#প্রণয়বেলায়_তোমার_আগমন (৪২)
#জেরিন_আক্তার
সকাল ৭ টা—
অধরা ঘুম থেকে জাগনা পেয়ে উঠে বসলো। রুদ্র তখনও আসেনি। ও বিছানায় থেকে নেমে রুমের লাইট জ্বালিয়ে ওয়াশরুমে গেলো। ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে এসে ব্যালকনির দরজাটা খুলে দিয়ে বিছানায় এলো। ফোনটা হাতে নিয়ে টাইম দেখতেই বিড়বিড় করে বলল, “সাড়ে ৭ টা বেজে গিয়েছে আর দেখো ঘুম থেকে উঠতেই পারিনি।”
অধরা ফোনটা রেখে বিছানাটা ঝাড়া দিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাড়ালো। এর মাঝে ঝিলিক এলো ডাকতে।
“কিরে তোদের কি ঘুম ভাঙেনি?”
অধরা দরজার কাছে গিয়ে বলল,
“দরজা খোলা, ভিতরে আয়!”
ঝিলিক ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
“বাব্বাহ, এতো আগেই ঘুম ভাঙলো। ভেবেছিলাম তো সকাল ১০ টার আগে উঠবিই না।”
অধরা হালকা হেসে বলল,
“বস!”
ঝিলিক এগিয়ে এসে অধরাকে একটু ধাক্কা দিয়ে আস্তে করে বলল,
“কিরে বাসর রাত কেমন কাটলো?”
অধরা লজ্জা পেয়ে বলল,
“চুপ করতো। কিছু বলবি?”
“হুম প্রথম প্রথম এসবই বলবি। তো তোর ধৈর্যহারা জামাই কই?”
অধরা পুনরায় আয়নার সামনে এসে বলল,
“বাহিরে গিয়েছে বোধহয়।”
“নতুন বউ রেখে বাহিরে গিয়েছে? তাহলে কি রাতে….”
“এই তু্ই চুপ করবি? নাকি আদ্রর সাথে তোর বিয়েটা দিয়ে দিবো।”
ঝিলিক গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“দিলে দিবি আমার সমস্যা নেই। অবশ্য বিয়ে হলে তোর জা হবো।”
বলেই খিলখিলিয়ে হাসা। অধরা দরজা লাগিয়ে দিয়ে এসে ভেজাচুলগুলো ছেড়ে আঁচড়ে নিলো। ঝিলিক হেসে হেসে বলল,
“কিরে দুজনে একসাথে শাওয়ার নিয়েছিলি নাকি?”
লজ্জায় অধরার গাল দুটো লাল হয়ে গেলো। কান দিয়ে ধোয়া বের হচ্ছে। রাগ দেখাতে গিয়েও হেসে ফেললো আর বলল,
“আর লজ্জায় ফেলিস নাতো। এমনেই উনি সারাক্ষন এমন কথা বলে। আর তু্ইও কম না।”
ঝিলিক মুখটিপে হেসে বসে রইলো। এরপরে চলে যেতে নিলে অধরা বলল শাড়িটা ঠিক করে দিতে। ঝিলিক শাড়ি ঠিক করে দিতে গিয়ে দেখলো অধরার গলায় কামড়ের দাগ। ও আবারও অধরাকে কিছু বলার জন্য প্রস্তুত হলো। কিন্তু অনিমার ডাকে আর কিছু বলতে পারলো না। তাড়াহুড়ো করে শাড়িটা ঠিক করে দিয়ে চলে গেলো। অতঃপর অধরা আয়নার সামনে বসে একটা স্কিন টোনের সাথে মিলিয়ে ফাউন্ডেশন বের করে গলায় ব্লেন্ড করে নিলো,যাতে দাগtটা না বোঝা যায়। এরপরে নিজেকে পরিপাটি করে উঠে দাঁড়াতেই রুকাইয়া রুম খোলা পেয়ে অধরাকে দেখে ভিতরে এসে বললেন,“ওহ রেডি হয়ে গিয়েছিস। তোকে খুব সুন্দর লাগছে। একদম বউ বউ।”
এই বলতে বলতে রুকাইয়া এগিয়ে এসে অধরার মাথায় ঘোমটা তুলে দিয়ে বললেন,
“রুদ্র কই?”
“কোথায় যেনো বেরোলো, আসেনি।”
“ও আসবে। তু্ই আমার সাথে নিচে চল!”
“হুমম চলো।”
“আর শোন, নিচে গিয়ে বাবা-চাচাদের সালাম করবি।”
অধরা “ঠিক আছে।” বলেই নিচু হয়ে রুকাইয়ার পা ধরে সালাম করতে নিলে রুকাইয়া ওকে ধরে হেসে বললেন,
“আরে মা আমাকে সালাম করতে হবে না। সবসময় তোদের জন্য দোয়া করি।”
“হুমম এখন চলো!”
অধরা কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ি পড়েছে। শরীরের রঙের শাড়িটা বেশ মানিয়েছে। স্বর্ণের চেইন, নাকফুল, আংটি, চুরি পড়াতে পরিপূর্ণ বউ বউ লাগছে। যে কেউ দেখলেই কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকবে।
অধরা রুকাইয়ার সাথে নিচে এলো। রুদ্র মাত্র ফিরে এসে খাবার টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে পানি খাচ্ছে আর ফোন স্ক্রল করছে। হুট্ করে চোখ যায় অধরার দিকে। পানির গ্লাসটা রেখে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। অধরা তাকাতেই রুদ্র মুচকি হাসলো। অধরাও মুচকি হেসে সোফার কাছে গিয়ে আরমান নেওয়াজকে সালাম করতেই তিনি অধরাকে ধরে বললেন,
“আরে সালাম করতে হবে না।”
অধরা হালকা হেসে ওর বাবার কাছে গিয়ে সালাম করতেই তিনি পা সরিয়ে মেয়েকে ধরে হেসে বললেন,
“ধুর পাগলী।”
অধরা শেষে গেলো আদনান নেওয়াজের কাছে। তিনি আগেই বললেন,
“সালাম করতে হবে না মা। দোয়া করি তোরা সুখী হ। তোদের ভালোবাসা আর দৃঢ় হোক।”
অধরা ওর মা আর ছোট চাচির দিকে যেতেই অনিমা হেসে হেসে বললেন,
“আমাদের দিকে এসে লাভ হবে না। আমরা সালাম করতে দিবো না।”
অধরা তবুও গেলো। জোর করে সালাম করে এসে ড্রইং রুমে একপাশে দাড়ালো। আদনান নেওয়াজ অধরাকে বললেন,
“সবাইকেই সালাম করলি রুদ্রকেও কর। ও বাদ যাবে কেনো?”
অধরা লজ্জা পেলো। রুদ্র মুখটিপে হেসে আদনান নেওয়াজের দিকে তাকাতেই তিনি চোখ টিপ দিলেন। রুদ্র ঘাড় চুলকে দাঁড়িয়ে রইলো। অধরা এগিয়ে এসে দাড়ালো রুদ্রকে সালাম করলো। রুদ্র ওকে ধরে হাসলো। বড়দের সামনে বলার মতো কোনো কথা পেলো না।
আদনান নেওয়াজ হেসে রুদ্রকে বললেন,
“এসো জামাইবাবা আমাদের পাশে বসো!”
রুদ্র হেসে এগিয়ে এসে আদনান নেওয়াজের পাশে বসলো। আদনান নেওয়াজ রুদ্রর পিঠে হাত রেখে ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিলো। বেচারা রুদ্র লজ্জা পেয়ে আস্তে করে বলল,
“তোমাকে শুধু একা পাই।”
এরপরে রুদ্র ফোনটা বের করে উঠে দাঁড়িয়ে বাহানা দিয়ে বলল,
“একটা কল এসেছে, উপরে থেকে কথা বলে আসছি।”
আদনান নেওয়াজ আস্তে করে বললেন,
“হ্যা যাও, আর বউকেও সাথে নিয়ে যাও। নাহলে কিন্তু বউ লুকিয়ে ফেলবো।”
আরিফ নেওয়াজ তা শুনে গলা খাকারি দিয়ে ফোন বের করলেন। মনে মনে বললেন, এই ছেলের সাথে সাথে আদনানেরও মাথা গেছে। কারোরই লজ্জা নেই।
অধরা এসে অনিমাকে জিজ্ঞাসা করলো,
“আম্মু ঝিলিক, সোহারা কোথায়?”
“দেখ ওরা তো মনে হয় উপরেই।”
অধরা উপরে চলে এলো। ওর নিজের রুমে ঢুকতে নিলে দেখতে পায় রুম বাহিরে থেকে লক তাহলে এই ঘরে কেউ নেই। ও হাঁটা দিলো সোহার রুমের দিকে। মাঝে আদ্রর রুমের দরজা খোলা পেয়ে রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
“দেবর মশাই কি করছেন?”
আদ্র তখনও ঘুমিয়ে। অধরা আর ডাক দিলো না। বেরিয়ে রুদ্রর রুমে এলো। রুদ্র ব্যালকনি থেকে রুমে ঢুকতে ঢুকতে রসিকতা করে বলল,
“আপনি মনে হয় ভুল করে এই রুমে ঢুকে পড়েছেন। আমার বউ দেখলে কিন্তু আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে।”
অধরা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে কোমরে হাত রেখে বলল,
“আচ্ছা.! ডাকুন আপনার বউকে দেখি ডিভোর্স দেয় নাকি?”
রুদ্র না বোঝার ভান করে বলল,
“কি বলুন তো, সকালে বউকে রেখে একটু বাহিরে গিয়েছিলাম। এসে আর দেখতে পাইনি। আচ্ছা আপনি কি দেখেছেন আমার আতঙ্ক নামের বউটাকে।”
অধরা দাঁত চেপে আওড়ালো,
“আজ সত্যি। সত্যিই আপনাকে ডিভোর্স দিবো। অসভ্য লোক!”
রুদ্র ওর মুখপানে তাকিয়ে জড়ানো গলায় বলল,
“বউ, আমি তো এখন থেকে 100% তোরই। একটু শিখিয়ে পড়িয়ে আমাকে অসভ্য থেকে ভালো ছেলে বানিয়ে দে না।”
অধরা বলল,
“আপনি না বলেছেন বিয়ের পরে ভালো হবেন, ইনোসেন্ট হবেন। সে কথার কি হলো!”
রুদ্র গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“বলেছিলাম তো, আবার প্রমিসও করেছিলাম। কিন্তু তখন তো বলিনি বিয়ের পরে সবসময়ই ইনোসেন্ট হবো। অল্প সময়ের জন্য ইনোসেন্ট হলেই তো হবে।”
অধরা হতবাক ওর কথায়। বিয়ের আগে বলেছিলো কি আর হলো কি।
অধরা জিজ্ঞাসা করলো,
“এখন কোথায় গিয়েছিলেন?”
“ওই একটু কাজে?”
“কি কাজে?”
রুদ্র বাকা হেসে বলল,
“কৈফিয়ত চাইছিস?”
“কেনো চাইতে পারিনা? পূর্ণ অধিকার আছে কৈফিয়ত চাওয়ার!”
রুদ্র বিছানায় শুয়ে বলল,
“তু্ই চাইলে তো কৈফিয়ত না, রুদ্র নেওয়াজ নিজের জীবনটাও তোকে দিয়ে দিবে।”
অধরা এগিয়ে এসে বলল,
“জীবন চাইনা। আপাতত বলুন কি কাজে গিয়েছিলেন।”
“সারপ্রাইস।”
অধরা পাশে বসে বলল,
“সিরিয়াস।”
“হুমম সিরিয়াস সারপ্রাইস দিবো।”
“ঠিক আছে।”
সকালের খাওয়া-দাওয়া শেষ হবার পরে আদনান নেওয়াজ রুদ্রকে ডাক পাঠিয়ে ছাদে এলেন। রুদ্র এলো। আদনান নেওয়াজ বললেন,
“রুদ্র কালকে সকালে চলে যাবো। পরশু থেকে কলেজে ক্লাস শুরু।”
“কালকেই। আরকটা দিন থাকবে না।”
“না রে বাপ যেতে হবে। তো যার জন্য ডেকেছি। কালকে কি সোহাকে সাথে নিবো।”
রুদ্র মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হুমম, নিয়ে যাও। তবে আগেই বলো না। রাতে বলবে যে আমাদের সাথে যেতে হবে। এমন ভাবে বলবে যেনো ও রাজি হতে বাধ্য হয়।”
“ঠিক আছে।”
রুদ্র উনার হাত ধরে বলল,
“চাচ্চু আর দুটো দিন ম্যানেজ করে থাকো না। প্লিজ।”
“হচ্ছে না তো বাপ। কি করবো।”
এদিকে বেলা ১১ টার দিকে আদ্রর ঘুম ভাঙে। ও উঠে নিজের দিকে তাকিয়ে রাতের কথা মনে করতে করতে বিছানায় থেকে নেমে দাড়ালো। এখনও ওর মাথা ঝিম ধরে আছে। নিজেই নিজেকে বকে উঠল, কেনো যে ওদের সাথে ঐসব খেতে গেলাম। যা পেটে সয়না তা খেয়ে অবস্থা খারাপ।
আদ্র শাওয়ার নিয়ে বের হলো। এরপরে কালো টিশার্ট আর কালো শর্ট প্যান্ট পড়ে বের হলো। ড্রইং রুমে এসে বসলো। সাদিক কল দিতেই রিসিভ করলো।
“কিরে আদ্র তোকে কখন থেকে কল দিচ্ছি কই তু্ই?”
“ড্রইং রুমে, আয়!”
“আসছি বস!”
মিনিট পাঁচেক পরে সাদিক এসে ওর পাশে বসতেই আদ্র বলল,
“ভাই রাতে ঐসব খাওয়া ঠিক হয়নি রে!”
“কেনো কি হলো আবার!”
“অনেক দিন পরে খেয়েছি তো পেটে সয়নি। দুবার বমি করেছি।”
সাদিক খিলখিলয়ে হেসে বলল,
“তাও ভালো মদ খেয়ে বউ পেটাসনি। লোকে তো দেখি মদ খেয়ে বউ পিটায়, আবার বউয়ের সাথে ইটিস-পিটিস..”
আদ্র ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“হয়েছে থাম ভাই আর বলতে হবে যে বুঝেছি। আর আমাকে বলেও লাভ হবে না। বিয়ে করিনি ভাই।”
অনিমা নিচে নামতে নামতে বলল,
“তোমরা দুজনে খেয়েছো?”
সাদিক বলল,
“আন্টি আমি খেয়েছি। আদ্রকে খাওয়ান।”
আদ্র বলল,
“না মেঝো আম্মু পরে খাবো, ভালো লাগছে এখন।”
“ঠিক আছে।”
রাত ১০ টা —
আদনান নেওয়াজ সোহার রুমে এলেন কথা বলতে।
চলবে....