#পর্ব_৭৭
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
প্রতিদিনের মতো আজও রাতের খাবারের সময় ডাইনিং টেবিলটা নিশ্চুপ হয়ে আছে।তবে দুই শেখ আহমেদের মুখোশ্রি যেন একটু বেশিই গম্ভীর।বিকেলের এতো চিল্লাপাল্লার পর সেটা অবশ্য মানানসই।তবে সেই দুই শেখ আহমেদসহ উপস্থিত সবাই একটাই কামনা করছে যে ডাইনিং টেবিলটা তাড়াতাড়ি ফাঁকা হলেই তাদের রেহাই।আরেক দফা ঝগড়া করার বা দেখার ইচ্ছা যে কারোই নেই।
পরিবেশ একদম থমথমে ছিল।বলতে গেলে শুধু চামুচ-বাটির টুকটাক আওয়াজ।কিন্তু পরিবেশের পরিবর্তন ঘটন কল্পনা সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর।স্বাভাবিকভাবেই কল্পনা মাথা নিচু করে দৈন্দিন যেখানে বসে সেখানেই বসে পড়ল।সামনের প্লেট উল্টাতে যাবে এমন সময় তাকে ভারী কন্ঠে ডাক দিলেন মহুয়া বেগম,
"কল্পনা"
মাথা তুলে উত্তর করল কল্পনা,
"হ্যাঁ দাদি?"
"ওখান থেকে উঠে এসে সাহিত্যের পাশে বস"
মহুয়া বেগমের কথায় কল্পনার চোখ জোড়া ক্ষণিকের জন্য কটোর থেকে বের হয়ে আসতে লাগলো।কল্পনা যেমন ভড়কেছে তোফায়েল শেখ ও ফাহাদ শেখও তেমন ভড়কেছেন।বাকিরা চুপ থাকলেও সাহিত্য মিটিমিটি হাসতে ব্যস্ত।কিন্তু কল্পনা পর মুহুর্তেই ভ্রু নেতিয়ে মুখখানায় কাঁদোভাব এনে দাদির উদ্দেশ্যে ডানে-বামে মৃদু মাথা দোলালো।অমনি হুংকার ছাড়লেন মহুয়া বেগম,
"মাথা দোলাচ্ছিস কেন?উঠে এসে সাহিত্যের পাশে বস!"
কল্পনা আড় চোখে নজর দিল দুই শেখ আহমেদের দিকে।তাদের মাঝে রাগ উদয় হলেও খাবার খাওয়ায় নিজেদেরকে ব্যস্ত রেখেছেন তারা।কল্পনার নড়াচড়া না দেখে মহুয়া বেগম আবারো শক্ত কন্ঠে শুধালেন,
"কল্পনা,কানে কথা যায়নি?"
দাদির আদেশে মাথা নিচু করেই উঠে দাড়ালো কল্পনা।অতঃপর গিয়ে সাহিত্যের ডানদিকে বসে পড়ল।ডাইনিং রুমে আসার পর থেকে কল্পনা সাহিত্যের দিকে একবারই চোখ তুলে দেখেনি।দেখবেই বা কেমন করে?কিছুক্ষণ আগে প্রীতির বলা কথাগুলোতে এখনো বেশ লজ্জায় আছে সে।
বাড়ির তিন গিন্নিদের মুখে এতক্ষণে হালকা হাসি ফুটল যেন।দুই শেখ আহমেদ মাথা নিচু করে খাবারে মনযোগ দিলেও বাকি সবার নজর শেখ ভিলার নতুন কপোত-কপোতীর উপর।লতিফা শেখ তো দুই জা এর কানে ফিসফিস করে বলেও উঠলেন,
"ভাবি দেখেন।দুজনকে একসাথে কি সুন্দর লাগছে না!মনে হচ্ছে রাবনে বানা দি জোরি!"
আমেনা শেখ সাহিত্য আর কল্পনার দিকে এক নজর দিয়ে লতিফা শেখের উদ্দেশ্যে ফিসফিসিয়ে বললেন,
"ধুর!অমন করে বলিস না তো।নজর লাগবে"
লতিফা শেখের কথাখানা ফাহাদ শেখের কান অব্দি পৌঁছায়।খাওয়া থামিয়ে চোয়াল শক্ত করে তিনি ভারী নজর ফেলেন সাহিত্যের দিকে।ফাহাদ শেখ যার দিকে ভারী নজর ফেলেছেন তার যেন কোনো চিন্তাই নেই।ছেলেটা কি স্বাভাবিক ভাব-ভঙ্গি নিয়ে খাবার খাচ্ছে।একটু পরপর মাথা ঝুকে রাখা কল্পনার দিকে হেলে এসে জিজ্ঞেসও করছে তার কিছু লাগবে নাকি।এই মুহুর্তে আবার কল্পনার পানির গ্লাসে পানিও ঢেলে দিল।সেটা দেখেই ফাহাদ শেখের শরীরের পানি রূপী রক্তগুলো টগবগ করে উঠছে।
হাতের জগটা রাখতে নিয়েই সাহিত্যের চোখাচোখি হলো ফাহাদ শেখের সাথে।ফাহাদ শেখের লাল চোখের দিকে সাহিত্য অবুঝের মতো কিছুক্ষণ শান্ত নজরে দেখে গেল।অতঃপর ঠোঁট হালকা বাকিয়ে শুধালো,
"মেঝো চাচু,কিছু লাগবে?"
সাহিত্য ফাহাদ শেখের সাথে কথা বলেছে সেটা কর্ণকুহর হতেই কল্পনা তরাত করে মাথা তুলে সাহিত্যের দিকে দেখলো।তবে ওই ফাজিল প্রীতির কারণে সেই সুদর্শন যুবককে নিয়ে উল্টাপাল্টা ভাবনাগুলো মস্তিষ্কে আবার উদয় হওয়া মাত্রই যেমন করে মাথা উঠিয়েছিল ঠিক তেমন করেই নামিয়ে নিল।কিন্তু এদিকে যে ফাহাদ শেখের চোখের লালভাবখানা আরো বাড়তে শুরু করেছে।সাহিত্যের হঠাৎ এমন প্রতিক্রিয়ায় পর মুহুর্তে ভড়কে উঠলেও এখন সাহিত্যের দিকে নজর রেখেই রাগে ফোসফোস করছেন তিনি।সময় নিয়ে শক্ত কন্ঠে সাহিত্যের প্রশ্নের উত্তর করলেন,
"আমার মেয়েকে লাগবে"
সাহিত্য নিজের শান্ত নজর ধীরে-সুস্থে ঘুরিয়ে কল্পনার দিকে নিয়ে গেল।অতঃপর ঠোঁটের হাসি ধরে রেখে হাতের জগ রাখতে নিয়েই বলে উঠল,
"সরি।ওটা সম্ভব না"
ফাহাদ শেখ মাথা নিচু করে ভারী শ্বাস ফেললেন।তার রাগটা যেন কিছুতেই কমছে না।নিজেকে সংযত করে এবার নজর কল্পনার দিকে দিলেন,
"কল্পনা"
বাবার ভারী কন্ঠে তরাত করে উঠল কল্পনা,
"হ্যাঁ বাবা?"
"আজ রাতেই মধ্যেই রুম সিফট করে নিচে চলে এসো...ওই দোতলায় যেন এখন থেকে না দেখি তোমাকে"
সাহিত্যের দিকে নজর ঘুরাতে নিয়েই শেষের বাক্যখানা বললেন ফাহাদ শেখ।কিন্তু একদম পর মুহুর্তেই মহুয়া বেগম খাওয়ায় মনযোগ রেখেই শান্ত স্বরে বললেন,
"হ্যাঁ কল্পনা,তোর রুম তো এখন বদলাতে হবেই...তবে নিচে নয়,পাশের রুমে।কাল থেকে তুই সাহিত্যের রুমে থাকবি"
মহুয়া বেগমের কথায় কল্পনা আবারো চমকে উঠল।সাহিত্য মাথা নিচু করে ঠোঁট বাকিয়েই রয়েছে।তাকে যেন কিছু করতেই হচ্ছে না।তার দাদিটা নিজ থেকেই সব ঠিক করে দিচ্ছে।এমন দাদি যেন সবার ভাগ্যেই জুটুক!
