ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৮৩তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৮৩(🚫বেশি না,একটুখানি রোমান্টিক এলার্ট🙈)

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

লতিফা শেখ একবার রাজ তো একবার অনুর দিকে দেখলেন।তার মেয়েটা হঠাৎ এমন কথা কিভাবে বলে বসলো?তার বাচ্চাটুকু মেয়েটা কি বড় হয়ে যাচ্ছে?সুক্ষ্ম হাসলেন তিনি।হাসি মুখেই রাজের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,

"তো রান্নাবান্না কে করে?নাকি প্রায়শই বাহিরের খাবার খাওয়া হয়?"

রাজ যেন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে এই কয়েক মুহুর্তে,

"না না,আন্টি!বাইরের খাবার আমি একদমই এলাউ করি না বাসায়।আমার বোন গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিলেও না।বলতে গেলে আমরা তিনজনই রান্না করি।রোজাকে তো এখন থেকেই একটু করে শিখাচ্ছি।বাকিটা আমি আর বাবাই সামলে নেই"

সামিয়া আরেক দফা অনুকে টোকা দিয়ে বসলো,

"ছেলে রান্নাও জানে"

এবার হালকা বিরক্ত হলো অনু সামিয়ার উপর।কিন্তু তারপরও কিছু বলল না।এতক্ষণ থেকে হালকা লজ্জায় থাকলেও এখন যেন অনেকটা স্বাভাবিক আছে মেয়েটা।

লতিফা শেখ নিজের কথা চালু রাখলেন,

"তো তুমি বিয়ে করে নাও না কেন?একটু সুবিধা হতো তোমাদের"

লতিফা শেখের কথায় সামিয়া আর অনু দু'জনেই বিষম খেল।লতিফা শেখ সেদিকে এক নজর দিয়ে আবার রাজের দিকে ঘুরলেন।রাজও আড় চোখে পাশে বসে থাকা দু'বোনকে দেখে নিল।অতঃপর লতিফা শেখের দিকে মনযোগ দিল সে।লতিফা শেখ যদি গত সপ্তাহেই এই প্রশ্ন করতো তাহলে রাজের সরল উত্তর হতো,

'দেখি আন্টি।আব্বু তো বলছেই।এ বছরেই ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করার প্লান আছে'

কিন্তু এখন যে আর সে উত্তর কিছুতেই বলতে ইচ্ছুক না ছেলেটা।গত সপ্তাহেই তো মনে হিমেল হাওয়া বয়ে গিয়েছে তার।তাই লতিফা শেখের কথায় মৃদু হেসে বলল সে,

"এখনে বিয়ে করার তেমন কোনো প্লান নেই আন্টি।রোজা আরো একটু বড় হোক।আর...চাকরিতে তো বছর খানেকই হলো জয়েন করেছি।আরো কয়েকটা বছর যাক"

"আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে ভাইয়া?"

সামিয়া যে হঠাৎই এমন এক প্রশ্ন করে বসবে সেটা কেউই চিন্তা করেনি।যার দরুন এবার অনুর সাথে লতিফা শেখ বিষম খেয়ে বসলেন।তার নিজের মেয়েটা বড় হলেও ভাতিজিটা যে এখনো ছোটই আছে সেটা ভালোভাবেই বুঝলেন তিনি।অনু তো টেবিলের নিচে সামিয়ার পায়ের উপর মারল এক পারা।সামিয়া অবশ্য সয়ে নিল সেই সুক্ষ্ম ব্যথা।তার উসখুস নজর তো ভড়কে উঠা রাজের দিকেই আটকে আছে।

সামিয়ার এমন কথায় বেশ লজ্জা পেয়েছে রাজ।পিচ্চি মেয়েটার নজর উপেক্ষা করে এলোমেলো নজর ফেলতে লাগল সে।তবে সামিয়ার এমন উসখুস চাহনি দেখে বুঝলো যে উত্তর না পেয়ে মেয়েটা ক্ষান্ত হবে না।রাজ মনের মধ্যেই হালকা হেসে নিল।এই ছলে নাহয় কেউ একজনকে নিশ্চিত করতে পারবে।

সেই চিরচেনা মৃদু হাসি মুখে ফুটিয়ে রাজ শান্ত স্বরেই সামিয়ার উত্তর দিল,

"তোমার ভাইয়ার কাজ সামলাতে গিয়ে প্রেম করার সময়টা কোথায় পেলাম আমি?এ জীবনে অ্যারেঞ্জম্যারেজ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমার"

সামিয়া সবার চোখের আড়ালে অনুকে আরেক দফা ঘুতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কণুই বাড়িয়েছিল।কিন্তু এবার আর সেই সুযোগ দিল না অনু।খপ করে ধরে ফেলল হাতখানা।তবে নজর তার ভাতের প্লেটে।সামিয়া বিরক্ত নিয়ে অনুর দিকে ঘুরলেও লতিফা শেখ রাজের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,

"সেকথা ভালো যে অ্যারেঞ্জম্যারেজ করবা।তো তাড়াতাড়ি বিয়েটা করলে কি হয়?আমাদেরও একটু বিয়ে খাওয়া হবে"

এবারও সামিয়া তাড়া দিয়ে বলল,

"ও হো ছোট চাচি!এতো তাড়াহুড়োর কি আছে?বিয়ে করা কি চারটিখানি কথা নাকি?দেখেশুনে ভালো মেয়ে খুঁজে বিয়ে করা উচিৎ।সব মেয়ে কি আবার আমাদের বাড়ির মেয়ের মতো ভালো হয় নাকি?তাই না অনু আপু?"

লতিফা শেখ সামিয়ার প্রথমের কথায় মৃদু মাথা দোলালেন।সামিয়া কথাটা অবশ্য ভুল বলেনি।সেই সাথে আরেক চিন্তায় মাথা চুলকালেন তিনি,কিছুক্ষণ আগেই এই মেয়েটা বাচ্চাদের মতো কথা বলছিল।এখন আবার বড়দের মতো কথা বলছে কেন?

লতিফা শেখ ওদিকে ভাতিজির দুই রূপে বিভ্রান্ত হয়ে থাকলেও এদিকে রাজ আর অনু সামিয়ার শেষের কথায় ভালোই ভড়কে উঠে।সেই সাথে অনু আর রাজের চোখাচোখি হয় সুক্ষ্ম সময়ের জন্য।অনুর থেকে নজর ঘুরয়ে নিয়ে রাজ আর এক মুহুর্তও বসে থাকল না।খালি প্লেট ছেড়ে উঠে গেল হাত পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে।রাজ হয়তো অনুর মনের হাবভাব বুঝতে পেরেছে সেটা ভেবেই বেশ লজ্জা পেল অনু।চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করে মাথাটা অনেকটা নিচু করে ফেলল।

সামিয়া তো রাজের পরপরই উঠে পড়ে।ফাজিল মেয়েটা রাজের সাথে টুকটাক কথা বলেই যাচ্ছে।আর সেই কথার ছলেই যেন বারবার অনুর দিকে নজর দিচ্ছে রাজ।সামিয়ার আকার-ইঙ্গিতের কথায় ঠোঁটে মৃদু হাসিও ঝুলে রেখেছে।

রাজ শেখ ভিলা থেকে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত অনু আর মাথা তুলে রাজের দিকে নজর ফেলেনি।তার ভালো করেই জানা আছে সামিয়া নিশ্চয়ই উল্টাপাল্টা কিছু ভাট বকছে রাজের কাছে।গত সপ্তাহে সামিয়ার সাথে রাজের ব্যাপারে কথা বলাই যেন এখন পাপ মনে হচ্ছে অনুর কাছে।এই সামিয়াটার আজ গলা টিপে ধরতেই হবে।

সামিয়া লতিফা শেখের সাথে রাজকে বিদায় দিয়ে রান্নাঘরের দিকেই এগুচ্ছে।রান্নাঘরে ঢুকার আগেই মেয়েটার মাথায় খিচুড়ি রান্না হয়ে গেল।লতিফা শেখের গা ঘেঁষে হাটতে নিয়েই বলতে লাগলো সে,

"ছোট চাচি।রাজ ভাইয়া অনেক ভদ্র,তাই না?"

সুক্ষ্ম হেসে উঠলেন লতিফা শেখ,

"ঠিক বলেছিস।ছেলেটা বড়দের অনেক সম্মান করে"

"রাজ ভাইয়াকে কি তোমার পছন্দ হয়েছে?"

সরু চোখে সামিয়ার দিকে নজর দিলেন লতিফা শেখ,

"কেমন পছন্দ হওয়ার কথা বলছিস?"

চাচির নজর উপেক্ষা করে আকাশের তারা গুনতে লাগলো সামিয়া,

"না মানে..বলছিলাম কি...তখন তুমি বলছিলে যে...অনু আপু ফেল করলে তাকে নাকি বিয়ে দিয়ে দিবে?"

"হ্যাঁ,তো এটার সাথে রাজকে পছন্দ হওয়ার যুক্তি কোথায়?.."

লতিফা শেখ কথাটা বললেন ঠিকই,কিন্তু কথাটা বলে থমকালেন একদম পর মুহুর্তেই।ব্যতিব্যস্ত হয়ে নজর ফেললেন ডাইনিং থেকে সিড়ির দিকে এগুতে থাকা অনুর দিকে,

"এই অনু!!তুই ফেল করলেও কোনো সমস্যা নেই!"

মায়ের ডাকে অনু পেছনে ঘুরেছিল।কিন্তু পরের কথায় ভড়কালো বেশ।হাসিখুশি লতিফা শেখের পাশে ঠোঁট টিপে হাসতে থাকা সামিয়াকে দেখে আসল ঘটনা ভালো করেই বুঝলো সে।মায়ের উদ্দেশ্যে তেতে উঠল একদম,

"আম্মুউউ!!আমি অতটাও খারাপ ছাত্রী নই যে ফেল করব!আর এই সামিয়ার বাচ্চা!!এদিকে আয়।তোর গলা টিপে ধরব আজকে।তোকে যে হোমওয়ার্কগুলো করতে দিয়েছিলাম,হয়েছে?বিকেলে প্রশ্ন ধরলে যদি না পারিস তাহলে পিটোনি একটাও মাটিতে পড়বে না কিন্তু!"

অনুর শেষের কথায় জিহ্বার মাথায় কামোড় বসালো সামিয়া।ভো দৌড় দিয়ে অনুর আগেই সিড়িতে উঠে গেল।পাশ কেটে যেতে নিয়ে পিঠে দুম করে অনুর হাতের এক চপাঘাতও খেল।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

সাহিত্যের মুখোশ্রির অবস্থা খুবই খারাপ।কেমন যেন প্যাচার মতো করে রয়েছে।ঠিক প্যাচার মতোও নয়।কেমন অদ্ভুত এক মুখোশ্রি।রাগ,দুঃখ,বিরক্ত কোনটি প্রকাশ পাইছে বলা যেন বড়ই দুষ্কর।আর সেই মুখোশ্রির ভাব বুঝা যে বড়ই দুষ্কর তা সামনের ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভিকির মুখোশ্রিতেই স্পষ্ট।টেবিলের উপর রাখা অ্যাপেল ল্যাপটপটায় ওয়াইফাইয়ের কানেকশন একদম ঠিকঠাক।কিন্তু ভ্রু কুচকে থমকে থাকা ভিকিকে দেখে সেটা তো একদমই মনে হচ্ছে না।

দুই বন্ধুরই এমন মুখোশ্রি তৈরি হওয়ার কারণ ক্ষণিক আগে ভিকির করা একটামাত্র প্রশ্ন,

"কিরে?বাসর করলি?"

ভিকির সেই প্রশ্ন শুনে সাহিত্য মুখখানা এই যে প্যাচার মতো করেছে,আর যেন ঠিক হওয়ার নাম নেই।কথাও বলা বন্ধ করেছে ছেলেটা।আর সাহিত্যের এই অবস্থা দেখে এখন ভিকিও ভ্রু কুচকে রয়েছে।

ওয়াইফাইয়ের কানেকশন ঠিক আছে সেটা বুঝাতেই যেন ভারী নিরবতা ভেঙে ভিকিই মুখ খুলল,

"বিয়েটা করে করলিটা কি তুই?তোর আর আমার বিয়ের মাত্র চার মাসের ডিফারেন্স।আমি আজ তোকে কল দিয়েছি এটা বলার জন্য যে আমি বাপ হতে যাচ্ছি।আর এদিকে তুই নিজেই এখনো বাচ্চা আছিস?"

এবার সাহিত্য মাথা ঝাকিয়ে তেতে উঠল,

"বউ কাছে যেতে দেয় তো,তাই এসব বলছিস!আমার সিচুয়েশনে থাকলে তখন দেখতাম কি বলতি!"

"আমার বউ তোর বউয়ের মতো না!আমার বউ সারাদিন আমার পিছনে ঘুরে.."

ভিকির কথা শেষ হওয়ার একদম পর মুহুর্তেই সাহিত্য ধাম করে মাথাটা টেবিলে ঠেকিয়ে দিল।সামনের ল্যাপটপটা যেভাবে কেপে উঠল,টেবিলের বারিতে সাহিত্যের মাথাটা ফাটল কিনা,কে জানে?তবে মাথার দিকে না দেখেই গলায় কন্ঠের প্রভাব ফেলে ভারী খুত-খুত করে উঠল সাহিত্য।সাহিত্যের এমন কান্না দেখে চোখ উল্টালো ভিকি।কিন্তু পর মুহুর্তেই শ্বাস ফেলে বলে উঠল,

"কাঁদে না বাচ্চা কাঁদে না"

মাথা টেবিলে ঠেকিয়ে রেখেই চাপা গোঙ্গানি দিল সাহিত্য,

"আমার বউটা বুঝে না কেন?শশুরের মেয়ে একটা চুমুও দিতে দেয় না।চুমু দিতে গেলেই চিল্লাবে.."

সাহিত্য মাথা ধরফরিয়ে উঠালো,

"আরে চিল্লানি কে দিতে বলেছে!চুমু দিতে যাবো চুপচাপ চুমু নিবি আর দিবি।সাইরেন ফুকিয়ে সবাইকে জানানোর দরকার আছে?!"

আবারো ভারী শ্বাস ফেলল ভিকি,

"বুঝতে পেরেছি।এই জীবনে তোর ভার্জিনিটি না ভাঙার অভিশাপ লেগেছে।তুই বাদ দে।কয়েক মাস পর আমার বাচ্চা তোকে ভার্জিন মামুই ডাকবে,পাক্কা!"

এবার টেবিলে সাহিত্যের মাথার বদলে হাতের বারি পড়ল,

"বাদ দিব মানে?!ওই ফাহাদ চাচার মুখে নাতি-নাতনির খাওয়া সেরেলাক ঢুকিয়েই মুখ বন্ধ করব,বলে দিলাম আমি!"

"তার আগে ফাহাদ চাচার মেয়েকে রুমে ঢুকাতে হবে।সেটাই তো তোর দ্বারায় হচ্ছে না"

কান্না বের হতে চাইলেও সাহিত্য একদম হতে দিল না।চোখ-মুখ শক্ত রাখার চেষ্টা করেই ভিকির উদ্দেশ্যে বলে উঠল,

"আজ এই কল্পনাকে দেখে নিব।খুব ছাড় দিয়েছি,আর না!!"

ভিকির হেলাফেলা কথা,

"তুই যদি ওকে চুমু দেওয়ার জন্যও মানাতে পারিস তাতেই আমি ভাববো তুই বিরাট কিছু করে ফেলেছিস।কিন্তু ওই জেদখোর কল্পনা তো সেটার জন্যও মানবে না"

কথা শেষেই ভিকি হো হো করে হেসে উঠল।সেদিকে চোখ রেখে দাঁত কিড়মিড় করা ছাড়া আর কিছুই করল না সাহিত্য।

হাসি থামিয়ে আবার কথা বলতে লাগলো ভিকি,

"এশার প্রেগন্যান্সির ব্যাপারে শেখ ভিলার সবাইকে জানিয়ে দিস।মিষ্টি আমি কুরিয়ার করে পাঠাবো।আর...পারলে তোর মিষ্টি কুরিয়ার করার ব্যবস্থাটাও তাড়াতাড়ি কর.."

কথা শেষ না হতেই ভিকি আবারো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।ভিকি এই মুহুর্তে সাহিত্যের সামনে থাকলে নির্ঘাত দু-একটা কিল খেত।তবে সাহিত্য সেটা না করতে পেরেই যেন কোনো কথা ছাড়াই ল্যাপটপের স্ক্রিনখানা জোর হাতে লাগিয়ে দেয়।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

ভার্সিটি যাওয়া আবার শুরু করেছে কল্পনা এই তো কিছুদিন হলো।পড়াশুনার তেমন একটা চাপ না থাকলেও এই ভর দুপুরে পড়তে বসেছে সে।এই মেয়েটার মাথায় কখন যে কিসের ভূত চাপে,কে জানে?

টেবিলে রাখা বইয়ের দিকে নজর রেখেই কলমের শেষ প্রান্ত মুখে গুজে রেখেছিল কল্পনা।হঠাৎ রুমের দরজা খুলায় হালকা চমকে উঠল যেন।দরজার দিকে দেখতেই হালকা চমকানি ক্ষনিকের মাঝেই বড় আকার ধারণ করল।কাপা কন্ঠে সাহিত্যের উদ্দেশ্যে তেতে উঠল সে,

"আপনাকে কতবার বলেছি আমার রুমে ঢুকবেন না!কথা শুনেন না কেন?এখন আপনার জন্য কি দরজা লক করে রাখতে হবে?"

সাহিত্য দরজা থেকে হাত সড়িয়ে চৌকাঠে হেলান দিল।ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে বলল সে,

"ভাঙা দরজা না চাইলে সে কাজ করিস না"

সাহিত্যের কথার ধার ধারলো না কল্পনা।আবার সামনের বইয়ে নজর দিল,

"বই পড়ছি আমি।বের হন রুম থেকে।নাহলে আবার চিল্লাতে শুরু করব কিন্তু"

সাহিত্য পর মুহুর্তে কিছু বলল না।সময় নিয়ে বলে উঠল,

"একটা গুড নিউজ আছে"

টনক নড়ল কল্পনার।কিসের গুড নিউজ?তোফায়েল শেখ আর ফাহাদ শেখ কি মেনে গিয়েছে?!সেই চিন্তা করেই কল্পনা মাথা ঘুরালো আবার,

"কিসের গুড নিউজ?"

"এশা প্রেগন্যান্ট"

নিজের ভাবনা সত্য হয়নি সেই চিন্তায় হালকা মন খারাপই হলো হয়তো কল্পনার।তবে এশার গর্ভধারণের খুশির সংবাদ ঢাকা দিয়ে দিল সেটা।সাহিত্যের কথা শুনা মাত্রই তড়াৎ করে উঠে দাড়ালো কল্পনা,

"সত্যি?আল্লাহ এটা তো অনেক বড় গুড নিউজ।ভিকি ভাইয়া মিষ্টি খাওয়াবে না?কখন এ কথা বলল?আপনি আমাকে এখন বলছেন কেন?"

"এশা প্রেগন্যান্ট কল্পনা"

এবার সাহিত্যের কন্ঠ একদম স্বাভাবিক ছিল না।অক্ষি জোড়া গম্ভীর করে ভারী কন্ঠে সে কথা বলল সে।সেটা দেখেই কল্পনার মুখের হাসি যেন কমে এলো।বুঝে উঠল না যে সাহিত্য ঠিক কি বুঝাতে চাইছে।সাহিত্যের দিকে দেখে থেকেই হালকা ভ্রু কুচকালো সে,

"হ্যাঁ...তো..বিয়ে হয়েছে,প্রেগন্যান্ট হবে না?"

"তোরও তো বিয়ে হয়েছে"

এবার কল্পনা ভালোভাবেই বুঝতে পারল সাহিত্য কথার স্টেশন কই থেকে কই নিয়ে যাচ্ছে।ইদানীং একটা মুহুর্তের জন্যও এই ছেলেটা স্বাভাবিক কথা বলে না!কেনোওওও?!!

সাহিত্যের কথা শুনা মাত্রই চোখ জোড়া কোটর ফাটিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগলো কল্পনার।আর এদিকে সাহিত্য কথা শেষেই হাত দিয়ে পিছনের দরজা লক করে দিল।গত কয়েকদিন থেকেই কল্পনা সাহিত্যের এমন আক্রমণের শিকার হচ্ছে।তাই বর্তমানে সাহিত্য কি করবে সেটা ভালো করেই উপলব্ধি করতে পারল কল্পনা।সেটা ভেবেই আরো কেপে উঠল মেয়েটা।ডান হাতের কাপা এক আঙুল সাহিত্যের দিকে তাক করে আমতা-আমতা করতে লাগলো সে,

"শু-শুনেন,একদম ঠিক করছেন না কিন্তু।আমি কিন্তু আবার চিৎকার দিব!.."

কল্পনা কথাটা বলেই উলটো ঘুরল বেলকুনিতে যাবে বলে।কিন্তু সাহিত্য আর সেটা হতে দিল কই।খপ করে কল্পনার এক হাত ধরে মেয়েটার পিঠ ঠেকিয়ে দিল ঘরের দেয়ালে।অমনি চোখ-মুখ খিচে তেতে উঠল কল্পনা,

"সাহিত্য ভাই ছাড়েন বলছি!আমি কিন্তু আসলেই চিৎকার দিব"

এবার সাহিত্যের রাগটাও যেন বেড়ে গেল।ধমক দিয়ে উঠল সে,

"এই!কে তোর ভাই লাগে রে?আমি তোর ভাই লাগি?"

খিচে রাখা চোখ খুলল না কল্পনা,

"আপনি আমাকে না ছাড়লে আমি কিন্তু আপনাকে ভাই-ই ডাকবো।ছাড়েন সাহিত্য ভাই লাগছে!"

সাহিত্যের দুই হাতের মাঝে কল্পনার দুই হাত আবদ্ধ থাকলেও লাগার মতো অতটাও জোরে ধরেনি সাহিত্য।তবে কল্পনার কথার উত্তর যেন সঠিক হয় সেজন্যই হয়তো সাহিত্য দেয়ালে আরো গাঢ়ভাবে হাত দুটো চেপে ধরে,

"ছাড়বো না।কি করবি কর"

কল্পনা যেন বুঝলো,যে গত ক'দিন কল্পনার হালকা চিৎকারেই সাহিত্য তার কাছে না এলেও আজ ভিন্ন ঘটনা ঘটছে।আজ যে সাহিত্যের মাথায় রাগ উঠেছে সেটাও ভালো করে বুঝলো মেয়েটা।ভারী ঢোক গিলে নিজেকে সংযত করে চোখ জোড়া খুলল।অমনি মুখের সামনে দেখা মিলল সেই চির চেনা মাটিয়া-সবুজাভাব চোখ জোড়া।সেদিকে হঠাৎ নজর যেতেই যেন ভারী শ্বাস ফেলতে শুরু করেছে কল্পনা।আর এটা যেন ইদানীং প্রায় সময় হয়।তাই তো সাহিত্যের থেকে দূরে-দূরে থাকে।

তবে কল্পনাও কম না।নিজের মনের অনুভূতি দাবিয়ে সরু চোখে সাহিত্যের দিকে দেখতে লাগলো।ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়েই বলল সে,

"আমি কিন্তু আবার চিৎকার দিব"

"দে"

একদম পর মুহুর্তেই সাহিত্যের প্রতিক্রিয়া।সেটা শুনে কল্পনা ভালোই ভড়কালো।তবে কন্ঠ কাপা সত্বেও আবার বলে উঠল,

"স-সত্যি কিন্তু"

"দে না!চুপ করে আছিস কেন?"

কল্পনা কেবলই সুক্ষ্ম মুখ খুলেছে চিৎকার দিবে বলে,অমনি আবার ঠোঁট জোড়া বন্ধ করে ফেলল সে।সাহিত্যের দিকে দেখে হালকা ঠোঁট বাকালো,

"কি মনে করেছেন,আপনার প্লান আমি বুঝি না?আমি চিৎকার দিতে ধরলে আপনি কি করবেন আমার ভালো করেই জানা আছে"

সাহিত্য মেকি হাসলো,

"রং।আমি এমনিতেও ওটা করব"

সাহিত্যের কথা বলাও শেষ,আর কল্পনার ঠোঁট জোড়া ছুঁয়ে দেওয়াও শেষ।সুক্ষ্ম সময়ে গভীর এক ছোঁয়া দিয়ে সাহিত্য আবার আগের জায়গায় মাথা নিয়ে এলো।কল্পনা তো পুরো হতবাক।হলোটা কি!এটা কেমন ন্যায় বিচার?স্ক্রিপ্টে তো লিখা ছিল কল্পনা চিল্লাতে ধরলে সাহিত্য চুমু দিবে,তো সাহিত্য স্ক্রিপ্টের বাইরে কাজ কেন করে বসল?!

কাঁদো গলায় তেতে উঠল কল্পনা,

"আমি মানবো না!!এবার কিন্তু আসলেই চিৎকার দিব"

সাহিত্যের ঠোঁটের মেকি হাসি এখনো বিদ্যমান,

"তুই যেটাই কর,আমার উত্তর ওই একটা জিনিসই থাকবে"

কল্পনা আর পারলো না।সাহিত্যের বিশাল আকার হাত দুটোর মাঝে আবদ্ধ হয়ে থাকা নিজের হাতগুলো কচলাতে নিয়েই খুত-খুত করে কেঁদে উঠল,

"আমাকে এমন জ্বালাতন কেন করছেন?আপনি সিচুয়েশন বুঝছেন না কেন?"

এবার সাহিত্য যেন অনেকটা কোমল হয়ে এলো,

"জানপাখি তুই বুঝছিস না কেন?মরে যাচ্ছি আমি।আমার ছটফটানি তোর চোখে পড়ে না?....আমার ভালোবাসা তোর চোখে পড়ে না?"

শেষের বাক্যখানা বলতে নিয়েই সাহিত্য কল্পনার কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকিয়ে দেয়।সেটাতে নিচের অধর সুক্ষ্ম কেপে উঠল কল্পনার।সাহিত্যের ভালোবাসা তো তার চোখে ঠিকই পড়ছে।গত ক'দিন থেকে কল্পনাকে অবাক করে দিয়ে যেন পাগল হয়ে শেখ ভিলায় ঘুরছে ছেলেটা।কিন্তু বর্তমানে কল্পনার সেদিকে দেখলে যে চলবে না।তাকে এখন একপ্রকার বাধ্য হয়েই সেই দিকটা উপেক্ষা করতে হচ্ছে।কিন্তু এই মুহুর্তে যেন আর পারল না।

হঠাৎই যেন উষ্ণ হতে শুরু করল ঘরের পরিবেশটা।দুই হৃদয়ের উষ্ণ তাপেই হয়তো।

সাহিত্যের চোখের দিকে দেখে থাকার সাধ্য কল্পনার মাঝে আর নেই।নজর তো নিচু করেছে ক্ষণিক আগেই।তবে সাহিত্যের নেশালো ভারী কন্ঠটা যেন কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারলো না,

"আব্বু-চাচুকে ছাড়া আমার দিকটাও একটু দেখ।আমার ছটফটানিটা শান্ত করার একটু তো রাস্তা খুলে দে।বেশি না..একটু শুধু।আব্বু আর চাচু মানার পর তুই সংসার করবি করিস।কিন্তু আমার মনটার দিকে দেখা তো তোর দায়িত্বে পড়ে।আর কার কাছে যাব আমি,বল?.."

সাহিত্যের কথার মাঝেই কল্পনা কাপা কন্ঠে মিনমিনিয়ে উঠল,

"তো এখন কি করতে বলছেন আমাকে?বাবা-বড় বাবাকে না মানিয়ে আবার আপনার দিকে কেমন করে দেখবো আমি?"

কপাল থেকে কপাল সড়িয়ে মাথা নিচু করল সাহিত্য।ভারী শ্বাস ফেলে আবারো কপাল কল্পনার কপালে ঠেকিয়ে ধরল।হালকা অভিমান মিশ্রিত শুনালো সাহিত্যের কন্ঠটা,

"প্রতিদিন রিচার্জের দরকার হয় আমার।চুমু দিতে আসলে সাইরেন ফুকাবি না"

কল্পনার খুব করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল,

'তাহলে বিয়ের আগে কেমন করে রিচার্জ হতেন?'

কিন্তু কল্পনা সে প্রশ্ন করল না।কারণ সেই প্রশ্নে সাহিত্য যে উত্তরটা দেবে সেটা হয়তো কল্পনার জন্য লজ্জাজনকই হয়ে দাঁড়াবে।গত কয়েকদিনে যে সাহিত্যের গতিবিধি ভালো করেই বুঝতে পারছে সাহিত্যের আদরের অর্ধাঙ্গিনীটা।তাই তো চুপটি করে রইল।সাহিত্যের শরীর থেকে আসা ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউমের ঘ্রাণেই যেন লজ্জাটা হালকা একটু ভার করল নব যুবতীর অন্তরে।

সাহিত্যের কপাল নিজের কপালের সাথে ঠেকে থাকার পরই মাথাটা একটু জোর করেই নিচু করল কল্পনা।সেটা দেখে মেকি হাসলো সাহিত্য।তবে নিজের কপালের জোরেই সাহিত্য আবারো কল্পনার মাথাটা আগের জায়গায় নিয়ে গেল।হয়তো আগের থেকেও বেশি উঁচু করতে সক্ষম হয়েছে।তবে কল্পনার অক্ষি জোড়া উপরে তুলতে এখনো সক্ষম হয়নি।প্রেয়সীর লাল কপোলের দিকে এক নজর দেখে হাস্কি কন্ঠেই শুধালো সাহিত্য,

"নিরবতা কিন্তু সম্মতির লক্ষণ।আমি কি আমার বউকে চুমু দেওয়ার পারমিশন পেয়ে গিয়েছি?"

আবারো কিছু বলল না কল্পনা।নব বধুর ন্যায় নজর ঝুকিয়ে রেখেই চুপটি করে থাকলো।আর সেটাতেই যেন নিজের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেল সাহিত্য।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

রুমে ঢুকে সাহিত্য হুড়মুড়িয়ে ল্যাপটপ খুলে ভিকিকে ভিডিও কল লাগালো।ভিকি কল রিসিভ করার সাথে-সাথেই খুশিতে চেচিয়ে উঠল সে,

"হয়ে গিয়েছে!!"

বিষয় বুঝতে পেরে ভিকিও ঠোঁট বাকালো।তবে ভ্রু কুচকে পর মুহুর্তেই শুধালো,

"এতো তাড়াতাড়ি?তুই তো গেলিই এখনে"

ভিকির নষ্টামো কথায় সাহিত্য ঝারি মারল এক,

"ধ্যাত শা'লা!!অতো দূর যাস কেন?ধাপে-ধাপে আগাচ্ছি,বুঝিস না?চুমু খাওয়ার পারমিশন পেয়েছি সেটা বলছিলাম"

সাহিত্যের ঝারিতে হালকা কেপে উঠেছিল ভিকি।তবে শুধু চুমু খাওয়ার পারমিশন পেয়েছে সেটা শুনে ভারী এক শ্বাস ফেলল সে।

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন