেই কথা যেন তুলতেই পারছে না।কিছু না কিছু বাধা থাকছেই।তারউপর প্রীতিও বেশ তোতলাতে ধরে এ ব্যাপারে কল্পনার সামনে মুখ খুলতে গেলে।তাই তো এখন অব্দি বলতে পারেনি।তবে আজ এই শরীর জ্বালানো গরমের মধ্যে নিজের মনে শক্তি সঞ্চয় করল সে।কল্পনাকে আজ বলেই ছাড়বে।কল্পনার হাতে যদি কিল-ঘুষিও খায় তারপরও পুরো কথা বলবে।কারণ প্রীতির পক্ষে আর সম্ভব না কল্পনার কাছে এমন লুকিয়ে রাখা।প্রচন্ডরকম অনুতপ্ত বোধ করে মেয়েটা।তাই আজই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল।
কল্পনাকে কথার মাঝে থামিয়ে দিল প্রীতি,
"কল্পনা"
"হুম"
কল্পনা স্বাভাবিকভাবেই পাশ ফিরল।সেদিকে নজর দিয়ে ভারী ঢোক গিলল প্রীতি।তবে সাহস করে আবার মুখ খুলল,
"একটা কথা বলার ছিল"
"হ্যাঁ,বল"
"তুই রাগ করবি না তো?"
কপালে ভাজ পড়ল কল্পনার,
"কি এমন কথা বলবি যে রাগ উঠবে আমার?"
"না...তেমন বেশি রাগ উঠার মতো না।কিন্তু...মনে হয় রাগ উঠতেও পারে"
পা জোড়া থামিয়ে প্রীতির দিকে কিছুক্ষণ দেখে থাকলো কল্পনা।অতঃপর স্বাভাবিকভাবেই বলে উঠল,
"আচ্ছা বল দেখি,কি হয়েছে"
প্রীতি মাথা নিচু করে পড়ণের চুড়িদারের ওড়না কচলাতে লাগলো,
"আসলে....কেমন করে বলব...বুঝতে পারছি না...কেমন যেন লাগছে"
"হাই কল্পনা"
নিকটে এক মাইক্রোবাস থামার শব্দের পরপরই এক ছেলের হাসি মাখা কন্ঠ কানে এলো।কিন্তু প্রীতি মাথা তুলে যা দেখলো সেটাতে যেন ভয়ের এক স্তর পার করল সে।
কল্পনার মুখ খুলার আগেই মাইক্রোবাস থেকে সাগর নেমে কল্পনার হাত আর মুখ চেপে ধরে টান দিল মাইক্রোর ভিতরে।প্রীতির দিকে দেখে থাকা কল্পনার বড় আকারের চোখগুলো যেন মুহুর্তের মধ্যেই ঢাকা পড়ে গেল মাইক্রোর ভারী দরজার পেছনে।
"কল্পনা!!!"
