ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৮৫তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৮৫(🚫রোমান্টিক এলার্ট)

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

লিফট থেকে বের হওয়ার আগ মুহূর্তে যেমন সাহিত্য নিজের ফোনে ব্যস্ত ছিল,লিফট থেকে বের হয়েও তেমনই ফোনে ব্যস্ত সে।মাথা নিচু করে নজর তার হাতের ফোনে আবদ্ধ থাকলেও ডার্বি সু জুতার খটখট আওয়াজ তুলে অফিসের ইন্টেরিয়র থেকে বাইরের দিকে এগুচ্ছে সে।প্রতিদিনের পরিচিত পদাচরনের কারণেই হয়তো সামনে না তাকানো সত্বেও দিব্বি হেটে চলেছে।এতো বড় কোম্পানির সি.ই.ও. হয়ে যেন খালি বসে থাকতেই পারে না ছেলেটা।অফিসের বাইরেও সবসময় ফোন বা ল্যাপটপে ব্যস্ত থাকতে হয়।যেমন এই মুহুর্তে গ্রুপ চ্যাটেই এক মিটিং চালিয়ে যাচ্ছে।মিটিংয়ের ব্যাকাপের জন্য অয়নকে গত দিনই কানাডায় পাঠানো হয়েছে।কিন্তু ভিকি যেন তাতেও সামাল দিতে পারছে না।তাই তো এখন সাহিত্যকেও এখান থেকেই যোগ দিতে বাধ্য করিয়েছে ভিকি।

ফোনের দিকে পুর্ণ মনযোগ থাকায় সামনের পরিবেশে একটু কমই ধ্যান ছিল সাহিত্যের।তবে হঠাৎই কোলাহল শুনে ভ্রু কুচকে সামনে তাকালো সে।তাতেই যেন ভড়কে গেল ছেলেটা।

মিডিয়ার লোকেরা সাহিত্যকে দেখা মাত্রই ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে যেন।কেউ বা ছবি তুলায় ব্যস্ত,তো কেউবা সাহিত্যকে "স্যার-স্যার" বলে ডেকেই যাচ্ছে।অফিসের গেটের সামনে ১০-১৫টা গার্ডও যেন তাদের ঠেকিয়ে রাখতে বেশ হিমসিম খাচ্ছে।

সাহিত্য পর মুহুর্তে ভড়কালেও এখন অনেকটা স্বাভাবিক আছে।এসব জিনিসের সাথে বেশ কয়টা বছর থেকেই অভ্যস্ত সে।স্বাভাবিকভাবেই পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে রাজের উদ্দেশ্যে শান্ত স্বরেই শুধালো সাহিত্য,

"হোয়াট ইজ অল দিস?"

রাজও এতক্ষণ সাহিত্যের সাথে লিফটেই ছিল।তবে লিফট থেকে বের হয়ে যেই না ফোনের নোটিফিকেশন চেক করতে গিয়েছে অমনি চোখ কপালে ওঠে তার।সাহিত্য ফোনে টাইপ করতে নিয়ে সামনে এগুলেও রাজ কিছু মুহুর্ত লিফটের দরজার কাছেই তম্বা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।তবে হুশ ফিরতেই হুড়মুড়িয়ে সাহিত্যের সাথে আবারো তাল মিলায় সে।পেছন থেকে এতো করে সাহিত্যের উদ্দেশ্যে হাক পাড়ল ছেলেটা,অথচ সাহিত্য কিনা ফোনের মিটিংয়েই ব্যস্ত ছিল।

এতক্ষণ থেকে রাজ যেই ব্যাপারে তথ্য দেওয়ার জন্যই হাক পেড়ে যাচ্ছিল সাহিত্য সেই প্রশ্নখানাই করে বসলো যেন।রাজ নিজের পায়ের গতি তো বাড়িয়েছিল ক্ষণিক আগেই।তবে অবশেষে সাহিত্যের নাগাল পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে।চোখের চিকন ফ্রেমের চশমা ঠিক করে বলে উঠল,

"আপনার বিয়ের ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গিয়েছে"

রাগে-বিরক্তে চোখ খিচে বন্ধ করল সাহিত্য।অতঃপর নিজেকে সংযত করে আবারো বলে উঠল।তবে এবার যেন শক্ত শুনা গেল সেই পুরুষালী কন্ঠটা,

"আমি না বলেছিলাম এ ব্যাপারে যেন এখনে কেউ না জানে"

নজর ঝুকালো রাজ,

"আমরা চেষ্টা তো করেছিলাম স্যার।কিন্তু..মিডিয়ার লোক..বুঝছেন না?"

সাহিত্য ঘাড় ঘুরিয়ে নজর দিল বড় কাচের দেয়ালের ওপরপাশে থাকা জার্নালিস্টদের দিকে।বিল্ডিংয়ের বড় কাচের মেইন দরজাটা খোলা থাকার দরুন তাদের কিচিরমিচির কানে আসছে সাহিত্যের।দরজার কাছে থাকা দুজন দারোয়ান না থাকলে হয়তো সাহিত্যের থেকে এই দূরত্বটুকুও আর রাখতো না তারা।অফিস এরিয়ার বড় কেচি গেইট পাড় করতে যে মিডিয়ার লোকগুলো দারোয়ানদের ঘাম ছুটিয়ে দিয়েছে সেটা ভালো করেই জানা আছে সাহিত্যের।এই মিডিয়ার লোকেরা মন্ত্রীর বাড়িতেও অনায়াসে ঢুকে যাবে সেটাতে কোনো সন্দেহ নেই।

"এখন কি করব স্যার?এভোয়েড করে বাসা চলে যাবেন কি?"

রাজের প্রতিবারের মতোই পরিস্থিতি সামলানো সচেতন কন্ঠ।সামনের মিডিয়া যেন কিছুই না তার কাছে।

সাহিত্য আর রাজের দিকে ঘুরলো না।সামনে নজর রেখেই সুক্ষ্ম হেসে বলে উঠল,

"কোনো কিছুকে পিঠ দেখিয়ে চলে যাওয়া আমার কাতারে পড়ে না রাজ"

ইট রঙা শার্টের উপর পড়নের কালো ব্লেজারের বন্ধ থাকা বাটোনটা খুলতে নিয়েই সামনে পা বাড়ালো সাহিত্য।

সাহিত্যকে কাচের দরজা পেড়িয়ে বের হয়ে আসতে দেখে মিডিয়ার লোকেরা যেন আরো ব্যস্ত হয়ে উঠল।আগের মতোই কিচিরমিচির করে প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করে যাচ্ছে তারা।

শান্ত নজর সামনের ব্যস্ত মানুষগুলোর দিকেই রাখলো সাহিত্য।অতঃপর মৃদু ঠোঁট বাকিয়ে ডান হাতখানা ক্লান্ত ভঙ্গিতেই হালকা উঁচিয়ে ধরল।সেটা দেখে একদমই চুপ মেরে গেল প্রত্যেকে।সাহিত্যের হাত দেখানোতে হয়তো তারা বুঝলো যে সাহিত্য চলে না গিয়ে তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে আগ্রহী।

"আপনাদের কাছে পাঁচ মিনিট সময় আছে।কি কি প্রশ্ন করবেন শান্তভাবে করবেন প্লিজ"

রাজের শান্ত স্বরের কথায় তার দিকে কটমটিয়ে দেখতে লাগলো মিডিয়ার লোকগুলো।রাজকে তারা একদমই পছন্দ করে না।কারণটা খুবই স্পষ্ট।সাহিত্যের সাথে কথা বলতে এলে প্রতিবারই এমন স্বল্প সময়সীমা ধরিয়ে দিবে রাজ।যেটা তাদের একদমই পছন্দ না।তবে আজ আর রাজের দিকে চোখ চালিয়ে সময় নষ্ট করে বোকামি কিছুতেই করা যাবে না।O.S.S. কোম্পানির সি.ই.ও. সাহিত্য শেখের বিয়ের ব্যাপারটা জানতে হবে যে!

রাজের অনুমতি পেয়ে যেন হুড়মুড়িয়ে সাহিত্যের দিকে এগিয়ে এলো মিডিয়ার লোকগুলো।শ'খানেক মাইক এগিয়ে দিল সাহিত্যের দিকে।সাথে-সাথেই একজন প্রশ্ন করে বসল,

"মিস্টার সাহিত্য শেখ!গুজব শুনা যাচ্ছে যে আপনি নাকি বিয়ে করেছেন?এটা কি সত্য?"

রাজ পাঁচ মিনিট সময় নির্ধারণ করলেও সাহিত্যের মধ্যে তার প্রভাব দেখা গেল না।তার হাবভাব একদমই স্বাভাবিক।প্রশ্নখানা শুনে পর মুহুর্তেই নয়,তবে সুক্ষ্ম সময় নিয়ে বলল সাহিত্য,

"হ্যাঁ,আমি বিয়ে করেছি"

সাহিত্যের সুক্ষ্ম কথায় হালকা ভড়কানোর শব্দ হলো সামনের ভীড়ে।তবে আবারো এক প্রশ্ন শুনা গেল,

"আমরা এটাও শুনেছি যে আপনি নাকি আপনার চাচাতো বোনকে বিয়ে করেছেন?এ বিষয়টাতে কি বলবেন?"

সাহিত্য ভ্রু কুচকালো,

"কেন?আমি আমার চাচাতো বোনকে বিয়ে করতে পারিনা?আমার ক্ষেত্রে সেটা মানা আছে নাকি?"

সুক্ষ্ম হাসির রোল পড়ল যেন।সাথে সেই একই জার্নালিস্ট বলে উঠল,

"না না।মানা থাকবে কেন?আমরা শুধু জানতে চাচ্চিলাম এমন হুট করে বিয়েটা কেন?সেটাও আবার চাচাতো বোন।সেটাও আবার...F.S. কোম্পানির সি.ই.ও. এর ছোট মেয়েকে"

মেকি হাসলো সাহিত্য,

"সময় কিন্তু বেশি নেই।এমন ঘুরিয়ে পেচিয়ে না বলে সরাসরি প্রশ্ন করা উচিৎ আপনাদের"

ভীড়ে আবারো সুক্ষ্ম হাসির শব্দ শোনা গেল।তবে এবার আর কড়া প্রশ্ন করতে পিচপা হলো না মিডিয়ার লোকগুলো,

"ওই সেটাই।মিস্টার ফাহাদ শেখের মেয়ের সাথে এমন হুট করে বিয়ে কেন করলেন?আর এতো বড় দুটো কোম্পানির সি.ই.ও. এর মাঝে চাচা-ভাতিজা বাদে নতুন এক সম্পর্ক গড়ে উঠল,সেটা একটু ধুমধাম করে পালন করা উচিৎ ছিল না?"

সাহিত্য তার দুই হাত পকেটে গুজে দাড়ালো।ঠোঁটে হাসি নিয়েই বলল সে,

"আপনারা...মিস্টার ফাহাদ শেখের কাছে কোনো তথ্য পাননি,তাই না?"

এই মেয়ে জার্নালিস্ট চোখ উল্টালো,

"আপনি তো তবুও কথা বলেন আমাদের সাথে।উনি তো কোনোবারই আমাদের সাথে তেমন কথাই বলেন না।আর এ ব্যাপারটাতেও আমাদেরকে পুরো ইগনোর করে চলে গিয়েছেন"

সেই মেয়ের পাশ থেকে এক কম বয়সী ছেলে বলে উঠল,

"মিস্টার ফাহাদ শেখের কথা বাদ দিন।আমরা আপনার থেকে উত্তর শুনতে চাইছি"

আগের ন্যায় স্বাভাবিক উত্তর সাহিত্যের,

"সবকিছু হওয়ার সাথে-সাথেই যে সেলিব্রেট করতে হবে এটা তো কোথাও লিখা নেই।দুই সি.ই.ও. বর্তমানে অনেক ব্যস্ত দেখে ছোট করে বিয়েটা করা হয়েছে"

"বিয়ে ছোট করে করতে চেয়েছেন?নাকি অবৈধ কিছু ছিল মিস্টার সাহিত্য শেখ?"

এক মধ্য বয়স্ক লোকের এমন কাটকাট কথায় রাজ যেন বাধ্য হলো এক ধাপ এগুতে।কিন্তু সাহিত্য হালকা ভড়কালেও শান্ত থাকলো।সুক্ষ্ম সময়ের জন্য নজর নিচু করে আবারো নজর তুলে সেই প্রশ্নকারীর দিকে সরাসরি তাকালো সে,

"অবৈধের কি দেখছেন এখানে?তাকে আমি ভালোবাসি তাই বিয়ে করেছি।চাইলে আমার ওয়াইফের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করতে পারেন আপনারা।আই হ্যাভ নো কমপ্লেইন উইথ দ্যাট।কিন্তু আমার ওয়াইফকে পার্সোনালি একদম ডিস্টার্ব করতে যাবেন না।সে মিডিয়ার এসব একদম পছন্দ করে না।যদি এমন কিছু আমার কান অব্দি পৌঁছেছে...তাহলে নিজের চাকরির কথা ভুলে যান...থ্যাংক ইউ"

আর এক মুহুর্ত দাড়ালো না সাহিত্য।শেষে গম্ভীর আওয়াজে 'থ্যাংক ইউ' বলেই নিজের অ্যাস্টন মার্টিনের দিকে এগুলো সে।আর তার পিছে-পিছে রাজও।

সাহিত্যের উত্তরখানা যেন সইতে পারেনি মিডিয়ার লোকেরা।মিস্টার অহিয়াম শেখ সাহিত্য কাউকে ভালোবাসতেন?কবে থেকে?এ খবর তাদের কান অব্দি পৌঁছায়নি কেন?একদম বিয়ের পরেই জানতে পারলো সেকথা?এটা যেন বড়ই আফসোসের বিষয়।সাহিত্যের কথা শেষে স্থান ত্যাগে আরেক দফা ভড়কালো তারা।এতক্ষণ থেকে যে শান্তভাব বজায় রেখেছিল সেটা মুহুর্তেই ভেঙ্গে গেল।তবে গার্ডদের বাধা দেওয়ায় সাহিত্যের দিকে আর এগুতে পারলো না তারা।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

ড্রইং রুমের পরিবেশ একদম স্বাভাবিক বললেই চলে।স্বাভাবিকের একটু উর্ধে বটে।পরিবেশটা বেশ হাসিখুশি।সেটা অবশ্য সম্ভব হয়েছে শেখ আহমেদদের কারণে।তোফায়েল শেখ গিয়েছেন অফিস ট্রিপে।বিকেল হলেও ফাহাদ শেখ এখনো অফিস থেকে বাড়ি ফিরেননি।আর রঞ্জক শেখ আরাম করছেন নিজ রুমে।এই সুযোগেই যেন তিন গিন্নি ড্রইং রুমটা নিজ দখলে নিয়ে রেখেছেন।আর তাদের সাথে উপস্থিত আছে বাড়ির তিন মেয়ে।

সামিয়া আর অনু সোফায় স্বাভাবিকভাবে বসলেও কল্পনা বেশ অস্বাভাবিক।সে তো হেনা শেখের কোলে মাথা রেখে সোফায় একদম শুয়েই পড়েছে।টিভি দেখার ফাঁকে টেবিলে রাখা চিনা বাদামের বাটি হাতড়াতে একদমই ভুলছে না সে।তিন যুবতীর পুর্ণ মনোযোগ টিভিতে হলেও বাড়ির তিন গিন্নি গল্পে মত্ব।সাংসারিক কথাবার্তাই যেন তাদের বেশি টানে।

টিভিতে একখানা পারিবারিক নাটক চলছে,সেই হিসেবে বেশি থ্রিলার কিছু নেই।ড্রইং রুম সহ টিভির আওয়াজও বেশ শান্ত।তবে এই শান্ত পরিবেশ চিড়ে দিল ভারী পুরুষালী এক কন্ঠ।

দোতলা থেকে হঠাৎই সাহিত্য চিৎকার দিয়ে কল্পনার নাম ধরে ডাকলো।সেই ডাকে সবাই চমকালেও কল্পনা একদম হাতে-পায়ে চমকে উঠেছে।

হেনা শেখের হাতের নিচে থাকা মাথাটা তড়াৎ করে তুলল সে।ক্ষণিক বাদে সাহিত্য আবারো চিৎকার দিয়ে উঠল,

"কল্পনা!!!"

গিমগিমিয়ে উঠল পুরো শেখ ভিলা।

"এমন করে কে ডাকে?কিছু হলো নাকি আবার?"

সবার মতো লতিফা শেখও দোতলায় নজর দিয়ে মুখের কথা বলে বসলেন।সেটা শুনেই কল্পনা হেলাফেলায় আবার হেনা শেখের কোলে মাথা ঠেকিয়ে দিল,

"কিছুই হয়নি।এমনি ডাকছে অমন করে"

"কল্পনাআআআআ!!!"

কল্পনার কথা শেষ হতেই উপর থেকে সাহিত্য আবারো চিৎকার ছুঁড়লো।এবার আর কল্পনা বসে থাকতে পারলো না।লেমন রঙা থ্রিপিসের ওড়না ঠিক করে জোর পায়ে সিঁড়ির দিকে এগুলো,

"আমি দেখছি,তোমরা টিভি দেখো"

কল্পনার ছোড়া বার্তায় পেছনের দর্শকরা মিটিমিটি হাসলো যেন।কিন্তু কল্পনার এবার আসলেই চিন্তা হচ্ছে।কিছু হলো নাকি আবার?এমন করে তো কল্পনাকে আগে কখনো ডাকেনি সাহিত্য।

নিজের মনে বেশ দুশ্চিন্তা নিয়েই সাহিত্যের রুমের দিকে হুটিপুটি পায়ে এগিয়ে গেল কল্পনা।হুড়মুড়িয়ে রুমের দরজা খুলে দাড়ালো,

"কি হয়েছে?এমন করে ডাকছেন কেন?"

ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে কথাটা বলে থমকালো কল্পনা।দরজা খুলেই দেখা মিলেছে সাহিত্যের প্রশস্ত ভি সেইপের উন্মুক্ত পিঠখানার।এই সুপুরুষের উন্মুক্ত বক্ষ দেখতে এখন যেন আর কোনো বাধা নেই কল্পনার।পূর্ণ আধিকার আছে তার।তবুও প্রতিবারের মতো এবারও নজর নিচু করে নিল।নিজের সংকোচেই হয়তো।তবে মাথা নিচু করেই ভ্রু কুচকালো সে।সাহিত্য তো নিজের রঙ-তুলি ক্যানভাসে চালাতে ব্যস্ত,তো এমন করে ডাকলো কেন?

মনের প্রশ্নের উত্তর কল্পনা পর মুহুর্তেই পেল।সাহিত্য কল্পনার দিকে না দেখেই ভারী কন্ঠে বলে উঠল,

"কতক্ষণ থেকে ডাকছি,শুনছিলি না কেন?"

কল্পনা পা বাড়িয়ে রুমের ভিতর ঢুকে,

"সিঁড়িতে উঠতে সময় লাগে না বুঝি?"

কিছু না বলে প্রেয়সীর দিকে নজর দিল সাহিত্য।সাথে হাতের পেইন্ট ব্রাশ রেখে কালো ট্রাউজারের পকেটে হাত গুজে দিল।মাথা তুলে কল্পনা আগাতে নিয়েই থেমে গেল যেন।সাহিত্য তার দিকে এমন করে দেখছে কেন?যেন মন গহীন থেকে কিছু বলতে চাইছে সামনের রমণীকে।সেই সুক্ষ্ম এক কথা বলতে চাওয়ার এক আকাশ পরিমাণ ইচ্ছাতেই সাহিত্যের চোখগুলো বেশ ভারী হয়ে এসেছে যেন।

নিজের ভাবনায় বিভোর থাকা অবস্থাতেই কল্পনা আনমনে শুধালো,

"ডাকলেন কেন?"

ঠোঁট বাকালো সাহিত্য।ঘুরে আবার ক্যানভাসের দিকে হয়ে ভারী কন্ঠেই বলে উঠল,

"এই মুহুর্তে তোর খুব দরকার ছিল,তাই"

"কি দরকার ছিল আমার?"

কল্পনার কথায় পেইন্ট টিউবের ঢাকনা খুলতে নিয়েই থমকালো সাহিত্য।ঘাড়খানা নিচু থেকে আর উচু করল না।নিজের মনের কথা কি কল্পনাকে বলে দিবে সে?এটাই যে,সাহিত্য তার প্রেয়সীকে খুব করে একটুখানি কাছে পেতে চায়।মনটা খুব আনচান করছে সাহিত্যের এই মুহুর্তে।অবাধ্য অনুভূতিরা বেসামাল হয়ে উঠেছে যেন।কল্পনা একটুখানি যেন সাহিত্যের অনুভুতিগুলোকে ক্ষণিকের জন্য সামলে নিক।শুধু একটু সময়ের জন্য।বেশি না।সাহিত্যের শক্তপোক্ত হৃদয়টা যে খুবই উথাল-পাতাল করছে।

আবারো সাহিত্য পেইন্টের টিউবের ঢাকনায় হাত চালাতে লাগলো,

"তোর হাতের ছাপ নিতাম।আমার ছবিতে দরকার ছিল"

"আমার হাতের ছাপই লাগবে?"

"আমার জীবনে তো পুরাটাই তুই লাগবে।সেটা তো হতে দিচ্ছিস না,অন্তত হাতের ছাপটা নিতে দে"

কল্পনা যেন আবারো থমকালো।সাহিত্যের সুক্ষ্ম কথায় অধর কেপে উঠেছে তার।এলোমেলো নজর ফেলে এগিয়ে গেল সাহিত্যের দিকে।সংকোচে ডান হাতটাও বাড়িয়ে ধরল।

পেছন ফিরল না সাহিত্য।ঘাড়খানা নিচু রেখেই হালকা ঘুরিয়ে আবারো নজর দিল কল্পনার দিকে।কেমন মাথা নিচু করে হাতখানা বাড়িয়ে রেখেছে কল্পনা।আজ সাহিত্য হাসলো না প্রেয়সীকে দেখে।তার মনে তো অন্যকিছুই চলছে।মনে বড় লোভ লাগছে প্রেয়সীর জন্য।হাতের ছাপ নেওয়া তো অযুহাত মাত্র।সাহিত্যের পেইন্টিংয়ে কোনো হাতের ছাপের দরকার নেই।সাহিত্য তো শুধু তার প্রেয়সীকে একটু কাছে পেতে চায়।আর সেটার জন্য সাহিত্য স্বার্থপর হতেও দ্বিধা করবে না।

কল্পনার হাতটা ধরে এক হেচকা টান দিল সাহিত্য।হঠাৎ এমন হেচকা টান যেন কল্পনা সামলে উঠতে পারলো না।তবে কিছু বুঝে উঠার আগেই আবিষ্কার করল,তার পিঠ সাহিত্যের উন্মুক্ত বুকের সাথে লেপ্টে রয়েছে।কল্পনা সে বিষয়টা ভালো করে বুঝতে নেওয়ার মাঝেই সাহিত্য নিজের থুতনি কল্পনার ডান কাধে ঠেকিয়ে দিয়েছে।কল্পনাকে নিজের বাহুদ্বয়ের মাঝে আবদ্ধ করে বাম হাতে থাকা পেইন্ট টিউব থেকে নীল টকটকে রঙ ডান হাতের তালুতে নিল।অতঃপর কল্পনার ডান হাতের তালুতে নিজের হাতের তালু মিশিয়ে রাঙিয়ে দিল হাতের পুরো তালুখানা।

এদিকে কল্পনা সাহিত্যের দিকে ঘাড় ঘুরাতে পারছে না।ঘাড় ঘুরালেই চোখে চোখ পড়বে।তাই তো সাহিত্যকে আড় চোখে দেখে আছে সে।নীল রঙের সাথে সাহিত্যের হাতের উষ্ণ ছোয়া যেন সয়ে নিল মেয়েটা।

সাহিত্য ও কল্পনার সেই ডান হাত জোড়া এখন যেখানেই ছুঁয়ে দিবে সেখানেই হয়তো নীল আভা ফুটে উঠবে।হলোও সেটা।তবে শুধু সাহিত্যের ক্ষেত্রে।কল্পনার হাতের তালুতে রঙ লেপ্টে দিয়ে কব্জিখানা হাতের মাঝে আবদ্ধ করল সাহিত্য।কল্পনার ক্লান্ত ভঙ্গির হাতটা নিয়ে গেল সামনের ক্যানভাসে।যেটি কয়েক ইঞ্চি দূরেই স্টান্ডে দাঁড়িয়ে আছে সাহিত্য আর কল্পনার থেকে।অতঃপর কব্জি থেকে ধীরে-ধীরে হাত সড়িয়ে এনে কল্পনার হাতের উল্টো পিঠ আকড়ে ধরে ক্যানভাসের নিচের এক কোণে স্বযত্নে চেপে ধরল।

কল্পনার হাতের উলটোপিঠসহ কব্জির প্রায় পুরো অংশটা সাহিত্যের হাতের রঙে লেপ্টে।কিন্তু সেদিকে কল্পনার খেয়াল কই?সে তো চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করে নিজের ভারী শ্বাস অনুভব করতে ব্যস্ত,সাথে নিজের কাধে সাহিত্যের অধরের উষ্ণ আলতো ছোঁয়া।

সাহিত্য যেন আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেই পারেনি।যার দরুন এক প্রকার বাধ্য হয়েই অধর ছুঁয়ে চলেছে প্রেয়সীর উন্মুক্ত কাধে।তবে প্রেয়সীর কাধের কাছের চুলগুলো বড্ড জ্বালা করছে সাহিত্যকে।যেন বাধা দিচ্ছে প্রেয়সীর ঘাড়-কাধ ছুঁয়ে দিতে।তাই তো রঙে আবৃত ডান হাত প্রেয়সীর হাত থেকে উঠিয়ে কাধের কাছে নিয়ে গেল।অধর জোড়া ব্যস্ত রেখেই হাত দিয়ে কেশগুলো সড়িয়ে দিল প্রেয়সীর।কাধের চুল সড়িয়ে দেওয়ার ক্ষণিক সময় পর সেই রঙে লেপ্টানো হাত স্থান পেল প্রেয়সীর চিকন কোমড়টার ভাজে।কল্পনার ডান কাধের ওড়নাটা যেন আলগোছেই পড়ে গিয়েছে।ক্যানভাসে ঠেকানো কল্পনার হাতের কণোইয়ের ভাজে ঠাই পেল সেটি।

আধো বন্ধ নেশায় বুদ হওয়া সাহিত্যের অক্ষি জোড়া যেন আশেপাশের আর কিছুই দেখতে সক্ষম না।প্রেয়সীর শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণ ছাড়া কিছুই অনুভব করতে সক্ষম নয় সে এই মুহুর্তে।তবে কল্পনা যেন আর সইতে পারছে না।ক্যানভাসে থাকা হাতের নখগুলো দেবে গিয়েছে ক্যানভাসটায়।সাহিত্যের অধর জোড়ার ছোঁয়া প্রতি ক্ষণে-ক্ষণে যেন গাঢ় হয়েই যাচ্ছে।সাথে সাহিত্যের হাত ও অধরের বিচরণ চলছে আরো গভীরতায়।আর সেটাতেই কেপে-কেপে উঠছে মেয়েটা।নব যুবতীর সুপ্ত নারী সত্বাটা এই জাগ্রত হলো বুঝি।

আর পারলো না কল্পনা।নিজের মনের সুপ্ত নারী সত্বাকে দুমড়েমুচড়ে দিয়ে ধড়ফড়িয়ে পেছন ঘুরলো।বেশ কিছুক্ষণ যাবত ক্যানভাস আর সাহিত্যের মাঝে পিষ্ট হওয়ায় পেছনে ঘুরতে নিয়ে বেশ হিমসিম খেল সে।এমনকি পেছনের ক্যানভাসটা পড়েও যেতে ধরল।

কল্পনার এমন কান্ডে সাহিত্যও বেশ ভড়কেছে।তবে সময় মতো কল্পনাসুদ্দো পেছনের পড়তে থাকা ক্যানভাসটা ধরে ফেলল সে।এমতাবস্থায় কল্পনা একপ্রকার বাধ্য হলো নিজের হাত জোড়া সাহিত্যের বুকে ফেলতে।কল্পনার মতো এবার সাহিত্যও যেন লেপ্টে গেল ভালোবাসার মানুষটার হাতের নীল রঙে।তবে কল্পনার থেকে বেশি নয়।এবার তো কল্পনার বাধন হারা চুলেও ক্যানভাসের হরেক রঙা রঙ ভরেছে।আর সেই সাথে আবারো পিষ্ট হলো সাহিত্য ও সাহিত্যের ক্যানভাসের মাঝে।এক দফা নজর ফেলল সাহিত্যের দিকে।ছেলেটা এখনো নিজের ঘোর থেকে যেন বের হতেই পারেনি।আর নিজের অয়েল পেইন্টে নিজের প্রেয়সীকে লেপ্টানো দেখে যেন আরেক দফা কাবু হয়ে বসলো।

স্টান্ডে দাড় করানো ক্যানভাস থেকে সাহিত্য হাত সরিয়ে ডান হাত ছুঁয়ে দিল কল্পনার কপালে।সামনের ছোট চুলগুলো গুজে দেওয়ার চেষ্টা চালালো কানের পিছনে।তবে তারা যেন স্থায়ি হলো না।একটু ছাড়া পেতে আবারো কল্পনার আদলে এসে ঠেকলো।তবে এবার কল্পনার মুখোশ্রিও যেন লেপ্টে গেল সাহিত্যের হাতের নীল রঙটায়।

সাহিত্য তো এখনো ডান হাতখানা কল্পনার কানের পেছনে ধরে রয়েছে।প্রেয়সীর নেশায় ভারীভাবে ডুবতে যে বড়ই ইচ্ছা করছে তার।সেই ইচ্ছাতেই হয়তো কল্পনার ঠোঁটের নিচটা এবার হালকা করে ছুঁয়ে দিল বৃদ্ধা আঙুলটা দিয়ে।প্রেয়সীর ঠোঁটের নিচে রঙ ভরিয়ে দিয়ে ঝুকে যেতে লাগলো সামনে।

কল্পনা হয়তো বুঝে উঠলো সাহিত্যের পরবর্তী পদক্ষেপ।অমনি চোখ খিচে নিয়ে সাহিত্যের বুকে দুই হাত দিয়ে ঠেলতে লাগলো সে,

"সাহিত্য ভাই,না প্লিজ!"

থমকালো সাহিত্য।তার প্রেয়সী আবার বাধা দিয়ে দিয়েছে।সাথে-সাথেই ঘাড় পাশ ফিরিয়ে ভারী কন্ঠে সুক্ষ্ম আওয়াজে বলল সাহিত্য,

"সরি"

সাহিত্য হয়তো রাগের মাথাতেই সে কথা বলল।কিন্তু কল্পনা যেন বুঝে উঠল না যে সাহিত্য নিজের উপর রাগ করেছে নাকি কল্পনার উপর।হয়তো কল্পনার উপরই।কিন্তু কল্পনার যে প্রচন্ড ভয় করছে।যদি কিছু আবার ভুল করে ফেলে সে?

আর এক মুহুর্ত দাড়ালো না কল্পনা।সাহিত্যের হাতের বাধন ঢিলা হতেই মেয়েটা ছুটলো নিজের রুমে।রুমে ঢুকে একদম ধাম করেই লাগিয়ে দিল দরজাটা।বেশ ভারীভাবে শ্বাস ফেলতে নিয়ে দরজার কাছেই বসে পড়লো।সাথে নজর পড়ল খানিক দূরে সামনের আয়নাটার দিকে।সামনের সেই আয়নায় নজর যেতেই শুধু একটি জিনিসেরই দেখা মিলল কল্পনার চোখে।সাহিত্যের রঙে রঞ্জিত কল্পনা।

#চলবে

অবশ্যই রেস্পন্স করবেন।নাহলে গল্প দেরি করে দিব কিন্তু😑

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন