ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৭২তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৭২

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

সময়টা বিকেলের শেষ দিকে হলেও বৈশাখ মাসের কারণেই যেন শরীর জ্বালানো রোদখানা এখনো আছে।তবে ফাঁকা রোডের পাশে ছোট কাজি অফিসের সামনে উপস্থিত কয়েকজন যেন সেই হালকা শরীর জ্বালা রোদে মনযোগ না দিয়ে,মনযোগ দিয়ে রেখেছে জ্বালামুখীর মতো উত্তপ্ত হয়ে থাকা সাহিত্যের দিকে।

নওশাদ যেন হঠাৎ এমন আক্রমণটা সইতে পারেনি।অবশ্য সাহিত্য তাকে সুযোগটাই দিয়েছিল কই?যার ফলস্বরুপ ঘোলা চাহনি ও নিস্তেজ শরীর নিয়ে এখনো সাহিত্যের হাতের শক্ত বাধনে আটকে সে।সাহিত্য নিজের প্রেয়সীকে নিয়ে শেষ বার্তা হুংকার দিতেই সাগরসহ বাকি দুই ছেলে অশ্রাব্য গালি বলতে নিয়ে সাহিত্যকে পেছন থেকে আক্রমণ করতে লাগলো।কিন্তু এই হাট্টাকাট্টা ২৮ বছরের যুবকের কাছে পেছনের ২৫বছরের ছেলে তিনটার আক্রমণ যেন পিপড়া কামড়ানোর মতোই।

ইতোমধ্যেই নওশাদের নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ছুটতে শুরু করেছে।কিন্তু তারপরও ক্লান্ত হাতে সাহিত্যের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সে।সেটা দেখে ভয়ংকরভাবেই ঠোঁট বাকালো সাহিত্য।এমন সময় প্রীতি 'ভাইয়া!' বলে চেঁচিয়ে উঠার একদম পর মুহুর্তেই সাহিত্যের পিঠে ভারী এক ব্যাটের আঘাত পড়ল।সেটা দেখেই প্রীতি চমকে উঠে নিজের অধর জোড়া লুকালো হাতের পেছনে।

এতো মোটা একখানা ব্যাটের আঘাতেও সাহিত্য এক ইঞ্চিও নড়লো না।উলটো আরো ভাঙলো সেই ব্যাটখানা।সাহিত্য নিজের ঠোঁটের হাসি অক্ষুণ্ণ রেখেই ঘাড়খানা ডানে-বামে ফুটিয়ে নিল।অতঃপর নওশাদকে নিজের হাতে ধরে রেখেই ঘাড়খানা পেছনে ঘুরালো।নজর ফেলল হাতে ব্যাট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাগরের দিকে।

সাগর নিজের কাপতে থাকা নজর হাতের ভাঙা ব্যাট থেকে সড়িয়ে সাহিত্যের দিকে ঘুরাতেই থরথর করে কাপতে লাগলো।তারা হয়তো এখনো সাহিত্যের পরিচয়টা পায়নি।কিন্তু সাহিত্য যে আগামী কয়েক মুহুর্তে তাদের কিমা বানাতে চলেছে সেটা ভালো করেই বুঝলো তারা।

সাহিত্য সাগরের দিকে ঘুরে বিরক্ত নিয়েই শুধালো,

"হাতে জোর নেই?"

সাহিত্য হয়তো অপেক্ষা করল সাগরের মূল্যহীন উত্তরের।কিন্তু তারপরও সাগর কিছু না বলায় নওশাদকে ছুঁড়ে মারলো তাদের দিকে।অতঃপর হাতের আঙুল ফুটাতে নিয়েই সামনে এগুলো সে।

জীবনে প্রথমবার চোখের সামনে এমন মারধর দেখতে পেয়ে প্রীতি মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে।এই মুহুর্তে যেন প্রীতি একমাত্র সাক্ষী হয়ে দাড়াচ্ছে সাহিত্যের এমন দক্ষ হাতের কেলানির।সে বুঝে উঠল না যে সাহিত্য এতো ভালো করে পিটাতে পারেই বা কেমন করে?ঠিক যেন মুভির নায়কের মতো।কিন্তু প্রীতিকে এখন কে বলবে,যে সাহিত্যের শরীরে হঠাৎই কোনো মুভির নায়ক ভড় করেনি।ছেলেটা যে কানাডায় দেড় বছরের বক্সিং ট্রেনিং নিয়েছিল সেটাই কাজে লাগাচ্ছে।

সাহিত্য নির্দয়তার পরিচয় দিয়ে ছেলেগুলোর হাড্ডি ফুটাতে ব্যস্ত।অথচ প্রীতির নজর আটকে গেল সাহিত্যের ফ্লো কাটের চুলগুলোর দিকে।এতো নড়েচড়ে ছেলেগুলোকে মারার ফলে জেল দিয়ে সেট করা চুলগুলো জেলের বাঁধন ভেঙ্গে ভ্রুর সাথে ধাক্কা লাগছে।শার্ট-প্যান্টে আবৃত পুরো ফর্মাল গেটাপ ধারণ করে সামনের চার ছেলেকে ফাটিয়ে যাচ্ছে সাহিত্য।

হা হয়ে সেপাশে দেখে বিড়বিড় করে বলে উঠল প্রীতি,

"ইস,চুলের স্টাইল বিগরেছে তারপরও কত হট লাগছে"

সাহিত্য সাগরের মুখ বরাবর আরো একটু ঘুষি বসিয়ে দিতেই প্রীতি নিজের ভ্রম থেকে ধাক্কা খেয়ে বেড়িয়ে এলো।নিজের মাথায় গাট্টা দিয়ে আবার বিড়বিড় করে বলল সে,

"প্রীতিইই,চোখ বন্ধ কর।ওটা কল্পনার মাল।তোর মালটা জানতে পারলে তোরে পেদাবে ধরে"

নিজের অবস্থান ঠাহর করে এবার প্রীতি নড়ে উঠলো।সে এখানে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছে কেন?কল্পনা নিশ্চয়ই ভিতরে আছে।তার কাছে যাওয়া উচিৎ।সেকথা ভাবতে নিয়েই প্রীতি পা বাড়ালো কাজি অফিসের দিকে।অমনি সাহিত্য প্রীতির উদ্দেশ্যে হুংকার ছাড়লো,

"এই মেয়ে!!কই যাও?"

হাতে-পায়ে কেপে উঠল প্রীতি।সাহিত্যের দিকে ঘুরে কাজি অফিসের দিকে আঙুল তাক করে কাপা গলায় বলল সে,

"ক-ক-কল্পনার কাছে"

আবার হুংকার ছাড়লো সাহিত্য,

"ওখান থেকে এক পা-ও নড়বে না!যেখানে আছো সেখানেই থাকো!!"

সাহিত্যের এই কথার কোনো যুক্তি প্রীতি খুঁজে পেল না।কিন্তু বর্তমানে সাহিত্যের এমন হিংস্র চেহারায় চুপসে গিয়ে ওখানেই ঠাই দাঁড়িয়ে রইল।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

তপ্ত রোদটা এখন অনেকটাই শিথিল হয়ে এসেছে।আর সেই হালকা গরমে সাহিত্য ভারী চাহনি নিয়ে রাস্তায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা চারটা ছেলের দিকে দেখে আছে।বেচারাদের জান তাদের হাতে বের করে দিয়েছে সাহিত্য।নড়বারও শক্তি নেই।হয়তো অজ্ঞানই হয়ে আছে তারা।

সাহিত্য ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়েই পকেট থেকে ফোন বের করল।অতঃপর ইমার্জেন্সিতে কল করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকলো সে।সাহিত্যের কল কাটার পর বেশি সময় নিল না ইমার্জেন্সির সদস্যরা।মিনিটখানেকের মধ্যে ঠিকানায় চলে এলো।তবে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে বেশ অবাক হলো তারা,যে সাহিত্য নিজ হাতে তাদের পিটিয়ে আবার সে নিজেই অ্যাম্বুলেন্সের জন্য কল দিয়েছে কেন?সাহিত্যকে গম্ভীর মুখোশ্রি দেখে কিছু বলার সাহস হলো না তাদের।সেই সাথে সামনে এগুতেও বেশ বিভ্রান্ত তারা।তবে হঠাৎ সাহিত্যের হুংকার শুনে ধরফড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে ছেলেগুলোকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলতে লাগলো।

হাতের কাজ সাড়িয়ে অ্যাম্বুলেন্সের এক লোক সাহিত্যের দিকে এগিয়ে এলো।সাহিত্যকে দেখে মনে ভয় লুকিয়ে বলে উঠল সে,

"স-স্যার...টাকাটা?"

সেই কথা শুনে ভ্রু কুচকালো সাহিত্য।তবে পর মুহুর্তেই কালো ফর্মাল প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে,

"ক্যাশ অর কার্ড?"

সাহিত্যের সেই কথার পর পরিবেশ নিস্তব্ধ থাকলো কিছুক্ষণ।কারণ সামনের দুই ব্যক্তি বেশ হতভম্ব সাহিত্যের সেই কথায়।অ্যাম্বুলেন্সের লোকটি হা হয়ে সাহিত্যের দিকে দেখে থাকলেও প্রীতি শুধু হা হয়ে নেই।তার তো বাম চোখটাও ফরকাতে শুরু করেছে।এই লোক এখানে কার্ডের কথা কেন তুলছে?তার কোটি টাকার সেই ক্রেডিট কার্ডটা এখানে মাঝ রাস্তায় সোয়াইপটাই করবে কোথায়?!!

প্রীতি এতক্ষণ পর একটু স্বাভাবিক হতে পেরেছে।সাহিত্যের সামনের লোকটা এখনো হা হয়ে সাহিত্যের দিকে দেখে আছে।তবে প্রীতি এগিয়ে গেল সাহিত্যের দিকে।সামনে থেকে কোনো কথা না শুনায় সাহিত্য মানিব্যাগ থেকে মাথা তুলে সামনে তাকালো,

"কি হলো?বলছেন না যে?"

সাহিত্যের কথার পর মুহুর্তেই নিজের রাগ দাবিয়ে রেখে দাঁত চিবিয়ে বলল প্রীতি,

"ভাইয়া....ক্যাশ"

প্রীতির দিকে নজর দিয়ে সাহিত্য আবারো মানিব্যাগের দিকে নজর ঘুরালো।অতঃপর তিনটা চকচকে এক হাজার টাকার নোট বের করে সামনের লোকটার দিকে ধরল সে,

"এটা হবে,না আরো লাগবে?"

সাহিত্য যে একসাথে তিন হাজার টাকা বের করে দিবে সেটা হয়তো লোকটা আশা করেনি।তাই তো ভড়কে উঠে আবারো সাহিত্যের দিকে কিছুক্ষণ দেখে থাকলো।অতঃপর অ্যাম্বুলেন্সের দিকে দেখে আবার নজর দিল সাহিত্যের দিকে,

"যে অবস্থা দেখলাম...আরো কিছু দিলে ভালো হয়"

কিছু না বলে সাহিত্য আরো তিন হাজার টাকা মানিব্যাগ থেকে বের করে মোটে ছয় হাজার টাকা ধরিয়ে দিল লোকটার হাতে।সুক্ষ্ম হাসি মুখে নিয়ে সালাম দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল লোকটা।সেদিক থেকে নজর ঘুরিয়ে প্রীতি সাহিত্যের দিকে ঘুরে।হালকা ভয় মিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠল মেয়েটা,

"ভাইয়া...ওই ছেলেগুলো কিন্তু ভার্সিটিতে রাজনীতি করে।কোনো সমস্যা আবার হবে না তো?...আর,এতো মার খাওয়ার কারণে যদি আপনাকে জেলে ঢুকাতে চায়"

সাহিত্য মুখে বিরক্ত ভাব নিয়ে আড় চোখে দেখলো প্রীতির দিকে,

"আমাকে কি তোমার ভার্সিটি পড়ুয়া পিদ্দি ছেলে মনে হয়?ওগুলো সামলানোর অনেক ওয়ে আছে আমার।ওদের বাপও আমাকে সামলাতে হিমসিম খাবে।তবুও আমার ধারের কাছেও আসতে পারবে না"

সাহিত্যের কথা শেষে প্রীতি হাবার মতো সাহিত্যের দিকে দেখে থাকলো।কানাডার টাইকুন বিজনেসম্যান হওয়ার সুবিধা তো অনেক!মন মতো পিটিয়ে গেল,অথচ সেটা যেন কিছুই না সাহিত্যের কাছে।কল্পনার ভাগ্যে আসলেই একটা সুগার ড্যাডি জুটবে।

কল্পনার কথা ভাবতেই কাজি অফিসের দিকে নজর ঘুরালো প্রীতি,

"আয়-হায়!কল্পনা তো ওখানেই আছে"

প্রীতি সামনে এগুতে নিলে আবারো সাহিত্যের শক্ত কন্ঠ কানে ভেসে আসে,

"তোমাকে না বললাম যেখানে দাঁড়িয়ে আছো সেখানেই থাকো"

প্রীতি এবার সাহিত্যের দিকে ভ্রু কুচকে তাকালো,

"তো কল্পনাকে নিয়ে আসবো না?"

"আবার যেহেতু যেতেই হবে তো নিয়ে এসে কি করবা?"

কথাটা বলেই সাহিত্য আবারো ফোন হাতে নিয়ে কল করল কোনো এক কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে।সেই ব্যক্তি কল রিসিভ করতেই বলে উঠল সাহিত্য,

"বাসায় না বাইরে?"

এতক্ষণ থেকে ঘুমে বিভোর থাকা অন্ত সাহিত্যের কথায় চোখে আঙুল ডলতে শুরু করেছে।অতঃপর ভাঙা গলা নিয়েই বলল,

"বাসায়।কেন?"

"একটা কাজি অফিসের এড্রেস দিচ্ছি,দুটো বর মালা নিয়ে তাড়াতাড়ি দৌড় মার"

অনেকটা ভড়কালো অন্ত,

"কিহ?বর মালা কেন?কার বিয়ে?"

"অত কথার সময় নেই।যেটা বলছি তাড়াতাড়ি কর"

"হ্যাঁ হ্যাঁ,আসছি"

কল কেটে সাহিত্য প্রীতির দিকে ঘুরতেই প্রীতির বড়-বড় চোখ জোড়া দেখতে পেল।সাহিত্য প্রীতির দিকে ঘুরার পর মুহুর্তেই কাপা কন্ঠে শুধালো প্রীতি,

"ক-কার বিয়ে হবে এখন?"

স্বাভাবিক কন্ঠ সাহিত্যের,

"আমার আর কল্পনার"

"হা??!!"

প্রীতির হা হয়ে থাকা মুখের দিকে দেখে সাহিত্য নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়।প্রীতি আর কিছু বলল না।ক্ষণিক সময় পর হা করা মুখটা বন্ধ করে হতবম্ব হয়ে সাহিত্যের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকলো সে।

অন্ত হয়তো মোটরসাইকেল ভাগিয়েই নিয়ে এসেছে।হঠাৎ সাহিত্যের কলেই তো এমনটা করা।মোটরসাইকেল স্ট্যান্ড করে সাহিত্যের দিকে এগিয়ে আসতেই কপালে ভাজ পড়ল তার।একবার প্রীতি,তো একবার সাহিত্যের দিকে দেখতে নিয়েই বলল,

"কি হয়েছে?কার বিয়ে হবে?"

সাহিত্য আগের ন্যায়ই স্বাভাবিকভাবে বলল,

"তোর ভাইয়ের"

"কিহ!!"

ক্ষণিক আগে প্রীতি যেই বড় চোখ নিয়ে সাহিত্যের দিকে দেখে ছিল সেই মুখোশ্রি এখন অন্তর চেহারায়।কিন্তু অন্ত এদিকে অন্য কিছুরই টেনশন করছে।প্রীতির দিকে কাপতে থাকা নজর ফেলল সে।অন্তর মনের ভাব বুঝতে পেরেই প্রীতি কাঁদো গলায় বলল,

"মেয়ে আমি না।কল্পনা"

মেয়ে যে প্রীতি নয় সেটা শুনে চোখ বন্ধ করে স্বস্তির এক শ্বাস ফেলল অন্ত।কিন্তু পর মুহুর্তেই যখন কল্পনার নামটা মাথায় ঢুকলো অমনি সাহিত্যের দিকে দেখে আগের থেকেও বেশি জোরে চিৎকার দিল ছেলেটা,

"কিহ!!!"

সাহিত্য কিছু মুহুর্ত থেকে বেশ স্বাভাবিক হয়ে আছে।এখনো থাকলো,

"কি কিহ?এখন চল তাড়াতাড়ি,সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে।আবার বাসায়ও ফিরতে হবে"

কথা শেষেই কাজি অফিসের দিকে হাঁটা দিল সাহিত্য।অন্ত ব্যস্ত পায়েই সাহিত্যের সাথে তাল মিলিয়ে হতভম্ব কন্ঠে শুধালো,

"তুমি কল্পনাকে কেন বিয়ে করছো?আর এমন হঠাৎ করে কোট ম্যারেজ কেন?"

"ফেরার পথে প্রীতি তোকে সব বলে দিবে।এখন সময় নষ্ট না করে চল"

সাহিত্যের ঠান্ডা গলার কথায় আবার ভড়কালো অন্ত।পেছনে ঘুরে তাদের পেছন-পেছন আসতে থাকা প্রীতির দিকে একবার দেখে আবার সাহিত্যের দিকে নজর দিল সে,

"ভাইয়া বিয়েটা কোনো ছেলেমানুষী কাজ না।এমন হুট করে এক ডিসিশন নেওয়া ঠিক হচ্ছে না"

"সিচুয়েশনই এমন"

সাহিত্যের এবারও ঠান্ডা গলায় অন্ত মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে থমকে দাড়ালো,

"বাসার কাউকে না জানিয়ে এমন বিয়েটা করা কি ঠিক হচ্ছে?"

সাহিত্য দাঁড়িয়ে পড়ে পেছনে অন্তর দিকে ঘুরলো,

"বাসায় যাকে জানানোর আমি তাকে অনেক আগেই জানিয়েছি"

ভ্রু কুচকালো অন্ত,

"কাকে?"

"দাদিকে"

অন্ত আবারো অনেকটা অবাক হলো,

"দাদি জানে?দাদি মেনেছে?"

সাহিত্য আবারো কাজি অফিসের দিকে এগুতে নিয়েই বলল,

"হ্যাঁ"

থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকলো অন্ত।কি হচ্ছে সব যেন মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে তার।সে কি এখনো ঘুমিয়ে আছে নাকি?নিশ্চয়ই ঘুমের মধ্যে এসব উলটা-পাল্টা জিনিস দেখছে।

প্রীতি এগিয়ে এসে অন্তর হাত থেকে বর মালা দুটো নিতে নিয়েই বলল,

"এখন অত মাথা খাটিয়েন না।সাহিত্য ভাইয়া যেটা করছে করতে দিন।আমি পরে সব খুলে বলল"

আর কিছু বলল না অন্ত।বেশ হতভম্ব হয়ে থাকলেও চুপ করে গেল সে।সাহিত্য যে অযথা এই সিদ্ধান্ত নেয়নি সেটা অন্তত বিশ্বাস আছে তার।নিশ্চয়ই কোনো ভারী কারণেই এমন ভারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।তার উপর সেটা আবার কল্পনার ব্যাপারে।

সাহিত্য স্বাভাবিকভাবেই কাজি অফিসে ঢুকে কল্পনার পাশের চেয়ারে বসলো,

"নেন কাজি সাহেব,বিয়ে পড়ান"

বাইরের এতো রোমাঞ্চকর মারামারির মজা নিতেই কাজি সাহেব এক কাপ চা খেতে বসেছিলেন।কল্পনার হাত,পা,মুখ বন্ধ থাকার পরেও তাকে চায়ের নিমন্ত্রণ দেন তিনি।কিন্তু কল্পনা মাথা ঝাকিয়ে না করে দেয়।ইশারায় কাজি সাহেবকে হাত-মুখের বাধন খুলতে বললে কাজি সাহেব সাফ না করে দেন।তাদের এসব বিষয়ে ঢুকতে তিনি একদম আগ্রহী না।

কাজি সাহেবের প্রত্যাখ্যান শুনে পড়নের আসমানী রঙা থ্রিপিসের সালোয়ারের দিকে নজর দিল কল্পনা।মোটা দড়ি দিয়ে বাধার ফলে বেশ ময়লা ভরেছে সেখানটায়।কয়েকদিন আগেই এই থ্রিপিসটা কিনলো।আর আজ সেটার বেহাল অবস্থা।সেফটিপিন দিয়ে দুই কাধে সিল্কের ওড়নাটা আটকানো থাকলেও একপাশের মাথাটা অনেকটা ছেড়া।হাত খোপা করে রাখা চুলগুলো তো সেই সাগরের হেচকা টানে গাড়িতে উঠানোর সময়ই খুলে গিয়েছিল।

কাজি সাহেব হাত-মুখ খুলতে না চাইলেও তেমন কিছু আর বলল না কল্পনা।কিছুক্ষণ পর যেহেতু সাহিত্যই হাতের বাধন খুলে দিবে সেহেতু কল্পনাও আর বেশি জোরাজোরি না করে বাইরের মারামারির মজা নিতে শুরু করে।

কিন্তু বর্তমানে সাহিত্যের মুখে এমন কথা শুনে কাজি সাহেব চায়ের শেষ চুমুকটায় বিষম খেলেন।আর কল্পনা চোখ জোড়া রসগোল্লা বানিয়ে যান্ত্রিকভাবে সাহিত্যের দিকে ঘুরলো।

বিষম কাটিয়ে শুধালেন কাজি সাহেব,

"বাবাজি,আপনি না বিয়ে ভাঙাতে এলেন?"

"হ্যাঁ।ওই বিয়ে ভাঙিয়ে এখন আমি বিয়ে করব"

সাহিত্যের সেকথায় কল্পনা ও কাজি সাহেব দুজনই থমকে থাকলো কিছু মুহুর্ত।অতঃপর নিস্তব্ধ পরিবেশ চিড়ে কল্পনা হুড়মুড়য়ে নড়ে উঠলো।সাথে বন্ধ মুখে সাহিত্যকে কিছু বলার চেষ্টাও করে যাচ্ছে সে।কিন্তু সাহিত্য কল্পনার দিকে একদমই নজর দিল না।তার শান্ত নজর তো কাজি সাহেবের দিকে।

এর মাঝেই অন্ত আর প্রীতি ভেতরে ঢুকে।ঘাড় হালকা ঘুরিয়ে সেদিকে দেখে বলে উঠল সাহিত্য,

"এই দু'জন সাক্ষী হবে"

সাহিত্যের কথায় আবারো কেপে উঠল অন্ত আর প্রীতি।প্রীতির উপস্থিতি ঠাহর করে কল্পনা নজর পেছনে ঘুরিয়ে আরো হুড়মুড়িয়ে নড়তে লাগলো।কল্পনার এমন হাত-পাসহ মুখ বাধা দেখে অন্তর এবার হালকা শ্বাসকষ্ট হতে শুরু করেছে।আজ হচ্ছেটা কি!বিকেলে কার মুখ দেখে ঘুমিয়েছিল সে!

কল্পনার এতো ডাক উপেক্ষা করে অন্তকে টানতে নিয়েই এক কোণায় দাড়ালো প্রীতি।কল্পনার এতো আকুতি যেন কারো নজরেই পড়ছে না।এবার তো চেয়ার ঝাকিয়ে নড়তে লাগলো মেয়েটা।সাহিত্যের দিকে ঘুরে বন্ধ মুখে আবারো কিছু বলল।কিন্তু সাহিত্য বরাবরের মতো উপেক্ষা করে গেল কল্পনাকে।যেন কল্পনা তার সামনেই নেই।

হঠাৎ সাহিত্যের এমন করে বিয়ে করা কল্পনার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না।হচ্ছেটা কি তার সাথে!!নওশাদের সাথে বিয়ে হওয়ার থেকেও বেশি ভয়ংকর বর্তমানের পরিস্থিতি কল্পনার কাছে।

কাজি সাহেব সাহিত্যের থেকে নজর ঘুরিয়ে কল্পনার দিকে দেখলেন,

"মেয়েকে দেখে তো মনে হচ্ছে সে একদমই রাজি না।আপনারা কে হন মেয়ের?"

এবার প্রীতি বলে উঠল,

"মেয়ে রাজি আছে আঙ্কেল।ওটা মেয়ের চাচাতো ভাই।আর এটাও চাচাতো ভাই।আমি ওর বান্ধুবী"

প্রীতির কথায় তার দিকে কটমটিয়ে দেখলো কল্পনা।সেটাতে চুপসে গেল প্রীতি।লুকিয়ে পড়ল অন্তর পেছনে।কল্পনা এবার অন্তর দিকে করুন নজর ফেলল।অন্তর বেশ মায়া হলো সেই চাহনিতে।মিনমিনিয়ে বলল সে,

"আমি ভাইয়াকে নিষেধ করেছিলাম রে।কিন্তু দাদি নাকি পারমিশন দিয়েছে।তাই আর কিছু বলতে পারছি না"

কল্পনা আবারো সাহিত্যের দিকে ঘুরলো।সরু চোখে দেখতে লাগলো সামনের সুপুরুষকে।

আজ প্রেয়সীকে নিজের করে নেওয়ার সুযোগ পেয়েই যেন শুধু এই কয়েক মুহুর্তের জন্য প্রেয়সীকে সম্পুর্ণ উপেক্ষা করে যাচ্ছে সাহিত্য।অতঃপর সামনের কাজি সাহেবকে তাড়া দিল সে,

"আরে আপনি বসে আছেন কেন?তাড়াতাড়ি করেন তো"

"দেনমোহড় কত দিবেন বাবাজি?"

"সেটা আমি পরে লিখে দিচ্ছি।আপনি আগে বিয়ে পড়ান"

আর কোনো উপায় দেখলেন না কাজি সাহেব।সাহিত্যের কথায় দুই হাতের তালু ঘষে মোনাজাতের জন্য হাত তুললেন।দোয়া-কালাম পড়ে নজর নিচু রেখেই কল্পনার উদ্দেশ্যে বললেন তিনি,

"আম্মাজি,বলেন আলহামদুলিল্লাহ কবুল"

ক্ষণিক সময় নিরবতা বয়ে যাওয়ার পরও যখন কোনো উত্তর এলো না তখন আবার কাজি সাহেব বলে উঠলেন,

"আম্মাজি বলেন আলহামদুলিল্লাহ কবুল"

আবারো কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে মাথা তুললেন তিনি।কল্পনার মুখের টেপের দিকে নজর গেল তার।সাথে লক্ষ করলেন যে কল্পনা রাগে ফুসতে নিয়েই সাহিত্যের দিকে দেখে আছে।কাজি সাহেব কল্পনার চোখের লক্ষ অনুসরণ করে সাহিত্যের দিকে দেখতেই চমকে উঠলেন।কল্পনা সাহিত্যের দিকে দেখে থাকলেও সাহিত্যের শক্ত নজর কাজি সাহেবের দিকে।সাহিত্য তাকে এভাবে কেন দেখছে সেটা মাথায় ঢুকলো না বেচারার।এই পাগলদের এসব তাড়াতাড়ি মিটে গেলেই বাঁচেন তিনি।

সাহিত্যের তীরের ফলার মতো নজর পাশ কেটে কাপা গলায় বললেন কাজি সাহেব,

"ব-বাবাজি।ওনার মুখ না খুললে কবুল কেমন করে বলবে?কবুল না বললে যে বিয়ে হবে না"

সাহিত্য এতক্ষণ পর কল্পনার দিকে ঘুরলো।গম্ভীর মুখোশ্রি বজায় রেখেই কল্পনার মুখের টেপটা খুলে দিল।অমনি যেন খৈ ফুটতে লাগলো কল্পনার মুখে।চেঁচিয়ে উঠল সে,

"সাহিত্য ভাই আপনি কি করছেন!মাথা খারাপ হয়েছে আপনার?এটা কোনো সল্যুশন না সবকিছু ঠিক করার জন্য!বাবা আর বড় বাবা এটার পরে কেমন রিয়েক্ট করবে জানা আছে আপনার?মেরে ফেলবে আমাদের দুজনকে!!"

"কল্পনা....কবুল বল"

সাহিত্যের ঠান্ডা নজর আর ঠান্ডা কন্ঠে কল্পনা আবারো দাপাদাপি করে উঠল,

"প্লিইইজ সাহিত্য ভাই,বাদ দেন এসব।জেদ ধরিয়েন না।বাসার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যাবে।বাবা আর বড় বাবা কেবলই একটু ঠিক হয়ে আসছে।আপনার একটা ভুলের কারণে সব শেষ হয়ে যাবে!"

এবার সাহিত্যের কন্ঠ শক্ত হয়ে এলো,

"কল্পনা কবুল বল"

কল্পনা নিজেকে সংযত করার উদ্দেশ্যে লম্বা দুটো শ্বাস নিল।অতঃপর আবারো সাহিত্যের দিকে ঘুরল।এবার শান্ত স্বরে বলল সে,

"আচ্ছা ঠিক আছে...আমি আপনাকেই বিয়ে করব।কিন্তু এখন না প্লিজ!বাবা আর বড় বাবাকে মানিয়ে আপনাকেই বিয়ে করব আমি,আই প্রমিস!শুধু এখন এসব পাগলামি বাদ দিন!"

সাহিত্য গম্ভীর মুখোশ্রি নিয়ে দেখে আছে কল্পনার দিকে।কল্পনার আকুতি ফু মেরে বলে উঠল সে,

"তাড়াতাড়ি কবুল বল"

কল্পনা চোখ-মুখ খিচে খুত-খুত করে উঠল।সাহিত্য যেন কোনো কথাই শুনতে চাইছে না।আজ এই বিয়ে হলে ফাহাদ শেখ কল্পনার কোরবানি দিবেন।সাথে হয়তো এবার তিনি নিজেই শেখ ভিলা ছাড়তে পারেন।

কাজি সাহেব আরো একবার মিনমিনিয়ে উঠলেন কল্পনার কাছ থেকে কবুল শুনার উদ্দেশ্যে।কিন্তু কল্পনা এবার দাঁত কিড়মিড় করতে লাগলো।তারও মাথাটা যে এখন ভারী গরম হয়ে উঠছে।সাহিত্যের দিকে শক্ত নজর রেখেই রাগ মিশ্রিত কন্ঠে বলল,

"বলবো না আমি!"

এবার আর সাহিত্য শান্ত থাকলো না।কল্পনার কথা শেষ হওয়ার পর মুহুর্তেই হুংকার দিল সে,

"চুপচাপ কবুল বল,নাহলে এখানেই আগে বাসর সেরে তারপর কবুল বলাবো!!"

পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্ত আর প্রীতি বেশ বিষম খেল সাহিত্যের সেকথায়।আর কল্পনা তো চোখ বড় আর মুখ হা করে সাহিত্যের দিকে দেখে আছে।তবে এদের সবাইকে পেছনে ফেলে আবারো কাজি সাহেব বিস্ময়কর কিছু বলে বসলেন।মোনাজাতের হাত ছাড়িয়ে কল্পনার উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি,

"আস্তাগফিরুল্লাহ!!আম্মাজি তাড়াতাড়ি কবুল বলেন।হারাম না,হালালভাবেই কাজটা সম্পন্ন হোক!"

কল্পনার বিস্ময়ে ভরা মুখের দিকে দেখে সাহিত্য আবারো বলল,

"কল্পনা,আমার ধৈর্য পরীক্ষা করিস না"

বিস্মরে ভরা মুখোশ্রি বদলে কটমটিয়ে উঠলো কল্পনা,

"করেন কি করবেন!আমি কবুল বলব না!"

পেছনে প্রীতি কপালে হাত চাপড়ালেও সাহিত্য ঝুকে এলো কল্পনার দিকে।ঠোঁটের কোণে এক চিলতি হাসি নিয়ে শুধালো,

"এতোটা ডেস্পারেট?"

সাহিত্যের কথাটুকু কানে যেতেই নাক-মুখ কুচকে কাজি সাহেব মিনমিনিয়ে বলে উঠলেন,

"ছিচ্ছি"

#চলবে

সাহিত্য ভাই কিন্তু তার জানপাখিকে নিজের আসল রূপ দেখানো শুরু করে দিয়েছে পাঠকগণ'স!🫡

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন