তোমারি হাত ধরে রবের পথে
পর্ব–৮
«“কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে শান্তি হয়ে, আবার কিছু মানুষ আসে আমাদের অহংকার ভাঙতে। কিন্তু কে কোন ভূমিকায় এসেছে, তা বুঝতে সময় লাগে।”»
সকালটা অন্য দিনের তুলনায় একটু ব্যস্ত ছিল। আয়াত ঘুম থেকে উঠেই দেখল, মাহিরার বেশ কয়েকটা মিসড কল।
সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল।
দ্বিতীয়বার রিং হওয়ার আগেই মাহিরা ফোন ধরল।
— “কোথায় ছিলি?”
আয়াত হেসে বলল, “ঘুমাচ্ছিলাম।”
— “এতক্ষণ?”
— “আজ ক্লাস একটু দেরিতে।”
মাহিরা বিরক্ত গলায় বলল, “তুই এখনো রেডি হোসনি?”
— “না।”
— “দশ মিনিটের মধ্যে বের হ। আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি।”
আয়াত অবাক হয়ে বলল, “তুই এত সকালে বের হয়েছিস?”
— “হ্যাঁ। আর তোর জন্য দাঁড়িয়ে থেকে আমার রাগ উঠছে।”
আয়াত হেসে বলল, “আচ্ছা, আসছি।”
ফোন রেখে মাহিরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। আজ তার পরনে ছিল সাদামাটা কালো পোশাক। চুলগুলো খোলা, মুখে কোনো বাড়তি সাজ নেই। কিন্তু চোখে সেই চেনা তীক্ষ্ণতা।
একজন রিকশাওয়ালা ভাড়া একটু বেশি চাইতেই মাহিরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “কীসের এত ভাড়া?”
লোকটা বলল, “আপা, রাস্তা অনেক জ্যাম।”
— “জ্যাম হলে ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যায় নাকি?”
লোকটা চুপ করে গেল।
ঠিক তখন পেছন থেকে একটা শান্ত কণ্ঠ শোনা গেল,
— “আপনি চাইলে একটু কমিয়ে দিতে পারেন, চাচা। তবে উনিও তো আপনার পরিশ্রমের মূল্য দেবেন।”
মাহিরা ঘুরে তাকাল।
মুসআব।
তার হাতে কয়েকটা বই। মুখে স্বাভাবিক শান্ত ভাব।
মাহিরা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “আপনি এখানে?”
মুসআব একটু অবাক হলো।
— “আমি তো প্রতিদিনই এই রাস্তা দিয়ে যাই।”
— “ওহ।”
মুসআব রিকশাওয়ালার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “চাচা, আপনি যা ন্যায্য মনে করেন সেটাই নিন।”
তারপর সে চলে যেতে উদ্যত হলো।
মাহিরা হঠাৎ বলল,
— “এক মিনিট।”
মুসআব থামল।
— “জি?”
— “আপনি কি সব ব্যাপারে এভাবে নাক গলান?”
মুসআব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শান্তভাবে বলল,
— “আমি নাক গলাতে চাইনি। শুধু মনে হলো, দুজনের কথার মাঝখানে একটু শান্তি দরকার ছিল।”
মাহিরা চোখ বড় বড় করে বলল,
— “আপনি আমাকে শান্তি শেখাবেন?”
— “না।”
— “তাহলে?”
— “আমি শুধু আমার কথাটা বলেছি।”
মাহিরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— “আপনি খুব বেশি ভদ্র।”
মুসআব মৃদু হেসে বলল,
— “এটা কি অভিযোগ?”
— “হ্যাঁ।”
— “তাহলে দুঃখিত।”
মাহিরা বিরক্ত হয়ে বলল,
— “আপনি আবার দুঃখিতও বলছেন!”
মুসআব এবার একটু হেসে ফেলল।
— “আপনি আসলে কী চান, সেটা বুঝতে পারছি না।”
— “আমিও না।”
কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে যেতেই মাহিরা থেমে গেল।
মুসআবও আর কিছু বলল না।
দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল আয়াত।
সে এগিয়ে এসে মাহিরার পাশে দাঁড়াল।
— “কী হয়েছে?”
