ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়বেলায় তোমার আগমন

৫ম পর্ব

লেখক: জেরিন আক্তার

#প্রণয়বেলায়_তোমার_আগমন (০৫)

#জেরিন_আক্তার

রুদ্র আরমান নেওয়াজের ঘরে এলো। তিনি ছেলেকে ডেকেছেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে। সকালে তিনি আরিফ নেওয়াজকে বলে দিয়েছেন রুদ্র এক মাসের শর্ত নিয়ে এসেছে। অধরার বাবা-মাও একমাস পরে রুদ্রর মতামতই সম্মতি দিবেন। কেননা জোর করে আর কিছু হলেও সংসার তাঁরা করাতে পারবেন না। একটা মাস তাঁরা দেখবেন সম্পর্ক কতদূর গড়ায়। এরপরে নাহয় অধরাকে বিয়ে দিয়ে দিবেন অন্য কোথাও।

আরমান নেওয়াজ বিছানায় বসেছিলেন। রুদ্রকে ডেকে পাশে বসতে বললেন। রুদ্র বসতেই তিনি গলার কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে বললেন,

“রুদ্র! তোমার কি মনের পরিবর্তন হচ্ছে? বলতে চাচ্ছি অধরাকে নিয়ে।”

রুদ্র স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আমার সময় চাই।”

“বেশ তাই নাও। তবে আমরাও অনেক ভাবলাম, তোমার যা ইচ্ছে তাই হবে। কেননা জোর করে তো আর আমরা তোমাকে একটা সংসার চাপিয়ে দিতে পারবো না।”

রুদ্র মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। ৮ বছরে বাড়িতে ফিরে আসেনি শুধু অধরাকে বিয়ে করার জন্য। ভেবেছিলো হয়তো অধরাকে মনে ধরবে না। সেই অনুযায়ী ও অধরাকে দেখেওনি। তবে যেদিন অধরাকে প্রথম দেখেছে তারপর থেকে আর এই মন থেকে সরাতেই পারেনি। মনের মধ্যিখানে বসিয়ে ফেলেছে।

রুদ্র উঠে দাড়ালো। আর বলল,

“বাবা, এই বিষয়টা এখন বাদ দাও। আমি সময় চাই। একমাস পরে আমি আমার মতামত জানিয়ে দিবো।”

“ঠিক আছে। তুমি যা চাও তাই হবে।”

রুদ্র কথাটা শুনে “হুমম” বলে চলে গেলো। রুমে এসে শাওয়ার নিয়ে সাদা টি-শার্ট আর কালো প্যান্ট পড়ে নিলো। ওর আবার স্কাই ব্লু রঙটা বেশি পছন্দ। সেই হিসেবে শার্ট, টি-শার্টও অনেক আছে এই রঙের। এখন সাদা শার্টই পড়লো। শার্টের কলার ভেঙে চুলগুলো সেট করে নিলো। আবারও রেডি-সেডি হয়ে বের হলো। এখন যাবে সবচেয়ে কাছের বন্ধু ইফতির সাথে দেখা করতে আবার ওখানে থেকে সব বন্ধুদের সাথে দেখাও করবে, আড্ডা দিবে। ফিরতেও বেশ রাত হতে পারে।

রুদ্র সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিচে এসে দাড়ালো। চোখ দুটো তখনও অধরার খোঁজে। অধরা নিচে ছিলো না। রুদ্র অধরাকে দেখতে না পেয়ে গভীর শ্বাস ছাড়লো। রুকাইয়া এসে জিজ্ঞাসা করলেন রাতের খাবার দিবেন কিনা। রুদ্র অনীহা জানালো। চলে যাওয়ার আগে ওর মাকে বলল চিন্তা না করতে ফিরতে রাত হবে। এদিকে অধরা ব্যালকনিতে বসে ফোন স্ক্রল করছিলো। একটু পরেই শুয়ে পড়বে। হঠাৎ বাহিরে থেকে আরিফ নেওয়াজের ডাক এলো। অধরা ব্যালকনি থেকে রুমে এসে বলল,

“আব্বু ভিতরে এসো!”

আরিফ নেওয়াজ ভিতরে এসে বললেন,

“কি করছো?”

“এইতো ভাবছিলাম শুয়ে পড়বো। কিছু বলবে আব্বু?”

“হুমম। শুনলাম সোহা নাকি আজ রুদ্রর কাছে আজকে পড়তে গিয়েছিলো। রুদ্রও নাকি তোমাকে যেতে বলেছে?”

“হ্যা আব্বু।”

“তাহলে তো ভালোই। কোচিংয়ে তো পড়ছোই। এর পাশাপাশি কোনো কিছু না বুঝলে রুদ্রর কাছে পড়বে। এমনকি আদ্রও আছে।”

“ঠিক আছে। কোনো পড়া না বুঝলে যাবো।”

আরিফ নেওয়াজ মেয়ের সাথে আরও কিছু কথা বলে বের হয়ে গেলেন। অধরা গভীর শ্বাস ছেড়ে রুমের দরজা বন্ধ করে বিছানায় এলো। ঠিক করলো কালকে সকালে থেকে রুদ্রর কাছে পড়তে যাবে। নাহলে কেউ ছাড়বে না।

পরদিন সকালবেলা.

রুদ্র মাত্রই উঠে ফ্রেশ হয়েছে। এরই মাঝে সোহার ডাক। রুদ্র ভাবলো হয়তো পড়তেই এসেছে। আবার রাগও হলো, অধরা আসে না বলে। অধরার জন্যই বলেছিলো যে পড়াবে। কিন্তু ও তো আসেইনা।

রুদ্র দরজা খুলে সামনে থাকা ব্যাক্তিকে না দেখেই বলল,

“সোহা ভিতরে আয়!”

তখনই রুদ্রর চোখ গেলো অধরার দিকে। অধরাও এসেছে। তবে ডাক দিয়েছে সোহা। রুদ্রর মুখে হাসি ফুটে উঠল।

“আয় ভিতরে আয়!”

অধরা, সোহা ভিতরে ঢুকলো। রুদ্র দুজনের উদ্দেশ্যেই বলল,

“ব্যালকনিতে গিয়ে বস। আসছি!”

অধরা রুদ্রর দিকে তাকিয়ে ব্যালকনিতে চলে গেলো। রুদ্রর রুমের সাথে ব্যালকনিটা আবার ভালোই বড়। একপাশে বুকসেলফ আছে, সাথে বেতের চেয়ার, টি-টেবিল। অধরা এসে ব্যালকনির পর্দাগুলো সরিয়ে দিলো। তখনই সূর্যের তীক্ষ্ণ রশ্নি এসে ছড়িয়ে গেলো। রুদ্র যে চেয়ারটায় বসবে তার পাশের চেয়ারে অধরা সোহাকে বসালো। রুদ্র এলো। নিজের পাশের চেয়ারে সোহাকে দেখে রেগে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো। কই ভেবেছিলো পাশে বসবে। কিন্তু তা আর হলো কই?

রুদ্র রাগই করলো একটু তবে বুঝতে দিলো না। ও সোহার পাশেই বসে বলল,

“যে পড়াটা নিয়ে সমস্যা সেটা বের কর!”

_______________

ওদের পড়া শেষ। অধরা আর সোহা চলে যাবে, রুদ্র তখন অধরাকে বলল,

“অধরা তোর পরীক্ষা বিকেলে তাইতো!”

অধরা পেছনে ফিরলো,

“হুমম।”

রুদ্র নিজের ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আজকে নিতে যাবো।”

অধরা চোখ বড় বড় করে তাকালো। অনীহা জানিয়ে বলল,

“নিতে যেতে হবে না আমি আসতে পারবো।”

পাশ থেকে সোহা বলল,

“আপু তুমি না করছো কেনো? ভাইয়া তো ভালোর জন্যই বলছে।”

অধরা কটমট দৃষ্টিতে তাকালো সোহার দিকে। সোহা ওর তাকানোর মানে বুঝলো না। রুদ্র কড়া গলায় বলল,

“নিতে যাবো মানে নিতে যাবো। এর বাহিরে কোনো কথা শুনতে চাচ্ছি না। এখন চুপচাপ যা!”

অধরা কিছু বলবে কিন্তু রুদ্র চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল,

“যেতে বলেছি যা!”

অধরা কিছু বলতে না পেরে হনহন করে চলে গেলো। পেছন পেছন সোহাও গেলো। অধরা রুমে এসে বিছানায় বসল। সোহা এসে বলল,

“ভাইয়া যেতে চায় যাক না।”

অধরা দরজার দিকে তাকিয়ে সোহাকে আস্তে করে বলল,

“তোর মাথায় আসলেই বুদ্ধি নেই। প্রতিদিন রাকিব দাড়িয়ে থাকে সেটা জানিস না। ভাইয়া গেলে তো রাকিব ঝামেলাও করতে পারে। এমনিতেই দেখিস না কেমন ঘুরঘুর করে। যে কারণে আমি আব্বুকে যেতে বলিনি, আদ্র ভাইয়াকেও বলিনি আর তু্ই রুদ্র ভাইকে বললি যে আনতে যেতে। গাধা কোথাকার।”

সোহা অধরার পাশে বসে বলল,

“সরি আপু। বুঝতে পারিনি।”

অধরা মনে মনে বলল—এখন আর সরি বলে কি লাভ। দেখা যাক কি হয়। আল্লাহ আল্লাহ করে আজকে রাকিব না থাকলেই ভালো হয়।

_____________

অধরা পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে দেখলো রুদ্র গেটের সামনে দাড়িয়ে আছে। স্কাই ব্লু রঙের শার্ট সাথে কালো প্যান্ট। হাতে সানগ্লাস। অধরার কাছে ভালোই লাগলো বলতে খুবই ভালো লাগলো। ও রুদ্রকে শুধু স্কাই ব্লু রঙের শার্টই পড়তে দেখছে। ভাবলো হয়তো এই রঙ পছন্দ। অধরা এগিয়ে আসতে আসতে আশেপাশে তাকালো। দেখলো রাকিব আছে কিনা। যেই দেখলো রাকিব নেই ঠিক তখনই তাড়াহুড়ো করে রুদ্রকে বলল,

“ভাইয়া চলুন তাহলে।”

রুদ্র আশেপাশে তাকিয়ে বলল,

“এখনই চলে যাবি?”

অধরা মিনমিন করে বলল,

“তাহলে আপনি থাকুন। এখানে মেয়ে দেখুন আমি চলে যাই।”

রুদ্র সানগ্লাস পড়ে বাকা হেসে বলল,

“আর ইউ জেলাস?”

অধরা নাক-মুখ কুঁচকে বলল,

“কি? কিসের জেলাস?”

রুদ্র প্রসঙ্গ পাল্টাতে গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“ও কিছুনা। চল তাহলে যাই।”

“হুমমম।”

রুদ্র গাড়িতে উঠার আগে আবারও আশেপাশে তাকালো। কিছু তো আছেই যা অধরা লুকাছে। যা ওকেই বের করতে হবে। আর ওই রাকিব। ওই ছেলেকেও বের করতে হবে।

সন্ধ্যায় প্রতিদিনের মতো অধরা আজকেও ওর বাবার জন্য কফি বানাতে কিচেনে ঢুকলো। রুদ্র সিঁড়ির উপরে দাড়িয়ে ফোন স্ক্রল করছিলো আর ওকেই দেখছিলো। ঠিক তখন আদ্র এলো। রুদ্রকে পেছনে থেকে বলল,

“কি করছো?”

রুদ্র শ্বাস ছেড়ে বলল,

“হাহ, কি আর করবো আমার রাঁধুনি চাচাতো বোনকে দেখি।”

“ওহ। দেখো,দেখো।”

“আদ্র শোন!”

“হুম বলো!”

“বলছি অধরা কি সবার জন্যই কফি বানায় নাকি রে?”

আদ্র বলল,

“ভাইয়া ওর কফি খুব এক্সপেন্সিব। ও শুধু মেঝো আব্বুর জন্যই বানায়। মনের ভুলেও অন্য কারোর জন্য বানায় না।”

রুদ্র বাকা হেসে বলল,

“আমার জন্য বানাবে কি?”

আদ্র ভাবুক গলায় বলল,

“ও যে জেদি, এমনে বললে বানাবে না। প্রেসার দিতে হবে।”

ঘন্টা খানিক পরে অধরা আর সোহা কথা বলতে বলতে নিচে এলো। রুকাইয়া আর অনিমা কথা বলছে। আর কেউ ড্রইং রুমে নেই। অধরা আর সোহা সোফায় গিয়ে বসলো। সোহা টিভি চালু করলো। এমন সময় অনিমা সোহাকে ডাকলেন। সোহা উঠে চলে গেলো। অনিমা বললেন,

“তোর রুদ্র ভাইকে এই কফিটা দিয়ে আয়! অধরাকে বললে তো কত বাহানা।”

সোহা সম্মতি জানালো।

“ঠিক আছে দাও।”

সোহা কফি নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে যেতে লাগলো। অধরাও চট করে উঠে ওর পেছন পেছন গেলো। অধরা উপরে এসেই সোহার থেকে কফির মগটা কেড়ে নিয়ে বলল,

“আমি নিয়ে যাচ্ছি। তু্ই আমার রুমে যা!”

সোহা মাথা নাড়িয়ে বলল,

“ঠিক আছে।”

অধরা রুদ্রর রুমের সামনে এসে ডাক দিলো,

“ভাইয়া আসবো?”

রুদ্র রেডি হচ্ছিলো। ইফতির সাথে কিছু কেনাকাটা করতে যাবে। অধরার ডাক শুনে ভিতরে আসতে বলল। অধরা ভিতরে ঢুকে রুদ্রর দিকে তাকালো। স্কাই ব্লু রঙের শার্ট পড়েছে আর সাদা রঙের প্যান্ট। শরীরে বেশ ভালো মানিয়েছে। চুলগুলোও ভালো করে সেট করছে। অধরার কাছে ভালো লাগলো কিন্তু প্রকাশ করলো না। বিবেকে বাঁধলো। মনে মনে বলল-প্রকাশ করলেই দাম বেড়ে যাবে। রুদ্র পেছনে ফিরতেই অধরা বলল,

“আম্মু আপনার জন্য কফি পাঠিয়েছে।”

“ওখানে রাখ!”

অধরা কফিটা রেখে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে রইলো। রুদ্র আয়নায় অধরাকে দেখে পেছনে ফিরে তাকালো। অধরা হাত কচলাতে কচলাতে বলল,

“একটা কথা বলবো?”

রুদ্র এগিয়ে এলো।

“হ্যা বল!”

অধরা খানিকটা আশাবাদী হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,

“আপনি কি একবারে চলে এসেছেন?”

মূলত এই একটা প্রশ্ন করার জন্যই ওর এখানে আসা। রুদ্র কোনো কিছু ভাবলো না। আর এই নিয়ে ভাবারও চেষ্টা করলো না। স্পষ্ট গলায় উত্তর দিলো,

“হুমম।”

“সত্যিই?”

“হুমম।”

অধরা একটু খুশি হলো। তবে সেদিন যে শুনেছিল রুদ্র আবার চলে যাবে। তাহলে হয়তো সেটা মিথ্যেই ছিলো। রুদ্র কফির মগ হাতে নিয়ে ভ্রু উঠিয়ে অধরাকে বলল,

“তু্ই বানিয়েছিস কফি?”

“না আম্মু বানিয়েছে।”

রুদ্র এই একটা সুযোগ পেলো। তৎক্ষণাৎ মর্জি ধরে কফি খেলো না। মগটা অধরার হাতে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“নিয়ে যা, খাবো না।”

অধরা জিজ্ঞাসা করলো,

“কেনো?”

রুদ্র ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,

“এমনেই।”

“তাহলে যে এতো কষ্ট করে নিয়ে এলাম।”

রুদ্র দরজার সামনে এসে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে অধরার পানে তাকালো। খানিকটা মোলায়েম কণ্ঠে বলল,

“যেদিন নিজে কষ্ট করে বানিয়ে নিয়ে আসবি সেদিন খাবো।”

অধরার মাথায় ঢুকলো না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে ফট করে বলে উঠল,

“আমি কফি বানাতে পারি না।”

রুদ্র বলল,

“বানাতে পারিস না নাকি বানিয়ে দিতে চাইছিস না?”

পরপর রুদ্র কাঠ কাঠ গলায় বলল,

“যে পর্যন্ত নিজে বানিয়ে নিয়ে আসবি সে পর্যন্ত এই রুমে যেনো কফি না আসে।”

অধরা গোলগোল চোখে তাকিয়ে রইলো। রুদ্রকে কিছু বলার আগেই সে রুমের চৌকাঠ পেরিয়ে চলে গিয়েছে। ও তৎক্ষণাৎ তাড়াহুড়ো করে রুদ্রর পিছু নিলো।

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন