#পর্ব_৮৬
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
F.S. গ্রুপ এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিস।বাংলাদেশের এক নামি-দামি কোম্পানি।দেশের বাইরেও বেশ কয়েকটি দেশে যার নাম ভালোই লোক মুখে।দেশের খবরের কাগজে প্রায়শই যেই কোম্পানির আর্টিকেল পাওয়া যায়।আর সেটা যেন সবসময়ই হেডলাইনের খবরখানার স্থান দখল করে থাকে।মিডিয়ার লোকদের যে বড়ই আগ্রহ এই "F.S. গ্রুপ এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি" -এর সি.ই.ও. এর জীবনটা নিয়ে।মানুষটার কাজগুলো যে প্রায়শই আশ্চর্য করে রাখে মিডিয়ার লোকদের।তাদের তো এতো দিনে এটাও ধারণা হয়েছে যে,F.S. গ্রুপ এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সি.ই.ও রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ নন,বরং এই "ফাহাদ শেখ আহমেদ" লোহার তৈরি মানুষ।কাউকে যেন এক ছটাকও ছাড় দিতে চান না।সেটা তার স্বভাবেই পড়ে না।মিডিয়ার লোকদের সাথে কম কথা বলেন দেখে এই মানুষটা যেন আরো বেশি রহস্যময় হয়ে উঠেছে সবার নজরে।মিডিয়ার লোকেরা যেন F.S. কোম্পানির ভিতরের খবর জানার জন্য প্রতি মুহুর্তেই ওত পেতে থাকে।কিন্তু ফাহাদ শেখ হুটহাট করে এমন এক কাজ করে বসেন যে মিডিয়ার লোকদের চোয়াল ঝুলে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।আর সেই হুটহাট করা কাজ এমন হয়ে থাকে যে খবরের হেডলাইনে সেই সংবাদ থাকবেই থাকবে।
যেমন গত সপ্তাহের কথা বললেও ভুল হবে না।সৌদির এক নামকরা কোম্পানিকে টেক্কা দিয়ে সেখানে বিজনেসের ব্রাঞ্চ খুলে বসেছেন।সেই সৌদির কোম্পানি যেসব প্রডাক্টস দিয়ে নিজেদের মার্কেটিং চালাতো ;একদম সেই জায়গায় হাত দিয়েছেন ফাহাদ শেখ।এমন চাল চেলেছেন,যে ক্রেতারা এক প্রকার নিজেদের প্রফিটের দিকে দেখেই F.S. কোম্পানির সাথে প্রডাকশনের কাজ শুরু করে।
অবশ্য ফাহাদ শেখের গত ছ'মাস অব্দিও এমনটা করা ধারণায় ছিল না।কিন্তু চার মাস আগে সৌদিতে এক ট্রিপে গিয়ে সৌদির সেই কোম্পানির সি.ই.ও. বেশ মশকরা করছিল F.S. কোম্পানিকে নিয়ে।আর...সেটারই ফল পেয়েছে সেই কোম্পানি।ফাহাদ শেখের সাথে মশকরা একটু ভেবেচিনতে করা উচিৎ।নাহলে অনেক পচতাতে হয়।কিন্তু অহিয়াম শেখ সাহিত্য যেন সেই তুচ্ছদের কাতারে পড়েই না।সে তো বিজনেস ইন্ডাস্ট্রিতে পদার্পণ করেছেই "দি ফাহাদ শেখ"-কে টক্কর দেওয়ার উদ্দেশ্যে।সেটার প্রমাণ,তিন মাস আগে ফাহাদ শেখের আদরের ছোট কন্যাকে বিয়ে করা।
সেই বিয়ের পর ফাহাদ শেখ প্রায় ১২ বছর পর প্রথমবারের মতো সাহিত্যের সাথে কথা বলতে শুরু করেন।ঠিক যেন কথা বলা নয়।কথা কাটাকাটি করা।ফাহাদ শেখ সুযোগ পেলেই সাহিত্যের মুখের উপর কথা বলতে শুরু করেন।কিন্তু অপরদিকে সাহিত্যের যেন ভিন্ন আচরণ।ছেলেটার আচরণ দেখে বোঝাই যায় না যে ছেলেটা ঠিক ফাহাদ শেখের মতোই রগচটা।কিন্তু ফাহাদ শেখের মতো রগচটা হলেও সাহিত্য আর ফাহাদ শেখের মাঝে পার্থক্য আছে।
জীবনের গত ১১টা বছর একাকিত্বের সাথে থেকে নিজের রাগকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়ে উঠেছে সাহিত্য।যেটা ফাহাদ শেখের ক্ষেত্রে একদমই হয়নি।ফাহাদ শেখের রাগ উঠতে যেন বেশি সময় লাগে না।তবে দুই ব্যক্তির একবার রাগ মাথায় উঠলে তাদের প্রেয়সী ছাড়া যেন আর কারো পক্ষেই তা ঠান্ডা করা সম্ভব হয়ে উঠে না।
