ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৭৯তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৭৯

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

ধরণীর আকাশ চিড়ে সকালের আলো ফুটেছে বেশ সময় আগেই।বৈশাখ মাস হওয়ায় সূর্য আড়াল থেকে উঁকি দিতে যেন একটুও দেরি করেনি।দোতলার করিডোরের খোলা বারান্দাটায় ১০টার দিকের কড়া রোদটা পুরোপুরি অনুভব করা গেলেও করিডোরের ভেতরের দিকে যেন হালকা আবছা আলো এসে পড়ছে।মেঝে আর রুমের দরজায় খোলা বারান্দা থেকে আসা রোদের ছটা হালকা পড়ায় যেন এস্থেটিকভাব ফুটে উঠেছে সেই জায়গাটায়।আর যেই রুমের দরজায় এমন এক সুন্দর দৃশ্য ফুটে উঠেছে সেই রুম বর্তমানে বেশ শান্তশিষ্ট অবস্থায়।সাধারণত এমন অবস্থা সচরাচর দেখা যায় না।সারাদিনই তো ব্যস্তভাবে খোলা-বন্ধ হয়ে থাকে সেই রুমের দরজাটা।তবে এই সকালটায় এমন বিপরীত অবস্থা হয়ে থাকার কারণ আছে।এই মুহুর্তে সেই রুমের অধিকারী কল্পনা নামের মেয়েটি যে গভীর ঘুমে তলিয়ে।কিন্তু আজ যেন কল্পনার বদলে অন্য একজনের কারণে করিডোর এবং সাথে কল্পনার রুমখানা নিরবতা ভেঙে বেড়িয়ে এলো।

মেঝে ও কল্পনার রুমের দরজার শেষের দিকে কোণাকুণি হয়ে পড়া হালকা আলো যুক্ত পরিবেশে হঠাৎই দেখা মিলল এক জোড়া ব্যস্ত পায়ের।ডার্বি ব্লাক সু আর কালো ফর্মাল প্যান্টে আবৃত লম্বা পুরুষালী পা জোড়া ব্যস্ত হয়েই খটখট আওয়াজ তুলে কল্পনার রুমের দরজা পার করে হয়তো সিড়ির দিকেই এগুলো।সুক্ষ্ম সময়ের জন্য পা জোড়ার দেখা দেওয়ার পর আবারো নিস্তব্ধতা বিরাজ করল কল্পনার রুমের সামনেটা।তবে ক্ষণিক সময় বাদে সিঁড়ির দিক থেকে এক প্রকার হুড়মুড়িয়েই সেই পা জোড়া ছুটে এলো,এবং কোনো বাধা ছাড়াই কল্পনার রুমের দরজা খুলে ঢুকে পড়ল।

হাতের ফোনের কাজ সাড়িয়ে সেটা পকেটে ঢুকালো সাহিত্য।নজর সামনে দিতেই মুচকি হেসে পায়ের গতি বাড়ালো সে।সে যেমনটা আশা করেছিল সেটাই হয়েছে।কল্পনা বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমে বিভোর।তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে সাহিত্যের ব্যতিব্যস্ত আচরণ দেখে দিল,

"এই জানপাখি একটা চুমু দে তো।উঠ!উঠ!তাড়াতাড়ি উঠ তো!মিটিং আছে আমার।তাড়াতাড়ি একটা চুমু দে!"

ঘুমের ঘোরে হঠাৎ সাহিত্যের এমন তাড়াহুড়ো কথা শুনে হালকা চোখ খুলল কল্পনা।মাথা তুলে নজর দিল লম্বাচওড়া সাহিত্যের দিকে।ঘুমের মধ্যেই অস্ফুটস্বরে বলল সে,

"কি দিব?"

আবার সাহিত্যের ব্যতিব্যস্ত কন্ঠ,

"চুমু দিতে বলছি।তাড়াতাড়ি একটা চুমু দে,অফিসে যাবো আমি"

গভীর ঘুমের রেশ না কাটায় কল্পনা বুঝে উঠল না যে এই 'চুমু' নামক জিনিসটা কি।আর সাহিত্য সেটা তার কাছে কেন চাইছে?বুঝতে না পেরেই ভ্রু কুচকালো কল্পনা।আবারো অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,

"চুমু?ওটা আবার কি?আমার কাছে অমন কিছু নেই।বড় মাকে জিজ্ঞেস করেন।বড় মার কাছে থাকতে পারে"

কথা শেষেই কল্পনা উল্টো দিকে ঘুরে আবার কম্ফোর্টার মুড়ি দিল।হয়তো ঘুমিয়েও পড়েছে সাথে-সাথেই।

কল্পনার কথা শুনে সাহিত্য চমকালো,ভড়কালো,সাথে বিরক্তও হলো বটে!ভ্রু টানটান করে উল্টো দিকে ঘুরে থাকা কল্পনার উদ্দেশ্যে হালকা গলা উঁচিয়ে বলল,

"আমি চুমু তোর বড় মার কাছ থেকে কেন নিব?সেটার জন্য আমার বাপ আছে!অত ঢং না করে একটা চুমু দে বলছি!"

উত্তর করল না কল্পনা।এমনকি হালকা নড়লোও না।সেটা দেখে সাহিত্য আরো ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেল।অফিসের মিটিংয়ের সময় চলে যাচ্ছে।কিন্তু প্রেয়সীর আদরের ছোঁয়া ছাড়া যেন সে বাড়ি থেকেই বের হতে নারাজ।কল্পনা কোনো প্রতিক্রিয়া করছে না দেখে সাহিত্য ব্যস্ত পায়ে বিছানার ওপর পাশে এগুলো।কল্পনার মুখোমুখি হতেই ঘুমন্ত প্রেয়সীর আদলখানা দুই হাতে আবদ্ধ করে বালিশ থেকে হালকা উঁচু করে ধরল সে।অতঃপর শব্দ করে পুরো মুখোমন্ডল ভিজিয়ে চুমু খেল একদম।চুমু খেতে নিয়েই আলতো হাতে কল্পনার মাথাটা আবার বালিশে ঠেকিয়ে রাখলো।সাহিত্যের শেষ চুমুটা পড়ল কল্পনার ভেসলিনে লেপ্টানো ঠোঁট জোড়ায়।আর এক মুহুর্ত দাড়ালো না সাহিত্য।হুড়মুড়িয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল।

কল্পনার চোখ জোড়া খোলার আগে কুচকালো ভ্রু জোড়া।পিটপিট করে চোখ খুলে নাক-মুখও কুচকালো সে।ক্ষণিক আগে এখানে কি হয়ে গেল এখনো যেন সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।তবে ঘুমের রেশটা ভালোভাবে কাটতেই বেশ বিরক্তভাব দেখা দিল তার চেহারায়।পর মুহুর্তে খুত-খুত করে উঠে বালিশে মুখ গুজালো।মনে পড়ে গেল গত রাতে সাহিত্যের বলা কড়া বার্তা।

সেদিন দুপুরে বৃষ্টিতে ভেজার পর সাহিত্যের বদ্ধ রুমে হওয়া ঘটনায় কল্পনার বেহাল দশা হয়েছিল।মেয়েটার উপর লজ্জা এতোটাই ভার করেছিল যে পুরো এক দিন পার হতে চলল সাহিত্যের সামনে যায়নি সে।সে তো পণ করেছিল যে সাহিত্যের কাছেই ভিড়বে না।দুই শেখ আহমেদের কথা চিন্তা করেই সে কাজ করা।

কিন্তু কল্পনা যেন শুধু সেই একদিনই সাহিত্যের থেকে বাঁচতে পেরেছে।কারণ হুট করেই বড় এমাউন্ট ইনভেস্ট করতে চাওয়া এক ক্লায়েন্ট সাহিত্যের কোম্পানির দিকে এগিয়ে আসে।সেটা যেন সাহিত্য কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইছিল না।তাই তো কল্পনা সাহিত্যের হাত থেকে ছাড়া পেয়েছিল।কিন্তু বর্তমান রাতটাই যেন শেষ প্রহর।

লতিফা শেখ বগুড়া থেকে বেশ কিছু দইয়ের কাত্রি অর্ডার করে নিয়ে আসেন।সারাদিন সেগুলো খেয়েও যেন কল্পনার মন ভরেনি।যার দরুন রাত এখন ২টার সময় ফ্রিজের দরজা খুলে দাড়িয়ে দই খাচ্ছে সে।রান্নাঘরের খোলা জানালা দিয়ে আসা হালকা আলো আর ফ্রিজের আলো ছাড়া আশেপাশে কোনো আলো নেই।তাই তো ফ্রিজের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাহিত্যকে একদমই দেখতে পারেনি সে।তবে যখন চোখে পড়ল তখন একদম ভুত দেখার মতোই চমকে উঠে সে।সাথে বলেও উঠল,

"আপনি এখানে কি করেন?"

