#প্রণয়বেলায়_তোমার_আগমন (২৬)
#জেরিন_আক্তার
দুপুরের দিকে অধরা রুকাইয়ার সাথে সাথে কাজ করে দিচ্ছিলো বলতে, রুকাইয়া আজ তার সব শাড়ি রোদে দিয়েছিলেন। এবং সেগুলো একা একা সেগুলো ভাজ করতে পারছিলেন না বলে অধরাকে ডাকেন। অধরা শাড়ি ভাজ করে রাখছিলো বিছানায়। আর ওর বড় আম্মুকে বলছিলো,
“জানো বড় আম্মু আমারও এতগুলো শাড়ি হবে। সেগুলো সব গুছিয়ে রেখেছি। সবগুলোই নতুন। একদিন কি দুদিন পড়েছি। আম্মুকে দেখাইনি। দেখলেই বকবে। কিন্তু তাকে কে বোঝাবে শাড়ি দেখলেই আমার মাথা ঠিক থাকে না।”
রুকাইয়া রসিকতা করে বললেন,
“বিয়েটা হোক, বিয়ের পরে যেনো শাড়িই পড়তে হয়।”
“আমার সমস্যা নেই। শাড়ি আমার খুব ভালো লাগে।”
এরপরে রুকাইয়া অধরাকে বললেন যেগুলো শাড়ি ভাজ করা হয়েছে সেগুলো কাভার্ডে তুলে রাখতে। অধরা সেগুলো কাভার্ডে রাখতে গেলো এবং সেখানে একটা শাড়ি প্যাকেট করা দেখে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
“বড় আম্মু এটার ভিতরেও কি শাড়ি?”
রুকাইয়া কাভার্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“হুমম। ওইটায়ও শাড়ি।”
“ওহ। স্পেশাল বুঝি?”
রুকাইয়া হেসে বললেন,
“হুম। ওইটা রুদ্রর বউয়ের জন্য।”
“ওহ।”
অধরা চুপচাপ শাড়িগুলো ভাজ করে রাখলো। আল্লাহ ভালো জানে রুদ্রর বউ কে হবে? অধরা ভাবতে ভাবতে রুমে এলো। রিডিং টেবিলে বসে একটা বইয়ের পেছনে থেকে একটা চাবি বের করলো। এরপরে সেটা দিয়ে রিডিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে ওর ডায়েরিটা বের করলো। কিছু কথা লিখলো আবার আগের কিছু লেখাও পড়লো।
বিকেলে রুদ্র ফিরলো অফিসে থেকে। রুমে ফিরে ড্রেস চেঞ্জ করে শাওয়ার নিতে ঢুকলো। অধরা রুদ্রকে একনজর দেখার জন্য রুমের বাহিরে দাড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে। রুদ্র ওয়াশরুম থেকে বের হলো শুধু একটা টাওয়াল পরে। আর গুন গুন করে গান গাচ্ছিলো। রুদ্র দেখার আগেই অধরা পিছিয়ে সরে যেতেই ধাক্কা খেলো ফুলদানির সাথে। কাঁচের ফুলদানিটা পড়ে ভেঙে গেলো। অধরা নিচে বসে কাচগুলো তুলছিলো। ওর মা দেখলে নিশ্চই কেলাবে। রুদ্র আচমকা এমন শব্দ পেয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। অধরাকে কাচ তুলতে দেখে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
“কি করছিস তু্ই খালি হাতে কাচ তুলছিস কেনো?”
অধরা পেছন ফিরে তাকালো। রুদ্র ধমক দিয়ে বলল,
“উঠ! মাথায় সেন্স নেই? খালি হাতে কেউ কাচ ধরে?”
অধরা উঠে দাড়ালো। সোহা রুম থেকে বেরিয়ে রুদ্র অধরাকে একসাথে থেকে আবার কি যেনো মনে করে রুমে ঢুকলো। অধরা উঠে দাড়িয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“আসলে ওই যে এখান দিয়ে বিড়াল, বিড়াল যাচ্ছিলো। বিড়ালই ফেলে দিয়েছে।”
রুদ্র ভাবুক গলায় বলল,
“বুঝেছি কোন বিড়ালে ফেলেছে। এই বাড়িতে একটা আতঙ্ক নামে বিড়াল আছে। সেই ফেলে দিয়েছে।”
কথাটা অধরার গায়ে লাগলো। সাথে সাথে রেগে বলল,
“সবসময় আমাকে আতঙ্ক আতঙ্ক বলেন কেনো?”
“আমি কি তোকে কিছু বলেছি? আমি বলেছি বিড়ালকে। তা তোর গায়ে লাগলো কেনো রে! তু্ই কি তাহলে এসে উঁকি দিচ্ছিলি?”
“মোটেও না। আপনাকে কেনো উঁকি দিয়ে দেখতে যাবো। আর নিজেকে সবসময় এতো এক্সপেন্সিব ভাবেন কেনো? চোর কোথাকার।”
রুদ্র নাক-মুখ কুচকে নিয়ে বলল,
“কিহ চোর? তোর কোন দিক দিয়ে মনে হয় আমি চোর।”
অধরা ঝাড়ি মেরে বলল,
“এতো কিছুর হিসাব-নিকাশ দিতে পারবো না। আপনি আমার কাছে চোরই।”
রুদ্র রেগে গিয়ে বলল,
“আবার চোর বলছিস?”
“রাখুন তো! এখন রুমে গিয়ে চুল মোছেন আর আমার সামনে যখন-তখন খালি গায়ে আসবেন না তো!”
রুদ্র বাকা হেসে বলল,
“কেনো আমাকে খালি গায়ে দেখলে তোর মাথায় কি অন্যকিছু ঘোরে নাকি?”
অধরা নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
“আপনার মাথায় কি খারাপ কথা ছাড়া আর কথা আসে না? আপনার সাথে ভালো কথা বলাও বেকার। গেলাম, থাকুন আপনি। ”
অধরা চলে গেলো। রুদ্র মুচকি হাসতে হাসতে ভেজাচুলগুলো ঝাড়ি মারলো। রুমে ফিরে এসে সাদা রঙের টি-শার্ট আর কালো ফুল প্যান্ট পড়ে নিলো। শার্টের কলার ভেঙে, চুলগুলো মুছলো।
অধরা রুমে ফিরে নিজের মাথায় নিজেই গাট্টা মেরে বসে রইলো। একেকসময় কি যে করে বসে ও বুঝেই না। এখন নিশ্চই রুদ্র খেতে নিচে যাবে। সেই অনুযায়ী অধরা ফোনটা নিয়ে নিচে চলে এলো। সোফায় বসে ফোন দেখার বাহানা করে রুদ্রকে দেখবে।
রুদ্র নিচে এলো খেতে। রুকাইয়া খাবার বেড়ে দিলেন। অধরা ফোন নিয়ে নাটক দেখছে। তখন ভিডিও কলে আদ্র কল দিলো। অধরা কল রিসিভ করতেই আদ্র ওর সামনে সি-ফুড দেখিয়ে অধরাকে বলল,
“এই দেখ তোকে রেখে সি-ফুড খাচ্ছি।”
অধরা রাগে গাল ফুলিয়ে বলল,
“ঢং! আবার দেখাতে হবে কেনো? খাও খাও পেট খারাপ করবে।”
“তা করবে না। তোর হাতের পায়েস খেয়েই যখন পেট খারাপ করেনি তাহলে এসব খেলেও কিছু হবে না।”
অধরা রুকাইয়াকে বলল,
“বড় আম্মু দেখো তোমার ছেলে আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে খাচ্ছে।”
রুকাইয়া এগিয়ে এসে আদ্রকে বললেন,
“আদ্র সি-ফুড কি পার্সেল করে আনা যায়? আবার অনেক পেজেও দেখলাম পাওয়া যায়। যদি পারিস ওখানে থেকেই ব্যবস্থা করে নিয়ে আয়।”
আদ্র হেসে বলল,
“আমি এতো দাম দিয়ে ওই ঝগড়ুটের জন্য আনতে পারবো না। ও কি কম মারে আমাকে। আমি কেনো ওর জন্য আনতে যাবো!”
অধরা রেগে গিয়ে বলল,
“আমার ফোনে কল দিয়েছো কেনো? কেটে দাও!”
অধরা নিজেই ফোনটা নিয়ে কেটে দিলো। এরপরে এখন ওর রাগ কিসে খাটাবে সেটা খুঁজতে লাগলো। পরক্ষনেই দাঁত চেপে বলল,
“শুধু বাড়িতে আসুক তোমার ছেলে। হাড্ডিগুড্ডি একটাও থাকবে না। তোমার ছোট ছেলে একটা ডাকাত, ছিনতাইকারী, মাদক ব্যাবসায়ী।”
রুদ্র খিলখিলিয়ে হেসে বলল,
“এগুলো বকা হলো!”
অধরা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“আপনিও একটা চোর!”
রুদ্রর হাসি যেনো থামছেই না। অধরা রাগে গটগট করে চলে গেলো উপরে। রুকাইয়া এতক্ষন হাসি আটকে রেখেছিলেন খুব কষ্টে। ও চলে যেতেই তিনিও হেসে উঠলেন। এগুলো কি বকা হলো। আর কোনো নাম পেলো না। শেষে বড় ভাইয়ের কপালে চোর উপাধি আর ছোট ভাইয়ের উপরে ডাকাত, ছিনতাইকারী, মাদক ব্যাবসায়ী উপাধি বসিয়ে দিলো।
রুদ্র খাওয়া-দাওয়া শেষ করে অধরার রুমে এলো। ও অন্যমনস্ক হয়ে ডায়েরিটা সামনে নিয়ে বসে ছিলো। রুদ্র চুপিচুপি এগিয়ে গিয়ে ডায়েরিটা ছুঁতে নিলেই অধরা ধ্যান থেকে বেরিয়ে ডায়েরিটা বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
“ডায়েরি ধরবেন না।”
“কেনো? পার্সোনাল বুঝি?”
“হুম, খুব পার্সোনাল।”
“দেখাও যাবে না?”
“উহু।”
“বেশ রেখে দে যত্ন করে।”
রুদ্র না করলো ঠিকই কিন্তু ওর কৌতূহল ওই ডায়েরিটার উপরেই। কি আছে ওই ডায়েরি তে ভাবতে ভাবতে ও বলল,
“অধরা এইটায় কি তোর সুখ-দুঃখের কথা লিখে রাখিস নাকি রে?”
“ওসব ছাড়ুন। কিছু বলতে এসেছেন?”
“হুমম।”
“বলুন!”
“আই লাভ ইউউউ!”
“তারপর কি?”
রুদ্র কপাল কুঁচকে বলল,
“তারপর আবার কি? আই লাভ ইউ টু বল! এতবড় হয়েছিস এখনও বলে দিতে হয়।”
অধরা মুখ ভেঙচি দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। রুদ্র আরও ওকে খোঁচানোর মতো কথা বলে চলে গেলো। এরপরে অধরা সেই ডায়েরিটা জায়গা মতো রেখে চলে গেলো নিচে।
রাতের খাবার খেয়ে অধরা ওর বাবার রুমে এসেছিলো। ওর বাবার সাথে একসাথেই বসে কথা বলছিলো। কথা বলতে বলতে অনিমা রুমে ফিরে অধরাকে খেয়াল করে দেখলেন ঘুম ঘুম ভাব হয়েছে। তিনি অধরাকে বললেন শুয়ে পড়তে রাত হয়েছে। অধরা ফোনটা রেখেই চলে আসে। আসলেই খুব ঘুম পাচ্ছে। বিকেলে আবার এলার্জির ওষুধ খেয়েছিলো। যতবারই এলার্জির ওষুধ খায় তারপর থেকেযে ঘুম পায়। আরিফ নেওয়াজ অধরার ফোনটা খেয়াল করে অনিমাকে বললেন,
“অনিমা তোমার মেয়ে ফোনটা রেখেই গিয়েছে।”
“ওহ, থাকুক। সকালে নিবে। এখন ঘুমাক।”
“ঠিক আছে।”
রাত ১ টা ছুঁইছুই—
সবাই তখন গভীর ঘুমে। অধরাও ঘুমিয়ে। রুদ্রর চোখে ঘুম নেই। ছাদে বসে আছে। সাথে ফোনে গান শুনছে। আর খুব করে চাইছে এই সময় যদি অধরা আসতো। কতই না ভালো হতো।
রুদ্র অধরাকে কল দিলো। ফোনটা ছিলো আরিফ নেওয়াজের বালিশের পাশে। ফোনটা বেজে উঠায় তিনি সজাগ হলেন। ফোনটা হাতে নিয়ে উঠে বসলেন। নাম্বারটা সেভ করা নেই। তাই কপালে ভাজ ফেলে বসে রইলেন। আবার যদি কল আসে তাহলে ধরবেন। অনিমাও উঠে বসলেন। রুদ্র আবারও কল দিলো। আরিফ নেওয়াজ রিসিভ করে কানে নিলেন। রুদ্র ওপাশে থেকে বলল,
“কি মানুষ রে তু্ই! এই পাশে তোর অভাবে ঘুম আসছে না আর তু্ই এতো ঘুমাস কি করে। আয় না একটু ছাদে, একটু কু-প্রস্তাব দেই। সাথে কু-ইশারাও।”
অনিমা শুনেও না শোনার ভান করে শুয়ে পড়লেন। আরিফ নেওয়াজ দাঁতে দাঁত চেপে রইলেন। রুদ্রকে কিছু বলতে না দিয়ে কলটা কেটে দিয়ে বিছানায় থেকে নেমে গেলেন। আবার কি মনে করে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। রুদ্র আবার কল দিলো। আরিফ নেওয়াজ আবারও কল ধরলেন। রুদ্র উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
“কিরে কথা বলছিস না কেনো? খুব ঘুম দেখাচ্ছিস! একবার বিয়েটা করতে দে, তারপর ঘুম বের করবো।”
আরিফ নেওয়াজ কি বলবেন কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। ছেলেটার লাজ-লজ্জা নেই বললেই চলে। কলও কেটে দিতে পারছেন না, আবারও কল দিচ্ছে। আরিফ নেওয়াজ শেষে গলা খাকারি দিয়ে বললেন,
“রুদ্র রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়ো!”
রুদ্র কিছু সেকেন্ডের জন্য নিরেট বেধে রইলো। এরপরে শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
“আস্সালামুআলাইকুম শশুর আব্বু। আপনার মেয়ে কোথায়?”
আরিফ নেওয়াজ রাগে দাঁত চেপে বললেন,
“রাত হয়েছে জামাই বাবা রুমে ঘুমিয়ে পড়ো!”
বলে কলটা কেটে দিলো আরমান নেওয়াজ। রুদ্র বাকা হাসি দিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।
চলবে....