#পর্ব_৮৭
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সময়টা বিকেল হওয়ার পরেও যেন অফিসের কাজ থেকে ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়।তবে সাহিত্য আজকের সিডিউলে থাকা সব কাজ মিলিটে কিছুক্ষণ আগেই নিজের কেবিনে ঢুকলো।সব কাজ শেষ হওয়ার পরও যেন ল্যাপটপে হাত চালাচ্ছে সে।অফিসের জিনিসগুলোতে আরো একবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে হয়তো।সাহিত্য অফিস থেকে বের হওয়ার আগে রাজ তার কেবিনে এসে দিনের শেষবারের মতো একবার হাজিরা দিয়ে যায়।আজও তাই হলো।রাজ দরজা ঠেলে কেবিনে ঢুকে পড়ে।সেটা বুঝতে পেরে ল্যাপটপে চোখ রেখেই সময় নিয়ে সাহিত্য বলে উঠল,
"নেক্সট হেভি সিডিউল কোনদিন?"
একজন দক্ষ পি.এ.-র মতো বলতে লাগলো রাজ,
"আগামী বুধবারে সকাল দশটার দিকে চট্টগ্রাম ব্রাঞ্চের ব্যাপারে ডিসকাস করার জন্য রবি স্যার একটা মিটিং রেখেছে"
"হুম"
ছোট করে উত্তর করল সাহিত্য।দেশে ফিরে মেইন ব্রাঞ্চ ছাড়া আর কোনো ব্রাঞ্চ খোলা হয়নি।যার ফলে প্রডাক্ট সাপ্লাইয়ে একটু অসুবিধাই হচ্ছে বলা চলে।তাই তো গত মাসে চট্টগ্রামের ব্রাঞ্চটার কাজ ধরা হয়।
রাজের চুপ হয়ে থাকা দেখে সাহিত্য আবারো বলে উঠল,
"আর কিছু নেই?"
মিনমিনালো রাজ,
"আর...ওই দিনই লাঞ্চের পর F.S. গ্রুপ এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সি.ই.ও. এর সাথে একটা মিটিং আছে"
"হুম"
আনমনে আবারো ছোট উত্তর করল সাহিত্য।কিন্তু পর মুহুর্তে মাথা ঘুরিয়ে রাজের দিকে দেখলো,
"হুম?"
রাজ এখন বেশ ভয়ে আছে।শুষ্ক ঢোক গিলল সে।সাহিত্যের জিগাসু চাহনির উদ্দেশ্যে বলল,
"হ-হ্যাঁ স্যার"
সাহিত্য আর কোনো কথা বলছে না।কুচকানো ভ্রু শীথিল হয়ে ধীরে-ধীরে তার মুখোশ্রি গম্ভীর হয়ে আসছে।সেটা দেখে রাজ এবার ভারী এক ঢোক গিলল।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
অফিসটা আজ ভালোর শান্ত আছে।বর্ষার শেষের দিকের আমেজেই যেন তেমনটা।অবশ্য অফিসের স্টাফদের ফুরফুরে মনও সেটার অংশীদার।কিছুক্ষণ আগেই তো অফিসের বস সবার সাথে হেসে-হেসে কথা বলে গেল।কিন্তু সাহিত্যের তৈরি সাম্রাজ্যে তো মসলাদার পরিবেশ থাকবেই থাকবে।সেটার কমতি কোনো কালেই ছিল না।
সাহিত্য একপ্রকার হুংকার ছাড়তে নিয়েই নিজ কেবিন থেকে বেড়িয়ে এলো।তার পিছন-পিছন রাজ হুড়মুড়িয়ে বের হয়।সাহিত্যের হঠাৎ এমন ভারী পুরুষালী কন্ঠের গর্জনে যেন কেপে উঠল অফিস বিল্ডিংয়ের পঞ্চম তলাটা।কিন্তু সাহিত্যের সেদিকে খেয়াল কোথায়?সে তো এই মুহুর্তে রবির উদ্দেশ্যে হুংকার ছাড়তে ব্যস্ত,
"রবি!!এই রবির বাচ্চা!!কেবিন থেকে বেড়িয়ে আয় বলছি!"
সাহিত্যের হুংকার শুনে রবি বের হলো কিনা কে জানে।কিন্তু অয়ন নিজের কেবিনের দরজা খুলে দাড়ালো।শরীরটা তার বড্ড ক্লান্ত আজ।বেচারার সর্দি লেগেছে গত রাতেই।এই মুহুর্তে নাকের এক ফোকোরে টিস্যু গুজে রেখেছে সে।সাহিত্যের দিকে নজর দিয়ে আতকে উঠল ছেলেটা।দরজার পাশে কাচের দেয়ালের সাথে একদম লেপ্টে গেল যেন।দূর থেকে সাহিত্যের দিকে নজর রেখেই কাঁদো গলায় মিনমিনিয়ে উঠল,
"এই শালা রবিকে বললাম আমি!জায়েদ আংকেলের মিটিংয়ের রিকোয়েস্ট এক্সেপট করিস না।এখন এই বর্ষার শেষের দিকে সাহিত্য ঘুর্ণিঝড় তুলছে তো!!"
সাহিত্য এখনো তার হুংকার চালু রেখেছে।এতক্ষণে রবির কানে পৌঁছোলো সেটা।হুড়মুড়িয়ে নিজের কেবিন থেকে বের হলো সে।সাহিত্যের কেবিনের সামনে সাহিত্যের এমন দাঁড়িয়ে চিৎকার ছুড়া শুনে ভ্রু কুচকালো তার।গলা উচিয়ে সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বলল,
"কি হয়েছে,এমন ভ্যাবাচ্ছিস কেন?"
রবিকে দেখা মাত্রই সাহিত্য একদম চুপ মেরে গেল।কালো শার্টের হাতা গুটাতে নিয়েই পায়ের গতি বাড়ালো সে।মাঝ রাস্তায় এসে একদম দৌড়ে গিয়েই রবির উপর হামলে পড়ল।এমন হামলে পড়েছে যে রবির শার্টের কলার ধরে একদম মেঝেতে শুয়ে দিয়ে তার উপর উঠে বসেছে একদম।এমন এক কান্ড দেখে উপস্থিত স্টাফসরা সহ সবাই হোইহোই করে উঠল।আর এদিকে সাহিত্য রবির মুখের দিকে ঝুকে আবারো হুংকার দেয়,
"ফাহাদ চাচার সাথে মিটিং রেখেছিস কেন!!??"
সাহিত্যকে এমন নিজের উপর চড়া দেখে রবি ভালোই ভড়কেছে।সাহিত্যের দুই হাতের কব্জি জড়িয়ে ধরে চেচিয়ে উঠল সে,
"আব্বে সড় আমার উপর থেকে!মরে যাবো আমি!"
সাহিত্য সড়লো না।আরো রবির শার্টের কলার ধরে ঝাকাতে লাগলো যেন,
"তোকে আজকে মেরেই ফেলবো আমি!"
রাজ ওদিকে এক কদমও আগাতে না পাড়লেও;নাকে টিস্যু গুজে রাখা অয়ন এসে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল মেঝেতে।কাঁদো গলায় সাহিত্যের উদ্দেশ্যে আকুতি করতে লাগলো সে,
"ভাই ওরে ছেড়ে দেএএ।ওর বাসায় একটা বউ আছে।ওর কিছু হলে ভাবির কি হবে??"
অয়নের দিকে ঘুরে বিস্ফোরিত কন্ঠে বলে উঠল সাহিত্য,
"চোপ!!"
সাহিত্য আবারো রবির দিকে ঘুরলো।শার্টের কলার ঝাকাতে নিয়েই কটমটিয়ে বলল সে,
"আমার পারমিশন ছাড়া F.S. এর সি.ই.ও. এর সাথে মিটিং কেন সেটেল করেছিস?আমি না নিষেধ করেছিলাম ওই কোম্পানির সাথে যোগাযোগ রাখতে?"
রবি আর পাড়ল না সহ্য করতে।কাশতে লাগলো বেচারা,
"আরে ছাড় আমাকে!চেয়ার-টেবিলে বসে কথা বলি!!এটা কথা বলার কোনো পজিশন হলো??"
"তুই এমন পজিশনে কথা বলার মতো কাজই করেছিস!"
অয়ন আর রেফারি স্টাইলে শুয়ে থাকলো না।হুড়মুড়িয়ে উঠে দাড়ালো সে।সাহিত্যের হাত থেকে রবিকে কেমন করে বাঁচানো যায় সেই চিন্তা করতে লাগলো।হঠাৎই অহি নাজিল হওয়ার মতোই এক ফেরেশতার কথা মনে পড়ল তার।অমনি চেচিয়ে উঠলো সে,
"আব্বে কেউ কল্পনারে কল লাগা!!কল্পনারে কল লাগা রেএএএ।এই এটম বমের মাথা ঠান্ডা করতে হবেএএএ।কেউ কল্পনারে কল লাগা!!"
রাজ ওদিকে হয়তো কাপা হাতে পকেট থেকে ফোনই বের করছিল।তবে অয়নের মনে পড়ল তার নিজের ফোনেই তো কল্পনার নাম্বার আছে।হুড়মুড়িয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে কল্পনাকে কল লাগালো সে।সাথে মুখেও বলে উঠল,
"আমি লাগাচ্ছি!আমি লাগাচ্ছি!আমার কাছেই নাম্বার আছে"
অয়নের কথাগুলো সাহিত্যের কানে ভালো করেই ঢুকেছে।রবির শার্টের কলার ধরে রেখেই যান্ত্রিকভাবে অয়নের দিকে ঘাড় ঘুরালো সাহিত্য।অয়ন কল্পনার নাম্বার খুজতে ব্যস্ত।আর এদিকে এবার সাহিত্য অয়নের উপর হামলে পড়ল।রবির শার্টের কলার ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে অয়নের শার্টের কলার চেপে ধরল।অয়নকে ঝাকাতে নিয়ে হুংকার ছাড়লো সে,
"তোকে কতবার করে বলেছি আমার বউয়ের নাম মুখে নিবি না!!আর আমার বউয়ের নাম্বার তোর কাছে কি করে শা'লা!!"
অয়ন ইতোমধ্যেই কল্পনাকে কল লাগিয়েছে।সাহিত্যের ঝাকুনিতে চোখ খিচে নিয়ে গলা উঁচিয়ে কাঁদো গলায় বলল সে,
"ভাই!আগামী মাসে লিসার আর আমার এনগেজমেন্ট হবে!তোর বউয়ের উপর আমি আর নজর দেই না তোওও!আর!আর কল্পনার নাম্বার সেফটির জন্য সেভ করে রেখেছিলাম।বিশ্বাস কর!ফর সেফটি অনলি!!!"
শেষের কথাটা বলতে নিয়ে বেচারা অয়ন মনে হয় কেঁদেই দিল।
"হ্যালো?...কে?"
লাউড স্পিকারে থাকা অয়নের ফোন থেকে হঠাৎই কল্পনার কন্ঠ শুনে থমকালো সবাই।সাহিত্য তো অয়নকে ঝাকানো থামিয়ে অয়নের হাতে থাকা ফোনের দিকে দেখে আছে।ওদিকে কল্পনা হয়তো অয়নের কন্ঠ চিনতে পেরেছে।তাই তো আবারো শান্ত স্বরে বলে উঠল মেয়েটা,
"কে?..অয়ন ভাইয়া আপনি কি?"
সাহিত্য অয়নের শার্টের কলার পর মুহুর্তেই ছেড়ে দিল।ছেড়ে দিল তো দিল,অয়নের হাত থেকে ফোনটা খপ করে নিয়ে অয়নকে দিল এক ধাক্কা।
প্রতিবারের মতো এবারও সবাইকে অবাক করে দিল সাহিত্যের পরিবর্তন।ফোনের স্পিকার বন্ধ করে সাহিত্য কানে চেপে ধরল ফোনখানা,
"না জানপাখি,আমি বলছি"
হঠাৎ সাহিত্যের কন্ঠে ভড়কালো কল্পনা,
"আপনি?এটা কোন নাম্বার?"
"এটা অয়নেরই নাম্বার।আমার ফোন একটু সমস্যা করছিল তো,তাই ওর ফোন দিয়ে কল দিয়েছি...এই ফোন থেকে আর কল আসবে না।কক্ষনো না"
শেষের শব্দ দুটো অয়নের দিকে দেখে চোখ রাঙিয়ে বলল সাহিত্য।অয়ন সাহিত্যের দিকে দেখে কন্ঠনালীতে চিমটি কেটে ডানে-বামে মাথা ঝাকালো বেশ।সাহিত্য আর সেদিকে মনযোগ রাখলো না।কল্পনার সাথে কথা বলতে নিয়েই নিজের কেবিনের দিকে এগুলো সে,
"জানপাখি কি করছিস তুই?দুপুরে খেয়েছিস?"
কল্পনা এখনো অনেকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে বসে আছে।কারণ সাহিত্য আর অয়নের শেষের চিল্লাপাল্লা তার কানে একটু হলেও গিয়েছে।মেয়েটা আমতা-আমতা করে কথা বলছে,
"হ-হ্যাঁ খেয়েছি।আপনি খেয়েছেন?"
"হুম"
সাহিত্য দরজা ঠেলে নিজের কেবিনে ঢুকে গেল।আর এদিকে সব স্টাফরা তম্বা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।এখনে কি হলো এটা?ক্ষণিকের জন্য এটম ব'ম ফেটে আবার যেন চুপসে গেল।স্যারের বউ তো আসলেই এটম ব'মে ঠান্ডা পানি ঢেলে দিয়েছে!
কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা এক মেয়ে বলে উঠল,
"ইস,স্যারের বউয়ের কন্ঠটা শুনেছো তোমরা?কি সুন্দর না?কন্ঠ শুনেই মনে হচ্ছে সে O.S.S. কোম্পানির সি.ই.ও.-এর বউ"
এদিকে রবি এখনো মেঝেতেই পড়ে রয়েছে।তবে উঠে বসে দুই হাটুতে হাত ঠেকিয়ে রেখেছে সে।রাজ হাফ ছেড়ে গলার টাই ঢিলা করে একটা চেয়ারে বসলেও অয়ন নাকের টিস্যু বের করে রবির পাশে বসে পড়ল,
"আমার কথা শুনলি না তো,এখন দেখছিস তো কি হচ্ছে"
রবির নজর সাহিত্যের কেবিনের দরজার দিকে,
"যেটা হচ্ছে হোক।এই জামাই-শশুরকে বিজনেস পার্টনার বানাতেই হবে।যদি এদিকেও রাইভেল হিসেবে থাকে তাহলে সাহিত্যের জন্য আরো ঝামেলা।দুটোকে না মিলালে চলবেই না।বিজনেসের দিক থেকেই নাহয় সেই মিল বন্ধন শুরু হোক।পানি গড়ানোর রাস্তা আমরা একটু হলেও ঠিক করতে পারি।আস্তে-আস্তে বুঝা যাবে কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়"
এবার রবি ভ্রু কুচকে অয়নের দিকে দেখলো,
"আর...কোন সেফটির জন্য কল্পনার নাম্বার তুই সেভ করে রেখেছিস বে!"
অয়নের চোখে-মুখে বিরক্তির চিহ্ন দেখা দিল।নজর রবির দিকে রেখেই দুই হাত দিয়ে আশপাশ দেখিয়ে দিয়ে বলল সে,
"এই সেফটির জন্য।সাহিত্যের রাগ থামানোর জন্য।আমি এই সেফটির কথা চিন্তা করে না রাখলে তুই এখনো সাহিত্যের হাতে ধোলাই খেতি"
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সাহিত্য বেশ অনেকক্ষণ থেকে কল্পনার কাছে ঘ্যানঘ্যান করছে,
"জান একটা চুমু দে না"
ফোনের মধ্যে সাহিত্য চুমু নিয়ে কি করবে এটা কল্পনার মাথায় ঢুকছে না।কল্পনা এতো করে বলছে যে জরুরী কোনো কথা না থাকলে ফোন কাটতে।কিন্তু সাহিত্য যেন নাছোড়বান্দা হয়ে উঠেছে।কল্পনা অয়নের ফোন কেটে দিলে এবার সাহিত্য নিজের ফোন দিয়ে কল লাগায়।আর সেই তখন থেকেই তো এক বাক্যই পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছে ছেলেটা।একদম ছোট বাচ্চার মতোই কল্পনার কাছে ভালোবাসার সুক্ষ্ম পরশ চাইছে।কিন্তু কল্পনা যেন একদমই রাজি নয়।মেয়েটার যে লজ্জা করছে বড্ড।অবশেষে সাহিত্যের এতো জোরাজোরিতে লাল টমেটোর মতো গাল দুটো নিয়ে টুপ করে ফোনে একটা চুমু দিয়েই কল কেটে দিল লজ্জাবতীটা।কিন্তু এবার সাহিত্য আর কল লাগালো না।তার পাওনা সে পেয়ে গিয়েছে।সেটাতেই তৃপ্তি ভরে শ্বাস নিল সে।সাথে শরীরটা চেয়ারে এলিয়ে দিল।
সাহিত্যের এমন শান্ত মেজাজের সুযোগ নিল রবি।নক না করে চোরের মতো কেবিনে ঢুকলো।তার দিকে না দেখেই সাহিত্য গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,
"তোর উপর কিন্তু আমি এখনো রাগ করে আছি"
রবির ভঙ্গি আর চোরের মতো থাকলো না।স্বাভাবিক হয়ে সে সাহিত্যের সামনের চেয়ারে বসলো।টেবিলে এক হাতের থাবা দিয়ে বলল সে,
"আমি এখন কথা বলব।তুই টু শব্দ করবি না।আমি কথা শেষ করব তারপর কথা বলবি"
কল্পনার সাথে কথা বলে সাহিত্যের মেজাজ এখন অনেকটাই ঠান্ডা।তাই তো শান্ত ভঙ্গিতেই বলে উঠল,
"বল"
শ্বাস ছাড়ালো রবি।অয়নের সেফটি আইডিয়া তাহলে কাজে দিয়েছে।আর সময় নষ্ট না করে রবি কথা চালালো,
"ফাহাদ আংকেল নিজেই মিটিং অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য তার পি.এ.-কে দিয়ে রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল"
রবি আসল ঘটনা সব জানে।জায়েদ সাহেব তাকে সব খুলে বলেছেন।কিন্তু সাহিত্যকে মানানোর জন্য একটু তো বানোয়াট কথা বলাই যায়।
রবি তার কথা চলতি রাখলো,
"আমি ইচ্ছা করেই এক্সেপ্ট করেছি।কেন করেছি এখন বলছি,শুন মনযোগ দিয়ে।....সাহিত্য..ফাহাদ আংকেল এখন তোর শশুরও হয়।আর তাকে তোর আর কল্পনার বিয়েটার ব্যাপারে মানানো এখন তোর জন্য ফরজ হয়েছে।কিন্তু তোদের দুজনের কোম্পানি যদি মার্কেটে রাইভেল হিসেবে থাকে তাহলে সিচুয়েশন আরো খারাপ হবে।আমি যেটা করেছি ভেবেচিন্তেই করেছি।আর..মিডিয়ার লোকরা তো ওত পেতে আছে।তারা তো চাইছেই এমন খারপ কিছুর।যেন তারা খবর ছড়াতে পারে যে তোদের বিয়েটা ফাহাদ আংকেলের অমতে হয়েছে।এটা ছড়িয়ে পড়লে তখন আরেক সমস্যা হবে ইন্ডাস্ট্রিতে।তোর বিজনেস প্রফিট প্লাস ফ্যামিলি প্রফিট দুই দিকে দেখেই একথা বলছি আমি।বাকিটা এখন তুই যা মনে করিস"
সাহিত্য বেশ সময় নিল মুখ খুলতে।চেয়ারে এলিয়ে রাখা মাথাটা তুলল সে,
"ঠিকাছে...কিন্তু এই ব্যাপারটায় যে আমার একটু অসুবিধা হবে সেটা হয়তো বুঝতে পারছিস তুই"
সাহিত্যের উত্তর শুনে স্বস্তির শ্বাস ফেলল রবি।সাহিত্য কিসের অসুবিধার কথা বলছে রবি সেটা ভালো করেই জানে।যাকে টক্কর দেওয়ার জন্য বিজনেস শুরু করেছে সাহিত্য;তার সাথেই পার্টনারশিপ করাটা সাহিত্যের জন্য মানসিক দিক থেকে একটু কষ্টকরই হবে।কিন্তু করার যে কিছু নেই।সাহিত্যকে সেই মানসিক চাপ থেকে বের করতেই হয়তো এই পথ বেঁচে নিয়েছে তার ভাগ্য।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
রাত এখন হবে হয়তো ১টা কি ২টা।কল্পনা নিজের বিছানায়।ঘুমানোর চেষ্টা চালাচ্ছে সে।তবে এতক্ষণ ধরে ফোন হাতে নিয়ে থাকার ফলে এখন আর ঘুম ধরছে না।ড্রিম লাইট জ্বলানো নিস্তব্ধ ঘরটার বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে সে।হঠাৎ দরজায় শব্দ হতেই হাতে-পায়ে চমকে উঠল মেয়েটা।নিস্তব্ধ ঘরে এমন হুট করে শব্দ হলে তো চমকানোরই কথা।তবে সাহিত্যকে দেখা মাত্রই হাফ ছেড়ে বাঁচলো যেন।বিরক্তির সুরে বলে উঠল কল্পনা,
"আপনি?এমন শব্দ করে দরজা খুলিয়েন না তো।ভয় লাগে আমার"
"তো-তোকে একটু জড়িয়ে ধরি?"
কল্পনা থতমত খেল।আবছা ড্রিম লাইটের আলোতে সাহিত্যের দিকে ভালো করে নজর দিল সে।সাহিত্য যে অসম্ভব রকমভাবে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে সেটা এই মাত্র চোখে পড়ল তার।সাথে এটাও খেয়াল করল সাহিত্যের হাত জোড়া কাপছে মৃদু।
কল্পনা উঠে বসে ভ্রু কুচকালো,
"আ..আপনার কিছু হয়েছে কি?এমন করছেন কেন?"
"তোকে একটু জড়িয়ে ধরি?"
একই কথা আবারো বলল সাহিত্য।তবে এবার যেন শ্বাস এটে আসছিল তার।ঘনঘন ঢোক গিলছে ছেলেটা।
কল্পনা যেন বুঝে উঠল না কি বলবে।সাহিত্য কি কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখেছে?এই মুহুর্তে তাকে না-ও করতে পারছে না।ছেলেটাকে দেখেই বড় মায়া হচ্ছে।কল্পনা সাহিত্যকে একটু সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য পিচপা হলো না।সাহিত্যের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে উঠল সে,
"কি হয়েছে আপনার?আসেন দেখি এদিকে"
কল্পনার মুখে সে কথা শুনে সাহিত্য আর এক মুহুর্তও দাড়ালো না।দরজা লাগিয়ে হুড়মুড়িয়ে কল্পনার দিকে এগুলো।বিছানায় বসেই কল্পনাকে নিজের সাথে লেপ্টে নিল যেন।কল্পনাকে নিজের কোলের উপর বসিয়ে জাপ্টে ধরেছে সে।আকস্মিক এমন ঘটনায় ভড়কালো কল্পনা।তবে আর কিছুই করার সুযোগ পেল না।সাহিত্য তার প্রেয়সীর গলায় ইতোমধ্যেই মুখ গুজে দিয়েছে।
"তোকে ছাড়া কোথাও যাব না আমি।সাহিত্য তার কল্পনার কাছেই থাকবে"
ঘুমের মধ্যেই বিড়বিড়িয়ে উঠল সাহিত্য।প্রেয়সী নিজের থেকে দূরে থাকায় আজ আবার সেই আগের দুঃস্বপ্নটা দেখেছে সাহিত্য।হয়তো সে এখনো ভয়ে আছে যে কল্পনা তার বাবার কথায় সাহিত্যকে ছেড়ে চলে যায় নাকি।সেই চিন্তা করতে নিয়েই হয়তো তার সেই নাইটমেয়ারটা আবারো দেখেছে।
সাহিত্যের মুখে হঠাৎ এমন কথা শুনে ভড়কালো কল্পনা।এতক্ষণ থেকে সাহিত্যের কোলে বসে একটু নড়াচড়া করলেও এখন যেন একদমই চুপ হয়ে গেল।হঠাৎ সাহিত্য এই কথা কেন বলে বসলো সেটাই হয়তো বুঝছে না।মেয়েটা তো আর জানেনা,যে সাহিত্য দীর্ঘ ১১বছর ধরে একটা নির্দিষ্ট দুঃস্বপ্ন দেখে আসছে তার প্রেয়সীকে নিয়ে।
কল্পনা যেন আনমনেই সাহিত্যের ঘামে ভিজে থাকা কপালের চুলগুলো ছুঁয়ে দিল।কোমল কন্ঠে সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
"কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখেছেন?"
মুখে কিছু বলল না সাহিত্য।চোখ বন্ধ রেখেই উপর-নিচ মৃদু মাথা দোলালো।কল্পনা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।সাহিত্যের মাথার চুলে আঙুল বুলাতে লাগলো।ক্ষণিক সময় পর হালকা ঠোঁট বেকে এলো তার।কল্পনা আজ তার সাহিত্য ভাইয়ের আরেক রূপ দেখছে যেন।কল্পনা কখনো সাহিত্যকে এভাবে আমেনা শেখের কাছেও আদর নিতে দেখেনি।
কল্পনার ভাবনার মাঝেই সাহিত্য তাকে আরো একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।ঘুমের মধ্যেই যেন আবার বলে উঠল ছেলেটা,
"জানপাখি,একটু জড়িয়ে ধর না আমাকে"
সাহিত্যের শক্ত করে জড়িয়ে ধরায় প্রথমে কল্পনা হালকা ইতস্তে পড়ে যায়।তবে এর পরেই ঠোঁটে হালকা হাসি নিয়ে বাম হাতখানা সাহিত্যের ঘাড়ের উপর দিয়ে ডান হাতখানা সাহিত্যের চুলেই ব্যস্ত রাখলো মেয়েটা।নিজের চোখে তো ঘুম নেই।অন্তত তার স্বামীটা নাহয় একটু আরাম করে ঘুমাক।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
পিটপিট করে চোখ খুলল কল্পনা।প্রথমে হালকা ঝাপসা দেখলেও ধীরে-ধীরে চোখের জ্যোতি ঠিক হলো।আড়মোড়া ভেঙে যেই না উঠে বসতে যাবে অমনি কিছু অস্বাভাবিক মনে হলো তার।পাশ ফিরতেই হাতে-পা চমকে উঠল সে।
কল্পনা আর কোথাও না,বরং সাহিত্যের কোলে শুয়েই রাত পার করেছে।আর এই মুহুর্তেও সে সাহিত্যের কোলেই বসে আছে।পাশ ফিরে যখনই দেখলো সাহিত্য ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে তখনই তো চমকে গিয়েছে মেয়েটা।
সাহিত্য বিছানার ডাশায় হেলান দিয়ে বসে সারা রাত তার প্রেয়সীকে নিয়ে ঘুমে বিভোর ছিল।সকালে যখন টের পায় সে-ও খানিকটা চমকে যায়।ধীরে-ধীরে গত রাতের কথা মনে পড়ে।তবে এর পর মুহুর্তেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে কল্পনার পুরো মুখোমন্ডলে আলতো করে টুকরো চুমু দেয় সাহিত্য।সেটাতে কল্পনার ঘুম একটুও ভাঙেনি অবশ্য।সে তো কেবলই উঠল।টের পেয়ে যে চমকেছে,তাতে পড়ে যেতে নিলে সাহিত্য তার কমোর ধরে আবার নিজের কোলে বসিয়ে নেয়।আর সেটাতে কল্পনা দাপাদাপি করে উঠে একদম,
"কি করছেন?ছাড়েন বলছি।উঠতে দিন আমাকে"
সাহিত্য নাছোড়বান্দা।ঠোঁট বাকিয়ে বলল সে,
"আগে একটা চুমু দে"
কল্পনার ঠোঁট জোড়া যেন হা হয়ে গেল।নিজেকে সংযত করে তেতে উঠল সে,
"এই সাত সকালে আবার জ্বালাতন করছেন আমাকে?"
"সাত সকাল নেই এখন,১০টা বাজছে"
কল্পনা থতমত খেল বেশ,
"যে-যেটাই হোক!আমি কিছু দিব না"
সাহিত্যের গলা গম্ভীর হয়ে উঠল,
"ভালোয়-ভালোয় দে,নাহলে কিন্তু আমি নিজে নিব"
কল্পনা অযুহাত দেখালো,
"ব্রাশ করিনি তো!"
ভ্রু কুচকালো সাহিত্য,
"চুমু দিতে ব্রাশ করার লাগে না"
"আপনি কিন্তু খুব জ্বালাতন করছেন"
"তুই চুমু দিবি,নাকি আমি চিৎকার দিব?"
কল্পনা চোখ সরু করে সাহিত্যের দিকে দেখতে লাগলো,
"আমার টেকনিক আমার উপরেই খাটাচ্ছেন?"
সাহিত্যও কল্পনাকে সরু চোখে দেখতে নিয়ে নিজের কথা চালালো,
"একবার চিন্তা কর।এই সকালে হঠাৎ আমার চিৎকার শুনে বাড়ির সবাই এখানে জড়ো হবে।সবাই দেখবে তুই আমার কোলে বসে আছিস,জিনিসটা কেমন দেখাবে না?তাই ভালো হবে চুপচাপ একটা চুমু দিয়ে দে"
কল্পনা মুখে বড় আকারের এক টিম্পুনি কাটলো।অতঃপর সাহিত্যের মুখ ভেঙচিয়ে বলল,
"খুব আসছে চিৎকার দিতে.."
কল্পনা কথাটা শেষ করতে না করতেই সাহিত্য মুখ হা করল চিৎকার দিবে বলে।অমনি কল্পনা দুই হাতে সাহিত্যের মুখ চেপে ধরল,
"পাগল নাকি!?"
হাসলো সাহিত্য।গালটাও এগিয়ে ধরল।চোখ খিচে নিল কল্পনা।সাহিত্যের মুখ থেকে হাত সড়িয়ে নিল সে।চোখ খুলে সাহিত্যকে সরু চোখে দেখতে লাগলো।সাহিত্য এখনো গাল এগিয়ে ধরে রয়েছে।কল্পনা ন্যানো সেকেন্ডের মাঝে সাহিত্যের গালে নিজের অধর ছুঁয়ে দিয়ে হুড়মুড়িয়ে উঠে দাড়ালো।শুধু উঠে দাড়ালো না,ওয়াশরুমের দিকে ভো দৌড় লাগালো।ওয়াশরুমের দরজা লাগাতে নিয়েই পেছনে সাহিত্যের উদ্দেশ্যে তেতে উঠল সে,
"এই লোকটা জ্বালিয়ে মারে আমাকে!"
কল্পনার এমন বিদ্যুতের বেগে চুমু দেওয়ায় অবাক হয়েছিল সাহিত্য।তবে কল্পনার শেষ কথা শুনে ঠোঁট বাকালো সে।
#চলবে
🚫বিশেষ নোট
গল্পের কাহিনী এখন ডেমু ট্রেনের মতো আগাবে।আগামী পর্বগুলো পড়ে মনে হতে পারে লেখিকা গল্প তাড়াতাড়ি শেষ করার চেষ্টা করেছে।যেটা একদমই সত্য কথা।কয়েক মাস ধরে একটা গল্প লিখতে লিখতে একঘেয়েমি হয়ে গিয়েছে।নতুন কিছু লিখতে চাই।তাই এই গল্প তাড়াতাড়ি শেষ করবো।