ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমারই হাত ধরে রবের পথে

৪র্থ পর্ব

লেখক: Nahid Matabbor

তোমারি হাত ধরে রবের পথে




পর্ব–৩ (শেষ অংশ)




> "আল্লাহ যখন দুটি হৃদয়ের জন্য কল্যাণ নির্ধারণ করেন, তখন তাদের পরিচয় কখনো গুনাহের পথে নয়; বরং তাকওয়া, ধৈর্য ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে গড়ে ওঠে।"










বাসটা ধীরে ধীরে স্ট্যান্ড ছেড়ে সামনে এগিয়ে চলল। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীও বাড়তে লাগল। কিছু দূর যেতেই বাসে আর তিল ধারণের জায়গা রইল না।




মুসআব দাঁড়িয়ে ছিল মাঝখানে, এক হাত দিয়ে উপরের রড ধরে। তার চোখ নিচের দিকেই। অযথা এদিক-সেদিক তাকানোর অভ্যাস তার নেই।




আয়াত জানালার পাশের একটি সিটে বসে বাইরের দৃশ্য দেখছিল। গত রাতের বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া শহরটা আজ যেন নতুন লাগছে। রাস্তার ধারে ফুটপাতে কয়েকজন বৃদ্ধ সবজি সাজিয়ে বসেছেন। এক কোণে এক ছোট ছেলে স্কুলড্রেস পরে বাবার হাত ধরে রাস্তা পার হচ্ছে।




হঠাৎ বাসটি জোরে ব্রেক করল।




একজন বৃদ্ধ যাত্রী ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নিলেন।




মুসআব দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাঁকে ধরে ফেলল।




— "চাচা, আস্তে... আপনি ঠিক আছেন?"




বৃদ্ধ লোকটি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,




— "আলহামদুলিল্লাহ বাবা। আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন।"




মুসআব নিজের সিট ছেড়ে তাঁকে বসিয়ে দিল।




বাসের ভেতরে কয়েকজন যাত্রী ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।




একজন বললেন,




— "এখনো এমন ছেলে আছে দেখে ভালো লাগছে।"




মুসআব শুধু মাথা নিচু করল।




প্রশংসা শুনতে তার কখনো ভালো লাগত না। সে মনে মনে শুধু বলল,




"হে আল্লাহ! মানুষের প্রশংসা নয়, আপনার সন্তুষ্টিই যেন আমার লক্ষ্য হয়।"







---




আয়াত সবকিছু নীরবে দেখছিল।




তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে।




এটা কি ভালো লাগা?




না...




সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের মনকে থামিয়ে দিল।




"একজন মানুষের চরিত্রকে সম্মান করা আর তাকে নিয়ে কল্পনার জগৎ বানিয়ে ফেলা— এই দুটো এক জিনিস নয়।"




সে চোখ বন্ধ করে আস্তে করে ইস্তিগফার পড়ল।







---




কলেজে পৌঁছে সুমাইয়া আয়াতকে দেখে বলল,




— "কী রে? আজও তোকে খুব শান্ত লাগছে।"




আয়াত মুচকি হেসে বলল,




— "হয়তো একটু বেশি ভাবছি।"




— "কী নিয়ে?"




— "মানুষকে দেখে বোঝা যায়, ভালো চরিত্র এখনো পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়নি।"




সুমাইয়া হেসে বলল,




— "এটা তো ভালো কথা। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস— ভালো মানুষ দেখলেই তাকে নিজের জীবনের গল্প বানিয়ে ফেলতে নেই।"




আয়াত অবাক হয়ে তাকাল।




তার মনে হলো, বান্ধবী যেন তার মনের অজানা কথাই বলে দিল।




— "জানি। তাই তো নিজের মনকে বারবার বুঝিয়ে দিচ্ছি।"




সুমাইয়া মৃদু হেসে বলল,




— "সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্ক সেই, যেখানে আগে দোয়া থাকে, পরে দেখা।"







---




এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে...




হামজা ক্লাস শেষে মুসআবের পাশে হাঁটছিল।




— "দোস্ত, আগামী সপ্তাহে আমাদের ইসলামী বইমেলা আছে। চলবি?"




মুসআবের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।




— "অবশ্যই। ভালো বইয়ের মতো ভালো সঙ্গী খুব কম পাওয়া যায়।"




হামজা হেসে বলল,




— "এই জন্যই তোকে নিয়ে ঘুরি।"




দুজনেই হেসে ফেলল।







---




বিকেলের দিকে আকাশ আবার মেঘে ঢেকে গেল।




কলেজ ছুটি হওয়ার পর আয়াত বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল।




আজ বাতাসটা বেশ ঠান্ডা।




দূরে কালো মেঘ জমেছে।




হঠাৎ এক বৃদ্ধা মহিলা রাস্তা পার হতে গিয়ে মাঝরাস্তায় আটকে গেলেন।




গাড়ির শব্দে তিনি ভয় পেয়ে গেছেন।




মুহূর্তের মধ্যে মুসআব এগিয়ে গেল।




সে এক হাত দিয়ে গাড়িগুলোকে ধীরে যেতে ইশারা করল, অন্য হাতে বৃদ্ধাকে নিরাপদে রাস্তার ওপারে পৌঁছে দিল।




বৃদ্ধা কাঁপা কণ্ঠে বললেন,




— "বাবা, তোমার মা-বাবা নিশ্চয়ই অনেক ভাগ্যবান।"




মুসআব হেসে বলল,




— "আমার জন্য দোয়া করবেন। এটাই যথেষ্ট।"




দূরে দাঁড়িয়ে আয়াতের ঠোঁটে অজান্তেই একটি দোয়া চলে এলো—




"হে আল্লাহ, এই মানুষটাকে সবসময় হিদায়াতের পথে অটল রাখুন।"




সে নিজের জন্য কিছু চাইল না।




শুধু একজন নেক মানুষের জন্য দোয়া করল।







---




সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে মুসআব নিজের ঘরে ঢুকে কুরআন খুলে বসে গেল।




আজ সূরা আল-কাহফের কয়েকটি আয়াত পড়ছিল।




একটি আয়াতের অর্থ পড়ে সে দীর্ঘক্ষণ চিন্তা করল।




তারপর সিজদায় মাথা রেখে বলল,




— "ইয়া রব! যদি আমার ভাগ্যে কোনো নেক জীবনসঙ্গী লিখে থাকেন, তবে তাকে এমন বানাবেন, যে আমাকে আপনার আরও কাছে নিয়ে যাবে। আর যদি এখনো সেই সময় না আসে, তাহলে আমার হৃদয়কে ধৈর্য দান করুন।"







---




অন্যদিকে...




ইশার নামাজ শেষে আয়াত বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।




মেঘ সরে গিয়ে চাঁদ উঠেছে।




চারপাশে নিস্তব্ধতা।




সে মনে মনে বলল,




"হে আল্লাহ! আমি এমন কাউকে চাই না, যে শুধু দুনিয়ায় আমার সঙ্গী হবে। আমি এমন একজনকে চাই, যে জান্নাতের পথেও আমার হাত ধরে হাঁটতে সাহায্য করবে। আর যদি সেই মানুষটি এখনো আমার জীবনে না আসে, তাহলে আমার হৃদয়কে আপনার ইবাদতেই ব্যস্ত রাখুন।"




তার চোখের কোণে একফোঁটা অশ্রু জমল।




কিন্তু সেই অশ্রু ছিল না কোনো অপূর্ণতার।




সেটা ছিল রবের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার প্রশান্তি।




দূরে কোথাও মসজিদ থেকে কুরআন তিলাওয়াতের সুর ভেসে আসছিল।




একই আকাশের নিচে...




একই সময়ে...




দুটি হৃদয় আলাদা জায়গায় দাঁড়িয়ে একই রবের কাছে একই ধরনের দোয়া করছে।




তারা জানে না ভবিষ্যতে কী লেখা আছে।




কিন্তু তারা এটুকু জানে—




আল্লাহর ওপর ভরসা করে অপেক্ষা করা কখনো ক্ষতির কারণ হয় না।




> "কখনো কখনো আল্লাহ মানুষের সঙ্গে মানুষের পরিচয় করিয়ে দেন, যাতে তারা আগে একে অপরকে নয়, নিজেদের রবকে আরও ভালোভাবে চিনতে শেখে।"










চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন