#পর্ব_৮১
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
বেশ কিছুদিন থেকেই রাজ শেখ ভিলায় যাতায়াত করছে।আর সেটার একমাত্র কারণ সাহিত্য অফিসে না যাওয়া।বিয়ে উপলক্ষে অফিসের সবাইকে বড় করে ভোজন খাওয়ায় সাহিত্য।সেই দিনই যেন সাহিত্যের শেষ আগমন ছিল অফিসে।রবি কিছু বললেই সাহিত্যের সোজাসাপটা কথা,
"বউটা তো আমাকে এমনিতেই কাছে যেতে দেয় না।যদি সারাদিন অফিসে পড়ে থাকি তাহলে আমার নব্য শশুর আব্বা যদি আমার বাচ্চা বউটার কান ভরে?"
নিজের বাচ্চা বউকে নিয়ে সাহিত্যের এমন বাচ্চামো কথা শুনে রবি আর রাজ বিরক্ত হয় বেশ।তবে অয়ন সাহিত্যকে সেই ব্যাপারে অনেক উৎসাহ দিয়েছে।যার ফলস্বরূপ অফিসের অতি প্রয়োজনীয় ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনা করতে রাজ এখন শেখ ভিলার সদস্যে পরিণত হয়েছে।
সিড়ি দিয়ে নামতে নিয়েই ড্রইং রুমে নজর পড়ল কল্পনার।সাহিত্য আর রাজ বসে অফিসের কথা-বার্তায় মত্ত।আরেক সোফায় অন্ত বসে।তবে সে ফোনে ব্যস্ত।
সামনে পা বাড়াতে নিয়েই সেদিকে দেখছিল কল্পনা।এবার নজর সেদিক থেকে ঘুরিয়ে জোর পায়ে মহুয়া বেগমের রুমে ঢুকলো সে,
"দাদি ডাকলে?"
মহুয়া বেগম হাতের বই থেকে নজর তুলে দরজায় দেখলেন।কিছুক্ষণ আগেই তিনি সামিয়াকে পাঠিয়েছিলেন কল্পনাকে ডাকার জন্য।কল্পনাকে দেখে হাতের বই বন্ধ করে চোখের চশমা খুললেন তিনি।কল্পনার দিকে না দেখেই বলে উঠলেন,
"সাহিত্যকে ডাক তো"
কল্পনা উল্টো ঘুরে দাড়ালো সামনে পা বাড়ানোর জন্য।কল্পনার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে মহুয়া বেগম পর মুহুর্তেই বলে উঠলেন,
"এখান থেকে ডাক দে"
কল্পনা ভড়কালো হালকা।পেছনে ঘুরে দাদির দিকে দেখলো,
"এখান থেকে কেমন করে ডাকবো?কাছে গিয়ে ডেকে আনছি"
"আমি এখান থেকে ডাকতে বলেছি এখান থেকেই ডাক।গলা উঁচিয়ে ডাকলে সাহিত্য এখান থেকেই শুনতে পারবে"
দাদির দিক থেকে ঘুরে দাড়ালো কল্পনা।তার চোখে দৃশ্যমান সাহিত্যের পিঠের দিকে একবার নজর দিয়ে এলোমেলো নজর ফেলতে শুরু করল।কল্পনা এখন কি বলে সাহিত্যকে ডাক দিবে?মহাশয় তো গলায় কামোড় বসিয়ে ওয়ার্নিং দিয়েছে 'সাহিত্য ভাই' যেন না ডাকে।এই কয়দিন থেকে সাহিত্য শুধু সামনে পড়লেই মুখ খুলে কল্পনা।তেমন ডেকে কথা বলা হয়ে উঠেনি।আর ডেকে কি কথা বলবে?সারাদিন তো কল্পনার পিছেই পরে থাকে সাহিত্য।মেয়েটাই যেন দৌড়ে পালিয়ে বেড়ায়।কিন্তু এখন কি করবে?সাহিত্যকে এতো দূর থেকে ডাকবেই বা কি বলে?
কল্পনার নড়চড় না দেখে মহুয়া বেগম আবারো চশমা চোখে দিয়ে বই হাতে নিলেন।মহুয়া বেগম জেনেশুনেই এই চাল চেলেছেন।কল্পনার গত কয়েকদিনের আচরণ তারও চোখে পড়েছে।মেয়েটার সংকোচ বোধ ভালো করেই বুঝছেন তিনি।কিন্তু এমন চলতে থাকলে তো চলবে না।উল্টো আরো ফাহাদ শেখের জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।সেটা হলে চলবে নাকি?নিজের শরীরের খারাপ অবস্থা মহুয়া বেগম ভালো করেই টের পাচ্ছেন।সেই হিসেবে নাতির কোলে পুতিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেখতে চান তিনি।সেই সাথে তোফায়েল শেখ ও ফাহাদ শেখকেও বুড়ো আঙুল দেখাতে চান।
হাতের বইয়ের পৃষ্ঠা উলটে শান্ত কিন্তু গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন মহুয়া বেগম,
"কি হলো?ডাকছিস না যে?"
মহুয়া বেগমের গলা একদম শান্ত থাকার পরও কল্পনা হাতে-পায়ে কেপে উঠল সেই আওয়াজ শুনে।সাথে 'হা?' বলে পেছনেও ঘুরলো।চশমার উপর দিয়ে নাতনির চোখ বরাবর দেখলেন মহুয়া বেগম।তবে কিছু বললেন না।দাদির শান্ত নজরের প্রশ্ন ভালো করেই বুঝলো কল্পনা।বাধ্য হয়ে আবারো সাহিত্যের দিকে নজর ফেলল সে।অতঃপর নিচু আওয়াজে থেমে থেমে বলে উঠল,
"এ-এই যে...সাহি...এই যে,শুনছেন?"
"তোর ডাক তো আমিই এখান থেকে শুনতে পারছি না।সাহিত্য কি খাক শুনবে?"
পেছন থেকে দাদির আবারো ঠান্ডা কন্ঠে কল্পনা চোখ-মুখ খিচে নিল।আর এদিকে আবার শুধালেন মহুয়া বেগম,
"আর কি 'এই যে-এই যে' করে ডাকছিস?আদর করে ডাকতে পারিস না?তোর মায়ের দেখে কিছু তো শিখ।ভালো করে ডাক!"
মহুয়া বেগমের শেষের কড়া কথায় কল্পনা ভড়কালো হালকা।তবে এখন বেশ রাগ উঠছে তার।সাহিত্যের দিকে দেখে দাঁত কিড়মিড়িয়ে উঠল।জোর করে বিয়ে করে এখন ঝামেলা পাকিয়ে রেখেছে।আর সেই সব ঝামেলা যেন শুধু কল্পনার জন্যই!
মুখ দু'পাশে মুচড়িয়ে ড্রইং রুমের উদ্দেশ্যে উঁচু গলায় হাক পাড়লো কল্পনা,
"ওগো শুনছো?এদিকে একটু আসো না!দাদি তোমাকে ডাকছে"
কল্পনার কথা শেষ হতেই রান্নাঘরের শিটির কড়া আওয়াজ কানে বাজলো ড্রইং রুমে উপস্থিত তিন যুবকের।অন্ত আর রাজ কল্পনার ডাকে চমকে উঠে নজর ঘুরিয়েছে সেদিকে।কিন্তু যাকে এতো আদর-সোহাগ দিয়ে ডাকা হয়েছে সেই ব্যক্তি চোখের কোটর যত বেশি ফাটানো সম্ভব ততটা ফাটিয়েছে।তবে স্তব্ধ নজর এখনো হাতের কাগজে।
অন্তর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসি খেলে গেল।সাহিত্যের দিকে ঘুরে বলল সে,
"ভাইয়া।তোমার বউ তোমাকে ডাকছে"
অন্তর কথার পর মুহুর্তেই মুখ বিকৃত করে সাহিত্য নিজের হাসিতে শ্বাসের প্রভাব ফেলে বলে উঠল,
"আরে না রে।আমার বউ অতটাও ভদ্র না।এতো সহজে সোজা হবে না ওটা"
কথা শেষে নজর রাখা হাতের কাগজ উল্টাতে লাগলো সাহিত্য।অন্ত সাহিত্যের দিকে নজর রেখে নিঃশব্দে হাসলেও রাজ বিভ্রান্ত ভরা চাহনিতে এখনো কল্পনার দিকে দেখে আছে।
সাহিত্যের কোনো উত্তর না পেয়ে কল্পনা আরো ফুসে উঠল।এবার আরো উঁচু গলায় চেচিয়ে উঠল সে,
"কি গো?আসো না একটু!"
রাজ নিজের বিভ্রান্তে ভরা মুখোশ্রি বজায় রেখেই সাহিত্যের দিকে ঘুরলো,
"স্যার...আসলেই ম্যাম আপনাকে ডাকছে"
আবারো কিছু মুহুর্ত স্তব্ধ রইল সাহিত্য।ক্ষণিক বাদে এক হাতের কাগজ টেবিলে রাখতে নিয়ে আরেক হাতে রাজের কাধে ভারীভাবেই চাপড় বসালো।অতঃপর মুখে কান্না মিশ্রিত হাসি ফুটিয়ে রাজের দিকে দেখলো,
"আমার বউটা আমাকে ডাকছে রে"
সাহিত্যের আচরণে ভ্যাবাচেকা খেল রাজ।তবে যান্ত্রিকভাবে উপর-নিচ মাথা দুলিয়ে গেল।নিজের কথা শেষেই সটান দাঁড়িয়ে পড়ে সাহিত্য।বেশ ভাব নিয়ে এক হাতে মাথার চুল ব্যাক ব্রাশ করল সে।হাতের কাজ শেষে সোফার পাশ কেটে লাফিয়ে কল্পনার উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল।
একদম জোর পায়ে এসেই কল্পনার হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চৌকাঠে হাত ঠেকিয়ে দিল।অতঃপর সেই হাতের নিচে থাকা প্রেয়সীর দিকে ঝুকে এসে মধুমাখা কন্ঠে শুধালো,
"ডাকলে গো?"
সাহিত্য এতো ভালোবাসা নিয়ে সামনের রমণীর দিকে দেখে আছে।অথচ সামনের রমণী মুখোশ্রিতে বেশ বিরক্তভাব নিয়ে সাহিত্যের দিকে দেখে।ক্ষণিক আগে থেকে সাহিত্যের কর্মকাণ্ড দেখে বেশ বিরক্ত সে।কোনো ভালোবাসাই ফুটে উঠছে না তার চেহারায়।
সাহিত্যের এতো কোমল কন্ঠে চোখ-মুখ কুচকে কিছু মুহুর্ত তার দিকে দেখে থাকলো কল্পনা।আর সেই সময়টা কাজে লাগিয়ে সাহিত্য আরো ঝুকে আসতে লাগলো কল্পনার দিকে।সাহিত্যের নষ্ট উদ্দেশ্য বুঝতে বেশি সময় লাগলো না কল্পনার।এই কয়দিনে সেই কাজে বেশ পারদর্শী হতে পেরেছে মেয়েটা।হঠাৎ-হঠাৎ যে আক্রমণ চালায় কল্পনার উপর!
সাহিত্যের সিনায় জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে মুখের বিরক্তভাব বজায় রেখেই ঝাজিয়ে বলল কল্পনা,
"আমি না!দাদি ডাকছে।শুনেন কি বলছে।নাতি-দাদি মিলে পাগল বানাচ্ছে আমায়"
কল্পনা কথা শেষেই হনহনিয়ে নিজের রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা দেয়।তবে এদিকে কেউ বেশ খানিকটা নিচের ঠোঁট উলটিয়ে সেদিকে দেখে থাকলো।এই ঠোঁট উলটানো ছেলেটাকে দেখে কে বলবে যে কিছু মাস পর ২৯বছরের ঘরে পা ফেলবে?বউয়ের আদরের অভাবে যেন এখনই ডুকরে কেঁদে ফেলবে ছেলেটা।বউ মানুষ কেমন এতো শাসন করে?তার মানে সাহিত্যের শুনা গুজব কি সত্য?যে বিয়ের পর বউরা মারধর করে?সেটাই তো মনে হচ্ছে।এখন বকাবকি করছে,কিছুদিন পর শাশুড়ীটার মতো ঝাটা নিয়ে পেছনে দৌড়াবে।
মহুয়া বেগমের দিকে ঘুরে দুঃখি মনেই ঝাজিয়ে উঠল সাহিত্য,
"দেখলে তো!কেমন করছে তোমার নাতি বউ!এমন করলে আমার মা নাতির মুখ কেমন করে দেখবে বলো তো একবার!!"
নাক কুচকালেন মহুয়া বেগম,
"এগুলো আমাকে বলতে লজ্জা করছে না?দাদি হই তোর!"
সাহিত্য এসে মহুয়া বেগমের সামনে বিছানায় শরীর ছেড়ে দিল।সিলিংয়ের দিকে নজর রেখে বলে উঠল সে,
"ওসব বাদ দাও।কি করি বলো তো?"
মহুয়া বেগম মাথায় হাত ঠেকালেন।নাতিকে দোষ দিয়ে লাভ কি?ছেলে মানুষ বিয়ের পর বউয়ের আদর চাইবে সেটাই তো স্বাভাবিক।কিন্তু কল্পনা যে শুধু খ্যাকখ্যাক করে উঠে সাহিত্যের সাথে।১৬ এপ্রিলের পর থেকে সাহিত্য আর কল্পনা দু'জনেরই আচরণের পরিবর্তন সবার চোখেই দৃশ্যমান।সাহিত্যের কর্মকাণ্ড সবার চোখের আড়ালে শুধু কল্পনার চোখে পড়লেও,কল্পনার হঠাৎ-হঠাৎ চিৎকার সবার নজরে পড়তে বাধ্য।সাহিত্য কাছে আসায় কল্পনার হঠাৎ সাইরেনের আওয়াজে সবার নজর তাদের দিকে পড়লে বেচারা সাহিত্য বেশ লজ্জায় পড়ে যায়।এলোমেলো আচরণ করতে শুরু করে সে।আর সেই সুযোগেই কল্পনা কেটে পড়ে।
মহুয়া বেগম সাহিত্যের প্রশ্নের শান্ত উত্তর দিলেন,
"এর মাঝে একদম আমাকে টানবি না।ওটা এখন আমার কথাও শুনছে না।নিজে বিয়ে করেছিস এখন নিজের বউকে নিজেই সামলা"
সাহিত্য চোখ-মুখ কুচকে মহুয়া বেগমের দিকে দেখল,
"কোনো কাজের নও তুমি"
সাহিত্য কথা শেষে উঠে রুম থেকে বেড়িয়ে পড়ল।মহুয়া বেগম পর মুহুর্তেই বেশ ভড়কালেন সাহিত্যের কথায়।তবে ভড়কানো মুখোশ্রি ছাড়িয়ে যেতে থাকা সাহিত্যের দিকে দেখে ফুসে উঠলেন,
"আমি কোনো কাজের নই?বিয়ের দিন ওই দুই খাটাশের কাছ থেকে কে বাঁচিয়েছিল তোকে?তোর দাদা!?তোর দাদা বেঁচে থাকলে ওই দিন তোর কান্ডে আবারও হার্ট অ্যাটাক করত"
দাদির কথা কানে যেতেই ফিক করে হেসে উঠল সাহিত্য।তবে পেছনে ঘুরলো না।ট্রাউজারের পকেটে হাত গুজে ড্রইং রুমে চলে গেল।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সাহিত্য বাকি সময়টা আর অফিসের কাগজে মন বসাতেই পারেনি।আর সেকথা তো রাজ ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল যখন কল্পনার ডাক তার কানে ঢুকে।যার দরুন ছেলেটা প্রতিবারের মতো এবারও সাহিত্যের অগচরে কাজগুলো নিজের মতো গুছিয়ে নেয়।রাজ হঠাৎ-হঠাৎ চিন্তা করে বসে,সাহিত্য মাঝেমধ্যে এমন হেলাফেলা করায় রাজ তো খুব সহজেই অফিসের সবকিছু নিজের করে নিতে পারে।এক রাতের মধ্যে O.S.S. কোম্পানির নতুন মালিক হতো দ্য ওয়ান এন্ড অনলি ইফরান রাজ!কিন্তু এতো বড় কোম্পানির মালিক হওয়া সত্বেও রাজ শুধু একটা কাজই করত।আর সেটা হলো সাহিত্যকে নাইন টু ফাইভ অফিসে রাখা।শুধু সেটা নয়।সাহিত্য যেমন সব কাজ রাজের কাধে চাপিয়ে কল্পনার পিছনে দৌড় দেয়,সেও সাহিত্যকে অমন সব কাজ করতে দিয়ে কারো পেছনে ছুটতো।কিন্তু সেটা আবার হয়ে উঠবে কেমন করে?কারণ, না সাহিত্যের কোম্পানি দখল করা রাজের ধান্দায় আছে,আর না রাজের কোনো প্রেয়সী আছে।ঠিক এই কথাটাই হয়তো সাহিত্য খুব ভালো করে জানে।তাই তো এতো বিশ্বাস করে রাজকে।
নিজের এমন বাচ্চামো ভাবনায় আনমনে ঠোঁট বাকালো রাজ।ল্যাপটপ সাট-ডাউন করে ব্যাকপ্যাকে ঢুকিয়ে কেবলই উঠে দাঁড়িয়েছে সে।উদ্দেশ্য শেখ ভিলা থেকে বের হওয়া।তবে লতিফা শেখের ডাকে টনক নড়ল তার।ঘাড় ঘুরিয়ে ডাইনিং টেবিল পাড় করে রান্নাঘরের দরজায় চোখের চাহনি ফেলল।সেখানে লতিফা শেখ হাসি মুখে দাঁড়িয়ে।রাজ তার দিকে ঘুরতেই বলে উঠেন তিনি,
"এতো তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছো?দুপুরের খাবারটা খেয়ে যাও"
চোখের চিকন চশমা ঠিক করে হাসি মুখে শান্ত উত্তর রাজের,
"না আন্টি থাক।অন্য একদিন"
ক্ষণিকের মাঝেই মুখের হাসি সড়িয়ে হালকা মুখ ফুলালেন লতিফা শেখ,
"এবার ধরা আটবার হচ্ছে তুমি এ কথা বলেছো।হয় দুপুরে আসো নাহলে রাতে আসো।কিন্তু একদিনও আমার আবদারটা রাখো না।আর এই সাহিত্যও কেন জানি কিছু বলে না..."
লতিফা শেখের কথা শেষ হওয়া মাত্রই দোতলা থেকে কল্পনার সেই চির পরিচিত সাইরেন শুনা গেল।সেটা শুনে লতিফা শেখ ও রাজ ভড়কালো হালকা।সাথে নজর দিল দোতলায়।চোখ পড়ল সাহিত্যের দিকে।তাকে দেখে বুঝাই যাচ্ছে যে কল্পনার এমন চিৎকারে ছেলেটা আবারো চমকে উঠে করিডোরে ব্যতিব্যস্ত পা ফেলে।কল্পনার গালে চুমু বসাতে গিয়েই তো কান বরাবর কল্পনার ফুকানো সাইরেনের শিকার হয়েছে সে।সাহিত্যের চুমু দেওয়া তো বহু দূরে থাক,এমন চিৎকার দিয়েছে যে এখনো সাহিত্যের বাম কানটা 'টু' শব্দ করে যাচ্ছে।কল্পনার রুম থেকে বের হয়ে মাথাটা জোরে এক ঝাকি দিয়েও থামছে না সেটা।তবে রাজ আর লতিফা শেখের চোখ জোড়া তার দিকে দেখে আছে সেটা বুঝতে পেরে এমন ভাব নেওয়া শুরু করল যেন কিছুই হয়নি।দুই হাতের কনুই করিডোরের রেলিংয়ে ঠেকিয়ে নিচের দুই দর্শকের মনযোগ অন্যদিকে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই সাহিত্য হাক পাড়লো,
"কি আলাপ চলছে ছোট চাচী?"
লতিফা শেখ আবার রাজের বিষয়ে মন দিলেন।এক নজর রাজকে দেখে আবারো সাহিত্যের দিকে ঘুরলেন,
"রাজকে এতো করে বলি খাবার খেয়ে যেতে,কিন্তু আমার কথাই শোনে না।তুই কিছু বলবি কি?"
মেকি হেসে বলল সাহিত্য,
"আমি আবার কি বলব?অন্তকে যেমন কান ধরে খাওয়াতে বসাও তেমন করে এই জনাবকেও বসাবে।অত জিজ্ঞেস করতে হয় নাকি?"
সাহিত্যের কথায় রাজ ভালোই চমকে উঠেছে।আমতা-আমতা করতে লাগলো ছেলেটা,
"আরে স্যার কি বলছেন আপনি?এটা কেমন কথা?"
"কোনো কেমন কথা না।তুমি খেয়ে যাচ্ছো মানে খেয়ে তারপরই যাচ্ছো"
লতিফা শেখের কথায় রাজ তার দিকে মাসুম নজর ফেলল।তাতে একদমই কাজ হলো না।লতিফা শেখ সাহিত্যের দিকে দেখে শুধালেন,
"তুই খাবি না?"
নজর ঘুরিয়ে বাম কানের ভেতর আঙুল নাড়াতে লাগলো সাহিত্য।কানটা এখনো 'টু' শব্দ করছে।লতিফা শেখের কথায় মিনমিনিয়ে বলে উঠল সে,
"যেটা খেয়ে আমি পেট ও মন ভরাতে চাচ্ছি ওটাই তো পাচ্ছি না"
সাহিত্যের কথা কানে না পৌঁছানোর ফলে লতিফা শেখ আবার প্রশ্ন করেন।এবার সাহিত্য স্বাভাবিকভাবেই বলে উঠল,
"না ক্ষুধা নেই"
আর কথা বাড়ালেন না লতিফা শেখ।রাজকে ডাইনিংয়ে বসার হুকুম দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন।ক্লান্ত শরীরে কাধের ব্যাকপ্যাক হাতে নিল রাজ,তখনই সাহিত্য উপর থেকে বলে উঠল,
"এ রাজ!কাল আমি অফিসে যাবো"
রাজ সাহিত্যের দিকে নজর দিল।গলার স্বর মিনমিনিয়ে হাতের ইশারায় সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বলল সে,
"ম্যামকে ছাড়া থাকতে পারবেন আপনি?অক্সিজেনের ঘাটতি হবে না?"
রাজের টিটকারি মার্কা কথা ভালো করেই বুঝলো সাহিত্য।মুখে কিছু না বলে বাম হাত উঠিয়ে ফোলা বাইসেপ্সে ডান হাতের চাপড় দিল।সাহিত্যের কুচকানো মুখসুদ্দো মনের কথা ভালো করেই বুঝলো রাজ।আর সেটা হলো, 'পারবো!!পারবো!!'
সাহিত্যের দিকে দেখে মাথা দুলিয়ে মেকি হাসলো রাজ।খাক পারবে!কাল দুপুর হতেই সাহিত্য চিৎকার দিয়ে উঠবে,
"রাজ!!বাকি মিটিং তুমি সামলে নিও!আমি আমার বউয়ের চুমু খেতে গেলাম!!"
আর সাহিত্য যদি কাল সে কথা না বলেছে তাহলে রাজ নিজের নাম বদলে হিরো আলম রেখে দিবে।নিজের উপর আর সাহিত্যের উপর তার এতোটাই বিশ্বাস আছে!
চোখের চশমা আরেক দফা ঠিক করে রাজ এগুলো ডাইনিং টেবিলের দিকে।এতক্ষণে বাড়ির গিন্নিরা টেবিলে সবকিছু রেডি করতে লেগে পড়েছেন।ছেলেটা প্রায় ২ মাস থেকেই শেখ ভিলায় যাতায়াত করছে।একবারও খাওয়াতে বসাতে পারেননি।ওই টুকটাক সাহিত্য নয়তো শেখ আহমেদদের সাথে চা পান করা যা একটু।ছেলেটা এতো ভদ্রভাবে বাড়ির গিন্নিদের সাথে হাসিঠাট্টা করে কথা বলে,অথচ তাকে কিনা এক বেলা খাওয়াতে পারেননি তারা।সেটাতে ভালোই আপসোস করেন তিন গিন্নি।
হাতে-মুখে পানি দিয়ে এসে তিন ব্যতিব্যস্ত গিন্নিদের দেখে বেশ ভড়কালো রাজ।স্বাভাবিক হলো যখন সামিয়া এসে তার হাতে ফকফকে একটা তোয়ালে ধরিয়ে দিল।সেটাতে হাত-মুখ মুছে চেয়ারে বসলো সে।টেবিল ভর্তি এতো তরকারি দেখে চোখ জোড়া হালকা গোল হলো তার।সেটা লুকিয়ে তিন গিন্নির দিকে ঘুরে মুখে হাসি ঝুলিয়ে বলল,
"আরে আন্টি এতো কিছুর কি দরকার ছিল?"
আমেনা শেখ প্লেটে খাবার উঠাতে নিয়েই বললেন,
"এতোদিন ধরে যদি বারন না করতে তাহলে একটু কম থাকার সম্ভাবনা ছিল"
"তাই দেখে একদিনে সব খাওয়াবেন?"
লতিফা শেখ আগ বাড়িয়ে বললেন,
"হ্যাঁ তো কি হয়েছে?একটু বেশি নাহয় খেলে একদিন।তুমিও তো দেখতে আমার ছেলে অন্তর মতোই।তোমরা এখনকার ছেলেরা কি খাওয়া-দাওয়া করো না নাকি?"
লতিফা শেখের উত্তরে কিছু না বলে রাজ মৃদু হাসলো শুধু।গিন্নিদের এতো আদিক্ষেতায় যেন গলে গেল ছেলেটা।এমন আদর যে তার ভাগ্যে একটু কমই জুটেছে।
তিন গিন্নির মনযোগ রান্নাঘর আর রাজের দিকে।এমন সময় গোসলের পর ভেজা চুলে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে আসে অনু।চোখ-মুখ অন্ধকার করে ধুপধাপ পা ফেলে এসে রাজের পাশের চেয়ারে বসে পড়ে।অনু রাজের পাশে বসেছে ঠিকই,কিন্তু তার বিন্দুমাত্র ধারনা নেই যে সেটা রাজ।পেছন দিক থেকে দেখে অন্তকে মনে করেছে সে।
অনু চেয়ারে বসেই প্লেটে ভাত তুলতে লাগলো।চোখ-মুখ কেন অন্ধকার করে আছে সেকথাও বলতে শুরু করল মেয়েটা,
"শিক্ষামন্ত্রিটা চেঞ্জ হওয়ার আর সময়ই পেল না!প্রতিটা দিন ভয় দেখিয়ে যাচ্ছে।মনে তো হচ্ছে আমরা পরীক্ষা না,অগ্নি পরীক্ষা দিচ্ছি!!তোমার সময়ের শিক্ষামন্ত্রীও কি এমন ছিল?খাটাশ একটা...!!."
মাথা তুলে পাশের চেয়ারে নজর দিতেই অনুর মুখের কথা তো বন্ধ হলোই,সাথে শরীরও পুরো জমে গেল।রাজ স্তব্ধ নয়নে চশমার উপর দিয়ে তাকেই দেখছে।সেও অনুর মতো থমকে গিয়েছে বলা চলে।মেয়েটা হঠাৎ রাজের সাথে এতো নিঃসংকোচে কথা বলছে সেটা দেখেই হয়তো।কারণ গত সপ্তাহে তো পুরোই উলটো ছিল।কিন্তু এদিকে আসল বিষয় তো অন্যকিছু।অনু তো অন্তকে মনে করে ভাট বকতে শুরু করে।টেবিলে যে রাজ বসে আছে যেটা জানলে মেয়েটা কখনোই রাজের পাশের চেয়ারে বসতো না।অবশ্য বেশি দূরেও বসতো না।সর্বোচ্চ একটা চেয়ার বাদ রেখে বসতো হয়তো।তবে বর্তমানে মেয়েটার ভাতের চামুচ ধরে রাখা হাতটা মৃদু কাপতে শুরু করেছে।কালো চিকন চশমার পেছনে থাকা গাঢ় বাদামী চোখ জোড়া দেখে মনে পড়ে গেল গত সপ্তাহের কথা।
#চলবে