ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৯২তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৯২

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

মাহির বিস্ময় ভরা চোখ তুলে কল্পনার দিকে দেখতে লাগলো।কল্পনা এখনো আকাশ পানে তাকিয়ে।আবছা অন্ধকারে কল্পনার ঠোঁটের হালকা হাসিটা স্পষ্ট।সেই স্নিগ্ধ হাসির দিকে মাহিরের বিস্ময় ভরা চোখগুলো দেখে থাকলো কিছুক্ষণ।অতঃপর মেকি হেসে মাথা নিচু করল সে।ভেতরের হৃদয় পোড়া ভারী এক শ্বাস ছাড়লো যেন।ঠোঁটের হাসি রেখেই ভাঙা কন্ঠে বলে উঠল,

"নিজেকে তোর সামনে উপস্থাপন করতে আমি মনে হয় একটু বেশিই দেরি করে ফেলেছি।যা আমাকে আমরণ ভোগাবে"

কথাটা বলতে নিয়েই মাহিরের গলা ভেঙে এলো।মুখ থেকে সুক্ষ্ম হাসিটাও চলে গিয়েছে তার।

কল্পনা মাথা ঘুরিয়ে মাহিরের দিকে দেখলো।মাহিরের বলা সুক্ষ্ম কথাটা বোঝার অনেক চেষ্টা চালাচ্ছে সে।কিন্তু বুঝে উঠছে না যেন।বর্তমানে হয়তো মাহিরের মন গহীনের দুঃখরা তার মুখোশ্রিতে বিরাজ করেছে।কিন্তু রাতের ভারী অন্ধকারে কল্পনার চোখের আড়াল হয়েই থাকলো সেই মুখোশ্রি।

কল্পনা কেবলই মুখ খুলেছিল কিছু বলবে বলে।কিন্তু মাহির সেটার সুযোগ দিল না।ছাদের দরজার উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল সে।কল্পনা দেখে থাকলো মাহিরের যাওয়ার পানে।

মাহির ছাদ থেকে নিচে এসে সোজা ভাবনা শিকদারের কাছে এসেছে।আরাফাত শিকদার ড্রইং রুমে থাকলেও ভাবনা শিকদার রুমেই ছিলেন।হঠাৎ মাহিরকে দেখেও কিছু বললেন না তিনি।মৃদু ঠোঁট বাকালেন শুধু।কিন্তু মাহিরের বিরক্তিতে ভরপুর মুখোশ্রি দেখে ভ্রু কুচকালেন তিনি।জিজ্ঞেস করে বসলেন,

"কিরে?মুখটা অমন প্যাচার মতো করে রেখেছিস কেন?"

বিরক্তিতে ভরা মুখোশ্রি নিয়েই মাহিরের সোজা কথা,

"আমি কল্পনাকে বিয়ে করব না"

ভড়কালেন ভাবনা শিকদার।হাতে সেলাই করতে থাকা কাপড় বিছানায় রাখলেন তিনি,

"মানে?হঠাৎ কি হলো?"

"আমি কোনো ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করব না"

ছেলের এমন কথায় চমকালেন ভাবনা শিকদার।গিয়ে আগে রুমের দরজা লাগালেন।অতঃপর মাহিরের সামনে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন তিনি,

"তুই এগুলো কি বলছিস মাহির?ওটা আমাদের কল্পনা।আর...তুই না বলেছিলি তুই কল্পনাকে পছন্দ করিস?তো এখন এমন বলছিস কেন?"

মাহির বিরক্তিতে মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করল,

"মেয়ের কি অভাব পড়েছে?আমাকে একটা ডিভোর্সি মেয়েকেই কেন বিয়ে করতে হবে?"

ভাবনা শিকদার ছেলের বাহুতে হাত রাখলেন।তার ছেলেটা তো এমন নয়।একমাত্র ছেলে হওয়ার পরেও যথেষ্ট আদব শিখিয়েছেন তিনি।আর আজ হঠাৎ করে এমন আচরণ করছে কেন তার ছেলেটা?

ভাবনা শিকদার ছেলের কপালে-মুখে হাত বুলাতে লাগলেন।কোমল কন্ঠে বললেন তিনি,

"তুই কল্পনার ব্যাপারে কখনোই এমন কথা বলবি না সেটা আমি ভালো করেই জানি মাহির।কি হয়েছে সোনা?কেউ কিছু বলেছে?মাকে বলবি না?"

মায়ের মমতায় মাহির আর নিজের মনের কষ্ট ধরে রাখতে পারলো না।মাকে জাপ্টে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো ছেলেটা।এতো বড় ছেলের এমন হঠাৎ করে কেঁদে উঠা দেখে ভড়কালের ভাবনা শিকদার।ছেলের মাথায় হাত বুলাতে নিয়েই বললেন তিনি,

"সোনা কি হয়েছে?এমন কাঁদছিস কেন?"

মাহির মায়ের গলায় মুখ গুজে কাঁদতে নিয়েই বলল,

"কল্পনা সাহিত্যকে ভালোবাসে মা।কল্পনা সাহিত্যের সাথে সুখে থাকবে।আমি চাইনা আমার সাথে বিয়ে হয়ে সে অসুখি থাকুক।আমার কল্পনাকে আমি অসুখি দেখতে চাই না মা।আমি চাই আমার কল্পনা যেন সুখে থাকে।কিন্তু তার সুখ অন্য কারো সাথে।সে অন্য কারো সাথে সুখি থাকবে মা।সে আমার সাথে সুখি থাকবে না"

কথা শেষে মাহির আবারো হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।ভাবনা শিকদারের চোখ থেকে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল যেন।অবাক হলেন তিনি তার ছেলের কথা শুনে।কাউকে এতোটা ভালোবাসা কি করে সম্ভব?যে কিনা নিজের ভালোবাসা বিসর্জন দিচ্ছে শুধুমাত্র তার ভালোবাসার মানুষটাকে সুখে রাখার জন্য।

চোখের পানি ফেলতে নিয়েই ভাবনা শিকদার হালকা ঠোঁট বাকালেন।ছেলের মাথায় হাত বুলাতে নিয়েই নিজেকে একজন যোগ্য মা হিসেবে বিবেচনা করে বসলেন আজ।তিনি তার ছেলেকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

কল্পনা তার রুমেই ছিল।এমন সময় নূপুর এসে রুমে ঢুকে।মেয়েটা আমতা-আমতা করছে।কল্পনা ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করল,

"কি হয়েছে?"

"ওই..তোমার চাচাতো ভাইটা এসেছে।অন্ত না কে যেন।বলছে...সাহিত্য ভাইয়া নাকি এক্সিডেন্ট করেছে"

এক্সিডেন্ট কথাটা শুনতেই বুকটা ধক করে উঠল কল্পনার।দৌঁড়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল সে।সিড়ি বেয়ে ড্রইং রুমে একদম অন্তর সামনে গিয়ে থামলো।আশেপাশের সবাইকে তোয়াক্কা না করেই অন্তর উদ্দেশ্যে বলে উঠল,

"উনি এক্সিডেন্ট করেছে মানে?কি বলছো তুমি?কেমন করে করল?কোথায় আছে এখন?"

কল্পনা হাত ধরে ঝাকুনি দেওয়াতে বেশ ঝাকি খাচ্ছে অন্ত।ছেলেটা কল্পনার সাথে চোখ মিলাতে পারছে না।কল্পনার হাতের উপর হাত রেখে বলে উঠল সে,

"হসপিটালে আছে।তোকে দেখতে চাচ্ছে"

অন্তর কথা শুনেই কল্পনা ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে।বাকি সদস্যরা অন্তর দিকে বিস্ময় ভরা নজরে দেখে আছে।মাহির করিডোরে ছিল।অন্তর কথা শুনে সেখানেই থম মেরে থাকে সে।ফাহাদ শেখও যেন স্তব্ধ দাড়িয়ে।

কল্পনা নিঃশব্দে চোখের জল ফেলল।পর মুহুর্তেই চোখের পানি হাতে মুছে উঠে দাড়ালো সে,

"চলো"

কল্পনার কথায় সবাই নজর ঘুরালো কল্পনার দিকে।কল্পনা ইতোমধ্যেই অন্তর হাত ধরে টানতে ধরেছে।অমনি ফাহাদ শেখ গর্জে উঠলেন,

"কল্পনা!ও এখন কেউ হয় না তোমার!"

অন্ত দেখে আছে ফাহাদ শেখের দিকে।কল্পনা অন্তর দিকে দেখে ফাহাদ শেখের দিকে করুন চোখে দেখলো।ভাঙা গলায় বলে উঠল মেয়েটা,

"প্লিজ বাবা।একবার শুধু দেখে আসি"

এক ধাপ পিছাতে বাধ্য হলেন ফাহাদ শেখ।গত ১২টা দিনে এই প্রথম তিনি তার মেয়ের মুখে কথা শুনছেন।আর সেটা যেন সাহিত্যকেই নিয়ে।ফাহাদ শেখের চুপ করে থাকা দেখে কল্পনা আর কিছু বলল না।অন্তর আগেই বাসা থেকে বেড়িয়ে গেল সে।

মাহির করিডোর থেকে আর নিচে নামলো না।নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলতে নিয়েই করিডোরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিল সে।নজর তার কল্পনার যাওয়ার পানে।কল্পনা হয়তো শুধু শিকদার বাড়ি থেকে নয়,সাথে মাহিরের জীবন থেকেও বেড়িয়ে যাচ্ছে।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

আজ সাহিত্যের রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিন থেকে সাহিত্য নয়,বরং তার অর্ধাঙ্গিনী নামলো।গ্যারেজ থেকে ছুটে হসপিটালে ঢুকেছে মেয়েটা।অন্তর পিছে পিছে কেবিনের সামনে গেল।অন্ত দরজায় দাঁড়িয়ে থাকলেও কল্পনা বিনা বাধায় দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে।কান্নারত মুখোশ্রিটা যেন থমকে গেল তার।

বেডের পাশে একটা চেয়ারে ভিকি বসে আছে।বেশ ক্লান্ত লাগছে তাকে।তবে চেহারায় বেশ বিরক্তির ছাপ।আর সেই বিরক্তির ছাপটা তৈরি হয়েছে বেডের উপর বসে থাকা সাহিত্যের দিকে দেখে।যে কিনা বেডে পা ভাজ করে বসে আপেল ছিলতে ব্যস্ত।পড়নে হসপিটালের কাপড় আর মাথায় সুক্ষ্ম একটা ব্যান্ডেজ প্যাচানো।

কল্পনা রুমে ঢুকতেই দুজনে দরজার দিকে নজর দেয়।সাহিত্য তো কল্পনাকে দেখা মাত্রই কাঁদো গলায় বলে উঠল,

"জানপাখিইই।এসেছিস তুই?"

তবে ভিকি কল্পনার দিকে দেখে ঝাজিয়ে উঠল,

"এসেছো!?সামলাও তোমার স্বামীকে!পাগল হয়ে গিয়েছে এটা।আমি আমার বউ আর ছেলেকে রেখে ইমার্জেন্সি ফ্লাইট নিয়ে বিডিতে এসেছি।আমাকে কল দিয়ে বলছে ভাই আমি গুরুতর এক্সিডেন্ট করেছি।তাড়াতাড়ি আয়।শালা এসে দেখি মাথায় পট্টি লাগিয়ে বসে আছে"

সাহিত্য এখনো আপেল ছিলায় ব্যস্ত,

"তো তোর ছেলের নাম কি রাখলি?"

ভিকি সাহিত্যের দিকে ঘুরে তেতে উঠল যেন,

"ভিভান্দ চৌধুরী!তোর মেয়ে হলে নির্ঘাত ওটাকে তোর মেয়ের জামাই বানাবো।আমাকে এখন যেগুলো জ্বালাচ্ছিস সব হাড়ে-হাড়ে সোধ নিব একদম!"

ঠোঁটে হাসি নিয়ে সাহিত্য ভিকির দিকে দেখলো,

"কি যে বলিস না!আমার মেয়েকে তুই আর তোর ছেলে রানির মতো রাখবি।সেটা ভালো করেই জানা আছে আমার"

গর্জে উঠল ভিকি,

"তোর গলা টিপে ধরব আমি!!কানাডা থেকে এখানে আসা চারটি খানি কথা?জীবনটা শেষ হয়ে গেল আমার!তোর এই ন্যাকামোতে আমার বারোটা বাজছে"

হাসি সড়িয়ে চেহারাখানা মাসুম করল সাহিত্য,

"এমন করে বলছিস কেন?গাড়ি জোরে ব্রেক করায় স্টেয়ারিংয়ে মাথা লেগে একটু কেটে গিয়েছিল।আর এই রাজ আমাকে হসপিটালে ভর্তি করিয়ে গিয়েছে।ভাবলাম এই সুবাদে কল্পনাকে ফেরত নিয়ে আসা যাবে।তখন তোর কথাও মনে পড়ল।তোকেও তো অনেকদিন থেকে দেখিনি।তাই ডেকেছি।এখন আমি একটু দেখতে চাইলেই দোষ?আমার বউ আর বেস্টফ্রেন্ডকে কি আমি এখন একটু দেখতেও পারবো না?"

ভিকি চেয়ার থেকে উঠে দাড়ালো,

"অহি তুই আসলেই পাগল হয়ে গিয়েছিস!আমি এখন কানাডায় ব্যাক যাচ্ছি।খবরদার যদি এমন আর ফাজলামি করেছিস!"

সাহিত্যকে আঙুল দেখিয়ে ভিকি এগুলো দরজার দিকে।কল্পনা চোখে জল নিয়ে ড্যাবড্যাব করে দেখে আছে।ভিকি পাশে আসতেই তার দিকে দেখতে লাগলো সে।মেয়েটা যেন এখনো কিছুই বুঝছে না।ভিকি বুঝলো কল্পনার অবস্থা।মেয়েটা নিশ্চয়ই অনেক ভয় পেয়েছিল।

ভারী শ্বাস ফেলল ভিকি।কল্পনার উদ্দেশ্যে বলল,

"টেনশন নিও না।অহির তেমন কিছুই হয়নি।কয়েকদিন থেকে তোমাকে দেখার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছে তাই ডেকেছে"

কল্পনা ভিকির থেকে নজর ঘুরিয়ে সাহিত্যের দিকে দেখলো।সাহিত্য ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে কল্পনার দিকেই তাকিয়ে।ভিকি ওদিকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছে।

কল্পনা কাপা পা নিয়েই এসে সাহিত্যের সামনে বসলো।নজর দিল সাহিত্যের মাথার ব্যান্ডেজের দিকে।এক হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল সে জায়গাটা।পর মুহুর্তে মাথা নিচু করে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল একদম।সাহিত্যের মাথায় ঠেকানো ক্লান্ত হাতটা আলগোছেই ধীরে-ধীরে সাহিত্যের বুকে নেমে এলো।

কল্পনার এমন কান্না দেখে ভড়কে গেল সাহিত্য।কাঁদতে থাকা কল্পনাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল সে।হালকা হেসে বলে উঠল,

"আল্লাহ,কাঁদছিস কেন?মিথ্যা বলেছি দেখে রাগ করেছিস?"

কল্পনা না সুচকে মাথা নাড়ালো,

"আপনার কিছু হয়নি দেখে কাঁদছি।যদি বড় কিছু হয়ে যেত?দেখেশুনে গাড়ি চালাবেন না?"

সাহিত্য কল্পনার আদল দুই হাতের মুঠে পুড়ে নেয়।কল্পনার ভেজা দুই গালে টুকরো চুমু বসিয়ে দিল সে।অতঃপর বলে উঠল,

"তুই আমার কাছে থাকলে আমার কিচ্ছু হবে না"

সাহিত্যের বুকে জোরে ধাক্কা দিল কল্পনা,

"এখন বলেন মিথ্যা বলেছেন কেন?আমি কত ভয় পেয়েছিলাম জানেন?"

সাহিত্য কল্পনার ধাক্কা সামলে নিয়ে বলে উঠল,

"তো আর কি করতাম?তোর কারণে আমার কোম্পানির কতগুলো লস হয়েছে জানিস!"

কল্পনা পিটপিট করে সাহিত্যের দিকে দেখলো,

"আমার কারণে?সেটা কেমন করে?"

"ওমাহ্,সকালে অফিস যাওয়ার আগে চুমু পাই আমি,যে অফিসে গিয়ে মাথা ঠিক থাকবে আমার?"

তেতে উঠল কল্পনা,

"ফাজলামো করার আর জায়গা পান না,তাই না?এমন এক্সিডেন্টের কথা কেউ বলে?শুধু আমি কেন?সবাই চিন্তায় পড়ে গিয়েছে।বাবা যদি জানতে পারে আপনার তেমন কিছুই হয়নি তাহলে তো আরেক সমস্যা হবে"

সাহিত্য সরু চোখে দেখতে লাগলো কল্পনাকে,

"শশুর আব্বাকে হার্ট অ্যাটাক দেওয়ার জন্যই এটা করেছি।তুই তো মুখ ফুটে কিছু বলিস না।তাই আজ তোকে এখানে নিয়ে এসে দেখিয়ে দিয়েছি তাকে।আর..তুই আর তোর নানাবাড়ি যাচ্ছিস না।তুই এখন আমার সাথে শেখবাড়ি যাবি"

কল্পনা চমকে উঠল,

"কি সব বলছেন আপনি।বাবা রাগ করবে অনেক"

"আমি কোনো কিন্তু শুনবো না।তুই আমার কাছে চলে এসেছিস সেটা দেখেই সবাই তাদের উত্তর পেয়ে গিয়েছে"

কল্পনা আর কিছু বলল না।মাথা নিচু করে রয়েছে সে।সাহিত্য বুঝলো তার প্রেয়সীর মন খারাপের বিষয়।তাকে হাসাতেই বলে উঠল যেন,

"জান,একটা চুমু দে না"

কল্পনা ফিক করে হেসে উঠল।মাথা তুলে বলে উঠল সে,

"কোনো চুমু পাবেন না আপনি।আমাকে মিনি হার্ট অ্যাটাক দেওয়ার শাস্তি এটা আপনার জন্য।আগামী ৩দিন কোনো চুমু নেই"

সাহিত্য বুকে হাত রেখে বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

"তিন!দিন!তুই জানিস তিন দিনে কত ঘন্টা হয়?কত মিনিট হয়?কত সেকেন্ড হয়?আমি অত সময় অপেক্ষা করতে পারবো না।আমার এখনই একটা চুমু লাগবে!"

কল্পনা মাথা ঝাকিয়ে বলল,

"একদম না"

অমনি কল্পনাকে জাপ্টে ধরল সাহিত্য।কল্পনা ভড়কালো বেশ।হেসেও উঠল সে।আর সাহিত্য তার হাসতে থাকা প্রেয়সীর দিকে কিছু মুহুর্ত দেখে থাকলো।অতঃপর কল্পনার গলায় মুখ গুজে দিয়ে হাস্কি কন্ঠে বলে উঠল,

"জানপাখি"

কল্পনার হাসি মৃদু হয়ে এলো যেন।ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়েই বলল,

"হুম"

"খুব ভালোবাসি তোকে"

"জানি তো"

"উহু।তোর চিন্তারও বাইরে"

কথাটা বলেই সাহিত্য আরো গভীরভাবে কল্পনার গলায় মুখ গুজে দেয়।প্রেয়সীর ঘ্রাণটা যে বড়ই প্রিয় জিনিস সাহিত্যের কাছে।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

কল্পনা যে আর শিকদার বাড়িতে ফেরত যাবে না সেটা ফাহাদ শেখসহ সবাই ভালাভাবে বুঝেছেন।তাই তো কথাবার্তা সব মিটমাট করে ফাহাদ শেখ ও হেনা শেখ শেখ ভিলায় চলে আসেন।

কল্পনার অমন করে চলে আসা ফাহাদ শেখ একদমই পছন্দ করেননি।শিকদার বাড়িতে মানসম্মানের মাথা নিচু হয়ে এসেছে তার।তারউপর শেখ ভিলায় এসে যখন দেখেন সাহিত্যের তেমন কিছুই হয়নি তখন তো আরো মেজার খারাপ হয় তার।সাহিত্যকে অনেক কথা শুনিয়েছেন।তবে কল্পনা এবার একটু শক্ত ছিল।মেয়েটা মন খারাপ করে থাকলেও একদমই কাঁদেনি।এখন সে শুধু অপেক্ষায় আছে ফাহাদ শেখ কখন মানবেন।

কল্পনা আগে যেভাবে নিজের রুমে ছিল,এখনো অমনই আছে।সাহিত্যকে সে সাফ শুনিয়ে দিয়েছে ফাহাদ শেখ না মানা পর্যন্ত কল্পনা তার রুমে সিফট হবে না।মেয়েটা এখনো দ্বিধায় আছে।যতই হোক,নিজের বাবা হয়।বাবার কথা অমান্য করতে এখনো কল্পনার মনটা খচখচ করে।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

সময়টা শীতের দিকে হলেও আজ কেন জানি হঠাৎই এই মাঝ রাতে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে ধরণীতে।কল্পনা তো এতক্ষণ ধরে ফোন দেখতে ব্যস্ত ছিল।যার কারণে হঠাৎ কারেন্ট চলে যাওয়ায় ফোনের চার্জ শেষ করে বসে রয়েছে এখন।কিছুক্ষণ আগে যে বিদ্যুৎটা পড়ল,তাতে মনে হয় না ডেবু চাচা এই বৃষ্টিতে বের হয়ে জেনারেটর চালু করবে।মানে আজ রাতে অন্ধকারেই থাকতে হবে সবাইকে।কল্পনার এমন ঘুটঘুটে অন্ধকার ভালো লাগে না।তারউপর বাইরে ক্ষণে-ক্ষণে বিদ্যুৎ পড়ছে।সেটাতেই চমকে-চমকে উঠছে মেয়েটা।সিদ্ধান্ত নিল রান্নাঘর থেকে মোমবাতি এনে জ্বালিয়ে রেখে ঘুমাবে।

চুলের মধ্যে হাত খোপা বেধে কল্পনা রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে এগুলো।চিরপরিচিত রাস্তায় অন্ধকারেও চোখ বন্ধ করে হাটতে পারবে কল্পনা।সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই কল্পনা রান্নাঘরে গিয়ে মোমবাতি জ্বালায়।জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে নিয়ে কল্পনা কেবলই রুমে ঢুকতে যাবে।কিন্তু সাহিত্যের রুমের সামনে এসে থেমে গেল সে।সাহিত্যের রুমের দরজা খুলে রাখা।রুমের দরজার সোজাসোজি বেলকুনির দরজাটাও খোলা।বৃষ্টির পানির ছটা এসে রুমে ঢুকছে।ভিজে একাকার হবে হয়তো কিছুক্ষণের মাঝে।

কল্পনা মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে রুমে ঢুকলো।নজর ঘুরাতেই দেখলো ওয়াশরুমে ফোনের ফ্লাস লাইটের আবছা আলো।বুঝলো যে সাহিত্য সেখানেই আছে।টেবিলের উপর মোমবাতি দাড় করিয়ে রেখে কল্পনা এগুলো বেলকুনির দরজা বন্ধ করতে।সাথে সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বলেও উঠল,

"বেলকুনির দরজা খুলে রেখেছেন কেন?বৃষ্টি ঢুকছে না?বন্ধ করে দিচ্ছি"

ওয়াশরুমের ভেতর থেকে সাহিত্য সময় নিয়ে বলে উঠল,

"হুম"

কল্পনা বেলকুনির দরজা লাগাতে গিয়েই থামকালো যেন।বৃষ্টির পানি তেমন একটা আসছে না।কিন্তু বৃষ্টিযুক্ত ঠান্ডা আবহাওয়াটা যেন শরীর শান্ত করার মতো।সেই বাতাসে কল্পনার মাথার হাত খোপাটা যেন আলগোছেই খুলে গেল।কিন্তু সেদিকে খেয়াল না করে কল্পনা তো ব্যস্ত হয়ে পড়ল অনুভব করতে সেই ঠান্ডা শীতল হাওয়া।চোখ বুজে নিয়ে হারিয়ে গেল যেন সেই আবহাওয়ার মাঝে।

এমন সময় একদম হুট করেই সাহিত্য এসে কল্পনাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে।কল্পনা ভড়কালেও পর মুহুর্তেই আবার শান্ত হয়ে গেল।তবে প্রতিবারের মতোই সাহিত্যের হাতের বাধনে শিটিয়ে গেল মেয়েটা।তবে আজ একটু সাহস দেখালো যেন।সাহিত্যের দিকে ঘুরে বলে উঠল সে,

"একটা গান বলেন না।আপনার মুখে কখনো গান শুনা হয়নি"

ভ্রু কুচকালো সাহিত্য,

"গান বলব?কি গান বলব?"

কল্পনা আবার বৃষ্টির দিকে মনযোগ দেয়,

"আপনার যেটা ইচ্ছা"

"আচ্ছা ঠিকাছে"

এতোটুকু কথা বলেই সাহিত্য কল্পনাকে আরো কাছে জাপ্টে ধরল যেন।অতঃপর পুরুষালী ভারী সুন্দর কন্ঠটা দিয়ে এক গানের কয়েক লাইল গেয়ে উঠল সাহিত্য,

❝

পারবো না, আমি ছাড়তে তোকে

পারবো না, আমি ভুলতে তোকে

পারবো না, ছেড়ে বাঁচতে তোকে

হয়ে যা না রাজি একবার!

❞

সাহিত্যের কন্ঠে গানটা এতো সুন্দর সুর মিলিয়ে গাওয়া শুনে অনেকটা অবাক হয়ে আছে কল্পনা।মেয়েটা যেন থমকে গিয়েছে একদম।সাহিত্যের গানের গলা সুন্দর সেটা কল্পনার জানা ছিল।কিন্তু এতো সুন্দর সেটা যেন আজ প্রথম জানলো।

কল্পনার এতো ভাবনার মাঝেই যেন সাহিত্য কল্পনার কানের কাছে নিজের অধর নিয়ে এলো।কিছুক্ষণ আগে যেই গাম্ভীর্য কন্ঠে গানখানা গাইলো,সেই কন্ঠে এখন হাস্কি নেশালোভাব বিরাজ করতে শুরু করেছে যেন।সেই কন্ঠ নিয়েই কল্পনার কানের কাছে বলে উঠল সাহিত্য,

"গানটার এই অংশটা আমার জীবনের সাথে পুরোটাই মিলে যায়।যেই জীবনে শুধুই তুই আছিস"

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন