#পর্ব_৭৫
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
শেখ পরিবারের যুবক-যুবতীরা যেন শেখ পরিবারের প্রবীণদের আজ ঝটকার উপর ঝটকা দিয়েই যাচ্ছে।যেমন এতক্ষণ থেকে সাহিত্য আর কল্পনা ঝটকা দিচ্ছিল,আর এখন অন্ত ঠান্ডা গলায় ঝটকা দিয়ে বসলো।যার ফলস্বরূপ ফাহাদ শেখ 'কিহ্!!' বলে হালকা হুংকার ছাড়লেন।
শেখ ভিলায় ঢুকেই সাহিত্য যখন নিজের ও কল্পনার বিয়ের কথা বলে তখনই মহুয়া বেগম ভড়কে উঠে রুমের দরজায় এসে দাড়ান।তার সাথে রুমের ভেতর অনু আর সামিয়াও ছিল।তারা ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে দাড়ালেও তার বেশি এগুতে পারেনি।কিন্তু মহুয়া বেগম ঠাই রুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়েই সাহিত্যের মুখের দিকে হা হয়ে দেখে ছিলেন।নাহয় তিনি সাহিত্যকে অনুমতি দিয়েছিলেন কল্পনাকে বিয়ে করার।কিন্তু তার নাতি যে এমন এক কান্ড করে বসবে সেটা এই বুড়ো বয়সের মাথায় ঘুনাক্ষরেও উঁকি দেয়নি।
অন্ত যখন শান্ত স্বরে অশান্ত ঝড় তোলার মতো এক কথা বলে বসে তখন তো আরো আঁতকে উঠেন মহুয়া বেগম।তবে পর মুহুর্তেই ভারী শ্বাস ফেলে নিজেকে সংযত করে নেন।তার নাতি তো বিয়ে করে নিজের রাস্তা পরিষ্কার করে নিয়েছে।এখন বাকি যেটা ঝড় সেটা তাকেই সামলাতে হবে।কারণ তিনি ভালো করেই জানেন যে সবাই এখন মহুয়া বেগমকে ব্যস্ত করে তুলবে এ প্রসঙ্গ নিয়ে।
মাথায় দেওয়া শুভ্রা রঙা শাড়ির আঁচল ঠিক করে গলার স্বর শক্ত করে উঁচু আওয়াজে বলে উঠলেন মহুয়া বেগম,
"হ্যাঁ দিয়েছি আমি অনুমতি।তাতে এমন কি হয়েছে?"
হঠাৎ পেছন থেকে শেখ পরিবারের সবচেয়ে গুরুজন ব্যক্তির কন্ঠ শুনতে পেরে উপস্থিত সবাই তার দিকে ঘুরলো।এখন কাহিনীর মুল আকর্ষণ মহুয়া বেগম।
সবাই মহুয়া বেগমের দিকে ঘুরেছে তা দেখে সাহিত্য দাদির দিকে দেখে ঠোঁট বাকিয়ে নিঃশব্দে হাসলো হালকা।অতঃপর সবার চোখের আড়ালে দৌড় লাগালো প্রেয়সীর রুমের দিকে।তার জানপাখিটা এতক্ষণে নিশ্চয়ই কেঁদেকুটে রুম ভাসিয়ে দিয়েছে।
ফাহাদ শেখ মহুয়া বেগমের উদ্দেশ্যে গর্জে উঠলেন,
"আপনি অনুমতি দিয়েছেন মানে?এটা কখন হলো?আর আপনি এমন কিছুর অনুমতি দিলেনই বা কেন?"
দৃঢ় গলা মহুয়া বেগমের,
"আমার মন চেয়েছে তাই দিয়েছি"
ভড়কালো সবাই।ফাহাদ শেখ রাগের চোটে কাপতে থাকলেও তোফায়েল শেখ বলে উঠলেন,
"আম্মা বিয়ে কি কোনো ছেলেখেলা,যে আপনার মন চেয়েছে দেখে আপনি অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন?"
"বিয়ে কোনো ছেলেখেলা নয় সেটা আমার ভালো করেই জানা আছে।আর সাথে এটাও জানা আছে যে শেখ পরিবারের ভবিষ্যৎ এখনো আমার হাতেই আছে।তো এই পরিবারকে সুখে রাখার জন্য কোনটা করা ঠিক আর কোনটা করা বেঠিক সেই বুদ্ধি এখনো লোপ পায়নি আমার"
দাঁত কিড়মিড় করে রাগে কেপে উঠলেন ফাহাদ শেখ,
"এই বিয়েতে এ পরিবারের কে এমন সুখে আছে?"
ফাহাদ শেখের হুংকারে মহুয়া বেগমের গলার জোর কমলো না বৈকি বাড়ল যেন,
"আমি"
মায়ের এমন দৃঢ় কন্ঠ শুনে ফুসে উঠা রাগটা কিছুটা দাবা পড়ল দুই শেখ আহমেদের।অতঃপর মহুয়া বেগম আবার বলে উঠলেন,
"আমার নাতি-নাতনীকে একসাথে দেখে আমি সুখে আছি।যেই সুখ তোরা কখনো তোদের মা-কে দিতে পারিসনি সেই সুখ পাচ্ছি আমি"
নজর ঝুকাতে বাধ্য হলেন দুই শেখ আহমেদ।মায়ের কড়া কন্ঠে এমন কষ্টের কথা শুনে রঞ্জক শেখও মাথা নামিয়ে নিয়েছেন।সময় নিয়ে মহুয়া বেগম আবার বললেন,
"আর,সাহিত্য এমন কি খারাপ কাজ করেছে?খারাপ কাজ তো বাদই দিলাম,শেখ পরিবারের সম্মান বাঁচিয়েছে সে।এখানে আমি তার কোনো ভুল দেখছি না।যা করেছে একদম ঠিক করেছে সে।এ বিষয়ে অযথা আর এমন চিল্লাপাল্লা না করে ভালো হবে মেনে নাও এই বিয়ে"
মহুয়া বেগমের শেষের কথা কর্ণকুহর হতেই গর্জে উঠলেন ফাহাদ শেখ,
"মানি না আমি এই বিয়ে!!আমার মেয়ের যোগ্য নয় সে!আমি কখনোই তার সাথে কল্পনার সংসার মেনে নিব না।আমার মরার পূর্ব মুহূর্তেও না!!"
কথা শেষেই ফাহাদ শেখ জোর পায়ে নিজের রুমের দিকে এগুলেন।তার পর মুহুর্তেই তোফায়েল শেখ শক্ত কন্ঠে মায়ের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,
"এই লোকের মেয়ে কখনোই আমার ঘরের বউমা হতে পারবে না আম্মা।সেটা সহ্য হবে না আমার"
মায়ের উদ্দেশ্যে বার্তা শেষ করে নিজের স্ত্রীর দিকে নজর দিলেন তোফায়েল শেখ।হুংকার ছাড়লেন তিনি,
"ভেবেছিলাম কানাডায় পাঠিয়ে মনে হয় তোমার ছেলে ঠিক হয়ে যাবে।কিন্তু সে তো আগের থেকেও বেশি উগ্র হয়েছে।বুঝাও তোমার ছেলেকে!!এসব পাগলামি বাদ দিয়ে ওই মেয়েকে আজকালের মাঝেই ডিভোর্স দিয়ে দিতে বলো!"
লাল বর্ণ ধারণ করা চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করে উল্টো দিকে ঘুরলেন তিনি।অতঃপর নিজ রুমের উদ্দেশ্যে চলে গেলেন।
দুই শেখ আহমেদ স্থান ত্যাগ করার পর সুক্ষ্ম সময়ের জন্য নিরবতা দেখা দিল পরিবেশে।অতঃপর ভারী কন্ঠেই মহুয়া বেগম হুংকার ছাড়লেন,
"সবাই কান খুলে শুনে রাখো!ওই দুই মাথামোটা ছাড়া যদি আর কেউ সাহিত্য আর কল্পনার বিয়ের বিরোধিতা করেছো,তাহলে শেখ ভিলায় থাকার আশা ভুলে যাও।ধাক্কা মেরে বের করে দেব!ওই দু'টো মাথামোটা যদি এহনাফ শেখের ছেলে হয়,তাহলে বলে রাখলাম!আমি এহনাফ শেখের স্ত্রী!আমার কথার উপর আর একটা কথাও হবে না!"
দুই শেখ আহমেদের মতো মহুয়া বেগমও তার শেষ বার্তা দিয়ে রুমে ঢুকে পড়লেন।শুধু দাঁড়িয়ে থাকলেন বাকি সদস্যরা।আজকের বিকেলটায় যা হয়ে গেল তা যেন অভাবনীয় ছিল সবার কাছে।
লতিফা শেখ শাশুড়ীর যাওয়ার পানে দেখে ভারী শ্বাস ফেললেন।ধীমি আওয়াজে বললেন তিনি,
"আম্মা প্রতিবার দুই ভাইজানকে কোনো না কোনো নাম তুলে গালি দিবেনই দিবেন।দুই রগচটা শেখ আহমেদ অবশেষে মাথামোটা উপাধি পেল?"
নজর ঘুরিয়ে সামনে দেখতেই অন্তর দিকে নজর পড়ল তার।ছেলেকে ডাকলেন তিনি,
"এই অন্ত!অমন খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে এখানে এসে সবকিছু খুলে বল দেখি,হয়েছেটা কি আসলে?"
অন্ত দৌড়ে এলো ডাইনিং টেবিলের কাছে।ছেলের এগিয়ে আসা দেখে রঞ্জক শেখও এগিয়ে এলেন।সবাইকে জড়ো করে অন্ত যেন পুরো ঘটনা পূঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ করে বলতে লাগলো।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
নিচের ঝড়-তুফান দাদির উপর ছেড়ে দিয়ে সাহিত্য দৌড় মেরেছে প্রেয়সীর রুমের দিকে।নিজের মাথার উপরে থাকা বড় আকারের বোঝটা এইমাত্র নামল যেন।সেই কবুল বলার পর থেকে তো ক্ষণিক আগের হওয়া পরিস্থিতিরই ভয় করছিল সে।তবে এখন আর ভয় নেই।সাহিত্যের প্রেয়সী এখন কোনো বাধা ছাড়াই সাহিত্যের।
সাহিত্যের ললনা যে বেশ কিছুক্ষণ থেকেই সাহিত্যের উপর রাগ করে রয়েছে।সেই রাগ তো আবার ভাঙাতে হবে,নাকি?স্বামীর মুখ্য কর্ম যে সেটি।না জানি পরে আবার ফাহাদ শেখ কল্পনাকে সাহিত্যের কাছে আসতে দেন কিনা?তখন তো সাহিত্যের আপসোস থেকে যাবে।তাই তো দৌড় মেরেছে ছেলেটা।
কল্পনার রুমের লক ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকবে অমনি আটকে পড়ল সাহিত্য।দরজা ভেতর থেকে লক করা।আর সাহিত্য যেটা ধারণা করেছিল সেটাই চলছে এই বদ্ধ রুমের ভেতরে।কল্পনা হাউমাউ করে কাঁদতে ব্যস্ত।প্রেয়সীর এমন কান্না শুনে হালকা মন খারাপ হলো সাহিত্যের।তবে পর মুহুর্তেই চিন্তা করে বসলো,বিয়ের দিন মেয়েরা কাঁদবে সেটা তো স্বাভাবিক।একটু নাহয় কাঁদুক।কিন্তু একায় কেন কাঁদবে?সাহিত্যের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদুক।
দরজায় ভারী হাতের কড়াঘাত বসালো সাহিত্য,
"কল্পনাআআ,দরজা খুল জানপাখি"
সাহিত্যের গলা শুনে কল্পনার কান্না কমলো না বৈকি বাড়লো।এতক্ষণ থেকে যদি বসে কাঁদছিল,তাহলে তো এবার নির্ঘাত বিছানায় শুয়ে কাঁদতে শুরু করেছে।
সাহিত্য আবারো কোমল কন্ঠে ডাকলো,
"দরজাটা খুলে দিয়ে কাঁদ"
ভেতর থেকে কল্পনা অভিমানী সুরে চেচিয়ে উঠল,
"খুলবো না আমি।যান এখান থেকে।আমার একটা কথাও আপনি শুনেন না।দেখছেন তো কি হচ্ছে।বাবা কখনোই মেনে নিবে না"
সাহিত্য ভারী শ্বাস ফেলে দরজার আরো একটু কাছে এলো,
"ওগুলো পরে দেখা যাবে।আগে তুই দরজাটা তো খুল"
"খুলবো না!খুলবো না!খুলবো না!"
কল্পনার অভিমান মিশ্রিত ভাঙা কন্ঠ শুনে আবারো ভারী শ্বাস ফেলল সাহিত্য।এমন সময় নিচ থেকে ফাহাদ শেখের শেষ বার্তা শুনা গেল।সেটা শুনেই যেন রাগটা উঁকি দিতে লাগলো সাহিত্যের মস্তিষ্কে।এবার আর কোমল থাকলো না সে।শক্ত হয়ে এসেছে তার কন্ঠটা,
"কল্পনা এই মুহুর্তে দরজা খোল,নাহলে কিন্তু দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকবো।তখন আমাকে দোষ দিতে পারবি না কিন্তু"
কথা শেষে হাতের মুঠ শক্ত করে দরজায় ধুমাধুম কড়াঘাত করতে লাগলো।এতো ভারী কড়াঘাত শুনে কল্পনার কান্না একদম বন্ধ।ব্যতিব্যস্ত হয়ে দৌঁড়ে এসে দরজা খুলল সে,
"কি হয়েছে?"
কান্না মিশ্রিত কন্ঠের অভিমানী সুরখানা যেন এখনো বদলেনি মেয়েটার।তবে সেই সুর উপেক্ষা করে সাহিত্য দেখতে লাগলো তার প্রেয়সীকে।গলার মালাসহ ওড়না খুলে মেঝেতে ছুড়ে মেরেছে।তবে সেগুলোর উপর রাগ ঝেড়েও যখন মন ভরেনি তখন চোখের বড় কণার নোনাজল গড়াতে শুরু করে।যার দরুন নাকসহ গাল দুটোও টুকটুকে লাল হয়ে আছে তার।আর সেই লাল মুখখানাই তো সাহিত্য দেখে আছে ক্ষণিক সময় ধরে।
সাহিত্যের এমন দেখে থাকায় কল্পনা আবারো বলে উঠল,
"কি সমস্যা?শান্তি মতো একটু কাঁদতেও দিবেন না?..."
কল্পনার কথাটার একদম পর মুহুর্তেই সামনে পা বাড়ালো সাহিত্য।কল্পনার দিকে নজর রেখেই এক হাতে পেছনের দরজা লাগিয়ে এসে জাপটে ধরল তাকে।এই জাপটে ধরা যেন শুধু জড়িয়ে ধরার কাতারে পড়ে না।আজ সাহিত্য যেন নিজের প্রেয়সীকে নিজের সাথে একদম মিশিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই জাপটে ধরেছে।সাহিত্যের হঠাৎ এমন জড়িয়ে ধরায় বেশ ভড়কালো কল্পনা।কান্না থামিয়ে যেন হতবম্ব হয়ে আছে।ভড়কানো নজর তার বন্ধ দরজার দিকে।
সাহিত্য এমন জড়িয়ে ধরায় কল্পনার উচ্চতার কারণেই সাধারণত তার মাথা গিয়ে ঠেকার কথা সাহিত্যের বুকের উপর।কিন্তু আজ যেন সেটা হলো না।সাহিত্য হেলে এসে কল্পনার কাধে মাথা ঠেকিয়ে দিয়েছে।এক হাত কল্পনার কমোড়ে থাকলেও আরেক হাত মাথার পেছনে।তবে দু'হাতের মাঝেই লেপ্টে রয়েছে কল্পনার উষ্কখুষ্ক চুলগুলো।
ক্ষণিক আগের থামা কান্নার তোপে সুক্ষ্ম হেচকি তুলতে শুরু করেছে কল্পনা।যার দরুন মৃদু কেপে-কেপে উঠছে সাহিত্যের হাতের বাধনে থাকা নব যুবতীর শরীর।সাহিত্যের শরীরের সেই পরিচিত ঘ্রাণের পাশাপাশি এবার সাহিত্যের বিড়বিড় করে বলা কথাটাও কানে এলো কল্পনার,
"সরি জানপাখি,ভেরি ভেরি সরি।আজ তোকে অনেক বকেছি,তাই না?তার জন্য সরি।তোর উপর দিয়ে আজ কি গিয়েছে বুঝছি আমি।কিন্তু তোর সাহিত্য ভাই তো তোর কিচ্ছু হতে দেয়নি।ঠিক সময় গিয়েছিলাম তো আমি।আমি থাকতে তোর কিচ্ছু হবে না"
কল্পনার যে এখন মানসিকভাবে একটু সান্ত্বনার প্রয়োজন সেটা ভালো করেই জানা আছে সাহিত্যের।একটা মেয়েকে কিছু ছেলে এমন তুলে নিয়ে যাওয়া মোটেও স্বাভাবিক বিষয় নয়।মস্তিষ্কে যে ভারী আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।কল্পনা এতক্ষণ যাবত নিজের মনের কোণের সেই সুক্ষ্ম ভয় কাউকে বুঝতে না দিলেও সাহিত্যের কাছ থেকে যেন লুকাতে পারেনি সেকথা।আর বর্তমানে সাহিত্যের এমন কথায় মনের খারাপ অনুভূতিগুলোকে যেন শক্ত খোলস ছাড়িয়ে বের করে আনতে বাধ্য হলো।
সাহিত্যের হঠাৎ এমন কথায় আবারো পানি গড়াতে লাগলো কল্পনার শুকনো চোখ জোড়া থেকে।ডুকরে কেঁদে উঠে ভাঙা গলা দিয়ে কথা বের করল মেয়েটা,
"আমার কত ভয় করছিল জানেন!হঠাৎ করে পেছন থেকে টান দিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়েছে।চিল্লাতে ধরেছিলাম তখন মুখ চেপে ধরেছিল।তারপরও হাত বাড়িয়েছিলাম জানালার দিকে,তখন হাতও চেপে ধরে।সামনের সিটে ওই নওশাদ চুপ করে বসে ছিল।আমি তো মনে করেছিলাম আমাকে আজকে মেরেই ফেলবে"
সাহিত্য পর মুহুর্তেই মাথা উঠিয়ে কল্পনার আদলখানা দুই হাতের মাঝে আবদ্ধ করে নেয়।প্রেয়সীর ভেজা দুই গালের পানি বৃদ্ধা আঙুলে হালকা মুছে দিল সে।কথা বলতে গিয়ে যেন সাহিত্যের শ্বাসটা কেপে উঠল,
"সেজন্যই তো পিটিয়েছি ওগুলোকে।তোর দিকে ভুলেও আর নজর দিবে না।আর যদিও দেয়...আই সোয়্যার!...এবার অবশিষ্ট জানটাও বের করে নিব একদম"
শেষের কথাটা কড়া গলায় বলে কল্পনাকে আবারো জড়িয়ে ধরল সাহিত্য।আর সেটাতে আপাতত এর জন্য যেন সব ভুলে বসলো কল্পনা।সাহিত্যের শক্ত বাধনে যেন গুটিয়ে গেল মেয়েটা।মনের ভেতরে জমে থাকা সবটুকু ভয় কান্নার মাধ্যমেই বের করে দিল সে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
কল্পনাকে কিছুটা শান্ত করে তাকে এক প্রকার ঠেলেই ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে দেয় সাহিত্য।আর এখন নিজের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে আছে সে।কি যে ভাবছে,কে জানে?
তবে ক্ষণিকের নিরবতা চিড়ে একদম লাফিয়ে উঠে উল্টো দিকে ঘুরে শারুক খানের সেই বিখ্যাত পোজখানা দিল।তার পরপরই নিঃশব্দে নাচতে শুরু করল।বিকেলের এতো মারামারিতে ক্লান্ত হওয়া শরীরের ম্যাজ-ম্যাজ ভাব ছাড়িয়ে যেন প্রেয়সীকে নিজের করে পাওয়ার খুশিতেই নাচছে সে।নাচতে নিয়েই কল লাগালো তার জিগ্রি বন্ধুকে।
বাংলাদেশের সময় এখন বিকেল পেড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে এগুলেও,কানাডায় এখন ভোর-ভোর সময়।এমন সময় ফোনে কল আসায় বেড সাইড টেবিলে চোখ বন্ধ করেই হাতড়াতে লাগলো ভিকি।ক্ষণিকের আলসেমি কসরত করে ফোন হাতে পেতেই কানে চেপে ধরল সেটা।ঘুমের মধ্যেই বলে উঠল সে,
"হ্যালো?"
সাহিত্যের উল্লাসে ভরা কন্ঠ,
"ভিকি!আমি বিয়ে করেছি!"
অস্ফুটস্বরে ভিকির উত্তর,
"ও...আচ্ছা...রিসিপশনের দাওয়াত দিস"
সাহিত্য নাচ থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।বুঝলো,যে ভিকি ঘুমের মধ্যে আছে।চেচিয়ে উঠল সে,
"আব্বে শালা!আমি কল্পনাকে বিয়ে করেছি!!"
এবার আর ভিকি ঘুমের মধ্যে থাকলো না।চোখ জোড়া ধীরে-ধীরে খুলতে নিয়েই রসগোল্লা হয়ে এলো তার।গলার স্বর উঁচিয়ে তরাত করে উঠে বসলো সে,
"কি!!"
পাশে শুয়ে থাকা এশা ঘুমের মাঝেই ভিকির পিঠে চাপোড় বসালো,
"ওহো,চুপ করো তো"
এশার অস্ফুটস্বর একদম উপেক্ষা করেই ভিকি কান থেকে ফোন সাড়িয়ে মুখের সামনে ধরল।যখন নিশ্চিত হলো যে এটা সাহিত্যই কল করেছে তখন আবার কানে চেপে ধরল।ব্যতিব্যস্ত হয়ে বিছানা ছাড়তে নিয়েই বলল সে,
"অহি ফাজলামি করিস না!"
সাহিত্য বিছানায় বসে দুই হাটুতে দুই হাত ঠেকিয়ে দিয়েছে।ঠোঁটের কোণের হাসি না সড়িয়েই বলল সে,
"আমি ফাজলামি করছি না।আম ড্যাম সিরিয়াস"
বেলকুনির দরজা খুলতেই ভোরের হালকা বাতাস আছড়ে পড়ল ভিকির চোখে-মুখে।সেটা উপেক্ষা করে মাথার চুল খামচে ধরল সে,
"কেমন করে?কল্পনা যে মানছিল না?আর ফাহাদ আঙ্কেল সেটা হতে দিল কেমন করে?!"
ভিকির এতো প্রশ্নে মেকি হাসলো সাহিত্য।অতঃপর কম কথায় পুরো কাহিনী খুলে বলল।সেই কাহিনী যেন বড়ই রোমাঞ্চকর ঠেকলো ভিকির কাছে।এতক্ষণে তো কানাডার আকাশে অন্ধকার চিড়ে আলো ফুটে উঠেছে।সেই আকাশের দিকে দেখেই ভারী শ্বাস ফেলল ভিকি,
"অহি রে...তোর এতো বড় ঝামেলা এতো সহজেই পাড় হয়ে গেল?"
হাসলো সাহিত্য,
"আলহামদুলিল্লাহ পড়"
ভিকিও হেসে উঠল,
"আলহামদুলিল্লাহ!আলহামদুলিল্লাহ!"
সাহিত্য আরো কিছু বলতে যাবে এমন সময় দরজায় নক করার শব্দে মাথা তুলল সাহিত্য।ভেতরে আসার কথা বলতেই সামিয়া দরজা হালকা খুলে মাথা ঢুকিয়ে দিল,
"আম্মু তোমাকে এক্ষুনি অন্ত ভাইয়ার রুমে ডাকলো"
ভ্রু কুচকালো সাহিত্য।সেটা দেখেই বলল সামিয়া,
"বাবা,মেঝো চাচু আর দাদি বাদে সবাই ওখানেই আছে।আম্মুর মেজাজ অনেক হট দেখলাম"
সাহিত্য হাত নাড়াতেই সামিয়া রুম ত্যাগ করল।আর এদিকে ভারী শ্বাস ফেলে ভিকির উদ্দেশ্যে বলল সাহিত্য,
"আব্বু আর শশুর আব্বার ঝাড়ি দেওয়া হয়েছে,এখন আম্মু আর শাশুড়ী আম্মার ঝাড়ি খাবো.."
কথাটা বলেই সাহিত্য বেশ লজ্জা পেয়ে এক হাতের পেছনে মুখ ঢাকলো,
"শশুর আব্বা-শাশুড়ী আম্মা।বলতেই কি মজা লাগছে"
"হয়েছে।এখন এতো ঢং না করে গিয়ে আন্টির ঝাড়ি খেয়ে আয়"
ভিকির কথায় বেশ বিরক্ত হলো সাহিত্য।নতুন-নতুন অনুভূতির একটু মজাও নিতে দিচ্ছে না এই ছেলেটা।তাই তো আর কোনো কথা না বলেই কল কেটে দিল।অতঃপর রুম থেকে বেড়িয়ে পড়ল সে।
অন্তর রুমের দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে অন্তর ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে আসে।দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই বেশ ভড়কালো সাহিত্য।তিন গিন্নি সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আছে।আর তাদের পাশেই অন্ত আর রঞ্জক শেখ দাড়িয়ে।
সাহিত্য রুমে ঢুকে নজর সামনে রেখেই পেছনের দরজা লাগালো,
"আম্মু,ডাকলে?"
পরপরই কিছু বললেন না আমেনা শেখ।তবে বাকি সবাই আড় চোখে আমেনা শেখকেই দেখছে।ছেলের উপর যে তিনি চটে আছেন সবাই বুঝছে সেটা।তবে হেনা শেখ অন্যমনস্ক।তার ভাব-ভঙ্গি দেখে বুঝা যাচ্ছে না তেমন কিছু।মেয়ের অমন এক পরিস্থিতিতে পড়া,তারপর সাহিত্যের সাথে বিয়ে...বিষয়গুলো যেন এখনো গোলমিল পাকাচ্ছে তার মাথায়।
আমেনা শেখ এগিয়ে এলেন সুক্ষ্ম।ভারী কন্ঠে শুধালেন,
"তুই কল্পনাকে পছন্দ করিস?"
সবাই হালকা ভড়কালেও সাহিত্য সুক্ষ্ম সময়ের জন্য মায়ের শক্ত নজরের দিকে দেখে নিচু করে নিল সেই নজর।শান্ত ও ধীমি আওয়াজে বলল,
"হ্যাঁ"
আবারো সময় নিয়ে শুধালেন আমেনা শেখ,
"আগে থেকেই করতি?"
"হ্যাঁ.."
এবারও সাহিত্যের কন্ঠ শান্ত ছিল।কিন্তু আমেনা শেখ শান্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন না।সাহিত্যের উত্তরের একদম পর মুহুর্তেই তার বাম গালে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দেন তিনি।হঠাৎ এমন এক কান্ডে লতিফা শেখ ও রঞ্জক শেখ আবারো ভড়কালেন।সাথে সুক্ষ্ম কন্ঠে 'ভাবি!' বলে উঠেন তারা।
পেছনের দুই ব্যক্তি সুক্ষ্ম প্রতিক্রিয়া করলেও সাহিত্য একদমই নড়ল না।মায়ের হাতের চড়ে এই যে ঘাড়খানা ডান দিকে কাত করে নজর নিচু করেছে,আর যেন চোখ তুলে অব্দি দেখছে না মায়ের দিকে।
#চলবে