ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়বেলায় তোমার আগমন

১৭তম পর্ব

লেখক: জেরিন আক্তার

#প্রণয়বেলায়_তোমার_আগমন (১৭)

#জেরিন_আক্তার

রুদ্র অধরার পেছন পেছন ছুটলো। অধরা রুমে এসে দরজা বন্ধ করে বিছানায় এলো। রুদ্র ওকে না ডেকে ওর রুমের থেকে দুই কদম দূরে দাড়িয়ে রইলো। এদিকে অধরা আদ্রকে মেসেজ দিলো—

—কোথায় তুমি? এদিকে সোহা কেঁদেই যাচ্ছে।

এপাশে থেকে আদ্র মেসেজ দিলো—

—বাবার সাথে বাহিরে এসেছি। একটু পরে আসছি। ওকে কাঁদতে না কর!

—আমার কথা শুনছে না তুমি এসো তাড়াতাড়ি।

—আসছি। তু্ই তাও চেষ্টা কর।

এই মুহূর্তে আবার রুদ্র কল দিলো অধরাকে। অধরা কলটা ধরে বলল,

“কি হয়েছে ওই রুমে থেকে এই রুমে কল কেনো দিচ্ছেন?”

“তাহলে রুমে আয়, একসাথে বসে কথা বলি।”

“পারবো না।”

“না পারলে তাহলে ফোনেই কথা বল!”

“তাও পারবো না।”

“তাহলে দরজা খোল!”

“কিহ!”

“দরজাটা খোল!”

“না রুমে সোহা আছে।”

রুদ্র কি যেনো ভেবে বলল,

“একটু খোল, তোকে একটু দেখেই চলে যাবো। প্লিজ! প্লিজ না করিস না।”

“ঠিক আছে, দাঁড়ান।”

অধরা কল কেটে দিয়ে বিছানায় থেকে নেমে দরজা খুলল। রুদ্র একটা টেডি স্মাইল দিয়ে হুড়মুড়িয়ে রুমে ঢুকলো। সোহা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে বলে দেখতে পেলো না। অধরা বলল,

“আপনি একটু দেখতে চেয়ে রুমে ঢুকলেন কেনো?”

“আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই ঢুকেছি।”

অধরা চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। রুদ্র এগিয়ে এসে অধরার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

“অন্যের প্রেমের ওকালতি না করে আমার প্রেমটা করিয়ে দে। বিনিময়ে যা চাস তাই দিবো। যদি আমার জানটাও চাস তাও দিয়ে দিবো।”

অধরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“কে সে আগে বলুন!”

রুদ্র কোনো ভনিতা না করে মুচকি হেসে বলল,

“তু্ই।”

“আমি?”

রুদ্র মাথা নাড়িয়ে বলল,

“নাহ! আরিফ নেওয়াজের একমাত্র আতঙ্ক। সরি সরি, একমাত্র মেয়ে।”

অধরা চোখ ছোট-ছোট করে বলল,

“কি বললেন আবার বলুন? আতঙ্ক কাকে বললেন?”

রুদ্র অধরার দুই গাল টেনে হেসে বলল,

“আতঙ্ক না, আমার পিচ্চি বউ হোস।”

অধরা ভাবলো ও কি স্বপ্ন দেখছে নাকি? রুদ্র এতো সহজেই বলে দিলো সব। অধরা ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছু বলার মতো কথা খুঁজে পাচ্ছে না। রুদ্র ওর দিকে তাকিয়ে হেসে গালে হাত ছুঁইয়ে বলল,

“ঘুমিয়ে পড়! আর পাশের টাকে শান্তনা দে।”

রুদ্র চলে যাবে ঠিক তখন অধরা পেছনে থেকে বলল,

“এখন যা বললেন সব কথা মজা করে বললেন তাই না!”

রুদ্র ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। তির্যক কণ্ঠে বলল,

“রুদ্র নেওয়াজ আর যাই হোক সম্পর্ক নিয়ে মজা করার মানুষ না। আমি তোকে ভালোবাসি।”

অধরা থমথমে মুখে জিজ্ঞাসা করলো,

“বড় আব্বু আর বড় আম্মুর চাপে পড়ে বলছেন না তো?”

রুদ্র হাসলো। এক পা এগিয়ে আবারও পেছনে ফিরে বলল,

“চাপে পড়েই হোক আর যেমন করেই হোক, ভালোবাসি মানে ভালোবাসি। আর এর থেকে ব্যাতিক্রম কোনো উত্তর আমার কাছে নেই। তু্ই যেভাবেই নিসনা কেনো, আমার থেকে একটা উত্তরই আসবে, আমি তোকে ভালোবাসি।”

এই বলে রুদ্র চলে গেলো। অধরা সেদিকে তাকিয়ে খুশি হলো। মুচকি হেসে পেছন ফিরলো। সামনে আবার সোহাকে দেখে সব খুশি হাওয়া হয়ে গেলো। বেচারিকে বোঝাতে চেয়েও পারছে না। ও ফোনটা হাতে নিয়ে আদ্রকে মেসেজ দিলো—

—তোমার আসতে কতক্ষন লাগবে?

আদ্র গাড়ি ড্রাইভ করছে। পাশে ওর বাবা আরমান নেওয়াজ ফোন স্ক্রল করছেন। আদ্র ফোনটা হাতে নিয়ে অধরার মেসেজ রিপ্লাই দিলো,

—আসছি, একটু ওয়েট কর না!

—সোহা ঘুমিয়ে গেলো প্রায়।

—ঘুমাক। পারলে তু্ইও ঘুমা। দরজা টা খোলা রাখিস। কথা বলবো সোহার সাথে।

—ঠিক আছে।

আদ্র ফোনটা রেখে চিন্তিত হয়ে স্টিয়ারিং ঘুরাচ্ছে। আরমান নেওয়াজের কাছে ছেলের চিন্তিত ভরা মুখখানা নজর এড়ালো না। তিনি ফোনটা রেখে জিজ্ঞাসা করলেন,

“কিছু নিয়ে চিন্তা করছো নাকি?”

আদ্র মাথা নাড়িয়ে বলল,

“ওই আর কি একটা প্রেজেন্টেশন আছে কালকে। সেটা নিয়েই চিন্তায় আছি।”

“ওহ, আমি ভাবলাম অন্য কিছু নিয়ে।”

আদ্র মনে মনে বলল—কি নিয়ে যে চিন্তায় আছি যদি বলতে পারতাম তাহলে কতই যে ভালো হতো বলে বোঝাতে পারবো না। এখন সোহার কথা বলতেও পারছি না। এখন বাড়িতে যাবো, সোহাকে বোঝাবো তারপর এই চিন্তা থেকে মুক্তি পাবো।

আদ্র কথাগুলো মনে মনে বলে ঘাড় ঘুরিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

“এই যে বিয়ে নিয়ে এতো নাটক করছি, তোমার বড় ছেলে কি বিয়েতে এবার রাজি হবে?”

আরমান নেওয়াজ ভাবুক গলায় বললেন,

“হবে হবে। তবে ওকে এতো প্রেসার দিলেও তো হবে না। আস্তে আস্তে সব করুক ও।”

“হুম, তাও খারাপ বলোনি।”

আদ্র বাড়িতে ফিরলো তখন বাজে রাত এগারোটা। গাড়িটা গ্যারেজে রেখে খুব তাড়াহুড়ো নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো। আরমান নেওয়াজই মেইন দরজা বন্ধ করে চলে গেলেন আগে। আদ্র ড্রইং রুমের টি-টেবিলের উপরে গাড়ির চাবিটা রেখে চলে এলো উপরে। অধরার ঘরের সামনে এসে দরজায় হাত দিতেই বুঝলো দরজা খোলা। আদ্র রুমে ঢুকলো। অধরা তখন ডায়েরি নিয়ে বসেছিলো। আবার কিছু লিখছিলোও। আদ্রকে দেখে উঠে এসে দরজা বন্ধ করতে করতে বলল,

“দরজাটা তো বন্ধ করবে। কেউ এদিকে এলে তোমাদের সব কাহিনী ধরে ফেলবে।”

আদ্র স্বস্তি ফেলে বলল,

“তু্ই আছিস তো ধরবে না।”

“হুম, এখন কথা বলো। আমি ব্যালকনিতে যাচ্ছি।”

“থাক না এইখানেই।”

অধরা কোমরে হাত রেখে দাড়িয়ে বলল,

“তোমাদের মাঝে থেকে আমি কি করবো শুনি। ওকে উঠিয়ে কথা বলো, ঘুমায়নি কাঁদছে। আমি ব্যালকনিতে গিয়ে বসছি।”

“ঠিক আছে।”

অধরা পুনরায় ডায়েরিটা আর একটা কলম নিয়ে ব্যালকনিতে চলে গেলো। ডায়েরিটা খুলে একটু আগে রুদ্রর বলা কথাগুলো লিখতে শুরু করলো। এই ডায়েরিটাই ওর ভালো-খারাপ সবসময়ের সাথী। সব কিছু এই ডায়েরিতে লিখে রাখবে। বিশেষ করে এই ডায়েরিটা লুকিয়েই রাখে। এমনকি সোহাকেও দেখায়না।

এদিকে আদ্র এসে বিছানায় বসলো। সোহার উপরে থেকে চাদর সরিয়ে নিতেই বুঝতে পারলো সোহা ঘুমায়নি। ফিকরে ফিকরে কাঁদছে। আদ্র সোহাকে ধরে বসালো। সোহা বসে চোখ মুছে বলল,

“এখানে এসেছো কেনো?”

“তোর জন্য এসেছি।”

সোহা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অভিমানী কণ্ঠে বলল,

“আসতে হবে না। তুমি ঝিলিকের কাছেই যাও। ওকে তো ভালোবাসো। আমাকে তো ভালোবাসো না। তাহলে আমার কাছে কি?”

আদ্র পা তুলে বসলো বিছানায়। এরপরে রয়েসয়ে বলল,

“তু্ই আসলেই একটা গাধা। তোর কাছে কেনো আসি তু্ই বুঝিস না। তোকেই তো ভালোবাসি।”

“আমাকে ভালোবাসো তাহলে ঝিলিককে বিয়ের কথা সবার সামনে বলতে পারলে কি করে?”

“তু্ই পুরো কথাটা তো শুনবি!”

“কি কথা?”

আদ্র বলল,

“শোন, ঝিলিককে বিয়ের করবো এটা সম্পূর্ণ একটা নাটক। বাবা এসব বলতে বলেছে।”

আদ্র সোহাকে সব কথা খুলে বলল। শেষে সোহা রেগে গিয়ে পাশে থেকে বালিশটা নিয়ে মারতে মারতে বলল,

“যদি সত্যি বিয়ে ঠিক করে আসে তাহলে দেখো তোমার কি করি।”

আদ্র বালিশটা কেড়ে নিয়ে বলল,

“আরে যাবে না। আর সব বলেই তো দিয়েছি তোকে। এখন ঘুমা, অধরাও মনে হয় ঘুমাবে। আমি আসি।”

আদ্র বিছানায় থেকে নামার আগে ব্যালকনির দরজার দিকে একবার তাকালো। এরপরে সোহার দিকে এগিয়ে এসে আস্তে করে বলল,

“চলে যাচ্ছি, একটা কিস দিবি?”

সোহা আদ্রর কাঁধে কিল মেরে বলল,

“কিসব বলছো, যাও তো!”

আদ্র আবারও পা উঠিয়ে রয়েসয়ে বসে বলল,

“না যাবো না, একটা কিস দিবি তারপর যাবো। দরকার হলে এখানেই বসে থাকবো। তোদের ঘুম নষ্ট করবো। কি করবি বল? যা গালে ছোট্ট করে একটা কিস দে।”

“কিন্তু আপু দেখে ফেললে!”

আদ্র গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“দিলে দে না দিলে চলে গেলাম। আর যদি না দিস তাহলে ওই ঝিলিককেই বিয়ে করে নিবো দেখিস।”

সোহা মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না। দিচ্ছি, দিচ্ছি।”

সোহা আদ্রর গালে কিস করে আসফাঁস করতে করতে বলল,

“এখন চলে যাও প্লিজ। আপু এসে পড়বে।”

আদ্র হেসে বলল,

“হুম যাচ্ছি।”

আদ্র উঠে অধরার কাছে এসে বলল,

“অধরা রুমে এসে দরজাটা লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়।”

অধরা উঠে দাড়িয়ে বলল,

“বাব্বাহ এখন দেখি খুশি খুশি লাগছে। ব্যাপার কি?”

আদ্রর পেটে আর কথা রইলো না। আস্তে করে বলেই দিলো,

“বলদের কাছে একটা কিস চেয়েছি। গালে কিস দিয়ে মনে কর এখন ভয়ে স্ট্রোক করার পর্যায়ে চলে গিয়েছে।”

অধরা হেসে বলল,

“বাহ্! ভালোই। তো ট্রিট দিও কালকে।”

“তা দেবো, এখন শুয়ে পড়। আমি গেলাম রে!”

“ঠিক আছে।”

আদ্র রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। বাহিরে দাড়িয়ে ছিলো রুদ্র। আদ্রর খুশি রুদ্রর চোখেও পড়লো। রুদ্র ওকে ডেকে বলল,

“এতো রাতে এখানে?”

“আসলে একটু কথা বলতে গিয়েছিলাম ওদের সাথে।”

“ওহহ।”

আদ্রকে আর কিছু বলল না। ও চলে গেলো। রুদ্র সেখানেই দাড়িয়ে ফোনটা বের করে মেসেজ দিলো অধরাকে—

—কিরে কোনো উত্তর দিলি না যে?

এই লিখে দিলো। এপাশে অধরা ফোনটা হাতে নিয়ে রুদ্ররই কল নাহয় মেসেজের অপেক্ষায় ছিলো। আর মেসেজও পেলো। অধরা লিখলো—

—কি উত্তর দিবো?

—ভালোবাসি বললাম যে সেটার উত্তর! কিছুই তো বললি না।

—আপনি দাঁড়ালেনই না কি করে বলবো!

—দাঁড়ালে কি বলতি?

—বলতাম কিছু একটা।

—তাহলে আবার আয়, আমি তোর রুমের সামনেই দাড়িয়ে আছি।

অধরা কপাল কুঁচকে লিখলো—

—রুমে যাননি?

—উহু।

—কেনো?

—তোর থেকে কিছু একটা শুনে তারপর যাবো।

—কি শুনতে চান?

—ভালোবাসিস আমায়?

অধরা হেসে লিখলো,

—বলতেই হবে?

—হুমম। বলতেই হবে।

—এখন না পরে বলবো। ঘুম পাচ্ছে অনেক।

—এড়িয়ে যাচ্ছিস?

—উহু।

রুদ্রও বুঝতে পারছে অধরার উত্তর হ্যা হবে। তাই ও এখন আর কথা বাড়াতে চাইলো না। লিখলো,

—ঠিক আছে, তাহলে পরেই বলিস। আর এখনই ঘুমিয়ে পড়বি? পাশেরটা ঠিক হয়েছে? দেখলাম তো আদ্র বের হলো।

—হুমম, দুজনের মিল হয়েছে।

—ওহ, তাহলে ঘুমা।

—আপনি ঘুমাবেন না?

—হুমম।

পরদিন সকালবেলা রুদ্র ঘুমিয়ে ছিলো। হঠাৎ করে দরজায় চাপর মারার শব্দে ওর ঘুম ভাঙলো। কোনোরকম উঠে বসে পাশে থেকে টিশার্টটা হাতে নিলো। ও আবার রাতে খালি গায়েই ঘুমায়।বলতে গেলে অভ্যাস।

টিশার্ট পড়ে বিছানায় থেকে নামলো রুদ্র। দরজাটা খুলে দিতেই অধরাকে দেখে অবাক হলো। অধরা রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল,

“কখন থেকে দরজা ধাক্কাচ্ছি শোনেননি?”

“ওই ঘুমিয়ে ছিলাম।”

অধরা হাতে কফি নিয়ে এসেছে। রুদ্র কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। অধরা কফির মগটা বিছানার সাইড টেবিলে রেখে বলল,

“দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি কফি বানিয়ে এনেছি। আর একটা কথা বলতে এসেছি, একটু পরে কলেজে যাবো। আপনাকে নিয়ে যেতে হবে।”

রুদ্র অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। ভাবতে লাগলো এক রাতে এতো পরিবর্তন! অধরা রুম থেকে বেরোনোর আগে রুদ্রর বিছানাটা গুছিয়ে দিয়ে চলে গেলো।

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন