#পর্ব_৮৯
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
শেখ ভিলার বড় কাঠের দরজাটা পুরোটাই খোলা।এতো বড় কাঠের দরজা দেখে ছোট্ট প্রাণটা ভড়কালো অনেক।তবে উঁকি ঝুকি দিয়ে শেখ ভিলার ভেতরে নজর ফেলল।
শেখ ভিলার ভেতরটা এই মুহুর্তে পুরো ফাঁকা।কিছুক্ষণ আগেই মহুয়া বেগমকে কবর দিয়ে সবাই বাড়ির মাঠে গিয়েছে।যেসব লোক এসেছে তাদের বিদায় দেওয়াতে ব্যস্ত শেখ পরিবারের সবাই।এই সুযোগেই এতক্ষণ পর শেখ ভিলায় উঁকি দিতে পারলো ছোট্ট কেউ একজন।ভেতরের সবকিছুই অনেক বড়বড় তার কাছে,এবং অপরিচিত ঠেকলো বটে।তবুও মাথা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে পরখ করতে লাগলো অন্দরমহলটা।বিস্ময় ভরা নজর ঘুরাতে নিয়েই থমকে গেল সিড়ির দিকে।সিড়ির শেষ মাথায় কল্পনা বসে আছে।কোনো এক কোণায় স্তব্ধ নয়ন ফেলে রেখেছে সে।পড়নে শুভ্রা রঙা থ্রিপিস।মাথায় ওড়না দেয়া।মেয়েটা এই যে গতকাল দুপুর থেকে স্তব্ধ হয়েছে,কেউ আর তাকে কাঁদাতে পারেনি।সাহিত্য তার সাথে কথা বলার অনেক চেষ্টা করেছে।কিন্তু কল্পনা কোনো কথা বলেনি।দাদির শোকে যেন পুরো মোমের পুতুল হয়ে গিয়েছে সে।কিন্তু বর্তমানে সেই দুঃখি মোমের পুতুলকে দেখে কারো একজনের মুখে বড় এক হাসি ফুটলো যেন।
সদর দরজায় এতক্ষণ থেকে লুকিয়ে অন্দরমহল পরখ করলেও,এবার ভালো হয়ে দরজার কাছে দাড়ালো সেই ছোট্ট প্রাণ।নিজের খালামণিকে দেওয়া আদরের ডাক নাম 'মণি' ডাকতে নিয়েই দৌড়ে আসতে লাগলো কল্পনার দিকে।দূরত্ব ঘুচিয়ে জুবুথুবু পায়ে এসে কল্পনাকে নিজের ছোট্ট দুই হাত দিয়ে জাপ্টে ধরল।কিন্তু কল্পনার যেন কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।হালকা দুলে উঠলেও বাচ্চা ছেলেটার কথায় একদম প্রতিক্রিয়া করল না।সে তো নিজের ভাবনায় ডুবে।
নিজের চঞ্চল খালার এমন চুপচাপ আচরণ দেখে ভড়কালো ছোট্ট বাচ্চাটি।কল্পনার থেকে দূরত্ব তৈরি করে বাচ্চা সুলভ কন্ঠে বলতে লাগলো,
"মণি!হোয়াট হ্যাপেন্ড?তুমি কথা বলচো না কেন?আর ইউ এঙরি উইথ মি?"
সাহিত্য বাড়ির ভেতর ঢুকতেই কল্পনার দিকে দেখলো।সামনের বাচ্চাটাকে দেখে ভ্রু কুচকালো সে।হাঁটতে নিয়েই এগিয়ে গেল সেদিকটায়।তবে বাচ্চা ছেলেটার কথা শুনে চিনতে আর দেরি হলো না তাকে।
সুবা আর তার হাসবেন্ড কিছুক্ষণ আগেই দেশে ফিরল।এতো মানুষের ভিড়ে পরিবারের সবার সাথে দেখাই হয়নি তাদের।শুধু ফাহাদ শেখের সাথে দেখা হয়েছে।সুবা তো শেখ ভিলাতেও ঢুকতে পারেনি।মেয়েটা বাইরেই কেঁদেকুটে মায়ের কাছে বসে পড়ে।এতক্ষণ পর বাড়ি ফাঁকা হতেই সুবার ছেলে ইফতি ঢুকে পড়ে শেখ ভিলায়।ছোট মানুষ সে তো আর পরিস্থিতি বুঝছে না।তাই হেসে খেলে বেড়াতে ব্যস্ত সে।
সাহিত্য এগিয়ে গিয়ে ইফতিকে কোলে তুলে নেয়।সেটাতে ইফতি বেশ ভড়কেছে।তার কিছু বলার আগেই সাহিত্য বলে উঠে,
"তোমার মণি এখন কিছু বলবে না।তার মন খারাপ আছে"
ভ্রু কুচকালো ইফতি,
"ওকে।বাট হু আর ইউ?টুমি কে?"
