#পর্ব_৭৩
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
এতো দাপাদাপি করার ফলে কল্পনা হাপিয়ে উঠেছে অনেকটা।বড়-বড় শ্বাস ফেলতে নিয়েই সাহিত্যের দিকে চোখ দিয়ে চা'কু চালাচ্ছে সে।সাহিত্যের ক্ষণিক আগের কথাটায় কল্পনা যেমন ভড়কেছে তেমন রাগও উঠছে তার।সাহিত্যের এমন কথা-বার্তা কল্পনা একদমই আশা করেনি।চোখের ছু'রি চালাতে নিয়েই দাঁত চিবিয়ে বলে উঠল সে,
"এতোটা অসভ্য কবে থেকে হলেন আপনি?"
উত্তর করল না সাহিত্য।সুক্ষ্ম মেকি হেসে আবারো মুখোশ্রি গম্ভীর বানিয়ে কল্পনার থেকে নজর ঘুরালো।সোজা হয়ে বসে চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে বলল সে,
"দেরি করিস না,তাড়াতাড়ি বল"
কল্পনা চোখ-মুখ খিচে বন্ধ করে ক্ষণিক আগের থেকে আরো বেশি জোরে চেঁচিয়ে উঠল,
"বলব না!!!"
এবার সাহিত্য তার রাগটা আর ধরে রাখতে পারলো না।কল্পনার উপর উঠা রাগ সামনের টেবিলে ঝাড়লো সে।ডান হাতের মুষ্টি সজোরে বসিয়ে দিল টেবিলের চকচকে কাঁচটার উপর।সাথে আবারো হুংকার ছাড়লো,
"লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি তোকে!তাড়াতাড়ি কবুল বল!!"
সাহিত্যের হাতের বারিতে টেবিলে উপস্থিত সব জড় বস্তু যেন কেপে উঠল।সাথে কেপে উঠল কাজি সাহেবের বুকের মাঝটা।বুকে হাত রেখে সাহিত্যের হাতের দিকে দেখে আছেন তিনি।সুক্ষ্ম চোখে পরখ করতে লাগলেন যে কাচ ফেটেছে কিনা।কাচ ফাটার কোনো চিহ্ন দেখতে না পেয়ে যখন কেবলই স্বস্তির শ্বাস ফেললেন ঠিক তখনই পট-পট আওয়াজ করে গাছের ডাল-পালার মতো কাঁচে ফাটল দেখা দিল।সাহিত্যের ভারী মুষ্টির স্বাদ ভালো করেই গ্রহণ করেছে টেবিলের কাঁচখানা।
সাহিত্যের এমন প্রতিক্রিয়ায় আঁতকে উঠে কল্পনা।তার আর চেঁচামেচি করে যে কোনো লাভ হবে না সেটা এতক্ষণ পর বুঝলো।কি একটা পরিস্থিতিতে পড়েছে সে!কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির সাথে বিয়ে হওয়ায় মনের এক কোণা খুশিও হচ্ছে,আবার এমন এক পরিস্থিতিতে সেই বিয়ে হওয়ায় রাগও উঠছে।
কাজি সাহেব করুন চোখে দেখে ছিলেন নতুন কাঁচে ফাটল ধরা জায়গাটায়।ভারী শ্বাস ফেলে আবারো কলেমা পড়া শুরু করলেন।কারণ সাহিত্যের সাথে কথা বলতে গেলেই তার মাথাও ফাঁটতে পারে সেটা বুঝলেন তিনি।কলেমা পড়া শেষ করে কল্পনার উদ্দেশ্যে আবারো বলে উঠলেন,
"আম্মাজি তাড়াতাড়ি বলেন তো আলহামদুলিল্লাহ কবুল"
এবার যেন কাজি সাহেবের কন্ঠে অসহায়ত্ব বোধ স্পষ্ট ছিল।নিজের ছোট কাজি অফিসখানা ভাঙার ভয়েই আছেন তিনি।কল্পনা কবুল না বললে যদি সাহিত্য পুরো কাজি অফিসের বারোটা বাজিয়ে দেয়?সে তো আরেক সমস্যা হয়ে যাবে!
কল্পনা শান্ত নজরে সাহিত্যের দিকে দেখতে লাগলো।আগামী দিনগুলোতে কি ঝড় তার জীবনে আগমন নিবে সেটা ভালো করেই বুঝলো সে।আর সেটা সামলে উঠবে কেমন করে সে বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র জানা নেই।সাহিত্যের এসব পাগলামি যে কি বয়ে নিয়ে আসবে সেটা ধারণারও বাইরে।
মাথা নিচু করে চোখ জোড়া বন্ধ করল কল্পনা।অতঃপর ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়ে কাপা কন্ঠেই বলে উঠল,
"আলহামদুলিল্লাহ...কবুল"
আবারো শুধালেন কাজি সাহেব,
"বলেন আলহামদুলিল্লাহ কবুল"
কল্পনার শ্বাসটাও এবার কেপে উঠল।হয়তো এখনই কেঁদে উঠবে মেয়েটা।সেই কান্নার কারণটাই বা কি?খুশির?যে সাহিত্য ভাই তাকে বিয়ে করছে।নাকি দুঃখের?যে এই বিয়ে ভুল সময়ে হচ্ছে।
এতো কিছু আর ভাবতে পারলো না কল্পনা।কাপতে থাকা শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়েই আবার উত্তর করল,
"আলহামদুলিল্লাহ কবুল"
"বলেন আলহামদুলিল্লাহ কবুল"
কল্পনা এবার মাথা তুলে সাহিত্যের দিকে দেখলো।সাহিত্যকে মানানোর আরো একবার চেষ্টা চালালো সে।কাঁদো গলায় বলল মেয়েটা,
"সাহিত্য ভাই...প্লিজ...বাবা অনেক রাগ করবে"
কিচ্ছু বলল না সাহিত্য।শুধু মাথা সামনে ঘুরিয়ে নিল।সাহিত্যের এমন নজর ঘুরিয়ে নেওয়ার মানে ভালো করেই বুঝলো কল্পনা।সাহিত্যের দিকে নজর রেখেই বাধ্য মেয়ের মতো তিন নাম্বার কবুলটাও বলে উঠল সে,
"আলহামদুলিল্লাহ কবুল"
কল্পনা ইতোমধ্যেই ফোপাতে শুরু করে দিয়েছে।বেশ রাগও উঠছে তার।কিন্তু সাহিত্য সামনে নজর রেখেই মুখে মৃদু হাসি নিয়ে বসে।সেটা হয়তো কল্পনার চোখে পড়ল না।কাজি সাহেব ভারী শ্বাস ফেলে এবার সাহিত্যের দিকে নজর দিলেন,
"বাবাজি,বলেন আলহামদুলিল্লাহ কবুল"
সাহিত্য একদমই সময় নষ্ট করল না।কাজি সাহেবের তিন দফা কথার উত্তরে চটজলদি কবুল বলল সে।
শেষের 'আলহামদুলিল্লাহ কবুল' শব্দ জোড়া সাহিত্য তার প্রেয়সীর দিকে দেখেই কোমলপ্রাণে বলে উঠল।সাহিত্যের নজর এতো কোমল হলেও তার প্রেয়সী তো টসটসে লাল কপোল জোড়া ফুলিয়ে ফোপাঁতে নিয়েই সাহিত্যের দিকে দেখে আছে।সামনের ছোট চুলগুলোর কিছু লেপ্টে আছে কপালটায়।সাহিত্য হাত বাড়িয়ে দিল সেগুলো ঠিক করার উদ্দেশ্যে।কিন্তু রাগে ফুসতে থাকা তার প্রেয়সী পর মুহুর্তেই এক ঝটকায় মাথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল।বুঝলো সাহিত্য,যে কল্পনা ভালোই রেগে আছে তার উপর।সাহিত্য মুচকি হেসে কাজি সাহেবের দিকে ঘুরতেই তিনি বলে উঠলেন,
"বাবাজি ওনার হাতটা খুলে দিন।সই করতে হবে তো"
সাহিত্য নিজের গম্ভীর মুখোশ্রি আবার ফেরত নিয়ে এলো,
"ওটা বাধা হাতেই করতে পারবে।এখন খুলে দিলে ও সাইন করতে চাবে না"
সাহিত্য তার জানপাখিকে ভালো করেই চিনে।তবে এ ব্যাপারটায় প্রীতি আর অন্তও বোধগম্য।এখন হাত-পা বাধা অবস্থায় আছে দেখেই মুখ চালানো ছাড়া আর তেমন কিছুই করতে পারছে না কল্পনা।আর সাহিত্য সেটারই ভালো করে সুযোগ নিচ্ছে।
কি আর করার?আবারো কল্পনা বাধ্য মেয়ের মতোই নিজের নামটা কাগজে লিখে দিল কালো কালির কলমটা দিয়ে।সাহিত্য নিজের নামটা লিখতে গিয়ে থমকালো একবার।নিজের গত হওয়া জীবনে অনেক জায়গায়ই সই করেছে সে।অথচ আজ যেন এক আলাদাই অনুভূতি খেলে যাচ্ছে তার ভেতরে।কল্পনার লিখে রাখা নামটার দিকে নজর পড়তেই ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি ফুটল তার।অতঃপর দক্ষ হাতে নিজের পুরো নামটা লিখে ফেলল তার প্রেয়সীর নামের থেকে কিছু দূরত্বে।
অন্ত আর প্রীতির সই নিয়ে কাজি সাহেব কাগজে ভালো করে একবার চোখ বুলিয়ে বলে উঠলেন,
"আলহামদুলিল্লাহ।আপনাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।আশা করছি কনে তাড়াতাড়ি নিজের রাগ ভাঙাবেন"
কল্পনা সাহিত্যের দিকে আর একবারও ঘুরে দেখছে না।প্রেয়সীর রাগ বুঝতে পেরেও এই মুহুর্তে যেন কিছুই করছে না সাহিত্য।সে বিষয়টা বাসায় গিয়ে নিপ্টানো যাবে।
এর মাঝেই প্রীতি বলে উঠল,
"আরে মালাগুলো যে পরা হলো না?"
কল্পনা প্রীতির দিকে দেখে দাঁত চিবিয়ে বলল,
"ওগুলো তুই তোর গলায় ফাস দে"
কল্পনা যে শুধু সাহিত্যের উপর রেগে নেই সেটা প্রীতি ভালো করেই বুঝলো।রাতে ফোনে সব মিটমাট করে নিতে হবে।নাহলে তো কল্পনা আর কথাই বলবে না প্রীতির সাথে।
সাহিত্য মালা দুটো হাতে নিতেই কল্পনা অন্যদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে রেখেই চেঁচিয়ে উঠল,
"পরাবো না আমি আপনাকে মালা!"
কল্পনাকে আর ঝাড়তে গেল না সাহিত্য।এই মেয়েকে এখন বুঝিয়েও লাভ নেই।কিছু বুঝবে না উলটো সাহিত্যের মাথা চাবাবে।তাই তো সাহিত্য একটা মালা নিজের গলায় পরে নিয়ে আরেকটা কল্পনার গলায় ঢুকিয়ে দিল।সেটাতে বেশ ভড়কালো কল্পনা।তবে সাহিত্য বাকিদের দিকে দেখে ভারী কন্ঠে শুধালো,
"হয়েছে?এখন চলো"
বাধা দিলেন কাজি সাহেব,
"বাবাজি!পেমেন্টটা?"
"ওহ,সরি,মনে ছিল না"
কথা বলতে নিয়েই মানিব্যাগ বের করল সাহিত্য,
"ক্যাশ অর কার্ড?"
মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে আবারো চোখ উল্টালো প্রীতি,
"ভাইয়া,ক্যাশ!ক্যাশ!!আপনার ক্রেডিট কার্ড এখানে চলবে না"
প্রীতির দিকে আড় চোখে দেখে সাহিত্য টাকা বের করে কাজি সাহেবকে দিল।সুক্ষ্ম বিরতির পর কাজি সাহেব সাহস নিয়ে বলে উঠলেন,
"মানে...বলছিলাম কি...টেবিলের কাঁচটা যে ভাঙলেন...সেটার টাকাটা?"
ফাটল ধরা কাঁচের দিকে এক নজর দেখলো সাহিত্য।মুখোশ্রি শান্ত রেখেই আবারো টাকা বের করে কাজি সাহেবের দিকে এগিয়ে ধরল সে।কাঁচ ভাঙার টাকা পাওয়ার আশায় ছিলেন না কাজি সাহেব।তবে পেয়ে যেন বড়ই খুশি হলেন।
সবকিছু মিটমাট হতেই কল্পনা চেঁচিয়ে উঠলো,
"আমার হাত-পায়ের রশিগুলো কি খুলবেন??"
অন্ত ভড়কে উঠে এগিয়ে আসতে নিয়েছিল।কিন্তু কল্পনার কথার পর মুহুর্তেই এক কাজ করে বসল সাহিত্য।কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই কল্পনাকে পাজা কোলে উঠালো।সেটাতে আবারো চেঁচিয়ে উঠলো কল্পনা।তবে সাহিত্য কোনো দিকে না দেখে সোজা হাঁটা ধরল তার গাড়ির উদ্দেশ্যে।প্রীতি,অন্ত আর কাজি সাহেব কিছু মুহুর্ত দেখে থাকলো সেদিকে।অতঃপর নিরবতা ভেঙে কাজি সাহেব বলে উঠলেন,
"কিডন্যাপ করে নিয়ে আসা অনেক বিয়ে পড়িয়েছি আমি।কিন্তু আজ নতুন অভিজ্ঞতা হলো আমার।কিডন্যাপারের কাছ থেকে বাচিঁয়ে নিজেই বিয়ে করে নিয়ে গেল।...বেচারি মেয়েটা।কিডন্যাপারের কাছ থেকে বেঁচে গিয়েও বাঁচলো না"
অন্ত আর প্রীতি এর মাঝেই সাহিত্যের থেকে চোখ সড়িয়ে কাজি সাহেবের দিকে নজর ঘুরিয়েছিল।তবে তার নীতি বাক্য শেষ হতেই অন্ত ভড়কানো কন্ঠে প্রীতির উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠল,
"কল্পনা কিডন্যাপ হয়েছিল??"
অন্তর হাত টেনে বাইরে যেতে নিয়েই বলল প্রীতি,
"বাসায় যেতে-যেতে সব বলছি।চলেন"
সাহিত্যের কোলে হাত-পা বাধা কল্পনা চিংড়ি মাছের মতো লাফাচ্ছে,
"আমি বাসা যাবো না!প্রীতির বাসায় যাবো!আপনি বাবার সাথে ঝগড়া করে সব ঠিক করবেন তারপরই আমি শেখ ভিলার দিকে মুখ ঘুরাবো"
সাহিত্য কিছু না বলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।হাত-পা বাধার ফলেও কেমন লাফাচ্ছে মেয়েটা।কিডন্যাপ করা ছেলেগুলো কল্পনার হাত-পা বেধেছিল কেমন করে সেটাই মাথায় ঢুকছে না সাহিত্যের।তবে সেই ছেলেগুলো কল্পনাকে কিডন্যাপ করার ফলেই তো তার সুবিধা হয়েছে।এতো বড় সুবর্ণ সুযোগ হাত ছাড়া করা যেন পাপ হয়ে যেত আজ।সাহিত্যের ভাগ্য যে এতো ভালো করে খুলে যাবে সেটা কে-ই বা জানতো?এখন শুধু বাসায় ফিরে দুই শেখ আহমেদকে সামলাতে হবে।তবে সাহিত্য যেই যুক্তি দিবে সেই যুক্তির সামনে মনে হয় না দুই শেখ আহমেদের কথা টিকবে।
হয়তো যে কেউ এখনকার পরিস্থিতি দেখে বলতে পারে যে সব সাহিত্যের পরিকল্পনা ছিল।কিন্তু আসল বিষয় যে একদমই সেটা নয়।সাহিত্য শুধু সুযোগের একদম উপযুক্ত সদ ব্যবহার করেছে।
কল্পনার এতো লাফালাফির মাঝেই সাহিত্য কোনোরকম গাড়ির দরজা খুলল।অতঃপর কল্পনাকে ছুঁড়ে মারলো প্যাসেঞ্জার সিটখানায়।সেটাতে বেশ হতবম্ব হলো কল্পনা।রাগের মাথায় কিছু বলতে যাবে তার আগেই ধাম করে দরজাটা লাগিয়ে দিল সাহিত্য।কিন্তু ভেতরে কল্পনা তার বকবকি শুরু করেই দিয়েছে।বন্ধ দরজার পেছনে সেটা অবশ্য হালকা করে কানে আসছে সাহিত্যের।ভারী এক শ্বাস ফেলে কল্পনার কঠিন নজর উপেক্ষা করে পেছনে ঘুরলো সাহিত্য।যাদের জন্য ঘুরেছিল তারা পেছনেই দাঁড়িয়ে।অন্তর কুচকানো ভ্রু দেখার পর প্রীতির উদ্দেশ্যে গম্ভীর কন্ঠে বলল সাহিত্য,
"একে সবকিছু বুঝিয়ে দিও"
পর মুহুর্তেই উপর-নিচ মাথা ঝাকালো প্রীতি।অন্তর দিকে দেখে সাহিত্য বলে উঠল ,
"প্রীতিকে সেইফলি বাসায় পৌঁছে দিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় আয়।কি অবস্থা হবে বুঝতেই তো পারছিস"
অন্ত আর দেরি করল না।সাহিত্য দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই প্রীতিকে নিয়ে রওনা হলো।
কল্পনা এখন একটু চুপ হয়েছে।সেপাশে লক্ষ করেই আড়মোড়া ভাঙতে নিয়ে ড্রাইভিং সিটের উদ্দেশ্যে এগুলো সাহিত্য।আজ অনেক বছর পর এমন মারামারি করেছে সে।শেষবার এমন ভারী মারামারি করেছিল কানাডায় থাকা অবস্থায় ভার্সিটির বক্সিং টুর্নামেন্টে।
সাহিত্য স্বাভাবিকভাবেই গাড়িতে বসে দরজা টেনে দিল।কিন্তু পাশে ঘুরতেই যেন ভড়কে উঠল ছেলেটা।তার নব্য বউ রূপী প্রেয়সী কটমটিয়ে তার দিকে দেখে আছে।জিহ্বা দিয়ে বাম পাশের গাল ঠেলে কিছু মুহুর্ত সাহিত্যও দেখে থাকলো সেদিকে।অতঃপর নিরবতা ভেঙে কল্পনা হুংকার দিয়ে উঠল,
"আমার হাত-পা গুলো খুলবেন কি!"
গম্ভীর মুখোশ্রি বজায় রেখে সাহিত্য এক ঝটকায় কল্পনার পা জোড়া উপরে উঠিয়ে ধরল।ভড়কে উঠে কল্পনা কিছু বলার আগেই নিজের কোলে তার পাগুলো রেখে মোটা রশি খুলতে লাগলো সাহিত্য।ভড়কানো চোখ জোড়া শিথিল করে কয়েক মুহুর্ত সাহিত্যের দিকে দেখে থাকলো কল্পনা।স্বাভাবিকের তুলনায় আজ সাহিত্য একটু উদ্ভট আচরণ করছে।সেটা কল্পনাকে প্রতিবারই অবাকের চূড়ায় তুলছে আজ।বাসায় গিয়ে কেমন করে সব সামলাবে সাহিত্যের কি মাথাতেও আছে সে কথা?
কল্পনার এতো হাবিজাবি ভাবনার মাঝেই সাহিত্য পায়ের রশি খুলা শেষ করেছে।অমনি এক ঝটকায় সেগুলো কোল থেকে নামিয়ে নিল কল্পনা।অন্যদিকে মাথা ঘুরিয়ে হাত জোড়া সামনে বাড়িয়ে ধরল।তবে কিছু খুটুরখাটার শব্দ কানে বাজতেই সামনে ঘুরলো সে।ভালোভাবেই ভ্রু কুচকে গেল তার।সাহিত্য একটা চেক বুকে কলম চালাচ্ছে।কল্পনা তার দিকে ঘুরতেই চেকবুক থেকে কাগজটা ছিড়ে কল্পনার দিকে এগিয়ে ধরল,
"তোর দেনমোহর"
সাহিত্যের স্বাভাবিক গলায় এতো ভারী কথা শুনে কল্পনা আবারো চেঁচিয়ে উঠে,
"নিব না দেনমোহর।মানি না আমি এই বিয়ে..."
এতক্ষণ থেকে সাহিত্য চুপচাপ বসে থাকলেও কল্পনার এবারের কথায় প্রতিক্রিয়া করল সে।কল্পনার চোখের পলকেই সাহিত্য এক হাত দিয়ে মুষ্টি বদ্ধ করল কল্পনার বেধে রাখা হাত দুটো।অতঃপর কল্পনার মাথার উপরে নিয়ে সেগুলো ঠেকিয়ে ধরল পেছনের দরজার কাঁচে।
সাহিত্যের হঠাৎ এমন আক্রমণে কল্পনা যেন মূর্তি বনে গিয়েছে।পরিস্থিতি মাথায় ঢুকার আগেই অনুভব করল সাহিত্য নিজের সিট থেকে উঠে কল্পনার দিকে অনেকটাই ঝুকে পড়েছে।কল্পনা নিজের অবস্থান বোঝার আগেই সাহিত্য নিজের মুখখানা আরো একটু ঝুকে দিল তার দিকে।অতঃপর দাঁত চিবিয়ে বলে উঠল,
"চুপচাপ নিয়ে নে।নাহলে ছেলেগুলোকে আধ মরা করে হসপিটালে পাঠিয়েছি,তোকে পুরা মেরে হসপিটালে পাঠাবো"
সাহিত্যের এমন ঠান্ডা ধমকে কল্পনার নিচের ঠোঁটখানা তিরতির করে কাপতে শুরু করেছে।চোখগুলো তো রসগোল্লা বানিয়ে সাহিত্যের দিকে দেখে আছে সেই ক্ষণিক আগ থেকেই।সাহিত্যের আজকের উদ্ভব সব আচরণের সাথে এই মুহুর্তে কল্পনাকে চেপে ধরার ভঙ্গি যেন মেয়েটার মাথায় ভেজাল পাকিয়ে দিচ্ছে।
সাহিত্য নিজের কন্ঠ শক্ত রাখলেও ক্ষণিক সময় পর যেন সেটা আর ধরে রাখতে পারলো না।প্রেয়সীর ক্লান্ত আদলখানা বড় আদুরে লাগছে তার।খুবই ব্যস্ত শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলছে মেয়েটা।এগুলোই যেন যথেষ্ট সাহিত্যকে তার প্রেয়সীর দিকে আকর্ষণ করতে।কিন্তু এখন সাহিত্যের সেই পদক্ষেপে কল্পনা হয়তো আসলেই কেঁদে উঠবে।এমনিতেই মেয়েটার উপর দিয়ে আজ অনেক ঝড় গিয়েছে।তাই নিজের অনুভূতিদের আরো ক্ষণিক সময়ের জন্য দাবিয়ে রেখে সাহিত্য কল্পনার হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের সিটে ঠিক হয়ে বসলো।আবারো হাতের চেকখানা এগিয়ে দিল কল্পনার দিকে।
সাহিত্য ছেড়ে দিলেও কল্পনা নিজের হাত দুটো নামিয়ে এখনো সেই কোণায় গাড়ির দরজার সাথেই লেপ্টে আছে।সাহিত্যের হাতের চেকে একবার নজর দিয়ে ঘামার্থ সাহিত্যের দিকে নজর দিল কল্পনা।ছেলেটার রয়েল ব্লু রঙা শার্টটা ঘামে অনেকটাই ভিজে গিয়েছে।ক্ষণিক আগে কড়া রোদে দাঁড়িয়ে যে শরীরের কসরত করল তারই ফল হয়তো।এতো ঘামার পরেও যেন নিজের দিকে আকর্ষণ করেই যাচ্ছে সামনের এই পুরুষ।তবে কল্পনা নিজেকে আর গলতে দিল না।সিটে ভালো হয়ে বসে মাথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
"হাত খুলে দিন"
ঠোঁট বাকালো সাহিত্য।অতঃপর কল্পনার কোলে চেকখানা রেখে তার হাতের রশি খুলতে লাগলো।হাতের বাধনটা একটু বেশিই শক্ত করে বেধেছে।তাই তো শেষ গিঠুটা খুলতে গিয়ে ব্যথায় 'আউ' করে উঠল কল্পনা।আর কল্পনার সেই সুক্ষ্ম আর্তনাদে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল সাহিত্য,
"কি হয়েছে?লেগেছে?.."
কথা বলতে নিয়েই কল্পনার হাতের কব্জি পরখ করে যাচ্ছে সে।ফর্সা কবজি দুটো লাল হয়ে উঠেছে এতক্ষণ ধরে বেধে রাখার ফলে।
সাহিত্য পরখ করতেই কল্পনা আরো একবার সুক্ষ্ম 'চ' আওয়াজ করল ব্যথার চোটে।সেটাতে সাহিত্যের প্রতিক্রিয়া খুবই ব্যথাতুর ছিল,
"এখনো জ্বলছে?"
কথাখানা শেষ করেই হালকা ফু দিতে লাগলো,এবং এক পর্যায়ে কোমলভাবে অধর জোড়া ছুঁয়ে দিল হাত দুটোতে।যেখানে-যেখানে লাল হয়ে উঠেছে ঠিক সেখানে-সেখানেই ঘন-ঘন অধর ছুঁয়ে দিতে লাগলো সে।সাহিত্যের হঠাৎ এমন কান্ডে কল্পনা ভড়কালো বেশ।শুধু যে ভড়কেছে তেমনটা একদমই নয়।রীতিমতো সুক্ষ্ম কাপতে শুরু করেছে মেয়েটা।হাতের অল্প ব্যথা ক্ষণিকের মাঝেই ভুলে বসলো।কল্পনার মতে তার সাহিত্য ভাই আজ একদমই স্বাভাবিক আচরণ করছে না।একদমই না!!
কল্পনার এমন হাত কাপতে দেখে ভ্রু কুচকালো সাহিত্য।মাথা তুলে নজর দিল তার দিকে।পুনরায় কল্পনার রসগোল্লার মতো চোখ জোড়া দেখে ঠোঁট বাকালো সে,
"এমন কাপছিস কেন?"
সাহিত্যের কথায় হুশ ফেরার সাথে-সাথেই এক ঝটকায় নিজের হাত দুটো ছাড়িয়ে নিয়ে জানালার দিকে ঘুরলো কল্পনা।মাথাটা তার ভো-ভো করছে।সৃষ্টিকর্তা মনে হয় কল্পনার জীবনের আজকের দিনটা একটু বেশিই মসলাদার বানিয়েছে।যার স্বাদ ভালো করেই পাইছে কল্পনা।
কল্পনার এমন উল্টো দিকে ঘুরায় হালকা ভড়কালো সাহিত্য।তবে আসল বিষয় বুঝতে পেরে ঠোঁটের হাসিখানা বেশ বড় করল।সবে তো শুরু।সাহিত্যের প্রেয়সী তো আজ থেকে সাহিত্যকে নতুনভাবে চিনবে।সম্পুর্ণ নতুনভাবে!!
কল্পনাকে আর জ্বালাতন করতে গেল না সাহিত্য।গাড়ি স্টার্ট দিল শেখ ভিলায় ফেরার উদ্দেশ্যে।কিন্তু গাড়ি চালু করার সেকেন্ড বাদেই চেঁচিয়ে উঠল কল্পনা,
"৯৫কোটি ৮৮লাখ ১টাকা ২৫পয়সা!!!??"
কল্পনার চিৎকারে সাহিত্য গাড়ি ব্রেক না করলেও হালকা স্লো করেছিল।তবে আসল কাহিনী বুঝতে পেরে আবার স্বাভাবিক হয়ে এলো সে।কল্পনার দিকে না ঘুরে দেখলো,আর না কোনো কথা মুখ থেকে বের করল।
কল্পনা হাতের চেক থেকে নজর সাড়িয়ে তড়িৎ গতিতে সাহিত্যের দিকে ঘুরলো।অতঃপর আবারো চেঁচিয়ে উঠল মেয়েটা,
"এমনিতে তো মোহরানার অ্যামাউন্ট নিজেই লিখেছেন।তারউপর সেই অ্যামাউন্ট লিখেছেন মাল্টি মিলিয়নারের ভাব নিয়ে!!?"
কল্পনার কথার একদম পর মুহুর্তেই সাহিত্য বলে উঠল,
"উহু,মাল্টি মিলিয়নার না,মাল্টি বিলিয়নার"
পরপরই কল্পনার দিকে ঘাড় ঘুরালো সে।অতঃপর ঠোঁটের হাসিতে কোটি ডলারের আভাস ফুটিয়ে হাস্কি কন্ঠে বলে উঠল,
"হুইচ আই অলরেডি এ্যাম"
#চলবে
সাহিত্যের এই ডায়লগটা লিখার জন্য আমি গত ১২টা মাস ধরে অপেক্ষায় ছিলাম!!😫🥹 অবশেষে!!লিখে ফেলেছি!💃
শশুর-জামাইয়ের ঝগড়া দেখার জন্য তৈরি থাকেন👀