মাহিরা দ্রুত বলল,
— “কিছু না।”
আয়াত মুসআবের দিকে তাকিয়ে সালাম দিল।
— “আসসালামু আলাইকুম।”
— “ওয়ালাইকুমুস সালাম।”
মুসআব মাথা নত করে চলে গেল।
মাহিরা তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
আয়াত সেটা লক্ষ্য করল।
— “কী দেখছিস?”
মাহিরা সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে বলল,
— “কিছু না।”
— “তুই আজকাল ‘কিছু না’ কথাটা খুব বলিস।”
— “চুপ কর।”
দুজন হাঁটতে শুরু করল।
কিছুদূর যাওয়ার পর আয়াত বলল,
— “মুসআবের সঙ্গে তোর প্রথম কথা হলো?”
মাহিরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— “হ্যাঁ। আর প্রথম কথাতেই বুঝলাম, লোকটা বেশ বিরক্তিকর।”
— “কেন?”
— “সবকিছুর মধ্যে শান্তি খোঁজে।”
আয়াত হেসে বলল,
— “এটা আবার দোষ?”
— “আমার কাছে দোষ।”
আয়াত আর কিছু বলল না।
কিন্তু মনে মনে সে একটা বিষয় বুঝতে পারল—
মাহিরা যতই মুসআবকে অপছন্দ করার কথা বলুক, আজ তার কথাগুলো অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি মনে রাখছে।
---
সেদিন দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বসে মুসআব পড়ছিল।
হামজা এসে পাশে বসে বলল,
— “কী হয়েছে?”
মুসআব বই থেকে চোখ না তুলেই বলল,
— “কী হবে?”
— “তুই হাসছিস।”
— “মানুষ হাসতে পারে না?”
— “পারে। কিন্তু তুই সাধারণত বই পড়ার সময় হাসিস না।”
মুসআব এবার বই বন্ধ করল।
— “একজন মানুষের সঙ্গে আজ একটু অদ্ভুত কথোপকথন হয়েছে।”
হামজা আগ্রহী হয়ে বলল,
— “মেয়ে?”
মুসআব সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “হ্যাঁ।”
হামজা হাসল।
— “বুঝেছি।”
মুসআব মাথা নেড়ে বলল,
— “ভুল বুঝিস না। মেয়েটা খুব রাগী।”
— “তাহলে?”
— “কিছু না। শুধু মনে হলো, মানুষ কখনো কখনো নিজের রাগ দিয়ে নিজের ভালো দিকটাও ঢেকে রাখে।”
হামজা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
— “তুই কি তাকে নিয়ে ভাবছিস?”
মুসআব এবার একটু গম্ভীর হলো।
— “না। আর ভাবতে চাইও না। আমি জানি, মানুষের প্রতি অযথা আকর্ষণ তৈরি হলে সেটা সামলানো জরুরি।”
হামজা মাথা নাড়ল।
— “ঠিক বলেছিস।”
---
সন্ধ্যায় মাহিরা নিজের ঘরে বসে ছিল।
মা এসে বললেন,
— “মা, আজ কী হয়েছে? মনটা খারাপ?”
— “না।”
— “তাহলে এত চুপচাপ কেন?”
মাহিরা বিরক্ত হয়ে বলল,
— “আমি কি সবসময় কথা বলব?”
মা হেসে বললেন,
— “তোর রাগটা একটু কমলে তোর জীবনটা আরও সুন্দর হতো।”
মাহিরা কিছু বলল না।
মা চলে গেলে সে জানালার পাশে দাঁড়াল।
আজকের কথাগুলো আবার মনে পড়ল।
“আমি শুধু আমার কথাটা বলেছি।”
কত সাধারণ একটা বাক্য।
তবুও কেন যেন তার মাথা থেকে যাচ্ছে না।
মাহিরা নিজের মনকে ধমক দিল,
— “এই! এত ভাবার কী আছে?”
তারপর নিজেই উত্তর দিল,
— “কিছুই না।”
কিন্তু হৃদয় তখনও যেন তার কথায় সায় দিচ্ছিল না।
সেদিন রাতে মাহিরা ঘুমানোর আগে প্রথমবার নিজের অজান্তেই একটা প্রশ্ন করল—
“মুসআব আসলে কেমন মানুষ?”
প্রশ্নটা করার পরই সে বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
সে জানত না, এই একটি প্রশ্নই ধীরে ধীরে তার জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পের দরজা খুলে দিচ্ছে।
চলবে...