চিৎকার দিয়ে উঠে হাত বাড়িয়ে দিল প্রীতি।কিন্তু নাগাল পেল না কল্পনার।সামনে নজর ঘুরাতেই প্যাসেঞ্জার সিটে বসে থাকা নওশাদের ঠোঁটের কুটিল হাসির দেখা মিলল।প্রীতির বাড়িয়ে দেওয়া হাত মাইক্রোর দারজায় ঠেকার আগেই সামনে এগিয়ে গেল গাড়িখানা।
সেকেন্ডের মধ্যে হওয়া এমন এক ঘটনার সম্মুখীন হয়ে ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়ে স্তব্ধ রইল প্রীতি।রাস্তায় পড়ে থাকা কল্পনার টোট ব্যাগটার দিকে দেখে থাকা নজর অসম্ভব রকম কাপছে তার।সেই কাপন পর মুহুর্তেই দেখা দিল তার হাত জোড়াতেও।নজর উঠিয়ে মাইক্রো বাসটার দিকে দেখলো সে।রাস্তার আশপাশটাতেও কোনো মানুষ নেই।নওশাদ হয়তো সেটারই সুযোগ নিয়েছে।
প্রীতি আশেপাশে নজর ঘুরিয়ে হয়তো কোনো মানুষকে খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছে।জোরে একটা চিৎকার যে দিবে সেটাও পারছে না।হঠাৎ এমন এক ঘটনায় যেন গলার স্বর বন্ধ হয়ে গিয়েছে তার।কিন্তু তারপরও হাল ছাড়লো না।কাপতে থাকা হাত জোড়া মুষ্টি বেধে চোখ খিচে বন্ধ করল।অতঃপর ভাবতে লাগলো এই সময় কোন জিনিসটা করলে বেশি ভালো হবে।....১০সেকেন্ড,ঠিক ১০সেকেন্ড পর হঠাৎই চোখ জোড়া খুলে নিচে পড়ে থাকা কল্পনার ব্যাগ থেকে কাপা হাতেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে কল্পনার ফোনটা বের করল।কল্পনার ফোনের পাসওয়ার্ড জানা এতোদিনে কাজে এলো প্রীতির।
হাত অসম্ভব রকম কাপার পরেও ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট থেকে সাহিত্যের নাম্বার বের করে কল লাগালো সেই নাম্বারে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
প্রতি বৈশাখে এতো কড়া রোদ ঝড়ার পরেও যেন সাহিত্যের কিছু যায়-আসে না।কারণ সে তো সারাদিন এসির মধ্যেই থাকে।সেটা অফিস হোক বা বাসা।যদি এই দুই জায়গায় পৌঁছানোর যাতায়াতের কথা বলা হয় তাহলে সে তো আরেক খানদানি ব্যাপার।রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনের এসিটা ধাই-ধাই করে ছেড়ে দিয়ে গাড়ি চালায় সে।আর সবসময় এমন এসিতে থাকার কারণেই হয়তো তার পছন্দের রয়েল নেভি ব্লু রঙা শার্ট পড়ে থাকে।যেমন আজ পড়ে রয়েছে।সাহিত্যের কাছে হয়তো এই রঙের বেশ কয়খানা শার্ট আছে।সেই ব্যাপারে তো সঠিক তথ্য শুধু সাহিত্যই দিতে পারবে।
বর্তমানে সাহিত্য তার রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনে চড়েই শেখ ভিলার উদ্দেশ্যে এগুচ্ছে।অফিসের মাথা ব্যথা উঠা কাজ সাড়িয়ে ক্লান্ত শরীরে কেবলই বাসায় ফিরছে সে।এতো বড় প্রশস্ত রাস্তাটা ফাঁকা থাকার পরেও যেন ধীরে-সুস্থে স্টেয়ারিং ঘুরিয়ে যাচ্ছে।আর সেই ধীরে-সুস্থে স্টেয়ারিং ঘুরানোর কারণেই হয়তো ফোনের দিকে নজর দিতে পারল।
বাজ-বাজ করে ভাইব্রেট হতে থাকা ফোনের স্ক্রিনে নাইটমেয়ার নামটা দেখে ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি ফুটল তার।কল্পনা আজ বেশ অনেকদিন পর সাহিত্যকে কল দিয়েছে।মেয়েটা এখন সাহিত্যকে ফোনেও কল দেয় না তেমন।গলা খাকাড়ি দিয়ে ফোন হাতে তুলল সাহিত্য।অতঃপর হালকা শ্বাস ছেড়ে কল রিসিভ করে কানে চেপে ধরল,
"হ্যাঁ জানপাখি,বল কি হয়েছে?"
"ভাইয়ায়া!!!!!"
কল্পনার ফোনে প্রীতির কন্ঠ শুনে চমকালো সাহিত্য।তবে প্রীতির চিৎকারে অবাক হলো বেশ।কপালে বড় ভাজ ফেলে শুধালো সে,
"কল্পনা কোথায়?আর তুমি এমন চিল্লাচ্ছো কেন?"
প্রীতি আগের বারের ন্যায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে কাঁদো গলায় বলল,
"ভাইয়া,কল্পনা কিডন্যাপ হয়েছে!আপনি তাড়াতাড়ি ভার্সিটির কাছে আসেন!"
পায়ের কাছের ব্রেকটা শক্তভাবেই চেপে ধরল সাহিত্য।গতি জড়তার ধাক্কা সামলে চেচিয়ে উঠলো সে,
"হোয়াট!!"
"আপনি তাড়াতাড়ি আসেন!মাইক্রো নিয়ে তারা বেশি দূরে যেতে পারেনি!"
সাহিত্য আর কথা বাড়ালো না।প্রীতির কাছে তার নির্দিষ্ট ঠিকানা নিয়ে কল কেটে দিল।শক্ত হাতে গিয়ার লিভার নড়াতে নিয়েই শক্ত চোয়ালে আওড়াল সে,
"কু'ত্তার বাচ্চা,তোর ভাগ্যে জা'হান্নামও জুটবে না আজকে"
এতো সুন্দর গাড়িখানা কেনার পর এই প্রথম মনে হয় তার আসল রূপ বের করল সাহিত্য।Vantage V12 মডেলের গাড়িখানা গর্জন তুলে ইঞ্জিন চালু হওয়ার সাথে-সাথেই দেখা দিল পেছনের সাইলেন্সার পাইপ থেকে বের হওয়া অগ্নিশিখারা।পরিবেশের তপ্ত গরমে নীল রঙা অগ্নিশিখারা রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিন গাড়িটার উপস্থিতি খুব ভালো করেই বুঝে দিচ্ছে।কিন্তু স্থির থাকলো না সেই গাড়ি বেশিক্ষণ।সাহিত্যের আদেশে রাস্তার ঘন পিচের সাথে ঘর্ষণ লেগে ঘুরতে লাগলো গাড়ির পেছনের চাকারা।অতঃপর সামনে এগিয়ে ছুটলো আলোর বেগে।আর সেই বেগ দেখেই বুঝা সম্ভব হলো,যে আজ সাহিত্য গাড়ির স্পিড মিটারের দিকে একদমই লক্ষ করবে না।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সাহিত্যের গাড়ি প্রীতির নজরে আসার পর মুহুর্তেই সে হাত নাড়িয়ে গলা উঁচিয়ে সাহিত্যকে ডাকতে লাগলো।গাড়ি থামার সাথে সাথেই প্রীতি তেড়ে গেল সেদিকে।সাহিত্যকে গাড়ি থেকে নামতে না দিয়েই ব্যতিব্যস্ত হয়ে প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলতে বলল।সাহিত্যের হাসফাস চাহনি উপেক্ষা করে কল্পনার টোট ব্যাগটা হাতে নিয়ে গাড়িতে চড়েই প্রীতি সাহিত্যকে তাড়া দিল গাড়ি সামনে এগুনোর জন্য।প্রীতির কমন সেন্সের ব্যাপারে ফাহাদ শেখ যেমন ভালো ধারণা নিয়ে রেখেছেন,তেমন সাহিত্যেরও ভালো ধারণা আছে।তাই তো প্রীতির কথা অনুযায়ী গাড়ি চালু করল সে।তবে পর মুহুর্তেই শক্ত কন্ঠে শুধালো,
"কই যাচ্ছি বলবা কি?!"
প্রীতি এক হাত বুকে রেখে নিজের বুকের ধুকপুকানি সামলাতে নিয়েই বলল,
"আপনি একদম সোজা গাড়ি চালিয়ে যান,আমি সব বুঝিয়ে বলছি"
সামনে ঘুরে হুংকার দিয়ে উঠল সাহিত্য,
"তাড়াতাড়ি বলো!!হচ্ছেটা কি!!"
সাহিত্যের হুংকারে সুক্ষ্ম কেপে উঠলেও প্রীতি হালকাভাবে শ্বাস ছেড়ে নিজের কাপতে থাকা গলা সংযত করে নিল।অতঃপর সাহিত্যের দিকে ঘুরে যতটুকু সম্ভব নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে বলতে লাগলো সে,
"নওশাদ কল্পনাকে কিডন্যাপ করেছে"
আবার হুংকার ছাড়লো সাহিত্য,
"এই কু'ত্তার বাচ্চা নওশাদটা কে!!"
প্রীতি চোখ-মুখ খিচে নিয়ে হালকা গলা উঁচিয়েই বলল,
"আমি কল্পনাকে বলেছিলাম সে যেন আপনাকে বলে!হলো তো এখন একটা অঘটন!"
সাহিত্যের দিকে দেখে আবারো ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়ে বলল প্রীতি,
"ওই হা'রাম'জাদা নওশাদের ডিটেইলস একটু পরে বলছি।আগে শুনুন আমাদের কোথায় যেতে হবে...সামনে কিছু দূরেই একটা কাজি অফিস আছে।আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর তারা ওখানেই গিয়েছে!"
সাহিত্যের শক্ত রাগের কন্ঠ যেন স্বাভাবিকই হতে চাইছে না,
"তুমি এতো শিওর কেমন করে?"
"কল্পনাকে কিডন্যাপ করে টাকা চাওয়ার মতো ছেলে নওশাদ না।এতোদিন থেকে সে ভার্সিটিতে যে কাজগুলো করে বেড়াচ্ছিল সেটা অনুযায়ী একটা কারণেই সে কল্পনাকে কিডন্যাপ করতে পারে.."
প্রীতি কথা থামিয়ে সাহিত্যের দিকে দেখলো।সাহিত্যও একই সময় প্রীতির দিকে নজর দিয়েছে।অমনি চেচিয়ে উঠলো প্রীতি,
"অমন করে কি দেখছেন!!ওই নওশাদ আপনার কল্পনাকে বিয়ে করার জন্য কিডন্যাপ করেছে!"
সাহিত্য চোখ-মুখ খিচে সামনে ঘুরলো।ভারী কন্ঠে বলল সে,
"ব্লাডি রাস্কেল"
"আমি কাজি অফিসটার রাস্তা চিনি।আমি বলছি আপনি গাড়ি চালান"
সাহিত্য বড়-বড় শ্বাস ফেলতে নিয়েই বলল,
"এখন ওই নওশাদের ব্যাপারে সব ক্লিয়ার করো তাড়াতাড়ি"
প্রীতি তার পড়নের চুড়িদারখানা খামচে ধরেছে।মনের মধ্যেই বলে উঠল,
'আল্লাহ মাবুদ,প্লিজ কল্পনাকে নিয়ে যেন ওই কাজি অফিসেই যায়।প্লিজ প্লিজ প্লিজ"
সাহিত্য আবারো হুংকার ছাড়তেই প্রীতি কেপে উঠে গত কয়েকমাসে নওশাদের করা প্রতিটা কথা বলতে লাগলো সাহিত্যকে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনটা কাজি অফিসের সামনে যেতেই প্রীতি চেচিয়ে উঠলো,
"ওই যে!ওই যে!ওইটা মাইক্রো বাস!"
প্রীতি নিজের কথা বলে স্বস্তির এক লম্বা শ্বাস ফেলল।নিজের ধারণা সঠিক হয়েছে দেখে আল্লাহর কাছে লাখো শুকরিয়া করল সে।কাজি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মিনি মাইক্রো বাসটা চোখে পড়তেই মাটিয়া-সবুজাভাব চোখ জোড়া লাল হয়ে উঠল সাহিত্যের।আর এক মুহুর্তও অপেক্ষা করল না সে।গাড়ির ব্রেক কষেই দরজা খুলে বেড়িয়ে দৌড় লাগালো।
সাহিত্যের ধাম করে লাগিয়ে দেওয়া দরজা থেকে নজর ঘুরিয়ে নিজের দিকের দরজা খুলার উদ্যোগ নিল প্রীতি।কিন্তু হাত বাড়াতেই যেন থমকালো মেয়েটা।সে তো সাহিত্যের গাড়িতে এই প্রথম উঠেছে।নরমাল গাড়ির থেকে অনেকটাই ভিন্ন এই গাড়ির জিনিসগুলো।নজর এদিক-ওদিক ঘুরিয়েও যখন কোনোকিছুতে হাত বসাতে পারলো না তখন কাঁদো গলায় চেচিয়ে উঠলো সে,
"এটা খোলে কেমনে!!"
এতক্ষণ থেকে কল্পনার টেনশনে থাকার পর এখন আবার এই সমস্যায় পড়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পাড়ল না।দুই হাত দিয়ে চোখ-মুখ ঢেকে ফুপিয়ে উঠল প্রীতি।
সাহিত্য বড়-বড় পা ফেলতে নিয়েই কাজি অফিসের দিকে এগুচ্ছে।হাতের ঘড়ি খুলে পকেটে রেখে নজর দিল পাশে থাকা মাইক্রোবাসের দিকে।ফাঁকা গাড়িটায় কেউ নেই।শার্টের হাতা গুটাতে নিয়েই ফুসতে লাগলো সাহিত্য।রাগের চটে গরম শ্বাসটাও থরথরিয়ে কাপছে তার।
কাজি সাহেব নওশাদের ঝাড়ুনিতে এতক্ষণ পর কাগজপত্রে বায়োডাটা লিখতে শুরু করেছেন।কল্পনার সব বায়োডাটা যেন পূঙ্খানুপুঙ্খ সংগ্রহ করেছে নওশাদ।সেটা দেখেই কল্পনা টেপ লাগানো বন্ধ মুখে আরো চিৎকার দেওয়ার চেষ্টা চালালো।তবে সেটা যেন ব্যর্থ।
ছোটখাটো কাজি অফিসটার দরজা থেকেই ভেতরের টেবিলখানা সাহিত্যের নজরে পড়ল।সাথে নজরে পড়ল উল্টো দিক হয়ে কাজি সাহেবের দিকে মুখ করে থাকা দুই ব্যক্তি।একটা চেয়ারে নওশাদ,আর পাশের চেয়ারে কল্পনা নওশাদের দিকে দেখে মোচড়া-মোচড়ি করে যাচ্ছে।কল্পনা নওশাদের একটু পাশ ফিরতেই সাহিত্যের চোখে পড়ল তার বেধে রাখা হাত-পা আর টেপ আটকানো অধর জোড়ার।
সাহিত্যের শার্টের হাতা গুটানো শেষ হতেই কাজি অফিসে প্রবেশ করল সে।কোনো দিকে না দেখে নিজের ভারী বলিষ্ঠ এক হাত দিয়ে নওশাদের মাথাটা সজোরে সামনের টেবিলে আছাড় মারলো।হঠাৎ সাহিত্যের এমন আক্রমণে উপস্থিত সবাই চমকে উঠেছে।কয়েক মুহুর্ত যেন বুঝে উঠল না যে কি হয়ে গেল।কল্পনাও বন্ধ মুখে গোঙ্গানো থামিয়ে সাহিত্যের দিকে নজর দিয়েছে।হঠাৎ সাহিত্যের আগমনে সে-ও অনেকটা চমকে গিয়েছে।
তবে সবাই এতোটা চমকানোর পরও কাজি সাহেব একটু কম চমকালেন।কারণ সাহিত্য যে শার্টের হাতা গুটাতে নিয়ে ভেতরে ঢুকছিল সেটা আড় চোখে লক্ষ করেন তিনি।কিন্তু সাহিত্য যে এমন বিনা বার্তায় নওশাদের মাথা ফাটাবে সেটা ধারণাতে ছিল না।তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো,আশেপাশের এতোগুলো হাট্টাকাট্টা যবুকরা থম মেরে থাকলেও কাজি সাহেব সাহিত্যের থেকেও দ্রুত নড়ে উঠেছেন।
গতকালই টেবিলের উপরে লাগানো নতুন কাচ বাঁচাতেই যেন পাশের এক মোটা ফাইল নওশাদের মাথা টেবিলে ঠেকার আগেই মাঝখানে ঢুকিয়ে দেন কাজি সাহেব।তাই তো নওশাদের মাথাটা আর টেবিলের কাচে লাগেনি।লাগলে হয়তো সেখানেই স্পট ডেড হয়ে যেত।
সাহিত্যের উপস্থিতি সবার মস্তিষ্কে ঠাহর হতেই এদিকে কাজি সাহেব ব্যতিব্যস্ত হয়ে সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,
"বাবা এখানে না!এখানে না!!দেয়ালে মারো!কালই নতুন কাচ সেট করা হলো"
নওশাদের অবস্থা খুবই নাজেহাল।হঠাৎ এমন আক্রমণে মাথা ঝিম ধরার সাথে-সাথে কানেও তালি লেগেছে তার।হাত-পা একদম ছেড়ে দিয়েছে সে।
কাজি সাহেবের কথা শেষ হওয়ার পর সাহিত্য আর দ্বিতীয়বার কিছু ভাবলো না।খামচে ধরল নওশাদের শার্টের কলারের পেছনটা।অতঃপর এক টানে চেয়ার থেকে উঠিয়ে আনলো তাকে।হাত-পা ছেড়ে দেওয়া নওশাদের মাথাটা এবার আছাড় মারলো দরজার পাশের দেয়ালে।পরপর দুটো আছাড় মারতেই যেন দেয়ালটা গিমগিম করে উঠল।সাগরসহ উপস্থিত বাকি দুই ছেলে কেবলই সাহিত্যকে আটকাতে এগিয়েছিল।কিন্তু সাহিত্যের বেগের সাথে তাল মিলাতে পারলো না তারা।সাগর চেঁচাতে নিয়ে এগিয়ে আসার আগেই সাহিত্য হাতের ময়লার মতো নওশাদকে কাজি অফিসের বাইরে ছুঁড়ে মারে।নওশাদ টাল সামলাতে না পেড়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেল রাস্তার পাশে।পড়ল একদম প্রীতির পায়ের কাছে।
প্রীতি এইমাত্র গাড়ির লক খুলতে পেরে দৌড় মেরেছে।কিন্তু হঠাৎ পায়ের কাছে এমন নওশাদকে দেখে হাতে-পায়ে চমকে উঠল সে।কিছু ভাবতে যাবে তার আগেই সাহিত্য জোর পায়ে এসে আবার নওশাদের শার্টের কলার ধরে দাড় করালো তাকে।নওশাদের দিকে অগ্নি বর্ণ চোখ জোড়া রেখেই কটমটিয়ে উঠলো,
"আমার কল্পনাকে বিয়ে করবি তুই?আমার কল্পনাকে??!!জান ভিক্ষা চাওয়ার মতোও অবস্থা রাখবো না"
সাহিত্যের এমন চেহারা দেখে প্রীতি ভয়ের চটেই যেন দুই ধাপ পিছিয়ে গেল।তার তো মনে হতে লাগলো সাহিত্য নওশাদকে ছিড়েখুঁড়ে কাঁচায় চিবিয়ে খাবে এখন।প্রীতি অন্তকে না ডেকে সাহিত্যকে ডেকেছিল এটা মনে করে যে,এমন পরিস্থিতিতে সাহিত্য ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।কিন্তু সাহিত্য যে কোনো কথা ছাড়াই এমন হিংস্র পশুর মতো মারধর শুরু করবে সেটা প্রীতির ধারণারও বাইরে ছিল।
#চলবে
নিচের ছবিতে আপনাদের সাহিত্য ভাই🫣