আপাতত তো সাহিত্যের প্রেয়সী সাহিত্যের থেকে দূরে-দূরে থাকে।তবুও ফাহাদ শেখের কড়া কথা কাটাকাটিতে সাহিত্য যথেষ্ট শান্ত ছেলে হয়ে থাকে।ফাহাদ শেখকে হারিয়ে দিয়ে নিজের প্রেয়সীকে বিয়ে করে জিতেছে সেই খুশিতেই হয়তো।কিন্তু সাহিত্যের এমন শান্ত আচরণ দেখে ফাহাদ শেখের রাগটা যেন আরো মাথায় উঠে।ফাহাদ শেখের কড়া কথায় সাহিত্যের এমন হেলাফেলায় নেওয়া দেখে আরো মেজাজ বিগ্রে যায়।আর সেই রাগ যেন হেনা শেখও থামাতে সক্ষম হয়ে উঠেন না।
ইদানীং এসব সামলাতে গিয়েই যেন অফিসে এসে বসে থাকলেও অফিসের কাজে মন বসে না ফাহাদ শেখের।প্রায় কাজ তার পি.এ. মিস্টার জায়েদ আহাম্মেদই করে থাকেন।জীবনের বিশ্বস্ত প্রথম পি.এ.-কে এখন অব্দি ছাড়েননি ফাহাদ শেখ।সমবয়সী জায়েদ সাহেবের সাথে অফিসের বাইরের বেশ কিছু কথাও সিগারেট ফুকিয়ে আলাপ করেন তিনি।কল্পনার কিডন্যাপ হওয়ার বিষয়টাও বলেছিলেন তাকে, এবং এটাও বলেছিলেন যে সেই ছেলের ব্যাপারে খোজ নিতে।আদরের মেয়ের কিডন্যাপারকে তো আর এতো সহজে ছাড় দেওয়া যায় না।কিন্তু জায়েদ সাহেব জানান যে সাহিত্যের পি.এ. রাজ নাকি তার সাথে যোগাযোগ করে।সেই বিষয়টা মিটমাট হয়ে গিয়েছে সেটাও বলেছে।তাই ভালো হবে পানি বেশি ঘোলা যেন না করে।
ফাহাদ শেখ চতুর মানুষ।সাহিত্য সেই বিষয়টা মিটমাট করেছে;এ কথা শুনে চটে গেলেও বেশি বাড়াবাড়ি করেননি।নিশ্চুপ হয়ে যান এ বিষয়টায়।তবে বর্তমানে জায়েদ সাহেব ঘনঘন ঢোক গিলছেন।আগের বিষয়টা নিয়ে তেমন রাগ হননি,কিন্তু বর্তমানে জায়েদ সাহেব যে প্রসঙ্গে কথা তুলবেন সেটাতে নিশ্চয়ই ফাহাদ শেখের রাগ চড়কিতে করে উপরে উঠবে।
ফাহাদ শেখ নিজ কেবিনের বড় লেদার চেয়ারে মাথা এলিয়ে রেখেছেন।তবে চিন্তা যেন তার মুখোশ্রিতে স্পষ্ট।ইদানীং এই চিন্তা জিনিসটা যে বেশি-বেশিই করছেন তিনি।জায়েদ সাহেব ক্ষণিক আগেই কেবিনে ঢুকলেন।তবে কথা না বলে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।ফাহাদ শেখ প্রথমদিকে সেটা খেয়াল না করলেও এখন চোখ বন্ধ রেখেই ভারী গম্ভীর কন্ঠেই শুধালেন,
"কিছু বলার ছিল?"
জায়েদ সাহেব চুপ রইলেন।সেই নিরবতায় ফাহাদ শেখ চোখ খুলতে বাধ্য হলেন।মাথা তুলে সামনে নজর দিলেন তিনি,
"কি ব্যাপার জায়েদ সাহেব?জরুরী কিছু?"
এবার মুখ খুললেন জায়েহ সাহেব,
"হ্যাঁ স্যার,অনেক জরুরী বিষয়"
"তো চুপ করে আছেন কেন?"
"আসলে...ওই...O.S.S. কোম্পানির ব্যাপারে কথা বলার ছিল.."
জায়েদ সাহেবের কথার প্রসংগ বুঝতে পেরে পর মুহুর্তেই শক্ত কন্ঠে বললেন ফাহাদ শেখ,
"আমি কতবার বলেছি ওই রাস্কেলটার ব্যাপারে আমার সামনে কথা বলবেন না,তবুও কেন বারবার ওই টপিক টানেন?"
টেবিলের সামনের চেয়ারে বসে গলায় জোর দিলেন জায়েদ সাহেব,
"স্যার,আপনি একটু বুঝার চেষ্টা করেন।O.S.S. কোম্পানির সামনে রাইভেল হিসেবে টিকে থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।গত কয়েক মাস থেকেই আমাদের কোম্পানির পার্টনাররা এটার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।আপনি তারপরও বুঝছেন না?"
ফাহাদ শেখ টেবিলে হাতের ভারী মুষ্টি ফেললেন,
"না বুঝছি না।ওই কোম্পানির সাথে আমি কখনোই পার্টনারশিপ করব না!নট ইন মাই দিস লাইফ"
"স্যার,মানুষের একটাই জীবন হয়,আপনারও সেটাই।এতো রাগের মাথায় সেই জীবন পার করলে তো চলবে না।বিজনেসের কিছু নিয়ম আছে"
"ওই ছেলে আর আমার মাঝে কোনো নিয়ম নেই জায়েদ!তুমি সেটা ভালো করেই জানো!"
হালকা ভড়কালেন জায়েদ সাহেব।ফাহাদ শেখ বেশি রাগের মাথায় থাকলেই জায়েদ সাহেবকে নাম ধরে 'তুমি' সম্মোধন করে ডাকেন।
জায়েদ সাহেব নিজেকে সংযত করলেন।সাথে ভারী শ্বাস ফেললেন তিনি।O.S.S. গ্রুপ এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সি.ই.ও. যে বাংলাদেশে মেইন ব্রাঞ্চ করবে এটা জায়েদ সাহেব কেন?কেউই ধারণা করেনি।সাহিত্যের কোম্পানির নামডাক কানাডায় থাকায় বাংলাদেশে নিজের নাম তুলতে বেশি সময় লাগেনি O.S.S. কোম্পানির।ফাহাদ শেখের কোম্পানি যেটা ৫ বছরেও করতে পারেনি;সাহিত্যের কোম্পানি সেটা দেড় বছরে করে ফেলেছে।যা অবাক করার মতো হলেও সত্য।যার কারণটা খুবই স্পষ্ট।কোনো কোম্পানির সাথে হয় পার্টনারশিপ অবস্থায় থাকতে হয় নাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থায় থাকতে হয়।কিন্তু O.S.S. গ্রুপ এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সম্মুখে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকা মানেই বোকামি করা।তাই দেশের বিজনেসম্যানরা চেষ্টা করবে সেই কোম্পানির সাথে পার্টনারশিপ করার।আর সেটার কারণেই দেশের মাটিতে উঠে দাড়াতে সাহিত্যের তেমন একটা অসুবিধে হয়নি।F.S. কোম্পানি যদি O.S.S. কোম্পানির সাথে পার্টনারশিপ না করে তাহলে মার্কেটিং সাইটে এই দুই কোম্পানি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকবে।যেটা ফাহাদ শেখের কোম্পানি,অর্থাৎ F.S. কোম্পানির জন্য অনেক রিস্ক।কিন্তু ফাহাদ শেখ যেন একদম গো ধরে বসেছেন এ বিষয়টায়।সবকিছু বুঝার পরও শুধুমাত্র নিজের রাগ আর জেদের জন্যই যেন এতো বড় কোম্পানিকে রিস্কে ফেলছেন।
হাল ছাড়লেন না জায়েদ সাহেব।সময় নিয়ে আবারো বললেন,
"তাহলে দু বছর আগে O.S.S. কোম্পানির সাথে পার্টনারশিপ করতে চেয়েছিলেন কেন?"
ফাহাদ শেখ দাঁত কটমটিয়ে বললেন,
"কারণ তখন অব্দিও আমি জানতাম না যে ওই বেয়াদবটা সেই কোম্পানির সি.ই.ও.!!"
একজন বিজনেসম্যান হিসেবে কানাডার স্বনামধন্য কোম্পানি O.S.S. গ্রুপ এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সম্পর্কে ফাহাদ শেখের ধারণা ছিল।কিন্তু তিনি এটা কখনোই চিন্তা করেননি যে সেই কোম্পানির সি.ই.ও. তারই অপছন্দের ভাতিজা হবে।কারণ তার জানা মতে সাহিত্য বিজনেস জিনিসটা কোনো কালেই পছন্দ করত না।
"স্যার...বিজনেস ইজ বিজনেস।আমাদের কোম্পানির ভালো যদি আপনিই না বুঝেন তাহলে কেমন করে চলবে..."
"আমি 'আমার' কোম্পানির ভালো চাই না?!..."
"তাহলে আমার কথা শুনছেন না কেন??!!"
এতক্ষণ পর জায়েদ সাহেবের উঁচু গলা কানে এলো ফাহাদ শেখের।অমনি তেতে উঠলেন তিনি,
"জায়েদ!!স্টে ইন ইয়র লিমিট'স!!.."
"আমি আমার লিমিটেই আছি স্যার!আপনার এ বিষয়টা নিয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করা উচিৎ।আমি পাঁচ-ছয় বছর পরের কথা চিন্তা করছি।এখন O.S.S. কোম্পানির সাথে পার্টনারশিপ না করলে কয়েক বছর পর গিয়ে আমাদের কোম্পানির লসের উপর লস দেখতে হবে।তখন আমার কাছে পরামর্শ নিতে আসবেন না কিন্তু!"
ফাহাদ শেখ আর কিছু বললেন না।সরু চোখে জায়েদ সাহেবের দিকে দেখতে লাগলেন।ফাহাদ শেখের মতোই আধাপাকা চুল-দাড়ি জায়েদ সাহেবের।তবে ফাহাদ শেখের সুঠাম দেহ ও লম্বাটে চেহারার মতো তার শরীরের গড়ন নয়।একটু স্বাস্থ্যবান লোকটা।ফাহাদ শেখের বিজনেস জীবনে জায়েদ সাহেব অহোরোহ পরামর্শ দিয়েছেন।এবং আজও দিচ্ছেন।লোকটা F.S. কোম্পানির প্রতি বড়ই সততা প্রকাশ করে প্রতিবারই।
জায়েদ সাহেব ফাহাদ শেখের নিশ্চুপতা দেখে মাথা নিচু করে শ্বাস ফেললেন।মাথা তুলে আবার বলতে লাগলেন তিনি,
"ফাহাদ ভাই শুনেন,এবার শেষবারের মতো আমার কথাটা রাখেন প্লিজ!এটা আমাদের কোম্পানির জন্য খুবই প্রফিটেবল।আপনাকে কিচ্ছু করতে হবে না।সাহিত্যের সাথে মিটিংয়ে শুধু একটু মুখোমুখি হয়ে বসতে হবে,দ্যাট'স ইট!কথা সব আমি বলে নিব।আপনাকে ওর সাথে তিল পরিমাণেরও কথা চালাতে হবে না"
ফাহাদ শেখ এখনো সরু চোখে সামনের ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে।তবে সময় নিয়ে এই প্রথমবার কিছু ভালো কথা মুখ ফুটে বের করলেন তিনি,
"আচ্ছা ঠিক আছে"
সাথে-সাথেই হাসি ফুটল জায়েদ সাহেবের মুখে।সেটা দেখেই হয়তো ফাহাদ শেখ নিজের বাকি কথাটুকু বললেন,
"কিন্তু ওই কোম্পানির সব ব্যাপার আপনি সামলাবেন।পরবর্তীতে যেন আমাকে আর সেদিকে না দেখতে হয়"
জায়েদ সাহেবের মুখের হাসিখানা গেল না,
"আচ্ছা ঠিকাছে,সমস্যা নেই...আমি তাহলে O.S.S. কোম্পানির সি.ই.ও. এর সাথে আপনার মিটিংয়ের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিচ্ছি"
কথা শেষে তিনি আর এক মুহুর্তও দাড়ালেন না।রুম থেকে বেড়িয়ে গেলেন তিনি।যদি ফাহাদ শেখ আবার উল্টাপাল্টা কিছু বলে দেন?জায়েদ সাহেবের যাওয়ার পানে কিছু মুহুর্ত দেখে থেকে ফাহাদ শেখ আবারো চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিলেন।ভারী শ্বাস ফেললেন তিনি।সাহিত্যের কোম্পানি এতো উপরে চলে গিয়েছে যে ফাহাদ শেখকে তার সাথে পার্টনারশিপ করার জন্য এগিয়ে যেতে হচ্ছে?সে কথা ভাবতেই যেন আবার রাগ উঠতে লাগলো তার।ছেলেটা এতো তাড়াতাড়ি এতো উপরে উঠলোই বা কেমন করে?বড় ভাবনার বিষয়!কিন্তু ফাহাদ শেখ তো আর এটা জানেন না যে,সাহিত্য একদম জেদ ধরেই এতো উপরে উঠেছে।এতো উপরে উঠেছে শুধুমাত্র এই ফাহাদ শেখকেই টেক্কা দিতে।
যাকে টক্কর দেওয়ার জন্য সাহিত্য জেদের বশে নিজের কোম্পানির পেছনে এতো পরিশ্রম দিয়েছে আজ সেই কোম্পানির থেকেও উচুতে সাহিত্যের কোম্পানি,এটা সাহিত্য জানতে পারলে হয়তো বা আসলেই আজ নিজেকে সাকসেসফুল মনে করতো।আর ফাহাদ শেখ যদি জানতে পারতেন যে তার কারণেই O.S.S. কোম্পানি তৈরি হয়েছে তাহলে নিশ্চয়ই নিজেকে সবচেয়ে দুর্ভাগা বিজনেসম্যান এবং মনে মনে সফল চাচা দাবি করতেন।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
লম্বা চুলের বেনির আগায় একটা গাডার জড়িয়ে কল্পনা ব্যস্ত হয়ে পড়ল সামনের কার্টেইন ব্যাঙ কাটের চুলগুলো ঠিক করতে।চিড়ুনি দিয়ে সেটা ঠিক করা হলেই কাধে ওড়না ঝুলিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে পড়ল।বিকেল বেলাটায় শেখ ভিলার সদস্যদের মুখ দেখতেই বের হচ্ছে হয়তো।কিন্তু রুম থেকে বেড়িয়েই থামতে বাধ্য হলো সে।
সাহিত্য নিজের রুমের দরজার পাশের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে।নজর তার ঘাড় বাকা করে কল্পনার উপরই নিবদ্ধ।কল্পনা হালকা থমকালেও পর মুহুর্তে মুখ গম্ভীর করল।যেন সে সাহিত্যের উপর বেশ চটে আছে।আর থাকবেই বা না কেন?সপ্তাহখানেক আগে সাহিত্যের কল্পনাকে রঙে চুবানোর কথাটায় কল্পনা এখনো রাগ করে আছে।
কাধের বেনি এক ঝটকায় পেছনে ফেলল কল্পনা।পায়ে জোর নিয়ে হাঁটতে লাগলো।সাহিত্যকে পাশ কেটে যাওয়ার সময় আড় চোখে দেখে ঠোঁটখানাও ভালোই মুচড়িয়েছে।পা বাড়িয়ে দুই-তিন কদম চলেই গিয়েছে কল্পনা,অমনি বেনিটায় হেচকা টান পড়ল পেছন থেকে।চুলের গোড়ায় দুই হাত দিয়ে "আহ্!" বলে উঠল কল্পনা।ঘাড় হালকা পেছনে ঘুরাতেই চোখে এলো সাহিত্যের কর্মকাণ্ড।কল্পনার চুলের বেনির আগাটা ভালোভাবেই টেনে ধরে আছে সে।সেটা দেখে মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করল কল্পনা।সাথে বলেও উঠল,
"কি করছেন?ছাড়েন বলছি!"
সাহিত্য তো কিছু বললোই না,সাথে বেনিটাও ছাড়লো না।এমনকি সেটা আরো হাতের তালুতে পেচাতে লাগলো।কল্পনা জোর নিয়ে থাকলো যেন সে পিছিয়ে না যায়।কিন্তু সাহিত্যের হাতের টানে নিজের সুন্দর কেশদের বাঁচাতেই যেন কল্পনা উলটো পায়ে সাহিত্যের দিকে পিছাতে লাগলো।
সাহিত্য বেনি টানা থামালো যখন কল্পনার পিঠ একদম তাকে ছুই-ছুই হয়ে দাঁড়িয়েছে।হাতে বেনিখানা পেচিয়ে ধরে রেখেই কল্পনার দিকে ঝুকে এলো সাহিত্য,
"বউ"
সাহিত্যের ভারী কন্ঠে হঠাৎ এমন একটা ছোট্ট শব্দ শুনে কল্পনার চোখ জোড়া চড়কগাছে উঠেছে।কিন্তু সেটা তো সাহিত্যের চোখে পড়ছে না।সে তো প্রেয়সীর কাধে নাক ঘষতে ব্যস্ত।
কল্পনার এমন নিশ্চুপ থাকা দেখে সাহিত্য এবার হালকা শক্ত কন্ঠে বলে উঠে,
"কেউ ডাকলে জ্বি বলতে হয়,জানিস না?"
কল্পনা মৃদু কেপে উঠল যেন।কিন্তু সাহিত্য আবারো বলে উঠল,
"আমি আবার ডাকবো।ভদ্র বউয়ের মতো জ্বি বলবি কিন্তু"
প্রেয়সীর গলায় ভারীভাবে নাক ঘষে হাস্কি স্বরে ডাকলো সাহিত্য,
"ও বউ...শুনো না"
কল্পনা সময় নিয়ে গলা কাপিয়ে বলল,
"জ-জ্বি"
সাহিত্য যেন এখনো প্রেয়সীর কাধের ঘ্রাণ নিতে ব্যস্ত,
"আমার না খুব প্রেম পাচ্ছে"
কল্পনার চোখ জোড়া আরেক দফা চড়কগাছে উঠল।এই লোকটা এতো নির্লজ্জ কেন?কিছুদিন আগেই কল্পনার কাছে বাধা পেয়ে আজ আবার এসেছে?
এতোক্ষণে সাহিত্যের হাতে থাকা কল্পনার চুলের বেনি অনেকটাই ছাড়া পেয়েছে।সেটারই হয়তো সুযোগ নিল কল্পনা।চট করে সাহিত্যের থেকে দূরে সড়ে এলো সে।সেটাতে সাহিত্য পর মুহুর্তে ভড়কালেও এখন বেশ বিরক্ত।তবে কল্পনা সাহিত্যকে সরু চোখে দেখতে নিয়েই এক হাত কমোড়ে দিয়ে আরেক হাত উচিয়ে বলল,
"আপনাকে কানাডায় চিঠি পাঠানোই আমার ভুল হয়েছিল।না চিঠি পাঠাতাম,আর না আজ এমন আপনার নির্লজ্জপোনাগুলো দেখতে হতো"
ঘাড় বাকিয়ে মেকি হাসলো সাহিত্য,
"ওমা সেটা কেমন কথা?আমার বউ আমার আসল রূপ দেখবে না?"
"তাই বলে এতোটাও নির্লজ্জ হইয়েন না!"
সাহিত্য চোখ টিপলো,
"এখনো তো কিছু করিইনি"
কল্পনা ভড়কালো যেন।গাল দুটো লাল হয়ে উঠল মেয়েটার।কিছু মুহুর্ত সাহিত্যের দিকে স্তব্ধ নয়নে দেখে মাথা নিচু করল।উল্টো দিক ঘুরে সিড়ির দিকে এগুতে নিয়েই বিড়বিড় করে আওড়ালো সে,
"অসভ্য-নির্লজ্জ একটা"
সাহিত্য অবশ্য শুনেছে সেকথা।ভারী মজা লাগলো যেন তার।কল্পনার দিকে চোখ রেখেই হালকা মেকি হেসে উঠল সে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সাহিত্যের সাথে চোখাচোখি করে কল্পনা সোজা রান্নাঘরে এসেছে।ড্রইং রুমে এখন তোফায়েল শেখ বসে।সেখানে না যাওয়াই ভালো।
রান্নাঘরের দরজায় এসে মৃদু স্বরের কিচিরমিচির শুনতে পেল কল্পনা।বাড়ির তিন গিন্নি কিচিরমিচির করছে।ভ্রু কুচকে কল্পনা বুঝার চেষ্টা করল ঘটনা কি।আন্দাজ করতে পারলো এই যে,আমেনা শেখ ও লতিফা শেখ মিলে হেনা শেখকে একপ্রকার ধস্তাধস্তি করছে কিছু মানানোর জন্য।
লতিফা শেখ আর আমেনা শেখ বলে চলেছেন,
"আরে কিছু হবে না।তুই চুপ কর তো"
আর ওদিকে হেনা শেখ ডানে-বামে মাথা নাড়িয়ে বলেই চলেছেন,
"একদম না।ভাইজান রাগ করবে অনেক"
মৃদু স্বরের কিচিরমিচিরের বিষয় ঠিক বুঝতে না পেরে এবার কল্পনা মুখ খুলেই ফেলল,
"কি হয়েছে?"
তিন গিন্নি থমকালেন।নজর দিলেন দরজার কাছে জিগাসু চাহনি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কল্পনার দিকে।ক্ষণিক সময় থমকে থেকে আমেনা শেখ ও লতিফা শেখ একে-অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করলেন।অতঃপর ব্যস্ত পা বাড়ালেন কল্পনার দিকে।আমেনা শেখ কল্পনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কোমল কন্ঠে বলতে লাগলেন,
"এই তো লক্ষী মেয়েটা নিজ থেকেই এসে গিয়েছে।এই লতিফা!চাটা রেডি করতো"
এতক্ষণে হেনা শেখ হুড়মুড়িয়ে কল্পনার দিকে এগিয়ে এলেন।আমেনা শেখের উদ্দেশ্যে কাঁদো গলায় বললেন তিনি,
"ভাবি কিজন্য জেদ ধরে আছেন?সুবার আব্বুও বাসায় আছে।আবার যদি কিছু হয়ে যায়?এমনিতেই ক'দিন ধরে এই দুই ভাইয়ের সতিনের মতো ঝগড়া কানে ধরছে।আজকের ঠান্ডা বিকেলটা নষ্ট না করলে হয় না?"
আমেনা শেখ এখনো কল্পনাকে আদর করতে ব্যস্ত।কল্পনার দিক থেকে নজর না ঘুরিয়েই বললেন তিনি,
"আরে কিচ্ছু হবে না।আমারটা তোরটার মতো অতটাও রগচটা না।ফাহাদ তো তবুও সাহিত্যের সাথে কথা বলছে।তো কল্পনা সাহিত্যের আব্বুর সাথে কথা বললে সমস্যা কোথায়?"
হেনা শেখ চোখ-মুখ খিচে নিলেন,
"ভাবিইইই।সুবার আব্বু সাহিত্যের সাথে কথা বলছে না,ঝগড়া করছে!আর ওই ফাজিল ছেলেটা তো আরো আগুনে ঘী ছড়কায়।কিন্তু কল্পনা আর ভাইজানের মাঝে ওই কথাটুকুও চলবে না"
কল্পনা এতক্ষণ ড্যাবড্যাব করে হেনা শেখ ও আমেনা শেখের দিকে দেখেছিল।এবার প্রশ্ন করে বসলো সে,
"কি হয়েছে বড় মা?"
কল্পনার কথা শুনেই চোখ-মুখ খিচে নিয়ে ডানে-বামে মাথা ঝাকালেন আমেনা শেখ।ঠোঁটের মৃদু হাসি রেখেই বললেন,
"উহু,বড় মা নয়।এখন থেকে তুই আমাকে আম্মা ডাকবি।সাহিত্য হওয়ার পর থেকেই আমার কত শখ ছিল ছেলের বউয়ের মুখে আম্মা ডাক শুনবো।তুই আমাকে এখন থেকে বড় মা নয়,আম্মা বলে ডাকবি।আর তোর বড় বাবাকে আব্বা বলে ডাকবি।নাহলে আমি রাগ করব কিন্তু"
চোখ উল্টালো কল্পনা।তবে আমেনা শেখের মুখের ছোট হাসি ধরে রাখার জন্যই মনে হয় বলে উঠল,
"আচ্ছা সে নাহয় ডাকবো।কিন্তু এখন কি হয়েছে সেটা আগে বলো তো"
কল্পনার কথায় আমেনা শেখ মিষ্টি হাসলেন,
"শুন।তুই এখন এক কাপ চা নিয়ে গিয়ে তোর আব্বাকে দিবি।শুধু দিবি না,একটু কথাও বলিস।তোর আব্বা তোর সাথে ঝগড়া করতে চাইলে সেটাও করিস,আমার কোনো সমস্যা নেই"
মাথা নিচু করে কল্পনা মিনমিনিয়ে বলল,
"আমি বড় বাবা..মানে আব্বার মুখের উপর কথা বলতে পারবো না"
আমেনা শেখ কল্পনার গাল আলতো করে টেনে দিলেন,
"ইস রে আমার মিষ্টি মেয়েটা"
হেনা শেখ আরেক দফা তার কথা বলার জন্য মুখ খুলেছিলেন,অমনি পেছন থেকে লতিফা শেখ দিলেন এক হুড়া।আমেনা শেখকে উদ্দেশ্য করে বললেন তিনি,
"বড় ভাবি!চাটা কল্পনা বানালে বেশি ভালো হয় না?"
আমেনা শেখের ঠোঁটের হাসি আরো বড় হলো যেন।কল্পনা কাচুমাচু হয়ে মায়ের দিকে একবার দেখলো।কিন্তু কিছু বলার সুযোগ পেল না।তার আগেই আমেনা শেখ কল্পনাকে নিয়ে হাঁটা দিলেন চুলার কাছে,
"এখন ঝটপট এক কাপ চা বানিয়ে ফেল তো।আমাকে যে মসলা চাটা করে দিস ওটা বানাবি।সাহিত্যের আব্বুর মাথা ব্যথা করছে নাকি।তোর হাতের সেই চা খেলে খুশি হয়ে যাবে একদম"
কল্পনা ভারী এক শ্বাস ফেলল।এক কাপ চা-ই তো।বানিয়ে তোফায়েল শেখকে দিয়ে আসবে,এই আরকি।শুধু ফাহাদ শেখ না দেখলেই হলো।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
কল্পনা অল্প সময়ের মধ্যেই সুন্দর করে এক কাপ মসলা চা বানিয়ে ফেলল।রান্নাঘর মো মো করছে চায়ের সুবাসে।মেয়েটার হাতের এই মসলা চাটা শেখ বাড়ির প্রায় সবাই পছন্দ করে।
কল্পনা চায়ের কাপ ট্রে-তে নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই রান্নাঘর থেকে বেড়ুলো।কিন্তু ড্রইং রুমের কাছে গিয়ে থমকালো সে।আগে ভয় না করলেও এখন হালকা ভয় করছে তার।তোফায়েল শেখ যদি কল্পনাকে ঝাড়ি মারে?তখন কি হবে?
ওদিকে রান্নাঘরে তিন গিন্নি ড্রইং রুমে উঁকি মারতে ব্যস্ত।আমেনা শেখ ও লতিফা শেখ মুখে বড় হাসি ঝুলিয়ে রাখলেও হেনা শেখ মেয়ের জন্য দোয়াদরুদ পড়ে চলেছেন।
কল্পনা ধীর গতিতে এগিয়ে গিয়ে তোফায়েল শেখের পাশে দাড়ালো।ট্রে ধরে রাখা হাত দুটো মৃদু কাপছে তার।গলা দিয়ে কথা যেন বেরই হতে চাইছে না।তারপরও ভারী এক শুষ্ক ঢোক গিলে কোনো মতে বলে উঠল,
"বড় বাবা...তোমার চা এনেছি"
কিছুক্ষণ আগে আমেনা শেখের শিখিয়ে দেওয়া 'আব্বা' ডাকটা কল্পনা ডাকলো না।মাথা খারাপ নাকি কল্পনার?!চা নিয়ে আসার জন্যই এক ঝারি দিতে পারে।আবার সেই 'আব্বা' ডাক শুনে তোফায়েল শেখ যদি আরো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে?
তোফায়েল শেখ খবরের কাগজ পড়ছিলেন।কন্ঠটা চিনতে পেরে ভ্রু কুচকালেন তিনি।আড় চোখে নজর দিলেন কল্পনার দিকে।কিন্তু কিছু বললেন না।ক্ষণিক সময় পার হওয়ার পরও যখন তোফায়েল শেখ কিছু বলছেন না তখন কল্পনা আরেক দফা চেষ্টা চালালো,
"বড় বাবা...তোমার নাকি মাথা ব্যথা করছে,তাই চ-চা এনেছি"
খবরের কাগজ উল্টালেন তোফায়েল শেখ।সাথে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,
"আমি কি রাখতে নিষেধ করেছি?"
অমনি কল্পনা ডানে-বামে মাথা ঝাকিয়ে টেবিলে চায়ের কাপটা রেখে দিল।খবরের কাগজ উল্টাতে নিয়েই আবারো আড় চোখে কল্পনাকে দেখলেন তোফায়েল শেখ।মেয়েটা চায়ের কাপ রেখে ট্রে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েই আছে।এখনো যাচ্ছে না কেন?কিছু বলবে নাকি?
তোফায়েল শেখ কল্পনার দিকে আড় চোখ রেখেই বেহুদা খবরের কাগজ উলটে যাচ্ছেন।বিয়ের সপ্তাহখানেক পর সাহিত্যকে নিয়ে যখন তোফায়েল শেখ সোজাঝাপটা কথা বলতে বসেন তখন সাহিত্য মৃদু হেসে বলেছিল,
"তোমার তো আরো ভালো হলো।ভাইয়ের রাগ এখন ভাইয়ের মেয়ের উপর ঝাড়তে পারবে।আমি তো আরো সুবিধা করে দিয়েছি"
সেকথা শুনে তোফায়েল শেখ থতমত খান বেশ।ঝাজিয়ে উঠেন তিনি,
"এই ছেলে!আমি কি মুর্খ,যে ওই বাচ্চা মেয়েটার উপর অযথা রাগ ঝাড়বো?"
সাহিত্যের মুখের হাসি চলে গিয়ে গম্ভীর হয়ে উঠে মুখোশ্রি,
"কথা তো এটাই আব্বু।চাচুর রাগ কল্পনার উপর কেন ঝাড়ছো?কল্পনা তোমার কি করেছে?মেয়েটা ছোট থেকে তোমাকে অনেক সম্মানও দিয়ে এসেছে।আর সে ঘরের বউ হিসেবে খারাপ নাকি?"
সেদিনের সাহিত্যের কথা তোফায়েল শেখকে খুব ভাবিয়েছে।আসলেই তো।কল্পনাকে তোফায়েল শেখ ছোট থেকে দেখে আসছেন।গত ১১ বছর সরাসরি দেখা না হলেও মেয়েটা প্রতিনিয়তই তোফায়েল শেখের চোখে পড়ত।কল্পনা তো মাঝেমধ্যে কথা বলারও চেষ্টা চালিয়েছিল।কিন্তু বাধা ছিল তোফায়েল শেখের দিক থেকেই।আর কল্পনার মতো মেয়ে এই যুগে দ্বিতীয়টা পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।এখনকার যে যুগ-জামানা।মোমবাতি নিয়ে খুজলেও হয়তো সাহিত্যের জন্য এমন ভালো মেয়ে এই যুগে পাওয়া যেত না।রূপে যেমন গুণেও তেমন।মেয়ের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই।আসল সমস্যা তো হলো মেয়ের বাপকে নিয়ে।আর তোফায়েল শেখ যখনই একটু কল্পনার দিকটায় শীতল হয়ে আসার চিন্তা করেন তখনই ফাহাদ শেখ নাকে তেল দিয়ে ঝগড়া করার জন্য তেড়ে আসেন।আর সেই সুবাদে তোফায়েল শেখ আবার বিগ্রে যান।তবে সাহিত্যের ফেলা চাল বিফলে যায়নি।এখনো মাঝেমধ্যে সাহিত্যের সেই দিনের কথা তোফায়েল শেখের মনে উদয় হয়।যেমন আজ হয়তো হয়েছে।একটুখানি।সেটাই হয়তো যথেষ্ট।
কল্পনা মাথা নিচু করে আছে।কোনো প্রতিক্রিয়া করছে না।সেটা ক্ষণিক মুহুর্ত পরখ করে আবার হাতের কাগজে চোখ ঘুরালেন তোফায়েল শেখ।আগের গম্ভীর কন্ঠেই বললেন,
"কিছু বলার ছিল কি?"
তড়াৎ করে কেপে উঠল কল্পনা।সময় নিয়ে গলা পরিষ্কার করে বলল সে,
"তোমার নাকি...মাথা ব্যথা করছে।তাই..একটু...মসলা চা বানিয়েছি আমি।তোমার যে কেমন লাগবে সেটা বুঝতে পারছি না"
তোফায়েল শেখ থমকালেন একটু।চোখের সামনের কাগজ নিচু করে সামনের টেবিলের চায়ের দিকে দেখলেন।চা থেকে তো ভালোই ঘ্রাণ আসছে।মেকি হাসলেন তিনি।কল্পনার দিকে দেখে কন্ঠের গাম্ভীর্য ধরে রেখেই বললেন,
"এখানে এখন তোমার বাবা থাকলে চায়ের কাপ ছুড়ে ফেলে দিত।কিন্তু আমি তো আর তার মতো অভদ্র না।আদব জানি আমি"
কথা শেষেই চায়ের কাপ তুললেন তোফায়েল শেখ।সেটা দেখে কল্পনার চোখ যেমন কোটর ফাটিয়ে বেড়িয়ে এলো তেমন রান্নাঘরের দরজায় ঝুলতে থাকা গিন্নিদেরও চোখ কোটর ফাটিয়ে বেড়িয়ে এসেছে।সাথে মুখে ঝুলছে বড় হাসি।আমেনা শেখ তো বাকি দুই জা-কে বলেই বসলেন,
"দেখেছিস?আমার ওনাকে আমি ভালো করেই চিনি।বলছিলাম না আমি,যে কিছুই বলবে না?"
তোফায়েল শেখ চায়ে এক চুমুক দিয়ে চোখ বুজে নেন।বউয়ের হাতের প্রতিদিনের চায়ের পাশে আজ নতুন চা পেয়ে একটু খুশিই হয়েছেন বটে।।কিন্তু কল্পনাকে বুঝতে দিলেন না যে চা-টা তার বেশ ভালোই লেগেছে।চায়ের কাপ টেবিলে রাখতে নিয়েই বললেন তিনি,
"হুম।হয়েছে।চলবে"
এতো ঠান্ডা উত্তরেও কল্পনা অনেক খুশি।তোফায়েল শেখের চোখের আড়ালে হালকা একটু নেচে নিবে তার আগেই মেয়েটার শশুর আব্বা বলে উঠলেন,
"এই মেয়েদের সমস্যা কি?বিয়ে হয়েছে দেখেই কি পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকতে হবে নাকি?"
কল্পনা ভড়কে উঠে বলল,
"আমি ভার্সিটিও যাচ্ছি তো"
"রান্নাঘরে আরো কাজের লোকও আছে মনে হয়।তোমাকে আমার প্রতি অত আদিক্ষেতা দেখাতে হবে না।যাও!"
তোফায়েল শেখ খবরের কাগজে নজর রেখেই কল্পনার উদ্দেশ্যে হুকুম ছাড়লেন।আর কল্পনা 'আচ্ছা ঠিকাছে' বলে রান্নাঘরে দৌড় লাগালো।মেয়েটার ঠোঁটে মৃদু হাসি ঝুলছে।
#চলবে
অনেক বড় পর্ব দিয়েছি কিন্তু।আশানুরূপ রিয়েক্ট চাই😑