#প্রণয়বেলায়_তোমার_আগমন (৩১)
#জেরিন_আক্তার
রাতে রুদ্রর মন-মেজাজ খারাপ থাকায় ও ওর মাকে থাকতে দিলো না। জোর করেই রুমে পাঠিয়ে দিলো। এদিকে অধরা রুমে এসে দরজা লাগিয়ে ব্যালকনিতে বসে রুদ্রর সেই কথা নিয়ে পড়ে আছে। ওর ইচ্ছে করছে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে। রুদ্র কেমন করে বলল আমার ঘরে আর আসবি না। অধরা বিড়বিড় করে বলল,
“এহ, আমি মনে হয় তার ঘরে যাওয়ার জন্য সবসময় বসে থাকি। যাবো না ওই চোরের ঘরে। তখন জ্বরের কথা বড় আম্মুকে না বললে কেমন হতো! উনার ছেলে উনার জানার অধিকার তো আছেই। আমি কি উনার বউ যে সেবা করবো। বিয়ে করার নাম নেই আর থাকতে বলে। বাড়ির সবাই কি ভাববে। আমিও যাবো না ওই ঘরে। দেখি কতক্ষন না বলে থাকতে পারে। আমার উপরে রাগ দেখানো না। আমিও নরম হবো না।”
______________
অধরা ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতো ওর বাবার জন্য কফি বানালো। রুদ্রর জন্য বানায়নি। আরিফ নেওয়াজ নিচে নামেননি। তাই অধরা কফি নিয়ে তার ঘরেই এলো। অধরা ওর বাবাকে কফি দিয়ে বিছানায় বসে হেডবোর্ডে হেলান দিলো। এরপরে ওর বাবার ফোনটা হাতে নিয়ে বলল,
“আব্বু পার্সেল আসার কথা ছিলো কালকে। তোমাকে কেউ কল দেয়নি?”
“কালকে, দেয়নি তো। মনে হয় আজকে দিতে পারে।”
অনিমা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে হাত-মুখ মুছতে মুছতে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আরিফ নেওয়াজ অধরাকে বললেন,
“তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো!”
অধরা ফোন রেখে বলল,
“বলো!”
অনিমা পেছন ফিরে তাকালেন। আরিফ নেওয়াজ গলা খাকারি দিয়ে বললেন,
“তুমি কি রুদ্রকে বিয়ে করতে চাও? মানে আমাদের মত তো আছেই। এখন তোমার কি মত?”
অধরা মাথাটা নিচু করে বলল,
“তোমার যা ইচ্ছা তাই করো।”
অনিমা মুচকি হেসে আবারও সামনে ফিরলেন। মেয়ের উত্তর তাহলে হ্যা। আরিফ নেওয়াজ মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
“তবুও তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই মা। হ্যা কি না সেটা বলো। আমি তো তোমার ফ্রেন্ড। ফ্রেন্ডকে বলতে তো কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা না।”
অধরা মুচকি হেসে উপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হ্যা।”
আরিফ নেওয়াজ হেসে মেয়ের কপালে চুমু দিলেন। অধরা সুযোগ একটা পেলো রুদ্রর নামে বদনাম করার। ও অভিযোগ সুরে বলল,
“আব্বু জানো রুদ্র ভাই আমাকে রাতে কি বলেছে।”
অনিমা তড়িৎ পায়ে এগিয়ে এলেন। আরিফ নেওয়াজ বুঝতে পারলেন রুদ্র কি বলতে পারে। নিশ্চই ঠোঁটকাটা কোনো কথা। তিনি বিষয়টা এড়িয়ে যেতে বললেন,
“রুদ্র যাই বলেছে মজা করে বলেছে হয়তো।”
অধরা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“উহু আব্বু, মজা করে কিচ্ছু বলেনি। রাতে উনার জ্বর এসেছে। তাই আমি বড় আম্মুকে বলেছি। এর জন্য রুদ্র ভাই আমাকে বলেছে তু্ই আমার ঘর থেকে বের হ। আর আমার ঘরে আসবি না। একবার বললে তাও মানা যেতো কিন্তু দুইবার। দুইবার করে বলেছে।”
আরিফ নেওয়াজ বললেন,
“মজা করেই হয়তো বলেছে মা।”
“আব্বু মজা করে বলেনি। উনি ধমক দিয়ে বলেছে। আব্বু তোমার মেয়েকে ধমক দিয়েছে। আরও ধমক দেয় কিন্তু বলিনা।”
অধরা জানে ওর বাবা কিচ্ছু বিশ্বাস করবে না। তাই ও ওর বাবার মাথাটা বিগড়ে দিতে উঠে দাড়িয়ে বলতে শুরু করলো,
“আব্বু তুমি এই পর্যন্ত আমাকে একবারও ধমক দিয়ে কথা বলোনি। আর উনি আমাকে ধমক দিয়েছে তাও আবার বড় আম্মুর সামনে। আমার খারাপ লেগেছে আব্বু।”
আরিফ নেওয়াজ গম্ভীর হয়ে গেলেন। মেয়ের খারাপ লেগেছে আর তিনি এখন সেটাকে মজা ভাববেন তা না। কিন্তু এতে কি বা করবেন তিনি। রুদ্রকে বকবেন। কিন্তু ছেলেটা তো তেমন না। বড়ও হয়েছে। বকলে কেমন দেখায়। আরিফ নেওয়াজ এতো ভাবাভাবি বাদ দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“তুমি রুমে গিয়ে পড়তে বসো। আমি কলেজে নিয়ে যাবো আজকে।”
“ঠিক আছে আব্বু।”
আরিফ নেওয়াজ এইটা না বললে এতক্ষনে তার মেয়ে একদফা রাগ ঢালতো। যদি কোনো কিছুই না বলতেন তাহলে অধরা বলতো, আব্বু তুমি রুদ্রর পক্ষে চলে গেলে।
এদিকে রুদ্র ঘুম থেকে উঠল ৭ টার দিকে। ফোনটা হাতে নিয়ে টাইম দেখতেই ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিলো। শোয়া থেকে উঠে বসে বলল,
“৭ টা বাজলো অথচ অধরা ডাকতে এলো না। প্রতিদিন তো ৬ টা বাজলেই হামলা চালায় দরজার উপরে। আজ হামলা চালালো না ব্যাপার কি!”
রুদ্র ফ্রেশ হয়ে নিচে এলো। পরিবেশ এতো শান্ত দেখে অবাক হলো কি। নাজমা এগিয়ে এসে রুদ্রকে বললেন,
“রুদ্র এখন কি শরীরে জ্বর আছে?”
“না ছোট আম্মু। জ্বর নেই।”
“কিছু খাবি?”
“না। আচ্ছা ছোট আম্মু অধরা, সোহা কোথায়?”
“নিজেদের ঘরেই তো।”
“ওহহ।”
ওখানেই বসে ছিলেন আদনান নেওয়াজ। তিনি আর রুদ্র বন্ধুর মতোই। ছোটবেলা থেকেই রুদ্র আদনান নেওয়াজের কাছেই বেশি থেকেছে। আদনান নেওয়াজ রুদ্রকে বললেন,
“কিরে কই থাকিস? তোর সাথে তো আর রাতে দেখাই হলো না কালকে। আয় বস!”
“চাচ্চু তুমি বসো আমি একটু আসছি।”
“ঠিক আছে যা।”
রুদ্র সিঁড়ি বেয়ে উপরে এলো। অধরার রুমে এসে দেখলো ও রুমে নেই। নিশ্চই সোহার রুমে আছে। রুদ্র সোহার রুমের সামনে এসে নক করতেই সোহা দরজা খুলে দিলো। রুদ্র জিজ্ঞাসা করলো,
“তোর গুরু কোথায়?”
“অধরা আপু?”
“হুমম। কোথায়?”
“আপু কোথায় জানি না তো!”
রুদ্র সাথে দ জিজ্ঞাসা করলো,
“আদ্র কোথায় রে?”
সোহা পট করে বলে দিলো,
“ভাইয়া রুমেই শুয়ে আছে।”
রুদ্র মুখ বাকিয়ে বলল,
“আদ্রর খবর ঠিকই রাখিস, আর অধরা কোথায় থাকে তা জানার মনেও করিস না। বিয়েটা করতে দে, তোর আশেপাশেও যেতে দিবো না।”
সোহা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। রুদ্র যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলল,
“দাড়া তোদের আয়েস করে প্রেম করা বের করছি। আমাকে তো চিনিস না, যেমন ভালো আমি, তেমন খারাপও আমি।”
রুদ্র রুম থেকে বেরিয়েই ধাক্কা খেলো আদ্রর সাথে। আদ্রকে দেখে খোঁচা মেরে বলল,
“ওহ তু্ই। যা যা সোহা তোরই অপেক্ষা করছে। পড়া বুঝতে পারছে না। আমি আবার জিজ্ঞাসা করেছি আমি বুঝিয়ে দিবো। সোহা বলে, না আদ্র ভাই ছাড়া পড়া মাথায় ঢোকে না। যা ভাই যা, চাচাতো বোনকে নিজের বোন মনে করে পড়া বুঝিয়ে দে। যেনো একটু পাশটা করতে পারে। নাহলে নেওয়াজ বাড়ির ইজ্জত যাবে।”
আদ্র ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। রুদ্রর কথায় পুরো শকড ও। কি উত্তর দিবে জানা নেই। শেষে আমতা আমতা করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো। রুদ্র চলে এলো ছাদে। আর অধরাকে ছাদেই পেলো। দোলনায় বসে ফোনে কথা বলছে। রুদ্র হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এসে ফোনটা নিয়ে কানে ধরলো। জুঁই কথা বলছে। রুদ্র কলটা কেটে দিয়ে অধরার পাশে বসলো। অধরা মুখ ভেঙচি দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। রুদ্র অধরার চোয়ালে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ঠোঁটে চুমু দিলো। পরপর দুবার চুমু দিলো। অধরা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থেকে উঠে দাড়ালো। রুদ্র ফোনটা এগিয়ে দিলো। অধরা ফোনটা নিয়ে চলে আসতে নিলে রুদ্র বাকা হেসে বলল,
“তু্ই যদি চলে যাস তাহলে এখন যেভাবে চুমু দিলাম ঠিক সেভাবেই খাবার টেবিলে সবার সামনে তোকে চুমু দিবো।”
অধরা পেছনে না ফিরে বেরিয়ে এলো ছাদে থেকে। রুদ্র দোলনায় দুলতে দুলতে বাকা হেসে আওড়ালো,
“সুযোগ একটা নিজই বানিয়ে দিয়ে গেলি। দেখা যাক চুমু দিতে পারি কিনা।”
অধরা রুমে ফিরে আয়নার সামনে দাড়ালো। আয়নায় নিজের ঠোঁটের দিকে তাকাতেই লজ্জায় দুহাত তুলে মুখ ঢাকলো। ইশ, লোকটার লাজ-লজ্জা কিচ্ছু নেই। মুখে লাগাম নেই সেটা জানা ছিলো। কিন্তু রুদ্রর কাজেও যে লাগাম নেই অধরা এবার বুঝলো। হুটহাট জড়িয়ে ধরবে, আবার চুমু খেলো তিনবার।
অধরা অনেক সাহস নিয়ে খাবার টেবিলে এসে ওর বাবার পাশে বসলো। রুদ্র এখনও আসেনি। অধরা আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে কখন আসে। আর খুব দ্রুত খাবার খাচ্ছিলো। রুদ্র এসে বসলো ওর সামনাসামনি। আরিফ নেওয়াজ আড়চোখে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে দেখে খাওয়ায় মনোযোগ দিলেন। কয়েক মিনিট পেরোতেই রুদ্র অধরার পায়ে স্লাইড করতে শুরু করলো। অধরা তাকালো রুদ্রর দিকে। রুদ্র তখনই ইশারায় চুমু দিলো। অধরা মাথাটা নত করে খাবার খাচ্ছে। রুদ্র পায়ে স্লাইড করা বন্ধ করলো। যারপরনাই অধরা আবারও মাথা তুলে তাকালো। রুদ্র আবারও চুমু ইশারা করলো। আরিফ নেওয়াজ রুদ্রর দিকে তাকালেন। রুদ্র তাকে দেখে ফিচেল হেসে দিলো।
আদনান নেওয়াজ রুদ্রর কানে কানে ফিসফিস করে বললেন,
“বাপ আমার, চুপচাপ খেয়ে অন্য কোথাও গিয়ে চুমু দিস। এখন এটা পাবলিক প্লেসই মনে কর।”
রুদ্র টেবিলের নিচে থেকে অধরার নাম্বারে কল দিলো। অধরা ফোনটা ব্যাগে রেখেছিলো। খাবার রেখে উঠে সোফায় গিয়ে ব্যাগ থেকে ফোন বের করলো। যখন দেখলো রুদ্রর নাম্বার তখন ফোনটা বন্ধ করে চলে এলো। আদ্র জিজ্ঞাসা করলো,
“কল দিয়েছে ধরলি না?”
“জুঁই কল দিয়েছে। হয়তো অপেক্ষা করছে।”
“তাড়াতাড়ি খেয়ে চল তাহলে।”
রুদ্র ভ্রু কুঁচকে আদ্রকে বলল,
“অধরা তোর সাথে যাবে?”
আদ্র কিছু বলার আগেই অধরা বলল,
“আব্বু নিয়ে যাবে আজকে।”
রুদ্র নাটকীয় ভঙ্গিতে আরিফ নেওয়াজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মেঝো আব্বু তোমার না কাজের চাপ। তুমি কি করে ওকে নিয়ে যাবে? এর থেকে আমি ওকে নিয়ে যাই?”
আরিফ নেওয়াজ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“ঠিক আছে নিয়ে যেও।”
অধরা কিছু বলল না। খাবার খেয়ে রুদ্রর গাড়ির কাছে এসে দাড়ালো। সোহা আর রুদ্র আসছে একসাথে। দুজনে মনে হয় কিছু একটা যুক্তি করতে করতে আসছে। তিনজনেই গাড়িতে উঠে বসলো। অধরা সোহার সাথে ব্যাক সিটে বসেছে। রুদ্র আসার সময় সোহাকে শিখিয়ে দিয়েছে ও যেনো অধরাকে পুরোটা সময় কথায় ভুলিয়ে রাখে। সোহা তাই করলো। শুধু শুধু কত কথা বলছে। দেখতে দেখতে রুদ্র গাড়ি থামালো। অধরা বাহিরে তাকিয়ে বলল,
“এটা কোথায়? গাড়ি কি নষ্ট হলো নাকি?”
রুদ্র গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল,
“তোরা নাম গাড়ি থেকে।”
অধরা গাড়ি থেকে নেমে সামনেই সাইনবোর্ডে দেখলো “কাজী অফিস” লেখা। অধরা ঢোক গিলে রুদ্রকে বলল,
“ভাইয়া কাজী অফিসে কেনো এলাম।”
রুদ্র অধরার হাতটা ধরে বলল,
“কাজী অফিসে মানুষ কিসের জন্য আসে? নিশ্চই বিয়ে করতে। ভিতরে চল!”
অধরা শুকনো ঢোক গিলে রুদ্রর সাথে সাথে গেলো ভিতরে। মনে প্রশ্ন জাগছে কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের করতে পারছে না অধরা। ভিতরে যেতেই রুদ্রর একটা বন্ধু নাম মেহেদী, ও এগিয়ে এসে বলল,
“বন্ধু এসেছিস? আয় সব রেডি। তোদেরই অপেক্ষা করছিলাম।”
রুদ্র আরও শক্ত করে অধরার হাতটা ধরে কাঁচের দরজাটা ঠেলে কাজীর রুমে/কেবিনে ঢুকলো।
চলবে....