ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৮২তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৮২

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

সামনে এইচএসসি পরীক্ষা থাকায় টেনশনে যেন অনু সব ভুলতে বসেছে।আর সেটা যদি হয় গণিত বিষয়!কল্পনার কাছে যেতে চেয়েও যায়নি।এই মুহুর্তে যে কল্পনার মন-মেজাজ ভালো নেই সেটা অনুসহ বাড়ির সবাই জানে।বাধ্য হয়ে বেচারি অন্তর পিছ ধরেছিল।কিন্তু অন্ত নিজের কাজে ব্যস্ত থাকায় অনুকে তেমন পাত্তা দেয়নি।তাই তো ড্রইং রুম আর ডাইনিংয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে চিৎকার ছাড়ে মেয়েটা,

"এই বাসায় কি এমন কেউ নেই,যে আমাকে কয়েকটা ম্যাথ সলভ করে দিতে পারবে!!"

সেই সময় আজকের মতোই সাহিত্য আর রাজ ড্রইং রুমে বসে ছিল।অবশ্য কাজ শেষে টিভি দেখছিল তারা।অনুর এমন চিৎকারে রাজ ভড়কালেও সাহিত্য ভ্রু কুচকে অনুর দিকে নজর দেয়,

"ভ্যাবাচ্ছিস কেন?"

অনু সাহিত্যের দিকে সরু নজর দিয়ে কিছু সময় চিন্তায় মগ্ন থাকে।অতঃপর সাহিত্যের উত্তর না দিয়ে হুড়মুড়িয়ে এসে পাশের সোফায় বসতে নিয়ে বলে উঠে,

"পেয়েছি!!ভদ্র মানুষের মতো আমাকে কিছু ম্যাথ সলভ করে দিন।ইমার্জেন্সি লাগবে আমার।আমি জানি যে আপনি অনেক ভালো স্টুডেন্ট ছিলেন।তো পালানোর চিন্তা একদম ছেড়ে দিন"

অনুর কথায় সাহিত্য থতমত খেল বেশ।তবে নিজেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে এক চাল চাললো সে।সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠল,

"আমি ভালো স্টুডেন্ট হলেও ভদ্র মানুষ না।কিন্তু আমার পি.এ. অনেক ভদ্র মানুষ।সে স্টুডেন্টও ভালো।কি বুঝে নিবি ওর কাছ থেকে নে"

কথা শেষেই সাহিত্য ছুটলো দোতলায়।সেদিকে নজর দিয়ে ফোসফোস করে বলে উঠল অনু,

"দেখে নিব!!সবকটাকে দেখে নিব।একটাও কাজে লাগছো না তোমরা।ফেল করলে তো খুব কথা শুনাবে।আর এই টিউশনের টিচারটাও বন্ধ দেওয়ার সময় পেল না?পরীক্ষার আগেই এমন নেটওয়ার্কের বাইরে যেতে হবে এই টি.টি. কে?!"

কথা শেষে অনু সামনে ঘুরতেই হাতে-পায়ে চমকে উঠল।রাজ কপালে ভাজ ফেলে তার দিকেই তাকিয়ে।রাজকে এমন নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে এলোমেলো আচরণ করতে লাগলো অনু।সেটা বুঝতে পেরে গলা খাকারি দিয়ে নজর ঘুরায় রাজ।সময় নিয়ে শান্ত স্বরে বলে উঠে,

"কি প্রবলেম হচ্ছে তোমার?দেখি হেল্প করতে পারি কিনা?"

অনু রাজের দিকে সেই ক্ষণিক আগে এক নজর দেখে চোখ সড়িয়েছে,এখনো এলোমেলো নজর ফেলছে।রাজকে বেশ কিছুদিন থেকে শেখ ভিলায় দেখলেও কখনো কথা হয়ে উঠেনি।আর হঠাৎ এমন অপরিচিত কারো সাথে আবার কথা বলা সম্ভব?তাও আবার ছেলে মানুষ।সেটাও আবার চশমাওয়ালা!!ছেলে হলেও চলতো।কিন্তু চশমাটা যে বড়ই অসুবিধা করছে!এমনটা না যে অনু চশমা পড়া ছেলেদের দেড় ব্যাটারি মনে করে।বিষয়টা যেন পুরোই উলটো।এই সুক্ষ্ম একটা জিনিসই যে মেয়েটাকে মারাত্মকভাবে আকর্ষণ করে!অনুর মতে তাকে মারার জন্য বেশি কিছু লাগবে না।শুধু একটা চোখে চশমা ঝুলানো ছেলেকে তার সামনে দাড় করিয়ে দাও,তাতেই বেচারি পরকাল পাড় করবে।

যার প্রমাণ এই মুহুর্ত।সামনের সোফায় বসে থাকা সুদর্শন যুবকের দিকে চোখটা পর্যন্ত তুলে তাকাতে পারছে না।একবার সেদিকে নজর ফেললে যে অনুর পক্ষে আর সম্ভবই হবে না অন্যদিকে নজর ঘুরানো।

রাজের ভারী পুরুষালী কন্ঠে কেপে উঠল অনু।মিনমিনিয়ে উঠল মেয়েটা,

"না না থাক!"

"আরে না কোনো সমস্যা নেই।স্যার মজা করছিল না তো।আমি আসলেই তোমার প্রবলেম সলভ করে দিতে পারবো"

"সমস্যা নেই!আমি টিউশন টিচারের কাছে বুঝিয়ে নিব।আপনাকে অযথা ঝামেলায় না ফেলি"

ভ্রু কুচকালো রাজ,

"তোমার টি.টি. ভ্যাকিশন থেকে ফিরে আসতে আসতে তোমার পরীক্ষাই শেষ হয়ে যাবে।দাও আমি সলভ করে দেই"

নড়ল না অনু।হাতের বই-খাতার দিকে নজর রেখেই আঙুল মোচড়াতে লাগলো।মেয়েটার সংকোচ রাজ বুঝলো হালকা।হয়তো সে কারণে বেশি জোরও করত না।কিন্তু সাহিত্য নিজে বলে গেল।মেয়েটাকে সাহায্য না করলে কেমন দেখায় বিষয়টা।যার দরুন এবার কথায় একটু জোর দিল রাজ,

"আমার থেকে বুঝে নিতে চাইছো না নাকি?"

এবার অনু হুড়মুড়িয়ে মাথা তুলল,

"আরে সেটা কেন হতে যাবে!"

"তাহলে খাতা-কলম এদিকে দাও দেখি"

রাজ কথা বলেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।কিন্তু অনুর সেদিকে খেয়াল কোথায়?সে তো মাথা তুলেই হাবার মতো রাজের দিকে দেখে আছে।একটা ছেলে চশমা পড়লে এতো হ্যান্ডসাম কেমন করে লাগতে পারে!এটা যেন ঘোর অপরাধের কাতারে পড়ে।

রাজও অবশ্য এতক্ষণ থেকে অনুর সাথে চোখ মিলিয়ে কথা বলেনি।তবে অনুর কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে এবার নিজের শান্ত নজর সরাসরি সামনের রমণীর দিকে ফেলল।আর সেটাতেই যেন জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়ে ঢুকে পড়ল ছেলেটা।সামনের হা হয়ে থাকা রমণীর চোখে চোখ পড়তেই থমকালো সে।আশেপাশে যেন মৃদু শীতল বাতাস বয়ে গেল তার।কলেজ জীবনের পর এই প্রথম আবার এমন অনুভব হলো।বিষয়টা যেন বিশ্বাস হচ্ছে না রাজের।তবে বিশ্বাস করে কি আর না করেই বা কি?হয়ে তো গিয়েছে।মৃদু শীতল বাতাস বয়ে তো গিয়েছে!

হা হয়ে থাকা মুখ থেকে অস্ফুটস্বরে সুক্ষ্ম আওয়াজ করল অনু,

"আমি শেষ"

বলেই ঘন চোখের পাতা নাড়ালো সে।সেটাতেই টনক নড়ল রাজের।ভড়কে উঠলেও অনুকে বুঝতে দিল না সেটা।শান্তভাবে নজর ঘুরিয়ে নিয়ে গলা খাকাড়ি দিল,

"খাতাটা দাও"

এবার আর দ্বিতীয়বার ভাবলো না অনু।হাবার মতো রাজকে দেখতে নিয়েই হাতের সবকিছু রাজের দিকে এগিয়ে ধরল।সামনের চাহনি ভালো করেই অনুভব করতে পারছে রাজ।এবার ছেলেটারও যেন হাত কাপতে শুরু করেছে।তবে নিজের ম্যাচিউরিটির পরিচয় দিয়ে নিজেকে সংযত করে খাতা খুলল।অনুর দিকে দেখে বলে উঠল সে,

"কোথায় প্রবলেম?"

রাজের কথা কানে ঢুকলেও অনুর মাথায় শুধু সামনের সু পুরুষই ভেসে উঠছে।কোথায় প্রবলেম?এই ছেলের মাঝে আবার কোনো প্রবলেম থাকতে পারে নাকি?কি সুঠাম দেখতে!আবার হাবভাবখানাও কি সাবলীল।"লাইক আ জেন্টালম্যান!"

নিজের মন ও মস্তিষ্কের এসব ভাবনার উত্তরেই যেন ডানে-বামে মৃদু মাথা দোলালো অনু।আনমনেই বলে উঠল,

"কোথাও না"

তবে কথাটা বলতে নিয়েই এমদম হঠাৎই হুশ ফিরল তার।হুড়মুড়িয়ে উঠে নিজের নজর নিচু করল।বই হাতে নিয়ে পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগলো সে,

"হ্যাঁ হ্যাঁ,দিচ্ছি"

রাজ এদিকে প্রচন্ড হাসফাস করতে শুরু করেছে।ছেলেটা অনুর কথা বুঝেও যেন না বুঝার আপ্রাণ চেষ্টা করতে ব্যস্ত।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

টানা আধা ঘন্টা ধরে রাজ অনুর টি.টি-এর দায়িত্ব পালন করল।তবে এই সময়ের মাঝে খুব সহজ অংকও দু-তিনবার করে কেটেছে ছেলেটা।কারণ একটাই।সামনের রমণী!মেয়েটা খাতায় কম রাজের দিকে বেশি নজর দিয়ে রেখেছে।সেটাতে বেশ ঘামতেও শুরু করে রাজ।গরম থেকে বাঁচতেই যেন শুভ্রা রঙা শার্টের হাতা গুটাতে নেয় সে।সেটাতে রাজের শরীরের গরম না কমলেও অনুর চোখ জোড়া একটু খাতার দিকে হয়েছে।ঠিক যেন খাতার দিকে নয়।খাতার উপর থাকা হাতগুলোর দিকে হয়তো।এই মেয়েটা রাজের উজ্জ্বল শ্যামলা হাতের দিকে এমন করে দেখছেই বা কেন!রাজের কলম হাতে ধরে রাখতে মনে হয় অসুবিধে হচ্ছে না!?একটা মেয়ের নজর এতো খারাপ কেমন করে হতে পারে!

তবে রাজ একটা বিষয়ে বেশ অবাক হলো।অনু যে রাজের বুঝিয়ে দেওয়া বিষয়ে অমনোযোগী সেটা একদমই নয়।সেদিকেও যেন কান খাড়া করে রেখেছে সে।মেয়েটা নিশ্চয়ই ভালো স্টুডেন্ট হবে।তবে বর্তমানে রাজের জন্য তো ভালো ঠেকছে না!

রাজ হয়তো বা নিজের ধৈর্যের বাধ ভাঙার লক্ষ্মণ বুঝতে পেরে কেবলই মুখ খুলতে যাবে,এমন সময় অনুই বলে উঠল,

"হয়েছে!হয়েছে!এতোটুকুই সমস্যা ছিল আমার।পরের অংশটা আম নিজে করতে পারবো"

রাজ মাথা তুলতেই অনু ভড়কে উঠে অন্যদিকে ঘাড় ঘুরালো।এতক্ষণ থেকে যে রাজের দিকেই এক ধ্যানে দেখে ছিল সে।এরপর রাজ আর বিন্দুমাত্র কথা মুখ থেকে বের করতে পারেনি।অনু উঠে যেতেই ভদ্র ছেলের মতো শেখ ভিলা থেকে বেড়িয়ে আসে।কিন্তু আজ যে আবারো সেই একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাকে।শেখ ভিলায় আসা মাঝের তিন দিন অনুর সাথে দেখা নাহলেও আড় চোখে যেন খুঁজছিল তাকে।কিন্তু এই মুহুর্তে অনুর বকবকিতে হাতে থাকা ভাতের লোকমা আর মুখে ঢুকাতেই পারলো না।আবারো সেইদিনের মতো নজরে নজর মিলিয়ে রেখেছে।

এদিকে অনুও যেন থমকে রয়েছে সেই তখন থেকেই।সামনে পরীক্ষা অথচ বেশ কদিন থেকেই মাথায় বইয়ের পড়ার সাথে চিকন চশমা পড়া গাঢ় বাদামি চোখ জোড়া ভেসে উঠছিল তার।আজ হঠাৎ এভাবে সামনে দেখবে সেটা হয়তো ভাবনাতেও আনেনি।কিন্তু গতবারের মতো যেন এবারও চোখ সড়াতে ভুলে গেল।মৌমাছির মধুর চাকে যেমন ভাল্লুকের নজর সব সময়ই থাকে,ঠিক তেমন ভাবেই অনুর নজর পাশের চেয়ারের যুবকের দিকে।

"এই লিমা!রান্নাঘরটা একটু ঝাড়ু দিয়ে দে তো।রান্নাবাড়ি করতে কতটা ময়লা হয়েছে!"

লতিফা শেখ উঁচু গলায় লিমা খালাকে ডেকেই ডাইনিং টেবিলের দিকে এগুলেন।তবে লতিফা শেখের উঁচু কন্ঠের প্রভাব শুধু লিমা খালার উপর পড়ল না,পড়ল ডাইনিংয়ে উপস্থিত দুই নর-নারীর উপরও।

লতিফা শেখের গলায় রাজ আর অনু হুড়মুড়িয়ে নড়ে উঠলো।অনু চেয়ার থেকে উঠে অন্যদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে নিলেও রাজ খালি মুখেই বিষম খেয়ে বসলো।হঠাৎ রাজের কেশে উঠা দেখে লতিফা শেখ পায়ের গতি বাড়ালেন।রাজের নিকটে এসে গ্লাসে পানি ঢালতে নিয়ে বললেন তিনি,

"আরে আরে,আসতে!ধীরে খাও।তাড়াহুড়ো করছো কেন?"

রাজ পানির গ্লাস মুখে লাগিয়ে আলগোছে একবার অনুর দিকে নজর দিয়ে পর মুহুর্তেই ঘুরিয়ে নিল সেই নজর।তবে লতিফা শেখ মেয়ের দিকে দেখে থেকেই শুধালেন,

"তুই কখন এলি?আর এমন দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"

মায়ের কন্ঠে তড়াত করে নড়ে উঠলো অনু।তবে ঘাড় ঘুরালো না,

"ও-ওই খেতে এসেছিলাম"

"তো না খেয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"

"প-পরে খেয়ে নিব"

লতিফা শেখের নজর পড়ল টেবিলের উপর রাখা প্লেটের দিকে।যেটাতে অনু ক্ষণিক আগেই ভাত উঠাতে নিয়েছিল।রাজের দিকে আড় চোখে দেখে আবার টেবিলের দিকে দেখলেন তিনি।মেয়ের এই মুহুর্তে ভাত খেতে না চাওয়ার কারণ একটু হলেও মাথায় ঢুকলো তার।তবে রাজকে যেন তিনি বাইরের কেউ হিসেবে দেখলেনই না।অনুর দিকে দেখে শান্ত স্বরেই বলে উঠলেন,

"আরে বোস।এসেছিস যখন খেয়ে নে"

"না থাক!আমি পরে খাবো"

লতিফা শেখ মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করলেন।অতঃপর অনুর প্লেটটা হাতে তুলে তাতে খাবার তুলতে লাগলেন,

"চুপচাপ বোস তো।দেরি করে খেলে তখন আবার মাথা ঘুরবে "

সামিয়ার এই মুহুর্তে ডাইনিং টেবিলে আসার কোনো উদ্দেশ্যই ছিল না।কিন্তু রাজ আর অনুর ব্যাপারটা সুক্ষ্ম সময়ের মধ্যে ধরে ফেলল সে।গত কদিন থেকে অনু তো সামিয়ার কাছেই রাজের সুনাম করে যাচ্ছিল।

ডাইনিং টেবিলের দিকে নজর থাকা অবস্থায় ঠোঁটে দুষ্টু হাসি খেলে গেল সামিয়ার।ফাজিলটা লাগাতে নিয়ে অনুর পাশে এসে দাড়ালো।লতিফা শেখের উদ্দেশ্যে হাসি মুখেই বলে উঠল,

"ছোট চাচি আমাকেও দাও তো,ক্ষুধা লেগেছে"

ভ্রু কুচকালেন লতিফা শেখ,

"তুই না একটু আগেই খেলি"

"আরে আবার ক্ষুধা লেগেছে।দাও তো!"

সামিয়া অনুর দিকে ঘুরে দেখলো,

"তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন?বসো!বসো!"

অনু লতিফা শেখ আর রাজের চোখের আড়ালে সামিয়াকে নিঃশব্দে গালি দিতে লাগলো।কারণ সে ভালো করেই জানে সামিয়া পেটের ক্ষুধা মিটাতে এখানে পদার্পণ করেনি।তবে সামিয়া বড় বোনের চোখ রাঙানো পুরো দমে উপেক্ষা করে অনুকে এক প্রকার ঠেলেই চেয়ারে বসালো।আর নিজে বসলো রাজ আর অনুর মাঝের চেয়ারটাতে।তবে রাজ টেবিলের লম্বা মাথার দিকে বসায় অনুকে খুব স্বচ্ছভাবেই দেখতে পারছে।

গত সপ্তাহের কথা মাথায় আসতেই রাজ অনুর উদ্দেশ্যে বলে উঠল,

"অনু,ম্যাথগুলো নিয়ে আর কোনো সমস্যা হয়েছিল?"

নিজের নাম রাজের মুখে শুনে সুক্ষ্ম কেপে উঠল অনু।অতঃপর নিজেকে সংযত করে মাথা নিচু রেখেই বলল,

"না,আর কোনো সমস্যা হয়নি"

"সমস্যা হলে বলিও,আমি সলভ করে দিব নাহয়"

অনু এবার মাথাটাও হালকা ডানে-বামে দোলালো,

"না!না!আর কোনো সমস্যা নেই।আমি করতে পারবো"

লতিফা শেখ ভ্রু কুচকে শুধালেন,

"আরে সমস্যা হলে বলবি।রাজ কই আবার বাইরের কেউ?তোর টি.টি. নাকি ফি.ফি. কি যেন?সেই স্যার টিউশন শুরু করার আগ পর্যন্ত কি কি সমস্যা হচ্ছে রাজের কাছেই নাহয় দেখিয়ে নিস"

একই উত্তর অনুর,

"না থাক,আমি নিজে করতে পারবো"

এবার সুক্ষ্ম শক্ত হলো লতিফা শেখের নজর,

"ভালো করে পড় অনু।তোর ভাইয়া বলেছে তুই ফেল করলে তোকে বিয়ে দিয়ে দিবে।আমি অন্তকে একটুও বাধা দেব না কিন্তু,বলে দিলাম"

অনু মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে ভ্রু কুচকে মায়ের দিকে তাকালো।কিন্তু রাজ বেশ ভড়কালো লতিফা শেখের কথায়,

"আরে আন্টি কি বলছেন আপনি?এখনই কেমন বিয়ে দেয়?আর অনু যথেষ্ট ভালো ছাত্রী।ও ফেল করবে কেন?"

রাজের কথায় লতিফা শেখ চেয়ার টেনে রাজের পাশে বসলেন।রান্নাঘরে আর গেলেন না তিনি।উদ্দেশ্য তার রাজের সাথে টুকটাক কথা চালানো।মহিলাটা যে গল্প করতে বেশ পছন্দ করেন।

"ওর কথা ছাড়ো।তুমি তোমার কথা বলো দেখি।এটা কি তোমার প্রথম চাকরি,নাকি আগেও কোথাও ছিলে?"

লতিফা শেখের কথায় সাবলীলভাবে বলল রাজ,

"না আন্টি,O.S.S. কোম্পানিতেই আমার প্রথম জব।ভার্সিটি থেকে বের হয়ে এক বছরের মাথায়ই এই জবে ঢুকেছি"

রাজের বয়স আন্দাজ করে সামিয়া অনুর হাতে কনুই দিয়ে মৃদু টোকা দিল।সাথে ফিসফিসালোও হালকা,

"বয়স পার্ফেক্ট"

অনু কিছু না বলে শুধু চোখ রাঙালো।মেয়েটা মাথা নিচু করে প্লেটে হাত নাড়িয়ে গেলেও আড় চোখ যেন বারবার রাজের দিকেই দেখে যাচ্ছে।উজ্জ্বল শ্যামলা ছেলেটার শরীরে আবৃত শুভ্রা রঙা ফর্মাল শার্টটা কি সুন্দর মানিয়েছে।আর বাম হাতের এনালগ ঘড়িখানা যেন জেন্টালম্যানভাবখানা ফুটিয়ে তুলতে বাধ্য।

রাজের কথায় ভ্রু উঁচালেন লতিফা শেখ,

"বাব্বাহ্!এতো কম সময়ের মধ্যেই এতো ভালো জব পেয়েছো?সাহিত্যের তো অনেক কাজ।সামলাতে তোমার অসুবিধে হয় না?"

রাজ শান্ত হেসে 'না' সূচকে মৃদু মাথা দোলালো।সেটার পরপরই লতিফা শেখ বলে উঠলেন,

"অবশ্য সাহিত্য তোমার ভারী সুনাম করে আমাদের কাছে।তুমি নাকি অনেক ধৈর্য ধরে তাকে সহ্য করো"

"কাজ তো অনেক থাকে আন্টি।তবে ধৈর্য ধরে কাজ করার অভ্যাস আছে আমার।স্যারের অবশ্য সেটাতে সুবিধা হয়েছে অনেক"

সামিয়া আবারো অনুর হাতে টোকা দিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠল,

"ছেলে ধৈর্যশীলও"

সামিয়ার টোকায় হালকা নড়ে উঠলেও অনু মাথা নিচু করে চোয়াল শক্ত করা ছাড়া আর কিছুই করল না।

লতিফা শেখ এবার একটু পারিবারিক বিষয়ের দিকে এগুলেন।দুই হাতের উল্টো পিঠে চিবুক ঠেকিয়ে শুধালেন তিনি,

"তো বাসায় আব্বু-আম্মু ছাড়া আর কে কে আছে?"

একটু থমকালো রাজ।তবে আবারো মৃদু হেসে বলে উঠল ছেলেটা,

"আব্বু রিটায়ার্ড মেজর জেনারেল আর আমার ছোট বোন রোজা,এবার ক্লাস সেভেনে....আর...আম্মু নেই"

রাজের শেষের সুক্ষ্ম কথায় উপস্থিত তিন নারীই ভড়কালো।অনু এতক্ষণে মাথা তুলে নজর দিল রাজের দিকে।লতিফা শেখ ভ্রু কুচকে শুধালেন,

"আম্মু...নেই মানে?"

আবারো রাজের সুক্ষ্ম হাসি যুক্ত শান্ত উত্তর,

"পাঁচ বছর আগে ব্লাড ক্যান্সার হয়ে.."

রাজকে আর কথা শেষ করতে দিলেন না লতিফা শেখ।তার আগেই বলে উঠলেন তিনি,

"সরি বাবা,জানতাম না আমি।সাহিত্য এ ব্যাপারে কখনো কিছু বলেনি"

"আমিই স্যারকে বলতে নিষেধ করেছিলাম"

কথাটা বলে আবারো প্লেটে নজর দিল রাজ।তার দিকেই এক ধ্যানে দেখে আছে অনু।এতো ভারী একটা কথা হাসি মুখেই কেমন করে বলে দিতে পারলো ছেলেটা?মনের ভারী কষ্ট লুকাতেই যেন এই মুখোশের আবির্ভাব।এমন মুখোশ্রি তৈরি করতে নিশ্চয়ই বেশ সময় লেগেছে।এজন্যই কি ছেলেটা এতো ভদ্র স্বভাবের?পরিবারের দায়িত্ব নিশ্চয়ই একাই সামলাতে নিজেকে এতো গাম্ভীর্য করে তুলেছে।

আনমনেই যেন অনু এক প্রশ্ন করে বসলো,

"আন্টি নিশ্চয়ই আপনাকে অনেক আদর করতো,তাই না?"

হঠাৎ অনুর এমন এক কথায় সবাই নজর তার দিকে ফেলল।রাজ তো ভড়কে উঠেই অনুর দিকে নজর দিয়েছে।ছেলেটার মুখোশ্রিতে এখন আর আগের সেই সুক্ষ্ম হাসিটা নেই।সামনের অনুভূতিহীন সাদামাটা চেহারার দিকে দেখে আছে সে।তেমন কিছুই নেই সেই ফর্সা সাদামাটা চেহারাটায়।তবুও কেন জানি ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল তার।যেই মোচড়টা হয়তো পাঁচ বছর আগে হসপিটালের বেডে নিজের মা-কে দেখে অনুভব করার কথা ছিল।যেই মায়ের উপর এতোদিন বেশ অভিমান করে ছিল এই ক্ষোভে যে,তাকে একা রেখে পরপারে চলে গিয়েছে।কিন্তু আজ অনুর মুখ থেকে বের হওয়া একটা বাক্য যেন হঠাৎ তাকে স্মরণ করিয়ে দিল অতীতের কিছু সুখের স্মৃতির।যা হয়তো নিজের মায়ের প্রতি সুক্ষ্ম ক্ষোভের উপর ধামাচাপা দিতে সক্ষম হতে পারে।

চিকন চশমার ভেতরে থাকা গাঢ় বাদামি চোখ জোড়া হালকা ঝাপসা হতে শুরু করল যেন।কিন্তু তার অবকাশ দিল না রাজ।এবার একটু শব্দ করে হেসে মাথা নিচু করে চোখ জোড়া বন্ধ করল।অতঃপর আবারো অনুর দিকে দেখলো,

"তুমি একথা জানলে কেমন করে?"

রাজের ক্ষণিক আগের মৃদু হাসি এবার অনুর ঠোঁট জোড়ায় দেখা দিল,

"আপনাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে"

রাজ যেন আবারো থমকালো।মেয়েটা কি তার ভিতরের অন্ধকার ঘেটে দেখতে সক্ষম নাকি?

#চলবে

তাড়াহুড়ো করে লিখার পর রিচেক না দিয়েই পোস্ট করেছি কিন্তু😪

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন