ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমারই হাত ধরে রবের পথে

৭ম পর্ব

লেখক: Nahid Matabbor

তোমারি হাত ধরে রবের পথে

পর্ব–০৭

«“কখনো কখনো মানুষ যাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে সাধারণ একটি ঘটনা মনে করে, আল্লাহর কাছে সেটাই হতে পারে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়।”»

বাসটা ধীরে ধীরে সামনে এগোচ্ছিল। জানালার বাইরে দুপুরের ব্যস্ত শহরটা ছুটে চলেছে নিজের গতিতে। কেউ অফিস থেকে ফিরছে, কেউ বাজারের ব্যাগ হাতে রাস্তা পার হচ্ছে, আবার কেউ রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। বাসের ভেতরও কম হইচই নেই।

আয়াত জানালার পাশে বসে চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে ছিল। পাশে মাহিরা। কিছুক্ষণ আগেও যে মুসআবকে নিয়ে নানা কথা বলছিল, এখন সে নিজেই অস্বাভাবিক রকম চুপ।

আয়াত একবার পাশ ফিরে তাকাল।

— “কী হলো? এত চুপ কেন?”

মাহিরা জানালার বাইরে তাকিয়েই বলল, “কিছু হয়নি।”

— “তোর ‘কিছু হয়নি’ কথাটাই সবচেয়ে সন্দেহজনক।”

— “তুই বেশি বুঝিস।”

আয়াত হেসে ফেলল। “আমি তোকে অনেক বছর ধরে চিনি।”

মাহিরা এবার তার দিকে তাকাল। “তাই বলে আমার মাথার ভেতর কী চলছে, সেটাও বুঝে ফেলবি?”

— “চেষ্টা করলে হয়তো পারব।”

— “তাহলে চেষ্টা কর।”

আয়াত একটু থেমে বলল, “তুই ওই ছেলেটাকে নিয়ে ভাবছিস।”

মাহিরার মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল।

— “কোন ছেলেটা?”

— “যাকে একটু আগে দেখলি।”

— “ওহ! মুসআব?”

নামটা মুখে আসতেই মাহিরা নিজেই একটু থেমে গেল। কেন যেন ছেলেটার নামটা মনে রাখা তার দরকার ছিল না। অথচ নামটা তার মাথায় থেকে গেছে।

আয়াত মৃদু হেসে বলল, “হ্যাঁ, মুসআব।”

মাহিরা ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমি কেন ওকে নিয়ে ভাবব?”

— “আমি তো বলিনি তুই ওকে পছন্দ করিস।”

— “কিন্তু তোর কথার ধরন দেখে মনে হচ্ছে সেটাই বলতে চাইছিস।”

আয়াত শান্তভাবে বলল, “আমি শুধু বললাম, মানুষটাকে নিয়ে এত সন্দেহ করারও দরকার নেই।”

মাহিরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আয়াত, একটা কথা বলি? পৃথিবীতে ভালো মানুষের অভাব নেই। কিন্তু কাউকে ভালো মনে হলেই তার প্রতি দুর্বল হয়ে যাওয়া ঠিক না।”

আয়াত এবার কিছু বলল না।

মাহিরা আবার বলল, “তুই খুব সহজ-সরল। তুই মানুষের ভালো দিকটা আগে দেখিস। সবাই তোর মতো না।”

আয়াত নিচু গলায় বলল, “তাই বলে সবাই খারাপও না।”

মাহিরা এবার আর উত্তর দিল না।

বাসটা একটা মোড়ে এসে থামল। কয়েকজন যাত্রী নামল, নতুন কয়েকজন উঠল। তাদের ভিড়ের মধ্যেই একজন বৃদ্ধা মহিলা বাসে উঠলেন। হাতে ভারী ব্যাগ। বসার জায়গা নেই।

মাহিরা চোখের কোণ দিয়ে বৃদ্ধার দিকে তাকাল। তারপর নিজের সিটের দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ঘুরিয়ে নিল।

কিন্তু দুই সেকেন্ড পরই বিরক্ত মুখে উঠে দাঁড়াল।

— “খালা, এখানে বসুন।”

বৃদ্ধা অবাক হয়ে বললেন, “না মা, তুমি বসো।”

মাহিরা একটু বিরক্ত গলায় বলল, “বসুন তো! দাঁড়িয়ে থাকলে আরও কষ্ট হবে।”

বৃদ্ধা বসে পড়লেন।

— “আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুক মা।”

মাহিরা মুখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল।

আয়াত মুচকি হাসল।

— “তুই আসলে এত খারাপও না।”

মাহিরা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “চুপ কর।”

— “আমি তো কিছু বলিনি।”

— “তোর হাসিটাই অনেক কিছু বলে।”

দুজনেই হেসে ফেলল।

বাসটা আবার চলতে শুরু করল।

---

অন্যদিকে মুসআবও একই সময়ে নিজের বন্ধুর সঙ্গে হাঁটছিল।

হামজা তার পাশে এসে বলল, “আজকে তোকে খুব চিন্তিত লাগছে।”

মুসআব তাকাল, “কেন?”

— “জানি না। তুই আজ ক্লাসেও কয়েকবার অন্যমনস্ক ছিলি।”

মুসআব হেসে বলল, “সবসময় তো মানুষের মন একরকম থাকে না।”

হামজা একটু দুষ্টুমি করে বলল, “নাকি কোনো বিশেষ মানুষকে নিয়ে ভাবছিস?”

মুসআব থেমে গেল।

তারপর শান্ত গলায় বলল, “হামজা, মজা করিস না।”

হামজা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, বিষয়টা নিয়ে মুসআব সত্যিই কথা বলতে চাইছে না।

— “আচ্ছা বাবা, করলাম না।”

কিছুক্ষণ নীরবতার পর মুসআব নিজেই বলল, “মানুষের মন খুব অদ্ভুত জিনিস। কখন কোন দিকে ঝুঁকে যায়, মানুষ নিজেও বুঝতে পারে না। তাই আমি সবসময় আল্লাহর কাছে একটা জিনিস চাই।”

— “কী?”

— “আমার মন যেন আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়।”

হামজা এবার আর কোনো রসিকতা করল না।

সে জানত, মুসআব এমন কথা হুট করে বলে না।

---

বিকেলের দিকে আয়াত আর মাহিরা বাস থেকে নেমে পাশাপাশি হাঁটছিল।

হঠাৎ সামনে একটা ছোট দোকানের পাশে কয়েকজন ছেলে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে কথা বলছিল। তাদের একজন পাশ দিয়ে যাওয়া একজন বৃদ্ধ লোককে নিয়ে হাসাহাসি করছিল।

মাহিরা থেমে গেল।

— “এই!”

ছেলেগুলো তাকাল।

মাহিরা এগিয়ে গিয়ে বলল, “বয়স্ক মানুষকে নিয়ে হাসতে এত ভালো লাগে?”

একজন হেসে বলল, “আপনার কী সমস্যা?”

মাহিরার চোখ দুটো রাগে চকচক করে উঠল।

— “সমস্যা হলো, তোমাদের মতো ছেলেদের জন্যই মানুষ রাস্তায় বের হতে ভয় পায়।”

আয়াত দ্রুত মাহিরার হাত ধরে বলল, “চল, মাহিরা।”

মাহিরা হাত ছাড়িয়ে বলল, “না, আগে ওদের—”

আয়াত এবার একটু কঠিন গলায় বলল, “মাহিরা। চল।”

মাহিরা কয়েক সেকেন্ড ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দাঁত চেপে বলল, “ঠিক আছে।”

দুজন একটু দূরে চলে এলো।

আয়াত বলল, “তুই রাগের মাথায় সবকিছু করে ফেলিস।”

— “অন্যায় দেখলে চুপ থাকব?”

— “চুপ থাকতে বলছি না। কিন্তু সব কথা রাগ দিয়ে বলতে হয় না।”

মাহিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— “আমি জানি। কিন্তু নিজেকে থামাতে পারি না।”

আয়াত তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “একদিন পারবি।”

মাহিরা মাথা নাড়ল।

— “দেখা যাবে।”

---

সেদিন সন্ধ্যায় মুসআব বাসায় ফিরে দেখল তার বাবা বসার ঘরে বসে আছেন।

— “আব্বু, আপনি কখন এলেন?”

— “কিছুক্ষণ হলো। বসো।”

মুসআব বাবার পাশে বসল।

বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “মুসআব, জীবনে একটা সময় আসে যখন মানুষকে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হয়।”

মুসআব চুপ।

— “পড়াশোনা শেষ করছ। দায়িত্বও বাড়ছে। আমরা চাই, তুই নিজের জীবন নিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করিস।”

মুসআব মাথা নিচু করে বলল, “আমি বুঝতে পারছি।”

বাবা মৃদু গলায় বললেন, “বিয়ে শুধু দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়। এটা দুই পরিবারের, দুই জীবনের, দুই দায়িত্বের মিলন।”

মুসআব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আব্বু, আমি এমন কাউকে চাই, যে আমার সঙ্গে শুধু দুনিয়ার জীবন কাটাবে না। যে আমাকে আল্লাহর কাছাকাছি যেতে সাহায্য করবে।”

বাবা ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।

— “তাহলে তোর চাওয়াটা খুব কঠিন নয়। কিন্তু তোর নিজেরও এমন মানুষ হতে হবে, যাকে দেখে একজন নেক মেয়ে নিরাপদ বোধ করবে।”

কথাটা মুসআবের মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।

---

সেই রাতেই আয়াত তার ঘরে বসে ডায়েরি লিখছিল।

সে লিখল—

“আজ আবার মুসআবকে দেখলাম। তার কিছু কাজ আমার মনে দাগ কেটেছে। কিন্তু আমি জানি, কোনো মানুষকে দেখে হৃদয়কে তার দিকে ছুটতে দেওয়া ঠিক নয়। যদি আল্লাহর ইচ্ছা থাকে, তিনি নিজেই পথ খুলে দেবেন। আমাকে শুধু নিজের মনকে সামলাতে হবে।”

ডায়েরি বন্ধ করে সে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তারপর দুহাত তুলে দোয়া করল,

“হে আল্লাহ, আমার অন্তরকে আপনার জন্য রাখুন।”

---

অন্যদিকে মাহিরা নিজের ঘরে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল।

হঠাৎ তার মনে পড়ল দিনের সেই দৃশ্য।

বৃদ্ধাকে সিট দেওয়া।

ফলওয়ালাকে সাহায্য করা।

অন্ধ মানুষটাকে রাস্তা পার করে দেওয়া।

মাহিরা বিরক্ত হয়ে নিজের মাথায় হালকা চাপড় দিল।

— “ধুর! আমি কেন এসব মনে করছি?”

সে উঠে ঘরের মধ্যে হাঁটতে লাগল।

নিজেকেই বলল,

— “ছেলেটা ভালো ব্যবহার করেছে, তাতে কী?”

কিছুক্ষণ পর আবার থামল।

— “ভালো ব্যবহার করলেই কেউ ভালো মানুষ হয়ে যায় নাকি?”

তারপর নিজের কথাতেই নিজে থমকে গেল।

কারণ সে বুঝতে পারল, গত কয়েক ঘণ্টায় সে অকারণে মুসআবের আচরণগুলো মনে করার চেষ্টা করছে।

মাহিরা দ্রুত নিজের মনকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল।

— “না। আমি কাউকে নিয়ে এভাবে ভাবব না।”

কিন্তু হৃদয় কি এত সহজে কথা শোনে?

সে জানত না।

আর এটাও জানত না, আজ যে ছেলেটাকে নিয়ে সে এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিল, “এমন ছেলেদের বিশ্বাস করা যায় না”—একদিন সেই ছেলেটার চরিত্রই তার নিজের সমস্ত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেবে।

আর সেই দিনটা খুব দূরে নয়।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন