ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়ের কোণে শুধু তুই

৩য় পর্ব

লেখক: Afifa Maksura Esha

রাত আটটা।

​চৌধুরী বাড়ির দোতলার ঘরে তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ইশান। পাঁচ বছর পর দেশে ফিরেছে সে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে ঘুমটা যেন একটু বেশিই গভীর হয়ে গিয়েছিল।

​দরজায় হালকা টোকা দিয়ে নাজনীন সুলতানা ঘরে ঢুকলেন।

—ইশান, বাবা ওঠো। রাত হয়ে গেছে। ফ্রেশ হয়ে নিচে এসো, খাবার খেয়ে নিও। সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।

​মায়ের ডাকে ইশান ধীরে ধীরে চোখ মেলল। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলল,

—আচ্ছা মা, আসছি।

​নাজনীন সুলতানা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নিচে চলে গেলেন।

​কিছুক্ষণ পর ইশান ফ্রেশ হয়ে নিচে নামল। ডাইনিং টেবিলে তখন পুরো চৌধুরী পরিবার একসঙ্গে বসে আছে। আজকের রাতের খাবারে ইশানের পছন্দের প্রায় সব পদই রান্না করা হয়েছে। পাঁচ বছর পর ছেলে বাড়ি ফিরেছে—মায়ের আনন্দ যেন ডিশের প্রতিটি পদে মিশে আছে।

​সবাই হাসি-ঠাট্টা করতে করতে একসঙ্গে খাওয়া শেষ করল। খাওয়া শেষে সবাই এসে জমল বসার ঘরে।

​ইশান বিদেশ থেকে আসার সময় পরিবারের সবার জন্য উপহার নিয়ে এসেছে। একে একে সবার হাতে উপহার তুলে দিতে লাগল সে। নুরি আর ফারহানার জন্য এনেছে অ্যাপল ওয়াচ। আর ছোটদের জন্য নানা জাতের চকলেট।

​সবাই নিজেদের উপহার পেয়ে ভীষণ খুশি। কিন্তু ইশানের প্যাকেটে তখনও একটি বিশেষ বাক্স রয়ে গেছে। ফারহানা এতক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে ছিল প্যাকেটটির দিকে। শেষ পর্যন্ত ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেলল,

—ইশান ভাইয়া, ওই প্যাকেটটায় কী আছে?

​ইশান সঙ্গে সঙ্গে প্যাকেটটা সরিয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

—ওইটায় নজর দিবি না। ওইটা আমার স্পেশাল কারও জন্য। যাকে যা দিয়েছি, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাক।

​'স্পেশাল কেউ' কথাটা শুনে ফারহানার মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। নুরি বিষয়টা বুঝতে পেরে পরিস্থিতি হালকা করতে দ্রুত ফারহানার দিকে তাকিয়ে বলল,

—আরে, ভাইয়া হয়তো সাফওয়ান ভাইয়ার জন্য কিছু এনেছে! ভাইয়ার একমাত্র স্পেশাল পারসন তো সাফওয়ান ভাইয়াই, তাই না?

​নুরির কথা শুনে সবাই হেসে উঠল। ফারহানাও জোর করে হাসল, কিন্তু তার মনের কোণে একটি অজানা অস্বস্তি জমে রইল।

​কিছুক্ষণ পর চৌধুরী বাড়ির সবাই ছাদে চলে গেল রাতের বাতাস উপভোগ আর গল্পগুজব করার জন্য।

​অন্যদিকে মির্জা বাড়িতেও রাতের খাওয়া শেষ হয়েছে। সবাই যার যার ঘরে চলে গেল।

​ইরা নিজের ঘরে এসে বই খুলে পড়তে বসেছিল, কিন্তু মন বসছে না। অজান্তেই তার চিন্তা অন্যদিকে চলে গেল—আজ এত কিছু ঘটে গেল, অথচ ইশান ভাইয়াকে একটুর জন্য দেখা হলো না!

​'নুরির অসুস্থতাটা না হলেও পারত। তাহলে হয়তো আজ দেখা হতো...' মনে মনে ভাবল ইরা।

​'ইশান ভাইয়া লোকটা বেশ রাগী আর গম্ভীর টাইপের ছিল। পাঁচ বছর আগে যেমনটা দেখেছিলাম, এখনও কি তেমনই আছেন?'

​হঠাৎ নিজের ভাবনায় নিজেই চমকে উঠে বলে উঠল,

—ইরা! আমি এসব কী ভাবছি? আজব তো!

​ঠিক তখনই দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকলো সাফওয়ান।

—কীরে ইরা, ঠিক করে পড়াশোনা করছিস তো? নাকি আবার ভণ্ডামি করে বান্ধবীদের সাথে বেরাচ্ছিস?

​ইরা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

—আমি পড়েছি তো!

​সাফওয়ান হেসে বলল,

—ঠিক করে পড়। আর হ্যাঁ, তোর বান্ধবী ফোন দিয়েছিল, আমি ধরতে পারিনি। তুই চাইলে এখন কথা বলে নিতে পারিস।

​কথাটা বলে সাফওয়ান নিজের ফোনটা ইরার হাতে দিয়ে চলে গেল। ইরা কন্টাক্ট লিস্ট থেকে 'নুসরাত জাহান রিদি' সেভ করা নামটায় কল দিল। প্রথমবারে কেউ রিসিভ করল না, তবে দ্বিতীয়বারে রিদি কল রিসিভ করতেই চড়াও হলো—

—মনে পড়ল তাহলে? ভেবেছিলাম ভুলেই গেছিস!

​ইরা হেসে বলল,

—না রে, ভুলিনি। আজকে তুই কোচিংয়ে যাসনি কেন? গেলে বৃষ্টিতে ভিজতে কী যে মজা হতো! জানিস, আজ অনেক কাহিনি হয়েছে। কাল স্কুলে আসিস, অনেক কথা বলার আছে।

​—সত্যি? আচ্ছা কাল তাহলে সব শুনব তোর কাছে, রিদি সায় দিল।

​—ওকে, এখন রাখি। ভাইয়াকে ফোনটা ফেরত দিতে হবে। বাই, আল্লাহ হাফেজ।

​কথা শেষ করে ইরা সাফওয়ানের বারান্দায় গেল। সাফওয়ান রাতের বাতাস উপভোগ করছিল। ইরা ফোনটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

—ভাইয়া, তোমার ফোন।

​সাফওয়ান ফোনটা নিয়ে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

—যা বনু, গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। সারাদিনের ধকলে তুই বেশ ক্লান্ত।

​ইরাও বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

​রাত আরও গভীর হলো।

​ছাদে গল্প শেষ করে চৌধুরী বাড়ির সবাই যার যার ঘরে চলে গেল। ইশান তার রুমে এসে দরজা বন্ধ করে ড্রয়ার থেকে বের করল সেই স্পেশাল প্যাকেটটি।

​তার ‘বাটারফ্লাই’-এর জন্য যত্ন করে আনা জিনিসগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে ভাবল—'কখন দেব তোমাকে?'

​উপহারটি আবার লুকিয়ে রেখে ইশান ফোন হাতে তুলে নিল। কল করল তার জানের দোস্ত সাফওয়ানকে। ওপাশ থেকে প্রথম রিংয়েই সাফওয়ান কল রিসিভ করতেই ইশান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—যা ভেবেছিলাম, তা তো আর হলোই না...

​সাফওয়ান ওপাশ থেকে মৃদু হেসে বলল,

—সবকিছু কি আর সবসময় নিজের হিসেব মতো হয়?

​দুই বন্ধুর মধ্যে কিছুক্ষণ কথা চলল। কথা শেষ করে ইশান চোখ বন্ধ করল। সারাদিনের ক্লান্তি তাকে ঘুমে তলিয়ে নিয়ে গেল।

​পরদিন সকাল আটটা।

​চৌধুরী বাড়িতে সবাই তৈরি হয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে জমেছে। বাড়ির গিন্নিরা গরম খাবার পরিবেশন করছেন।

​খাওয়ার মাঝেই শাহরিয়ার চৌধুরী ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—ইশান, আজ থেকে তুমি আমাদের পারিবারিক ব্যবসা সামলানোর দায়িত্ব নাও।

​ইশান শান্তভাবে বাবার দিকে তাকাল।

—হ্যাঁ বাবা, আমি তোমার কথায় রাজি। তবে একটা কথা আছে—আমি নিজে আলাদা একটা বিজনেস শুরু করতে চাই।

​কথাটা শুনে শাহরিয়ার চৌধুরী আর ইকবাল চৌধুরী দুজনেই অবাক হলেন। ইকবাল বললেন,

—আমাদের সাজানো ব্যবসা সামলালেই তো হয়। আলাদা করে নতুন কিছু করার কী দরকার?

​ইশান নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে বলল,

—না চাচা, আমি নিজের একটা পরিচয় তৈরি করতে চাই।

​অনেক আলোচনার পর অবশেষে শাহরিয়ার চৌধুরী ও ইকবাল চৌধুরী রাজি হলেন। নাস্তা শেষ করে বড়রা অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলেন। বাচ্চারাও যার যার স্কুলের পথ ধরল। বাড়িতে রইলেন শুধু মহিলারা। ইশানও কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।

​মির্জা বাড়িতেও সকালের খাবার শেষ করে পুরুষেরা অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। ইরাও স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো।

​ইরা একাই স্কুলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু বাড়ির বড়রা তাকে একা ছাড়তে নারাজ। অগত্যা সাবধানেই স্কুলে পৌঁছাল সে। স্কুলে রিদির সাথে দেখা হতেই দুই সখী মেতে উঠল গল্পে। Class শেষ করে তারা দুজন চলে গেল TSC-র মাঠে। জায়গাটা বেশ শান্ত, ওরা প্রায়ই এখানে এসে বসে।

​ইরা কালকের এয়ারপোর্ট আর চৌধুরী বাড়ির সব ঘটনা বলতে শুরু করল।

​রিদি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—আচ্ছা, তুই কি কাল তোর সাফওয়ান ভাইয়ার বন্ধু ইশান ভাইয়াকে দেখেছিলি?

​ইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—আরে না! এত কিছুর মাঝে আর ইশান ভাইয়াকে দেখাই হলো না।

​কথার মাঝেই রিদি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে বলল,

—চল চল, অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে! বাড়ি না ফিরলে সবাই চিন্তায় পড়ে যাবে।

​দুজন দ্রুত বাড়ির পথে হাঁটা দিল।

​অন্যদিকে ফারহানাও ক্লাস শেষে বান্ধবীদের সঙ্গে কলেজের মাঠে বসে গল্প করছিল।

​তার বান্ধবী মালা ফারহানার হাতের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,

—কাল তো তোর ইশান ভাইয়া বাড়ি ফিরল। তোর জন্য কী আনল রে?

​ফারহানা হাতে পরা নতুন অ্যাপল ওয়াচটি দেখাল আর ইশানের চেহারার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠল।

​মালা দুষ্টুমির হাসি হেসে বলল,

—হয়েছে হয়েছে, আর বলতে হবে না! বুঝে গেছি, তুই তো তোর ইশান ভাইয়ের প্রেমে পড়ে গেছিস!

​ফারহানা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল। তবে হাসির পেছনে তার মনে তখনও বাজছিল ইশানের সেই গম্ভীর কণ্ঠের বাক্যটি—

​"ওইটায় নজর দিবি না। ওইটা আমার স্পেশাল কারও জন্য..

​কে সেই স্পেশাল ব্যক্তি? আর ইশানের সেই বিশেষ প্যাকেটটি কার জন্য রাখা?

​(চলবে...)

"ভুল হলে বলবেন ভুল গুলো সংশোধন করার চেষ্টা করবো..!😌

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন