ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমারই হাত ধরে রবের পথে

১০ম পর্ব

লেখক: Nahid Matabbor

তোমার ই হাত ধরে রবের পথে

লেখক: নাহিদ মাতাব্বর

পর্ব: ১০

«“কিছু সম্পর্কের শুরু হয় একটি কথোপকথন দিয়ে, আর কিছু সম্পর্কের শুরু হয় একটি ভুল বোঝাবুঝি দিয়ে।”»

পরদিন সকাল থেকেই মাহিরার মেজাজ খারাপ। ঘুম থেকে উঠেই আম্মুর সঙ্গে তর্ক হয়েছে। কারণটা খুব বড় কিছু নয়—আম্মু তাকে বলেছিলেন, কলেজ থেকে ফিরে যেন বাজার থেকে কিছু জিনিস নিয়ে আসে। মাহিরা বলেছিল, “আমি কি সারাদিন শুধু কাজই করব?” কথাটা বলার পর অবশ্য নিজের কাছেই খারাপ লেগেছিল। কিন্তু মুখে ‘সরি’ বলতে তার ভীষণ কষ্ট হয়।

নাস্তার টেবিলে বসে সে চুপচাপ খাবার খাচ্ছিল। আম্মু কিছু বললেন না। এই নীরবতাই মাহিরাকে আরও অস্বস্তিতে ফেলল।

শেষ পর্যন্ত সে নিজেই বলল, “আম্মু...”

— “হুম?”

— “সকালের কথাটা নিয়ে রাগ করো না।”

মা তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। “আমি রাগ করিনি। তবে তুই রাগের সময় কথাগুলো একটু ভেবে বলবি।”

মাহিরা মাথা নিচু করল। “চেষ্টা করব।”

মা তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “এই তো আমার মেয়ে।”

এই ছোট্ট কথাটাই মাহিরার মনটা হালকা করে দিল।

কলেজে পৌঁছানোর পর আয়াত তাকে দেখে বলল, “আজ মুখটা এত শান্ত কেন?”

মাহিরা বলল, “আমি কি সবসময় ঝগড়া করি?”

আয়াত হাসল। “না, মাঝে মাঝে বিশ্রামও নিস।”

মাহিরা চোখ রাঙাল। “বেশি কথা বলিস না।”

দুজন ক্লাসে ঢুকে পড়ল।

ক্লাস শেষ হওয়ার পর আয়াত বলল, “আজ লাইব্রেরিতে যাবি?”

— “না। আমার একটা কাজ আছে।”

— “কী কাজ?”

— “ব্যক্তিগত।”

আয়াত আর জিজ্ঞেস করল না।

মাহিরা আসলে কিছুই ঠিক করেনি। শুধু একটু একা থাকতে চাইছিল। সে কলেজের পেছনের দিকে পুরোনো গাছগুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। জায়গাটা তুলনামূলক নিরিবিলি।

কিছুক্ষণ পর পেছন থেকে একটা কণ্ঠ শোনা গেল,

— “আপনি এখানে?”

মাহিরা ঘুরে তাকাল।

মুসআব।

মুহূর্তেই তার মুখের ভাব বদলে গেল।

— “আপনাকে তো দেখি সব জায়গাতেই!”

মুসআব হেসে বলল, “আমি কি বিরক্ত করছি?”

— “না। তবে আপনি যেখানেই থাকেন, সেখানেই হঠাৎ করে দেখা হয়ে যায়।”

— “সম্ভবত আমাদের চলাফেরার পথ একই।”

মাহিরা কিছু বলল না।

মুসআব পাশ দিয়ে চলে যেতে চাইল। কিন্তু তার হাতে থাকা কয়েকটা কাগজ হঠাৎ বাতাসে উড়ে গেল।

মাহিরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাগজগুলো ধরতে শুরু করল।

— “এই নিন।”

— “ধন্যবাদ।”

মাহিরা একটা কাগজ হাতে নিয়ে থেমে গেল। সেখানে কয়েকটি লেখা ছিল। সে পড়ার চেষ্টা করল না, কিন্তু উপরে একটা লাইন চোখে পড়ে গেল—

“নিজেকে বদলানোর আগে অন্যকে বদলানোর চেষ্টা করা উচিত নয়।”

মাহিরা কাগজটা ফেরত দিয়ে বলল, “আপনি এসব লিখেন?”

— “মাঝে মাঝে।”

— “কেন?”

— “নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য।”

— “নিজেকে?”

— “জি।”

মাহিরা একটু অবাক হলো। “আপনি নিজেকে এত উপদেশ দেন?”

মুসআব হেসে বলল, “কারণ আমি নিজেও ভুল করি।”

মাহিরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর হঠাৎ বলল, “আপনি একটা কথা বলবেন?”

— “জি।”

— “মানুষ যদি অনেক রাগী হয়, তাহলে কি সে বদলাতে পারে?”

মুসআব এবার তার দিকে সরাসরি তাকাল।

— “অবশ্যই পারে।”

— “কীভাবে?”

— “প্রথমে তাকে স্বীকার করতে হবে যে তার রাগ তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তারপর রাগের সময় চুপ থাকা শিখতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে।”

মাহিরা ধীরে বলল, “সবাই কি বদলাতে পারে?”

— “যে সত্যি বদলাতে চায়, তার জন্য পথ বন্ধ থাকে না।”

কথাটা শুনে মাহিরা চুপ হয়ে গেল।

মুসআব আর কিছু না বলে চলে গেল।

মাহিরা অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর নিজের মনে বলল, “লোকটা এত সহজে এসব কথা বলে কীভাবে?”

দূর থেকে আয়াত তাদের কথোপকথনের শেষ অংশটা দেখে ফেলেছিল।

সে কাছে এসে বলল, “তুই ওনার সঙ্গে কথা বলছিলি?”

মাহিরা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “হ্যাঁ। তাতে কী?”

— “কিছু না।”

— “তুইও শুরু করলি!”

আয়াত হেসে বলল, “আমি কিছু বলিনি।”

মাহিরা হাঁটতে হাঁটতে বলল, “তুই একটা জিনিস বুঝিস না।”

— “কী?”

— “মানুষকে দূর থেকে যেমন মনে হয়, কাছে গেলে তেমন নাও হতে পারে।”

আয়াত বলল, “এটা ঠিক।”

মাহিরা থেমে বলল, “তবে একটা কথা মানতেই হবে।”

— “কী?”

— “মুসআব... খারাপ না।”

কথাটা বলেই মাহিরা যেন নিজের মুখের কথায় নিজেই অবাক হয়ে গেল।

আয়াত কিছু বলল না।

শুধু মৃদু হাসল।

---

সেদিন বিকেলে হামজা মুসআবকে বলল, “তোর কী হয়েছে?”

— “কিছু না।”

— “তুই আজ তিনবার ‘কিছু না’ বলেছিস।”

মুসআব হেসে বলল, “তুই গুনছিস?”

— “হ্যাঁ। কারণ তোর মধ্যে পরিবর্তন দেখছি।”

মুসআব একটু চুপ করে বলল, “একজন মানুষকে দেখলে মাঝে মাঝে মনে হয়, সে আসলে নিজের ভেতরে অনেক যুদ্ধ করে।”

হামজা জিজ্ঞেস করল, “কাকে বলছিস?”

মুসআব উত্তর দিল না।

হামজা হেসে বলল, “মাহিরা?”

মুসআব তার দিকে তাকাল।

— “তুই বেশি বুঝিস।”

হামজা বলল, “আমি শুধু নামটা বললাম।”

মুসআব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “ও খুব রাগী।”

— “তাই বলে?”

— “কিন্তু মনে হয়, ওর রাগের নিচে অনেক কষ্ট লুকানো।”

হামজা আর কিছু বলল না।

মুসআবও বুঝতে পারল না, কেন সে মাহিরাকে নিয়ে এত কিছু ভাবছে।

---

রাতে মাহিরা আবার জায়নামাজে বসেছিল।

আজ সে আগের দিনের চেয়ে বেশি সময় দোয়া করল।

“হে আল্লাহ, আমার রাগ কমিয়ে দিন। আমার অন্তরকে পরিষ্কার করুন। আমি যেন কাউকে অন্যায়ভাবে বিচার না করি।”

দোয়া শেষ করে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর নিজের অজান্তেই মুসআবের কথা মনে পড়ল।

সে দ্রুত চোখ বন্ধ করে বলল,

“না। এখন না।”

কিন্তু মন তো যুক্তির ভাষা সবসময় বোঝে না।

মাহিরা জানে না, তার জীবনের গল্পে মুসআবের নাম এখনো ভালোবাসা হয়ে লেখা হয়নি।

শুধু একটা প্রশ্ন হয়ে লেখা হয়েছে—

“এই মানুষটা আসলে কে?”

আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই একদিন সে নিজের হৃদয়ের উত্তর খুঁজে পাবে।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন