তোমার ই হাত ধরে রবের পথে
লেখক: নাহিদ মাতাব্বর
পর্ব: ০৯
«“কিছু মানুষকে আমরা প্রথমে ভুল বুঝি। তারপর সময় আমাদের শেখায়—ভুলটা মানুষটির মধ্যে ছিল না, ছিল আমাদের ধারণার মধ্যে।”»
সকাল থেকেই আকাশটা কেমন যেন মেঘলা। সূর্যের আলো আছে, কিন্তু তেমন তেজ নেই। বাতাসে হালকা শীতলতা। আয়াত কলেজের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মাহিরার জন্য অপেক্ষা করছিল। হাতে ফোন, চোখ বারবার রাস্তার দিকে। প্রায় দশ মিনিট পর দূর থেকে মাহিরাকে দেখা গেল। হাঁটার ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছে, আজও তার মেজাজ ভালো নেই। কাছে আসতেই আয়াত বলল, “কী হয়েছে?” মাহিরা ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে বলল, “কিছু না।” আয়াত হেসে বলল, “তুই যখন ‘কিছু না’ বলিস, তখনই বুঝি অনেক কিছু হয়েছে।” মাহিরা চোখ রাঙিয়ে বলল, “আজ সকাল থেকে বাসার সবাই আমাকে বিরক্ত করেছে। আম্মু বলছে আমি নাকি সবকিছুতে রাগ করি, আব্বু বলছে আমার রাগ একদিন আমাকে বিপদে ফেলবে। এখন তুইও শুরু করিস না।” আয়াত মুচকি হেসে বলল, “তোর আব্বু ভুল বলেননি।” মাহিরা থমকে দাঁড়াল। “এই! তুইও?” আয়াত হাসতে হাসতে তার হাত ধরল। “চল, আগে ক্লাসে যাই।”
দুজন করিডোর দিয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ সামনে একটা ছেলে তাড়াহুড়ো করে বের হতে গিয়ে মাহিরার সঙ্গে ধাক্কা খেল। মাহিরার হাতে থাকা বইগুলো মাটিতে পড়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে রেগে বলল, “চোখে দেখে হাঁটতে পারেন না?” ছেলেটা থেমে গেল। “সরি, আপু। খেয়াল করিনি।” মাহিরা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আয়াত তার হাত ধরে থামিয়ে দিল। “থাক, ভুল করে হয়েছে।” মাহিরা দাঁত চেপে বলল, “সবাইকে এত সহজে ছেড়ে দিলে মানুষ মাথায় উঠে বসে।” আয়াত শান্ত গলায় বলল, “সব লড়াই জিততে হয় না, মাহিরা।”
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল, “কথাটা কিন্তু ঠিক বলেছেন।” দুজনই ঘুরে তাকাল। মুসআব দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে কয়েকটা বই, পাশে হামজা। মাহিরা ভ্রু কুঁচকে বলল, “আপনি আবার?” মুসআব শান্তভাবে বলল, “জি, আমিও এখানে পড়ি। তাই মাঝেমধ্যে দেখা হয়ে যেতে পারে।” হামজা মুখ নিচু করে হাসি চেপে রাখল। মাহিরা সেটা দেখে বলল, “আপনার বন্ধু হাসছে কেন?” হামজা সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল। “না, কিছু না।” মাহিরা বলল, “আপনাদের দুজনের ‘কিছু না’ কথাটা বেশ মিল আছে।” মুসআব হালকা হেসে বলল, “কিছু কিছু বিষয়ে মিল থাকা খারাপ না।” মাহিরা উত্তর দিতে গিয়েও থেমে গেল। সে বুঝতে পারল না, ছেলেটা সবসময় এত সহজভাবে কীভাবে কথা বলে।
আয়াত বলল, “আমাদের ক্লাস আছে। চল।” মাহিরা হাঁটতে শুরু করল, কিন্তু কয়েক পা যাওয়ার পর একবার পেছনে তাকাল। মুসআব তখন হামজার সঙ্গে কথা বলছে। তার চোখে কোনো অস্থিরতা নেই, কোনো বাড়তি আগ্রহ নেই। মাহিরা সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নিল।
ক্লাসে বসার পর আয়াত নিচু গলায় বলল, “তুই আবার তাকিয়েছিলি।” মাহিরা চমকে উঠল। “কোথায়?” “পেছনে।” “আমি তো কিছু দেখিনি।” আয়াত মুচকি হেসে বলল, “আমি তো কিছু বলিনি যে তুই কী দেখেছিস।” মাহিরা বুঝতে পারল, সে ধরা খেয়ে গেছে। সে ফিসফিস করে বলল, “তুই খুব বিরক্তিকর।” আয়াত হেসে ফেলল।
ক্লাস শেষ হওয়ার পর সবাই বেরিয়ে গেল। আয়াত লাইব্রেরিতে যাওয়ার কথা বলল। মাহিরা বলল, “তুই যা, আমি নিচে অপেক্ষা করছি।” লাইব্রেরির সামনে বসার জায়গায় মাহিরা একা বসে ফোন দেখছিল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তার ফোনটা হাত থেকে পিছলে মাটিতে পড়ে গেল। সে নিচু হয়ে তুলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পাশ থেকে আরেকটি হাত ফোনটা তুলে নিল। মুসআব।
সে ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আপনার ফোন।” মাহিরা ফোনটা নিয়ে বলল, “ধন্যবাদ।” মুসআব চলে যেতে চাইল। মাহিরা হঠাৎ বলল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করি?” “জি?” “আপনি কি সবসময় এত শান্ত?” মুসআব একটু হেসে বলল, “না।” “কখন রাগেন?” “যখন নিজের ওপর রাগ করার মতো কিছু করি।” মাহিরা অবাক হয়ে তাকাল। “মানে?” মুসআব বলল, “অন্যের ভুল দেখে রাগ করা সহজ। নিজের ভুল দেখে নিজেকে ঠিক করা কঠিন।” কথাটা বলে সে চলে গেল।
মাহিরা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। কথাটা তার মনে অদ্ভুতভাবে দাগ কেটে গেল। সে নিজের রাগের কথা ভাবল। কতবার ছোট ছোট বিষয় নিয়ে সে মানুষকে কষ্ট দিয়েছে। কতবার পরে নিজেই আফসোস করেছে। অথচ এই ছেলেটা বলছে—অন্যের ভুলের আগে নিজের ভুল দেখতে হয়।
আয়াত লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এসে দেখল মাহিরা চুপ করে বসে আছে। “কী হয়েছে?” মাহিরা মাথা নাড়ল। “কিছু না।” আয়াত এবার হেসে বলল, “আবার সেই ‘কিছু না’!” মাহিরা বিরক্ত হয়ে বলল, “চুপ কর।”
দুজন বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে লাগল। পথে আয়াত বলল, “জানিস, মুসআবের একটা ব্যাপার আমার ভালো লাগে।” মাহিরা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “কী?” আয়াত বলল, “ও কারও সঙ্গে অযথা মেশে না। নিজের সীমাটা বোঝে।” মাহিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “হুম।” আয়াত তার দিকে তাকাল। “তুই কী বলিস?” মাহিরা মুখ ঘুরিয়ে বলল, “আমি কিছু বলি না।” কিন্তু তার কণ্ঠে আগের সেই বিরক্তি ছিল না।
সন্ধ্যায় মাহিরা বাসায় ফিরে নিজের ঘরে ঢুকে ব্যাগটা বিছানায় রাখল। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি কি সত্যিই ওকে নিয়ে ভাবছি?” সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “না। অসম্ভব।” কিন্তু যতবার সে নিজেকে বোঝাতে চাইল, ততবার মুসআবের সেই কথাটা মনে পড়ল—“অন্যের ভুল দেখে রাগ করা সহজ। নিজের ভুল দেখে নিজেকে ঠিক করা কঠিন।”
সেদিন রাতে মাহিরা নামাজ পড়ে অনেকক্ষণ জায়নামাজে বসে রইল। সে খুব বেশি দোয়া করতে জানে না। কিন্তু আজ নিজের অজান্তেই বলল, “আল্লাহ, আমাকে আমার রাগের কাছে হারতে দেবেন না। আমাকে ভালো মানুষ বানান।”
অন্যদিকে মুসআবও ইশার নামাজ শেষে নিজের ঘরে বসে ছিল। হামজার সঙ্গে দিনের কথাগুলো মনে পড়ছিল। মাহিরার তীক্ষ্ণ কথা, রাগী চোখ, আবার হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়া—সবকিছু তার মনে পড়ল। সে নিজেকে থামিয়ে দিল। “না। কাউকে নিয়ে অযথা ভাবা ঠিক না। যদি কোনো সম্পর্ক আমার জন্য লেখা থাকে, আল্লাহ নিজেই তার হালাল পথ খুলে দেবেন।”
তারপর সে কুরআন খুলে পড়তে শুরু করল।
দুটি মানুষ।
দুটি আলাদা ঘর।
দুটি আলাদা জীবন।
কিন্তু অদৃশ্যভাবে তাদের পথ যেন ধীরে ধীরে একই দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
মাহিরা এখনো জানে না, যে মানুষটাকে নিয়ে সে একদিন আয়াতকে সাবধান করবে, একদিন সেই মানুষটির প্রতিই তার নিজের হৃদয় দুর্বল হয়ে পড়বে।
আর আয়াতও জানে না—তার আজকের ছোট্ট অনুভূতি একদিন তাকে এমন একটি সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করাবে, যেখানে বন্ধুত্ব আর নিজের অনুভূতির মধ্যে তাকে কঠিন একটি পথ বেছে নিতে হবে।
কিন্তু সেই গল্পের শুরু এখনো অনেক দূর।
কারণ ভালোবাসার আগে তাদের জীবনে আসবে ভুল বোঝাবুঝি।
তারপর অভিমান।
তারপর দূরত্ব।
আর সবশেষে—রবের ইশারায় এমন এক মিলন, যেখানে তারা বুঝবে, মানুষ পরিকল্পনা করে, কিন্তু সুন্দর পরিকল্পনা করেন একমাত্র আল্লাহ।
চলবে...