সাহিত্য এবার বেশ বিভ্রান্তে পড়ল।কি পরিচয় দিবে সে?মামা নাকি খালু?সময় নিয়ে বলে উঠল সাহিত্য,
"আমি তোমার আঙ্কেল হচ্ছি।তোমার মণির হাসবেন্ড"
"কল্পনার হাসবেন্ড?কল্পনার বিয়ে হয়েছে?"
পেছনে এক ছেলের কন্ঠ শুনে সাহিত্য পিছন ফিরলো।সাহিত্যের কোলে থাকা ইফতির চোখ পেছনে যেতে হাসি মুখে বলে উঠল সে,
"পাপা!!"
কথাটা বলেই সাহিত্যের কোল থেকে নামার জন্য মোচড়ামোচড়ি শুরু করে ইফতি।সাহিত্য তাকে নামিয়ে দিতেই দৌড়ে গিয়ে সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কোলে উঠে।সামনের পুরুষ সাহিত্যের দিকেই ভ্রু কুচকে দেখে আছে।আবার প্রশ্ন করল সে,
"আপনি যেন কি বললেন?আপনি কল্পনার হাসবেন্ড?"
সাহিত্য হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়,
"জ্বি।আমি অহিয়াম শেখ সাহিত্য।কল্পনার চাচাতো ভাই..আর..এখন ওর হাসবেন্ড"
সামনের ব্যক্তির মাথায় এখনো কিছু ঢুকছে না।তবু্ও সাহিত্যের সাথে হাত মিলিয়ে বলল সে,
"আমি রাহাদ আলী।সুবার হাসবেন্ড"
"আর আমার পাপা"
রাহাদের কথার পর মুহুর্তেই ইফতি হাসি মুখে কথাটা বলে উঠল।সেপাশে দেখেই সাহিত্য আর রাহাদ মৃদু ঠোঁট বাকায়।রাহাদ আবারো নজর দিল সাহিত্যের দিকে।ভ্রু কুচকে শুধালো সে,
"কল্পনার বিয়ে হয়েছে এটা আমাদেরকে জানায়নি কেন?আব্বা তো এই ব্যাপারে কিছুই বলেনি"
ঘাড় চুলকালো সাহিত্য,
"আসলে...বিয়েটা একটু আনএক্সপেক্টেডলি হয়ে গিয়েছে।আর মেঝো চাচু আপনাদের জানায়নি কেন সেটা আমিও ঠিক জানি না"
রাহাদ আর এ বিষয়টায় কথা বাড়ালো না।বাড়ির এমন খারাপ পরিবেশে এসব কথা এখন না তুলাই ভালো।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
"আমি কল্পনার বড় বোন হই!!ওর বিয়ে হয়েছে আর সেটা আমাকেই জানাওনি তোমরা!?আমার ছোট বোন কিডন্যাপ হওয়া থেকে বেঁচে গিয়ে তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে আর তোমরা আমাকে কিছুই জানাওনি?"
সুবার গর্জনে ফাহাদ শেখ একদম শান্ত,
"কিছুদিন পরে তো ডিভোর্সটা হবেই তাই তোমাকে অযথা বলার প্রয়োজন মনে করিনি"
সুবা যেন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল,
"এটা কেমন কথা!কিসব বলছো তুমি?আমার বোনের জীবন নিয়ে তোমরা চাচা-ভাতিজা কি শুরু করেছো?কল্পনাকে কি একবারও জিজ্ঞেস করেছো,যে সে কি চায়?"
"ওর জন্য কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক সেটা আমি ভালো করেই জানি সুবা!"
সুবা যেন রাগে ফুসতে লাগলো ফাহাদ শেখের কথা শুনে।কিন্তু বাবার মুখের উপর আর কথা বলতে পারছে না।সন্ধ্যার দিকে যখন রাহাদ এসে তাকে বলে যে কল্পনার নাকি বিয়ে হয়েছে তখনই রাগটা মাথায় উঠে সুবার।তার আদরের বোনের নাকি তার আদরের ভাইয়ের সাথে বিয়ে হয়েছে,আর এই খবর নাকি সুবা জানেই না।তাই তো এখন এশার নামাজের পর সুবা ফাহাদ শেখের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে চেচামেচি করে যাচ্ছে।এতো বড় একটা বিষয় তাকে কেন জানানো হয়নি?
বাবা-মেয়ের এমন ঝগড়া শাশুড়ী-জামাই সোফায় বসে শুনছে।হেনা শেখ আর রাহাদ একদম চুপচাপ।রাহাদ বরাবরই শান্ত স্বভাবের।ফাহাদ শেখ আর হেনা শেখ যখন সব ঘটনা খুলে বলে তখনই রাহাদ বিষয়টা বুঝতে পেরেছে।তবে মাহিরের ব্যাপারটা ফাহাদ শেখ এখনো বলেননি তাদের।নিজের শশুর আব্বাকে ভালো করেই চেনে রাহাদ।তিনি যখন একবার বলেছেন যে কল্পনা আর সাহিত্যের ডিভোর্স করাবে,তার মানে করাবেই।
হাতের ঘড়িতে নজর দিল রাহাদ।তার ফ্লাইটের সময় হয়ে গিয়েছে।অফিস থেকে ইমার্জেন্সি ছুটি নিয়ে এসেছে সে।তাই সুবা আর ইফতি দেশে থাকলেও রাহাদ আজই সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে।
অবশেষে রাহাদ সোফা ছেড়ে উঠে এলো।সুবাকে উদ্দেশ্য করে গমগমে কন্ঠে বলল সে,
"সুবা একটু শান্ত হও।বাসার পরিবেশ এমনিতেই ভালো নেই।আর আব্বার সাথে এমন চিল্লাপাল্লা না করে তুমি সাহিত্য আর কল্পনার সাথে কথা বলো।সেটা মনে হয় বেশি ভালো হবে"
রাহাদ সামনে এগিয়ে ফাহাদ শেখের দিকে গেল।শান্ত স্বরেই বলল সে,
"আব্বা,আপনার সিদ্ধান্তকে আমি সবসময়ই সম্মান দিয়ে এসেছি।এবারও দিব।কিন্তু দেখিয়েন আবার,কল্পনা যেন আপনার সিদ্ধান্তে ভুক্তভোগী না হয়।ও আপনার কথার উপর কখনোই কথা বলবে না।চুপ করে থাকবে সে।এই ডিভোর্সে তার মত আছে কিনা সেটা মনে হয় জানা উচিৎ"
ফাহাদ শেখ শুধু শুনেই গেলেন।কিছু আর বললেন না।সেটাতে রাহাদ ভালো করেই বুঝলো,যে ফাহাদ শেখ তার সিদ্ধান্ত থেকে এক পা-ও নড়বেন না।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
রাহাদকে বিদায় দিয়ে সুবা এগুলো সাহিত্যের রুমের দিকে।তার রাগটা এখনো নামেনি।এতো বড় বাড়ির এতোগুলো লোকজনের মধ্যে কেউ তাকে এই খবরটা দিবে না?তাকে কি পরিবার থেকে আলাদা করে ফেলেছে নাকি?
সাহিত্যের রুমের দরজায় ভারী কড়া ঘাত করতে লাগলো সুবা।সাহিত্য দরজা খুলতেই সুবার বিস্ফোরিত চোখ জোড়া দেখতে পেল।কাপা গলায় সালাম দিয়ে বসলো সে,
"আ-আসসালামু আলাইকুম আপু"
চেচিয়ে উঠলো সুবা,
"কিসের আপু-বাপু লাগিয়েছিস?একদম ন্যাকামি করবি না!তোর সাথে জরুরী কথা আছে আমার"
কথা বলতে নিয়েই সুবা সাহিত্যকে সড়িয়ে রুমে ঢুকলো।সাহিত্য আর কিছু বলল না।সুবার চেচামেচি সবার আড়াল করতেই দরজাটা লাগিয়ে দিল সে।পেছনে ঘুরে নজর দিল তার বড় বোনের উপর।
গোলগাল চেহারা।একটু স্বাস্থ্যবানই বলা চলে।গায়ের রঙ দুধে আলতা ফর্সা।চেহারা কল্পনার চেহারার সাথে মিল থাকলেও চুলগুলো কল্পনার মতো না।সেগুলো পিঠের মাঝ বরাবর।এতো বছর পর বড় বোনকে দেখে থতমত বেশ খেল সাহিত্য।প্রথমে একটু অসুবিধা হচ্ছিল চিনতে।কিন্তু এখন পরিচিত লাগছে।ওই সেই বছর কয়েক আগের বড় বোনটা তার।সাহিত্যের উপর রাগ হলেই যে কটমটিয়ে উঠত।আদরের ভাইটা ভুল কাজ করতে গেলেই এমন কটমটিয়ে উঠত সুবা।পরে আবার ঠিক আদরও করত।বলতে গেলে সুবার কারণেই তো সাহিত্য নামক ছেলেটা আজ একজন জেন্টালম্যান।
সাহিত্য মৃদু ঠোঁট বাকিয়ে বলে উঠে,
"তুই একদম আগের মতোই আছিস"
সুবা সাহিত্যকে আঙুল দেখিয়ে আবারো কটমটিয়ে উঠল,
"বললাম না,একদম ন্যাকামি করবি না!সোজা পয়েন্টে আয়।আমার বোনকে তুই বিয়ে কেন করেছিস!!??"
এবার সাহিত্য বুঝল যে সুবার রাগ উঠেছে কেন।একদম সোজা কথাতেই গেল সে।গলা খাকারি দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠেই বলে উঠল,
"তোর বোনকে আমি ভালোবাসি,তাই"
সুবার চোয়াল এক হাক ঝুলল যেন।নিজেকে সংযত করে বলল সে,
"এটা কখন হলো?তুই আবার কবে থেকে কল্পনাকে পছন্দ করিস?"
সাহিত্য এবার লাজুক আচরণ করতে লাগলো বেশ,
"ওই...আরকি...আগে থেকেই মনে হয়"
সাহিত্যের লাজুকভাব দেখে আবারো চেচিয়ে উঠলো সুবা,
"বললাম না,ন্যাকামি করবি না!আগে থেকে মনে হয়?এটা কেমন কথা?তুই জানিস না তুই কল্পনাকে কবে থেকে পছন্দ করিস?"
"অমন করে কখন পছন্দ করা শুরু করেছি আমি আসলেই জানি না!বুঝতে পেরেছি দেশে ফিরে"
সাহিত্যের কথা শুনে সুবা ভড়কালো।ভারী শ্বাস ফেলল সে।মেয়েটা বেশ ক্লান্ত।ফাহাদ শেখের কথা শুনার পর এখন আবার সাহিত্যের এসব কথা মাথায় ঢুকাতে একটু অসুবিধা হচ্ছে তার।বিছানায় বসে পড়ল সে।এতক্ষণ পর শান্ত স্বরে বলল,
"বাবা যে তোদের ডিভোর্স করাতে চাচ্ছে সেটা জানিস?"
উপর-নিচ মাথা ঝাকালো সাহিত্য।সুবা আবার বলল,
"কল্পনা যদি ডিভোর্সের জন্য রাজি হয়ে যায়?"
সাহিত্য মেকি হেসে চেয়ারে বসে পড়ল,
"তোর বোনটা আমাকে ভালোবাসে রে"
"কল্পনা তোকে মুখে বলেছে সেকথা"
"কল্পনা আমাকে মুখে কিছুই বলে না।ওর চোখ দেখে বুঝি আমি"
"তাহলে তোর এটাও বুঝার কথা যে কল্পনা বাবার কথার বিরুদ্ধে একদমই যাবে না"
"কল্পনা যদি আমাকে না-ই ভালোবাসতো তাহলে এতোদিনে সে নিজেই ডিভোর্সের কথা বলত"
ভারী শ্বাস ফেলল সুবা।সময় নিয়ে বলল সে,
"আমি জানি না ভবিষ্যতে কি হতে যাচ্ছে।কিন্তু নিজেকে প্রিপেয়ার্ড রাখিস।আগে নাহয় দাদি ছিল।এখন আর সে-ও নেই যে বাবাকে থামাবে।বাবা কিন্তু যেকোনো সময় অ্যাকশন নিতে পারে"
সুবার কথা শুনে সাহিত্য কিছু বলল না।মেকি হাসলো শুধু।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
মহুয়া বেগম শেখ ভিলা থেকে বিদায় নেওয়ার দুই দিন হচ্ছে।বাড়ির পরিবেশ তেমন একটা ভালো না।তবে যখন সবাই একটু স্বাভাবিক হতে যাচ্ছে তখনই কল্পনার দিকে দেখে যেন আর সেই স্বাভাবিকটাও হতে পারছে না।কল্পনা গতকাল এই যে দুপুরের খাবার খেয়ে মহুয়া বেগমের রুমে গিয়ে ঢুকেছে আর বের হয়নি।খোলা দরজা থেকে দেখা যায় যে কল্পনা বিছানায় শুয়ে আছে।কিন্তু কোনো নড়চড় দেখা যায়না মেয়েটার।এমনকি সে চোখ থেকে এক ফোটা পানিও গড়ায়নি।শুকনো চোখে কেমন যেন নিঃপ্রাণ ব্যবহার করছে।
শেখ আহমেদরা চাকরি জীবনে ফেরত গেলেও সাহিত্য তার প্রেয়সীর আশেপাশেই আছে।ছেলেটা যেন হাসফাস করছে একদম।দুপুর গড়িয়ে এলো কিন্তু কল্পনা এখনো কিছু খায়নি।অবশেষে সাহিত্য কল্পনার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।আলতো করে ডাকতে লাগে তাকে।কিন্তু কল্পনা যেন নিশ্চুপ।যেন সে কিছুই শুনছে না।এই দুই দিনে মেয়েটার চোখ-মুখগুলোও কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে।
সাহিত্য এবার বাধ্য হলো কল্পনাকে টেনে তুলতে।মেয়েটা যে শরীরটাও ছেড়ে দিয়েছে।তারপরও সাহিত্য তাকে কোলে তুলতে নিয়েই বলে উঠল,
"জানপাখি আমার,এমন করিস না তো।কষ্ট হচ্ছে আমার।কিছু একটু খেয়ে নে তো..."
"আমি দাদির শেষ ইচ্ছাটা পুরন করতে পারলাম না"
হঠাৎ কল্পনার ভাঙা মিনমিনি কন্ঠে এমন এক কথা শুনে সাহিত্য কল্পনাকে কোলে নিয়েই বিছানায় ধপ করে বসে পড়ে।পুরো হতবম্ব হয়ে গিয়েছে সাহিত্য।এর মাঝেই কল্পনা সাহিত্যের টি-শার্টের কলারটা এক হাতের মুঠোয় নিয়ে বুকে মাথা গুজলো।গলা ছেড়ে কেঁদে উঠলো মেয়েটা।ভাঙা গলায় বলতে লাগলো,
"আমি দাদির শেষ ইচ্ছাটা পুরোন করতে পারলাম না সাহিত্য ভাই।আমি দাদির শেষ ইচ্ছাটা পুরন করতে পারলাম না!দাদি আমার কাছে একটা আবদারই করেছিল।আমি সেটাই করতে পারলাম না।কতটা অপদার্থ আমি!!আমি নিজেকে মুখ দেখাবো কেমন করে?আমি বেঁচে থাকবো কেমন করে?"
কান্নার তোপে কেপে-কেপে উঠছে কল্পনা।আর তার সাথে সাহিত্যও হালকা নড়ে উঠছে।এবার যেন তারও চোখ থেকে ঝড়ঝড়িয়ে পানি গড়তে শুরু করে।অপলক একদিকে দেখে আছে সে।
কল্পনার হঠাৎ এমন কান্নায় বাড়ির সবাই চমকে উঠেছে যেন।গিন্নিরা তো দৌড়ে এসেছেন রুমের দিকে।তবে সাহিত্যের এমন হতবম্ব হয়ে বসে থাকা আর কল্পনা কান্না করা দেখে তারাও আর থাকতে পারলেন না।দরজার কাছে দাঁড়িয়েই মুখে আঁচল গুজে কাঁদতে লাগলেন তারা।কল্পনার এমন কান্না দেখে হেনা শেখ তো মেঝেতে বসে পড়েছেন একদম।সুবা ওদিকে সোফায় বসে ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়েই চোখের জল ফেলছে।এই শেখ ভিলাটা মনে হয় কখনোই সুখি থাকবে না।
কল্পনা কাঁদতে-কাঁদতে হঠাৎই যেন থেমে গেল।সাহিত্যের টি-শার্টের কলারটাও ছেড়ে দিল একদম।ভড়কালো সাহিত্য।কল্পনার দিকে নজর দিতেই দেখলো কল্পনা জ্ঞান হারিয়েছে।একদম ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল সে।কল্পনার গালে-মুখে হাত দিয়ে ডাক দিল কয়েকবার।কিন্তু কল্পনা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।কল্পনাকে বিছানায় শুয়ে দিয়ে অন্তর উদ্দেশ্যে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিল সাহিত্য,
"অন্ত!মুহিত আঙ্কেলকে তাড়াতাড়ি কল কর!অন্ত!!"
সুবাও এবার উঠে এসেছে সোফা থেকে।রুমে এসে দেখলো কল্পনা জ্ঞান হারিয়েছে।সাহিত্যকে শান্ত হতে বলল সে,
"সাহিত্যকে শান্ত হ একটু।ও কাল থেকে কিছু খায়নি দেখেই সেন্স হারিয়েছে"
হুংকার দিয়ে উঠল সাহিত্য,
"শান্ত হবো?ওর অবস্থা দেখেছিস?বাসার মানুষজন ওর খেয়াল রাখতে পারে না,আবার আমাকেও দূরে থাকতে বলে ওর থেকে!কল্পনার এমন অবস্থা দেখে খুব শান্তি পাচ্ছে,তাই না?ওর কিছু হলে কাউকে ছাড় দিব না আমি!!"
কথা শেষেই সাহিত্য কল্পনাকে কোলে নিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে কল্পনার রুমের দিকে এগোয়।সুবা সাহিত্যের প্রতিউত্তরে কিছু বলল না।কারণ সে জানে সাহিত্য সেই কথাগুলো তাকে নয়,বরং তোফায়েল শেখ ও ফাহাদ শেখকে ইংগিত করে বলেছে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সুবা শেখ ভিলায় আসার ১১দিন হচ্ছে।আর কিছুদিন পরেই তার অফিসের ছুটি শেষ হবে।তাই সে চিন্তা করেছে নানাবাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসা থাক।মহুয়া বেগমের দোয়া পড়ায় শিকদার বাড়ির সবাই এসেছিল।কিন্তু ব্যস্ততার কারণে সেদিনই চলে যান সবাই।কল্পনার সাথে কারো দেখা হয়নি।বলতে গেলে কল্পনা নিজেই দেখা করেনি।মেয়েটা সেই সময় তেমন অবস্থায় ছিল না।
দুপুরের দিকেই সুবা ইফতিকে নিয়ে শিকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।কল্পনাকে তার সাথে যেতে বললে কল্পনা মানা করে দেয়।এমন খারাপ সময়ে সে এখনই বাড়ি থেকে বের হতে চায় না।সুবাও আর জোর করেনি।
সাহিত্য বেশ কয়েকদিন থেকেই অফিসে যাচ্ছে।বাসা ফিরছে অবশ্য দেরি করে।বাসায় এসে ফ্রেশ হয়েই আগে কল্পনার রুমে ঢুকবে।মেয়েটা ইদানীং তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে।বাসার তেমন কারো সাথে কথাও বলে না।অনেকটা চুপচাপ হয়ে গিয়েছে।
রাত বাজে ১টার আড়পার।সাহিত্য শেখ ভিলায় প্রবেশ করল মাত্র।নিজের রুমের দরজা খুলে বেশ হতবম্ব হলো সে।কল্পনা বিছানায় বসে।প্রথমে চমকালেও পর মুহুর্তেই মুখে মৃদু হাসি নিয়ে তার দিকে এগোয় সে,
"কি ব্যাপার জানপাখি?তুই আজ হঠাৎ এখানে কেন?"
কল্পনার টনক নড়তেই সাহিত্যের দিকে ঘুরলো।ক্লান্ত চেহারাটায় হালকা হাসার চেষ্টা করেই বলল,
"এমনি এসেছিলাম।রুমে ভালো লাগছিল না"
সাহিত্য এসে কল্পনার পাশে বসে।আলতো হাতে গাল ছুয়ে দেয় তার।মেয়েটার মুখটা কেমন শুকিয়ে গিয়েছে।চোখগুলো কোটরে ঢুকেছে যেন।
কল্পনা বলে উঠল,
"রাতের খাবার খেয়েছেন আপনি?"
না সুচকে মাথা নাড়ালো সাহিত্য।সাথে জিজ্ঞেসও করল,
"তুই খেয়েছিস?"
মৃদু ঠোঁট বাকিয়ে কল্পনাও না সুচকে মাথা নাড়ায়।সেটা দেখেই বলল সাহিত্য,
"যা খাবার নিয়ে আয়"
ভ্রু কুচকায় কল্পনা,
"এখানে?"
"হুম।আমাকে খাইয়ে দিবি,সাথে নিজেও খাবি"
কল্পনা ভড়কালো যেন,
"আ-আমি আপনাকে খাইয়ে দিব?"
সাহিত্য উঠে দাড়ালো।কাবার্ড থেকে কাপড় নিয়ে পড়নের শার্টের বাটোন খুলতে নিয়েই ওয়াশরুমের দিকে এগুলো সে,
"হ্যাঁ।এখন চুপচাপ খাবার নিয়ে আয়।আমার ক্ষুধা পেয়েছে"
আর কিছু বলল না কল্পনা।মৃদু হাসলো শুধু।
সাহিত্য ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই দেখলো কল্পনা খাবার নিয়ে হাজির।প্লেটে করে খাবার নিয়ে বসে আছে সে।তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে সাহিত্য গিয়ে বসলো বিছানায়।কল্পনা তার পরপরই এক লোকমা উঠে ধরল সাহিত্যের সামনে।
সাহিত্যের চোখে যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।তার বউটা এতো ভদ্র কবে থেকে হলো?কল্পনার দিকে নজর রেখেই ভাতের লোকমা মুখে নিল সে।ভাত চাবাতে নিয়েই অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,
"কি ব্যাপার?তোর মাথার তার ছিরেছে নাকি?"
"না।জোরা লেগেছে"
কল্পনার কথায় সাহিত্য বেশ বিষম খেল।কল্পনা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পানির গ্লাস বাড়িয়ে দিল তার দিকে।পানি খেয়ে বলল সাহিত্য,
"কি বললি?"
মাথা নিচু রেখেই কল্পনা ডানে-বামে ঝাকালো।সাহিত্য অন্যদিকে ঘুরে মিটিমিটি হেসে নিল একবার।বুঝলো যে তার বউটা ঠিক হয়ে আসছে হয়তো।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
ফাহাদ শেখ কল্পনাকে রুমে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।সেটাতেই কল্পনা এখন ফাহাদ শেখের রুমে।রুমে ঢুকে একবার মায়ের দিকে দেখে নিয়ে বাবা দিকে নজর দিল কল্পনা,
"বাবা ডাকলে?"
ফাহাদ শেখের গমগমে কন্ঠ,
"ব্যাগ গুছিয়ে নাও।আমরা তোমার নানাবাড়ি যাচ্ছি"
ভ্রু কুচকালো কল্পনা,
"কেন বাবা?কোনো সমস্যা?"
ফাহাদ শেখ এবার মাথা ঘুরিয়ে নজর দিলেন কল্পনার দিকে,
"তোমার ডিভোর্স হওয়ার পর মাহিরের সাথে তোমার বিয়ে হবে,তাই"
কল্পনা যেন আকাশ থেকে পড়ল।ফাহাদ শেখ কি বলছেন তার কানে বিশ্বাস হচ্ছে না যেন।হঠাৎ করে ডিভোর্সের ব্যাপার কই থেকে উঠল?
কল্পনা কাপা পা নিয়ে এগিয়ে গেল ফাহাদ শেখের দিকে,
"মা-মাহির ভাইয়া একটা ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করবে?"
"করবে।ওর সাথে আমার কথা হয়েছে।এমনকি শিকদার বাড়ির সবার সাথে কথা হয়েছে।আমি তো চেয়েছিলাম বিয়ের দিনই তোমার ডিভোর্স করিয়ে নেই।কিন্তু আম্মার জন্য সম্ভব হয়ে উঠেনি।ওই বেয়াদব ছেলের সাথে আমি তোমার সংসার মেনে নিব না।তাড়াতাড়ি ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হও।আমরা আজই বের হবো।আমি তোমার মুখে 'না' কথাটা যেন না শুনি"
কল্পনার অধর যেন কেপে উঠল ফাহাদ শেখের শেষের কথায়।ছলছল নয়নে একবার হেনা শেখের দিকে দেখলো সে।হেনা শেখ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বসে রয়েছেন।কল্পনা আর কিছু বলল না।কাপা পায়ে নিজের রুমের দিকে এগুলো সে।নজর পড়ল সাহিত্যের রুমের দিকে।সেপাশে দেখে দু'ফোটা চোখের জল ফেলল।সেটা করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলো না।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
অন্ত হুড়মুড়িয়ে দরজা খুলে সাহিত্যের রুমে ঢুকলো,
"ভাইয়া!কল্পনা ওর নানাবাড়ি যাচ্ছে!"
সাহিত্য ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো অন্তর দিকে,
"যাক একটু ঘুরে আসুক।সুবাও আছে ওখানে,কিছুদিন থাকলে মনটা হালকা হবে তার"
মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে আবার ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে বলল অন্ত,
"মেঝো বাবা নিয়ে যাচ্ছে!তোমাদের ডিভোর্স করিয়ে কল্পনার মামাতো ভাইয়ার সাথে বিয়ে দিবে ওকে!"
এবার আর সাহিত্য শান্ত থাকলো না।'কিহ্' বলে হুড়মুড়িয়ে উঠে দাড়ালো সে।সাথে ছুটলো নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।অন্তও তার পিছনে ছুটলো।
সাহিত্য নিচে এসে দেখলো কল্পনা ইতোমধ্যেই শেখ ভিলা থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দরজায় গিয়েছে।সেটা দেখেই সাহিত্য দোতলা থেকেই হুংকার ছুড়লো,
"কল্পনা!!"
কল্পনার সাথে হেনা শেখ ও ফাহাদ শেখও সাহিত্যের হুংকারে চমকে উঠে।তিনজনই পেছন ফিরল।
সাহিত্য এসে কল্পনার দুই বাহু চেপে ধরল,
"কই যাচ্ছিস তুই?আমাকে রেখে কই যাচ্ছিস তুই!?"
কল্পনা নিশ্চুপ থাকলেও কল্পনার পেছন থেকে ফাহাদ শেখ উঁচু গলায় বলে উঠলেন,
"একদম আমার মেয়ের কাছে আসবে না!তোমার মতো ছেলের থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছি ওকে"
সাহিত্য এবার ফাহাদ শেখের দিকে দেখে হুংকার ছুড়লো,
"পারবেন না!কল্পনাকে আমার থেকে দূরে নিয়ে যাওয়ার সাহস হয় কেমন করে আপনার?কল্পনা কখনোই আমাকে ছেড়ে যাবে না"
কথাটা বলেই সাহিত্য কল্পনার দুই গাল আগলে ধরে।
"জানপাখি প্লিজ কথা বল।প্লিজ যাস না।কিজন্য তুই চাচুর কথা শুনছিস?"
ফাহাদ শেখ কল্পনার এক হাত ধরে টান দিলেন,
"কল্পনা চলো এখান থেকে!এই ছেলের কাছে তুমি আর এক মুহুর্তও থাকবে না"
ফাহাদ শেখ কল্পনাকে হেচকা টান দিতেই সাহিত্য কল্পনার আরেক হাত ধরে ফেলল।কল্পনার উদ্দেশ্যে আবার বলে উঠল সে,
"প্লিজ যাস না"
"হাতটা ছাড়েন"
কল্পনার নজর ঝুকিয়ে মিনমিনি কথায় কেপে উঠল সাহিত্যের হাত জোড়া,
"কি বলছিস তুই!কল্পনা এটা অন্যের কথা শুনার সময় নয়।তুই তোর মনের কথা কবে শুনবি?"
কল্পনা সাহিত্যের হাতে আবদ্ধ থাকা হাতটা মোচড়াতে লাগলো।ভাঙা গলা নিয়ে বলল সে,
"হাতটা ছাড়েন বলছি"
সাহিত্য ছাড়লো না কল্পনার হাত।চোখ থেকে অঝোরে পানি ফেলতে নিয়ে মেঝেতে হাটু ভেঙে বসে পড়ল সে।ভাঙা গলায় বলে উঠল তার প্রেয়সীর উদ্দেশ্যে,
"প্লিজ জানপাখি।মরে যাবো আমি।তোকে ছাড়া বেঁচে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়"
সাহিত্যের চোখে পানি দেখে কল্পনার ছলছল চোখ জোড়া যেন অবাক হলো বেশ।মেয়েটার নিচের ঠোঁটখানা তিরতির করে কাপতে লাগলো।ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়ে আবার বলে উঠল সাহিত্য,
"তোকে ছাড়া আমি সত্যিই মরে যাবো"
সাহিত্যের কথাটা শেষ হতেই ফাহাদ শেখ কল্পনার হাতটা ধরে হেচকা টান দেন।তাতেই সাহিত্যের কাপা হাত থেকে কল্পনার হাতটা যেন ছুটে গেল।সাহিত্য ও কল্পনার নজর এখনো একে-অপরের মাঝে আবদ্ধ।কিন্তু দূরত্ব যেন বেড়েই যাচ্ছে ক্ষণে-ক্ষণে।সাহিত্য আর কিছুই যেন বলছে না।স্তব্ধ নয়নে দেখে থাকলো তাকে ছেড়ে চলে যাওয়া তার প্রেয়সীর দিকে।
#চলবে