#পর্ব_৮৮
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সাহিত্য বর্তমানে কামাল মির্জার চেম্বারে।গত রাতে আবারো সেই আগের নাইটমেয়ার দেখে বিকেলেই এখানে এসেছে সে।গতবার ডাক্তার কামালের এখান থেকে ফেরত গিয়ে কি-কি হয়েছে সাহিত্য সব খুলে বলে।এবং এই মুহুর্তে অপেক্ষা করছে ডাক্তার কামালের প্রতিক্রিয়ার।কিন্তু ডাক্তার কামালের প্রতিক্রিয়া তো অন্য কিছুই।তিনি বেশ অবাক হয়েছেন যে সাহিত্য কল্পনাকে বিয়ে করেছে।চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বিস্ময় ভরা কন্ঠে বললেন তিনি,
"তুমি কল্পনাকে জোর করে বিয়ে করেছো??!!"
সাহিত্য নিশ্চুপ।সে তার সমস্যার সমাধান শুনতে চায়।কিন্তু ডাক্তার কামাল হাসি মুখে যেন আবার বলে উঠলেন,
"দেখেছো!আমি তোমাকে বলেছিলাম না,যে তুমি তোমার রাগ-জেদের কাছে হেরে যাবে।এখন কি হলো?এবার বিশ্বাস হয়েছে আমার কথা?"
এবার সাহিত্য মাথা হালকা নামিয়ে মৃদু ঠোঁট বাকালো।তবে পর মুহুর্তেই গলা খাকারি দিয়ে চেহারা শক্ত করল সে,
"আপনি এটাও বলেছিলেন কল্পনা আমার ঔষধ।ওকে বিয়ে করলে আমার এই সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে।কিন্তু আমি আবার এই স্বপ্ন দেখলাম কেন?"
চেয়ারে বসতে নিয়ে মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করলেন ডাক্তার কামাল,
"আহা সাহিত্য।এমন বাচ্চাদের মতো কথা বলছো কেন?বিয়ে করে সংসারটা তো করতে হবে, তাই না?কিন্তু তুমি এখনে যেই হিস্ট্রি শুনালে তাতে এটাও আমার কানে এলো যে কল্পনা আর তুমি আলাদা রুমে থাকো।নতুন বউ-জামাই সারাদিন এক রুমে ঢুকে থাকলে না তোমার এই নাইটমেয়ারটা দেখা বন্ধ হতো।আর আমার যত দূর মনে হচ্ছে কল্পনার দূরে যাওয়া নিয়ে তুমি এখনো ভয়ে আছো।তোমার চাচা..মানে শশুর কি এতোটাই কড়া?"
সাহিত্য ভারী এক শ্বাস ফেলল।অতঃপর কাঁদো গলায় বলতে লাগলো সে,
"আঙ্কেল প্লিজ আমার হেল্প করেন।আমাকে যেমন বুঝিয়েছেন আমার শশুর আব্বাকেও বুঝান না,প্লিইইজ"
"সাহিত্য,ওই লেভেলের মাথা পাগল লোক আমার দ্বারায়ও ঠিক করা সম্ভব না।ওনাকে তোমাকেই ঠিক করতে হবে"
সাহিত্য যেন বেশ বিরক্ত হলো সেই কথায়,
"রাস্তায় চলতে বলেছেন ঠিকই,আবার রাস্তার কাটা সড়াতে হেল্প করছেন না কেন?"
ডাক্তার কামাল মৃদু হেসে বললেন,
"কারণ সেই কাটা তোলার চিমটা তোমার কাছেই আছে"
সাহিত্য আনমনে থাকলো কিছু মুহুর্ত।অতঃপর শান্ত স্বরে বলে উঠল সে,
"আর আমার এই নাইটমেয়ারের কি করব?"
ডাক্তার কামাল প্রেসক্রিপশনে কলম চালাতে লাগলেন,
"আপাতত আমি কিছু ঔষধ দিচ্ছি সেটা কন্টিনিউ করো।...আর এটা নিয়ে বেশি চিন্তা করো না।তোমার বউ ঠিক হলে এটাও ঠিক হয়ে যাবে"
সাহিত্য আবারো ভারী শ্বাস ফেলল।মাথা নিচু করে বিড়বিড় করল সে,
"আমার বউটাই যে কবে ঠিক হবে?"
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
মিটিং রুমের পরিবেশ বেশ থমথমে।যেন যুদ্ধের আগ মুহুর্তের অবস্থা।তবে যুদ্ধে যাওয়ার মতো অতো সৈন্য-সামোন্ত নেই এই মিটিং রুমটায়।উপস্থিত শুধু চারজন।রবি আর জায়েদ সাহেব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও সাহিত্য আর ফাহাদ শেখ একদমই স্বাভাবিক নেই।চোখের দৃষ্টিতে একে-অপরকে চিবিয়ে খাচ্চে তারা।এই বুঝি কোনো অযুহাত পেলেই জংলি বিড়ালদের মতো ঝগড়া করতে লেগে পড়বে।
নিরবতা কাটিয়ে সাহিত্যের পাশে বসে থাকা রবি গলা খাকাড়ি দিয়ে উঠল।অতঃপর বাকি তিনজনের উদ্দেশ্যে বলল সে,
"তোহ্,কথাবার্তা শুরু করা যাক?"
জায়েদ সাহেবও গলা খাকাড়ি দিলেন,
"হ্যাঁ হ্যাঁ!স্যার...আমি শুরু করব কি?"
শেষের কথাটা জায়েদ সাহেব ফাহাদ শেখের দিকে দেখেই বললেন।কিন্তু ফাহাদ শেখের নজর তো সাহিত্যের নজরের সাথে টক্কর খেতে ব্যস্ত।তারপরও সময় নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন তিনি,
"হুম"
জায়েদ সাহেব বিস্তারিত সব খুলে বলতে লাগলেন।রবি সব কিছুই মনযোগ দিয়ে শুনছে।কারণ সে ভালো করেই জানে এই পুরো সময়টা সাহিত্য ফাহাদ শেখের সাথে চোখাচোখি করতেই ব্যস্ত থাকবে।এজন্যই তো রাজকে বাদ দিয়ে রবি নিজেই এই মিটিংয়ে উপস্থিত আছে।
মিটিংয়ের এক পর্যায়ে সাহিত্য ফাহাদ শেখের সাথে চোখাচোখি বজায় রেখেই ভ্রু উঁচিয়ে ভারী কন্ঠে বলল,
"এই পার্টনারশিপে আমার প্রফিট কি?"
রবি বেশ ভড়কেছে সাহিত্যের এমন কথায়।তবে ফাহাদ শেখ সাহিত্যের মতো গম্ভীর কন্ঠেই বলে উঠলেন,
"আমার সাথে পার্টনারশিপ করছো এটাই তোমার প্রফিট"
মেকি হাসলো সাহিত্য,
"তাই নাকি,....মাই ডিয়ার শশুর আব্বা?তোমার সাথে যদি পার্টনারশিপ করাই আমার প্রফিট হয়,তাহলে তুমি কেন আমার কাছে এসেছো?"
সাহিত্য সচরাচর ফাহাদ শেখকে তুমি করেই ডাকে।ছোট থেকে তুমি করেই ডেকে আসছে।কিন্তু কথা কাটাকাটি হলেই ছেলেটা তুমি থেকে আপনিতে চলে যায়।ফাহাদ শেখও সেটা ভালো করেই জানেন।বুঝলেন তিনি,যে এই মুহুর্তে সাহিত্য ফাহাদ শেখের মাথা খেতে শুরু করবে।যেমনটা বেশ কয়দিন থেকে শেখ ভিলায় করছে সাহিত্য।রীতিমতো ফাহাদ শেখকে উস্কানিমূলক কথা বলে থাকে ছেলেটা।যেমনটা এইমাত্র বলল।
সাহিত্যের কথা শুনে ফাহাদ শেখ ভড়কেছেন বেশ।সাহিত্যকে চোখ রাঙিয়ে বললেন তিনি,
"এই ছেলে!কতবার বলেছি আমাকে শশুর আব্বা ডাকবা না তুমি!"
সাহিত্য এতক্ষণ পরে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো,
"তো শশুর আব্বাকে শশুর আব্বা ডাকবো না তো কি বউয়ের বাপ ডাকবো?"
টেবিলে হাতের থাবা মারলেন ফাহাদ শেখ,
"কিছুই ডাকবা না তুমি!"
ঘাড় বাকিয়ে মেকি হাসলো সাহিত্য,
"ঠিকাছে।একবারে তোমার নাতি-নাতনিরা তোমাকে ডাকবে"
সাহিত্যের মুখে এমন কথা শুনে হুংকার ছুড়লেন ফাহাদ শেখ,
"একদম চুপ!"
ফাহাদ শেখ তার পাশে বসে থাকা জায়েদ সাহেবের দিকে ঘুরলেন,
"জায়েদ সাহেব!বাদ দেন এসব মিটিং-ফিটিং!আমি কথা বলছি এর সাথে"
ফাহাদ শেখের হুংকারে রবি আর জায়েদ সাহেব কেপে উঠল যেন।তবে ফাহাদ শেখ ঘুরলেন শান্তভাবে বসে থাকা সাহিত্যের দিকে,
"দেখো!ভালোই-ভালোই কোনো কথা ছাড়া পার্টনারশিপটা করে নাও।তোমার সাথে এসব মিটিং করায় আমার কোনো আগ্রহ নেই"
"আগ্রহ না থাকলেও করতে হবে শশুর আব্বা।এটা শেখ ভিলা না।এটা আমার অফিস"
ফাহাদ শেখ চোখ-মুখ খিচে নিলেন।সেটা দেখেই হয়তো সাহিত্য বলে উঠল,
"আচ্ছা ঠিক আছে।আমার শ্রদ্ধেও চাচা,সাথে আমার শশুর আব্বা হ-ও দেখে মিটিং না করেই পার্টনার বানাচ্ছি তোমাকে"
এবার ফাহাদ শেখ মেকি হেসে বললেন,
"শ্রদ্ধাটা তুমি দিলে কবে"
সাহিত্য বেশ ভড়কে গেল সেই কথা শুনে।হুড়মুড়িয়ে উঠলো।তবে রবি তাকে কোনো মতে বসিয়ে দিল।সেটা দেখে ফাহাদ শেখ আবারো হাসলেন।এতক্ষণে সাহিত্যের শান্ত ভংঙিমা বদলাতে পেরেছেন সেজন্যই হয়তো।
রবির জোরাজোরিতে সাহিত্য নিজেকে সংযত করল।গলার টাই ঠিক করে বলল সে,
"বেশ কিছু দিন থেকেই তোমাকে শ্রদ্ধা দিচ্ছি।তুমি না নিলে আমি কি করব?"
ফাহাদ শেখ আরো কিছু বলতে যাবেন তার আগেই রবি বলে উঠল,
"তাহলে মিটিং এখানেই শেষ করি?কথাবার্তার তো আর কিছু বাকি নেই!"
জায়েদ সাহেবও পরিস্থিতি বুঝে রবির সাথে তাল মিলালেন,
"হ্যাঁ হ্যাঁ!আমিও সেটাই ভাবছিলাম"
সাহিত্য আর ফাহাদ শেখ আবারো চুপ মেরে গিয়ে চোখাচোখি করতে লাগলো।তবে সেটি বেশ গম্ভীর।না জানি এই চোখ জোড়া কবে একে-অপরকে কোমল দৃষ্টিতে দেখবে?
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
"রুম থেকে আমার ফোনটা নিয়ে আয় তো"
সাহিত্যের কথায় কল্পনা সামনে পা বাড়াতে গিয়ে আবার থেমে গেল।মাথা ঘুরিয়ে সাহিত্যের দিকে সরু নজর ফেলল সে।এর আগে একবার রুমে ডেকে নিয়ে গিয়ে কি কান্ডটা না করে বসলো।আজ আবার যেতে বলছে?কোনো ভেজাল আছে নিশ্চয়ই।
সাহিত্য কল্পনাকে সেকথা বলে আবার ল্যাপটপে মন দেয়।কিন্তু আড় চোখে পরখ করতে গিয়ে দেখলো কল্পনা এখনো ঠাই দাঁড়িয়ে আছে।ভ্রু কুচকালো সাহিত্য,
"কি হলো,যা"
কল্পনা সাহিত্যের দিকে ঘুরে কোমরে হাত দিয়ে দাড়ালো,
"আমি আর আপনার রুমে যাচ্ছি না।একবার গিয়ে আক্কেল হয়েছে আমার"
সাহিত্য থতমত খেল যেন।তবে নিজেকে সংযত করে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল সে,
"আমি কি এখন রুমে আছি?আমার ফোনে কাজ আছে।তাড়াতাড়ি এনে দে তো"
কল্পনা চিন্তা করে বসলো।আসলেই তো সাহিত্য এই সময় রুমে নেই,তো কোনো ঝামেলা করারও সম্ভাবনা নেই।গিয়ে টুপ করে ফোনটা নিয়ে বেড়িয়ে এলেই হলো।
কল্পনা মাথা মৃদু ঝাকিয়ে পা বাড়ালো সিড়ির দিকে।আর এদিকে কল্পনার পাশে দেখে সাহিত্য মুচকি হেসে উঠল।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
আগের বারের মতো এবারও কল্পনা রুমে ঢুকে ভড়কে উঠেছে অনেকটা।তবে এবার কারণটা সাহিত্য নয়,বরং সাহিত্যের হাতে তৈরি এক অয়েল পেইন্টিং কল্পনার ভড়কানোর কারণ।
রুমের মাঝ বরাবর স্টান্ড দাড় করিয়ে তাতে বড়সড় একখানা পেইন্টিং ক্যানভাস রাখা।কিন্তু কল্পনা ভড়কেছে ক্যানভাসে থাকা ছবিটা দেখে।ছবিতে একটা মেয়ে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে।পাগুলো হালকা আড়াআড়ি করে রাখা।এক পা স্বাভাবিকভাবে থাকলেও অন্য পায়ের আঙুলের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছে।এক হাত মাথার উপরে দিয়ে এবং আরেক হাত সামনে পেটের কাছে হয়তো নিয়ে আছে।পিছন থেকে ঠিক বুঝা যাচ্ছে না।তবে মেয়েটার সৌন্দর্য যেন ভালোভাবেই বুঝা যাচ্ছে।
লাল রঙের একখানা কামিজ,সাথে রাণী গোলাপি রঙা প্লাজু পরা।হাটু অব্দি সিল্কি কালো রেশমি চুলের ঝলমলেভাব যেন ছবিটায় ফুটে উঠেছে একদম।পেইন্টিংটায় বৃষ্টির পানির ফোটারাও বিদ্যমান।স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে মেয়েটা বৃষ্টিতে ভিজতে নিয়ে মনের সুখে নাচছিল।আর সেই সময়ই পেছন থেকে কেউ একজন সেই দৃশ্যটা ক্যানভাসে ধারণ করে নিয়েছে।
কল্পনা সরু চোখে ছবিটা দেখতে নিয়েই ধীর গতিতে সামনে পা বাড়ালো।ছবিটা দেখতে কল্পনার মতো লাগছে না?ওই যে একদিন বৃষ্টিতে ভিজে ছাদে ডান্স প্রাক্টিস করছিল যে সে,তেমনই তো লাগছে।পড়নের কাপড়গুলোও হুবোহু তেমন!কিন্তু কিছু একটা তো আলাদা আছে।কল্পনা একপ্রকার খুটেখুটে ছবিটা দেখছে।হঠাৎই চোখ পড়ল ছবিতে থাকা মেয়েটার কানের দিকে।মেয়েটা তার ঘাড় হালকা পাশ ফিরায় ডান কানটা স্পষ্ট ছবিটায়।এবং সেই কানে থাকা বড় কানটানা ঝুমকাটাও।অক্সিডাইজ গোল কালারের বড় কানটানা ঝুমকো দুল ঝুলছে মেয়েটার কানে।বাম পাশের ঝুকাটার শুধু টানাটা বুঝা যাচ্ছে চুলে গুজে থাকার কারণে।কিন্তু ডান কানের পুরো দুলটাই যেন উন্মুক্ত।কল্পনার তো এমন কোনো ঝুমকো কানটানা দুল নেই।সেকথা ভাবতে নিয়েই কল্পনার চোখ জোড়া ক্যানভাসের উপরে বাম দিকে গেল।সুন্দর করে দুটো শব্দ লিখা।যেমনটা কল্পনা সাহিত্যের এর আগের এক পেইন্টিংয়ে দেখেছিল।কিন্তু সেই ছবিতে ইংরেজিতে 'মাই নাইটমেয়ার' লিখা থাকলেও আজকের ছবিটায় খাটি বাংলায় দুটো শব্দ লিখা।আর কল্পনা মনের মধ্যে সেই দুখানা শব্দ পড়ে আবারো চমকে উঠল যেন।
এবার মুখে উচ্চারণ করল কালো কালি দিয়ে লিখে রাখা সেই সুন্দর শব্দ দুটো,
"সাহিত্যের কল্পনা?"
শব্দ দুটো পড়ে কল্পনা আবারো ছবিতে থাকা মেয়েটার দিকে দেখলো।তার মানে...ছবিতে থাকা মেয়েটা কল্পনা?নিজের ভাবনা থেকে কল্পনা ছিটকে বেড়িয়ে এলো যখন পেছনে দরজা লাগানোর শব্দ হলো।ভড়কে উঠে পেছনে মাথা ঘুরালো সে।দেখলো সাহিত্য দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে।কল্পনা সময় নষ্ট না করে সাহিত্যের দিকে নজর রেখে ক্যানভাসের দিকে আঙুল তাক করল,
"এ-এটা..আমার ছবি কি?"
কিছু বলল না সাহিত্য।শুধু মৃদু ঠোঁট বাকালো।কল্পনা নিজের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে আবার ক্যানভাসের দিকে ঘুরলো।মেয়েটা যেন এমন কিছু কখনোই আশা করেনি।এতো সুন্দর ছবিটা নাকি কল্পনার!কল্পনার তো নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না।কিন্তু শরীরের গড়ণ দেখে তো যেকেউ বলে উঠবে যে এটা কল্পনা।
কল্পনার এতো ভাবনার মাঝেই সাহিত্য এক কাজ করে বসলো।এগিয়ে এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল কল্পনাকে।তাতে কল্পনা চমকে উঠল বেশ।তবে সাহিত্য ক্যানভাসের দিকে নজর রেখেই বলতে লাগলো,
"মনে আছে?তুই একবার আমার একটা পেইন্টিং দেখতে চেয়েছিলি।ওই যে যেদিন আমার চোখ দেখেছিলি তুই,ওইদিনের কথা বলছি।এটা সেই ছবি।কাল রাতেই শেষ করেছি।এই ছবিটা বানাতে গিয়ে অনেক হাত কেপেছে আমার।কেন জানিস?কারণ কেন জানি আমার মনে হচ্ছিল আমি ফুটিয়ে তুলতে পারবো না ছবিটা।তোর মতো হয়তো হবে না।কিন্তু তারপরও হাল ছাড়িনি।তবুও কেন জানি মনে হচ্ছে হয়নি"
কল্পনা স্তব্ধ নয়নে সামনের ক্যানভাসের দিকে দেখে থেকে সাহিত্যের কথা শুনছে।সাহিত্য এতো বাস্তব একটা ছবি তৈরি করেছে,আর কিনা বলছে সে ফুটিয়ে তুলতে পারেনি!!?সাহিত্য কি এমন খুত দেখছে যেটা কল্পনার চোখে পড়ছে না?এতো নিখুত ছবি কি আদৌ আঁকা সম্ভব!?কে বলবে যে এটা একটা বাস্তব ছবি নয়,বরং সাহিত্যের হাতে তৈরি একটা অয়েল পেইন্টিং!!?
সাহিত্যের শেষের কথায় কল্পনা পর মুহুর্তেই বলে উঠল,
"একদম না!ছবিটা একদম আসল মনে হচ্ছে।মনে হচ্ছে কেউ পেছন থেকে আমার ছবি তুলেছে...কিন্তু আমার যে এমন কানের দুল নেই"
শেষের কথাটা কল্পনা মিনমিনিয়েই বলল।সেটা শুনেই হালকা হাসলো সাহিত্য।অতঃপর বাম হাত ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে রিনরিনি আওয়াজ তুলে কল্পনার সামনে নিয়ে এলো।
কল্পনার কাধে তো সাহিত্য থুতনি ঠেকিয়ে দিয়েছিল সেই কথা শুরু হওয়ার আগেই।সেই অবস্থায় থেকেই বলে উঠল সে,
"এখন আছে"
কল্পনার চোখ জোড়া যেন কোটর ফাটিয়ে বেড়িয়ে এলো এই মুহুর্তে।মেয়েটা যেন প্রতি ক্ষণে-ক্ষণেই চমকে উঠছে।
সাহিত্য এবার কল্পনাকে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল,
"দেখি আমি পরিয়ে দেই"
কথা শেষে কল্পনার প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করল না সাহিত্য।কল্পনার ছোট চুলগুলো কানের পেছনে গুজে দিয়ে আলতো হাতে প্রেয়সীর কানে দুল পরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ছেলেটা।কল্পনা কিছু বলতে গিয়েও যেন থেমে গেল।লজ্জা যেন হঠাৎই ভার করে বসলো মেয়েটার উপর।সাহিত্য খেয়াল করল কল্পনা গালসহ কান দুটোই গরম ও লাল হয়ে উঠেছে।প্রেয়সীর ভারী লজ্জা বুঝতে পেরে মৃদু মুচকি হাসলো সে।
কানটানাগুলো কল্পনার চুলে গুজে দিয়ে সাহিত্য আবারো কল্পনাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে কাধে থুতনি ঠেকলো।ক্যানভাসের দিকে দেখতে নিয়েই হাস্কি কন্ঠে বলল সে,
"এবার পূর্ণতা পেয়েছে.....সাহিত্যের কল্পনা"
লাল হয়ে থাকা গাল দুটো নিয়ে কল্পনাও ক্যানভাসের দিকে নজর ফেলল।চোখ দুটো তার হালকা ছলছল করছে।পরিস্থিতিটা তাদের এতো খারাপ কেন?কল্পনার তো এখন মন চাইছে শেখ ভিলা থেকে পালিয়ে গিয়ে সাহিত্যের সাথে সংসার করুক।একটা সুখের সংসার।
"থ্যাংক ইউ"
কল্পনার মৃদু কন্ঠের স্বর সাহিত্যের কানে গেল।তবে সাহিত্য সময় নিয়ে বলে উঠল,
"আমাকে আর দূরে ঠেলে দিস না তো জানপাখি,প্লিজ"
উত্তর করল না কল্পনা।ছলছল নয়নে দেখে থাকলো "সাহিত্যের কল্পনা" নামক পেইন্টিংটার দিকে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
বর্ষার শেষে শীতের আমেজ এখনো ধরণীতে আসেনি।সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় দিনে সাধারণত এমনটাই হয়ে থাকে।তবে দুপুরবেলাটায় আজ কেন জানি একটু গরম পড়েছে।কল্পনা কিছুক্ষণ আগেই ফ্যানের সুইচটা অন করে দিল সেজন্যই।ফ্যান অন করে বিছানার দিকে এগুতে নিয়েই স্টাডি টেবিলের উপর রাখা পানির বোতলটার দিকে নজর গেল তার।সেদিকে নজর যেতেই হঠাৎই কেন জানি এক কথা মনে পড়ে গেল।দুপুরে খাওয়ার আগে মহুয়া বেগমের কিছু ঔষধ আছে।সেগুলো কি খেয়েছে?মহুয়া বেগম সাধারণত নিজ থেকেই ঔষধ খান।তার স্মরণশক্তিটা যে এখনো বেশ প্রখর আছে।তবে কেন জানি কল্পনার মনে দ্বিধা কাজ করছে।ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার হঠাৎই মনে ইচ্ছা জাগল একটুখানি দাদির রুমটা ঘুরে আসতে।যেই ভাবনা সেই কাজ।শরীরে ওড়না চড়িয়ে কল্পনা বেড়িয়ে পড়ল মহুয়া বেগমের রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
সিড়ির কাছে আসতেই নজর পড়ল ড্রইং রুমে।আজ অনেকদিন পর মুহিত সাহেব শেখ ভিলায় এসেছেন।কিছু মুহুর্তই হবে শেখ ভিলায় ঢুকেছেন তিনি।শুক্রবার হওয়ায় আসতে পেরেছেন।রঞ্জক শেখ তাকে নিয়ে বসেছেন ড্রইং রুমে।গল্পগুজব করছেন হালকা।গল্প শেষেই দুপুরের খাওয়া চলবে।
কল্পনার সেদিকে নজর যেতেই মুহিত সাহেবকে লম্বা করে এক সালাম দেয়।সুক্ষ্ম কুশল বিনিময় করে কল্পনা হাসি মুখে এগুলো দাদির রুমের দিকে।আর এদিকে রঞ্জক শেখ মুহিত সাহেবের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,
"আরে মুহিত সাহেব!আপনাকে তো খুশির খবরটা দেওয়াই হয়নি।কল্পনা আর সাহিত্যের বিয়ে হয়েছে"
মুহিত সাহেব কল্পনার দিক থেকে সটান রঞ্জক শেখের দিকে মাথা ঘুরালেন।বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলে উঠলেন তিনি,
"কিহ্!!কখন হলো এ কাজ?"
হালকা হাসলেন রঞ্জক শেখ,
"এই তো,এপ্রিল মাসে"
আবারো ভড়কালেন মুহিত সাহেব,
"কিহ্!এতোদিন আগে এই অঘটন ঘটেছে আর আপনি আমাকে এখন বলছেন?আপনারা মানুষ না রোগী?"
রঞ্জক শেখ আবারো হালকা হাসলেন।অতঃপর মুহিত সাহেবকে শান্ত করে সব ঘুটনা খুলে বললেন তিনি।
কল্পনা দূর থেকে মুহিত সাহেবের ভড়কানো চেহারা দেখে হাসলো মিটিমিটি।অতঃপর মাথা ঘুরিয়ে মহুয়া বেগমের রুমে ঢুকলো।
মহুয়া বেগম শুয়ে আছেন।এসময় একটু আরাম করেন তিনি।সেই সুবাদে মাঝেমধ্যে একটু ঘুমিয়েও নেন।কল্পনা রুমে ঢুকেই বিছানার দিকে এগিয়ে এলো।নজর দিল পাশে থাকা টেবিলের উপর।কল্পনা যেটা চিন্তা করেছিল সেটাই হয়েছে।মহুয়া বেগম ঔষধ খাননি।কল্পনা মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করল।অতঃপর সব ক'টা ঔষধ খুলে হাতে নিল সে।জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালতে নিয়েই মৃদু স্বরে ডাকতে লাগলো দাদিকে,
"দাদি।উঠো ঔষধ খেয়ে নাও।খাওয়ার আধা ঘন্টা আগে ঔষধ খেতে হবে আর তুমি এখনো খাওনি?"
গ্লাসে পানি ঢালা হলে এবার কল্পনা মহুয়া বেগমের বাহুতে হাত দিল।আলতো করে বুলাতে নিয়ে আবার ডাকলো সে,
"দাদি।হয়েছে।অনেক ঘুমিয়েছো তো।উঠো তো ঔষধগুলো খেয়ে নাও।এতো ঘুমালে মোটা হয়ে যাবে কিন্তু"
শেষের কথাটা বলতে নিয়েই হালকা হেসে উঠল কল্পনা।কিন্তু মহুয়া বেগম নড়লেন না।সেটা দেখেই কল্পনার ভ্রু জোড়া কুচকালো।এবার একটু জোরেই ঝাকি দিল কল্পনা,
"দাদি?"
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
মুহিত সাহেব শরবত গিলছেন আর রঞ্জক শেখের মুখে আদি হিস্ট্রি শুনছেন।এই কয়টা মাসে এতো কিছু হয়ে গিয়েছে?মুহিত সাহেব কাজের সুবাদে কি একটু ঢাকার বাইরে গিয়েছিলেন আর এতোকিছু মিস করেছেন তিনি?ভেবেই বড় আপসোস লাগছে তার।
মুহিত সাহেব বেশ মনযোগ দিয়ে রঞ্জক শেখের কথা শুনতে ব্যস্ত।এমন সময় মহুয়া বেগমের রুম থেকে কল্পনার ভয়ার্থ চিৎকার শুনা গেল,
"দাদি!কি হয়েছে তোমার!?উঠছো না কেন??মা!!মা দেখো না,দাদি উঠছে না কেন জানি!"
হঠাৎ কল্পনার এমন চিৎকার শেখ ভিলার সবার কানেই পৌঁছেছে।মহুয়া বেগমের কিছু হয়েছে সেটা শুনেই মুহিত সাহেব ভড়কে উঠেন।হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে গেলেন সেই কাঙ্ক্ষিত রুমটার দিকে,যেই রুমটায় হয়তো তার আর কখনোই যাওয়া হবে না।এটাই শেষ প্রবেশ।
মুহিত সাহেব রুমে ঢুকেই কল্পনার দিকে নজর ফেলেন।কল্পনা মহুয়া বেগমের বাম হাতের তালুর সাথে নিজের হাতের তালু ধরে রেখে অনবরত ডেকেই যাচ্ছে।কিন্তু বিছানায় শুয়ে থাকা নিথর দেহটি যেন কোনো প্রতিক্রিয়াই করছে না।
কল্পনা মুহিত সাহেবকে দেখতেই কাঁদো গলায় বলে উঠল,
"আঙ্কেল!দাদির হাত অনেক ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।দাদি উঠছে না কেন??"
মুহিত সাহেবের হয়তো বুঝতে দেরি হলো না।কিন্তু তারপরও তিনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে মহুয়া বেগমের কাছে গেলেন।মহুয়া বেগমের পাল'স চেক করার জন্য ডান হাতটা হাতে তুললেন তিনি।হঠাৎই মুহিত সাহেবের হাত কাপতে শুরু করল।বারে বারে মহুয়া বেগমের পালস চেক করছেন।কিন্তু নিজের ডাক্তারী শিক্ষার উপর আজ মুহিত সাহেবের বিশ্বাস হচ্ছে না।অবশেষে শেষ পর্যায়ের কাজ করে বসলেন।কাপা এক হাত মহুয়া বেগমের নাকের কাছে নিয়ে গেলেন।অমনি তার কাপা হাত হঠাৎই থমকে গেল যেন।
কল্পনা এক হাতে দাদির হাত ধরে রেখেই মুহিত সাহেবের উদ্দেশ্যে গলা উঁচিয়ে বলল,
"কি হয়েছে?কথা বলছেন না কেন?হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে?আমি এম্বুলেন্স ডাকছি.."
এরই মাঝে শেখ পরিবারের সব সদস্য উপস্থিত হলো বড় রুমখানায়।সবার চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ।
কল্পনা নিজের শেষের কথা বলতে নিয়েই সামনে পা বাড়ালো রুমের বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।কিন্তু বাধা পড়ল মহুয়া বেগমের শক্ত হাতের বাধনে।হেচকা টান খেল কল্পনা।ঘুরে দেখলো দাদির হাতটার দিকে।পর মুহুর্তেই মুহিত সাহেব মাথা নিচু করে ভারী কান্নায় ভেঙে পড়লেন,
"চাচি আম্মা আর নেই,কল্পনা"
কল্পনার ব্যতিব্যস্ত আচরণ হঠাৎই থেমে গেল।তার স্তব্ধ নজর এখনো নিজের হাতের দিকে,যেটা মহুয়া বেগম শক্ত করে ধরে আছেন।পেছনে গিন্নিদের হা-হুতাশসহ সবার কান্না যেন আবছা শুনতে শুরু করল কল্পনা।
কল্পনা আর দাড়িয়ে থাকতে পারলো না।পা দুটো তার অসম্ভব রকম কাপতে শুরু করেছে।সাহিত্য কল্পনার কাছে আসার আগেই কাপতে থাকা পা নিয়ে ধপ করে বিছানার পাশে মেঝেতে বসে পড়ল কল্পনা।কিন্তু মহুয়া বেগম এখনো তার আদরের নাতনিটার হাত ছাড়েননি।একদম শেষ মুহুর্তে তার এই নাতনিটারই কন্ঠ শুনে চলে গেলেন তিনি।কল্পনা কি সুন্দর করে তাকে ডাকছিল,
"দাদি।উঠো ঔষধ খেয়ে নাও..."
#চলবে