হাতের ফাঁকা পানির বোতল দেখিয়ে শান্ত স্বরেই বলল সাহিত্য,

"পানি নিতে এসেছিলাম"

কথাটা বলেই আবারো দুই হাত বুকে ভাজ করে দাড়ালো সাহিত্য।শান্ত শীতল চাহনি কল্পনার দিকেই।দেখেই বুঝা যাচ্ছে সে কল্পনার উপর বেশ চটে আছে।সাহিত্যের এমন চাহনিতে কল্পনা হালকা মোচড়ামুচড়ি করতে লাগলো।পাশকেটে চলেও যেতে পারছে না।খানিক সময় এলোমেলো নজর ফেলে হাতে থাকা দইয়ের কাত্রি সাহিত্যকে দেখালো সে,

"দ-দই খাবেন?"

সাহিত্যের গম্ভীর কন্ঠে শান্ত উত্তর,

"হুম"

উত্তর শুনে কল্পনা এগুলো রান্নাঘরের মাঝখানে থাকা টাইলস-সিমেন্টে আবৃত টেবিলের দিকে।রাতের আবছা আলোতেই হাতের চামুচ আর দইয়ের কাত্রি রেখে বাটি নেওয়ার জন্যই ঘুরেছিল কল্পনা।কিন্তু সাহিত্য যেন আর তাকে নড়তেই দিল না।কল্পনা ঘুরে দাড়ানোর পর মুহুর্তেই তার চিকন কমোড় দুই হাতের মাঝে আবদ্ধ করে নেয়,এবং বসিয়ে দেয় টেবিলখানার উপর।কল্পনা যেন অবাকের সপ্ত আসমানে।মেয়েটা টু শব্দ করারও সময় পায়নি।কিন্তু তারপরও এই মুহুর্তে মুখ থেকে কথা বের করতে গেলেই সাহিত্যের কারণে আর হয়ে উঠল না যেন।পুরো একদিনের পিপাসা মিটাতেই যেন মিষ্টি দইয়ে আবৃত প্রেয়সীর অধর ছুঁয়ে দেয় সাহিত্য।অতঃপর আবারো দূরত্ব বাড়িয়ে এক হাতে কল্পনার নরম গাল আবদ্ধ করে নেয়।খরখরে বৃদ্ধা আঙুল আলতো করে প্রেয়সীর গালে ঘষতে শুরু করে।ক্ষণিক আগের শীতল চাহনি ও শক্ত কন্ঠ যেন এক মুহুর্তেই কোমল হয়ে উঠল সাহিত্যের,

"কি ব্যাপার?কাল দুপুরের পর থেকে এমন পালিয়ে-পালিয়ে বেড়াচ্ছিস কেন?"

কল্পনা স্তব্ধ নয়নে সাহিত্যের দিকে তাকিয়ে।সাহিত্যের এমন হুটহাট ছোঁয়া যে এখনো স্বাভাবিকভাবে নিতে অভ্যস্ত হয়নি মেয়েটা।কল্পনার এমন চুপ করে থাকা দেখে মাথা নাড়িয়ে আবারো প্রশ্ন করল সাহিত্য,

"হুম?"

এবার ভ্রম কাটলো কল্পনার।সাহিত্যের শক্ত বুকে দুই হাত ঠেকিয়ে ঠেলতে লাগলো সে।দৃঢ় কন্ঠে বলল,

"কারণ আপনার থেকে দূরে থাকতে চাচ্ছি"

কল্পনার হাতের ঠেলায় একটু পিছাতে নিয়েছিল সাহিত্য। কিন্তু কল্পনার কথা শুনে আগের থেকেও বেশি কাছে এসে দাড়ালো।চোখ-মুখ অন্ধকার করে শুধালো ছেলেটা,

"এটা কেমন কথা জানপাখি?আমি তোর বিয়ে করা স্বামী হই,আর তুই আমার থেকে দূরে থাকতে চাইছিস?এটা কিন্তু আইন বিরোধী কাজ করছিস তুই"

সাহিত্যের আবারো কাছে আসায় হাসফাস করছে কল্পনা।তবে ক্ষণিকের মাঝেই নিজেকে সংযত করে চোখ-মুখ শক্ত করে বলল,

"দেখেন!আমি আজকেই বলে দিচ্ছি।যতদিন না বাবা আর বড় বাবা এই বিয়ে মেনে নিবে ততদিন আমি আপনার থেকে দূরে থাকবো।ওরা দুজন মেনে নিবে তারপরই আমি আপনার সাথে সংসার করব,তার আগে নয়"

সাহিত্য এতক্ষণে কল্পনার গালে ঠেকানো হাতটা নামিয়ে নিয়েছিল।কিন্তু আবারো ছোঁয়ালো হাতটা,

"কেন এমন বাচ্চাদের মতো করছিস?তুই ভালো করেই জানিস ওরা কেমন।মাঝখানে আমার জীবন অতিষ্ঠ বানাচ্ছিস কেন?"

তেতে উঠল কল্পনা,

"দেখেন সাহিত্য ভা.."

কল্পনার মুখের কথা আটকে গেল।মনে পড়ে গেল সাহিত্যের দ্বারায় গলায় বসানো কামোড়ের কথা।সাহিত্যের দিকে দেখে আমতা-আমতা করতে লাগলো সে।আর সাহিত্যও যেন এক ভ্রু উঁচিয়ে তার দিকে দেখে আছে।যেন কল্পনা মুখ থেকে 'ভাই' শব্দটা উচ্চারণ করা মাত্রই আবার কামোড় বসিয়ে দেবে।

পরিস্থিতি বুঝতে পেরে কল্পনা নিজেকে সংশোধন করে নিয়ে কথা বলতে শুরু করল,

"দেখেন!ওরা বাড়ির গুরুজন হয়।আর আমি বাবার সম্মতি ছাড়া সেদিকে কখনোই যাবো না।ভালো লাগছে না আমার"

কল্পনা কথা বলতে নিয়েই মাথা নিচু করল।সাহিত্য পর মুহুর্তেই কিছু বলল না।দুই হাত কল্পনার দুই পাশে টেবিলে ঠেকিয়ে ঝুকে এলো কল্পনার মুখ বরাবর।রাতের নিশুতি শান্ত পরিবেশে ভারী শ্বাস চলতি রেখেই ভারী কন্ঠে বলে উঠল সে,

"আমার থেকে যতই দূরে থাকার চেষ্টা করবি ততই কাছে টেনে এর থেকেও বেশি গভীরভাবে আদর করব তোকে।তোকে গভীরভাবে আদর করতে কিন্তু আমার কোনো সমস্যা নেই।ওটা তোর উপর নির্ভর করবে"

কথা শেষেই রান্নাঘর ত্যাগ করল সাহিত্য।মাথা নিচু করে রাখা কল্পনা যেন সেভাবেই স্তব্ধ রইল কিছুক্ষণ।সাহিত্যের কথাটুকু শুনে তো এটাই বুঝলো সে,যে কল্পনার ক্ষণিক আগের এতো কথা সাহিত্যের কানে বিন্দুমাত্র ঢুকেনি।

'সাহিত্য ভাইয়ের' জায়গায় 'সাহিত্য স্বামীর' এই রূপে যেন বেশ ভয়-ভয় করছে কল্পনার।না জানি আগামী দিনগুলোতে কি করবে?গত কাল দুপুরে কি আক্রমণটাই না চালিয়েছিল কল্পনার উপর!কল্পনার তো এখনো মাথায় ঢুকছে না যে সেটা চুমু ছিল নাকি ভ্যাকিউম ক্লিনার!অমন দাবিয়ে ধরে কে চুমু খায়?কল্পনার তো মনে হচ্ছিল তার পুরো জানটাই বের হয়ে যাচ্ছে।

সেদিন দুপুরে অমন জান বের করা আক্রমণ চালালেও আজ সকালে সাহিত্য খুবই নরমভাবে ভালোবাসার ছোঁয়া দিয়েছে কল্পনাকে।কিন্তু তারপরও মেয়েটা সইতে পারেনি।বালিশে মুখ গুজে রাখার পরও এখন আর ঘুম আসছে না।তাই তো বাধ্য হয়েই উঠে বসল সে।গত রাতে সাহিত্যের অধরের ছোঁয়ায় কল্পনার ঠোঁটের সুক্ষ্ম দইয়ের কণারা তো উঠে গিয়েছে।কিন্তু রয়ে গিয়েছে সাহিত্যের আদরের পড়স।কাল রাতে রান্নাঘর থেকে ফিরে নিজের ঠোঁট জোড়া যেন একে-অপরের সাথে মিলাতেই লজ্জা করছিল কল্পনার।অধর জোড়ার মাঝে সুক্ষ্ম দূরত্ব তৈরি করে তো রুমে কিছুক্ষণ পায়চারিও করেছে।সাহিত্য ভাইয়ের এসব ছোঁয়ায় কিছুতেই গলে পড়া যাবে না।গলেছে তো ফাহাদ শেখের ঝাড়ি খেয়েছে।অবশেষে অধর জোড়া পানি দিয়ে ধুয়ে ভেসলিন লাগিয়ে ঘুমিয়েছিল কল্পনা।কিন্তু আজ সকালে আবারো সাহিত্যকে আক্রমণ চালাতে হতো?আর সেটাতেই বর্তমানে কল্পনার গভীর ঘুমের বারোটা বেজে আছে।রাগের মাথায় বিড়বিড় করে সাহিত্যকে ঝাড়তে নিয়েই বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমের দিকে এগুলো কল্পনা।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

সকাল সাড়ে ১০টায় কল্পনাকে শেখ ভিলার প্যারাবোলা সিঁড়িটায় দেখে অবাক হলেন লতিফা শেখ।এই মেয়ে এতো সকালে কেমন করে উঠেছে?ভার্সিটি যেদিন করে থাকে না সেদিন করে তো ১২টার সময়ও গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকে।

মাথা নিচু করে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগুতে থাকা কল্পনার উদ্দেশ্যেই বাক্য ছুড়লেন লতিফা শেখ,

"কি রে কল্পনা?তুই এতো সকালে কেন উঠেছিস?"

মাথা নিচু করে এগুতে নিয়েই বিড়বিড় করে উঠল কল্পনা,

"সাত সকালে অত্যাচার চলছিল আমার উপর"

"কি বললি?"

লতিফা শেখের কথায় কল্পনা ভড়কালো।মাথা তুলে আমতা-আমতা করে বলে উঠল,

"ওই...ক্ষুধা লেগেছে"

ডাইনিং টেবিলের দিকে নজর যেতেই চমকালো সে।সাহিত্য পরোটা চিবোতে নিয়েই তার দিকে দেখে মুচকি হাসছে।সাহিত্যের মুচকি হাসির প্রতিক্রিয়ায় কল্পনা সরু চোখে দেখতে লাগলো তাকে।কিছুক্ষণ আগে কল্পনাকে অফিসে যাওয়ার ব্যস্ততা দেখিয়ে এতোগুলো চুমু বসিয়ে দিয়ে এখন শান্তি মতো পরোটা চিবোচ্ছে?

কল্পনার মনের প্রশ্নখানা লতিফা শেখই সাহিত্যকে করে বসলেন,

"তুই না বললি তোর মিটিং আছে,তো এখনো বসে আছিস কেন?"

শান্ত নজর লতিফা শেখের দিকে ঘুরালো সাহিত্য,

"মিটিং ক্যান্সেল হয়ে গিয়েছে"

সাহিত্যের কথা কানে ঢুকিয়ে কল্পনা এক চেয়ার টেনে বসার উদ্যোগ নিল।অমনি বলে উঠলেন লতিফা শেখ,

"এই তুই ওখানে কেন বসছিস?আম্মা তোকে সাহিত্যের পাশে বসতে বলেছে না?"

মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে বিরক্তভাবখানা চেহারায় রেখেই কল্পনা বলে উঠল,

"মানে দাদির সাথে এখন তোমরাও উঠে-পড়ে লেগেছো?বাসার সিচুয়েশন কি মাথায় ঢুকছে না তোমাদের?বাবা আর বড় বাবার চোখে পড়ে আমার মরার কোনো শখ নেই!"

লতিফা শেখ সাহিত্যের দিকে দেখে শান্ত স্বরে শুধালেন,

"সাহিত্য?দুই ভাইজান কি বাড়িতে আছে?"

সাহিত্য ভদ্র বাচ্চার ন্যায় ভ্রু কুচকে নিচের ঠোঁট উলটালো।অতঃপর ডানে-বামে মাথা নড়িয়ে লতিফা শেখের উত্তর 'না' সুচকে দিল।সেটাতে লতিফা শেখ আবার কল্পনার দিকে ঘুরলেন।হালকা শক্ত হলো তার কন্ঠ,

"বেশি কথা না বলে এখন চুপচাপ সাহিত্যের পাশে বসে পড়।অভ্যাস করতে হবে না?"

আদরের চাচীমা আজ আর আদরের মনে হলো না কল্পনার কাছে।কটমট করে ক্ষণিক সময় তার দিকে দেখে হনহনিয়ে গিয়ে সাহিত্যের পাশে ধপ করে বসে পড়ল।সেটাতে শান্ত ভঙ্গি সাহিত্যের।কল্পনা বসার পরপরই তার সামনে প্লেট দিয়ে তাতে একটা পরোটা তুলে দিয়ে তরকারি তুলতে লাগলো।কল্পনা সেই প্লেটের দিকে নজর রেখেই বুকে দুই হাত ভাজ করে মুখ মুচড়িয়ে আছে।তবে সাহিত্যের এমন স্বামী আদর দেখে নিঃশব্দে মুচকি হাসলেন লতিফা শেখ।

হেনা শেখ আর আমেনা শেখ দুই শেখ আহমেদের নাস্তার পর্ব চুকিয়ে একটু বিশ্রাম নিতেই রুমে ঢুকেন।ক্ষণিক বাদে দুপুরের রান্না চলবে তাই হয়তো সেই বিশ্রাম।লতিফা শেখ রঞ্জক শেখের কারণে আটকা পড়লে কিছুক্ষণ পর সাহিত্যও এসে হাজির হয়।সকালের নাস্তাটা তো তিনি এখনো করেননি।যার দরুন সাহিত্য আর কল্পনার সাথে লতিফা শেখও খেতে বসেন।সুক্ষ্ম কথা-বার্তার মাঝেই সাহিত্য আড় চোখে মুখ ভোতা করে থাকা কল্পনার দিকে দেখে লতিফা শেখের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,

"ছোট চাচী,যে দইগুলো নিয়ে এসেছিলে,ওগুলো তো মজাই লাগলো"

সাহিত্যের কথায় লতিফা শেখের চোখ জোড়া জ্বলজ্বল করে উঠল,

"তাই না?বগুড়া থেকে অর্ডার করে আনিয়েছিলাম।তোদের বিয়েতে তো কোনো মিষ্টিই খাওয়া হয়নি।তাই ভাবলাম এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়ে যাবে।সবার দইও খাওয়া হয়ে যাবে আর দুই ভাইজান খাওয়ার পরেও বুঝতে পারবে না"

হাসি মুখে কথা শেষ করে ভ্রু কুচকালেন লতিফা শেখ,

"তুই তো কালকে দই খাসনি।তো টেস্ট বুঝলি কেমন করে?"

কল্পনা প্রথম থেকেই কথা না বলে শুধু খাবার চাবাচ্ছিল।কিন্তু ক্ষণিক আগে সাহিত্যের কথায় সেই খাবার চাবানোও বন্ধ হয়ে যায় তার।কল্পনা যেটা ধারণা করছে সাহিত্য লতিফা শেখের উদ্দেশ্যে সেই উত্তরই দিল,

"কাল রাতে খেয়েছি"

লতিফা শেখের চোখের আড়ালে কল্পনা চোখ-মুখ খিচে বন্ধ করল।কাল রাতের কথা কল্পনাকে এভাবে মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার ছিল?স্বপ্ন মনে করেই ভুলে যেত সে।কিন্তু এই মহান গ্রিক গর্ড সেটা আবার হতে দিচ্ছেন কই?

কল্পনার দিকে কোনো ভুরুক্ষেপ নেই লতিফা শেখের।তিনি সাহিত্যের দিকে নজর রেখেই বললেন,

"রাতে কখন?আমি তো দেখলাম না"

প্রেয়সীর লজ্জা বাড়াতে সাহিত্য আজ আর পিচপা হলো না।আর না ভবিষ্যতে পিচপা হবে।ঠোঁটের সুক্ষ্ম হাসি বজায় রেখেই সাহিত্য উত্তর করল,

"২টার দিকে।ক্ষুধা লেগেছিল তো তাই খেয়েছি"

লতিফা শেখের হাসি মাখা কথা,

"তো কেমন লাগলো বগুড়ার দই?"

প্রেয়সীর দিকে আবারো আড় নজরে একবার দেখে নিয়ে বলল সাহিত্য,

"মজা ছিল।মিষ্টি..নরম..গরম."

কল্পনা এই মুহুর্তে দাঁতে দাঁত পিষে কটমট করছে।কল্পনাকে এভাবে লজ্জায় ফেলার কোনো মানে আছে?অযথা এমন জ্বালাতন করছে কেন?!অসভ্য লোক একটা!!

বেচারি লতিফা শেখ স্ট্রেট ফরওয়ার্ড।তিনি এতো প্যাচগোচ বুঝলেন না।ভ্রু কুচকে শুধালেন তিনি,

"গরম?দই তো ফ্রিজে ছিল"

সাহিত্য এবার গলা খাকাড়ি দিয়ে বলল,

"ওই..বেশি ঠান্ডা ছিল তো তাই ওভেনে একটু গরম করে নিয়েছিলাম"

'ও আচ্ছা' বলে খাওয়ায় মন দিলেন লতিফা শেখ।আর এদিকে সাহিত্য পাশের ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বলল,

"অমন নরম-গরম বগুড়ার দই প্রতিদিন খেতে আমার কোনো সমস্যা নেই"

নিচু করে রাখা মুখটা বাম হাত দিয়ে ঢেকে লজ্জায় লাল হওয়া মুখোশ্রি নিয়ে কল্পনা কোনো প্রতিক্রিয়া না করলেও;লতিফা শেখ বলে উঠলেন,

"আচ্ছা দেখি তাহলে।আবার অর্ডার করব"

লতিফা শেখের কথায় সাহিত্য তার দিকে ঘুরে ঠোঁটের ভারী হাসি গিলে মাথা মৃদু দোলালো।তবে আর কিছু বলতে পারলো না সে।তার আগেই পাশে রাখা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল।সেটা কানে চেপে বেসিনের দিকে এগুলো সাহিত্য হাত পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে।লতিফা শেখও খাওয়া শেষ করে উঠে রান্নাঘরে ঢুকলেন।আর কল্পনা তো এখনো ঠাই বসে রয়েছে।সে তো খাবার খাওয়ার সময়টাই পায়নি।সাহিত্য যে অতিষ্ঠ করে রেখেছিল এতক্ষণ।লোকটা যেন ঘন্টায়-ঘন্টায় অসভ্যতার মাত্রা বাড়িয়েই চলেছে।এতোদিন কি শুধু মুখের দেখায় ভদ্র হয়ে ছিল সে?কল্পনা তো বিয়ের দিনই সাহিত্যের অমন অসভ্য কথা শুনে চমকেছিল।সেটাতেই যেন সয়ে গিয়েছে তার।কিন্তু দিন-দিন এর মাত্রা বাড়তে থাকলে তো কল্পনার ঘোর বিপদ।

কল্পনার এতো ভাবনার মাঝেই সাহিত্য আবার ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে দাড়ালো।টেবিলে রাখা মানিব্যাগ পকেটে ঢুকিয়ে হাতে গাড়ির চাবি উঠালো সে।অতঃপর ভাবনায় বিভোর থাকা কল্পনার মাথাটা আলতো হাতে নিজের দিকে টেনে নিয়ে অধর ছুঁয়ে দিল মাথার উপর,

"অমন বসে না থেকে খেয়ে নে তাড়াতাড়ি"

কথা শেষেই বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো সাহিত্য।আর কল্পনা হতবম্ব হয়ে দেখে থাকলো সেদিকে।ক্ষণিক বাদে চেহারাখানা কাঁদো-কাঁদো হয়ে এলো তার।এই লোকটা এই মুহুর্তেই কেন এতো আদর-সোহাগ দেখাচ্ছে কল্পনাকে?কল্পনা যে তার লক্ষ্য থেকে বারবার ছিটকে পড়ছে।আর সেটা হতে গিয়ে যে বারবার দুই শেখ আহমেদের চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার।আর সেই দৃশ্য যে বড়ই ভয়ংকর!

#চলবে

গল্পের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রচ্ছদের মতো দ্বিতীয় অধ্যায়টাও অনেক সুন্দর হতে চলেছে😌✨

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন