ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়ের কোণে শুধু তুই

৪র্থ পর্ব

লেখক: Afifa Maksura Esha

ইশান আজ কাজের ফাঁকে সাফওয়ানের সাথে দেখা করতে তার অফিসে গেল। দীর্ঘদিন পর দুই বন্ধুর দেখা, তাই কাজের কথার চেয়ে গল্প আর হাসি-ঠাট্টাই যেন বেশি হচ্ছিল।

আড্ডা শেষে ইশান বিদায় নিয়ে নিজের কাজে রওনা হতে চাইলে সাফওয়ান ধরে বসলো—

—"চল, আজ আমাদের বাড়ি যাবি।"

ইশান হালকা হেসে এড়াতে চাইল,

—"আজ থাক রে সাফওয়ান, পরে একদিন যাব। আজ একটু কাজ আছে।"

সাফওয়ান কোনো অজুহাত শুনল না, সোজা ইশানের হাত ধরে টেনে বলল,

—"না, আজই যাবি। একদম কোনো কথা নয়, সোজা আমার সাথে চল!"

অবশেষে বন্ধুর নাছোড়বান্দা জেদের কাছে হার মানতে হলো ইশানকে। দুজনে মিলে গাড়িতে উঠে মির্জা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

অন্যদিকে মির্জা বাড়িতে ইরা ততক্ষণে স্কুল থেকে ফিরে এসেছে। রুমে গিয়ে স্কুলের পোশাক বদলে, শাওয়ার নিয়ে সে তৈরি হতে লাগল কোচিংয়ের উদ্দেশ্যে।

ইরার মা মেহেরুন্নেসা নিজেই খাবার নিয়ে মেয়ের রুমে এলেন। তিনি ভালো করেই জানেন, জোর করে না খাওয়ালে তার এই খামখেয়ালী মেয়েটা না খেয়েই ছুটে বের হয়ে যাবে। মায়ের জোরাজুরিতে খেয়ে নিয়ে ইরা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বের হতে নিলে মা আর চাচি সুলতানা রাজিয়া দরজার কাছ থেকে তাগিদ দিলেন—

—"ইরা, যাওয়ার সময় রাস্তাঘাট একটু সাবধানে পার হবি, বুঝেছিস?"

ইরা মিষ্টি হেসে মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।

ঠিক তার পরপরই মির্জা বাড়িতে এসে থামল সাফওয়ান আর ইশানের গাড়ি।

ঘরে ঢুকেই ইশান বিনীতভাবে সাফওয়ানের মা মেহেরুন্নেসা ও চাচি সুলতানা রাজিয়াকে সালাম দিল, তাঁদের সাথে কুশল বিনিময় করল। বাড়িতে মেহেরুন্নেসা, সুলতানা রাজিয়া এবং তাঁদের ছেলেমেয়েরাই উপস্থিত ছিল। এরপর সাফওয়ান আর ইশান দুজন মিলে সাফওয়ানের রুমে গিয়ে বসল।

ইশান এদিক-ওদিক তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে উঠল,

—"কী রে, বাড়িতে আর কাউকে তো দেখছি না?"

সাফওয়ান চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বলল,

—"সবাই তো আছে, শুধু বাবা আর চাচু অফিসে। আর বোধহয় আমার পিচ্চি বোনটাও বাড়িতে নেই, কোচিংয়ে গেছে।"

কথাটা শুনেই ইশান হতাশ হয়ে কপালে হাত দিল,

—"ওহ শিট! এবারও মিস? কবে পাব তোর বোনের দর্শন?"

সাফওয়ান হা-হা করে হেসে উঠে ঠাট্টা করল,

—"যে অবস্থা দেখছি, এ জন্মে মনে হয় আর দেখতে পাবি না!"

ইশান অমনি চোখ পাকিয়ে বলল,

—"আরে ধুর, এসব আজেবাজে বলিস না তো, হবু সালা!"

ঠিক তখনই সাফওয়ানের ছোট চাচাতো ভাই ইজান রুমে ঢুকে বলল,

—"সাফওয়ান ভাইয়া, কাকিমা তোমাদের নিচে ডাকছেন। তাড়াতাড়ি আসো, খাবার তৈরি।"

দুজনে নিচে নামল। ডাইনিং টেবিলে মেহেরুন্নেসা ও সুলতানা রাজিয়া যত্ন করে খাবার বেড়ে দিলেন। ইশান প্রথমে খেতে না চাইলেও তাঁদের মাতৃতুল্য জোরাজুরিতে না খেয়ে উপায় রইল না। পেটপুরে খাওয়া-দাওয়া ও খানিকক্ষণ গল্প শেষে ইশান বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

এদিকে কোচিং শেষ করে ইরা আর তার বান্ধবী রিদি হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। দুই সখীর গল্প আর আড্ডা চলছিল বেশ জমে।

হঠাৎ এক মর্মান্তিক অঘটন! পথ পার হতে গিয়ে তীব্র গতিতে আসা একটি গাড়ির সাথে সজোরে ধাক্কা খেল ইরা। আঘাতটা একটু জোরেই লেগেছিল। মুহূর্তের মধ্যে রাস্তার ওপর ঢলে পড়ল তার নিথর শরীর।

চারপাশে নিমেষেই মানুষের শোরগোল ও ভিড় জমে গেল। কিছু পথচারী ধাওয়া করল ঘাতক গাড়ির চালককে। অন্যদিকে রক্ত হিম করা আতঙ্কে রিদি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে শুরু করল।

রিদি কান্নাভেজা গলায় চেঁচাতে লাগল,

—"কেউ হেল্প করুন! প্লিজ আমার ফ্রেন্ডকে বাঁচান! ইরা, চোখ খোল!"

ঠিক সেই মুহূর্তেই সেই রাস্তা দিয়ে নিজের গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল ইশান। সামনে অত ভিড় দেখে গাড়ি থামিয়ে সে নেমে এল। ভিড় ঠেলে সামনে এগোতেই ইশানের বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল—১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী অচেতন হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে, এলোমেলো চুলে মুখটা ঢাকা। পাশে ওরই বয়সী আরেকটি মেয়ে অঝোরে কাঁদছে।

ইশান ভিড় সরিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল। রিদির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ও আদেশসূচক গলায় বলল,

—"এই মেয়ে, এসো আমার সাথে!"

রিদি যেন খড়কুটো আঁকড়ে ধরল। ইশান নিচু হয়ে মেয়েটিকে কোলে তুলতে গিয়েই থমকে গেল। চুলগুলো সরাতেই ভেসে উঠল সেই চেনা-অচেনা মিষ্টি মায়াভরা মুখটি!

ইশানের চোখ ছানাবড়া—এ তো আর কেউ নয়, এ তার 'Butterfly'! তার নিজের ইরা!

সময় নষ্ট না করে ইশান ইরাকে কোলে তুলে নিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে শুইয়ে দিল। রিদির কান্না দেখে ইশান শান্ত কিন্তু দৃঢ় সুরে বলল,

—"একদম কাঁদবে না! চুপ করে বসো, হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে।"

গাড়ি ছুটিয়ে ইশান পকেট থেকে ফোন বের করে সাফওয়ানকে কল দিল,

—"সাফওয়ান, তুই যেখানেই থাকিস, জলদি হাসপাতালে আয়! এক মুহূর্ত দেরি করিস না, এখনই আয়!"

সাফওয়ান কোনো প্রশ্ন না করে তড়িঘড়ি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

হাসপাতালে পৌঁছাতেই ডাক্তার ও নার্সরা ইরাকে দ্রুত কেবিনে নিয়ে গেলেন। রিদি দরজার বাইরে আতঙ্কে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। ইশান দেওয়ালে হেলান দিয়ে মনে মনে ভাবছিল—সে কখনো স্বপ্নেও কল্পনা করেনি, প্রিয়তমার সাথে তার প্রথম দেখাটা এভাবে রক্তাপ্লুত হাসপাতালে হবে!

খানিক পরেই হাঁপাতে হাঁপাতে এসে পৌঁছাল সাফওয়ান। এসে রিদিকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইশানের শার্ট চেপে ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

—"ইশান! কী হয়েছে? রিদি এখানে কেন? ইরা কোথায়? ইরার কিছু হয়নি তো রে?"

ইশান সাফওয়ানকে সামলে নিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল,

—"শান্ত হ সাফওয়ান, অত প্যানিক করিস না। কিচ্ছু হয়নি ওর, ডাক্তার দেখছে।"

ঠিক তখনই কেবিন থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। সাফওয়ান আর ইশান একসঙ্গে ডাক্তারের দিকে এগিয়ে গেল।

ডাক্তার হাসিমুখে আশ্বস্ত করে বললেন,

—"ভয়ের কিছু নেই। হাতে-পায়ে সামান্য ছড়ে গেছে আর কপালে ও চোখের ওপর হালকা কেটে গেছে। সিরিয়াস কোনো চোট নেই, পেশেন্ট একদম সেফ।"

সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বাড়িতে মা-বাবা যেন অহেতুক আতঙ্কিত না হন, তাই সাফওয়ান বাড়িতে জানিয়ে দিয়েছিল ইরা তার সাথেই আছে এবং চিকিৎসা চলছে, দুশ্চিন্তার কিছু নেই।

তখন সন্ধ্যা প্রায় সাতটা। ইরার জ্ঞান ফিরে এসেছে। রিদিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাফওয়ান সাময়িকভাবে কেবিন থেকে বের হলো।

কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল ইশান।

ইরা চোখ মেলে তাকাল। দরজায় দাঁড়িয়ে এক শ্যামবর্ণের অত্যন্ত সুদর্শন যুবক—পরনে সাদা শার্ট, যার হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, হাতে ঘড়ি, কপালে এলোমেলো সিল্কি চুল। প্রথম দর্শনেই যেন যে কোনো নারীর হৃদয় হরণ করার মতো তার ব্যক্তিত্ব!

ইরা আনমনে অপলক দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে ভাবছিল। ঠিক তখনই ইশান ইরার চোখের সামনে আঙুল দিয়ে হালকা তুড়ি বাজাল!

ইরা চমকে উঠল। ইশান ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

—"ইরা, এখন কেমন লাগছে? শরীর কি একটু ঠিক মনে হচ্ছে?"

ইরা কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই ইশানের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে মায়ের নাম—নাজনীন সুলতানা।

ইশান কলটা রিসিভ করে বলল,

—"হ্যালো মা, আমি একটু ব্যস্ত আছি। বাড়ি ফিরতে লেট হবে, এখন রাখি।"

কথা শেষ হতেই সাফওয়ান ঘরে ঢুকল। সে রিদিকে সাবধানে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এসেছে। সব ফরমালিটি শেষ করে ডাক্তারের সাথে কথা বলে সাফওয়ান আর ইশান মিলে ইরাকে নিয়ে মির্জা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

মির্জা বাড়িতে পা রাখতেই যেন শোরগোল পড়ে গেল!

ইরার ব্যান্ডেজ ও আঘাত দেখে মেহেরুন্নেসা, সুলতানা রাজিয়া, সাফওয়ানের বাবা-মা ও চাচা-চাচিসহ পরিবারের সবাই ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। সাফওয়ান আর ইশান সবাইকে শান্ত করে পুরো ঘটনাটা বুঝিয়ে বলল। বড়রা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ইরাকে তার রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বললেন।

ইশানও মির্জা পরিবার থেকে বিদায় নিয়ে নিজের বাড়ি—চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

রাত তখন প্রায় দশটা।

চৌধুরী বাড়ির ড্রয়িংরুমে শাহরিয়ার চৌধুরী, নাজনীন সুলতানা, চাচা-চাচি, ফুফু, নুরি, ফারহানাসহ পরিবারের সবাই বসে ছিলেন। ইশান ঢুকতেই তার বাবা শাহরিয়ার চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন,

—"সারাদিন কোথায় ছিলে ইশান?"

ইশান সোফায় বসে শান্ত গলায় বলল,

—"বাবা, সাফওয়ানের বোনের এক্সিডেন্ট হয়েছিল।"

তারপর রাস্তার ঘটনা থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত পুরো ঘটনাটা খুলে বলল সে। শাহরিয়ার চৌধুরী উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,

—"ইরার এখন কী অবস্থা?"

—"এখন মোটামুটি ভালোই আছে বাবা, টেনশন করার মতো কিছু নেই। কয়েক দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে," ইশান জবাব দিল।

কথাবার্তা শেষে ইশান নিজের রুমে চলে গেল। নিচে নাজনীন সুলতানা, রাজিয়া সুলতানা আর তানজিলা খাবার গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। ইশান ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো এবং সবাই মিলে রাতের খাবার শেষ করল। সারাদিনের ধকল ও ক্লান্তিতে ইশান ঘরে গিয়ে বিছানায় মাথা রাখতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

অন্যদিকে নুরি আর ফারহানা নিজেদের রুমে বসে গল্প করছিল। নুরি পা দুলিয়ে বলল,

—"ফারহানা আপু, কাল আমি ইরা আপুকে দেখতে যাব। ইশান ভাইয়াকে বলব আমাদের নিয়ে যেতে। তুমি যাবে তো আমার আর ইশান ভাইয়ার সাথে?"

ফারহানা হেসে মাথা নেড়ে জবাব দিল,

—"হ্যাঁ, যাব।"

দুজনেই ঠিক করে ফেলল পরদিন ইশানকে বলেই তারা মির্জা বাড়িতে ইরাকে দেখতে যাবে।

(চলবে...!!)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন