#প্রণয়বেলায়_তোমার_আগমন (৩৬)
#জেরিন_আক্তার
অধরা রুমের দরজা একটু চাপিয়ে আয়নার কাছে এসে দাড়ালো। রুদ্র শুয়ে আছে সেটা দেখে মুচকি মুচকি হেসে রিডিং টেবিলে এসে বসল। এরপরে ডায়েরিটা বের করে কিছু লিখলো। রুদ্র চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখলো। ইচ্ছে করছে ডায়েরিটা পড়তে। কিন্তু ও তো বলেই রেখেছে পার্সোনাল এটা। তবুও ও আজ একটু হলেও পড়বেই। রুদ্র উঠে বসে শার্টটা খুলে অধরাকে বলল,
“অধরা একটু পানি দে না!”
অধরা ডায়েরিটা রেখে এগিয়ে এসে পানি দিলো আর বলল,
“আপনি দিনের বেলা ঘুমাবেন। তাও খালি গায়ে ঘুমাতে হবে?”
রুদ্র বাকা হেসে বলল,
“হুমম। খুব গরম লাগে তোকে ছাড়া। আয় না তোকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাই।”
“অসভ্য লোক। মুখে যদি একটু ভালো কথা আসে।”
“বিয়েটা কর এরপরে আমি সত্যিই ভালো হয়ে যাবো। একদম ইনোসেন্ট স্বামী হয়ে থাকবো। প্রমিস।”
“হয়েছে। চাপা মারা বন্ধ করে এখন ঘুমান! আমার জানা আছে আপনি বিয়ের পরে কতটুকু ইনোসেন্ট থাকবেন।”
“অধরা একটা কাজ করে দে তো! ড্রইং রুমে আমার ফোন রেখে এসেছি। ফোনটা নিয়ে আয়।”
অধরা অবলীলায় চলে গেলো। আবার তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে কারণ ডায়েরিটা ঐভাবেই রেখে গিয়েছে। রুদ্র ঝটপট উঠে রিডিং টেবিলে গিয়ে ডায়েরিটা খুলল। শুরু থেকে কয়েকটা পাতা পড়ার মাঝে নিজের নাম, আর ছবি পেলো। রুদ্র অবাকের শেষ প্রান্তে। থতমত খেয়ে গেলো। না চাইতেই কেমন বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আরও কিছু লেখাও পড়লো। তবে অধরা চলে আসার ভয়ও পাচ্ছে। রুদ্র তাড়াহুড়ো করে ডায়েরিটা রেখে বিছানায় এলো। অতঃপর আগের মতোই উঁবু হয়ে শুলো। অধরা তার পরপরই রুমে এসে বলল,
“ভাইয়া, আপনার ফোন তো ড্রইং রুমে পেলাম না।”
রুদ্র থমথমে মুখে বলল,
“হয়তো রুমে। থাক লাগবে না। ঘুমাবো।”
“রুমে থেকে এনে দিবো?”
“উহু। তু্ই পড়তে বস।”
অধরা রিডিং টেবিলে এসে বসলো। রুদ্র অন্যদিক ফিরে শুয়ে রইলো। অধরার ডায়েরিতে নিজের ছবি, নিজেকে নিয়ে কতশত কথা লেখা দেখার পর থেকেই ওর কেমন একটা অস্থির লাগছে। অধরা ঝটপট ডায়েরিটা আগের জায়গায় রেখে বই বের করলো। তবে চাবিটা আগের জায়গায় রাখলো না, একটা খাতার ভিতরে রেখে বুকসেলফে রাখলো।
সন্ধ্যার দিকে রুদ্র ঘুম থেকে উঠে বসলো। অধরা রুমে নেই। রুদ্র দুবার ওকে ডেকে কোনো সাড়া না পেয়ে বিছানায় থেকে নেমে শার্টটা পড়ে বের হলো রুম থেকে। সামনেই এসে দাড়ালো অধরা। মুখে সেই চিরচেনা হাসি ফুটিয়ে বলল,
“উঠে গিয়েছেন এতো তাড়াতাড়ি ঘুম শেষ হলো?”
“হুমম।” রুদ্রর কণ্ঠে গম্ভীরতা। এরপরে বলল,
“রেডি হ, বাহিরে যেতে হবে।”
অধরা হেসে আবদার সুরে বলল,
“বলছি বোরখা নাই পড়লাম।”
রুদ্র ধরা গলায় বলল,
“তাহলে যাওয়ার কি দরকার? পুরোনো কাপড় পড়েই থাকিস বিয়ের অনুষ্ঠানে।”
অধরা রেগে মিনমিন করে বলল,
“ঠিক আছে, রেডি হচ্ছি।”
অধরা রুমে ঢুকে রেডি হলো। আদ্র আর সোহাকেও বলা আছে। সোহা রেডি হয়ে এসে আদ্রর রুমে ঢুকলো। আদ্র আয়নার সামনে দাড়িয়ে শার্টের বোতাম লাগাচ্ছিলো। সোহা এগিয়ে আসতেই আদ্র বলল,
“তোকে একটা কথা বলার ছিলো। এসেছিস ভালোই হয়েছে।”
“হ্যা বলো!”
“শোন এখন একসাথে বাহিরে যাবো। রুদ্র ভাইও থাকবে। তু্ই কিন্তু আমার ধারের কাছেও আসবি না।”
“কেনো?”
“কেনো আবার, দেখিস না ভাইয়া কেমন খোঁচা মেরে কথা বলে।”
“ঠিক আছে।”
অধরার রেডি হওয়ার আগেই রুদ্র রেডি হয়ে এসে হাজির। এসেই অধরাকে তাড়াতাড়ি রেডি হতে বলছে। অধরা রেডি হয়ে রুদ্রর সাথে চলে এলো। সাইড ব্যাগ, ফোন নিলো না। আর নিলেও দরকার হয়না। টাকা দেওয়ার রুদ্রই দেয়, আর ফোন তো দরকারই হয়না।
…..
রুদ্র ড্রাইভ করছে, পাশে আদ্র। আর অধরা সোহা ব্যাক সিটে। রুদ্র থেকে থেকে লুকিং গ্লাসে অধরার দিকে তাকাচ্ছিলো। আবার তখনকার সেই ডায়েরির কথাও ভাবছিলো। এউ ভাবছিলো অধরার সাথে বড্ড অন্যায় করে ফেলেছে। মেয়েটা যে ভালোবেসে গিয়েছে কখনও কাউকেই বুঝতে দেয়নি। এমন কি রুদ্রর সাথে কথাও বলার চেষ্টাও করেনি। এভাবেও ভালোবাসা যায়? প্রশ্ন টা নিজেই নিজেকে করলো রুদ্র। অতঃপর গভীর শ্বাস ছেড়ে অধরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। আগে হয়তো অজান্তেই কষ্ট দিয়ে ফেলেছে অধরাকে। তবে এবার আর কষ্ট দিবে না। বরং সুন্দর একটা সংসার গড়বে।
এর কিছুক্ষন পরে রুদ্র, আদ্র আর সোহাকে শুনিয়ে অধরাকে বলল,
“অধরা তোর খালাতো বোন ঝিলিক আর জীবনকেও আগে আসতে বলিস। ওরা থাকলে আরও মজা হবে। আর ঝিলিক তো আদ্রকে পছন্দই করে। আর আদ্রও তো বলছিলো বিয়ে করবে এখন আবার কি হলো আদ্র?”
সোহা আদ্রর দিকে তাকালো। আদ্র আমতা আমতা করে বলল,
“আসলে বাবা বলল তোমার বিয়ের পরেই এইটা নিয়ে আলোচনা করবে।”
রুদ্র বাকা হেসে বলল,
“শোন আমার বিয়ের মধ্যে তো ও আসছেই। তো এই সুযোগে ওর আশেপাশেও থাকতে পারবি। কিরে সোহা তোর ছোট ভাবি হিসেবে ঝিলিক কেমন হবে রে?”
সোহা থমথমে মুখে বলল,
“ভালো।”
আদ্র মনে মনে বলল,
“এমনেই সোহার মাথা বিগড়ে যায়। তার মধ্যে আবার ঝিলিককে নিয়ে কথা বলে ব্রেইন ওয়াশ করলে তো আরও বিগড়ে যাবে। আল্লাহ তুমি রুদ্র ভাইকে হেদায়েত দাও। নাহলে আমি বিয়ে করতে পারবো না।”
গাড়ি থেকে নেমেই আদ্র অধরাকে কিছু একটা ইশারা করলো। অধরা তা বুঝে মনে মনে বলল, আল্লাহ আমার অর্ধেক জীবন যাবে ওদের ঝামেলা শেষ করতে।
কথাটা ভেবে অধরা সোহার হাত ধরে যেতে যেতে বলল,
“তু্ই কিন্তু রুদ্র ভাইয়ের কথা সিরিয়াস নিসনা। তু্ই কিন্তু জানিস ভাইয়া ঝিলিককে পছন্দ করে না। রুদ্র ভাই তোদেরকে জ্বালাতন করতে এমন বলল। আদ্র শুধু তোকেই ভালোবাসে। বুঝেছিস?”
সোহা বলল,
“হুমম আপু বুঝেছি। তুমি চিন্তা করো না। আমি ভুল বুঝবো না আদ্র ভাইকে। ও তো ভালোবাসে আমাকে।”
“হ্যা, এটাই মাথায় রাখবি। নাহলে তো সেই ঝামেলা আমাকেই মিটাতে হয়। আমি এখন এইসব ঝামেলার মধ্যে নেই। সামনে বিয়ে, বিয়ে নিয়ে চিন্তায় আছি বুঝেছিস।”
“হুমম, আপু বুঝেছি।”
রুদ্র হুট্ করে অধরার হাত ধরে টান দিলো। সোহার থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অধরার হাত ধরে হাঁটা দিলো। আর বলল,
“তু্ই শুধু আমার হাত ধরবি।”
অধরা চোখ ছোট-ছোট করে বলল,
“মেয়ে মানুষ হাত ধরলেও আপনার সহ্য হয়না?”
“উহু সহ্য হয়না। আমি বাদে যেই তোর হাত ধরবে সেই মনে কর আমার শত্রু। আগে আমি ছিলাম না, তখন সোহা হাত ধরেছে সেটা নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। তবে এখন আমি এসে গিয়েছি। এখন এই হাত আমার।”
সোহা আবার আদ্রর জন্য দাড়ালো। ও পেছনে পড়েছে। অধরা যেতে যেতে হুট্ করে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল,
“ভালোবাসেন আমায়?”
রুদ্র ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“আর কতবার শুনতে চাস তু্ই?”
“আরে বলুন তো!”
“হুমম। ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি তোকে।”
অধরার মুখে হাসি ফুটে উঠল। রুদ্রর হাতটা আঁকড়ে ধরে বলল,
“এবার ঠিক আছে চলুন।”
রুদ্র কি যেনো ভেবে দাড়িয়ে পড়লো। জেদ ধরে বলল,
“আমি যাবো না।”
“কেনো আপনার আবার কি হলো?”
“ভালোবাসিস আমায়?”
অধরা মুখের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“উহু ভালোবাসি না।”
“তাহলে একাই যা। যাবো না আমি।”
“যাবেন না?”
“না, যাবো না। এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো।”
অধরা নিচে বসে পড়লো। রুদ্র আশেপাশে তাকিয়ে বলল,
“আরে উঠ, বসলি কেনো?”
“উঠবো না। চলুন আমার সাথে।”
রুদ্র দাঁত চেপে বলল,
“ঠিক বাপের মতো জেদ হয়েছে। ভাঙবে তো মচকাবে না। উঠ! ভালোবাসি বলতে হবে না। যেদিন ইচ্ছে হয় বলিস।”
অধরা বিশ্বজয় করা হাসি দিয়ে উঠে দাড়িয়ে রুদ্রর হাত ধরে বলল,
“চলুন।”
রুদ্র শ্বাস ছেড়ে বলল,
“আল্লাহ আল্লাহ করে বিয়েটা হতে দে, তখন দেখবো ভালোবাসি না বলে যাস কই?”
অধরা যেতে যেতে হেসে বলল,
“আমিই বলবোই না ভালোবাসি।”
রুদ্র হেসে বলল,
“তার মানে বাসিস।”
অধরা না বোঝার ভান করে মাথা দুদিক নাড়িয়ে বলল,
“উহু বাসি না। চলুন।”
রুদ্র কিছু বলবে ঠিক তখন হঠাৎ চোখে যেনো কি যায়। চোখে হাত দিয়ে ডলতে শুরু করলো। অধরা বুঝতে পেরে রুদ্রর দুগালে হাত রেখে অস্থির কণ্ঠে বলল,
“দেখি দেখি.. আমার দিকে তাকান। আমার দিকে তাকান, দেখছি কি গিয়েছে।”
রুদ্র তাকালো। সোহা একটা টিস্যু বের করে দিলো। অধরা সেটা দিয়ে চোখের ভিতরে যাওয়া ছোট্ট একটি পোকা বের করলো। এরপরে রুদ্রর চোখে ফুঁ দিলো। রুদ্র কি কোনো তালে আছে! ও অধরার দিকে তাকিয়ে আছে তো আছেই। অধরা বলল,
“কি হলো স্বাভাবিক লাগছে না।”
রুদ্র মাথা কাত করে বলল,
“হুমম লাগছে।”
“তাহলে চলুন যাই।”
রুদ্র হাসলো। অধরা জিজ্ঞাসা করলো,
“কারণ ছাড়া হাসছেন কেনো?”
রুদ্র অধরার হাত ধরে গভীর গলায় বলে,
“ভালোবাসি কথাটা শোনার চেয়ে, বেশি আনন্দ হয়, যখন মানুষটার ব্যবহারে ভালোবাসা
প্রকাশ পায়।”
অধরা মুচকি হেসে সামনের দিকে তাকিয়ে রুদ্রর সাথে হাঁটা দিলো।
এদিকে পেছন পেছন আদ্র আর সোহা যাচ্ছে। আদ্রর ইচ্ছা হচ্ছে সোহার হাত ওভাবে ধরে যেতে। কিন্তু যে খোঁচা মেরে কথা বলে তার থেকে না ধরাই ভালো। কিন্তু মন যে মানে না। আদ্র সোহার হাতটা ধরে হাঁটা দিলো। যা হবার হবে।
শপিং করা শেষে সব ব্যাগগুলো এনে গাড়ির টিকিতে রাখা হলো। আদ্র, অধরা, সোহা গাড়িতে উঠতে নিলে রুদ্র তিনজনকেই উদ্দেশ্য করে বলল,
“শোন আগেই গাড়িতে উঠিস না। একটা কথা বলবো।”
আদ্র বলল,
“হ্যা বলো!”
রুদ্র গাড়ির চাবিটা আদ্রর হাতে দিয়ে বলল,
“তু্ই ড্রাইভ কর। আর সামনে বসবি সোহা। আর অধরা আমার সাথে পেছনে বসবি। কথা ক্লিয়ার!”
সোহা সাথে সাথে বলে দিলো,
“ঠিক আছে বসছি।”
সোহার কথায় রুদ্র মুখটিপে হেসে গাড়িতে উঠল। সাথে অধরাও। আদ্র গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার সাথে সাথে রুদ্র অধরার কোলে মাথা রেখে শুলো। অধরা ইতস্তত গলায় বলল,
“আ আপনি এভাবে শুলেন।”
রুদ্রর থেকে কোনো উত্তর এলো না। ওর কোনো উত্তর দিতেও ইচ্ছে করছে না। ডায়েরিটা দেখার পর থেকে ইচ্ছে করছে অধরাকে জড়িয়ে ধরে থাকতে। একটুও হাতছাড়া করতে ইচ্ছে করছে না।
কিছুদূর যাওয়ার পরে আদ্র গাড়ির স্প্রিড কমিয়ে আনলো। এরপরে পেছন ফিরে অধরাকে বলল,
“অধরা তোর না ফুল পছন্দ, ফুল কিনে নিয়ে আসি।”
কথাটা বলার একটাই উদ্দেশ্য সেটা সোহাকে ফুল দেওয়া। আর রুদ্র মাথাটা তুলে খোঁচা মেরে বলল,
“আমার বউকে আমিই কিনে দিতে পারবো। আপনি বরং সোহাকে কিনে দিন। বেচারার কেউ নেই।”
অধরা মুখটিপে হাসলো। যা দেখে আদ্র রেগে দাঁত চেপে সামনে ফিরলো। রুদ্র উঠে বসে বলল,
“গাড়িটা সাইডে রাখ!”
আদ্র গাড়ি থামাতেই রুদ্র বলল,
“সোহাকে নিয়ে যা, দেখ কি ফুল নিবে। আর অধরা নাম তো গাড়ি থেকে। তোকে আমি কিনে দিবো। কারো ফুল নিতে দিবো না।”
আদ্র এই সুযোগ আর হাতছাড়া করতে চায় না। তবে সোহাকে সাথে নিয়ে গেলে আরও কথা শুনতে হবে। তাই ওকে রেখেই চলে গেলো ফুল আনতে। সোহার জন্য গোলাপ ফুল নিয়ে এলো। অধরার জন্য কিনার সাহস হয়নি। যার বউ সেই দিক, ওর কি!
রুদ্র অধরাকে নিয়ে এলো ফুলের দোকানে। অধরাকে জিজ্ঞাসা করলো, “কি ফুল নিবি?”
“যা দিবেন তাই নিবো।”
“গোলাপ না বেলী?”
“দুটোই দিন।”
রুদ্র আগে বেলী ফুলের গাজরা নিয়ে অধরার হাতে পেঁচিয়ে দিলো। এরপরে গোলাপের ঝুড়ি থেকে, সুন্দর দেখে একটা গোলাপ তুলে অধরার হাতে দিয়ে বলল,
“ফুলের মধ্যে যেমন গোলাপ সেরা,
ঠিক তেমনি হাজারো মানুষের ভিড়ে আমার কাছে তুই সেরা।”
চলবে....