তোমারি হাত ধরে রবের পথে
Nahid Matabbor
পর্ব–০৬
> **"আল্লাহ কখনো কখনো এমন দু'জন মানুষকে মুখোমুখি দাঁড় করান, যারা প্রথম দেখায় একে অপরকে সহ্যই করতে পারে না। অথচ ভবিষ্যৎ তাদের জন্য অন্য গল্প লিখে রাখে।"
দুপুরের ক্লাস শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে।
কলেজের করিডোরে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। কেউ হাসছে, কেউ তাড়াহুড়ো করে বাসার পথে বেরিয়ে যাচ্ছে।
আয়াত ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ধীরে ধীরে গেটের দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ তার ওড়না ধরে টান দিল।
— "এই, ম্যাডাম! আজকে এত চুপচাপ কেন?"
কণ্ঠটা চেনা।
আয়াত ঘুরে তাকাতেই হেসে ফেলল।
— "মাহিরা!"
মেয়েটা ঠোঁট বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁধ পর্যন্ত চুল, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, মুখে একরাশ আত্মবিশ্বাস। কারও অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকার মেয়ে সে নয়। রাগ উঠলে সামনে কে আছে সেটাও ভাবে না।
— "কী রে? দুই দিন ধরে ফোন দিচ্ছি, ধরিস না কেন?"
— "ব্যস্ত ছিলাম।"
— "তুই আর ব্যস্ত? মিথ্যা বলিস না। চল, ফুচকা খাওয়াবি।"
আয়াত হেসে বলল,
— "আজ না। বাসায় যেতে হবে।"
মাহিরা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
— "তুই না, একদম বুড়ি হয়ে গেছিস!"
দুজন হাঁটতে হাঁটতে বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল।
---
হঠাৎ মাহিরার চোখ পড়ল রাস্তার ওপারে।
একজন ছেলে একজন অন্ধ মানুষকে রাস্তা পার করিয়ে দিচ্ছে।
সাদা পাঞ্জাবি, কাঁধে কালো ব্যাগ।
মুসআব।
মাহিরা একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল।
— "হুম... ভালোই নাটক পারে।"
আয়াত অবাক হয়ে বলল,
— "নাটক?"
— "এই যে এত ভালো মানুষ সাজার চেষ্টা! আজকাল অনেকেই করে। বাইরে একরকম, ভেতরে আরেকরকম।"
আয়াত শান্ত গলায় বলল,
— "সবাইকে না জেনে বিচার করা ঠিক না।"
মাহিরা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— "এই! তুই ওর উকিল নাকি?"
আয়াত একটু থেমে বলল,
— "না... শুধু বললাম, কারও সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে মন্তব্য করা উচিত না।"
মাহিরা হেসে উঠল।
— "আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। তবে আমার অভিজ্ঞতা বলে—এত ভদ্র ভদ্র ছেলেরাই পরে সবচেয়ে বেশি ঝামেলা করে!"
আয়াত কিছু বলল না।
---
ঠিক তখনই একটি রিকশা দ্রুত ঘুরতে গিয়ে এক বৃদ্ধ ফলওয়ালার ঝুড়িতে ধাক্কা দিল।
কমলা, আপেল, কলা সব রাস্তায় গড়িয়ে পড়ল।
লোকজন দাঁড়িয়ে দেখছে।
কেউ এগিয়ে এল না।
মুসআব দৌড়ে গিয়ে ফলগুলো কুড়াতে শুরু করল।
আরেকজন ছোট ছেলেও তাকে সাহায্য করল।
বৃদ্ধ লোকটি কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন,
— "বাবা, এগুলোই আজকের সব পুঁজি ছিল।"
মুসআব পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে বৃদ্ধের হাতে দিতে চাইলে তিনি নিতে রাজি হলেন না।
মুসআব মুচকি হেসে বলল,
— "এটা দান না চাচা। আজ আমি আপনার কাছ থেকে কিছু ফল কিনলাম।"
বলেই টাকা রেখে কয়েকটা কমলা হাতে নিল।
বৃদ্ধ আর কিছু বলতে পারলেন না।
শুধু দুই হাত তুলে দোয়া করলেন।
---
সবটা চুপচাপ দেখছিল মাহিরা।
কিন্তু নিজের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে সে রাজি নয়।
সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— "হতে পারে... মানুষটা অভিনয় এতটাও খারাপ করে না।"
আয়াত হেসে ফেলল।
— "তুই সবকিছুতেই সন্দেহ করিস কেন?"
— "কারণ আমি সহজে কাউকে বিশ্বাস করি না। আর যেদিন বিশ্বাস করি, সেদিন শেষ পর্যন্ত পাশে থাকি।"
এই কথাটা বলার সময় মাহিরার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অন্যরকম একটা ছায়া নেমে এল।
আয়াত সেটা লক্ষ্য করলেও কিছু জিজ্ঞেস করল না।
---
ওদিকে মুসআব কিছুই জানে না।
দুই মেয়ে দূর থেকে তাকে নিয়ে কথা বলছে—এটাও তার অজানা।
সে শুধু মনে মনে পড়ছিল,
> "হে আল্লাহ, আমার কাজের মধ্যে যদি রিয়া (লোক দেখানো) চলে আসে, তাহলে আমাকে ক্ষমা করুন। মানুষের চোখে নয়, আপনার কাছেই কবুল হওয়াই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া।"
---
বাস এসে থামল।
মাহিরা উঠে বসতে বসতে আবার একবার মুসআবের দিকে তাকাল।
তারপর বিরক্ত মুখে ফিসফিস করে বলল,
— "অদ্ভুত ছেলে!"
সে বুঝতে পারল না, কেন ছেলেটার কথা দ্বিতীয়বার তার মাথায় এল।
হয়তো বিরক্তি।
হয়তো কৌতূহল।
অথবা...
ভাগ্য নিজের অজান্তেই প্রথম লাইনটা লিখে ফেলেছে।
চলবে...