সাহিত্যসহ বাকি সবাই লুকিয়ে হাসলেও দুই শেখ আহমেদের মুখোশ্রি পূর্বের ন্যায় আবারো উল্টো।তোফায়েল শেখ হয়তো পণ করে রেখেছেন যে তিনি আজ আর কথা বলবেন না।কিন্তু মহুয়া বেগমের মুখে এমন কথা শুনে খাওয়া চলতি রেখেই টেবিলের উপর দাড় করে রাখা বাম হাতের আঙুল ঠেকালেন মাথার দুই চিপে।
তবে এদিকে ফাহাদ শেখ গর্জে উঠলেন মহুয়া বেগমের উদ্দেশ্যে,
"আম্মা আপনি একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছেন!"
শান্ত কিন্তু গম্ভীর কন্ঠ মহুয়া বেগমের,
"বাড়াবাড়ি আমি না,তুই করছিস।বিয়ে হয়েছে ওদের,তো একই রুমে থাকবে না?নিচের রুমে কেন আসবে?"
মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে ফাহাদ শেখ ফুসে উঠলেন,
"আমি আর কতবার বলব,যে আমি এই বিয়ে মানি না?"
কল্পনার দিকে ঘুরে আবারো গর্জে উঠলেন তিনি,
"কল্পনা!!খাওয়া শেষ করে উঠেই তুমি নিচের রুমে সিফট হবে!"
এবার মহুয়া বেগম ভাতের প্লেট থেকে চোখ তুললেন,
"কল্পনা সাহিত্যের রুমে সিফট হবে"
মায়ের দিকে আবারো ঘুরলেন ফাহাদ শেখ।বাম হাতের ভারী মুষ্টি টেবিলে মেরে কড়া কন্ঠে বললেন,
"না!কল্পনা নিচে সিফট হবে"
ফুসে উঠলেন মহুয়া বেগমও,
"তুই আমার উপর কথা বলছিস?কল্পনা সাহিত্যের রুমেই সিফট হবে!"
"আমি ওর বাবা হই!বললাম যে ও নিচে সিফট হবে মানে নিচেই সিফট হবে!"
"আমি ওর বাপের মা হই!কল্পনা সাহিত্যের রুমেই সিফট হবে!"
ফাহাদ শেখ ও মহুয়া বেগম যেন হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করতে শুরু করলেন।সবাই একবার ফাহাদ শেখের দিকে তো একবার মহুয়া বেগমের দিকে নজর ফেলছে।মিনিটখানেক পরও যখন তাদের সেই একই বাক্যের পুনরাবৃত্তি ঘটা বন্ধ হচ্ছে না তখন সেই ব্যক্তি মুখ খুলল যাকে নিয়েই এতো টানাটানি চলছে।
কল্পনা চোখ খিচে বন্ধ করে চেচিয়ে উঠলো,
"চুপ করো দু'জনে!!"
কল্পনার এমন হুংকারে ভড়কালো সবাই।বেচারা সাহিত্য তো হঠাৎ চমকে উঠেছে।
ফাহাদ শেখ ও মহুয়া বেগম যখন চুপ মেরে কল্পনার দিকে দেখলেন তখন কল্পনা জোর গলায় বলল,
"আমি না নিচে নামবো,আর না অন্য কারো রুমে যাবো।আমি যেখানে আছি সেখানেই থাকবো,আমার রুমে।এখন চুপচাপ দু'জন খাবার খাও"
ফাহাদ শেখ আর মহুয়া বেগম দু'জনই বলে উঠলেন,
"কিন্তু..."
কথা শেষ করতে পারলেন না তারা।তার আগেই কল্পনা আবার উঁচু গলায় বলে উঠল,
"কোনো কিন্তু না!আমি কোথাও সিফট হচ্ছি না"
ভারী শ্বাস ফেললেন মহুয়া বেগম।কিন্তু ফাহাদ শেখ রাগে ফুসতে নিয়েই মেয়ের দিকে দেখে আছেন।সময় নিয়ে শক্ত কন্ঠে বললেন তিনি,
"ঠিকাছে।কিন্তু আমি যেন তোমাকে এই ছেলের সাথে না দেখি।তাহলে কিন্তু আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না,বলে দিলাম।সেটা যেন মাথায় থাকে তোমার"
এতক্ষণ ধরে উঁচু গলায় কথা বললেও এবার মাথা নিচু করে নিল কল্পনা।মুখোশ্রিও কেমন যেন অন্ধকার হয়ে এলো।বুঝলো সে,যে ফাহাদ শেখ এতো সহজে মানবেন না।এতো সহজে মানবে কি?তার কথা শুনে তো মনে হলো এই ইহজীবনে তিনি এই বিয়ে কখনোই মেনে নিবেন না।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সারাদিনের এতো ধকলের পর এই মাত্র রুমে ঢুকলেন হেনা শেখ।ফাহাদ শেখ তো রাতের খাওয়া শেষেই রুমে চলে এসেছিলেন।বিকেলে সাহিত্যের সাথে ফাহাদ শেখের কথা কাটাকাটি হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তেমন ভালো করে কথা হয়নি স্বামী-স্ত্রীর মাঝে।হেনা শেখ আড় চোখে বিছানায় বসে থাকা স্বামীকে পরখ করে ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগুলেন।কল্পনার আজ বিয়ের বিষয়টা নিয়েও টু শব্দটি করতে পারেননি তিনি।স্বামীর কাছে কোন বিষয়ে কথা বলে লাভ আছে আর কোন বিষয়ে লাভ নেই,সংসার জীবনের ৩০টা বছরে হেনা শেখ ভালো করেই তা বুঝে গিয়েছেন।এই রগচটা লোকটা এমন শান্ত এক মেয়ের প্রেমে কেমন করে পড়েছিল সে কথা হেনা শেখকে আজও ভাবায়।
চুলের মধ্যে চিরুনিই চালাচ্ছিলেন হেনা শেখ।ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা ফোনটা বেজে উঠল তার।ফোনে নজর দিতেই দেখলেন সুবা কল দিয়েছে।আজকের এসব ব্যাপারে তো সুবাকে এখন অব্দি কিছু বলাই হয়নি।কল রিসিভ করার জন্য কেবল ফোনটা হাতেই তুলবেন হেনা শেখ।তখনই পেছন থেকে ফাহাদ শেখের গম্ভীর গলা শুনা গেল,
"কে?সুবা কল দিয়েছে?"
হালকা ঘাড় ঘুরালেন হেনা শেখ,
"হ্যাঁ"
হাতের ম্যাগাজিনের দিকে নজর রেখেই শান্ত কিন্তু গম্ভীর কন্ঠে ফাহাদ শেখ বললেন,
"আজকের কোনো বিষয়ে সুবাকে কিছু বলার দরকার নেই।অযথা টেনশন করবে ও।কল্পনাকেও বলে দিও,সুবাকে যেন কিছু না বলে"
হেনা শেখ সুক্ষ্ম আওয়াজে শুধালেন,
"কল্পনার বিয়ে হয়েছে এটা সুবাকে বলা উচিৎ না?"
ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাতে নিয়েই ফাহাদ শেখ আগের কন্ঠে বলে উঠলেন,
"কি বলা উচিৎ,আর কি বলা উচিৎ নয় সেটা আমার জ্ঞানে আছে।আর কিছুদিন পর এমনিতেও কল্পনার ডিভোর্স করাবো আমি।তো যেটা বলছি সেটা করো"
নিজের ভড়কানো ভাব লুকিয়ে হেনা শেখ বলে উঠলেন,
"ডিভোর্সটা...ভেবেচিন্তে করা উচিৎ না?মেয়ের ডিভোর্স হওয়ার পর অন্য জায়গায় বিয়ে দিবেন কেমন করে?"
ফাহাদ শেখ এতক্ষণ পর হেনা শেখের দিকে নজর দিলেন।কপালে ভাজ ফেলে বললেন তিনি,
"তোমার স্মরণ শক্তি কবে থেকে কমতে শুরু করল?তোমার বড় ভাইয়ের কথা এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে?শিকদার বাড়ির সবার সাথেই কথা হলো যে কল্পনার অনার্স শেষে মাহির আর কল্পনার বিয়ে হবে।সেটা কি মাথায় নেই তোমার?"
হেনা শেখের কন্ঠ বদলালো না।তিনি নজর নিচু করে বললেন,
"আমরা তো এতো পাকাভাবেও কথাটা বলে আসিনি।আপনি বলেছেন কল্পনা অনার্সটা আগে শেষ করুক।তারপর ওর মত নিয়েই বিয়ে হবে"
ফাহাদ শেখ আবারো নজর ফেললেন হাতের ম্যাগাজিনে,
"এখন ওর মত নেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই"
স্বামীর নজর ঘুরে নেওয়া দেখে ঝুকে রাখা নজর সেদিকে তুললেন হেনা শেখ,
"ভাইজান যদি কল্পনার বিয়ে এবং ডিভোর্সের কথা শুনে মানা করে দেন?"
"সন্ধ্যার দিকেই আরাফাত ভাইয়ের সাথে কথা হয়েছে আমার।সব খুলে বলেছি তাকে।মাহিরের সাথেও কথা হয়েছে।মাহিরের কোনো সমস্যা নেই।আর কল্পনাকে শিকদার বাড়ির সবাই যথেষ্ট স্নেহ করে।আব্বা বলেছেন কল্পনার ডিভোর্সের পরপরই মাহিরের সাথে তার বিয়ে করাবেন।আমি তো চাইছিলাম আজই ডিভোর্সটা করিয়ে দিতে।কিন্তু শুধু আম্মার পাগলামোর কারণেই ডিভোর্সটা করাতে পারছি না"
হেনা শেখের হালকা বিস্ময় মিশ্রিত চাহনি ফাহাদ শেখের দিকেই আটকে আছে।এই সুক্ষ্ম সময়ের মধ্যে ফাহাদ শেখ শিকদার বাড়িতেও কল করেছিল?আবার সবকিছু পাকাও হয়ে গিয়েছে?
কিছুদিন আগে কায়েস শিকদারের অসুস্থতার কথা শুনে যখন ফাহাদ শেখ ও হেনা শেখ শিকদার বাড়িতে যান তখনই কল্পনা আর মাহিরের বিষয়টা উঠে।আসল কথা হলো,কায়েস শিকদার অসুস্থ ছিলেনই না।মূলত ব্যস্ত বিজনেসম্যান ফাহাদ শেখের সাথে কথা বলতেই অসুস্থের কথাটা বলেছিলেন কায়েস শিকদার।তাই তো কল্পনা শিকদার বাড়িতে না যেতে চাইলেও কেউ জোর করেনি।গুরুজনদের মাঝে শুধু কথা হবে বলেই সেটা করা।তখন তো আর হেনা শেখ জানতেন না যে সাহিত্য কল্পনাকে পছন্দ করে।আর সেটা না হওয়াতেই যেন শিকদার বাড়ির কথাটা হালকা শক্ত হয়ে যায়।মাহির নিঃসন্দেহে অনেক ভালো ছেলে।কল্পনার জন্য উপযুক্তই বলা চলে।তাই ফাহাদ শেখও আর মানা করেননি।মাহির সবে মাত্র চাকরিতে জয়েন করেছে।আর কল্পনারও যেহেতু অনার্স শেষ হয়নি তাই বিয়ের কথাটা সেদিনই স্থগিত থাকে।ফাহাদ শেখ কায়েস শিকদারকে জানিয়েছেন,যে কল্পনার অনার্স শেষ করে তাকে মাহিরের কথা জানাবেন।মেয়ের পড়াশোনায় এখনই কোনো ব্যাঘাত দিতে তিনি চাচ্ছেন না।তবে ধরেই রাখেন যে কল্পনা মাহিরের বিষয়ে না করবে না।তবে হুট করে আজ সাহিত্য কল্পনাকে বিয়ে করে নিয়ে আসায় যেন সবকিছু ঘোলাটে হয়ে গেল।
স্বামীর সাথে কথা বলতে থাকায় বড় মেয়ে সুবার কলটা আর রিসিভ করতে পারলেন না হেনা শেখ।সেটা তো ক্ষণিক আগেই কেটে গিয়েছে।হেনা শেখ যখন এক ধ্যানে ফাহাদ শেখের দিকে দেখে আছেন তখন ফাহাদ শেখ তার দিকে নজর ঘুরিয়ে বললেন,
"মাহিরের বিষয়টা যেন এ বাড়ির কেউ না জানে।নাহলে ওই ছেলেটা আরেক কান্ড করে বসবে।আর ডিভোর্সের বিষয়টা আমি দেখে নিব।কিছুদিন গেলে এমনিতেই কল্পনা ওই ছেলের ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে যাবে।তখন নিজেই ডিভোর্স চাবে সে...আর আমার মনে হয় না কল্পনা আমার কথার বিপরীতে গিয়ে ওই ছেলের সাথে সংসার করবে।কারণ কারো ছেলের মতো আমি আমার মেয়েকে অতটাও অবাধ্য বানাইনি"
হাতের ম্যাগাজিন বন্ধ করতে নিয়ে বললেন তিনি,
"লাইট তাড়াতাড়ি অফ করে দাও।চোখে ধরছে আমার"
কথা শেষেই চোখের চিকন চশমা ছাড়িয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলেন ফাহাদ শেখ।স্বামীর পিঠের দিকে কিছু মুহুর্ত দেখে থেকে হেনা শেখ আবারো আয়নার দিকে ঘুরলেন।আগামীতে কি হবে ভাবারও সাহস পেলেন না তিনি।তবে মাহিরের বিষয়টা আসলেই কাউকে এখন না বলাই শ্রেয়।অযথা উপরি চিন্তা দিয়ে কল্পনার মন খারাপ করার তো কোনো মানেই হয়না।মেয়েটা একদিনেই অনেককিছু সহ্য করেছে।কিছুদিন একটু মাথাটা ফাঁকা রাখুক।কল্পনাকে সাহিত্যের সাথে খুশি দেখলে হয়তো ফাহাদ শেখ গলতে শুরু করবেন।নিজের আদরের মেয়ের খুশির চেয়ে বড় কিছু কি আর হতে পারে?
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সময়টা একদমই সকাল-সকাল নয়।বলতে গেলে ঘড়িতে এখন ১১টা বাজছে।নাহলে কি কল্পনাকে এসময় জেগে থাকা অবস্থায় পাওয়া যেত?এই মুহুর্তে বিছানায় শুয়ে উপন্যাসের বই পড়ছে সে।কিন্তু ঘুম থেকে উঠেছিল ভার্সিটি যাওয়ার উদ্দেশ্যে।তবে হেনা শেখ ক্ষণিক আগেই বলে গিয়েছেন কয়েকটাদিন একটু বাসায় থাকতে।মনটা একটু হালকা হোক তারপর নাহয় ভার্সিটির দিকে মুখ করবে।বাড়ির পরিবেশও শিথিল হয়ে আসবে সেকয়দিনে।গতরাতে ডাইনিং টেবিলের সেসব ঘটনার পর কল্পনা আর কারো সাথে কথা বলেনি।সোজা নিজের রুমে চলে আসে।উদ্দেশ্য তার একটাই।সাহিত্য ভাইয়ের থেকে দূরে-দূরে থাকা।কিন্তু সেটা যেন এই মুহুর্ত পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল।
আলো বাতাস প্রবেশ করতে থাকা রুমটার জানালা আর বেলকুনির দরজা খোলা থাকলেও রুমের দরজাটা আটকানো।তবে হ্যান্ড লক ঘুরালেই রুমে প্রবেশ করা সম্ভব।আর কেউ একজন আজ সেটারই সুযোগ নিয়েছে।
কল্পনার পড়নের পার্পেল রঙা থ্রিপিসের ওড়নাটা তো স্টাডি টেবিলের চেয়ারে ঝুলছে।ফ্যানের বাতাসে সেটা হালকা নড়লেও নিস্তব্ধ পরিবেশে বিছানার উপর চিত হয়ে শুয়ে হাতের বই পড়ছিল কল্পনা।এমন সময় পুরো নিস্তব্ধতা ভেঙে সবেগে রুমে ঢুকলো সাহিত্য।হঠাৎ কারো এমন দরজা খুলায় কল্পনা বেশ ভড়কেছে।বই থেকে চোখ সড়ানোর আগেই সাহিত্য ইতোমধ্যে কয়েক ধাপ পার করে এসেছে।ভড়কে থাকা মেয়েটা উঠার সময়ই পেল না।হাতের বই মুখের সামনে থেকে সড়িয়ে বলে উঠল,
"সাহিত্য ভাই...এমন করে রুমে ঢুকলেন কেন?"
সাহিত্য কল্পনার পায়ের দিকে এগুতে নিয়েই শান্ত স্বরে বলল,
"আমার বউয়ের রুমে ঢুকার জন্য আবার আমার পারমিশন লাগে?"
কথাটা শুনে কল্পনা ভড়কানোর ঠিক মতো সময়ই পেল না।একদম পর মুহুর্তে বিছানায় ঠেকানো কল্পনার এক পা সটান হাতে তুলে নিল সাহিত্য।সাহিত্যের এমন কান্ডে হেচকা টান খেল কল্পনা।বিছানার চাদর ধরতে গিয়ে যেন সেটাও পরিপাটি অবস্থা ছাড়িয়ে কল্পনার সাথে চলে এলো।বিস্ময় মিশ্রিত চাহনি সাহিত্যের দিকে রেখেই ভড়কানো কন্ঠে শুধালো মেয়েটা,
"সাহিত্য ভাই!ক-কি করছেন?"
সাথে-সাথেই উত্তর করল না সাহিত্য।কল্পনার বাম পা-টা নিজের কালো টি-শার্টে আবৃত বুকের বাম দিকে ঠেকিয়ে এক হাতেই আবদ্ধ রাখলো সেই পা।অতঃপর ডান হাতখানা ধুসর ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে সুক্ষ্ম রিনরিনি আওয়াজ তোলা সিলভার রঙা একখান নূপুর বের করল।নিজের সিনায় ঠেকানো প্রেয়সীর ফর্সা পায়ের দিকে নজর রেখেই হাতের নূপুর পড়াতে লাগলো সে।কোমল হাতে মসৃণ পায়ে নূপুর পরিয়ে দিতে নিয়েই বলে উঠল সাহিত্য,
"ভিকির হলুদের ফাংশন থেকে নোটিস করছিলাম।তোর পাগুলো কেমন যেন খালি-খালি লাগে।এগুলো অর্ডার করেছিলাম সেদিন রাতেই।কিন্তু প্লাটিনামের হওয়ায় দিতে দেরি করে দিয়েছে....সমস্যা নেই।দেরি করে দিয়েছে ভালোই হয়েছে।নিজে পরিয়ে দিতে পারছি"
সাহিত্যের কন্ঠের হাস্কিভাবখানা যেন কল্পনার ভালো করেই কর্ণকুহর হলো।স্তব্ধ রইল সে কিছুক্ষণ।তবে ক্ষণিক বাদে হুশ ফিরতেই সাহিত্যের হাতে আবদ্ধ পা-টা মোচড়াতে লাগলো,
"লাগবে না আমার নূপুর!আর পাগল হয়েছেন নাকি?এমন করে কে নূপুর পরায়?!"
কল্পনার উঁচু স্বরে সাহিত্য তার দিকে দেখে মেকি হাসলো শুধু।কি মধুমাখা রহস্যময়ই না সেই হাসি!তবে কল্পনার আরো কিছু বলার আগেই হাতের পা ছেড়ে দিয়ে কল্পনার নড়ার আগেই তার আরেকটা পা ধরে টান দিল সাহিত্য।সেটাতে কল্পনা আরো একটু এগিয়ে আসতে বাধ্য হলো সাহিত্যের দিকে।
এবার আর স্তব্ধ থাকলো না কল্পনা।পা মোচড়াতে নিয়েই চোখ খিচে বন্ধ করল সে।অতঃপর ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়ে ভাঙা গলায়ই বলতে লাগলো,
"সাহিত্য ভাই ছাড়েন!আমি বিছানা থেকে পড়ে যাবো।হাওয়ায় ভাসছি আমি!"
নিজেকে বাঁচানোর হালকা চেষ্টা করতেই বিছানায় দুই হাতের ভর দিয়ে পিছাতে চাইলো কল্পনা।কিন্তু সাহিত্য আরো একটু নিজের দিকে টান দিতেই হিতে বিপরীত হয়ে গেল।উপায়ান্তর হাপিয়ে উঠে ভারী শ্বাস ফেলতে লাগলো মেয়েটা।মাথাটাও ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে।সাহিত্যের দিকে চোখ ঘুরাতেও যেন লজ্জা লাগছে তার।ফর্সা কপোল জোড়া প্রতিবারের মতো এবারও লাল হয়ে উঠল।সাহিত্যের হাতের বিচরণ যে কল্পনা নিজের পায়ে সইতে পারছে না।বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরে রাখা হাত দুটো ইতোমধ্যে সুক্ষ্ম কাপতে শুরু করেছে।
সাহিত্য নূপুর পরানো শেষে নজর দিল বিছানায় বিধ্বস্ত অবস্থায় থাকা প্রেয়সীর দিকে।ঘাড়খানা অন্যদিকে ঘুরিয়ে চোখ খিচে বন্ধ করে রয়েছে কল্পনা।জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ায় বুকের উঠা-নামা যেন দৃশ্যমান।বাধন হারা লম্বা কেশগুলো এলোমেলো হয়ে আছে পুরো বিছানায়।আবারো শব্দহীন মেকি হাসলো সাহিত্য।অতঃপর নজর প্রেয়সীর দিকে রেখেই আলতো করে অধর ছোঁয়ালো হাতে আবদ্ধ থাকা পায়ের গোড়ালির ওপর।সেই সাথে নেশালো কন্ঠে বলেও উঠল সে,
"স্বামী আদর দিলে নিতে হয় জানপাখি"
সাহিত্যের ঠোঁটের এমন স্পর্শ যেন অপ্রত্যাশিত ছিল কল্পনার কাছে।সামনের সুপুরুষের অধর জোড়া নিজের পায়ে অনুভব করা মাত্রই সারা শরীরের শিরা-উপশিরারা শিউরে উঠল তার।ফলস্বরূপ সেই কোমল ছোঁয়াতেও যেন কুকড়িয়ে গেল মেয়েটা।কল্পনার খিচে ধরে রাখা পা-টা আলতোভাবেই বিছানায় রেখে রুমের বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এগুলো সাহিত্য।ট্রাউজারের পকেটে দুই হাত গুজে মনের মাধুরি দিয়ে এক গানের সুর মিলিয়ে শিষ ফুকাতে লাগলো সে।সেই গানটা যেন আশোকা মুভির সেই বিখ্যাত রোমান্টিক গানখানা।
সাহিত্য এক হাত দিয়ে পেছনের দরজা লাগিয়ে বেড়িয়ে গিয়েছে সেই কতক্ষণে।কিন্তু কল্পনা এখনো সেদিকে দেখে আছে।তার ভয়ার্ত নজরের সাথে ভারী শ্বাস এখনো বিদ্যমান।সাহিত্য তার পা ছেড়ে দেওয়ার পরেও এক ইঞ্চি নড়েনি সে।ঘাড় বাকিয়ে অমন শুয়ে থেকেই রুমের দরজার দিকে দেখে আছে।মনের ভেতর যেন হাজারটা প্রশ্ন।তার সাথে এখনে হলোটা কি!!কি ছিল ওটা!এমন করে কে নূপুর পরায়?যাকে নূপুর পরিয়েছে তার অর্ধেক জান বের করে ছাড়লো একদম।
❀প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত❀
#চলবে
🚫জরুরী কথা
প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত দেখে কেউ চিল্লাপাল্লা করিয়েন না!গল্প যেভাবে দু'দিন পরপর দিচ্ছিলাম সেভাবেই চলবে।আমি শুধু সাহিত্য আর কল্পনার দুই ধরনের প্রেম কাহিনী দুই অধ্যায়ে ভাগ করেছি।এতোদিন সাহিত্য আর কল্পনার মিষ্টি-মিষ্টি প্রেম কাহিনী চলছিল।আর এখন ঝাল-ঝাল প্রেম কাহিনী চলবে।তার ডেমো তো এই পর্বের শেষেই পেলেন🤭