#প্রণয়বেলায়_তোমার_আগমন (১৩)
#জেরিন_আক্তার
রুদ্র এপর্যন্ত আরিফ নেওয়াজকে কল দেয়নি, বলতে গেলে প্রথমবারই দিলো। সেদিন নাম্বার সেভ করতে মিস কল দিয়েছিলো, কথা হয়নি। আরিফ নেওয়াজ রুদ্রর দেওয়া কলটা রিসিভ করলেন। রুদ্র শুরুতেই বলল,
“মেঝো আব্বু আমি রুদ্র।”
“ওহ রুদ্র, হ্যা বলো।”
“কি করছো?”
“অফিস থেকে বাড়িতে যাবো। শুনলাম বন্ধুর বিয়েতে গিয়েছো?”
“হুমম। মেঝো আব্বু একটা কথা বলবো?”
“বলো!”
“আসলে না বলে থাকতে পারলাম না, বলতে একপ্রকার বাধ্যই হলাম।”
“সমস্যা নেই বলো।”
“তার আগে বলো অধরাকে কিছু বলবে না?”
“কেনো অধরা কিছু করেছে?”
“না।”
“তাহলে?”
রুদ্র নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“কিছু করেনি কিন্তু মেঝো আব্বু তোমার মেয়ে সবসময় আমাকে থ্রেট দিচ্ছে।”
আরমান কপালে ভাজ ফেলে বললেন,
“কি বলে থ্রেট দিচ্ছে?”
রুদ্র হাফ ছেড়ে বলল,
“আমি যে এতবছর দেশে আসিনি, তোমার মেয়েকে না দেখে দোষ দিয়ে গিয়েছি এটা তোমার কাছে স্বীকার করছি। মিথ্যের আশ্রয় আমি নিলাম না। এখন কথার মধ্যে কথা হলো তোমার মেয়ে সবসময় শুধু বলছে আব্বুর কাছে বিচার দিবো আপনি এমন, অমন। আপনি মেয়েদের সাথে ঘুরেন, মেয়েদের নাম্বার নিন। আবার এইমাত্র ফোন দিয়েছি একটু কথা বলার জন্য তাও একই কথা বলে। আচ্ছা তোমার কি আমাকে দেখে এরকম মনে হয় মেঝো আব্বু।”
আরিফ নেওয়াজ ভাবুক গলায় বললেন,
“না তোমাকে তো এমন মনে হয়না। অধরা এতবছর পরে তোমাকে দেখছে তো তাই মনের মধ্যে উল্টো-পাল্টা কথা আসছে। আমি অধরাকে বোঝাবো তুমি চিন্তা করো না।”
“তুমি আগেই ওকে কিছু বলো না। যদি ও কিছু বলে তাহলে বলো। নাহলে বুঝবে তোমাকে বলে দিয়েছি।”
“ঠিক আছে।”
রুদ্র ফোন কেটে দিয়ে বাকা হেসে বিড়বিড় করে বলল—এখন বলিস আমি তোকে কু-প্রস্তাব দেই। কিচ্ছু বিশ্বাস করবে না। এখন আমারই ভালো হবে। কু-প্রস্তাব দিলে তু্ই তোর বাবাকে বললেও সে বিশ্বাস করবে না।
তখনই ইফতি এসে ওর কাঁধে চাপর মেরে বলল,
“কিরে অধরার সাথে কথা বলছিলি নাকি?”
রুদ্র হেসে বলল,
“রুদ্র নেওয়াজ বাজিতে হারার পাত্র নয়।”
ইফতিকে এই বলে মনে মনে বলল—রুদ্র নেওয়াজ আসলেই হারার পাত্র নয়। কথা বলেনি ঠিকই কিন্তু মেসেজতো দিয়েছে। তু্ই তো তখন বলিসনি মেসেজ দেওয়া যাবে না,শুধু বলেছিলি কল দেওয়া যাবে না। তো সিম্পল আমি হারিনি।
ইফতি অবাক কণ্ঠে বলল,
“তাহলে সত্যিই কথা বলিসনি অধরার সাথে?”
“উহু।”
“তাহলে কি ২৪ ঘন্টা পরেই কথা বলবি?”
“হুম।”
“ভালোই। তাহলে চল নাফিজের কাছে যাই।”
“চল।”
সন্ধ্যার দিকে রুদ্র অধরার হোয়াটস্যাপে একটা ছবি পাঠালো। অধরা দেখলো রুদ্র, ইফতি আরও দুটো মেয়ে একসাথে ছবি তুলেছে। বেশ একটা দূরত্বও নেই। অধরা জেলাস ফিল হয়ে ছবিটা দেখে হা হা ইমোজি সেন্ড করলো। পাশে আবার আদ্রও বসে ওর কান্ড দেখছিলো। ওদিকে রুদ্র হা হা রিএক্ট দেখে ওকে আরও জেলাস ফিল করাতে লিখলো—
“আমার পাশে যে দাড়িয়ে আছে মেয়েটা কেমন রে? পছন্দ হয়?”
অধরা দাঁত চেপে লিখলো—
—ভালোই তো।
আদ্র বলল,
“কার ছবি পাঠিয়েছে এটা দেখি?”
অধরা ফোনটা কাত করে আদ্রকে ছবি আর মেসেজ দেখালো। আদ্র বলল,
“তু্ই আর কিছু লিখিস না। ও তোকে জ্বালাতে এমন করছে। তু্ইও ওর মতো করে ছবি তুলে তুলবি। ও যা করবে তু্ইও উল্টো তাই করবি। দেখাবি তু্ইও পারিস।”
“এখন ছবি কিভাবে তুলবো?”
“আমার সাথে তুলবি। আয় আমার সাথে ঘুরতে নিয়ে যাবো তোকে।”
“এখন যাবো না। আব্বু আসবে একটু পরে। এখন বাহিরে গেলে বকবে।”
“বকবে না। রেডি হয়ে আয়।”
“আম্মু জিজ্ঞাসা করলে কি বলবো?”
“বলবি পড়াশোনা বিষয়ক কোনো কিছু আনতে যাবি। আর তু্ই কি একা একা যাবি? আমি নিয়ে যাবো।”
“ভাইয়া, তাই এখন? থাক না।”
“তু্ই কি যাবি?”
অধরা রুমে ফিরে রেডি হয়ে নিচে নামলো। আদ্র রেডি হয়ে গাড়ি বের করতে গিয়েছে। অনিমা মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন,
“কোথায় যাবি এখন?”
“আম্মু একটা বই কিনতে যেতে হবে।”
“এখন? তোর আব্বুকে ফোন করে বল!”
“না আব্বু বুঝতে পারবে না। আমার যেতে হবে।”
অনিমা মেয়েকে শুনিয়ে বললেন,
“না তোর আব্বু তা পারবে কেনো? সে তো পড়ালেখা করেনি।”
অধরা মুখটা গুমোট বাঁধিয়ে বলল,
“আব্বু আসুক শুধু আজকে।”
“হ্যা আসুক। তোর আব্বু আমার কি করবে?”
“ভয় পাও না আব্বুকে?”
“কে ভয় পায় আমি? উল্টো তোর আব্বুই ভয় পায় আমাকে।”
অধরা মুখের উপরে বলে দিলো,
“তাহলে আব্বু যখন বকে তখন চুপ থাকো কেনো? তাকে তো কিচ্ছু বলতে পারো না। আর সব রাগ আমার উপরেই আসে শুধু।”
বাহিরে থেকে আদ্র ডাক দিলো। অধরা সেদিকে যেতে যেতে ওর মাকে উদ্দেশ্য করে বলে গেলো,
“শুধু আজ বাড়ি ফিরি, সব বলে দিবো। সব রাগ শুধু আমার উপরেই ঝড়ো তাও বলে দিবো।”
সন্ধ্যা পরে সববন্ধুরা যেখানে নাফিজের হলুদসন্ধ্যার আনন্দে ব্যাস্ত সেখানে অধরার পাঠানো ছবি দেখে প্রচন্ড রেগে গেলো। এক ছেলের সাথে দাড়িয়ে কাপল ছবি তুলেছে। এমন ভাবে তুলেছে ছেলেটাকে বোঝা যাচ্ছে না। তবে অধরাকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। রুদ্র বেশ বুঝতে পারছে ওকে ঠিক একই ভাবে জেলাস ফিল করাতেই ছবিটা দিয়েছে। রুদ্র সবার থেকে সরে গিয়ে দাড়ালো। ছবিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ওর মাকে কল দিলো। রুকাইয়াকে কিছু বলতে না দিয়ে ও বলল,
“মা একটু সরে আলাদা জায়গায় যাও তো!”
রুকাইয়া রুমেই ছিলেন। বললেন,
“রুমেই আছি বল!”
“মা অধরা আজকে কি বাহিরে গিয়েছিলো নাকি?”
“হুমম। ও তো বই কিনতে বাহিরে গিয়েছিলো।”
“সাথে কে গিয়েছিলো আদ্র?”
“হুমম। আদ্রই গিয়েছিলো।”
“ওদের একসাথে ফিরতে দেখেছো?”
“হুমম। মাত্র ফিরলো।”
রুদ্র আবারও ছবিটা দেখে কিছু ভাবলো,
“আচ্ছা মা আদ্র কি রঙের শার্ট পড়ে গিয়েছিলো?”
রুকাইয়া ছেলের প্রশ্ন শুনে অবাক না হয়ে পারলেন না। তখন আদ্রকে কি রঙের জামা পড়তে দেখেছেন সেটা মনে করে ফটাফট বলে দিলেন,
“আদ্র সাদা শার্ট পড়ে বেরিয়েছিল।”
“থ্যাংক ইউ মা। রাখছি। আর এগুলো কাউকে বলো না। একটা দরকারে জানার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম।”
“ঠিক আছে।”
রুদ্র কলটা কেটে দিয়ে অধরার সেই ছবিতে হা হা রিএক্ট দিয়ে লিখলো—
—ভালোই তো চালিয়ে যা। বেস্ট অফ লাক। বাড়িতে এসে পরিচয় করিয়ে দিস।
মেসেজটা অধরার দেখার অপেক্ষা করলো না। ফোনটা সাইলেন্ট করে বন্ধুদের কাছে চলে গেলো। এদিকে অধরা মেসেজ দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। ফোনটা ফ্লোরে ছুড়ে মেরে রুম থেকে হনহন করে আদ্রর রুমে চলে গেলো। আদ্র বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে হেডফোনে গান শুনছিলো। অধরা কোনো কথাবার্তা ছাড়াই আদ্রর চুল ধরে মাথা ঝাঁকাতে শুরু করলো। আদ্র কোনোরকম হেডফোন খুলে নিয়ে বলল,
“আহা…! এই কি করছিস ছাড়।”
অধরা না ছেড়ে দাঁত চেপে বলল,
“তোমার জন্য সব হলো, আমি আগেই বলেছিলাম এখন বাহিরে যাবো না। এউ বলেছিলাম রুদ্র ভাইয়ের সাথে এসব নিয়ে কোনো কাহিনীই করতে চাই না। তোমার জন্য বাহিরে গিয়ে ছবি তুলে রুদ্র ভাইকে দিলাম। কিন্তু সে বলল ভালোই তো চালিয়ে যা, বেস্ট অফ লাক। মানে কি?”
আদ্র অধরার হাত দুটো ধরে বলল,
“তাই আমাকে মারবি কেনো? রুদ্রকে গিয়ে মার। আর এই হাত না তো অক্টপাস, ধরলে আর ছাড়ানো যায়না। এভাবে কেউ মারে?”
অধরা রাগ সামলাতে না পেরে বলল,
“তোমার কথা আর সোহার কথা আমি সবাইকে বলে দিবো এখনই।”
বলেই চলে যেতে নিলে আদ্র খপ করে ওর হাত ধরে নিয়ে বিছানায় বসালো। এরপরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“এতো রাত করতে নেই বোন। তু্ই শান্ত থাক। আমি দেখছি।”
আদ্র অধরাকে কোনোরকম শান্ত করে বলল,
“চকলেট খাবি বাহিরে থেকে এনে দেই।”
“লাগবে না, সোহাকে এনে দিও!”
“কেনো তোকে এনে দেই, রাগ কমবে।”
“লাগবে না, এখন শুধু একটা কাজ করো। এমন কাজ করো যাতে রুদ্র ভাই রেগে যায়।”
“কাপল ছবি তুলে দিলাম তো, ভাইয়া তোকে নিয়ে তো রেগেও যায়নি। আর জেলাসও হয়নি।”
অধরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
“জেলাস হবে মানে?”
আদ্র দরজার দিকে একবার তাকিয়ে পরপর অধরার দিকে তাকিয়ে অবলীলায় বলল,
“ভাইয়া তোকে ভালোবাসে।”
অধরা সোজা গলায় বলল,
“জানি আমি, আগেই বুঝেছি।”
আদ্র খুশি হয়ে বিছানায় উঠে বলল,
“সত্যিই বুঝেছিস, যাক তাহলে আর আমার আর বেশি কিছু করতে হলো না। মেসেজেই কাজ হয়েছে।”
“মানে কিসের মেসেজ?”
আদ্র তালে তালে বলল,
“তোর অনুমতি ছাড়াই ভাইয়ার ফোনে মেসেজ দিয়েছি।”
এই শুনে অধরার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। আরও শিওর হতে জিজ্ঞাসা করলো,
“মেসেজটা বাংলায় লিখেছো তাই না!”
আদ্র ফিচেল হেসে বলল,
“হুমম। তাহলে তো ভাইয়া বলে দিয়েছে।”
অধরা রাগী কণ্ঠে বলল,
“তুমি জানো মেসেজটা নিয়ে কি সমস্যায় পড়েছিলাম। পরে সেটা উনাকে বুঝিয়ে দিয়েছি মেসেজটা আমার না। পরে বিশ্বাস করেছে। আর এখন তোমার মাথার চুল যদি না তুলেছি।”
আদ্র সাথে সাথে উঠে রুমে থেকে বেরিয়ে গেলো। অধরা পেছন পেছন দৌড়ে গেলো। আদ্র দৌড়ে নিচে এলো। অধরাও এলো। ড্রইং রুমে আরিফ নেওয়াজ আর অনিমা উপস্থিত ছিলেন। আরিফ নেওয়াজ মেয়েকে ডেকে কাছে বসালেন। আদ্র গিয়ে অনিমার পেছনে দাড়ালো। আর বলল,
“মেঝো আম্মু, তোমার মেয়ে আরেকটু হলে মাথা থেকে চুল সবগুলো উঠিয়ে নিতো। ভাগ্গিস দৌড়ে এসেছি।”
অনিমা আদ্রর মাথায় হাত রেখে অধরাকে বললেন,
“তোর কি এই ছেলের চুলেই নজর যায়। যা আদ্র ও আর তোকে মারবে না।”
আদ্র মাথায় হাত দিয়ে চলে গেলো। অধরা বাবার পাশে এখন একটু জোরই পেয়েছে বলা যায়। তাই এখন আর কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনই মনে করলো না। এই সময় বাড়িতে ঢুকলো দারোয়ান। হাতে সেই পার্সেল। দারোয়ান পার্সেলটা আরিফ নেওয়াজের দিকে দিয়ে বলল,
“ভাইজান, এইটাই দুপুরে এসেছে।”
“হুম দাও।”
আরিফ নেওয়াজ সেটা অধরাকে দিলেন। অধরা তো বুঝতেই পেরেছে এটা কিসের পার্সেল। ও পার্সেলটা হাতে নিয়ে দোপাটি দাঁত বের করে হেসে ওর বাবাকে বলল,
“আব্বু রাগ করোনি তো।”
আরিফ নেওয়াজ হাসলেন মেয়ের কথায়। ভেবেছিলেন মেয়েকে একটু খেপাবেন কিন্তু তা আর হলো কই। এই মেয়ের হাসিতেই সব উবে গিয়েছে। তিনি সোজা হয়ে বললেন,
“উহু, রাগ করবো কার উপরে। আমার সবতো তোমারই। একটা কেনো, দশটা পার্সেল এলেও রাগ করতাম না।”
অনিমা দুজনের কথা শুনে এবার আর কিছু বললেন না। শুধু তাকিয়ে রইলেন। একেকসময় বাপ-মেয়ের কিছু মুহূর্তে দেখে তিনি অবাক না হয়ে পারেন না।
অধরা হেসে একবার অনিমার দিকে তাকালো। এর পরপরই আরিফ নেওয়াজকে বলল,
“আব্বু জানো আম্মু কি বলেছে?”
“কি বলেছে?”
“আম্মু বলেছে তোমাকে দেখে নাকি ভয় পায়না। উল্টো তুমিই নাকি ভয় পাও।”
আরিফ নেওয়াজ গলা খাকারি দিয়ে অনিমার দিকে তাকালেন। অনিমা তো আরও অবাক, সেই কথা আবার এই মেয়ে বলেও দিচ্ছে। অনিমা চোখ নিচে নামিয়ে কিচেনে চলে গেলো। অধরা থামলো না আজকে সব বলে দেবে। কয়েক সেকেন্ড বিরতি নিয়ে আবারও বলল,
“জানো আম্মু না সবসময় শাসনের উপরেই রাখে। একটা কথা বলা যায়না কেমন যেনো করে।”
আরমান নেওয়াজ কথাগুলো শুনতে শুনতে নিচে নামলেন। অতঃপর হেসে হেসে অনিমাকে আদেশ করে বললেন,
“ভাবি, তোমাকে যদি এরপরে দেখি অধরাকে বকেছো তাহলে কিন্তু তোমার নামে মামলা দিবো।”
অনিমা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন,
“যান আপনাদের মা কে আর কিচ্ছুটি বলবো না। আমিও দেখবো কতদিন আগলে আগলে রাখেন ওকে। পরের বাড়ি গেলে তখন কি হবে?”
শেষের কথাটা মুখ ফসকেই বলে দিয়েছেন। তবে আরমান নেওয়াজ প্রচন্ড রেগে গেলেন। মুহূর্তেই চোখ দুটো রক্তের মতো লাল হয়ে গেলো।
চলবে....